📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে কুরআনের দলিল

📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে কুরআনের দলিল


১. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা ওয়াজিব, তার বিরোধিতা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাসূলের আনুগত্য করা মূলত আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা। ইরশাদ হচ্ছেঃ
(يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَـٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْـَٔاخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾ [النساء: ٥٩]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর”।³¹
এখানে আল্লাহ তা'আলা নিজের ও তার রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদানের জন্য )وأطيعوا( ক্রিয়াটি পুনরায় উল্লেখ করেছেন। এ দিকে ইঙ্গিত করার জন্য যে, রাসূলের আনুগত্য করা এককভাবে ফরয, তার নির্দেশকে কুরআনের সামনে রেখে যাচাই করার প্রয়োজন নেই, বরং সর্বাবস্থায় তার নির্দেশ মানা ওয়াজিব, কুরআনে থাক বা নাক। ইরশাদ হচ্ছেঃ
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوٓا۟ أَعْمَـٰلَكُمْ ﴿٣٣﴾ [محمد: ٣٣]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না"। ³² অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهُ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْتُكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ۸۰ [النساء : ٨٠]
"যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করি নি"। ³³ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
( وَمَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ۷ ) [الحشر: ٧]
"রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর"। ³⁴ এ থেকে প্রমাণিত হয় হাদীস দলিল ও ইসলামী শরীয়তের পরিপূর্ণ এক উৎস।
২. কতক আয়াতে ঈমানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য, তার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ ও তার আদেশ-নিষেধকে মেনে নেয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا ٣٦ ) [الاحزاب : ٣٦]
"আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে"। ³⁵ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
( فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ٦٥ ) [النساء : ٦٥]
"অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন
দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়”³⁶। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُواْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأَوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ٥١ ) [النور : ٥١]
“মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার, মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে: 'আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম"। ³⁷ এসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা মেনে নেয়া ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ঈমানের অংশ।
৩. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস আল্লাহর পক্ষ থেকে একপ্রকার ওহী, তিনি নিজের পক্ষ থেকে শরীয়তের বিষয়ে কিছু বলেন নি। তাই তার হারাম করা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে হারাম করা। যেমন ইরশাদ হচ্ছেঃ
( وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ ٤٤ لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ٤٥ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ ٤٦ فَمَا مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَجِزِينَ ٤٧ ) [الحاقة: ٤٤، ٤٧]
"যদি সে আমার নামে কোন মিথ্যা রচনা করত, তবে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। তারপর অবশ্যই আমি তার হৃদপিণ্ডের শিরা কেটে ফেলতাম। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউই তাকে রক্ষা করার থাকত না"। ³⁸ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
(قُتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ حَتَّى يُعْطُواْ الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَغِرُونَ (۲۹)
"তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযইয়া দেয়”। ³⁹ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَلَهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ١٥٧ ) [الاعراف : ١٥٦ ]
“যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে”। ⁴⁰
এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, হাদীস আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী, তাই কুরআনের ন্যায় হাদীসও দলিল।
৪. কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের ব্যাখ্যা দানকারী এবং তিনি উম্মতকে হিকমত শিক্ষা দেন, যেমন তিনি শিক্ষা দেন কুরআন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
بِالْبَيِّنَتِ وَالزُّبُرُ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ) [النحل : ٤٤]
“এবং তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে”। ⁴¹ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) وَمَا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ٦٤ ) [النحل: ٦٤]
“আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি, শুধু এ জন্য যে, যে বিষয়ে তারা বিতর্ক করছে, তা তাদের জন্য তুমি স্পষ্ট করে দেবে এবং (এটি) হিদায়াত ও রহমত সেই কওমের জন্য যারা ঈমান আনে”। ⁴²
) وَأَنزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ ١١٣ ) [النساء : ١١٣]
“আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমত”। ⁴³ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ عَايَتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ ٣٤ ) [ الاحزاب : [٣٤
“আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়- তা তোমরা স্মরণ রেখো। ⁴⁴ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
(لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ عَايَتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ (١٦٤) [ال عمران: ١٦٤]
“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল”। ⁴⁵ আলেমগণ বলেছেনঃ এখানে হিকমত দ্বারা উদ্দেশ্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস।
ইমাম শাফে'ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে কিতাব উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ কুরআন। আমি কুরআনের এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যার প্রতি আমি সন্তুষ্ট, তিনি বলেছেন: হিকমত অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস। এখানে কুরআন উল্লেখ করে তার পশ্চাতে হিকমত উল্লেখ করা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মুমিনদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব এখানে হিকমত অর্থ হাদীস ভিন্ন অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন ও হাদীস এ দু'টি বস্তুই শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ ভালো জানেন। দ্বিতীয়ত এখানে যেরূপ কুরআনের পাশাপাশি হিকমত রয়েছে, সেরূপ আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি রাসূলের আনুগত্য মানুষের উপর ফরয করা হয়েছে। অতএব আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীস ব্যতীত অন্য কিছু ফরয বলা বৈধ নয়..."⁴⁶。
৫. কুরআনে যেসব ইবাদত ও আহকাম অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, হাদীস তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর সালাত ফরয করেছেন, কিন্তু তিনি তার সময়, রোকন ও রাকাত সংখ্যা বর্ণনা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সালাত ও প্রশিক্ষণ দ্বারা মুসলিমদের তার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি বলেছেনঃ
«صلوا كما رأيتموني أصلي» رواه البخاري.
"তোমরা সালাত আদায় কর, যেমন আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ"⁴⁷। আল্লাহ তা'আলা হাজ্ব ফরয করেছেন, কিন্তু তার মাসায়েল বর্ণনা করেন নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাসায়েল বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ
«لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ» رواه مسلم.
"তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের মাসায়েল শিখে নাও”। ⁴⁸ আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করেছেন, কিন্তু কোন্ সম্পদ, কি পরিমাণ ফসল ও কোন্ জাতীয় ব্যবসায়ী পণ্যে যাকাত ফরয হবে, তার বর্ণনা দেন নি, অনুরূপ তার প্রত্যেকটির নিসাবও বর্ণনা করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে তার পরিপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। অতএব হাদীস ব্যতীত কুরআন বুঝা অসম্ভব।
৬. কুরআনে বর্ণিত অনেক সাধারণ নীতিকে হাদীস খাস করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَدِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ١١) [النساء : ١١]
"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ"। ⁴⁹
উত্তরাধিকার বা মিরাসের ক্ষেত্রে এখানে কুরআন একটি সাধারণ নীতির বর্ণনা দিয়েছে, যা প্রত্যেক মাতা-পিতা ও তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু হাদীস খাস করে দিয়েছে যে, পিতা নবী হলে তার সম্পদের মধ্যে মিরাস প্রতিষ্ঠিত হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«نحن معاشر الأنبياء لا نورث ما تركناه صدقة» رواه مسلم.
"আমরা নবীদের জামাত, আমাদের কেউ উত্তরাধিকার হয় না, আমাদের রেখে যাওয়া সম্পদ সদকা"। ⁵⁰ আর উত্তরাধিকারী থেকে হত্যাকারীকে বাদ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«لا يرث القاتل»، رواه الترمذي وأحمد وغيرهما، وصححه الألباني.
“হত্যাকারী উত্তরাধিকার হবে না”।⁵¹ অতএব কুরআনের সাধারণ নীতি শামিল করলেও হাদীসের কারণে নবীদের সম্পদে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং সন্তান হত্যাকারী হলে পিতার সম্পদের মিরাস পাবে না।
৭. কুরআনে বর্ণিত অনেক অনির্দিষ্ট বিধানকে হাদীস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
﴿وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا﴾ [المائدة: ٣٨] (৩৮)
“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও”।⁵² এখানে হাত কাটার স্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি, হাতের কব্জি, বাহু ও ভুজ সবার উপর (يد) শব্দের প্রয়োগ হয়। কিন্তু হাদীস তা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, কব্জি থেকে হাত কাঁটা হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল তাই ছিলঃ
«أتي بسارق فقطع يده من مفصل الكف». رواه الدار قطني.
"জনৈক চোরকে উপস্থিত করা হলে তার হাত কব্জি থেকে কর্তন করা হয়"⁵³。
৮. কুরআনে বর্ণিত বিধানকে হাদীস কখনো শক্তিশালী করেছে, কখনো তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ, এসব ইবাদতের বর্ণনা যদিও কুরআনে রয়েছে, তথাপি হাদীস তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

টিকাঃ
³¹ সূরা নিসা: (৫৯)
³² সূরা মুহাম্মদ: (৩৩)
³³ সূরা আন-নিসা: (৮০)
³⁴ সূরা আল-হাশর: (৭)
³⁵ সূরা আহযাব: (৩৬)
³⁶ সূরা আন-নিসা: (৬৫)
³⁷ সূরা আন-নূর: (৫১)
³⁸ সূরা আল-হাক্কাহ: (৪৪-৪৭)
³⁹ সূরা আত-তাওবাহ: (২৯)
⁴⁰ সূরা আল-আরাফ: (১৫৭)
⁴¹ সূরা আন-নাহল: (88)
⁴² সূরা আন-নাহল: (৬৪)
⁴³ সূরা নিসা: (১১৩)
⁴⁴ সূরা আহযাব: (৩৪)
⁴⁵ সূরা আলে-ইমরান: (১৬৪)
⁴⁶ আর-রেসালা: (৭৮)
⁴⁷ বুখারী: (৫৫৭৬)
⁴⁸ মুসলিম (১২৯৭)
⁴⁹ সূরা নিসা: (১১)
⁵⁰ মুসলিম।
⁵¹ তিরমিযী ও ইমাম আহমদ প্রমুখগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আলবানি তা সহিহ বলেছেন।
⁵² সূরা আল-মায়েদা: (৩৮)
⁵³ দারা কুতনি; সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, নং ১৭২৪৮।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 কুরআনের বিধান ব্যাখাকারী হাদীসের উদাহরণ

📄 কুরআনের বিধান ব্যাখাকারী হাদীসের উদাহরণ


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
( لَا تَأْكُلُوا أَمْوَلَكُم بَيْنَكُم بِالْبَطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَرَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ ۲۹ ) [النساء : ٢٩]
"তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা"⁵⁴। এ আয়াত প্রমাণ করে পরস্পর সম্মতিতে হলে সব ধরণের ব্যবসা বৈধ ও হালাল। কিন্তু হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করে এসে দেখেন, কৃষকরা গাছের ফল উপযুক্ত হওয়ার পূর্বে বিক্রি করে দেয়, অথচ ক্রেতা ফলের পরিমাণ ও ভাল-মন্দ জানতে পারে না। যখন ফল কাঁটার মৌসুম হয়, তখন গাছে ফল না থাকলে বা কোন কারণে ধ্বংস হলে উভয়ের মাঝে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে অধিক ঠাণ্ডা, বা ফল বিনষ্টকারী গাছের রোগ বা পোকার আক্রমণের কারণে ফল ক্ষতিগ্রস্ত হলে এরূপ ঘটনা ঘটে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জাতীয় বেচাকেনা হারাম করে দেন, যতক্ষণ না ফলের আসল আকৃতি বের হয়, এবং যতক্ষণ না ক্রেতা ফলের আসল প্রকৃতি বুঝতে সক্ষম হয়। তিনি বলেনঃ
«أرأيت إذا منع الله الثمرة بم يأخذ أحدكم مال أخيه ؟» رواه البخاري ومسلم، واللفظ للبخاري.
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ, যদি আল্লাহ গাছে ফল না দেন, তাহলে কিসের বিনিময়ে তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের সম্পদ ভক্ষণ করবে"? ⁵⁵
৯. হাদীসে অনেক হুকুম রয়েছে, কুরআনে যার উল্লেখ নয়। যেমন গৃহ পালিত গাধা ও নখ বিশিষ্ট পাঞ্জা দ্বারা শিকারকারী হিংস প্রাণী
খাওয়া হারাম, অনুরূপ ফুফু ও খালার সাথে কোন নারীকে বিয়ে করা হারাম। এসব বিধান কুরআনে নেই, তাই কুরআনের পাশাপাশি হাদীস গ্রহণ না করলে ইসলাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

টিকাঃ
⁵⁴ সূরা নিসা: (২৯)
⁵⁵ বুখারী, ২১৯৮; মুসলিম, ১৫৫৫।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে হাদীসের দলিল

📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে হাদীসের দলিল


অসংখ্য হাদীস প্রমাণ করে যে, হাদীস ইসলামী শরীয়তের অকাট্য দলিল ও তার উপর আমল করা ওয়াজিব। নিম্নে আমরা তার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছিঃ
কতক হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচারিত কুরআন ও গায়রে কুরআন সব ওহীর অন্তর্ভুক্ত। তিনি যা বলেছেন, বা যার স্বীকৃতি দিয়েছেন তা আল্লাহর নির্দেশে দিয়েছেন। তাই হাদীসের উপর আমল করার অর্থ কুরআনের উপর আমল করা, রাসূলের আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য করা; আর রাসূলের নাফরমানি করার অর্থ আল্লাহর নাফরমানি করা। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
يوشك الرجل متكئا على أريكته ، يحدث بحديث من حديثي ، فيقول : بيننا وبينكم كتاب الله عز وجل ، فما وجدنا فيه من حلال استحللناه ، وما
وجـدنـا فـيـه مـن حـرام حـرمـنـاه ، ألا وإن مـا حـرم رسـول الله - صـلـى الله عـلـيـه وسـلـم - مـثـل مـا حـرم الله» رواه ابـن مـاجـة
"সেদিনে বেশী দূরে নয়, কোন ব্যক্তি তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, আমার কোন হাদীস বর্ণনা করা হবে, তখন সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মাঝে কিতাবই যথেষ্ট, তাতে যা হালাল পাব, তা হালাল মানব এবং তাতে যা হারাম পাব, তা হারাম মানব। জেনে রেখ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহর হারাম করার ন্যায়"⁵⁶。
আবু দাউদের বর্ণনায় রয়েছেঃ
ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه ، ألا يوشك رجل شبعان على أريكته يقول : عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فأحلوه وما وجدتم فيه من حرام فحرموه».
"জেনে রেখ, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ (হাদীস) দেয়া হয়েছে। জেনে রেখ, সেদিন দূরে নয়, কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তি তার চেয়ারে বসে বলবেঃ তোমরা এ কুরআনকে আঁকড়ে ধর, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল জান এবং তাতে যা
হারাম পাবে তা হারাম জান"⁵⁷। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক বাণীতে বলেনঃ
«إنما مثلي ومثل ما بعثني الله به كمثل رجل أتى قوماً فقال : يا قوم إني رأيت الجيش بعيني ، وإني أنا النذير العريان فالنجاء ، فأطاعه طائفة من قومه فأدلجوا فانطلقوا على مهلهم فنجوا ، وكذبت طائفة منهم فأصبحوا مكانهم ، فصبحهم الجيش فأهلكهم واجتاحهم ، فذلك مثل من أطاعني فاتبع ما جئت به ومثل من عصاني وكذب بما جئت به من الحق». رواه البخاري
"আমার এবং আমাকে যা দিয়ে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে তার কওমের নিকট এসে বলল: হে আমার কওম, আমার দু'চোখে আমি শত্রু বাহিনী দেখেছি, নিশ্চয় আমি স্পষ্ট সতর্ককারী, অতএব নিরাপত্তা অবলম্বন কর।
অতঃপর তার কওমের এক দল তার অনুসরণ করল, ফলে তারা বের হয়ে পড়ল ও তাদের অজান্তে জনপদ প্রস্থান করল, তারা নাজাত পেল। আর তার কওমের অপর দল তাকে মিথ্যারোপ করল, ফলে তারা নিজেদের জায়গায় ভোর করল, সকালে শত্রু বাহিনী তাদের উপর হামলা করে তাদের ধ্বংস ও সমূলে নিঃশেষ করে দিল। এ হল ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার আনুগত্য করল ও আমি
যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করল; এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে আমার নাফরমানি করল ও আমি যে সত্য নিয়ে এসেছি তা মিথ্যারোপ করল”⁵⁸। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত মারফু হাদীসে এসেছে:
« من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله .... ».
"যে আমার অনুসরণ করল সে আল্লাহর অনুসরণ করল। আর যে আমার নাফরমানি করল সে আল্লাহর নাফরমানি করল ..."⁵⁹ অপর হাদীসে এসেছেঃ
« كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى ، قالوا : يا رسول الله ومن يأبى ؟ قال : من أطاعني دخل الجنة ، ومن عصاني فقد أبي».
"আমার প্রত্যেক উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করেছে। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যে আমার নাফরমানি করল সে অস্বীকার করল”⁶⁰। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতক হাদীসে হাদীস আঁকড়ে ধরা,
"আমি তোমাদের মধ্যে দু'টি বস্তুকে রেখে দিয়েছি, তার পরবর্তীতে তোমরা গোমরাহ হবে না, আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নত। এ দু'টি বস্তু পৃথক হবে না যতক্ষণ না হাউজে কাউসারে আমার নিকট উপস্থিত হয়”⁶¹। তিনি আরো বলেছেনঃ
فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء المهديين الراشدين، تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ». رواه أبو داود
"অতএব তোমরা আমার সুন্নত ও হিদায়েত প্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধর। খুব শক্তভাবে তা আঁকড়ে ধর ও মাড়ির দাঁত দ্বারা কামড়ে ধর”⁶²। তিনি অন্যত্র বলেনঃ
"সালাত আদায় কর, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ"⁶³। অন্যত্র বলেনঃ
«خذوا عني مناسككم». رواه النسائي
"আমার থেকে তোমরা তোমাদের হজের বিধানগুলো গ্রহণ কর"⁶⁴। অন্যত্র বলেনঃ
«نضر الله امرأ سمع مقالتي فوعاها وحفظها وبلغها ، فرب حامل فقه إلى من هو أفقه ...». رواه الترمذي وغيره
"আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে তরতাজা রাখুন, যে আমার কথা শুনল, অতঃপর তা আত্মস্থ ও হিফাজত করল এবং তা পৌঁছে দিল। কখনো ফিকাহ (হাদীস) বহনকারী ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকট পৌঁছায়..."⁶⁵। অন্যত্র তিনি বলেনঃ
«إن كذبا علي ليس ككذب على أحد، من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار».
“আমার উপর মিথ্যা রচনা করা অন্য কারো উপর মিথ্যা রচনা করার মত নয়, যে আমার উপর স্বেচ্ছায় মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নام বানিয়ে নেয়⁶⁶。
তিনি অন্যত্র বলেনঃ
«لا ألفين أحدكم متكئاً على أريكته يأتيه الأمر من أمري مما أمرت به أو نهيت عنه فيقول: لا أدري ما وجدنا في كتاب الله اتبعناه ». رواه الترمذي. وقال حسن صحيح.
"তোমাদের কেউ অবশ্যই চেয়ারে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে দেখবে, যার নিকট আমার কোন বিষয় আসবে, যার আমি নির্দেশ দিয়েছি অথবা যা থেকে আমি নিষেধ করেছি; অতঃপর সে বলবে: আমরা জানি না, আল্লাহর কিতাবে যা পাব, তারই অনুসরণ করব”⁶⁷。
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে যে ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন, তা এখন বাস্তব দেখা যাচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ হাদীসকে অস্বীকার করছে, কেউ তার অংশ বিশেষকে অস্বীকার করছে।

টিকাঃ
⁵⁶ ইবনে মাজাহ, ১২।
⁵⁷ আবু দাউদ, ৪৬০৪।
⁵⁸ বুখারী, ৭২৮৩।
⁵⁹ বুখারী: (২৭৫২)
⁶⁰ বুখারী: (৬৭৬৪)
⁶¹ বায়হাকি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
⁶² আবু দাউদ ৪৬০৭。
⁶³ বুখারী, ৬৩১。
⁶⁴ নাসাঈ, ৩০৬২。
⁶⁵ তিরমিযী, ২৬৫৬。
⁶⁶ বুখারী, ১০৭。
⁶⁷ তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: হাসান ও সহিহ।

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীস অস্বীকার করার কতক অজুহাত

📄 হাদীস অস্বীকার করার কতক অজুহাত


প্রথম অজুহাত: একশ্রেণী লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা হাদীসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তাদের নিকট কুরআন ব্যতীত কোন কিছুর উপর আমল করা যাবে না। সন্দেহ নেই হাদীস অস্বীকারকারী এ শ্রেণীর লোক কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। কারণ এর মাধ্যমে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতকে অস্বীকার করেছে। তারা বিশ্বাস করেনি তিনি সন্দেহাতীত ও সত্যিকার অর্থে আল্লাহর রাসূল, যা কুরআন ও তার আয়াতকে অস্বীকার করার শামিল। এ মত পোষণকারী কয়েকটি দলঃ
এক. কট্টর রাফেযী তথা শিয়া সম্প্রদায়: তাদের নিকট সাহাবিরা সবাই কাফের, ফলে তাদের বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।
দুই. আহলে কুরআন অথবা কুরআনী সম্প্রদায়: তাদের সৃষ্টি ভারতে। এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে আহমদ খান ও আব্দুল্লাহ বকর আলাভি।
তিন. পাশ্চাত্য চিন্তা ধারায় প্রভাবিত কতক বুদ্ধিজীবী হাদীস অস্বীকার করেন, অথবা তাতে সন্দেহ পোষণ করেন।
দ্বিতীয় অজুহাত: একশ্রেণীর লোক সব হাদীসকে নয়, বরং শুধু খবরে ওয়াহেদ অস্বীকার করেন। খবরে ওয়াহেদ দ্বারা উদ্দেশ্য এক সনদে বা এক সূত্রে বর্ণিত হাদীস। কয়েকটি বিদআতি দল এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মুতাযিলা সম্প্রদায় এবং আবুল হাসান আশআরি ও আবুল মানসুর মাতুরিদির অনুসারীগণ। তারা আকিদার বিষয়ে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করেন না, যদিও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়। তাদের দাবি একাধিক সনদ ব্যতীত আমরা হাদীস গ্রহণ করব না। এ জাতীয় লোকের সংশয় নিরসন ও অজুহাতের কতক উত্তর -
এক. আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ ٦ ) [الحجرات: ٦]
"হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও”⁶⁸。
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সংবাদের সত্যতা যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং একজন ফাসেকের সংবাদ প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন। এর অর্থ আমরা একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সংবাদ গ্রহণ করব।
দুই. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুসলিমরা মসজিদে কুবায় ফজর সালাত আদায় করতে ছিলেন, একজন সংবাদ দাতা এসে বলল, কেবলা কাবার দিকে ঘুরে গেছে, ইতোপূর্বে যা বায়তুল মাকদিসের দিকে ছিল। তারা তার সংবাদ শুনে সালাতেই কেবলার দিকে ঘুরে যান। যদি একজনের সংবাদ তাদের নিকট দলিল ও আমলযোগ্য না হত, তাহলে অবশ্যই তারা দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ব্যক্তিকে স্বাক্ষীরূপে চাইত। কিন্তু তারা তৎক্ষণাৎ তার সংবাদ গ্রহণ করে প্রমাণ করেন, খবরে ওয়াহেদের উপর আমল করা জরুরী।
তিন. আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
( يَأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ٦٧ ) [المائدة: ٦٧]
“হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও”⁶⁹। এ আয়াতে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার উপর নাযিলকৃত রিসালাত পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তিনি মাত্র একজন ব্যক্তি। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের প্রেরণ করতেন। এ ক্ষেত্রে একস্থানে একজন দায়ী প্রেরণ করা সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়েছিল, লোকেরা প্রেরিত দায়ীর সংবাদ গ্রহণ করত, তাকে আল্লাহ ও
তাদের মাঝে আমানতদার জ্ঞান করত। দেখুন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তুমি তাদেরকে ইসলাম ও তাওহীদের দিকে আহ্বান কর। তিনি ছিলেন একা।
চার. যখন মদ হারাম করে আয়াত নাযিল হল, তখন তার প্রচারকারী ছিল মাত্র একজন। মদিনার লোকেরা তার সংবাদ শ্রবণ করে তাদের মদের পাত্রগুলো ভেঙে ফেলে। তারা বলেনি আমরা একজনের সংবাদ গ্রহণ করব না।
তৃতীয় অজুহাত: এক শ্রেণীর লোক বিবেক সমর্থন করে না তাই হাদীস ত্যাগ করেন। হাদীস ত্যাগ করার এ ফেতনা প্রথম যুগের বিদআতিদের থেকে সূচনা হয়, যেমন মুতাযেলা ও তাদের অনুসারী আশায়েরা প্রমুখ কয়েকটি সম্প্রদায়। তারা বিবেক সমর্থন না করার অজুহাতে অনেক হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে যেসব হাদীসে গায়েব তথা অদৃশ্যের সংবাদ রয়েছে, যেমন আল্লাহর সিফাত ও ঐসব বিষয় যা আমরা চোখে দেখি না। আশ্চর্য যা গায়েবি বিষয়, বা যা বিবেকের ঊর্ধ্বে তারা বিবেক দ্বারা কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে! আমাদের বুঝে আসে না। ঐ ফেতনা পর্যায়ক্রমে আমাদের যুগ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যখন বিবেককে খুব প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, দৃশ্য ব্যতীত অদৃশ্যকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের
বিষয় মুসলিম পরিচয়দানকারী এসব লোক কুরআন ও হাদীসের বাইরে বিবেককে প্রাধান্য দেয়ার নতুন এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে।

টিকাঃ
⁶⁸ সূরা হুজুরাত: (৬)
⁶⁹ সূরা আল-মায়েদা: (৬৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00