📄 হাদীস (حديث) সংরক্ষণ ও বর্ণনা করার ফযীলত
হাদীস সংরক্ষণ করা বর্ণনা করা অত্যন্ত ফযীলতময়। কারণ এর মাধ্যমে প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র কালামের হেফাযত করা হয়। আর এরকম ব্যক্তির ব্যাপারে প্রিয়নবী বলেছেনঃ
نضر الله امر أسمع مقالتي فوعاها واداها كما سمع فرب حامل فقه غير فقيه ورب حامل فقه الى من هوافقه منه
অর্থঃ আল্লাহ পাক সেই ব্যক্তিকে সতেজ, ও সমুজ্জ্বল রাখুন, যে আমার কথাগুলো শুনেছে, সংরক্ষণ করেছে এবং অপরজনের নিকট তা পৌঁছে দিয়েছে। (আবু দাউদ)। এই হাদীস আমাদের নিকট তুলে ধরে হাদীস বর্ণনা করার গৌরব ও সম্মান। এজন্যে এই হাদীসের ব্যাখ্যায় কোন কোন মুহাদ্দিস বলেছেন, যে ব্যক্তি মূলত অর্থেই হাদীস সন্ধানী হয় তার চেহারা সজীব বা নূরানী হয়ে ফুটে উঠবে। শুধু ফযীলত নয়, আল্লাহর রাসূল দোআ করেছেন হাদীস
বর্ণনাকারীদের জন্য এবং তাদেরকে নিজের উত্তরসূরী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বলেছেনঃ
اللهم ارهم خلفائي قالو يارسو الله ومن خلفائك قال الذين يرؤون - الاحاديث ويعلمونها الناس
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমার উত্তরসূরীদের প্রতি রহম করুন। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উত্তরসূরী কারা? তিনি বলেন, তারাই যারা আমার হাদীস বর্ণনা করে ও মানুষের নিকট শিক্ষা দেয়। হাদীস বর্ণনাকারীরা আরো একটি উপায়ে লাভবান হতে পারে। আল্লাহর রাসূল বলেছেন, "নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন তারাই আমার নিকটবর্তী হবে যারা অধিক হারে আমার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করে।” (তিরমিযী)।
এই হাদীসটি ইবনে হিব্বান ও তার হাদীসের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন এই হাদীস এর ফায়েজ ও বরকত লাভ করবে নিশ্চিতভাবে মুহাদ্দিসানে কেরাম ও হাদীসের শায়খগণ। কারণ তারাই তো অধিক হারে হাদীস পড়ে, লিখে। যতবার হাদীস লিখবে বা পড়বে ততবার তিনি প্রিয়নবীর প্রতি দরূদ সালাম পড়বেন ও লিখবেন। এর ফলে রোজ কিয়ামতে সহজেই তারা প্রিয়নবীর নিকটবর্তী হতে পারবেন।
📄 হাদীস বিজ্ঞ হওয়ার ইসলামিক মানদন্ড
হাদীস শাস্ত্রকে নিভের্জাল, নিখাদ ও বিশুদ্ধ রাখার জন্যে ইসলামী চিন্তাবিদ ও হাদীস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ লোকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও গবেষনার ফলে হাদীস যাচাই-বাছাই, পর্যালোচনা ও সমালোচনা যে বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তিগ্রাহ্য পদ্ধতির উৎপত্তি হয় তাকে علم الجرح والتعديل বা সমালোচনা ও সামঞ্জস্য বিষয়ক জ্ঞান বলে। এই বিশেষ পদ্ধতির পরিচয় সম্বন্ধে বলা হয়েছেঃ এটি একটি বিজ্ঞান যাতে বিশেষ শব্দাবলীতে রাবীদের সমালোচনা ও সামঞ্জস্য রক্ষা করা হয়। আমরা দেখতে পাই শব্দগত দিক থেকে হাদীসের দুটি অংশ। প্রথম অংশটি সনদ। আর দ্বিতীয় অংশটি মতন। সনদের (হাদীস বর্ননাকারীদের পরস্পরা নামসমূহ) যাচাই-বাছাই ও সমালোচনা করা হয় সামঞ্জস্য বিষয়ক জ্ঞান পদ্ধতির মাধ্যমে। কেননা হাদীস বর্ননাকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনচরিত সম্বন্ধে সূক্ষভাবে জ্ঞাত হওয়া জরুরী। আর এই জ্ঞান হওয়াকে হাদীসের নীতিশাস্ত্রনুযায়ী লোকদের (রাবীদের) নাম পরিচয় বিষয়ক জ্ঞান বলা হয়।
জ্ঞানের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ হাদীসে উল্লেখিত সাহাবা, তাবেয়ী ও রাবীদের সম্পর্কীত ইলম। এই ইলম হলো হাদীসের অর্ধেক জ্ঞান। علم الجرح والتعديل পদ্ধতির মাধ্যমে সনদে উল্লেখিত রাবীদের জীবন চরিত্রের যে দিকগুলো সূক্ষাতিসূক্ষভাবে দেখা হয় তা এইঃ
(১) রাবী কি ধরনের লোক?
(২) রাবীর চারিত্রিক দোষ-গুন কেমন?
(৩) রাবীর ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান কতটুকু আয়ত্ত?
(৪) রাবীর উপলব্ধি ও বোধশক্তি কতটুকু প্রখর ও উন্নত?
(৫) স্মরন শক্তি ও প্রতিভা কেমন?
(৬) রাবীর আকিদা বিশ্বাস, চিন্তা-গবেষনা ও মতবাদ নির্ভুল কি না?
(৭) রাবীর সমস্ত কর্মকান্ড ইসলামী বিধান মুতাবিক কি না?
(৮) সততা ও ন্যায় নিষ্ঠা রাবীর মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য কি না?
(৯) সততা ও ন্যায় নিষ্ঠা রাবীর মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য কি না?
(১০) কখনো মিথ্যা কলার অভ্যাস ছিল না তো?
(১১) রাবী সৎ চরিত্রবান, চরিত্রহীনতা তাকে কখনো স্পর্শ করে নি?
(১২) রাবী কোথায় হাদীস শ্রবণ, গ্রহণ ও শিক্ষা করেছেন?
(১৩) রাবী কার কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন?
(১৪) রাবী সত্যিই কি ওস্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে হাদীস শিখেছিল?
(১৫) রাবীর তখন বয়স কত ছিল, কোথায়, কিভাবে, কখন তিনি হাদীস শিখলেন?
হাদীস যাচাই-বাছাই ও সমালোচনা করার এই পদ্ধতি সম্পর্কে অমুসলিম সমালোচকগণের কেউ এর কটাক্ষ করেছেন। আবার অনেকে এর বাস্তবতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। যারা কটাক্ষ করেছেন তারা হাদীস সংকলনের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সঠিকভাবে জ্ঞাত না হতেই এমন সব কথাবার্তা বলেছেন যার ফলে অনভিজ্ঞ পাঠকের মনে হাদীসের নির্ভরতা সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। প্রখ্যাত পাশ্চাত্যবাদী ডঃ স্প্রিঙ্গার হাদীস যাচাই পদ্ধতির বাস্তবতা স্বীকার করে বলেছেনঃ মুসলমানদের আসমাউর রিজালের মতো বিরাট ও সুশৃঙ্খল চরিত্র বিভাজন পৃথিবীর অপর কোনো জাতির সৃষ্টি করতে অতীতে পারে নি আর বর্তমানেও নেই। এই তথ্যভিত্তিক শাস্ত্রের কারনেই পাঁচ লক্ষ হাদীস বর্ননাকারী (রাবী) জীবন চরিত অত্যন্ত নিখুঁত ও সবিস্তারে আজও লোকেরা জানতে পারে। ইমাম শাফেঈ এ শাস্ত্রের গুরুত্বারোপ করে বলেছেনঃ সনদ সম্পর্কীত জ্ঞান ব্যতীত হাদীস সন্ধানকারী ব্যক্তি অন্ধকারে কাষ্ঠ আহরনকারীর মতো। সে কাষ্ঠের বোঝা বহন করে অথচ বোঝার
মধ্যে এমন একটি বিষধর সাপ আছে যে তাকে তার অজান্তে দংশন করে থাকে⁹³。
উপরে উল্লেখিত আলোচনায় রিজাল পদ্ধতির মাধ্যমে হাদীসের প্রথম অংশ সনদ বা রেওয়াতের যাচাই-বাছাই ও সমালোচনা পরিস্ফুট হয়েছে। হাদীসের দ্বিতীয় এবং মূল অংশ মতন এর বিশুদ্ধতা ও যাচাই বাছাই করা অপরিহার্য। অর্থাৎ ইসলামী চিন্তাবিদ এবং হাদীস শাস্ত্রের গৌরব মুহাদ্দিসও উসুলবিদগণ মতনকেও যুক্তি তর্ক ও বাস্তবতার আলোকে যাচাই বাছাই করা হয়। আর এরূপ যাচাই বাছাই করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ রয়েছে। যেমনঃ ইফকের ঘটনার সাথে কিছু সংখ্যক মুসলমানও সন্দেহ প্রবন হয়ে পড়লে তাদের শানে এই আয়াত নাযিল হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ
وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ
"তোমরা যখন সে কথা শুনতে পেলে তখন তোমরা (শুনেই) কেন বললেন যে, এ ধরনের কথা বলা আমাদের কিছুতেই উচিত নয়। আল্লাহ মহান! এটা সুস্পষ্ট মিথ্যা ও বিরাট দোষারোপ ছাড়া আর কিছুই নয়"⁹⁴। অর্থাৎ সংবাদ শনেই তাৎক্ষনিকভাবে গ্রহণ বা বর্জন না করে শ্রুত সংবাদ সম্পর্কে বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগ করার সুস্পষ্ট ইংগিত রয়েছে এই
আয়াতে। মূল হাদীসটি সাধারন জ্ঞান বাস্তবতা, কুরআন ও সহীহ হাদীসের পরিপন্থী কি না, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিবেচনার মানদন্ডে উত্তীর্ণ কিনা তা দেখা দরকার। মিরাজের ঘটনা সাধারনের বোধগম্য না হলেও তীক্ষ্ণ জ্ঞানের পরিপন্থী নয়। অধিকন্তু ঘটনাটির বিবরণ কুরআনে উল্লেখ আছে এবং মিরাজের হাদীস ২৫ জন সাহাবী ও শত তাবেয়ী হতে বর্ণিত। সুতরাং হাদীসটি সত্য ও বিশুদ্ধ হাদীসরূপে সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণীয়। ইবনুল জাওযী ও মোল্লা আল কারী হানাফী (রহঃ) দেরায়াতগত (বুদ্ধিভিত্তিক বিশ্লেষন) প্রক্রিয়ার যে বিষয়গুলির ওপর হাদীসের যাচাই বাছাই ও নিরীক্ষা করেছেন তা নিম্নরূপঃ
(১) যে হাদীস ভাষাগত অলংকারের দূষিত তা হাদীস নয়। কেননা রাসূল (সাঃ) ছিলেন আরবী সাহিত্যে সুপন্ডিত ও সুসাহিত্যিক।
(২) সাধারন জ্ঞান ও বুদ্ধি বিবর্জীত হাদীস।
(৩) যে হাদীস শরীয়তের কোনো সুস্পষ্ট নীতি ও উসুলের বিপরীত।
(৪) যে হাদীস বাস্তব অভিজ্ঞতার বিপরীত।
(৫) যে হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসের বিপরীত।
(৬) যে হাদীস ইজমায়ে হাদীসের বিপরীত।
(৭) যে হাদীস লঘু অপরাধে গুরুদন্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
(৮) যে হাদীসের সামান্য আমল বিরাট পুরস্কারের ঘোষনা রয়েছে।
(৯) যে হদীসের বক্তব্য মূলতঃ অর্থহীন। যেমন যাবেহ ছাড়া কদু না খাওয়া।
(১০) যে হাদীস রাবী সাক্ষাৎ লাভ করে নি এমন লোক থেকে বর্ননা করেন। অন্যদিকে এ হাদীস অপর কোনো রাবীও তার নিকট থেকে বর্ননা করেনি।
(১১) হাদীসের বিষয়বস্তু এমন যে সম্পর্কে অবহিত হওয়া সকল মুসলমানদের কর্তব্য অথচ বর্ণিত হাদীসটি রাবী ছাড়া আর কেউ অবগত নহে। যেমন রাসূল (সাঃ) কর্তৃক লক্ষাধিক সাহাবীর সামনে হযরত আলী (রাঃ) এর গাদীরেখুমে খলীফা হওয়ার ঘোষনা করা।
(১২) যে হাদীস এমন কথা রয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে অনেক লোক জানতে পারতো অথচ ঐ রাবী ছাড়া আর কেউ তা অবগত নয়।
(১৩) যে হাদীসের বর্ননা অতিরঞ্জিত।
(১৪) যে হাদীসের কথা নবীগণের কথার অনুরূপ নয়।
(১৫) যে হাদীসের অসাম্ভবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমান বিদ্যমান। যেমন উজ বিন ওনক সম্পর্কীয় হাদীস। (৩ হাজার হাত, ৭০ হাত লম্বা লোক)।
(১৬) কুরআনের বিশেষ বিশেষ সূরার অতিরঞ্জিত ফযিলতের আমল সম্পর্কীয় হাদীস ইত্যাদি।
উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় যে, হাদীস সহীহ ও গায়রে সহীহ হওয়ার উল্লেখিত দুটি পন্থা রেওয়ায়েতগত (আসমাউর রিজাল) ও দেরায়েতগত অত্যন্ত বিজ্ঞান সম্মত ও বুদ্ধিবৃত্তিক। এ দু'পন্থায় হাদীস উত্তীর্ণ হলে হাদীসটি সহীহ বলে গণ্য হবে।
টিকাঃ
الحطة في ذكر الصحاح الستة 1 2011 Ra3
⁹³ হাদীস সংকলনের ইতিহাস মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং ৬৩৪ দ্রষ্টব্য।
⁹⁴ সূরা নূর, আয়াত নং - ১৬