📄 তাবেয়ীন (تابعين)
যিনি রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন সাহাবীর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবিয়ীন বলে। অর্থাৎ যিনি বা যারা ঈমানের সাথে কোন সাহাবীর সাহচর্য লাভ করেছেন, তার নিকট থেকে ইসলামী জ্ঞান আহরণ করেছেন এবং সাহাবীদের অনুকরণ করেছেন তাদেরকে 'তাবিয়ীন' বলে।
কোন কোন মুহাদ্দিসের মতে সাহাবী থেকে অন্তত একটি হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন।
প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞাঃ তাবেয়ীনদের সম্বন্ধে প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞা নিম্নে উপস্থাপন করে আলোচনা করা হলোঃ-
উলুমুল হাদীস এর পরিভাষায়ঃ- তাবেয়ী হচ্ছেনঃ যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন তিনি তাবেয়ী। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, এর জন্য দীর্ঘদিনের সঙ্গ শর্ত নয়। অতএব, যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনিই তাবেয়ী। তাবেয়ীর মধ্যে উত্তমতার স্তরভেদ রয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) 'নুখবাতুল ফিকার' (৪/৭২৪) গ্রন্থে বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন।
ইবনে কাছির (রহঃ) বলেনঃ- খতিব আল-বাগদাদী বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন যিনি সাহাবীর শিষ্য ছিলেন। হাকেমের বক্তব্যের দাবী হচ্ছে- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন তাকে তাবেয়ী বলা যাবে। তাঁর থেকে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, যদিও সাহাবীর শিষ্যত্ব না পেয়ে থাকুক না কেন? ইরাকী (রহঃ) তাঁর 'আলফিয়া' (পৃষ্ঠা-৬৬) তে বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন। মূলতঃ তাবেয়ীন হলেন তারা- 'যারা আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদেরকে দেখেছেন'। তাবেয়ীনরা সাহাবীদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহন
করতেন। তাবেয়ীনদের যুগে এসে হাদীস সংকলনের কাজ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। সাহাবাদের যুগে হাদীস মুখস্তকারীদের সংখ্যাই ছিল বেশী; কম সংখ্যক সাহাবীই হাদীস লিখে রাখতেন। কিন্তু তাবেয়ীদের যুগে এসে এ সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। প্রতিটি মজলিসে হাদীস মুখস্ত করার সাথে সাথে হাদীস লিখনের কাজও গুরুত্ব পায়। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম তাদের শিষ্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ- "তোমরা লিখনের মাধ্যমে ইলমকে বেঁধে রাখ।" অনুরূপ বাণী উমর (রাঃ) ও আনাস (রাঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। এছাড়া বিশিষ্ট তাবেয়ীন ইসলামের পঞ্চম খলিফা উমর বিন আব্দুল আযিয (মৃত:-৯৯হিঃ) তাঁর খিলাফতকালে এ ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দেন। তিনি আবু বকর ইবনে হাযম, ইবনে শিহাব যুহরীসহ বড় বড় মুহাদ্দিসদের কাছে চিঠি লেখেন- তারা যেন হাদীস সংকলন করেন।
আবু বকর ইবনে হাযমকে লেখেন- "খুঁজে খুঁজে রাসূলের বাণী লিপিবদ্ধ করুন। আমার আশংকা হচ্ছে ইলম বিরান হয়ে যাবে, আলেমরা মারা যাচ্ছেন। ব্যাপক যাচাই-বাছাই করুন; শুধুমাত্র রাসূলের হাদীস হলে গ্রহন করবেন।..." ইবনে শিহাব যুহরী বলেন, "উমর বিন আব্দুল আযিয আমাকে সুন্নাহ লিপিবদ্ধ করার আদেশ
দেন। তার আদেশে আমি একটি একটি করে লিপিকা তৈরী করেছি। এরপর তিনি তার শাসনাধীন প্রতিটি অঞ্চলে এর একটি করে কপি পাঠিয়ে দেন।"
তাবেয়ীনদের যুগে যাদের লিপিকার কথা জানা গেছে তারা হলেন-
১. ইবনে আব্বাসের ছাত্র সাঈদ ইবনে যুবাইরের লিপিকা
২. আবু হুরায়রার ছাত্র বাশির ইবনে নাহিকের লিপিকা
৩. ইবনে আব্বাসের ছাত্র মুজাহিদ বিন জাবরের লিপিকা
৪. জাবের বিন আব্দুল্লাহর ছাত্র মুহাম্মদ বিন মুসলিম বিন তাদরুসের লিপিকা
৫. হিশাম বিন উরউয়ার লিপিকা
৬. আউয়ুব বিন আবি তামিমা আস্ সিখতিয়ানীর লিপিকা। এ ছাড়াও রয়েছেন আরো অনেকে।
📄 তাবে’ তাবেয়ীন (تابع تابعين)
একই নিয়ম অনুযায়ী যিনি বা যারা তাবেয়ীদের সাহচর্য লাভ করেছেন বা একটু সময়ের জন্যেও দেখেছেন, তাদের অনুকরণ অনুসরণ করেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন তারাই 'তাবে' তাবিয়ীন'।
প্রখ্যাত আলেমদের অভিমতঃ তাবে তাবেয়ীন সম্বন্ধে প্রখ্যাত আলেমদের অভিমত নিচে উপস্থাপন করে আলোচনা করা হলোঃ-
ইমাম বুখারী (৩৬৫১) ও ইমাম মুসলিম (২৫৩৩) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ "সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে- আমার প্রজন্ম। এরপর তাদের পরে যারা। এরপর তাদের পরে যারা। অতঃপর এমন কওম আসবে যাদের সাক্ষ্য হলফের পিছনে, হলফ সাক্ষ্যের পিছনে ছুটাছুটি করবে।"
ইমাম নববী বলেনঃ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রজন্ম হচ্ছে-সাহাবায়ে কেরام। দ্বিতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবেয়ীগণ। তৃতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবে-তাবেয়ীগণ। [ইমাম নববী রচিত সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ (১৬/৮৫) থেকে সমাপ্ত]।
হাফেয ইবনে হাজার বলেনঃ হাদীসের বাণীঃ "এরপর তাদের পরে যারা" অর্থাৎ তাদের পরের প্রজন্ম। তারা হচ্ছেন তাবেয়ীগণ। "এরপর তাদের পরে যারা"। তারা হচ্ছেন তাবে-তাবেয়ীগণ।
ফাতহুল বারী (৭/৬) থেকে সমাপ্ত। ক্বারী (রহঃ) বলেনঃ সুয়ূতী বলেনঃ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এটি অর্থাৎ প্রজন্ম বিশেষ কোন সময়সীমাতে আবদ্ধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রজন্ম হচ্ছে- সাহাবায়ে কেরাম। নবুয়তের শুরু থেকে সর্বশেষ সাহাবীর মৃত্যু পর্যন্ত ১২০ বছর এ প্রজন্মের সময়কাল। তাবেয়ী-
প্রজন্মের সময়কাল ১০০ হিঃ থেকে ৭০ বছর। আর তাবে-তাবেয়ী প্রজন্মের সময়কাল এরপর থেকে ২২০ হিঃ পর্যন্ত। এ সময়ে ব্যাপকভাবে বিদআতের উদ্ভব ঘটে। মুতাযিলারা তাদের মুখের লাগাম খুলে দেয়। দার্শনিকেরা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠে। দ্বীনদার আলেমগণকে "কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি” এই মতবাদ মেনে নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। এভাবে গোটা পরিস্থিতি ওলট পালট যায়। এভাবে আজ অবধি দ্বীনদারী হ্রাস পেতেই আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর বাস্তব নমুনা যেন ফুটে উঠেছে - "এরপর মিথ্যা ব্যাপক হারে দেখা দিবে”। 'মিরকাতুল মাফাতিহ' (৯/৩৮৭৮) গ্রন্থ থেকে সমাপ্ত।
অতএব, তাবে তাবেয়ীনদের যুগ ছিল বেঁচে থাকা অবশিষ্ট তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনদের নিয়ে। এ যুগে হাদীসের সংকলন ও গ্রন্থায়নের কাজ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। এর আগ পর্যন্ত সময়ে হাদীস বিক্ষিপ্তাকারে বিভিন্ন লিপিকাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। বরং কোন কোনটি ছিল ব্যক্তিগত নোট আকারে। কিন্তু এ যুগে এসে হাদীসের সংকলন সুবিন্যস্ত গ্রন্থের রূপ ধারন করে। সুবিশেষ অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের অধীনে হাদীসগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়।
গ্রন্থাকারে এ যুগে যারা হাদীসের সংকলন করেছেন তাদের সংখ্যা অনেক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-
মক্কায়- ইবনে জুরাইজের (মৃত্যু ১৫০হিঃ)
মদীনায়- মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ ১৫১হিঃ)
ইয়ামেনে- মা'মার বিন রাশেদ (মৃ ১৫৩ হিঃ)
বসরাতে- সাঈদ বিন আবি আরুবা (মৃ ১৫৬হিঃ)
শামে- আল আওযায়ী (মৃ ১৫৬হিঃ)
বসরাতে- শু'বাহ বিন হাজ্জাজ (মৃ ১৬০হিঃ)
কুফাতে- সুফিয়ান ছাওরী (মৃ ১৬১ হিঃ)
মদীনাতে- ইমাম মালেক (মৃ ১৭৯ হিঃ) তার গ্রন্থের নাম "মুয়াত্তা"
মিশরে – ইমাম শাফেয়ী (মৃতঃ ২০৪ হিঃ) তার গ্রন্থের নাম "মুসনাদ"। তবে এ সময়ে সংকলিত গ্রন্থগুলোতে রাসূলের বাণীর সাথে সাহাবায়ে কেরামের বাণীগুলোও মিশ্রিত ছিল।
📄 রিওয়ায়েত (رواية)
হাদীস বা আসার বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত' বলে। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, হাদীস শরীফ বা আসার বর্ণনা করাকে রিওয়ায়েত বলে এবং যিনি বর্ণনা করেন ওনাকে রাবী (رِوَايَتْ) বলে। কোন কোন সময় হাদীস শরীফ বা আসারকেও
রিওয়ায়েত বলে। যেমন, বলা হয় এ সম্পর্কে একটি রিওয়ায়েত আছে।
রিওয়ায়েত (روایت) শব্দের অর্থ হলো কোন ঘটনার বিবরন, বর্ননা, কাহিনী ইত্যাদি। বস্তুতঃ হাদীসের বর্ননাকারীগণও রাসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কিরাম কিংবা তাবেঈনদের কথা, কাজ অথবা অনুমোদনের খন্ড খন্ড বর্ননা পেশ করে থাকেন। এ হিসাবেই তাদের বর্ণিত বিষয়কে রিওয়ায়েত (روَايَتْ) বলা হয়ে থাকে।
রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ) বিল মা'নাঃ অর্থের গুরুত্ব সহকারে হাদীস বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত বিল মা'না' বলে।
রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ) বিল লবজিহিঃ হুবহু অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ) - এর সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীনদের মুখনিঃসৃত শব্দ সহ হাদীস বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত বিল লবজিহি' বলে। এ ধরনের হাদীসের গুরুত্ব অনেক বেশী।
মুনকার (مُنْكَرٌ) ও রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ): যে দুর্বল বর্ণনাকারী রিওয়ায়েত বা হাদীস তদপেক্ষা সর্ব বর্ণনাকারীর রিওয়াতের পরিপন্থী হয় তাকে 'মুনকার রিওয়ায়েত' বলে।
📄 রিওয়ায়েত (رواية) বিল মা’না
অর্থের গুরুত্ব সহকারে হাদীস বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত বিল মা'না' বলে।