📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 কুরআনের বিধান ব্যাখাকারী হাদীসের উদাহরণ

📄 কুরআনের বিধান ব্যাখাকারী হাদীসের উদাহরণ


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
( لَا تَأْكُلُوا أَمْوَلَكُم بَيْنَكُم بِالْبَطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَرَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ ۲۹ ) [النساء : ٢٩]
"তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা"⁵⁴। এ আয়াত প্রমাণ করে পরস্পর সম্মতিতে হলে সব ধরণের ব্যবসা বৈধ ও হালাল। কিন্তু হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করে এসে দেখেন, কৃষকরা গাছের ফল উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে বিক্রি করে দেয়, অথচ ক্রেতা ফলের পরিমাণ ও ভাল-মন্দ জানতে পারে না। যখন ফল কাঁটার মৌসুম হয়, তখন গাছে ফল না থাকলে বা কোন কারণে ধ্বংস হলে উভয়ের মাঝে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে অধিক ঠাণ্ডা, বা ফল বিনষ্টকারী গাছের রোগ বা পোকার আক্রমণের কারণে ফল ক্ষতিগ্রস্ত হলে এরূপ ঘটনা ঘটে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জাতীয় বেচাকেনা হারাম করে দেন, যতক্ষণ না ফলের আসল আকৃতি বের হয়, এবং যতক্ষণ না ক্রেতা ফলের আসল প্রকৃতি বুঝতে সক্ষম হয়। তিনি বলেনঃ
«أرأيت إذا منع الله الثمرة بم يأخذ أحدكم مال أخيه ؟» رواه البخاري ومسلم، واللفظ للبخاري.
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ, যদি আল্লাহ গাছে ফল না দেন, তাহলে কিসের বিনিময়ে তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের সম্পদ ভক্ষণ করবে"? ⁵⁵
৯. হাদীসে অনেক হুকুম রয়েছে, কুরআনে যার উল্লেখ নয়। যেমন গৃহ পালিত গাধা ও নখ বিশিষ্ট পাঞ্জা দ্বারা শিকারকারী হিংস প্রাণী
খাওয়া হারাম, অনুরূপ ফুফু ও খালার সাথে কোন নারীকে বিয়ে করা হারাম। এসব বিধান কুরআনে নেই, তাই কুরআনের পাশাপাশি হাদীস গ্রহণ না করলে ইসলাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

টিকাঃ
⁵⁴ সূরা নিসা: (২৯)
⁵⁵ বুখারী, ২১৯৮; মুসলিম, ১৫৫৫।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে হাদীসের দলিল

📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে হাদীসের দলিল


অসংখ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, হাদীস ইসলামী শরীয়তের অকাট্য দলিল ও তার উপর আমল করা ওয়াজিব। নিম্নে আমরা তার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছিঃ
কতক হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচারিত কুরআন ও গায়রে কুরআন সব ওহীর অন্তর্ভুক্ত। তিনি যা বলেছেন, বা যার স্বীকৃতি দিয়েছেন তা আল্লাহর নির্দেশে দিয়েছেন। তাই হাদীসের উপর আমল করার অর্থ কুরআনের উপর আমল করা, রাসূলের আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য করা; আর রাসূলের নাফরমানি করার অর্থ আল্লাহর নাফরমানি করা। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
يوشك الرجل متكئا على أريكته ، يحدث بحديث من حديثي ، فيقول : بيننا وبينكم كتاب الله عز وجل ، فما وجدنا فيه من حلال استحللناه ، وما
وجـدنـا فـيـه مـن حـرام حـرمـنـاه ، ألا وإن مـا حـرم رسـول الله - صـلـى الله عـلـيـه وسـلـم - مـثـل مـا حـرم الله» رواه ابـن مـاجـة
"সেদিনে বেশী দূরে নয়, কোন ব্যক্তি তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, আমার কোন হাদীস বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মাঝে কিতাবই যথেষ্ট, তাতে যা হালাল পাব, তা হালাল মানব এবং তাতে যা হারাম পাব, তা হারাম মানব। জেনে রেখ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহর হারাম করার ন্যায়"⁵⁶。
আবু দাউদের বর্ণনায় রয়েছেঃ
ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه ، ألا يوشك رجل شبعان على أريكته يقول : عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فأحلوه وما وجدتم فيه من حرام فحرموه».
"জেনে রেখ, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ (হাদীস) দেয়া হয়েছে। জেনে রেখ, সেদিন দূরে নয়, কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তি তার চেয়ারে বসে বলবেঃ তোমরা এ কুরআনকে আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল জান এবং তাতে যা
হারাম পাবে তা হারাম জান"⁵⁷। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক বাণীতে বলেনঃ
«إنما مثلي ومثل ما بعثني الله به كمثل رجل أتى قوماً فقال : يا قوم إني رأيت الجيش بعيني ، وإني أنا النذير العريان فالنجاء ، فأطاعه طائفة من قومه فأدلجوا فانطلقوا على مهلهم فنجوا ، وكذبت طائفة منهم فأصبحوا مكانهم ، فصبحهم الجيش فأهلكهم واجتاحهم ، فذلك مثل من أطاعني فاتبع ما جئت به ومثل من عصاني وكذب بما جئت به من الحق». رواه البخاري
"আমার এবং আমাকে যা দিয়ে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে তার কওমের নিকট এসে বলল: হে আমার কওম, আমার দু'চোখে আমি শত্রু বাহিনী দেখেছি, নিশ্চয় আমি স্পষ্ট সতর্ককারী, অতএব নিরাপত্তা অবলম্বন কর।
অতঃপর তার কওমের এক দল তার অনুসরণ করল, ফলে তারা বের হয়ে পড়ল ও তাদের অজান্তে জনপদ প্রস্থান করল, তারা নাজাত পেল। আর তার কওমের অপর দল তাকে মিথ্যারোপ করল, ফলে তারা নিজেদের জায়গায় ভোর করল, সকালে শত্রু বাহিনী তাদের উপর হামলা করে তাদের ধ্বংস ও সমূলে নিঃশেষ করে দিল। এ হল ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার আনুগত্য করল ও আমি
যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করল; এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার নাফরমানি করল ও আমি যে সত্য নিয়ে এসেছি তা মিথ্যারোপ করল”⁵⁸। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত মারফু হাদীসে এসেছে:
« من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله .... ».
"যে আমার অনুসরণ করল সে আল্লাহর অনুসরণ করল। আর যে আমার নাফরমানি করল সে আল্লাহর নাফরমানি করল ..."⁵⁹ অপর হাদীসে এসেছেঃ
« كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى ، قالوا : يا رسول الله ومن يأبى ؟ قال : من أطاعني دخل الجنة ، ومن عصاني فقد أبي».
"আমার প্রত্যেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করেছে। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যে আমার নাফরমানি করল সে অস্বীকার করল”⁶⁰। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতক হাদীসে হাদীস আঁকড়ে ধরা,
"আমি তোমাদের মধ্যে দু'টি বস্তুকে রেখে দিয়েছি, তার পরবর্তীতে তোমরা গোমরাহ হবে না, আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নত। এ দু'টি বস্তু পৃথক হবে না যতক্ষণ না হাউজে কাউসারে আমার নিকট উপস্থিত হয়”⁶¹। তিনি আরো বলেছেনঃ
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء المهديين الراشدين، تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ». رواه أبو داود
"অতএব তোমরা আমার সুন্নত ও হিদায়েত প্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধর। খুব শক্তভাবে তা আঁকড়ে ধর ও মাড়ির দাঁত দ্বারা কামড়ে ধর”⁶²। তিনি অন্যত্র বলেনঃ
"সালাত আদায় কর, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ"⁶³। অন্যত্র বলেনঃ
«خذوا عني مناسككم». رواه النسائي
"আমার থেকে তোমরা তোমাদের হজের বিধানগুলো গ্রহণ কর"⁶⁴। অন্যত্র বলেনঃ
«نضر الله امرأ سمع مقالتي فوعاها وحفظها وبلغها ، فرب حامل فقه إلى من هو أفقه ...». رواه الترمذي وغيره
"আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে তরতাজা রাখুন, যে আমার কথা শুনল, অতঃপর তা আত্মস্থ ও হিফাজত করল এবং তা পৌঁছে দিল। কখনো ফিকাহ (হাদীস) বহনকারী ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়..."⁶⁵। অন্যত্র তিনি বলেনঃ
«إن كذبا علي ليس ككذب على أحد، من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار».
“আমার উপর মিথ্যা রচনা করা অন্য কারো উপর মিথ্যা রচনা করার মত নয়, যে আমার উপর স্বেচ্ছায় মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নام বানিয়ে নেয়⁶⁶。
তিনি অন্যত্র বলেনঃ
«لا ألفين أحدكم متكئاً على أريكته يأتيه الأمر من أمري مما أمرت به أو نهيت عنه فيقول: لا أدري ما وجدنا في كتاب الله اتبعناه ». رواه الترمذي. وقال حسن صحيح.
"তোমাদের কেউ অবশ্যই চেয়ারে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে দেখবে, যার নিকট আমার কোন বিষয় আসবে, যার আমি নির্দেশ দিয়েছি অথবা যা থেকে আমি নিষেধ করেছি; অতঃপর সে বলবে: আমরা জানি না, আল্লাহর কিতাবে যা পাব, তারই অনুসরণ করব”⁶⁷。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে যে ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন, তা এখন বাস্তব দেখা যাচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ হাদীসকে অস্বীকার করছে, কেউ তার অংশ বিশেষকে অস্বীকার করছে।

টিকাঃ
⁵⁶ ইবনে মাজাহ, ১২।
⁵⁷ আবু দাউদ, ৪৬০৪।
⁵⁸ বুখারী, ৭২৮৩।
⁵⁹ বুখারী: (২৭৫২)
⁶⁰ বুখারী: (৬৭৬৪)
⁶¹ বায়হাকি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
⁶² আবু দাউদ ৪৬০৭。
⁶³ বুখারী, ৬৩১。
⁶⁴ নাসাঈ, ৩০৬২。
⁶⁵ তিরমিযী, ২৬৫৬。
⁶⁶ বুখারী, ১০৭。
⁶⁷ তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: হাসান ও সহিহ।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস অস্বীকার করার কতক অজুহাত

📄 হাদীস অস্বীকার করার কতক অজুহাত


প্রথম অজুহাত: একশ্রেণী লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা হাদীসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তাদের নিকট কুরআন ব্যতীত কোন কিছুর উপর আমল করা যাবে না। সন্দেহ নেই হাদীস অস্বীকারকারী এ শ্রেণীর লোক কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। কারণ এর মাধ্যমে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতকে অস্বীকার করেছে। তারা বিশ্বাস করেনি তিনি সন্দেহাতীত ও সত্যিকার অর্থে আল্লাহর রাসূল, যা কুরআন ও তার আয়াতকে অস্বীকার করার শামিল। এ মত পোষণকারী কয়েকটি দলঃ
এক. কট্টর রাফেযী তথা শিয়া সম্প্রদায়: তাদের নিকট সাহাবিরা সবাই কাফের, ফলে তাদের বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।
দুই. আহলে কুরআন অথবা কুরআনী সম্প্রদায়: তাদের সৃষ্টি ভারতে। এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে আহমদ খান ও আব্দুল্লাহ বকর আলাভি।
তিন. পাশ্চাত্য চিন্তা ধারায় প্রভাবিত কতক বুদ্ধিজীবী হাদীস অস্বীকার করেন, অথবা তাতে সন্দেহ পোষণ করেন।
দ্বিতীয় অজুহাত: একশ্রেণীর লোক সব হাদীসকে নয়, বরং শুধু খবরে ওয়াহেদ অস্বীকার করেন। খবরে ওয়াহেদ দ্বারা উদ্দেশ্য এক সনদে বা এক সূত্রে বর্ণিত হাদীস। কয়েকটি বিদআতি দল এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মুতাযিলা সম্প্রদায় এবং আবুল হাসান আশআরি ও আবুল মানসুর মাতুরিদির অনুসারীগণ। তারা আকিদার বিষয়ে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করেন না, যদিও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়। তাদের দাবি একাধিক সনদ ব্যতীত আমরা হাদীস গ্রহণ করব না। এ জাতীয় লোকের সংশয় নিরসন ও অজুহাতের কতক উত্তর -
এক. আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ ٦ ) [الحجرات: ٦]
"হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও”⁶⁸。
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সংবাদের সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং একজন ফাসেকের সংবাদ প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন। এর অর্থ আমরা একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণ করব।
দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুসলিমরা মসজিদে কুবায় ফজর সালাত আদায় করতে ছিলেন, একজন সংবাদ দাতা এসে বলল, কেবলা কাবার দিকে ঘুরে গেছে, ইতোপূর্বে যা বায়তুল মাকদিসের দিকে ছিল। তারা তার সংবাদ শুনে সালাতেই কেবলার দিকে ঘুরে যান। যদি একজনের সংবাদ তাদের নিকট দলিল ও আমলযোগ্য না হত, তাহলে অবশ্যই তারা দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ব্যক্তিকে স্বাক্ষীরূপে চাইত। কিন্তু তারা তৎক্ষণাৎ তার সংবাদ গ্রহণ করে প্রমাণ করেন, খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করা জরুরী।
তিন. আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
( يَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ٦٧ ) [المائدة: ٦٧]
“হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও”⁶⁹। এ আয়াতে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার উপর নাযিলকৃত রিসালাত পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তিনি মাত্র একজন ব্যক্তি। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের প্রেরণ করতেন। এ ক্ষেত্রে একস্থানে একজন দায়ী প্রেরণ করা সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়েছিল, লোকেরা প্রেরিত দায়ীর সংবাদ গ্রহণ করত, তাকে আল্লাহ ও
তাদের মাঝে আমানতদার জ্ঞান করত। দেখুন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তুমি তাদেরকে ইসলাম ও তাওহীদের দিকে আহ্বান কর। তিনি ছিলেন একা।
চার. যখন মদ হারাম করে আয়াত নাযিল হল, তখন তার প্রচারকারী ছিল মাত্র একজন। মদিনার লোকেরা তার সংবাদ শ্রবণ করে তাদের মদের পাত্রগুলো ভেঙে ফেলে। তারা বলেনি আমরা একজনের সংবাদ গ্রহণ করব না।
তৃতীয় অজুহাত: এক শ্রেণীর লোক বিবেক সমর্থন করে না তাই হাদীস ত্যাগ করেন। হাদীস ত্যাগ করার এ ফেতনা প্রথম যুগের বিদআতিদের থেকে সূচনা হয়, যেমন মুতাযেলা ও তাদের অনুসারী আশায়েরা প্রমুখ কয়েকটি সম্প্রদায়। তারা বিবেক সমর্থন না করার অজুহাতে অনেক হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে যেসব হাদীসে গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ রয়েছে, যেমন আল্লাহর সিফাত ও ঐসব বিষয় যা আমরা চোখে দেখি না। আশ্চর্য যা গায়েবি বিষয়, বা যা বিবেকের ঊর্ধ্বে তারা বিবেক দ্বারা কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে! আমাদের বুঝে আসে না। ঐ ফেতনা পর্যায়ক্রমে আমাদের যুগ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যখন বিবেককে খুব প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, দৃশ্য ব্যতীত অদৃশ্যকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের
বিষয় মুসলিম পরিচয়দানকারী এসব লোক কুরআন ও হাদীসের বাইরে বিবেককে প্রাধান্য দেয়ার নতুন এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে।

টিকাঃ
⁶⁸ সূরা হুজুরাত: (৬)
⁶⁹ সূরা আল-মায়েদা: (৬৭)

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস (حديث)

📄 হাদীস (حديث)


হাদীস )حدیث( আরবী শব্দ। এর বহুবচন )أَحَادِيث( হাদীস )حديث( শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে নতুন, নবীন, আধুনিক, নব্য, সাম্প্রতিক। আরবী অভিধান ও কোরআনের ব্যবহার অনুযায়ী 'হাদীস' শব্দের অর্থ- কথা, বাণী [speech, word (s)], বার্তা, সংবাদ, বিষয়, খবর )خَبَرُ( ও ব্যাপার ইত্যাদি। [তথ্যসূত্রঃ আরবী - বাংলা অভিধান, ডঃ ফজলুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৮০; আল মাওরিদ, (আরবী-ইংরেজী অভিধান) মুনির বাআলবাকী]।
حَدِيث )হাদীস) শব্দটি একবচন, এর বহুবচন حُدَثن )হুদিসানুন) বা أَحَادِيثُ )আহাদীসু) বা حُدَثَاءُ )হুদাসাউ)। যার লুগাতী বা শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কথা, বাণী, সংবাদ, ব্যাপার, বিষয়, পুরাতন সংবাদ ইত্যাদি। আর 'ইসতিলাহী' বা পারিভাষিক অর্থে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়‍্যীন, হাবীবুল্লাহ্, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন, করেছেন বা অন্যের কোন কথা বা কাজের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন তাকে সুন্নাহ্ বা
হাদীস বলে। অর্থাৎ রসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সম্মতি, চারিত্রিক গুণবলীকে হাদীস বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন -
عَظِيمٍ خُلُقٍ لَعَلَى وَإِنَّكَ
আর (হে নবী) অবশ্যই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সূরা আল-কালাম, ৬৮/৪)। 'হাদীস' (حَدِيث) শুধুমাত্র একটি আভিধানিক শব্দ নয়। মূলতঃ 'হাদীস' (حَدِيث) শব্দটি ইসলামের এক বিশেষ পরিভাষা। সে অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) এর কথা, কাজের বিবরণ কিংবা কথা, কাজের সমর্থন এবং অনুমোদন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত, ইসলামী পরিভাষায় তাই-ই 'হাদীস' নামে অভিহিত। অর্থাৎ-
اقوال النبى صلى الله عليه وسلم وأفعاله وأحواله فتح الملهم - 6/1
রাসূল (সাঃ) এর কথা, কর্ম এবং অবস্থাকে বলা হয় হাদীস। [ফাতহুল মুলহিম-১/৬]।
حديث (হাদীস) এর আভিধানিক অর্থ নতুন। আল্লাহর কালাম 'কাদিম' বা অনাদির বিপরীত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীকে হাদীস বলা হয়, কারণ তার বাণী অপেক্ষাকৃত নতুন
সংবাদকে হাদীস বলা হয়, কারণ সংবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন। মুখের কথাও হাদীস, কারণ এগুলো নতুন নতুন অস্তিত্ব লাভ করে। এ হিসেবে কুরআনুল কারিমকে হাদীস বলা হয়। ইরশাদ হচ্ছেঃ
فَبِأَيِّ حَدِيثُ بَعْدَ اللَّهِ وَعَايَتِهِ يُؤْمِنُونَ ٦
"অতএব তারা আল্লাহ ও তার আয়াতের পর আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে”? [সূরা আল-জাসিয়াহ: (৬)]। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেছেনঃ
الَّذِينَ جُلُودُ مِنْهُ تَقْشَعِرُّ مَثَانِيَ مُتَشَابِهَا كِتَابًا الْحَدِيثِ أَحْسَنَ نَزَّلَ اللَّهُ اللَّهِ هُدَى ذَلِكَ اللَّهِ ذِكْرِ إِلَى وَقُلُوبُهُمْ جُلُودُهُمْ تَلِينُ ثُمَّ رَبَّهُمْ يَخْشَوْنَ هَادٍ مِنْ لَهُ فَمَا اللَّهُ يُضْلِلِ وَمَنْ يَشَاءُ مَنْ بِهِ يَهْدِي
আল্লাহ অবর্তীণ করেছেন সর্বোত্তম (হাদীস) বাণী সম্বলিত সামঞ্জস্য পূর্ণ একটি কিতাব যা পুনরাবৃত্তি হয়, যারা তাদের রবকে ভয় করে তাদের গা এতে শিউরে ওঠে তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে প্রতি বিনম্র হয়ে যায়; এটিই আল্লাহর হেদায়াত, তিনি যাকে চান তাকে এর দ্বারা হেদায়াত দান করেন আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন পথ প্রদর্শক নেই⁷¹। বস্তুতঃ কুরআন কারীমের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগই হাদীস বা সুন্নাত। কুরআনের
পাশাপাশি অতিরিক্ত যে ওহীর জ্ঞান বা প্রজ্ঞা আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রদান করেছিলেন, তার ভিত্তিতে তিনি কুরআনের বিভিন্ন বক্তব্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং বাস্তব জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেছেন। কুরআন ও হাদীসই আমাদের সকল জ্ঞানের ও কর্মের মূল উৎস।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেনঃ
إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَداً، كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نبيه
"আমি তোমাদের মধ্যে যা রেখে যাচ্ছি তা যদি তোমরা আঁকড়ে ধরে থাক তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, তা হলোঃ আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর হাদীস বা সুন্নাত"⁷²।
হাদীস (حديث) শব্দটিও আরবী। যার আভিধানিক অর্থ নিম্নরুপঃ
১. الكلام তথা বাণী। যেমন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا অর্থাৎ আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্য কথা (বাণী) আর কার হবে?
২. তথা সংবাদ। যেমন- هل اتك حديث الجنود فوعون وثمود অর্থাৎ আপনার কাছে সৈন্যবাহিনীর সংবাদ পৌছেছে কি? ফেরআউন ও ছামুদের?
৩. তথা নতুন। যেমন বলা হয় هذا امر حديث অর্থাৎ এটা নতুন বিষয়।
৪. তথা কাহিনী। যেমন - هل اتك حديث موسى অর্থাৎ হযরত মুসা আ. এর কাহিনী কি আপনার কাছে পৌছেনি?
৫. তথা স্বপ্ন। যেমন - و علمتنى من تاويل الاحاديث অর্থাৎ আপনি আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় হাদীস শব্দটি দ্বারা যে সকল বিষয়গুলো পাওয়া যায় তা নিম্নরূপঃ-
- কথা - বাণী - বক্তব্য - খোশ-গল্প - উপন্যাস - উপকথা - প্রচার করা
- নতুন - আধুনিক
এছাড়াও রাসূল (সা.) হাদীস শব্দটি দ্বারা যা বুঝিয়েছেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সা.) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলেন, 'সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি কে, যে কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) এর শাফায়াত লাভে ধন্য হবে?' [উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন-
لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَلا يَسْأَلُنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لَمَّا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ
অর্থঃ আমার মনে হয় এ বিষয় (হাদীস) সম্পর্কে তোমার পূর্বে আর কেউই জিজ্ঞাসা করেনি। কারণ, আমার কথা (হাদীস) শুনার জন্যে তোমাকে সর্বাধিক আগ্রহান্বিত দেখা যায়। (সহীহুল বুখারী)।
ব্যাখ্যাঃ এখানে রাসূল (সাঃ), একটি তথ্য এবং তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া কথা, বক্তব্য বা বাণীকে হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ রাসূল (সাঃ) এখানে তাঁর মুখ নিঃসৃত কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যথাযথ ভাবসহ বর্ণনা করা রূপকে হাদীস বলেছেন। তাহলে দেখা যায় যে, কুরআন ও সুন্নাহ হাদীস শব্দটি দ্বারা যখন কারো কথা, বক্তব্য বা বাণী
বুঝিয়েছে তখন ঐ কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু রূপকে বুঝিয়েছে।
তাই কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) এর হাদীস বলতে বুঝায় রাসূল (সাঃ) এর কথা, বক্তব্য বা বাণীর হুবহু, নির্ভুল বা শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উল্লেখ করা রূপকে বুঝায়। আর যেহেতু কোন ব্যক্তি তার বক্তব্যকে কাজ বা সমর্থনের মাধ্যমেও প্রকাশ করতে পারেন তাই রাসূল (সাঃ) এর কাজ বা সমর্থনের হুবহু বা নির্ভুল রূপকেও হাদীস বলা যাবে।
হাদীস শাস্ত্রে যে অর্থে হাদীস শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বিষয়টি সকল মুসলমানের ভাল করে জানা ও বুঝা দরকার। পুস্তিকার আলোচ্য বিষয়ের জন্যেও তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হাদীস শাস্ত্রে হাদীস শব্দটি একটি পরিভাষা হিসেবে নেয়া হয়েছে। আর এর অর্থ ধরা হয়েছে - রাসূল (সাঃ) এর পরের ৪ (চার) স্তরের (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও তাবে তাবে-তাবেয়ী) ঈমানের দাবিদার ব্যক্তিদের, রাসূল (সাঃ) এর কথা, কাজ বা সমর্থনের নিজ বুঝের, স্বীয় শব্দ প্রয়োগ করে উপস্থাপন করা বক্তব্য। অথবা ঐ সকল ব্যক্তি কর্তৃক তার পূর্বের স্তরের ব্যক্তির কথা, কাজ বা সমর্থনের হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উপস্থাপন করা বক্তব্য। কিন্তু কারো কথা, কাজ বা সমর্থন হুবহু উপস্থাপন করা প্রায় অসম্ভব। তাই
হাদীস শাস্ত্রে হুবহু উপস্থাপিত হওয়া হাদীসের সংখ্যা ভীষণ কম বা হাতে গনা কয়েকটি।
হাদীস শাস্ত্রের হাদীস শব্দের সংজ্ঞার মারাত্মক দুর্বলতা হাদীস শাস্ত্রের হাদীস শব্দের মারাত্মক দুটি দুর্বলতা হল-
ক. ঈমানের দাবিদার ব্যক্তি নিষ্ঠাবান মুসলিম, দুর্বল মুসলিম বা মুনাফিক হতে পারে এবং
খ. নিজ বুঝকে স্বীয় ভাষায় বর্ণনা করার সুযোগ থাকায়- মুনাফিক ব্যক্তির নিজ বানানো কথা রাসূল (সাঃ) এর কথা বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকা,
মু'মিন ব্যক্তির নিজ বুঝ ও উপস্থাপনে দুর্বলতা থাকার কারণে রাসূল (সা.) এর কথা, কাজ বা সমর্থনের ভুল উপস্থাপনের সম্ভাবনা থাকে। রাসূল (সা.) এর কথা হুবহু তথা অর, শব্দ, দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ও যতিচিহ্নসহ উপস্থাপন করার পদ্ধতিতে এ দুর্বলতা থাকে না।
হাদীসের পারিভাষিক অর্থঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম, সম্মতি, চারিত্রিক গুণগান ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যকে হাদীস বলা হয়। (তথ্যসূত্রঃ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ
নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং ৭৫)⁷³। অতএব, ইসলামী পরিভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে হাদীস বলা হয়। এক কথায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুয়াতী জীবনের সকল কথা কাজ ও অনুমোদন এবং চারিত্রিক গুনাবলী, সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য সবই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় আ-সা-র ( آثار) এবং তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় 'ফতোয়া'⁷⁴。
কারণ কুরআন ও হাদীসের মূলকে ভিত্তি করিয়াই তাঁহাদের এই সব কাজ সম্পন্ন হইত। এই তিন প্রকারের হাদীসের আরও তিনটি স্বতন্ত্র পারিভাষিক নাম রয়েছে; যথাঃ রাসূলের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মারফু; সাহাবীদের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় মওকুফ এবং তাবেয়ীদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে মাকতু হাদীস বলা হয়। অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, হাদীস বিশারদগণ হাদীস বুঝাতে যেয়ে কখনো কখনো আরও তিনটি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। তা হলোঃ- (১) আসর ( آثار) (২) খবর ( خبر) এবং (৩) সুন্নাহ্ ( السنة)। নিম্নে এ তিনটি পরিভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করা হলোঃ-
আসর ( آثار ): আরবী "আলিফ (ا), সা (ث) এবং রা (ر) বর্ণ এর সমন্বয়ে গঠিত।
আসর ( آثار ) শব্দের আভিধানিক অর্থ কোন জিনিসের এমন চিহ্ন যা তার অস্তিত্বের প্রমান দেয়। এর বহুবচন আ-সা-র। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, তোমরা আল্লাহ্ এর রহমতের চিহ্নের প্রতি লক্ষ কর। (সূরা রূম, আয়াত নং - ৬০)। তাই কোন জিনিসের চিহ্নের বাকী অংশকেও আসার বলা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, তোমরা আমার কাছে এর আগের কোন বই অথবা কোন জ্ঞানের অবশিষ্টাংশ নিয়ে এস। আসর এর পরিভাষা চার রকম পাওয়া যায়।
এক - আসার হচ্ছে হাদীসের সমার্থবোধক। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথা, কাজ ও চুপ থাকার সমষ্টির নাম আসর। তবে সাধারনতঃ এ পরিভাষাটি সম্বন্ধবাচকে ব্যবহৃত হয়। তাই আ-সা-র এর সাথে রাসূল কিংবা সাহা-বাহ্ যোগ করে আ-সা-রু'র রসূল ও আ-সা-রু'স সাহা-বাহ্ বলা হয়। এজন্য মুহাদ্দিসকে আসারীও বলা হয়।
দুই - সাহাবী এবং তাবে'ঈদের কথা, কাজ ও সমর্থনকে আসার বলা হয়।
তিন - খোরাসা-নেব ফকীহ্ গণ কেবলমাত্র সাহাবীদের হাদীসকেই আসার বলেন।
চার – আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আলী আলফারেসী বলেন, আসারটি ফকীহদের পরিভাষা। তারা এটিকে সালাফ বা পূর্ববর্তী আলেমদের বানী সম্পর্কে ব্যবহার করতেন।
আল্লামা নদভী এ প্রসঙ্গে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের হাদীসকে আসর নাম দেয়াটা হাদীস বিশারদদের পছন্দীয় অভিমত এবং এটা পূর্ববর্তী অধিকাংশ বিদ্বানদেরও পরিভাষা। এ কারনেই ইমাম ত্বাহাবী (রহঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস ও সাহাবায়ে কিরামের আ-সা-র সম্বলিত গ্রন্থের নাম রেখেছেন তাহযীবুল আ-সা-র। যদিও এ গ্রন্থটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীসের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এতে উল্লেখিত সাহাবীদের হাদীসগুলো আনুসঙ্গিকভাবে উদ্ধৃত।
খবর এর আভিধানিক এবং পারিভাষিক অর্থঃ আরবী খা (خ), বা (ب), রা (ر) হরফের সমষ্টি খবর (خبر) শব্দের আভিধানিক অর্থ সংবাদ হিসেবে কোন জিনিস আনা। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেনঃ তোমরা যা করছ তার খবর আল্লাহ্ জানেন। যা বর্ননা করা হয় এবং যা কথায় প্রকাশ করা হয় তাকে খবর (خبر) বলা হয়। (এক খবর হাদীসেরই সমার্থবোধক)। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথাবার্তা, কাজকর্ম ও অনুমোদনকেই খবর (خبر) বলা হয়।
আবার কারো মতে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে যা এসেছে তা খবর (خبر)। এ জন্যই ইতিহাস ও বিভিন্ন ঘটনাবলী চর্চাকারীকে আখবারী বা ঐতিহাসিক বলা হয়।
কারো মতে, খবর হাদীস থেকে ব্যাপক অর্থবোধক। তাই প্রত্যেকটি হাদীসই খবর কিন্তু প্রত্যেকটি খবর হাদীস নয় (ঐ)। কারন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে যা এসেছে তা কেবল হাদীস। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং অন্যান্যদের তরফ থেকে যা আসে তা খবর (خَبَرُ)।
বস্তুতঃ খবরের উৎস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাড়া কোন মুসলিম বা অমুসলিমও হতে পারে। কিন্তু হাদীসের উৎস কোন অমুসলিম হতেই পারে না। ইমাম ইবনে জরীর, হাফিয ইবনে কাসীর, ইমাম বুখারী ও হাফিয যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস ও আখবারী দুটোই। কিন্তু জুর্জী যাইদান ও গোল্ড যেহার প্রমুখ ইসলামবিদ খৃষ্টান ও ইহুদী বিদ্বানগণ কেবলমাত্র ঐতিহাসিক। তাঁরা মুহাদ্দিস মোটেই নন। সুতরাং, সাহাবায়ে কিরামের আমলকেও সুন্নাহ্ বলা হয়। কারন তাঁরা কেউই সুন্নাহ্ ছাড়া মনগড়া বিষয়ের উপর আমল করতেন না ⁷⁵。

টিকাঃ
⁷⁰ আরবী - বাংলা অভিধান, ডঃ ফজলুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৮০; আল মাওরিদ, (আরবী-ইংরেজী অভিধান) মুনির বাআলবাকী
* সূরা আয-যুমার, ৩৯/২৩
⁷² হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/১৭১, নং ৩১৮/৩১। হাকিম ও যাহাবী হাদীসটিকে 'সহীহ' বলেছেন। আরো দেখুন: আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/৯৩
⁷³ হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সানাউল্লাহ নজির আহমেদ, পৃষ্ঠা নং - ৭৫
⁷⁴ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা - ২৩
⁷⁵ রাহে আমাল – আল্লামা জলীল আহসান নদভী (রহঃ), অনুবাদঃ প্রফেসর ডঃ এ, বি, এম, সিদ্দিকুর রহমান, ভূঁইয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং- ৩৪ - ৩৫ দ্রষ্টব্য

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00