📄 সাহাবী (صحابي)
হাদীস শাস্ত্রের কতিপয় পরিভাষা
সাহাবী (صَحَابِیّ) : যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য লাভ করেছেন বা তাঁকে দেখেছেন ও তাঁর একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, অথবা জীবনে একবার তাঁকে দেখেছেন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে সাহাবী বলে।
সর্বোচ্চ হাদীস বর্ণনাকারী কয়েকজন সাহাবীর নাম নিম্নে ছকে দেয়া হলোঃ-
সর্বোচ্চ হাদীস বর্ণনাকারী কয়েকজন সাহাবীর নামঃ
| ক্রঃ নং: | সাহাবীর নাম | ওফাত | জীবন কাল | বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা |
| :--- | :--- | :--- | :--- | :--- |
| ১ | হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রকৃত নাম আবদুর রহমান | ৫৭ হিজরী | ৭৮ বছর | ৫৩৭৪ টি |
| ২ | উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) | ৫৮ হিজরী | ৬৭ বছর | ২২১০টি |
| ৩ | হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) | ৬৮ হিজরী | ৭১ বছর | ১৬৬০টি |
| ৪ | হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) | ৭০ হিজরী | ৮৪ বছর | ১৬৩০টি |
| ৫ | হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) | ৭৪ হিজরী | ৯৪ বছর | ১৫৪০টি |
"সাহাবী" (صَحَابِی) শব্দটি আরবী ভাষার 'সুবহত' শব্দের একটি রূপ। একবচনে 'সাহেব' ও 'সাহাবী' এবং বহুবচনে 'সাহাবা' ব্যবহৃত হয়। আভিধানিক অর্থ সংঙ্গী, সাথী, সহচর, এক সাথে জীবন যাপনকারী অথবা সাহচর্যে অবস্থানকারী। ইসলামী পরিভাষায় 'সাহাবা' শব্দটি দ্বারা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মহান সংঙ্গী-সাথীদের বুঝিয়েছেন। 'সাহেব' শব্দটির বহুবচনের আরো কয়েকটি রূপ আছে। তবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সংঙ্গী-সাথীদের বুঝানোর জন্য
'সাহেব' এর বহুবচনে 'সাহাবা' ছাড়া 'আসাহাব' ও 'সাহব' ও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
আল্লামা ইবন হাজার (রহঃ) 'আল-ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা' গ্রন্থে সাহাবীর সংজ্ঞা দিতে দিয়ে বলেনঃ ইন্নাস সাহাবীয়্যা মান লাকিয়ান নাবিয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা মু'মিনান বিহি ওয়া মাতা আলাল ইসলাম'- অর্থাৎ সাহাবী সেই ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহ'র (সাঃ) প্রতি ঈমান সহকারে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।
সাহাবী হওয়ার জন্য তিনটি শর্তারোপঃ উপরোক্ত সংজ্ঞায় সাহাবী হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। (১) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি ঈমান (২) ঈমানের অবস্থায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ (আল-লিকা) (৩) ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ (মাউত'আলাল ইসলাম)।
প্রথম শর্তটি দ্বারা এমন সাহাবী বলে গণ্য হবে না যারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাক্ষাৎ তো লাভ করেছে কিন্তু ঈমান আনেনি। যেমনঃ আবু জাহল, আবু লাহাব প্রমুখ মক্কার কাফিরবৃন্দ।
দ্বিতীয় শর্ত অর্থাৎ সাক্ষাৎ দ্বারা এমন ব্যক্তিও সাহাবী বলে গণ্য হবেন, যিনি হুজুরের তো সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, কিন্তু অন্ধত্ব বা এ জাতীয় কোন অক্ষমতার কারণে চোখে দেখার সৌভাগ্য থেকে
বঞ্চিত হয়েছেন। যেমনঃ অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রাঃ)।
তৃতীয় শর্ত অর্থাৎ মাউত 'আলাল ইসলাম দ্বারা এমন লোকও সাহাবীদের দলে শামিল হবেন, যাঁরা ঈমান অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন। তারপর মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়েছেন। তারপর আবার ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন। পুনরায় ইসলাম গ্রহণের পর নতুন করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাক্ষাৎ লাভ না করলেও তিনি সাহাবী বলে গণ্য হবেন। এটাই সর্বাধিক সঠিক মত। যেমনঃ হযরত আশয়াস ইবন কায়েস (রাঃ) ও আরো অনেকে। হাদীস বিশারদগণ আশয়াস ইবন কায়েসকে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করে তাঁর বর্ণিত হাদীস সহীহ ও মুসনাদ গ্রন্থসমূহে সংকলন করেছেন। অথচ তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মুরতাদ (ধর্মত্যাগ) হয়ে যান এবং হযরত আবু বকরের (রাঃ) খিলাফতকালে আবার ইসলামে ফিরে আসেন। শেষোক্ত শর্তের ভিত্তিতে এমন ব্যক্তি সাহাবী বলে গণ্য হবে না যে ইসলাম অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাক্ষাৎ লাভ করেছে, কিন্তু পরে মুরতা অবস্থায় মারা গেছে। যেমনঃ আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ আল-আসাদী। সে মুসলমান হয়ে হাবশায় হিজরাত করার পর খৃষ্টান হয়ে যায় এবং সেখানে মুরতাদ অবস্থায় মারা যায়। তাছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল, রাবীয়া ইবন উমাইয়া প্রমুখ মুরতাদ ব্যক্তিবর্গ। সাহাবী
হওয়ার জন্য ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ শর্তটি উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
উপরোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ঈমান সহকারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাথে সাক্ষাতের পর তাঁর সাহচর্য বেশী বা অল্প দিনের জন্য হউক, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করুক বা না করুক, রাসূলুল্লহ সংগে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক, এমন কি যে ব্যক্তির জীবনে মুহূর্তের জন্য রাসূলুল্লহ (সাঃ) সাক্ষাত লাভ ঘটেছে এবং ঈমানের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, এমন সকলেই সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত। যারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রতি ঈমান আনেনি, কিন্তু পূর্ববর্তী অন্য কোন নবীর প্রতি ঈমান সহকারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাক্ষা লাভ করেছে, তারা সাহাবী নয়। আর বুহাইরা লাভের পূর্বে তাঁর সাক্ষা লাভ করেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন, তিনি ভবিষ্যতে নবী হবেন- এমন ব্যক্তিদের সাহাবা হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। মুসলিম মনীষীরা তাঁদের সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করতে পারেনি। উল্লেখিত সংজ্ঞার শর্তাবলী জ্বীনদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জ্বীনরাও সাহাবা ছিলেন। কুরআন মজিদে এমন কিছু জ্বীনের কথা বলা হয়েছে যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরআন তিলাওয়াত শুনে ঈমান এনেছিলেন। নি:সন্দেহে তারা অতি মর্যাদাবান সাহাবা ছিলেন। সাহাবীর উল্লেখিত সংজ্ঞাটি ইমাম বুখারী, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলসহ অধিকাংশ পন্ডিতের নিকট সর্বাধিক সঠিক বলে
বিবেচিত। অবশ্য সাহাবীর সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আরো কয়েকটি অপ্রসিদ্ধ মতামতও আছে। যেমন কেউ সাক্ষাতের (আল-লিকা) স্থলে চোখে দেখার (রুইয়া) শর্ত আরোপ করেছেন। কিন্তু তাতে এমন সব ব্যক্তি বাদ পড়ে যাবেন যাঁরা মুমিন হওয়া সত্ত্বেও অন্ধত্বের কারণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চোখে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
যেমনঃ আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রাঃ)। অথচ তিনি অতি মর্যাদাবান সাহাবী ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেনঃ সাহাবী হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, এক বা দু'বছর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহচর্য অথবা তাঁর সাথে দু'একটি গাযওয়া বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ।
কিছু সংখ্যক উলামায়ে উসূল ও উলামায়ে ইলমুল কালাম এর মতে, সাহাবী হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দীর্ঘ সাহচর্য ও সুন্নাতে নববীর (সাঃ) অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁর পরিচিতি ও খ্যাতি।
কেউ কেউ আবার বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। একদল আলিমের মতে যে ব্যক্তি বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর এক নজর রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) দেখেছেন, তিনি সাহাবী। আর যিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) দেখেছেন, তিনিও সাহাবী। তবে এ হিসেবে যে, রাসূল (সাঃ) তাকে দেখেছেন। তিনি রাসূলকে (সাঃ) দেখেছেন সে হিসাব নয়। কিন্তু হাদীস বর্ণনার দিক দিয়ে এম ব্যক্তি সাহাবী নন, বরং তাবেঈর মর্যাদা লাভ করবেন। প্রশ্ন হতে পারে, যদি কেউ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ইনতিকালের পর দাফনের পূর্বে তাকে দেখে থাকেন, যেমনটি ঘটেছিল প্রখ্যাত আরবী কবি 'আবু জুয়ায়িব
আল-হুজালীর' ক্ষেত্রে- তাঁর ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হবে? আলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এমন ব্যক্তি সাহাবীদের দলভুক্ত হবেন না। ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহচর্য বা 'সুবহাত' এমন একটি মর্যাদা, যার সমকক্ষ আর কোন মর্যাদা মুসলমানদের জন্য নেই। সুহবতের মর্যাদা ছাড়াও দ্বীনের ভিত্তিকে শক্তিশালী ও মজবুত করা, ইসলামের তাবলীগ ও শরীয়তের খিদমতের ক্ষেত্রে কঠোর শ্রমদান ও আত্মত্যাগের কারণে প্রতিটি মুসলমানের কাছে সাহাবায়ে কিরামের একটি পবিত্র ও উচ্চ মার্যাদা আছে। এ কারণে কোন কোন আলিমের মতে সাহাবীদের হেয় প্রতিপন্নকারী ব্যক্তি যিনদীক। আবার কারো মতে, এটা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাহাবীদের মর্যাদাঃ সাহাবীদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদা হিসেবে স্তরভেদ থাকতে পারে, কিন্তু পরবর্তী যুগের কোন মুসলমানই, তা তিনি যত বড় জ্ঞানী, গুণী ও সাধক হোন না কেন কেউই একজন সাধারণ সাহাবীর মার্যাদাও লাভ করতে পারেন না। এ ব্যাপারে কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা একমত। এই সাহাবীরাই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও তাঁর উম্মাতের মধ্যে প্রথম মধ্যসূত্র। পরবর্তী উম্মাত আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআন, কুরআনের ব্যাখ্যা, আল্লাহর রাসূলের পরিচয়, তাঁর শিক্ষা, আদর্শ, মোটকথা, দ্বীনের সবকিছুই একমাত্র তাদেঁরই সূত্রে, তাঁদেরই মাধ্যমে জানতে পেরেছে। সুতরাং
এই প্রথম সূত্র উপেক্ষা করলে, বাদ দিলে অথবা তাঁদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হলে দ্বীনের সবকিছুই একমাত্র তাঁদেরই মাধ্যমে জানতে পেরেছে। সুতরাং এই প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হলে দ্বীনের মূল ভিত্তিই ধসে পড়ে। কুরআন ও হাদীসের প্রতি অবিশ্বাস্য দানা বেঁধে ওঠে। হাফেজ ইবন আবদিল বার সাহাবীদের মার্যাদা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সুহবত ও তার সুন্নাতের হিফাজত ও ইশায়াতের দুর্লভ মর্যাদা আল্লাহ তা'আলা এইসব মহান ব্যক্তির ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন। এ কারণেই তাঁরা 'খায়রুল কুরুন' ও 'খায়রু উম্মাতিন' এর মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন।
হাফেজ আবু বকর ইবন খতীব আল-বাগদাদী বলেনঃ উল্লেখিত ভাব ও বিষয়ের হাদীস ও আখরারের সংখ্যা অনেক এবং সবই 'নাসসুল কুরআনের' ভাবের সাথে সংগতিপূর্ণ। অর্থা তাতে সাহাবীদরে সুমহান মার্যাদা, আদালাত, পবিত্রতা, ইত্যাদি ভাব ব্যক্ত হয়েছে।
আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক তাদের আদালতের ঘোষণা দানের পর পৃথিবীর আর কোন মানুষের সনদের মুখাপেক্ষী তাঁরা নন। আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) তাঁদের সম্পর্কে কোন ঘোষণা না দিলেও তাঁদের হিজরাত, জিহাদ, সাহায্য, আল্লাহর রাহে ধন-সম্পদ ব্যয়, পিতা ও সন্তানদের হত্যা, দ্বীনের ব্যাপারে উপদেশ, ঈমান ও ইয়াকীনের দৃঢ়তা ইত্যাদি কর্মকান্ড এ কথা প্রমাণ করতো যে, আদালাত, বিশ্বাস, পবিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ন্যায়
পরায়ণ ও পবিত্র ব্যক্তিই জন্মগ্রহণ করুন না কেন, তাঁরা ছিলেন সকলের থেকে উত্তম। কোন কোন সাহাবীর জীবদ্দশায় রাসূল (সাঃ) তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে মুসলিম পন্ডিতদের অনেকে সাহাবীদের সকলেই জান্নাতী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
ইবন হাজার 'আল-ইসাবা' গ্রন্থে স্পেনের ইমাম ইবন হাযামের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেনঃ 'আস-সাহাবাতু কুল্লুহুম মিন আহলিল জান্নাতী কাতআন- সাহাবীদের সকলেই নিশ্চিতভাবে জান্নাতী"। রাসুল (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের গালি দেওয়া বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সমালোচনা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ "আল্লাহ, আল্লাহ! আমার পরে তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত করো না। তাদেরকে যারা ভালবাসে, আমার মুহাব্বতের খাতিরেই তারা ভালবাসে, আর যারা তাদেরকে হিংসা করে, আমার প্রতি হিংসার কারণেই তারা তা করে"।
সাহাবী চিনবার উপায়ঃ প্রশ্ন হতে পারে, কে সাহাবী এবং কে সাহাবী নয়, তা কিভাবে নির্ণয় করতে হবে? 'রিজাল ও হাদীস' শাস্ত্র বিসারদগণ এ ব্যাপারে কতিপয় মূলনীতির অনুসরণ করেছেন।
প্রথমঃ 'খবরে তাওয়াতুর' অর্থাৎ একজন মানুষ সম্পর্কে যখন প্রতিটি যুগের অসংখ্য মানুষ বর্ণনা বা সাক্ষ্য দেবে যে তিনি সাহাবী ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, 'খবরে মাশহুর' অর্থাৎ প্রতিটি যুগের প্রচুর সংখ্যক মানুষ সাক্ষ্য দিবে যে, অমুক সাহাবী।
তৃতীয়ত: কোন একজন সাহাবীর বর্ণনা বা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে।
চতুর্থত: কোন একজন প্রখ্যাত তাবেঈর বর্ণনা বা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে।
পঞ্চমত: কেউ নিজেই যদি দাবী করেন, আসি সাহাবী। সে ক্ষেত্রে দু'টি বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে আছে কিনা তা দেখতে হবে। ১) 'আদালত' বা ন্যায়নিষ্ঠতা। এটি সাহাবীদের বিশেষ গুন। সাহাবীয়্যাতের দাবীদার ব্যক্তির মধ্যে এ গুণটি অবশ্যই থাকতে হবে। ২) 'মুয়াসিরাত' বা সমসাময়িকতা। সাহাবীদের যুগ শেষ হয়েছে হিজরী ১১০ সনে। কারণ, রাসূল (সাঃ) তাঁর ইনতিকালের একমাস পূর্বে বলেছিলেন, আজ এ পৃথিবীতে যারা জীবিত আছে, আজ থেকে একশ বছর পর তারা কেউ জীবিত থাকবে না। সুতরাং হিজরী ১১০ সনের পরে কেউ জীবিত থাকলে এবং সে সাহাবী বলে দাবী করলে, 'রিজাল'শাস্ত্র বিশারদরা তাকে সাহাবী বলে মেনে নেননি।
অনেকে এমন দাবী করেছিলেন; কিন্তু সে দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। তাদের জীবনীও 'রিজাল' শাস্ত্রে লিখিত আছে। এ ছাড়াও সাহাবী নির্ধারণের আরো কিছু নিয়ম নীতি মুহাদ্দিসগণ অনুসরণ করেছেন। সাহাবীদের সংখ্যাঃ সাহাবীদের সংখ্যা যে কত তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। ইমাম আবু যারআ আর রাযী
বলেছেন, রাসূল (সাঃ) যখন ইনতিকাল করেন, তখন যারা তাঁকে দেখেছেন এবং তাঁর কথা শুনেছেন এমন লোকের সংখ্যা নারী-পুরুষ মিলে এক লাখেরও ওপরে। তাঁদের প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাহলে যে সকল সাহাবী কোন হাদীস বর্ণনা করেননি তাঁদের সংখ্যা যে কত বিপুল তা সহজেই অনুমেয়। আবু যারআর একথার সমর্থন পাওয়া যায় বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হযরত কা'ব ইবন মালিকের একটি বক্তব্য দ্বারা। তিনি তাবুক অভিযান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, "মানুষের সংখ্যা অনেক। কোন দফতর বা দিনওয়ান তা গণনা করতে পারবে না"।
সাহাবীদের যথাযথ হিসেব কোনভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জীবনের শেষ দিকে মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর হাতে বাইয়াত হয়। কেউ কেউ বলেছেন, হিজরী দশম সনে মক্কা এবং তায়েফে একজনও অমুসলিম ছিল না। সকলে ইসলাম গ্রহণ করে বিদায় হজ্জে অংশ গ্রহণ করে। এমনিভাবে আরবের বহু গোত্র সম্পূর্ণরূপে মুসলমান হয়ে যায়। তাদের অধিকাংশ ছিল মরুবাসী। তাহের হিসেব সংরক্ষণ করা কোনভাবেই সম্ভব ছিলনা। তাছাড়া হযরত আবু বকরের (রাঃ) খিলাফতকালে ভণ্ড নবী ও ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানকালে অসংখ্যা সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের অনেকের পরিচয় ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত ও অসংখ্য হাদীসে সাহাবীদের মর্যাদা ও ফজীলত
বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আয়াতের অর্থ উদ্ধৃত হলোঃ "মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল : তার সহচরগণ, কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমন্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইনজীলেও” (সূরা আল-ফাতাহ: ২৯)
"মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটা হবে কামিয়াবী”। (সূরা আত-তাওবা: ১০০)। "এ সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে (মদীনা) বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্খা পোষণ করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও”। (সূরা আল-হাশর: ৮-৯) এ আয়াতে প্রথমে মুহাজির ও পরে আনসারদের প্রশংসা করা হয়েছে।
এমনিভাবে সূরা আল-ফাতাহ- ১৮, সূরা আল-ওয়াকিয়া- ১০, এবং সূরা আল-আনফালের ৬৪ নাম্বার আয়াতসমূহ বিভিন্ন আয়াতে কোথাও প্রত্যক্ষ আবার কোথাও পরোক্ষভাবে সাহাবায়ে কিরামের প্রশংসা এসেছে।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেও তাঁর সাহাবীদের শানে বক্তব্য রেখেছেন। তাঁদের সম্মান, মর্যাদা ও স্থান নির্ধারণ করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- "আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম লোক হচ্ছে আমার যুগের লোকেরা। তারপর তার পরের যুগের লোকেরা, তারপর তার পরের যুগের লোকেরা। তারপর এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে যাদের কমস হবে তাদের সাক্ষ্যের অগ্রগামী। তাদের কাছে সাক্ষী চাওয়ার আগেই তারা সাক্ষ্য দেবে"।
"তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দেবেনা, কসম নেই সত্তার যাঁর হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও ব্যায় করো তবুও তাদের যে কোন একজনের 'মুদ' বা তার অর্ধেক পরিমাণ যবের সমতুল্য হবে না”।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ "তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তার ওপর আমল করতে হবে। তা তরক করা সম্পর্কে তোমাদের কারো কোন ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। যদি আল্লাহর কিতাবে কোন সিদ্ধান্ত না পাওয়া যায় তাহলে আমার সুন্নাতে খোঁজ করতে থাক। যদি তাতেও না পাওয়া যায় তাহলে আমার
সাহাবীদের কথায় তালাশ করতে হবে। আমার সাহাবীরা আকাশের তারকা সদৃশ। তার কোন একটিকে তোমরা গ্রহণ করলে সঠিক পথ পাবে। আর আমার সাহাবীদের পারস্পরিক ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য তোমাদের জন্য রহমত স্বরূপ"। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "আমার পরে আমার সাহাবীদের পারস্পরিক মতপার্থক্য সম্পর্কে আমার 'রব' প্রভুকে জিজ্ঞেস করলাম। আল্লাহ আমার কাছে ওহী পাঠালেন: হে মুহাম্মদ, তোমার সাহাবীরা আমার কাছে আকাশের তারকা সদৃশ। তারকার মত তারাও একটি থেকে অন্যটি উজ্জ্বলতর। তাদের বিতর্কিত বিষয়ের কোন বিষয়ের কোন একটিকে যে আঁকড়ে থাকবে, আমার কাছে সে হবে হিদায়াতের ওপরে"।
ইমাম শাফেঈ হযরত আনাস ইবন মালিকের সনদে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ আমাকে ও আমার সাহাবীদেরকে মনোনীত করেছেন। তাদের সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে আমার আনসার বানিয়ে দিয়েছেন। শেষ যামানার এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে যারা তাদের অবমাননা করবে।
সাবধান, তোমরা তাদের ছেলে-মেয়ে বিয়ে করবে না তাদের কাছে ছেলে-মেয়ে বিয়েও দেবে না। সাবধান, তাদের সাথে নামায পড়বে।
না, তাদের জানাযাও পড়বে না। তাদের ওপর আল্লাহ লা'নত।
মিশকাত শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন আমার উম্মাতের মধ্যে একটি ফিরকাই নিশ্চিত জান্নাতী হবে। জিজ্ঞাস করা হলো, তারা কে? বললেনঃ যারা আমার ও আমার সাহাবীদের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে সাহাবীদের স্থান তেমন, যেমন খাবারের মধ্যে লবণের স্থান।
সাহাবীদের সমাজঃ সাহাবীদের সমাজ ছিল একটি আদর্শ মানব সমাজ। তাঁদের কর্মকান্ড মানব জাতির জন্য একটি উৎকৃষ্টতম নমুনা স্বরূপ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের সততা, বিশ্বস্ততা, ভদ্রতা, আত্মত্যাগ ও সদাচারণ তুলনাবিহীন। তাঁরা ছিলেন একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিশীল। গরীব ও মুহতাজ শ্রেণীর প্রয়োজন ও চাহিদাকে তাঁরা সবসময় অগ্রাধিকার দিতেন। বীরত্ব ও সাহসিকতায় তাঁরা ছিলেন নজীরবিহীন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইত্তেবা বা অনুসরণ ছিল তাঁদের জীবনের মূল লক্ষ্য। তাঁদের জীবন-মরণ উভয়ই ছিল ইসলামের জন্য। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) যে সর্বোত্তম সমাজের ভিত্তি রেখেছিলেন, সাহাবায়ে কিরাম হচ্ছেন সেই সমাজের প্রথম নমুনা। রাসূল পাকের
(সাঃ) সুহবতের বরকতে তাঁরা মহান মানবতার বাস্তব রূপ ধারণ করেছিলেন।
‘আদল, তাকওয়া, দিয়ানাত, ইহসান এবং খাওফে খোদার তাঁরা ছিলেন সমুজ্জ্বল প্রতীক। তাঁদের মধ্যে এই অনুভূতি সদা জাগ্রত ছিল যে, এই পৃথিবীতে তাঁদের আগমন ইসলামের ঝান্ডা সমুন্নত করা ও মানব জাতির মধ্যে সমতা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য।
এখানে তাঁদেরকে খিলাফতে ইলাহিয়ার আমীন বা বিশ্বাসী রূপে আল্লাহর উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। পবিত্রতা ও নিস্কুলতা তাঁদের মধ্যে এমন পরিচ্ছন্ন হৃদয় ও ন্যায়ের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছিল যে, হক ও ইনসাফের ব্যাপারে তাঁরা যেমন নিজেদেরকে দায়িত্বশীল মনে করতেন, তেমন মনে করতেন অন্যদেরকেও। তাঁরা উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থাকা সত্বেও নিজেদের সন্তান ও আত্মীয়-বন্ধুদের শরয়ী বিধানের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারেনি, বাঁচাতে চেষ্টাও করেননি। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনে হাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর অনুসরণ করেছেন, তাঁর নির্দেশ পালন করেছেন এবং ছোট-বড় প্রত্যেক বিষয়ে তারা তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। তারা রাসূলের এত অনুসরণ করতেন যে, কোন কারণ ও হিকমত জানা ছাড়াই তিনি যা করতেন তারা তাই করত, তিনি যা পরিহার করতেন তারাও তা পরিহার করত। যেমন ইমাম বুখারী ইব্
ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি স্বর্ণের আঙটি পরিধান করেছিলেন, ফলে লোকেরাও স্বর্ণের আঙটি পরিধান করে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা এ বলে নিক্ষেপ করেন: "আমি কখনো তা পরিধান করব না, ফলে লোকেরাও তাদের আঙটি ফেলে দেন"⁹⁸。
ইমাম আবু দাউদ আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের নিয়ে সালাত আদায় করতে ছিলেন, হটাৎ তিনি জুতো খুলে বাম পাশে রেখে দেন। যখন লোকেরা তাকে দেখল, তারাও তাদের জুতো নিক্ষেপ করল। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করে বলেন: তোমরা কেন তোমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছ, তারা বলল: আমরা আপনাকে দেখেছি আপনি জুতো নিক্ষেপ করেছেন, তাই আমরাও আমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছি। তিনি বললেন: জিবরীল (অঃ) আমার নিকট এসে বলল যে, জুতোতে ময়লা রয়েছে"⁹⁹। মোটকথা ঈমান ও বিশ্বাস তাদের সামগ্রিক যোগ্যতাকে আলোকিত করে দিয়েছিল। তাঁরা খুব অল্প সময়ে বিশ্বের সর্বাধিক অংশ প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁদের সামরিক ও সাংগঠনিক
যোগ্যতার ভুরিভুরি নজীর ইতিহাসের পাতায় বিদ্যামান। সাহাবায়ে কিরামের আদর্শ সমাজের অনুরূপ সমাজ যদি আজ আমরা গড়তে চাই, আমাদের অবশ্যই তাঁদের সম্পর্কে জানতে হবে। তাঁদের মত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কুরআনী সমাজ গড়ার যে চেতনা দেখা যাচ্ছে, তাকে সঠিক লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যেতে হলে সাহাবীদের জীবনীর ব্যাপক চর্চা হওয়া দরকার। তাঁদের জীবন থেকেই দিক নির্দেশনা নিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাঙালী মুসলিম সমাজে সাহাবীদের জীবনের চর্চা খুব কম। এখানে পীর-আওলিয়ার জীবনের কাল্পনিক কিসসা-কাহিনী যে পরিমাণে আলোচিত হয় তার কিয়দাংশও সাহাবীদের জীবনীর আলোচনা হয়না। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন, আমীন।
টিকাঃ
⁹⁸ বুখারি, ৫৮৬৭。
⁹⁹ আবু দাউদ, ৬৫০。
📄 তাবেয়ীন (تابعين)
যিনি রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন সাহাবীর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন অথবা তাঁকে দেখেছেন এবং মুসলমান হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁকে তাবিয়ীন বলে। অর্থাৎ যিনি বা যারা ঈমানের সাথে কোন সাহাবীর সাহচর্য লাভ করেছেন, তার নিকট থেকে ইসলামী জ্ঞান আহরণ করেছেন এবং সাহাবীদের অনুকরণ করেছেন তাদেরকে 'তাবিয়ীন' বলে।
কোন কোন মুহাদ্দিসের মতে সাহাবী থেকে অন্তত একটি হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন।
প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞাঃ তাবেয়ীনদের সম্বন্ধে প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞা নিম্নে উপস্থাপন করে আলোচনা করা হলোঃ-
উলুমুল হাদীস এর পরিভাষায়ঃ- তাবেয়ী হচ্ছেনঃ যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন তিনি তাবেয়ী। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, এর জন্য দীর্ঘদিনের সঙ্গ শর্ত নয়। অতএব, যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনিই তাবেয়ী। তাবেয়ীর মধ্যে উত্তমতার স্তরভেদ রয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) 'নুখবাতুল ফিকার' (৪/৭২৪) গ্রন্থে বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন।
ইবনে কাছির (রহঃ) বলেনঃ- খতিব আল-বাগদাদী বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন যিনি সাহাবীর শিষ্য ছিলেন। হাকেমের বক্তব্যের দাবী হচ্ছে- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন তাকে তাবেয়ী বলা যাবে। তাঁর থেকে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, যদিও সাহাবীর শিষ্যত্ব না পেয়ে থাকুক না কেন? ইরাকী (রহঃ) তাঁর 'আলফিয়া' (পৃষ্ঠা-৬৬) তে বলেনঃ তাবেয়ী হচ্ছেন- যিনি সাহাবীর সাক্ষাত পেয়েছেন। মূলতঃ তাবেয়ীন হলেন তারা- 'যারা আল্লাহর রাসূলের সাহাবীদেরকে দেখেছেন'। তাবেয়ীনরা সাহাবীদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহন
করতেন। তাবেয়ীনদের যুগে এসে হাদীস সংকলনের কাজ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। সাহাবাদের যুগে হাদীস মুখস্তকারীদের সংখ্যাই ছিল বেশী; কম সংখ্যক সাহাবীই হাদীস লিখে রাখতেন। কিন্তু তাবেয়ীদের যুগে এসে এ সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। প্রতিটি মজলিসে হাদীস মুখস্ত করার সাথে সাথে হাদীস লিখনের কাজও গুরুত্ব পায়। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম তাদের শিষ্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ- "তোমরা লিখনের মাধ্যমে ইলমকে বেঁধে রাখ।" অনুরূপ বাণী উমর (রাঃ) ও আনাস (রাঃ) থেকেও বর্ণিত আছে। এছাড়া বিশিষ্ট তাবেয়ীন ইসলামের পঞ্চম খলিফা উমর বিন আব্দুল আযিয (মৃত:-৯৯হিঃ) তাঁর খিলাফতকালে এ ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দেন। তিনি আবু বকর ইবনে হাযম, ইবনে শিহাব যুহরীসহ বড় বড় মুহাদ্দিসদের কাছে চিঠি লেখেন- তারা যেন হাদীস সংকলন করেন।
আবু বকর ইবনে হাযমকে লেখেন- "খুঁজে খুঁজে রাসূলের বাণী লিপিবদ্ধ করুন। আমার আশংকা হচ্ছে ইলম বিরান হয়ে যাবে, আলেমরা মারা যাচ্ছেন। ব্যাপক যাচাই-বাছাই করুন; শুধুমাত্র রাসূলের হাদীস হলে গ্রহন করবেন।..." ইবনে শিহাব যুহরী বলেন, "উমর বিন আব্দুল আযিয আমাকে সুন্নাহ লিপিবদ্ধ করার আদেশ
দেন। তার আদেশে আমি একটি একটি করে লিপিকা তৈরী করেছি। এরপর তিনি তার শাসনাধীন প্রতিটি অঞ্চলে এর একটি করে কপি পাঠিয়ে দেন।"
তাবেয়ীনদের যুগে যাদের লিপিকার কথা জানা গেছে তারা হলেন-
১. ইবনে আব্বাসের ছাত্র সাঈদ ইবনে যুবাইরের লিপিকা
২. আবু হুরায়রার ছাত্র বাশির ইবনে নাহিকের লিপিকা
৩. ইবনে আব্বাসের ছাত্র মুজাহিদ বিন জাবরের লিপিকা
৪. জাবের বিন আব্দুল্লাহর ছাত্র মুহাম্মদ বিন মুসলিম বিন তাদরুসের লিপিকা
৫. হিশাম বিন উরউয়ার লিপিকা
৬. আউয়ুব বিন আবি তামিমা আস্ সিখতিয়ানীর লিপিকা। এ ছাড়াও রয়েছেন আরো অনেকে।
📄 তাবে’ তাবেয়ীন (تابع تابعين)
একই নিয়ম অনুযায়ী যিনি বা যারা তাবেয়ীদের সাহচর্য লাভ করেছেন বা একটু সময়ের জন্যেও দেখেছেন, তাদের অনুকরণ অনুসরণ করেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন তারাই 'তাবে' তাবিয়ীন'।
প্রখ্যাত আলেমদের অভিমতঃ তাবে তাবেয়ীন সম্বন্ধে প্রখ্যাত আলেমদের অভিমত নিচে উপস্থাপন করে আলোচনা করা হলোঃ-
ইমাম বুখারী (৩৬৫১) ও ইমাম মুসলিম (২৫৩৩) ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ "সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে- আমার প্রজন্ম। এরপর তাদের পরে যারা। এরপর তাদের পরে যারা। অতঃপর এমন কওম আসবে যাদের সাক্ষ্য হলফের পিছনে, হলফ সাক্ষ্যের পিছনে ছুটাছুটি করবে।"
ইমাম নববী বলেনঃ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রজন্ম হচ্ছে-সাহাবায়ে কেরام। দ্বিতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবেয়ীগণ। তৃতীয় প্রজন্ম হচ্ছে- তাবে-তাবেয়ীগণ। [ইমাম নববী রচিত সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ (১৬/৮৫) থেকে সমাপ্ত]।
হাফেয ইবনে হাজার বলেনঃ হাদীসের বাণীঃ "এরপর তাদের পরে যারা" অর্থাৎ তাদের পরের প্রজন্ম। তারা হচ্ছেন তাবেয়ীগণ। "এরপর তাদের পরে যারা"। তারা হচ্ছেন তাবে-তাবেয়ীগণ।
ফাতহুল বারী (৭/৬) থেকে সমাপ্ত। ক্বারী (রহঃ) বলেনঃ সুয়ূতী বলেনঃ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এটি অর্থাৎ প্রজন্ম বিশেষ কোন সময়সীমাতে আবদ্ধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রজন্ম হচ্ছে- সাহাবায়ে কেরাম। নবুয়তের শুরু থেকে সর্বশেষ সাহাবীর মৃত্যু পর্যন্ত ১২০ বছর এ প্রজন্মের সময়কাল। তাবেয়ী-
প্রজন্মের সময়কাল ১০০ হিঃ থেকে ৭০ বছর। আর তাবে-তাবেয়ী প্রজন্মের সময়কাল এরপর থেকে ২২০ হিঃ পর্যন্ত। এ সময়ে ব্যাপকভাবে বিদআতের উদ্ভব ঘটে। মুতাযিলারা তাদের মুখের লাগাম খুলে দেয়। দার্শনিকেরা মাথা ছাড়া দিয়ে উঠে। দ্বীনদার আলেমগণকে "কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি” এই মতবাদ মেনে নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। এভাবে গোটা পরিস্থিতি ওলট পালট যায়। এভাবে আজ অবধি দ্বীনদারী হ্রাস পেতেই আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর বাস্তব নমুনা যেন ফুটে উঠেছে - "এরপর মিথ্যা ব্যাপক হারে দেখা দিবে”। 'মিরকাতুল মাফাতিহ' (৯/৩৮৭৮) গ্রন্থ থেকে সমাপ্ত।
অতএব, তাবে তাবেয়ীনদের যুগ ছিল বেঁচে থাকা অবশিষ্ট তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীনদের নিয়ে। এ যুগে হাদীসের সংকলন ও গ্রন্থায়নের কাজ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। এর আগ পর্যন্ত সময়ে হাদীস বিক্ষিপ্তাকারে বিভিন্ন লিপিকাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। বরং কোন কোনটি ছিল ব্যক্তিগত নোট আকারে। কিন্তু এ যুগে এসে হাদীসের সংকলন সুবিন্যস্ত গ্রন্থের রূপ ধারন করে। সুবিশেষ অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের অধীনে হাদীসগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়।
গ্রন্থাকারে এ যুগে যারা হাদীসের সংকলন করেছেন তাদের সংখ্যা অনেক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-
মক্কায়- ইবনে জুরাইজের (মৃত্যু ১৫০হিঃ)
মদীনায়- মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ ১৫১হিঃ)
ইয়ামেনে- মা'মার বিন রাশেদ (মৃ ১৫৩ হিঃ)
বসরাতে- সাঈদ বিন আবি আরুবা (মৃ ১৫৬হিঃ)
শামে- আল আওযায়ী (মৃ ১৫৬হিঃ)
বসরাতে- শু'বাহ বিন হাজ্জাজ (মৃ ১৬০হিঃ)
কুফাতে- সুফিয়ান ছাওরী (মৃ ১৬১ হিঃ)
মদীনাতে- ইমাম মালেক (মৃ ১৭৯ হিঃ) তার গ্রন্থের নাম "মুয়াত্তা"
মিশরে – ইমাম শাফেয়ী (মৃতঃ ২০৪ হিঃ) তার গ্রন্থের নাম "মুসনাদ"। তবে এ সময়ে সংকলিত গ্রন্থগুলোতে রাসূলের বাণীর সাথে সাহাবায়ে কেরামের বাণীগুলোও মিশ্রিত ছিল।
📄 রিওয়ায়েত (رواية)
হাদীস বা আসার বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত' বলে। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, হাদীস শরীফ বা আসার বর্ণনা করাকে রিওয়ায়েত বলে এবং যিনি বর্ণনা করেন ওনাকে রাবী (رِوَايَتْ) বলে। কোন কোন সময় হাদীস শরীফ বা আসারকেও
রিওয়ায়েত বলে। যেমন, বলা হয় এ সম্পর্কে একটি রিওয়ায়েত আছে।
রিওয়ায়েত (روایت) শব্দের অর্থ হলো কোন ঘটনার বিবরন, বর্ননা, কাহিনী ইত্যাদি। বস্তুতঃ হাদীসের বর্ননাকারীগণও রাসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কিরাম কিংবা তাবেঈনদের কথা, কাজ অথবা অনুমোদনের খন্ড খন্ড বর্ননা পেশ করে থাকেন। এ হিসাবেই তাদের বর্ণিত বিষয়কে রিওয়ায়েত (روَايَتْ) বলা হয়ে থাকে।
রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ) বিল মা'নাঃ অর্থের গুরুত্ব সহকারে হাদীস বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত বিল মা'না' বলে।
রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ) বিল লবজিহিঃ হুবহু অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ) - এর সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীনদের মুখনিঃসৃত শব্দ সহ হাদীস বর্ণনা করাকে 'রিওয়ায়েত বিল লবজিহি' বলে। এ ধরনের হাদীসের গুরুত্ব অনেক বেশী।
মুনকার (مُنْكَرٌ) ও রিওয়ায়েত (رِوَايَتُ): যে দুর্বল বর্ণনাকারী রিওয়ায়েত বা হাদীস তদপেক্ষা সর্ব বর্ণনাকারীর রিওয়াতের পরিপন্থী হয় তাকে 'মুনকার রিওয়ায়েত' বলে।