📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে হাদীসের দলিল
অসংখ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, হাদীস ইসলামী শরীয়তের অকাট্য দলিল ও তার উপর আমল করা ওয়াজিব। নিম্নে আমরা তার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছিঃ
কতক হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচারিত কুরআন ও গায়রে কুরআন সব ওহীর অন্তর্ভুক্ত। তিনি যা বলেছেন, বা যার স্বীকৃতি দিয়েছেন তা আল্লাহর নির্দেশে দিয়েছেন। তাই হাদীসের উপর আমল করার অর্থ কুরআনের উপর আমল করা, রাসূলের আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য করা; আর রাসূলের নাফরমানি করার অর্থ আল্লাহর নাফরমানি করা। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
يوشك الرجل متكئا على أريكته ، يحدث بحديث من حديثي ، فيقول : بيننا وبينكم كتاب الله عز وجل ، فما وجدنا فيه من حلال استحللناه ، وما
وجـدنـا فـيـه مـن حـرام حـرمـنـاه ، ألا وإن مـا حـرم رسـول الله - صـلـى الله عـلـيـه وسـلـم - مـثـل مـا حـرم الله» رواه ابـن مـاجـة
"সেদিনে বেশী দূরে নয়, কোন ব্যক্তি তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, আমার কোন হাদীস বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মাঝে কিতাবই যথেষ্ট, তাতে যা হালাল পাব, তা হালাল মানব এবং তাতে যা হারাম পাব, তা হারাম মানব। জেনে রেখ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহর হারাম করার ন্যায়"⁵⁶。
আবু দাউদের বর্ণনায় রয়েছেঃ
ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه ، ألا يوشك رجل شبعان على أريكته يقول : عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فأحلوه وما وجدتم فيه من حرام فحرموه».
"জেনে রেখ, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ (হাদীস) দেয়া হয়েছে। জেনে রেখ, সেদিন দূরে নয়, কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তি তার চেয়ারে বসে বলবেঃ তোমরা এ কুরআনকে আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল জান এবং তাতে যা
হারাম পাবে তা হারাম জান"⁵⁷। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক বাণীতে বলেনঃ
«إنما مثلي ومثل ما بعثني الله به كمثل رجل أتى قوماً فقال : يا قوم إني رأيت الجيش بعيني ، وإني أنا النذير العريان فالنجاء ، فأطاعه طائفة من قومه فأدلجوا فانطلقوا على مهلهم فنجوا ، وكذبت طائفة منهم فأصبحوا مكانهم ، فصبحهم الجيش فأهلكهم واجتاحهم ، فذلك مثل من أطاعني فاتبع ما جئت به ومثل من عصاني وكذب بما جئت به من الحق». رواه البخاري
"আমার এবং আমাকে যা দিয়ে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে তার কওমের নিকট এসে বলল: হে আমার কওম, আমার দু'চোখে আমি শত্রু বাহিনী দেখেছি, নিশ্চয় আমি স্পষ্ট সতর্ককারী, অতএব নিরাপত্তা অবলম্বন কর।
অতঃপর তার কওমের এক দল তার অনুসরণ করল, ফলে তারা বের হয়ে পড়ল ও তাদের অজান্তে জনপদ প্রস্থান করল, তারা নাজাত পেল। আর তার কওমের অপর দল তাকে মিথ্যারোপ করল, ফলে তারা নিজেদের জায়গায় ভোর করল, সকালে শত্রু বাহিনী তাদের উপর হামলা করে তাদের ধ্বংস ও সমূলে নিঃশেষ করে দিল। এ হল ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার আনুগত্য করল ও আমি
যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করল; এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার নাফরমানি করল ও আমি যে সত্য নিয়ে এসেছি তা মিথ্যারোপ করল”⁵⁸। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত মারফু হাদীসে এসেছে:
« من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله .... ».
"যে আমার অনুসরণ করল সে আল্লাহর অনুসরণ করল। আর যে আমার নাফরমানি করল সে আল্লাহর নাফরমানি করল ..."⁵⁹ অপর হাদীসে এসেছেঃ
« كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى ، قالوا : يا رسول الله ومن يأبى ؟ قال : من أطاعني دخل الجنة ، ومن عصاني فقد أبي».
"আমার প্রত্যেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করেছে। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যে আমার নাফরমানি করল সে অস্বীকার করল”⁶⁰। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতক হাদীসে হাদীস আঁকড়ে ধরা,
"আমি তোমাদের মধ্যে দু'টি বস্তুকে রেখে দিয়েছি, তার পরবর্তীতে তোমরা গোমরাহ হবে না, আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নত। এ দু'টি বস্তু পৃথক হবে না যতক্ষণ না হাউজে কাউসারে আমার নিকট উপস্থিত হয়”⁶¹। তিনি আরো বলেছেনঃ
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء المهديين الراشدين، تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ». رواه أبو داود
"অতএব তোমরা আমার সুন্নত ও হিদায়েত প্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধর। খুব শক্তভাবে তা আঁকড়ে ধর ও মাড়ির দাঁত দ্বারা কামড়ে ধর”⁶²। তিনি অন্যত্র বলেনঃ
"সালাত আদায় কর, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ"⁶³। অন্যত্র বলেনঃ
«خذوا عني مناسككم». رواه النسائي
"আমার থেকে তোমরা তোমাদের হজের বিধানগুলো গ্রহণ কর"⁶⁴। অন্যত্র বলেনঃ
«نضر الله امرأ سمع مقالتي فوعاها وحفظها وبلغها ، فرب حامل فقه إلى من هو أفقه ...». رواه الترمذي وغيره
"আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে তরতাজা রাখুন, যে আমার কথা শুনল, অতঃপর তা আত্মস্থ ও হিফাজত করল এবং তা পৌঁছে দিল। কখনো ফিকাহ (হাদীস) বহনকারী ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়..."⁶⁵। অন্যত্র তিনি বলেনঃ
«إن كذبا علي ليس ككذب على أحد، من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار».
“আমার উপর মিথ্যা রচনা করা অন্য কারো উপর মিথ্যা রচনা করার মত নয়, যে আমার উপর স্বেচ্ছায় মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নام বানিয়ে নেয়⁶⁶。
তিনি অন্যত্র বলেনঃ
«لا ألفين أحدكم متكئاً على أريكته يأتيه الأمر من أمري مما أمرت به أو نهيت عنه فيقول: لا أدري ما وجدنا في كتاب الله اتبعناه ». رواه الترمذي. وقال حسن صحيح.
"তোমাদের কেউ অবশ্যই চেয়ারে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে দেখবে, যার নিকট আমার কোন বিষয় আসবে, যার আমি নির্দেশ দিয়েছি অথবা যা থেকে আমি নিষেধ করেছি; অতঃপর সে বলবে: আমরা জানি না, আল্লাহর কিতাবে যা পাব, তারই অনুসরণ করব”⁶⁷。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে যে ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন, তা এখন বাস্তব দেখা যাচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ হাদীসকে অস্বীকার করছে, কেউ তার অংশ বিশেষকে অস্বীকার করছে।
টিকাঃ
⁵⁶ ইবনে মাজাহ, ১২।
⁵⁷ আবু দাউদ, ৪৬০৪।
⁵⁸ বুখারী, ৭২৮৩।
⁵⁹ বুখারী: (২৭৫২)
⁶⁰ বুখারী: (৬৭৬৪)
⁶¹ বায়হাকি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
⁶² আবু দাউদ ৪৬০৭。
⁶³ বুখারী, ৬৩১。
⁶⁴ নাসাঈ, ৩০৬২。
⁶⁵ তিরমিযী, ২৬৫৬。
⁶⁶ বুখারী, ১০৭。
⁶⁷ তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: হাসান ও সহিহ।
📄 হাদীস অস্বীকার করার কতক অজুহাত
প্রথম অজুহাত: একশ্রেণী লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা হাদীসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তাদের নিকট কুরআন ব্যতীত কোন কিছুর উপর আমল করা যাবে না। সন্দেহ নেই হাদীস অস্বীকারকারী এ শ্রেণীর লোক কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। কারণ এর মাধ্যমে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতকে অস্বীকার করেছে। তারা বিশ্বাস করেনি তিনি সন্দেহাতীত ও সত্যিকার অর্থে আল্লাহর রাসূল, যা কুরআন ও তার আয়াতকে অস্বীকার করার শামিল। এ মত পোষণকারী কয়েকটি দলঃ
এক. কট্টর রাফেযী তথা শিয়া সম্প্রদায়: তাদের নিকট সাহাবিরা সবাই কাফের, ফলে তাদের বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।
দুই. আহলে কুরআন অথবা কুরআনী সম্প্রদায়: তাদের সৃষ্টি ভারতে। এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে আহমদ খান ও আব্দুল্লাহ বকর আলাভি।
তিন. পাশ্চাত্য চিন্তা ধারায় প্রভাবিত কতক বুদ্ধিজীবী হাদীস অস্বীকার করেন, অথবা তাতে সন্দেহ পোষণ করেন।
দ্বিতীয় অজুহাত: একশ্রেণীর লোক সব হাদীসকে নয়, বরং শুধু খবরে ওয়াহেদ অস্বীকার করেন। খবরে ওয়াহেদ দ্বারা উদ্দেশ্য এক সনদে বা এক সূত্রে বর্ণিত হাদীস। কয়েকটি বিদআতি দল এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মুতাযিলা সম্প্রদায় এবং আবুল হাসান আশআরি ও আবুল মানসুর মাতুরিদির অনুসারীগণ। তারা আকিদার বিষয়ে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করেন না, যদিও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়। তাদের দাবি একাধিক সনদ ব্যতীত আমরা হাদীস গ্রহণ করব না। এ জাতীয় লোকের সংশয় নিরসন ও অজুহাতের কতক উত্তর -
এক. আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ ٦ ) [الحجرات: ٦]
"হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও”⁶⁸。
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সংবাদের সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং একজন ফাসেকের সংবাদ প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন। এর অর্থ আমরা একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণ করব।
দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুসলিমরা মসজিদে কুবায় ফজর সালাত আদায় করতে ছিলেন, একজন সংবাদ দাতা এসে বলল, কেবলা কাবার দিকে ঘুরে গেছে, ইতোপূর্বে যা বায়তুল মাকদিসের দিকে ছিল। তারা তার সংবাদ শুনে সালাতেই কেবলার দিকে ঘুরে যান। যদি একজনের সংবাদ তাদের নিকট দলিল ও আমলযোগ্য না হত, তাহলে অবশ্যই তারা দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ব্যক্তিকে স্বাক্ষীরূপে চাইত। কিন্তু তারা তৎক্ষণাৎ তার সংবাদ গ্রহণ করে প্রমাণ করেন, খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করা জরুরী।
তিন. আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
( يَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ٦٧ ) [المائدة: ٦٧]
“হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও”⁶⁹। এ আয়াতে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার উপর নাযিলকৃত রিসালাত পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তিনি মাত্র একজন ব্যক্তি। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের প্রেরণ করতেন। এ ক্ষেত্রে একস্থানে একজন দায়ী প্রেরণ করা সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়েছিল, লোকেরা প্রেরিত দায়ীর সংবাদ গ্রহণ করত, তাকে আল্লাহ ও
তাদের মাঝে আমানতদার জ্ঞান করত। দেখুন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তুমি তাদেরকে ইসলাম ও তাওহীদের দিকে আহ্বান কর। তিনি ছিলেন একা।
চার. যখন মদ হারাম করে আয়াত নাযিল হল, তখন তার প্রচারকারী ছিল মাত্র একজন। মদিনার লোকেরা তার সংবাদ শ্রবণ করে তাদের মদের পাত্রগুলো ভেঙে ফেলে। তারা বলেনি আমরা একজনের সংবাদ গ্রহণ করব না।
তৃতীয় অজুহাত: এক শ্রেণীর লোক বিবেক সমর্থন করে না তাই হাদীস ত্যাগ করেন। হাদীস ত্যাগ করার এ ফেতনা প্রথম যুগের বিদআতিদের থেকে সূচনা হয়, যেমন মুতাযেলা ও তাদের অনুসারী আশায়েরা প্রমুখ কয়েকটি সম্প্রদায়। তারা বিবেক সমর্থন না করার অজুহাতে অনেক হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে যেসব হাদীসে গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ রয়েছে, যেমন আল্লাহর সিফাত ও ঐসব বিষয় যা আমরা চোখে দেখি না। আশ্চর্য যা গায়েবি বিষয়, বা যা বিবেকের ঊর্ধ্বে তারা বিবেক দ্বারা কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে! আমাদের বুঝে আসে না। ঐ ফেতনা পর্যায়ক্রমে আমাদের যুগ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যখন বিবেককে খুব প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, দৃশ্য ব্যতীত অদৃশ্যকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের
বিষয় মুসলিম পরিচয়দানকারী এসব লোক কুরআন ও হাদীসের বাইরে বিবেককে প্রাধান্য দেয়ার নতুন এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে।
টিকাঃ
⁶⁸ সূরা হুজুরাত: (৬)
⁶⁹ সূরা আল-মায়েদা: (৬৭)
📄 হাদীস (حديث)
হাদীস )حدیث( আরবী শব্দ। এর বহুবচন )أَحَادِيث( হাদীস )حديث( শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে নতুন, নবীন, আধুনিক, নব্য, সাম্প্রতিক। আরবী অভিধান ও কোরআনের ব্যবহার অনুযায়ী 'হাদীস' শব্দের অর্থ- কথা, বাণী [speech, word (s)], বার্তা, সংবাদ, বিষয়, খবর )خَبَرُ( ও ব্যাপার ইত্যাদি। [তথ্যসূত্রঃ আরবী - বাংলা অভিধান, ডঃ ফজলুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৮০; আল মাওরিদ, (আরবী-ইংরেজী অভিধান) মুনির বাআলবাকী]।
حَدِيث )হাদীস) শব্দটি একবচন, এর বহুবচন حُدَثن )হুদিসানুন) বা أَحَادِيثُ )আহাদীসু) বা حُدَثَاءُ )হুদাসাউ)। যার লুগাতী বা শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কথা, বাণী, সংবাদ, ব্যাপার, বিষয়, পুরাতন সংবাদ ইত্যাদি। আর 'ইসতিলাহী' বা পারিভাষিক অর্থে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন, করেছেন বা অন্যের কোন কথা বা কাজের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন তাকে সুন্নাহ্ বা
হাদীস বলে। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সম্মতি, চারিত্রিক গুণবলীকে হাদীস বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন -
عَظِيمٍ خُلُقٍ لَعَلَى وَإِنَّكَ
আর (হে নবী) অবশ্যই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সূরা আল-কালাম, ৬৮/৪)। 'হাদীস' (حَدِيث) শুধুমাত্র একটি আভিধানিক শব্দ নয়। মূলতঃ 'হাদীস' (حَدِيث) শব্দটি ইসলামের এক বিশেষ পরিভাষা। সে অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) এর কথা, কাজের বিবরণ কিংবা কথা, কাজের সমর্থন এবং অনুমোদন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত, ইসলামী পরিভাষায় তাই-ই 'হাদীস' নামে অভিহিত। অর্থাৎ-
اقوال النبى صلى الله عليه وسلم وأفعاله وأحواله فتح الملهم - 6/1
রাসূল (সাঃ) এর কথা, কর্ম এবং অবস্থাকে বলা হয় হাদীস। [ফাতহুল মুলহিম-১/৬]।
حديث (হাদীস) এর আভিধানিক অর্থ নতুন। আল্লাহর কালাম 'কাদিম' বা অনাদির বিপরীত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীকে হাদীস বলা হয়, কারণ তার বাণী অপেক্ষাকৃত নতুন
সংবাদকে হাদীস বলা হয়, কারণ সংবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন। মুখের কথাও হাদীস, কারণ এগুলো নতুন নতুন অস্তিত্ব লাভ করে। এ হিসেবে কুরআনুল কারিমকে হাদীস বলা হয়। ইরশাদ হচ্ছেঃ
فَبِأَيِّ حَدِيثُ بَعْدَ اللَّهِ وَعَايَتِهِ يُؤْمِنُونَ ٦
"অতএব তারা আল্লাহ ও তার আয়াতের পর আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে”? [সূরা আল-জাসিয়াহ: (৬)]। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেছেনঃ
الَّذِينَ جُلُودُ مِنْهُ تَقْشَعِرُّ مَثَانِيَ مُتَشَابِهَا كِتَابًا الْحَدِيثِ أَحْسَنَ نَزَّلَ اللَّهُ اللَّهِ هُدَى ذَلِكَ اللَّهِ ذِكْرِ إِلَى وَقُلُوبُهُمْ جُلُودُهُمْ تَلِينُ ثُمَّ رَبَّهُمْ يَخْشَوْنَ هَادٍ مِنْ لَهُ فَمَا اللَّهُ يُضْلِلِ وَمَنْ يَشَاءُ مَنْ بِهِ يَهْدِي
আল্লাহ অবর্তীণ করেছেন সর্বোত্তম (হাদীস) বাণী সম্বলিত সামঞ্জস্য পূর্ণ একটি কিতাব যা পুনরাবৃত্তি হয়, যারা তাদের রবকে ভয় করে তাদের গা এতে শিউরে ওঠে তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে প্রতি বিনম্র হয়ে যায়; এটিই আল্লাহর হেদায়াত, তিনি যাকে চান তাকে এর দ্বারা হেদায়াত দান করেন আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন পথ প্রদর্শক নেই⁷¹। বস্তুতঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগই হাদীস বা সুন্নাত। কুরআনের
পাশাপাশি অতিরিক্ত যে ওহীর জ্ঞান বা প্রজ্ঞা আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রদান করেছিলেন, তার ভিত্তিতে তিনি কুরআনের বিভিন্ন বক্তব্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং বাস্তব জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেছেন। কুরআন ও হাদীসই আমাদের সকল জ্ঞানের ও কর্মের মূল উৎস।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেনঃ
إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَداً، كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نبيه
"আমি তোমাদের মধ্যে যা রেখে যাচ্ছি তা যদি তোমরা আঁকড়ে ধরে থাক তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, তা হলোঃ আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর হাদীস বা সুন্নাত"⁷²।
হাদীস (حديث) শব্দটিও আরবী। যার আভিধানিক অর্থ নিম্নরুপঃ
১. الكلام তথা বাণী। যেমন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا অর্থাৎ আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্য কথা (বাণী) আর কার হবে?
২. তথা সংবাদ। যেমন- هل اتك حديث الجنود فوعون وثمود অর্থাৎ আপনার কাছে সৈন্যবাহিনীর সংবাদ পৌছেছে কি? ফেরআউন ও ছামুদের?
৩. তথা নতুন। যেমন বলা হয় هذا امر حديث অর্থাৎ এটা নতুন বিষয়।
৪. তথা কাহিনী। যেমন - هل اتك حديث موسى অর্থাৎ হযরত মুসা আ. এর কাহিনী কি আপনার কাছে পৌছেনি?
৫. তথা স্বপ্ন। যেমন - و علمتنى من تاويل الاحاديث অর্থাৎ আপনি আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় হাদীস শব্দটি দ্বারা যে সকল বিষয়গুলো পাওয়া যায় তা নিম্নরূপঃ-
- কথা - বাণী - বক্তব্য - খোশ-গল্প - উপন্যাস - উপকথা - প্রচার করা
- নতুন - আধুনিক
এছাড়াও রাসূল (সা.) হাদীস শব্দটি দ্বারা যা বুঝিয়েছেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সা.) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলেন, 'সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি কে, যে কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) এর শাফায়াত লাভে ধন্য হবে?' [উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন-
لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَلا يَسْأَلُنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لَمَّا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ
অর্থঃ আমার মনে হয় এ বিষয় (হাদীস) সম্পর্কে তোমার পূর্বে আর কেউই জিজ্ঞাসা করেনি। কারণ, আমার কথা (হাদীস) শুনার জন্যে তোমাকে সর্বাধিক আগ্রহান্বিত দেখা যায়। (সহীহুল বুখারী)।
ব্যাখ্যাঃ এখানে রাসূল (সাঃ), একটি তথ্য এবং তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া কথা, বক্তব্য বা বাণীকে হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ রাসূল (সাঃ) এখানে তাঁর মুখ নিঃসৃত কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যথাযথ ভাবসহ বর্ণনা করা রূপকে হাদীস বলেছেন। তাহলে দেখা যায় যে, কুরআন ও সুন্নাহ হাদীস শব্দটি দ্বারা যখন কারো কথা, বক্তব্য বা বাণী
বুঝিয়েছে তখন ঐ কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু রূপকে বুঝিয়েছে।
তাই কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) এর হাদীস বলতে বুঝায় রাসূল (সাঃ) এর কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু, নির্ভুল বা শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উল্লেখ করা রূপকে বুঝায়। আর যেহেতু কোন ব্যক্তি তার বক্তব্যকে কাজ বা সমর্থনের মাধ্যমেও প্রকাশ করতে পারেন তাই রাসূল (সাঃ) এর কাজ বা সমর্থনের হুবহু বা নির্ভুল রূপকেও হাদীস বলা যাবে।
হাদীস শাস্ত্রে যে অর্থে হাদীস শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বিষয়টি সকল মুসলমানের ভাল করে জানা ও বুঝা দরকার। পুস্তিকার আলোচ্য বিষয়ের জন্যেও তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হাদীস শাস্ত্রে হাদীস শব্দটি একটি পরিভাষা হিসেবে নেয়া হয়েছে। আর এর অর্থ ধরা হয়েছে - রাসূল (সাঃ) এর পরের ৪ (চার) স্তরের (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও তাবে তাবে-তাবেয়ী) ঈমানের দাবিদার ব্যক্তিদের, রাসূল (সাঃ) এর কথা, কাজ বা সমর্থনের নিজ বুঝের, স্বীয় শব্দ প্রয়োগ করে উপস্থাপন করা বক্তব্য। অথবা ঐ সকল ব্যক্তি কর্তৃক তার পূর্বের স্তরের ব্যক্তির কথা, কাজ বা সমর্থনের হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উপস্থাপন করা বক্তব্য। কিন্তু কারো কথা, কাজ বা সমর্থন হুবহু উপস্থাপন করা প্রায় অসম্ভব। তাই
হাদীস শাস্ত্রে হুবহু উপস্থাপিত হওয়া হাদীসের সংখ্যা ভীষণ কম বা হাতে গনা কয়েকটি।
হাদীস শাস্ত্রের হাদীস শব্দের সংজ্ঞার মারাত্মক দুর্বলতা হাদীস শাস্ত্রের হাদীস শব্দের মারাত্মক দুটি দুর্বলতা হল-
ক. ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি নিষ্ঠাবান মুসলিম, দুর্বল মুসলিম বা মুনাফিক হতে পারে এবং
খ. নিজ বুঝকে স্বীয় ভাষায় বর্ণনা করার সুযোগ থাকায়- মুনাফিক ব্যক্তির নিজ বানানো কথা রাসূল (সাঃ) এর কথা বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকা,
মু'মিন ব্যক্তির নিজ বুঝ ও উপস্থাপনে দুর্বলতা থাকার কারণে রাসূল (সা.) এর কথা, কাজ বা সমর্থনের ভুল উপস্থাপনের সম্ভাবনা থাকে। রাসূল (সা.) এর কথা হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উপস্থাপন করার পদ্ধতিতে এ দুর্বলতা থাকে না।
হাদীসের পারিভাষিক অর্থঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সম্মতি, চারিত্রিক গুণগান ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যকে হাদীস বলা হয়। (তথ্যসূত্রঃ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ
নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং ৭৫)⁷³। অতএব, ইসলামী পরিভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে হাদীস বলা হয়। এক কথায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুয়াতী জীবনের সকল কথা কাজ ও অনুমোদন এবং চারিত্রিক গুনাবলী, সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য সবই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় আ-সা-র ( آثار) এবং তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় 'ফতোয়া'⁷⁴。
কারণ কুরআন ও হাদীসের মূলকে ভিত্তি করিয়াই তাঁহাদের এই সব কাজ সম্পন্ন হইত। এই তিন প্রকারের হাদীসের আরও তিনটি স্বতন্ত্র পারিভাষিক নাম রয়েছে; যথাঃ রাসূলের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মারফু; সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মওকুফ এবং তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে মাকতু হাদীস বলা হয়। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, হাদীস বিশারদগণ হাদীস বুঝাতে যেয়ে কখনো কখনো আরও তিনটি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। তা হলোঃ- (১) আসর ( آثار) (২) খবর ( خبر) এবং (৩) সুন্নাহ্ ( السنة)। নিম্নে এ তিনটি পরিভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করা হলোঃ-
আসর ( آثار ): আরবী "আলিফ (ا), সা (ث) এবং রা (ر) বর্ণ এর সমন্বয়ে গঠিত।
আসর ( آثار ) শব্দের আভিধানিক অর্থ কোন জিনিসের এমন চিহ্ন যা তার অস্তিত্বের প্রমান দেয়। এর বহুবচন আ-সা-র। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা আল্লাহ্ এর রহমতের চিহ্নের প্রতি লক্ষ কর। (সূরা রূম, আয়াত নং - ৬০)। তাই কোন জিনিসের চিহ্নের বাকী অংশকেও আসার বলা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, তোমরা আমার কাছে এর আগের কোন বই অথবা কোন জ্ঞানের অবশিষ্টাংশ নিয়ে এস। আসর এর পরিভাষা চার রকম পাওয়া যায়।
এক - আসার হচ্ছে হাদীসের সমার্থবোধক। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথা, কাজ ও চুপ থাকার সমষ্টির নাম আসর। তবে সাধারনতঃ এ পরিভাষাটি সম্বন্ধবাচকে ব্যবহৃত হয়। তাই আ-সা-র এর সাথে রাসূল কিংবা সাহা-বাহ্ যোগ করে আ-সা-রু'র রসূল ও আ-সা-রু'স সাহা-বাহ্ বলা হয়। এজন্য মুহাদ্দিসকে আসারীও বলা হয়।
দুই - সাহাবী এবং তাবে'ঈদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে আসার বলা হয়।
তিন - খোরাসা-নেব ফকীহ্ গণ কেবলমাত্র সাহাবীদের হাদীসকেই আসার বলেন।
চার – আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আলী আলফারেসী বলেন, আসারটি ফকীহদের পরিভাষা। তারা এটিকে সালাফ বা পূর্ববর্তী আলেমদের বানী সম্পর্কে ব্যবহার করতেন।
আল্লামা নদভী এ প্রসঙ্গে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের হাদীসকে আসর নাম দেয়াটা হাদীস বিশারদদের পছন্দীয় অভিমত এবং এটা পূর্ববর্তী অধিকাংশ বিদ্বানদেরও পরিভাষা। এ কারনেই ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস ও সাহাবায়ে কিরামের আ-সা-র সম্বলিত গ্রন্থের নাম রেখেছেন তাহযীবুল আ-সা-র। যদিও এ গ্রন্থটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীসের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এতে উল্লেখিত সাহাবীদের হাদীসগুলো আনুসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত।
খবর এর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থঃ আরবী খা (خ), বা (ب), রা (ر) হরফের সমষ্টি খবর (خبر) শব্দের আভিধানিক অর্থ সংবাদ হিসেবে কোন জিনিস আনা। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেনঃ তোমরা যা করছ তার খবর আল্লাহ্ জানেন। যা বর্ননা করা হয় এবং যা কথায় প্রকাশ করা হয় তাকে খবর (خبر) বলা হয়। (এক খবর হাদীসেরই সমার্থবোধক)। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথাবার্তা, কাজকর্ম ও অনুমোদনকেই খবর (خبر) বলা হয়।
আবার কারো মতে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে যা এসেছে তা খবর (خبر)। এ জন্যই ইতিহাস ও বিভিন্ন ঘটনাবলী চর্চাকারীকে আখবারী বা ঐতিহাসিক বলা হয়।
কারো মতে, খবর হাদীস থেকে ব্যাপক অর্থবোধক। তাই প্রত্যেকটি হাদীসই খবর কিন্তু প্রত্যেকটি খবর হাদীস নয় (ঐ)। কারন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে যা এসেছে তা কেবল হাদীস। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং অন্যান্যদের তরফ থেকে যা আসে তা খবর (خَبَرُ)।
বস্তুতঃ খবরের উৎস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাড়া কোন মুসলিম বা অমুসলিমও হতে পারে। কিন্তু হাদীসের উৎস কোন অমুসলিম হতেই পারে না। ইমাম ইবনে জরীর, হাফিয ইবনে কাসীর, ইমাম বুখারী ও হাফিয যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস ও আখবারী দুটোই। কিন্তু জুর্জী যাইদান ও গোল্ড যেহার প্রমুখ ইসলামবিদ খৃষ্টান ও ইহুদী বিদ্বানগণ কেবলমাত্র ঐতিহাসিক। তাঁরা মুহাদ্দিস মোটেই নন। সুতরাং, সাহাবায়ে কিরামের আমলকেও সুন্নাহ্ বলা হয়। কারন তাঁরা কেউই সুন্নাহ্ ছাড়া মনগড়া বিষয়ের উপর আমল করতেন না ⁷⁵。
টিকাঃ
⁷⁰ আরবী - বাংলা অভিধান, ডঃ ফজলুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৮০; আল মাওরিদ, (আরবী-ইংরেজী অভিধান) মুনির বাআলবাকী
* সূরা আয-যুমার, ৩৯/২৩
⁷² হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/১৭১, নং ৩১৮/৩১। হাকিম ও যাহাবী হাদীসটিকে 'সহীহ' বলেছেন। আরো দেখুন: আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/৯৩
⁷³ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং - ৭৫
⁷⁴ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা - ২৩
⁷⁵ রাহে আমাল – আল্লামা জলীল আহসান নদভী (রহঃ), অনুবাদঃ প্রফেসর ডঃ এ, বি, এম, সিদ্দিকুর রহমান, ভূঁইয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং- ৩৪ - ৩৫ দ্রষ্টব্য
📄 হাদীস (حديث) ও সুন্নাহ (السنة)
হাদীসে 'হাদীস' (حديث) শব্দটির ব্যবহার যেমন রয়েছে তেমনি সুন্নাহ শব্দটির ব্যবহারও রয়েছে। হাদীস শব্দের ব্যবহারের উদাহরণ হলঃ
(الْكَذَّابِيْنِ أَحَدُ فَهُوَ كَذِبٌ أَنَّهُ يُرَى حَدِيْثٍ بِـ عَنِّي حَدَّثَ مَنْ)
অর্থঃ "যে ব্যক্তি কোন একটা বাণীকে আমার বাণী বলে প্রচার করে; অথচ প্রচারকালে তার সন্দেহ হয়-এটা রাসূলের নামে মিথ্যা কথা, তারপরও প্রচার করে সে মিথ্যাবাদীদের একজন।" [সহীহ মুসলিমের ভূমিকা (১/৮)]। আর সুন্নাহ শব্দের ব্যবহারের উদাহরণ হলঃ
(المهديين الراشدين الخلفاء وسنة سنتي بـ عليكم)
অর্থঃ "তোমাদের উপর আমার সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নাহ অনুসরণ করা অপরিহার্য।" [মুসনাদে আহমদ ৪/১২৬, সুনানু আবু দাউদ ৫/১৩, তিরমিজী ৫/৪৪]। তবে সুন্নাহ শব্দটির অর্থের পরিসর আরো ব্যাপক। সুন্নাহ দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ, অনুমোদনকে যেমন বুঝানো হয়, তেমনি তাঁর সাহাবাদের কথা কাজ, অনুমোদনকেও বুঝায়। যেমন পূর্বের হাদীসটিতে খলিফাদের সুন্নাহকে আঁকড়ে
ধরতে বলা হয়েছে। অতএব, রাসূলুল্লাহ () তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আরও বলেছেনঃ
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، حَدَّثَنَا ثَوْرُ بْنُ يَزِيدَ، قَالَ حَدَّثَنِي خَالِدُ بْنُ مَعْدَانَ، قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَمْرِو السُّلَمِيُّ، وَحُجْرُ بْنُ حُجْرٍ، قَالَا أَتَيْنَا الْعِرْبَاضِ بْنَ سَارِيَةً وَهُوَ مِمَّنْ نَزَلَ فِيهِ { وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوْكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ } فَسَلَّمْنَا وَقُلْنَا أَتَيْنَاكَ زَائِرِينَ وَعَائِدِينَ وَمُقْتَبِسِينَ . فَقَالَ الْعِرْبَاضُ صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ فَقَالَ قَائِلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةً مُوَدِّعٍ فَمَاذَا تَعْهَدُ إِلَيْنَا فَقَالَ " أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشَ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ "
আহমদ ইবন হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ) ... হাজার ইবন হাজার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমরা ইরবায ইবন সারিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) - এর নিকট গমন করি, যার শানে এ আয়াত নাযিল হয়, তাদের জন্য কোন অসুবিধা নেই, যারা আপনার নিকট এ জন্য আসে যে, আপনি তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করবেন। আপনি বলেনঃ আমি তো তোমাদের জন্য কোন বাহন পাই না। রাবী বলেনঃ আমরা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম
করি এবং বলি, "আমরা আপনাকে দেখার জন্য, আপনার খিদ্মতের জন্য এবং আপনার কাছ থেকে কিছু সংগ্রহের জন্য এসেছি।” তখন তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের সঙ্গে সালাত আদায়ের পর, আমাদের দিকে ফিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যাতে আমাদের চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয় এবং অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। আমাদের মধ্যে একজন বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ)! মনে হচ্ছে এ আপনার বিদায়ী ভাষণ, কাজেই আপনি আমাদের আরো কিছু অছীয়ত করুন। তখন তিনি (ﷺ) বলেন, আমি তোমাদের তাকওয়া অবলম্বনের জন্য বলছি এবং শোনা ও মানার জন্যও যদিও তোমাদের আমীর হাবশী গোলাম হয়। কেননা, তোমাদের মাঝে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে, তারা বহু মতভেদ দেখতে পাবে। এমতাবস্থায় তোমাদের উচিত হবে আমার ও আমার খুলাফায়ে-রাশেদার সুন্নাতের অনুসরণ করা, যারা সত্য ও ন্যায়ের অনুসারী। তোমরা তাদের দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করবে। তোমরা বিদ'আতের অনুসরণ ও অনুকরণ করা হতে দূরে থাকবে। কেননা, প্রত্যেক নতুন কথাই বিদ'আত এবং প্রত্যেক বিদ'আতই গুমরাহী। [সুনান আবু দাউদ :: কিতাব আস-সুন্নাহ অধ্যায় ৪২, হাদীস ৪৬০৭]⁷⁶。
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا
আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই, অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্র করবেন কিয়ামতের দিনে, এতে কোন সন্দেহ নেই, আর আল্লাহর (হাদীস) বাণী অপেক্ষায় কার কথা অধিক সত্যবাদী হতে পারে? (সূরা আন-নিসা, ৪/৮৭)। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেনঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلا
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর আর তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বের অধিকারী তাদের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও; যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখ, এটাই কল্যানকর এবং শ্রেষ্ঠতর সমাধান। [সূরা নিসাঃ ৫৯]। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অন্যত্র বলেছেনঃ "আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করবে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, যেখানে সে চিরদিন অবস্থান করবে।” [সূরা জীনঃ ২৩]। অতএব, রাসূলের অবাধ্যতা করলে তার জন্য শাস্তির বিধান সাব্যস্ত থাকায় প্রমাণিত হলো যে, সুন্নাহ অবশ্যই
আল-কুরআনের মতই হুজ্জত (দলিল)। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেনঃ
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
"রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।” [সূরা হাশরঃ আয়াত নং - ৭]
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةً لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
"অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।” [সূরা আল-আহযাবঃ ২১]।
উপরোক্ত পবিত্র কুরআনের আয়াতটি হাদীসেও এসেছে। নিম্নে হাদীসটি উপস্থাপন করা হলোঃ-
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ قَالَ: حَدَّثَنَا شَرِيكَ عَنِ الْأَعْمَشِ عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
:: সুনানু ইবনে মাজাহ্ :: হাদীস ১ [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] - এর সুন্নতের বিবরন অধ্যায়]" আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ রাক'আত সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি তোমাদেরকে যা আদেশ দেই, তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাকো। তাখরীজ কুতুবুত তিসআহ: বুখারী ৭২৮৮, মুসলিম ১৩৩৭, তিরমিযী ২৬৭৯, আহমাদ ৭৩২০, ৭৪৪৯, ৮৪৫০, ৯২২৯, ৯৪৮৮, ৯৫৭৭, ২৭২৫৮, ৯৮৯০, ২৭৩১২, ১০২২৯, ইবনু মাজাহ। ২। তাহক্বীক্ব আলবানীঃ সহীহ। তাখরীজ আলবানীঃ ইরওয়াউল গালীল ১৫৫, ৩১৪; সহীহাহ ৮৫০। অতএব, একজন মুমিনের ঈমানের অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে, এ হাদীস তা বুঝার এক মানদণ্ড। এ সত্যিকার মুমিনদেরকে ঈমানের অমৃত স্বাদ পেতে হলে হাদীসে রাসূলের তিনটি শর্ত প্রণিধানযোগ্য-
একঃ আল্লাহর রবুবিয়াতের ওপর অটল আস্থা ও তাতে সন্তুষ্ট হওয়া।
দুইঃ দ্বীন হিসেবে ইসলামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে চলার দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করা এবং সমস্ত পৃথিবীর চাকচিক্যপূর্ণ মিথ্যা ও মানবগড়া সকল মত ও পথ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। মুহাম্মদ
(صلى الله عليه وسلم) এর রিসালতের সাক্ষ্য দান ও সমস্ত মহান ব্যক্তি এমনকি পূর্বের নবীদেরকে ও তাঁর মোকাবেলায় পেশ করার সুযোগ নেই বরং তা হবে ধৃষ্টতার নামান্তর।
তিনঃ জীবনের প্রতিটি কদমে তার সুন্নাতকে এভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে জন্মান্ধ যেমন করে চক্ষুষ্মানের লাঠি শক্তহাতে ধরে পথ চলে।
হে প্রভু! আপনাকে একমাত্র রব, মুহাম্মদ (صلى الله عليه وسلم) কে শেষ ও চূড়ান্ত রাসূল এবং ইসলামকে শুধু আল্লাহর মনোনীত দ্বীন হিসেবে আমাদের জন্যে যথেষ্ট বানাও। এ ক্ষেত্রে রাসূল (صلى الله عليه وسلم) এর একটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য। যেমনঃ "হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিব (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূল (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালাকে রব, ইসলামকে জীবনবিধান ও মুহাম্মদ (صلى الله عليه وسلم) কে রাসূল হিসেবে শুধু ঈমান আনেনি বরং মনে প্রাণে গ্রহণ করেছেন ও সন্তুষ্ট হয়েছেন, তিনি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছেন। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অতএব, জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে বাতিল আদর্শ পরিত্যাগ করতে হবে। অন্ধ-অনুকরণ, অন্ধ-বিশ্বাস ও বিদআত কুসংস্কার বর্জন করে ইত্তেবায়ে রাসূল অর্থাৎ রাসূল (صلى الله عليه وسلم) ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (صلى الله عليه وسلم) জুম'আর খুতবায়ে ঘোষণা করেছেন,
فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ) . مسلم
উত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার বাণী। আর উত্তম পথনির্দেশনা হচ্ছে মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পথনির্দেশনা। নিকৃষ্টতম বিষয় হচ্ছে (দ্বীনের মধ্যে) নতুন নতুন বিধান ইবাদতের নামে প্রবর্তন করা, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা। (মুসলিম : ৮৬৭)⁷⁸। রাসূলের অনুকরণ ও অনুসরণ বলতে বুঝায় দালালাতুল কুরআন (কুরআনের নস) মুাতাবেক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব কাজ করেছেন ও তিনি নিজে যা সুন্নত করেছেন সে সব কাজ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ بْنُ نَجْدَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو عَمْرِو بْنُ كَثِيرِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ حَرِيزِ بْنِ عُثْمَانَ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي عَوْفٍ، عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ " أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلالٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ أَلَا لَا يَحِلُّ لَكُمْ لَحْمُ الْحِمَارِ الْأَهْلِيِّ وَلَا كُلُّ ذِي نَابٍ مِنَ السَّبْعِ وَلَا لُقَطَةً مُعَاهِدٍ إِلَّا أَنْ يَسْتَغْنِيَ عَنْهَا صَاحِبُهَا وَمَنْ نَزَلَ بِقَوْمٍ فَعَلَيْهِمْ أَنْ يَقْرُوهُ فَإِنْ لَمْ يَقْرُوهُ فَلَهُ أَنْ يُعْقِبَهُمْ بِمِثْلِ قِرَاهُ "
আবদুল ওয়াহাব (রহঃ) .... মিকদাম ইবন মা'দীকরাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ حَنْبَلِ، وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ النُّفَيْلِيُّ، قَالَا حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ أَبِي النَّصْرِ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِنًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ الْأَمْرُ مِنْ أَمْرِي مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لَا نَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ "
আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন হাম্বল (রহঃ) .... আবু রাফি (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ আমি তোমাদের মাঝে কাউকে এরূপ পাব না, যে তার খাটের উপর বালিশে হেলান দিয়ে থাকে। যদি তার কাছে আমার কোন আদেশ বা নিষেধ আসে, তখন সে বলেঃ আমি তো এ জানি না। বরং আমি আল্লাহ্র কিতাবে যে নির্দেশ পেয়েছি, তার অনুসরণ"⁷⁹。
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَاحِ الْبَزَّازُ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، ح وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عِيسَى، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ الْمَخْرَمِيُّ، وَإِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ سَعْدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ عَائِشَةَ رضى الله عنها قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدُّ " . قَالَ ابْنُ عِيسَى قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " مَنْ صَنَعَ أَمْرًا عَلَى غَيْرِ أَمْرِنَا فَهُوَ رَدُّ "
মুহাম্মদ ইবন সাব্বাহ (রঃ) .... আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনের মধ্যে নতুন কিছুর সংযোজন করবে, যা এতে নেই তা পরিত্যাজ্য।
রাবী ঈসা (রঃ) বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেনঃ আমরা যা করিনি, যদি এমন কাজ কেউ করে, তাবে তা পরিত্যাজ্য। আলোচ্য হাদীসে নবী (সাঃ) অহংকারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন, যারা নিজেদের আরাম-আয়েশে জন্য এরূপ বলবে এবং হাদীসের নির্দেশ পরিত্যাগ কর কেবলমাত্র ব্যক্তি স্বার্থ ও সুবিধার জন্য কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবী করবে। এরা সত্যকারের মুসলিম নয়। বরং প্রকৃত মুসলমান তারা - যারা কুরআন ও হাদীসের পূর্ণ অনুসরণ করবে। (অনুবাদক)]। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ( ) বলেছেনঃ-
كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا مِلَةٌ وَاحِدَةً ما أنا عَلَيْهِ وَأَصْحَابي (الترمذي حسن
আর্থাৎ, একমাত্র আমি এবং আমার সাহাবীদের মতের (মিল্লাতের) অনুসারী দল ব্যতীত সকলেই জাহান্নামে যাবে। (তথ্যসূত্রঃ তিরমিযী, হাসান)। মানুষ কি দেখে না, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি বীর্য থেকে?⁸⁰
অথচ এখন সে সুস্পষ্ট ঝগড়াটে হয়ে গেছে। (সূরা ইয়াসিন, ৩৬/৭৭-৭৯)।
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُبِينٌ
তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বীর্য থেকে অথচ এখন সে সুস্পষ্ট ঝগড়াটে হয়ে গেছে। (সূরা আন-নাহল, ১৬/৪)
আল-কুরআনের দৃষ্টিতে হাদীস (حَدِيث) :
আল-কুরআনে হাদীস শব্দটি যে সকল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছেঃ-
১. কুরআনের আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহর কথা, বক্তব্য বা বাণী অর্থেঃ
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيْثِ أَسَفًا
অর্থঃ তারা এই বক্তব্যের (হাদীসের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তুমি [রাসূল (সাঃ)] হয়তো নিজেকে ভীষণভাবে চিন্তাকিষ্ট করে তুলব। (সূরা কাহাফ/১৮: ৬)। ব্যাখ্যঃ এখানে কুরআনের আয়াত তথা কুরআনের আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহর বক্তব্যকে হাদীস বলা হয়েছে।
أَفَبِهَذَا الْحَدِيْثِ أَنْتُمْ مُدْهِنُونَ
অর্থঃ এ কথা (হাদীস) কি তোমাদের (ভুল ধারণার) উপর প্রলেপ দেয় না? (সূরা ওয়াকিয়াহ/৫৬: ৮১)।
ব্যাখ্যাঃ এখানেও কুরআনের আয়াত তথা কুরআনের আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহর কথা বা বক্তব্যকে হাদীস বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيْثِ تَعْجَبُونَ
অর্থঃ তাহলে এসব কথায় (হাদীস) তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হচ্ছ? (সূরা নজম: ৫৯)। ব্যাখ্যাঃ এখানেও কুরআনের আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহর কথা বা বাণীকে 'হাদীস' বলা হয়েছে।
২. নবীর কথা অর্থেঃ
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا
অর্থঃ এবং নবী যখন তাঁর এক স্ত্রীর নিকট গোপনে একটি কথা (হাদীস) বললেন। (সূরা তাহরীম/৬৬: ৩)।
ব্যাখ্যাঃ এখানে নবীর বলা কথাকে হাদীস বলা হয়েছে।
৩. সাধারণ মানুষের কথা, বক্তব্য বা বাণী অর্থে
فَبِأَيِّ حَدِيثِم بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ
অর্থঃ অতঃপর এটি বাদে অন্য কার কথাকে (হাদীস) তারা বিশ্বাস করবে? (সূরা আরাফ/৭: ১৮৫, মুরসালাত/৭৭: ৫০)।
ব্যাখ্যাঃ এ দুই স্থানে আল্লাহ বা রাসূল (সাঃ) এর কথা, বক্তব্য বা বাণী বাদে অন্য কারো কথা, বক্তব্য বা বাণীকে হাদীস বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. নতুন কথা, সংবাদ বা খবর অর্থেঃ
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ مُوسَى
অর্থঃ মুসার খবর (হাদীস) তোমার নিকট পৌঁছেছে কি? (সূরা ত্বাহা/২০ : ৯, সূরা আন-নাযিয়াত/৭৯ : ১৫)।
ব্যাখ্যাঃ এখানে কুরআনের আয়াতে উল্লেখ করা খবর কে হাদীস বলা হয়েছে।
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْجُنُودِ
অর্থঃ তোমার নিকট সেই সৈনিকদের খবর (হাদীস) পৌঁছেছে কি? (সূরা বুরুজ/৮৫:১৭)
ব্যাখ্যাঃ এখানেও কুরআনের আয়াতে উল্লেখ করা বিশেষ একটি খবরকে হাদীস বলা হয়েছে।
৫. বর্ণনা করা, প্রকাশ করা অর্থেঃ
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدَّتْ
অর্থঃ তোমার রবের নিয়ামতের কথা বর্ণনা (হাদীস) করতে থাক। (সূরা দুহা/৯৩ : ১১)
৬. স্বপ্নকালীন কথাবার্তা অর্থেঃ
وَعَلِّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ
অর্থঃ স্বপ্নের (হাদীস) কথার ব্যাখ্যা তুমি আমাকে শিখিয়েছো। (সূরা ইউসুফ/১২: ১০১)।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায় যে, আল-কুরআনে আল্লাহ, নবী-রাসূল ও সাধারণ মানুষের কথা, বক্তব্য ও বাণী এবং বর্ণনা করা, প্রকাশ করা, সংবাদ (খবর), নতুন কথা, স্বপ্নকালীন কথাবার্তা ইত্যাদি অর্থে হাদীস শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
কুরআন হচ্ছে আল্লাহর কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু (অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উল্লেখিত) রূপ তথা নির্ভুল রূপ। তাহলে নিশ্চয়তা সহকারে বলা যায় যে, কুরআন যেখানে হাদীস শব্দ দ্বারা কারো কথা, বক্তব্য বা বাণী বুঝিয়েছে সেখানে ঐ কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু তথা নির্ভুল রূপকে বুঝিয়েছে। অর্থাৎ কুরআন অনুযায়ী হাদীস শব্দের একটি সংজ্ঞা হচ্ছে কারো কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু, নির্ভুল বা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যথাযথ ভাবসহ উল্লিখিত রূপ।
হাদীস সম্পর্কে আলেমদের অভিমতঃ
হাদীসের প্রসিদ্ধতম সংজ্ঞা হল,
اقوال النبي صلى الله عليه وسلم وأفعاله وأحواله (فتح الملهم - 6/1)
রাসূল (সাঃ) এর কথা, কর্ম এবং অবস্থাকে বলা হয় হাদীস। (ফাতহুল মুলহিম-১/৬)। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) লিখেন-
وَقَالَ الطَّيِّبِيُّ: الْحَدِيثُ أَعَمُّ مِنْ أَنْ يَكُونَ قَوْلَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالصَّحَابِيِّ وَالتَّابِعِيِّ وَفِعْلَهُمْ وَتَقْرِيرَهُمْ
আল্লামা তীবী (রহঃ) বলেন- হাদীস এটি আম শব্দ। এর মাঝে রাসূল সাঃ এর কথা এবং সাহাবী এবং তাবেয়ীদের কথা এবং তাদের কর্ম ও তাকরীর তথা কোন কিছু দেখে চুপ থাকা বিষয়ও শামিল। (তাদরীবুর রাবী-৬)⁸¹। তাহলে আল্লামা তীবী (রহঃ) এর মতে হাদীস হল ৯টি বস্তুর সমন্বয় তথা-
১- রাসূল (সাঃ) এর কথা।
২- রাসূল (সাঃ) এর কর্ম।
৩- রাসূল (সাঃ) এর তাকরীর।
৪- সাহাবী (রাঃ) এর কথা।
৫- সাহাবী (রাঃ) এর কর্ম।
৬- সাহাবী (রাঃ) এর তাকরীর।
৭- তাবেয়ীগণ (রহঃ) এর কথা।
৮- তাবেয়ীগণ (রহঃ) এর কর্ম।
৯- তাবেয়ীগণ (রহঃ) এর তাকরীর।
আল্লামা তীবী (রহঃ) এর মতে ৯ প্রকারকেই হাদীস বলেছেন। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ)। ⁸² আল্লামা হাফেজ সাখাবী (রহঃ) বলেন-
وَالْحَدِيثُ لُغَةً ضِدُّ الْقَدِيمِ وَاصْطِلا حَامَا اضيف الى النبي ﷺ قَوْلا لَهُ او فِعْلا لَهُ او تَقْرِيرٍ اوصِفَة حَتَّى الْحَرَكَاتِ وَالسَّكَنَاتِ فِي الْيَقَظَةِ وَالْمَنَامِ
অর্থঃ আভিধানিক অর্থে হাদীস শব্দটি কাদীম তথা অবিনশ্বরের বিপরীত আর পরিভাষায় বলা হয় রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত। চাই তার বক্তব্য হোক বা কর্ম বা অনুমোদন অথবা গুণ এমন কি ঘুমন্ত অবস্থায় বা জাগ্রত অবস্থায় তাঁর গতি ও স্থির সবই হাদীস। সহীহ বুখারীতে বিশিষ্ট ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল ক্বারী এর মধ্যে হাদীস সম্বন্ধে রয়েছেঃ
علم الحديث هو علم يعرف به اقوال النبي ﷺ وافعاله واخواله
অর্থঃ ইলমে হাদীস এমন বিশেষ জ্ঞান যার সাহায্যে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কাজ ও অবস্থা জানতে পারা যায়। হাদীস' শব্দের বিশ্লেষণ করে ইমাম রাগব ইসফাহানী লিখেছেনঃ
الحديث : وَالْحَدِيْثُ كَوْنُ الشَّيْ بَعْدَ أَنْ لَّمْ تَكُنْ عِرْضاً كَانَ تَوْ أَوْجَدْ هَرًا وَكُلُّ كَلَامٍ يَبْلُغُ الْإِنْسَانَ مِنْ جَهَةِ السَّمْعِ أَوِ الْوَحْي فِي يَقْظَتِهِ أَوْ مَنَامِهِ -حَدِيْثُ
'হাদীস' আর 'হুদুস' বলতে বুঝায় কোন একটি অস্তিত্বহীন জিনিসের অস্তিত্ব লাভ করা, তা কোন মৌলিক জিনিস হোক কি অমৌলিক। আর মানুষের নিকট শ্রবণেন্দ্রীয় বা ওহীর সূত্রে নিদ্রায় কিংবা জাগরণে যে কোন কথা পৌঁছায়, তাকেই হাদীস বলে। অন্যত্র তিনি লিখেছেনঃ
شَيْ تُلْقَى فِي رَوْعِ أَحَدٍ مِنْ جِهَةِ الْمَلَأُ
উচ্চতর জগত হতে একজনের অন্তর্লোকে যা কিছু উদ্রিক্ত হয় তাই হাদীস। কতিপয় হাদীসবিশারদ বলেন,
معرفة ما اضيف الى رسول الله صلى الله عليه وسلم او الى صحابي او الى من دونه ممن يقتدى بهم في الدين قولا او فعلا أو صفة او . تقريرا⁸³
অর্থাৎ নবী (সাঃ) এর বাণী, কর্ম, অনুমোদন ও বৈশিষ্ট সম্পর্কে জানা তেমনিভাবে কোন সাহাবী বা তার পরবর্তী এমন কারও বাণী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, দ্বীনের ব্যাপারে যিনি অনুসরণযোগ্য, এসবগুলোই ইলমুল হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। ফিকহ বিদদের নিকট হাদীস হলঃ
اقوال رسول الله صلى الله عليه واله وافعaleh -
অর্থঃ হাদীস হলো আল্লাহর রাসূলের কথা ও কাজসমূহ।
'ইলমুর রিওয়াইয়াহ' ও 'ইলমুদ দিরাইয়াহ' কে "علم مصطلح الحديث" বা শুধু "مصطلح الحديث" বলা হয়।
অর্থাৎ যে শাস্ত্রে 'ইলমুর রিওয়াইয়াহ' ও 'ইলমুদ দিরাইয়াহ' সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, সে শাস্ত্রকে 'ইলমু মুসতালাহিল হাদীস' বলা হয়। তবে সাধারণত 'ইলমুদ দিরাইয়াহ'কে 'ইলমু মুসতালাহিল হাদীস' বলা হয়। 'মুসতালাহুল হাদীসের' অপর নাম "علم علوم الحديث 'ইলমু উলুমিল হাদীস' বা "علم أصول الحديث " 'ইলমু উসুলিল হাদীস' বা শুধু "علم الحديث" 'ইলমুল হাদীস'⁸⁴। মূলতঃ
علوم الحديث একটি আরবী পরিভাষা যা দুটি শব্দ যোগে গঠিত হয়েছে। একটি হল علوم আর অপরটি হলো الحديث
علوم শব্দটি বহুবচন। একবচনে علم অর্থ নিম্নরুপঃ
১. জানা,
২, জ্ঞান লাভ করা,
৩. বুঝা,
৪. বিশ্বাস করা,
৫. প্রজ্ঞা,
৬. শাস্ত্র ইত্যাদি।
সুতরাং বলা যায় (علم الحديث) অর্থ হাদীসের জ্ঞান বা হাদীস শাস্ত্র। ইলমে হাদীস (علم الحديث) দুই প্রকার। যথা- (ক) বর্ণনা সংশ্লিষ্ট ইলমে হাদীস, (খ) অর্থ ও ভাবসংক্রান্ত ইলমে হাদীস।
(ক) বর্ণনা সংশ্লিষ্ট ইলমে হাদীসঃ যে শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে রাসূল (সাঃ) এর কথা ও কাজের বর্ণনা এবং বর্ণনাগুলোর মূলপাঠ ও
মূলপাঠের শব্দ লেখন রীতি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়, তাকে বর্ণনা সংশ্লিষ্ট ইলমে হাদীস বলে।
(খ) অর্থ ও ভাবসংক্রান্ত ইলমে হাদীসঃ আর যে শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে বর্ণনার বাস্তবতা, শর্তাবলী, প্রকারভেদ, বর্ণনাকারীর অবস্থা, বর্ণনাকারীর শর্ত সমূহ, বর্ণনার প্রকারগুলো এবং এ সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়, তাকে অর্থ ও ভাবসংক্রান্ত ইলমে হাদীস বলে। [(কাওয়াইদুত তাহদীস-১/২৮, তাদরীবুর রাবী-১/২৬,২৭, আন-নুকাত-১/২২৫, উসূলুল হাদীস-১/২০, ইত্তেহাফুল মাহারা- ২৪,২৫, কাওয়াইদ ফি উলুমিল হাদীস- ২৩, দরসে তিরমীযী- ১/২২-২৩)]⁸⁵。
ইলমুল হাদীস প্রধানত দুই প্রকার -
১. ইলমুর রিওয়াইয়াহ হাদীস )"علم الرواية"(
২. ইলমুদ দিরাইয়াহ হাদীস )"علم الدراية"(
১. ইলমুর রিওয়াইয়াহ হাদীস এর পরিচয়ঃ
هو علم يشتمل على نقل احواله صلى الله عليه وسلم قولا و فعلا او تقريرا أو صفة
যে শাস্ত্রে রাসুল (সাঃ) এর আহওয়াল তথা সামগ্রিক অবস্থা বা জীবনপ্রণালী বর্ণনা করা হয়; চাই তার বাণী হোক বা কর্ম কিংবা অনুমোদন কিংবা কোন গুণ, তাই ইলমুর রিওয়াইয়া'র হাদীস। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'ইলমুর রিওয়াইয়া'র হাদীসের সূচনা করেন। অতঃপর প্রয়োজনের তাগিদে ধীরে ধীরে তার পরিসর বর্ধিত হয়। এ ইলমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
«بَلِّغُوا عَنِّى وَلَوْ آيَةً»
"একটি আয়াত হলেও আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও”⁸⁶। অন্যত্র রাসূল (সাঃ) আরও বলেনঃ
«لِيُبَلِّغُ الشَّاهِدُ مِنْكُمُ الْغَائِبَ»
"তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয়”⁸⁷। অন্যত্র তিনি বলেনঃ
«تَسْمَعُونَ مِنّى، وَيُسْمَعُ مِنْكُمْ، وَيُسْمَعُ مِمَّنْ يَسْمَعُ مِنْكُمْ»
“তোমরা আমার নিকট শ্রবণ কর, তোমাদের থেকে শ্রবণ করা হবে এবং যারা তোমাদের থেকে শ্রবণ করে তাদের থেকেও শ্রবণ করা হবে”⁸⁸。
২. ইলমুদ দিরাইয়াহ হাদীস এর পরিচয়ঃ
هُوَ عِلْمُ بِقَوَانِيْنَ يَعْرِفُ بِهَا أَحْوَالَ السَّنَدِ وَالْمَتْنِ مِنْ صِحَةٍ وَحُسْنٍ وَ ضَعْفِ وَ رَفْعِ وَ وَقْفِ وَ قَطْعِ وَ عُلُوٍّ وَنُزُوْلٍ وَ كَيْفِيَّةِ التَّحَمُّلِ وَ الْأَدَاءِ وَ صِفَاتُ الرِّجَالِ وَ مَا أَشْبَهَ ذَلِكَ
অর্থাৎ এম কতক নিয়মাবলী জানা, যার দ্বারা সহীহ, হাসান, জয়ীফ, মারফু, মাওকুফ, মাকতু, উচ্চসনদ, নিম্ন সনদ- এর দিক দিয়ে সনদ ও মতনের অবস্থা জানা যায়, হাদীস শিক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষা প্রদানের অবস্থা জানা যায় এবং হাদীসের রাবীদের গুণাবলি ও এ জাতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়, তাই ইলমুদ দিরাইয়াহ হাদীস।
মোট কথা, কোন হাদীস সম্পর্কে জানা যে, এটি কোন কোন কিতাবে কি কি সনদে এবং কি কি শব্দে বর্ণিত হয়েছে। এরপর এর অর্থ বুঝা ও এর থেকে বিভিন্ন বিধান চয়ন করা, এসবই হল ইলমু রিওয়াতিল হাদীস। অপরদিকে কোন হাদীসের সনদ সম্পর্কে আলোচনা করা যে এটি কোন পর্যায়ের হাদীস, সহীহ না হাসান,
মাকবুল না মারদুদ, সনদের রাবীদের অবস্থা কিরুপ, ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা ইলমু দিরায়াতুল হাদীস এর অন্তর্ভুক্ত।
সাধারণভাবে উলুমুল হাদীস বলতে ইলমু দিরায়াতুল হাদীসকে বুঝানো হয়ে থাকে।
উলুমুল হাদীস এর আলোচ্য বিষয়ঃ السند والمتن من حيث القبول والرد
অর্থাৎ গ্রহণ ও বর্জণের দিক দিক থেকে হাদীসের সনদ ও মতন নিয়ে আলোচনা কর।
উলুমুল হাদীসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ ১. গায়রে সহীহ থেকে সহীহ হাদীস জানা এবং
২. হাদীসের পারস্পরিক স্তর জানা।
ইলমে হাদীসের গুরুত্বঃ ইমাম আবু আমর ওসমান ইবনু আবদীর রহমান- ৬৪৩ হিঃ (রাহঃ) বলেন, ইলমে হাদীস একটি শ্রেষ্ঠতম ও অতি কল্যাণকর শাস্ত্র। যাকে উচ্চতর বিদগ্ধ ব্যক্তিরাই ভালবাসেন। গবেষক, আলেম ও বুদ্ধিমানরাই এর সাথে মনোনিবেশ করেন। এটি এমন একটি ইলম, যাতে অধিকাংশ ইলম সন্নিবেশিত। বিশেষতঃ
ইলমে ফিক্বহ, যা ইলমের নয়নতারা স্বরূপ। তাও এই ইলমের অন্তর্ভুক্ত। আগেকার যুগে ইলমে হাদীসের চর্চা ছিল ব্যাপক। তৎকালীন মুহাদ্দিসীনদের মর্যাদায় তা ছিল সর্বোচ্চ। তখন তার দরস ছিল জীবন্ত এবং তার পাঠশালা ছিল প্রাণবন্ত। ইলমে হাদীসের দরসের গুঞ্জনে পরিবেশ ছিল মুখরিত।
ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) ১৫০ হিঃ বলেন, যদি সুন্নাহ না থাকত, তাহলে আমাদের কেউ কুরআন বুঝতে পারত না। আর ইলমে হাদীস হল, সঠিক সুন্নাহর নির্ণয়ক।
ইমাম আওযায়ী (রাহঃ) বলেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দিক দিয়ে রাসূল (সাঃ) এর হাদীস কুরআন মাজীদের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে কুরআনই হাদীসের প্রতি বেশি মুখাপেক্ষী। যে হাদীসের প্রতি কুরআনের মুখাপেক্ষীতা বেশি, সে হাদীস থেকে উদ্দেশ্য হল সহীহ হাদীস।
সিহ্যাতে হাদীস নির্ভর করে, হাদীসের মূলপাঠ ও সূত্র বিশুদ্ধ হওয়ার ওপর। আর তা যে শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়, তা হল ইলমুল হাদীস বা হাদীস শাস্ত্র। অতএব, ইলমূল হাদীসের গুরুত্ব অপরিসীম।⁸⁹ ⁹⁰ ⁹¹
বর্তমান যুগে ইলমে হাদীস চর্চা সময়ের দাবীঃ তৎকালীন যুগের তুলনায় বর্তমান যুগে ইলমে হাদীসের চর্চা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বর্তমান সময়ে এমন কতগুলো সমস্যা প্রকট ধারণ করছে যার সুষ্ঠু সমাধান ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভ্রান্তি নিরসনে ইলমে হাদীসের বিকল্প নেই। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়, চিন্তাশীল প্রেরণায়, কলম ও মুখের ভাষায় তাদের মোকাবালা করতে ইলমে হাদীসের যথেষ্ট সঠিক জ্ঞান অর্জন করা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবী।
বর্তমান যুগে ইলমে হাদীস চর্চার অবস্থাঃ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, যেখানে ইলমে হাদীসের চর্চা করা সময়ের অপরিহার্য দাবী, সেখানে তার চর্চা হয়ে গেল ঐচ্ছিক বিষয়। কেননা এ যুগের সিংহভাগ তালিবে ইলম 'আসমাউর রিজাল', হাদীসের দুর্লভ ও দুর্বধ্য শব্দের অর্থ সম্পর্কে অনবগত। হাদীস তাদের মৌখিকভাবে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদ্দরুণ পড়ার এই রীতিতে ভাষাগত ত্রুটি ও উচ্চারণগত ভুল ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হ্যাঁ, এখনো ইলমে হাদীসের একটি শাখা অবশিষ্ট আছে। যদিও তা হাদীসের সকল অধ্যায়ের ক্ষেত্রে নয়; বরং মতভেদ রয়েছে এমন মাসায়েলের ক্ষেত্রে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো যে, আজকাল জনসম্মুখে ভ্রান্ত, বানোয়াট ও জাল হাদীসের বর্ণনা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ জনসভা কিংবা বিশেষ মজলিস হোক সর্বত্র এমন
ভঙ্গিমায় জাল হাদীস উপস্থাপন করা হয়, যেন তা সর্বাধিক সহীহ হাদীস। অথচ রাসূল কারিম (সাঃ) ইরশাদ করেন,
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْجَعْدِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنِي مَنْصُورٌ، قَالَ سَمِعْتُ رِبْعِيَّ بْنَ حِرَاشٍ، يَقُولُ سَمِعْتُ عَلِيًّا، يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " لاَ تَكْذِبُوا عَلَى، فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَى فَلْيَلِجِ النَّارَ
আলী ইবনুল জা'দ (রহঃ) ... 'আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী বলেছেনঃ তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে⁹²। বর্তমানে আমরা সহীহ হাদীসের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। হাদীসের নির্ভরযোগ্য কিতাব সমূহ অধ্যয়নের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। হাদীসের সাথে আমাদের সম্পর্ক এতটুকু যে, যে কোনো বক্তার ওয়াজ-নসীহতে বা বাজারি কোনো পুস্তিকায় কোনো হাদীস পেলেই হল, আমরা তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যাই; অথচ হাদীসের ইলম অর্জন করার মাধ্যম যদি এটিই হয়, তাহলে নিজেদের অজান্তেই মানুষ হাদীসের নামে জাল ও মিথ্যা বর্ণনার ধোঁকায় পড়ে চরম ভ্রান্তির শিকার হবে। আরো আফসোসের বিষয় এই যে, একই বিষয়ের ওপর যদি এক দিকে রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) এর হাদীস বিদ্যমান থাকে, অপরদিকে জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনাও থাকে, তখনো দেখা যায় যে, সাধারণ মানুষের মুখে ঐ বিষয়ের জাল ও ভিত্তিহীন রেওয়ায়েতই প্রসিদ্ধ। আর তার বিপরীতে সহীহ হাদীস থেকে তারা সম্পূর্ণ বে-খবর! আর মানুষ এহেন পরিস্থিতির শিকার তখনই হয়, যখন সে ইলমে হাদীস বা হাদীস সংক্রান্ত জ্ঞান থেকে উদাসীন হয় এবং তার চর্চা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আমাদের উচিত, ইলমে হাদীসের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অনুধাবন করে তাঁর চর্চায় সময় ব্যয় করা।
ইলমে হাদীসের কয়েকটি শাখা প্রশাখাঃ উল্লিখিত আলোচনায় ইলমে হাদীসের গুরুত্ব সূর্যের ন্যায় প্রমাণিত। তাই, তার কতিপয় শাখা প্রশাখা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে উক্ত শাস্ত্রের পান্ডিত্য লাভ করা একান্ত জরুরী মনে করি। অতএব, নিম্নে তার পাঁচটি শাখা সম্পর্কে আলোকপাত করা হল- (১) আসমায়ে সনদ শুদ্ধ করণ, (২) হাদীস বর্ণনাকারীর অবস্থা বিশ্লেষণ, (৩) হাদীসের শাব্দিক শুদ্ধকরণ ও বিশ্লেষণ, (৪) হাদীস সহীহ-জয়ীফের বিষয়ে হুকুম নির্ণয় করা, (৫) রাবী ও তার আদাবের জ্ঞান লাভ করা। তন্মধ্যে প্রথম তিনটি ইলমে হাদীসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর চতুর্থ বিষয় ইলমে হাদীসের ওপরই নির্ভর। পঞ্চম বিষয় ইলমে হাদীসের মূল বিষয় না হলেও এটাই হাদীসের নির্যাস ও ফলাফল। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায়
বলা যায় যে, হাদীস (حدیث) বলতে সাধারনতঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কর্ম বা অনুমোদনকে বুঝানো হয়।
অর্থাৎ, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যা বলেছেন, করেছেন বা অনুমোদন করেছেন তাকে হাদীস বলা হয় এবং হাদীস (حدیث) বলে যা জানা যায় তা সত্যিই রাসুল (সাঃ) এর কথা কিনা তা যাচাই করে নির্ভরতার ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিভিন্ন প্রকারে ও পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। ব্যাপক অর্থে সাহাবী (صحابی) দের কথা, কাজ ও সমর্থন এবং তাবেয়ীদের কথা কাজ ও সমর্থনকেও হাদীস (حدیث) বলে। কিন্তু সাহাবা, তাবেয়ী (تابعی) দের ন্যায় তাবে তাবেয়ীনের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণও যে কোরআন হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তাতে সন্দেহ নেই। অতএব, সাহাবায়ে কেরামের কথা, কাজ ও সমর্থনকেও হাদীস বলা হয়।
অবশ্য পরে উসুলে হাদীসে তাঁদের কথা, কাজ ও সমর্থনের নাম দেয়া হয়েছে 'আসার' এবং হাদীসে মওকুফ' এবং তাবেয়ীগণের কথা, কাজ ও সমর্থনের নাম দেয়া হয়েছে 'ফতোয়া'। যেহেতু রাসূলে করীম (সাঃ), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী এবং তাবে তাবেয়ীগণের কথা কাজ ও সমর্থন একই মূল বিষয়কে কেন্দ্র করেই প্রচলিত, সেই জন্য মোটামুটিভাবে সবগুলিকেই 'হাদীস' নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু তবুও শরীয়তী মর্যাদার দৃষ্টিতে এই সবের মধ্যে পার্থক্য থাকায় প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা পরিভাষা নির্ধারণ করা হয়েছে। যথা- নবী করীম (সাঃ) এর কথা কাজ ও
অনুমোদনকে বলা হয় 'হাদীস'। হাদীস বিশারদদের পরিভাষায় "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ, মৌন সম্মতি এবং তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে হাদীস বলে।"
টিকাঃ
⁷⁶ সুনান আবু দাউদ :: কিতাব আস-সুন্নাহ অধ্যায় ৪২, হাদীস ৪৬০৭
⁷⁷ সুনানু ইবনে মাজাহ্- হাদীস ১ [রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নতের বিবরন অধ্যায়]
⁷⁸ মুসলিম: ৮৬৭
⁷⁹ সুনান আবু দাউদ :: কিতাব আস-সুন্নাহ অধ্যায় ৪২, হাদীস ৪৬০৫
⁸⁰ আবু দাউদ, অধ্যায়: কিতাবুস্ সুন্নাহ, তিরমিযী, অধ্যায়: কিতাবুল ইল্ম। ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। মুসনাদে আহমাদ, (৪/১২৬), মাজমুওয়ায়ে ফাতাওয়া (১০/৩৫৪।)
⁸¹ তাদরীবুর রাবী-৬
⁸² وَقَالَ شَيْخُ الْإِسْلَامِ فِي شَرْحِ التَّحْبَةِ الْخَبَرُ عِنْدَ عُلَمَاءِ الْفَنَّ مُرَادِفٌ لِلْحَدِيثِ، فَيُطْلَقَانِ عَلَى الْمَرْفُوعِ 2 وَعَلَى الْمَوْقُوفِ وَالْمَقْطُوعِ }তাদরীবুর রাবী-৬{
⁸³ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম নামক, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং-২০।
⁸⁴ হাদীসশাস্ত্রের পরিভাষায় পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমদ, পৃষ্ঠা নং- ৫৭
⁸⁵ (কাওয়াইদুত তাহদীস-১/২৮, তাদরীবুর রাবী-১/২৬,২৭, আন-নুকাত-১/২২৫, উসূলুল হাদীস-১/২০, ইত্তেহাফুল মাহারা- ২৪,২৫, কাওয়াইদ ফি উলুমিল হাদীস- ২৩, দরসে তিরমীযী- ১/২২-২৩)
⁸⁶ বুখারী: (৬/৪৯৬), হাদীস নং: (৩৪৬১), হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্ন আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
⁸⁷ বুখারী: (১/১৯৯), হাদীস নং: (১০৫), হাদীসটি আবু বাকরাহ নুফাই ইন্ন হারেস (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
⁸⁸ আবু দাউদ: (৩/৩২১), হাদীস নং: (৩৬৫৯), ইব্ন আব্বাস (রাঃ) থেকে সহী সনদে বর্ণিত।
⁸⁹ মুকাদ্দাতু ইবনি সসালাহ - ০৯
⁹⁰ মীযানুশ শারানী-৫১
⁹¹ আত-তালীকুস সাহীহ-১/৩
⁹² ইলম বা জ্ঞান অধ্যায় :: সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৩ :: হাদীস ১০৮