📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 কুরআনের উৎপত্তি

📄 কুরআনের উৎপত্তি


আরবী ব্যাকরণে কুরআন শব্দটি মাসদার তথা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি قرأ করা'আ ক্রিয়া পদ থেকে এসেছে যার অর্থ পাঠ করা বা আবৃত্তি করা। এই ক্রিয়াপদটিকেই কুরআন নামের মূল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়”। এই শব্দটির মিটার বা "মাসদার" (الوزن) হচ্ছে غفران তথা "গুফরান"। এর অর্থ হচ্ছে অতিরিক্ত ভাব, অধ্যবসায় বা কর্ম সম্পাদনার মধ্যে একাগ্রতা।
উদাহরণস্বরুপ, غفر নামক ক্রিয়ার অর্থ হচ্ছে "ক্ষমা করা"; কিন্তু এর আরেকটি মাসদার রয়েছে যার যা হলো غفران, এই মাসদারটি মূল অর্থের সাথে একত্রিত করলে দাঁড়ায় ক্ষমা করার কর্মে বিশেষ একাগ্রতা বা অতি তৎপর বা অতিরিক্ত ভাব। সেদিক থেকে কুরআন অর্থ কেবল পাঠ করা বা আবৃত্তি করা নয় বরং আরেকটি অর্থ হচ্ছে একাগ্র ভঙ্গীতে পাঠ বা আবৃত্তি করা।
কুরআনের মধ্যেও এই অর্থেই কুরআন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনের সূরা আল-কিয়ামাহ্ (৭৫ নং সূরা) ১৮ নং আয়াতে এই শব্দটি উল্লেখিত আছেঃ
فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ²²
অতঃপর, আমি যখন তা পাঠ করি (কুরা'নাহু), তখন আপনি সেই পাঠের (কুরআ'নাহ্) অনুসরণ করুন। অবশ্য এ নিয়ে সংশয় রয়েছে যে, এই শব্দটি আসলেই আরবি ভাষার মূল থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে নাকি সিরিয়াক থেকে এসেছে। এই সংশয়টি প্রথম উত্থাপন করেন জার্মান সেমিটিক বিশেষজ্ঞ থিওডর নোলদেকে। তিনি ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে Geschichte des Qorâns (কুরআনের ইতিহাস) নামীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে আরবী কুরআন শব্দটি সিরিয়াক ভাষায় ব্যবহৃত বিশেষ্য পদ qeryānā (কেরিয়ানা) থেকে এসে থাকতে পারে। সিরিয়াক ভাষার এই শব্দটি আবার সিরিয়াক ক্রিয়াপদ √q থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে যার অর্থ পাঠ করা বা আবৃত্তি করা। নোলদেকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে - "পাঠ কর"-এর মতো একটি ক্রিয়াপদ প্রাক-সেমিটীয় হতে পারে না, আমরা ধারণা করতে পারি শব্দটি আরবিতে প্রবেশ করেছে, খুব সম্ভবত উত্তরাঞ্চলের কোনো ভাষা থেকে... যেহেতু সিরিয়াক ভাষায় קרא নামক ক্রিয়া এবং "কেরিয়ানা" নামীয় একটি বিশেষ্যও রয়েছে যার অর্থ ἀνάγνωσις (পাঠ করা) এবং ἀνάγνωσμα (ভাষণ) উভয়টিই হতে পারে, এবং উপর্যুক্ত সকল
ধারণার কারণেই এই সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় যে, কুরআন আরবি ভাষার নিজসৃষ্ট কোনো শব্দ নয় যার অর্থ একই রকম হতে পারে, বরং এটি সিরিয়াক ভাষা থেকে ধার করা শব্দ হতে পারে যা ful'an ধরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকবে। এ সম্পর্কে সবচেয়ে আধুনিক মতগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রিস্টোফ লুক্সেনবার্গ কর্তৃক প্রদত্ত মত। লুক্সেনবার্গের মতে কুরআন প্রকৃতপক্ষে একটি সিরিয়াক লেকশনারী ছিলো।

টিকাঃ
²² BYU Studies, vol. 40, number 4, 2001. Page 52
সূরা আল-কিয়ামাহ্ (৭৫ নং সূরা) ১৮ নং আয়াত
Payne Smith, Jessie (Ed.) (1903). A compendious Syriac dictionary founded upon the Thesaurus Syriacus of R. Payne Smith. Oxford University Press, reprinted in 1998 by Eisenbraums. ISBN 1-57506-032-9. Page 516, 519
Now read a word such as culture "can not be the Primal Semites, we may assume that it has migrated into Arabia, and qeryānā although probably from the North ... Now the Syrian קרא next to the verb, the noun, in ἀνάγνωσις the double meaning (reading, reading aloud) and ἀνάγνωσμα (reading, reading), it gains in connection with the same Erörteten, the presumption of Wahrscheinlichkkeit that the term non-Arab Qoran is a development from the equivalent infinitives, but a borrowing from that Syria's words at the same time align with the type Fulan. "Noldeke
Christoph Luxenberg (2004) -- Die Syro-Aramäische Lesart des Koran: Ein Beitrag zur Entschlüsselung der Koransprache. Berlin: Verlag Hans Schiler. 20054 ISBN 3-89930-028-9. Page 81-84.

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 পবিত্র কুরআনের সংজ্ঞা

📄 পবিত্র কুরআনের সংজ্ঞা


মুসলমানদের মতে এটি আল্লাহর বানী বা বক্তব্য, যা ইসলামের নবী ও রাসূল মুহাম্মদের উপর আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়। তাদের মতে এটি একটি মু'জিযা বা অলৌকিক গ্রন্থ যা মানব জাতির পথনির্দেশক। মুসলমানদের বিশ্বাস, কুরআনে মানব জীবনের সকল
সমস্যার সমাধান রয়েছে এবং এটি পূর্নাংগ জীবন বিধান”²⁷। বস্তুতঃ কুরআন কারীম মানব জাতির কাছে প্রেরিত মহান আল্লাহর সর্বশেষ বাণী।
এর প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স যখন ৪০ বৎসর তখন থেকে আল্লাহ তাঁর কাছে ওহীর মাধ্যমে কুরআন প্রেরণ করতে শুরু করেন। পরবর্তী ২৩ বৎসর যাবৎ বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন মত কুরআনের বিভিন্ন সুরা ও আয়াত অবতীর্ণ করা হয়। ২৩ বৎসরে তা পরিপূর্ণরূপে অবতারিত হয়।
আল্লাহর নিকট থেকে প্রধান ফিরিশতা জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তা পরিপূর্ণভাবে মুখস্থ করে নিতেন। এরপর তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিতেন তা মুখস্থ করার জন্য এবং লিখে রাখার জন্য। এভাবে পরিপূর্ণ কুরআন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) -এর জীবদ্দশায় পৃথক পৃথক কাগজ, চামড়া, হাড় ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং অসংখ্য সাহাবী তা মুখস্থ করে নেন। তাঁর সময় থেকেই তিনি ও সাহাবীগণ সাধারণ সালাতে এবং বিশেষত রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাতে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও খতম করতেন, অর্থাৎ পরিপূর্ণ কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ পাঠ করতেন। অনেক সাহাবীই ৩ থেকে ৭ রাত্রিতে তাহাজ্জুদের সালাতে কুরআন খতম করতেন। কেউ কেউ একটু বেশি সময় ধরে
কমবেশি এক মাসের মধ্যে তাহাজ্জুদ সালাতে কুরআন খতম করতেন। এছাড়া নিজের কাছে সংরক্ষিত লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে দেখে দেখে দিবসে ও রাত্রিতে তা পাঠ করা ছিল সাহাবীগণের প্রিয়তম ইবাদত ও হৃদয়ের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি ও আনন্দের কর্ম। এভাবে মূলত মুমিনদের হৃদয়ে মুখস্থ রেখে ও নিয়মিত রাতের সালাতে (তাহাজ্জুদে) খতমের মাধ্যমেই কুরআনকে অবিকল আক্ষরিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন আল্লাহ।
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাতের পরের বৎসর খলীফা আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর সময়ে লিখিত পৃথক কাগজ, চামড়া, হাড় ইত্যাদি থেকে একত্রিত করে পুস্তকাকারে সংকলন করান। পরবর্তীকালে খলীফা উসমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে নতুন মুসলিম প্রজন্মের মানুষদের বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা ও মুখস্থ করণের সুবিধার্থে আবু বকর (রাঃ) কর্তৃক পুস্তকাকারে সংকলিত কুরআনটির বিভিন্ন অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেন। এভাবে সকল মুসলিমের প্রাত্যহিক পাঠের প্রিয়তম ধর্মগ্রন্থ হিসেবে কুরআন কারীম পরিপূর্ণ ও অবিকৃতভাবে অগণিত মানুষের হৃদয়পটে এবং পুস্তকাকারে সংরক্ষিত হয়। যেভাবে তা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর উপর অবতারিত হয়েছে আজ পর্যন্ত ঠিক তেমনিভাবে অবিকৃত ও অপরিবর্তিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সকল যুগেই লক্ষ লক্ষ মুসলিম তা পরিপূর্ণ মুখস্থ করে রেখেছেন। এ কুরআনই মানব
জাতির পথের দিশারী এবং সকল কল্যাণের উৎস। এতে রয়েছে সকল উপদেশ, শিক্ষা ও সকল আত্মিক ও মানসিক অসুস্থতার মহৌষধ।
কুরআনের বৈশিষ্ট্য কুরআন কেন্দ্রিক ঈমান, আকীদা ও জীবন গঠন সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে 'আল্লাহর কিতাবের প্রতি ঈমান' ও 'কুরআনের প্রতি ঈমান' পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করব। কুরআনই প্রত্যেক মুমিনের বিশ্বাস, ঈমান বা আকীদার মূল ভিত্তি। কুরআন কারীমে যা কিছু বলা হয়েছে তা আক্ষরিকভাবে ও সরলভাবে বিশ্বাস করাই ইসলামী আকীদার মূল ভিত্তি। কোন্ বিষয়ে বিশ্বাস করতে হবে, কিভাবে বিশ্বাস করতে হবে, কিসে বিশ্বাস নষ্ট হবে, কিসে কুফরী হবে, কিসে শিরক হবে, কিভাবে ও কি কারণে পূর্ববর্তী উম্মাতগণ ঈমান লাভ করার পরেও বিভ্রান্ত হয়েছিল, কিভাবে বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করা যায়, কিভাবে ঈমানদার ব্যক্তি জীবনযাপন করবেন, ইত্যাদি বিষয়ই হলো, কুরআন কারীমের মূল শিক্ষা।
আল-কুরআনই ইসলামী আকীদার প্রধান ও মূল উৎস। এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআনের আয়াত থেকে আক্ষরিক, সরল ও স্বাভাবিক যে অর্থ বুঝা যায় তাই আকীদার মূল উৎস, কুরআনের তাফসীর বা ব্যাখ্যা নামে পরিচিতি পরবর্তী যুগগুলির আলিমগণের মতামত।
আকীদার উৎস নয়। মহান আল্লাহ কুরআন কারীমকে সহজ ও অত্যন্ত সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন এবং তা বুঝা সহজ করেছেন বলে কুরআন কারীমে বারংবার উল্লেখ করেছেন।
সাধারণভাবে কুরআন কারীম নিজেই নিজের ব্যাখ্যা করে। এছাড়া কুরআনের ব্যাখ্যার বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হলে তাও ওহীর ব্যাখ্যা বলে গণ্য। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সাহাবী-তাবিয়ীগণের ব্যাখ্যাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদাণ করা হয়। পরবর্তী যুগের আলিমগণ তাফসীরের ক্ষেত্রে যা কিছু বলেছেন তা আলিমগণের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ, রায় বা মতামত হিসেবে পর্যালোচনার গুরুত্ব লাভ করে, কিন্তু কখনোই তা ওহীর সমতুল্য বা সম্পূরক নয় এবং তা আকীদার ভিত্তি নয়।

টিকাঃ
²⁷ আল-ইহকাম, আল-আমিদি

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 শুধু কুরআনের উপর আমল করা অসম্ভব

📄 শুধু কুরআনের উপর আমল করা অসম্ভব


গভীরভাবে চিন্তা করলে স্পষ্ট হয় যে, শুধু কুরআনের উপর নির্ভর করে শরীয়তের বিধি-বিধান বুঝা ও পালন করা সম্ভব নয়। কারণ কুরআনের অনেক মূলনীতি রয়েছে, যার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আবার অনেক আয়াত রয়েছে দুর্বোধ্য, যার তাফসীর ও স্পষ্টকরণ জরুরী। তাই কুরআন বুঝা ও তার থেকে হুকুম বের করা হাদীস ব্যতীত সম্ভব নয়। বস্তুতপক্ষে হাদীস না হলে কুরআনের অনেক বিধান অজানা থেকে যেত, বরং কুরআনের উপর আমল করা দুঃসাধ্য
হত। ইমাম ইব্‌ন হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: "কুরআনের কোথায় রয়েছে জোহর চার রাকাত, মাগরিব তিন রাকাত, এভাবে রুকু করতে হবে, এভাবে সিজদা করতে হবে, এভাবে কিরাত পাঠ করতে হবে ও এভাবে সালাম ফিরাতে হবে; আবার সিয়ামে কি ত্যাগ করতে হবে; স্বর্ণ, রূপা, বকরি, উট ও গরুর যাকাতের নিয়ম কি, তার সংখ্যা ও পরিমাণ কত; হজের মাসায়েল যেমন ওকুফে আরাফা কোন সময়, মুজদালিফা ও আরাফাতে সালাতের নিয়ম কি, পাথর নিক্ষেপ কিভাবে, ইহরামের নিয়ম কি, ইহরাম অবস্থায় কি করব; চোরের হাত কোথা থেকে কাঁটা হবে; মাহরাম হওয়ার জন্য দুধ পানের বয়স কত; কোন বস্তু ও কোন প্রাণী হারাম; যবেহ ও কুরবানির পদ্ধতি কি; হদ কায়েমের নিয়ম কি; কিভাবে তালাক পতিত হয়; বেচাকেনার নিয়ম, সুদের বিস্তারিত বর্ণনা; বিচার, ফয়সালা ও দাবি-দাওয়ার সুরাহা ইত্যাদি। অনুরূপ কসম করা, মাল জমা সঞ্চিত করা, উন্নয়ন ও আবাদ করা ইত্যাদি ফিকাহের অধ্যায়গুলো কুরআনের কোথায় রয়েছে? বরং যদি কুরআন ও আমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে আমাদের পক্ষে অসম্ভব হবে তার উপর আমল করা।
এসব বিষয় জানার একমাত্র উপায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস। এ ছাড়া উম্মতের ইজমার সংখ্যা খুব কম, অতএব হাদীসে ফিরে যাওয়া ব্যতীত কোন উপায় নেই। যদি কোন ব্যক্তি বলে: কুরআনে যা পাই
একমাত্র তাই গ্রহণ করব, অন্য কিছু নয়, তাহলে সবার ঐক্যমত্যে সে কাফের"। মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে শিখখিরকে বলা হয়েছিল: আমাদেরকে কুরআন ব্যতীত কিছু বলবেন না, তিনি বলেন: আল্লাহর কসম আমরাও তাই চাই, কিন্তু কুরআন সম্পর্কে আমাদের চেয়ে অধিক জানেন কে? ²⁸ عمران ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জনৈক ব্যক্তি বলেছিল: "তোমরা আমাদেরকে শুধু হাদীস বল, অথচ তার কোন প্রমাণ আমরা কুরআনে পাই না”, ইমরান রেগে বললেন: তুমি আহমক, তুমি কি কুরআনের কোথাও পেয়েছি জোহর চার রাকাত, তাতে আস্তে কিরাত পড়তে হবে? অতঃপর তিনি সালাত ও যাকাত ইত্যাদির কথা বলেন। তিনি বলেন: তুমি এসব বিষয় কুরআনে বিস্তারিত পেয়েছ, নিশ্চয় পাওনি, এসব বিষয় কুরআন অস্পষ্ট রেখেছে, কিন্তু হাদীস তার ব্যাখ্যা দিয়েছে”। প্রকৃতপক্ষে হাদীস থেকে যা গ্রহণ করা হয়, তার উৎস কুরআনুল কারীম ও তার মূলনীতি। আল্লাহ তা'আলা নিজ ঘোষণায় কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীসের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তাই হাদীস আঁকড়ে ধরার অর্থ কুরআন আঁকড়ে ধরা, হাদীস ত্যাগ করার অর্থ কুরআন ত্যাগ করা। সাহাবায়ে কেরাম ও আদর্শ পূর্বসূরিগণ তাই বুঝেছেন। একদা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ
لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوتَشِمَاتِ، وَالْمُتَنَمِّصَاتِ، وَالْمُتَفَلَجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ».
“আল্লাহর লানত হোক সেসব নারীদের উপর, যারা দেহাঙ্গে উল্কি উৎকীর্ণ করে এবং যারা করায়; যারা ভ্রু ছেঁছে সরু (প্লাক) করে, এবং যারা সৌন্দর্যের জন্য দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃতকারী”। এ কথা বনু আসাদ বংশের জনৈক মহিলা শুনে, যার নাম উম্মে ইয়াকুব, সে ইবনে মাসউদের নিকট এসে বলে: আমি শুনেছি আপনি অমুককে অমুককে লানত করেছেন? তিনি বললেন: আমি কেন তাকে লানত করব না, যাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন, এবং যার কথা আল্লাহর কুরআনে রয়েছে! সে বলল: আমি পূর্ণ কুরআন পড়েছি, কিন্তু আপনি যা বলেন তা তো পাই নি? তিনি বললেন: তুমি কুরআন পড়লে অবশ্যই পাইতে, তুমি কি পড়নিঃ
(وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا 7 ) [الحشر: ٧]
“আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর এবং যার থেকে তোমাদের নিষেধ করে তার থেকে বিরত থাক”। ²⁹ সে বলল:
অবশ্যই, তিনি বললেন: নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কর্ম থেকে নিষেধ করেছেন"³⁰।
এ থেকে প্রমাণিত হল যে, হাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা ও তার উপর আমল করা ওয়াজিব, এবং আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে হাদীস কুরআনের সমমর্যাদার। হাদীস থেকে বিমুখ হওয়া প্রকৃতপক্ষে কুরআন থেকে বিমুখ হওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাফরমানি করা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নাফরমানি করা।
অতএব গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকার একমাত্র পথ কুরআন ও হাদীসকে আঁকড়ে ধরা।

টিকাঃ
²⁸ অর্থাৎ আমরা কুরআনই চাই, কিন্তু আমাদের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক কুরআন জানেন, তাই কুরআন বুঝার জন্যই তার হাদীস গ্রহণ করতে হবে।
²⁹ সূরা আল-হাশর: (৭)
³⁰ বুখারী: (৪৮৮৬)

📘 হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি > 📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে কুরআনের দলিল

📄 হাদীসের প্রামাণিকতার পক্ষে কুরআনের দলিল


১. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা ওয়াজিব, তার বিরোধিতা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাসূলের আনুগত্য করা মূলত আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা। ইরশাদ হচ্ছেঃ
(يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَـٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْـَٔاخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾ [النساء: ٥٩]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর”।³¹
এখানে আল্লাহ তা'আলা নিজের ও তার রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদানের জন্য )وأطيعوا( ক্রিয়াটি পুনরায় উল্লেখ করেছেন। এ দিকে ইঙ্গিত করার জন্য যে, রাসূলের আনুগত্য করা এককভাবে ফরয, তার নির্দেশকে কুরআনের সামনে রেখে যাচাই করার প্রয়োজন নেই, বরং সর্বাবস্থায় তার নির্দেশ মানা ওয়াজিব, কুরআনে থাক বা নাক। ইরশাদ হচ্ছেঃ
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوٓا۟ أَعْمَـٰلَكُمْ ﴿٣٣﴾ [محمد: ٣٣]
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না"। ³² অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
مَّن يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهُ وَمَن تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْتُكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا ۸۰ [النساء : ٨٠]
"যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করি নি"। ³³ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
( وَمَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ۷ ) [الحشر: ٧]
"রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর"। ³⁴ এ থেকে প্রমাণিত হয় হাদীস দলিল ও ইসলামী শরীয়তের পরিপূর্ণ এক উৎস।
২. কতক আয়াতে ঈমানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য, তার ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ ও তার আদেশ-নিষেধকে মেনে নেয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا ٣٦ ) [الاحزاب : ٣٦]
"আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে"। ³⁵ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
( فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ٦٥ ) [النساء : ٦٥]
"অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন
দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়”³⁶। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُواْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأَوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ٥١ ) [النور : ٥١]
“মুমিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচার, মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে, তখন তারা বলে: 'আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম"। ³⁷ এসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফয়সালা মেনে নেয়া ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ঈমানের অংশ।
৩. কুরআনুল কারীমের কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস আল্লাহর পক্ষ থেকে একপ্রকার ওহী, তিনি নিজের পক্ষ থেকে শরীয়তের বিষয়ে কিছু বলেন নি। তাই তার হারাম করা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে হারাম করা। যেমন ইরশাদ হচ্ছেঃ
( وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ ٤٤ لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ٤٥ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ ٤٦ فَمَا مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَجِزِينَ ٤٧ ) [الحاقة: ٤٤، ٤٧]
"যদি সে আমার নামে কোন মিথ্যা রচনা করত, তবে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। তারপর অবশ্যই আমি তার হৃদপিণ্ডের শিরা কেটে ফেলতাম। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউই তাকে রক্ষা করার থাকত না"। ³⁸ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
(قُتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ حَتَّى يُعْطُواْ الْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَغِرُونَ (۲۹)
"তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযইয়া দেয়”। ³⁹ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَلَهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ١٥٧ ) [الاعراف : ١٥٦ ]
“যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃঙ্খল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে”। ⁴⁰
এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, হাদীস আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী, তাই কুরআনের ন্যায় হাদীসও দলিল।
৪. কতক আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের ব্যাখ্যা দানকারী এবং তিনি উম্মতকে হিকমত শিক্ষা দেন, যেমন তিনি শিক্ষা দেন কুরআন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
بِالْبَيِّنَتِ وَالزُّبُرُ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ) [النحل : ٤٤]
“এবং তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে”। ⁴¹ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) وَمَا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ٦٤ ) [النحل: ٦٤]
“আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি, শুধু এ জন্য যে, যে বিষয়ে তারা বিতর্ক করছে, তা তাদের জন্য তুমি স্পষ্ট করে দেবে এবং (এটি) হিদায়াত ও রহমত সেই কওমের জন্য যারা ঈমান আনে”। ⁴²
) وَأَنزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ ١١٣ ) [النساء : ١١٣]
“আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমত”। ⁴³ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
) وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ عَايَتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ ٣٤ ) [ الاحزاب : [٣٤
“আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়- তা তোমরা স্মরণ রেখো। ⁴⁴ অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
(لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ عَايَتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ (١٦٤) [ال عمران: ١٦٤]
“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল”। ⁴⁵ আলেমগণ বলেছেনঃ এখানে হিকমত দ্বারা উদ্দেশ্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস।
ইমাম শাফে'ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে কিতাব উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ কুরআন। আমি কুরআনের এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যার প্রতি আমি সন্তুষ্ট, তিনি বলেছেন: হিকমত অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস। এখানে কুরআন উল্লেখ করে তার পশ্চাতে হিকমত উল্লেখ করা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মুমিনদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব এখানে হিকমত অর্থ হাদীস ভিন্ন অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন ও হাদীস এ দু'টি বস্তুই শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ ভালো জানেন। দ্বিতীয়ত এখানে যেরূপ কুরআনের পাশাপাশি হিকমত রয়েছে, সেরূপ আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি রাসূলের আনুগত্য মানুষের উপর ফরয করা হয়েছে। অতএব আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীস ব্যতীত অন্য কিছু ফরয বলা বৈধ নয়..."⁴⁶。
৫. কুরআনে যেসব ইবাদত ও আহকাম অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, হাদীস তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের উপর সালাত ফরয করেছেন, কিন্তু তিনি তার সময়, রোকন ও রাকাত সংখ্যা বর্ণনা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সালাত ও প্রশিক্ষণ দ্বারা মুসলিমদের তার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি বলেছেনঃ
«صلوا كما رأيتموني أصلي» رواه البخاري.
"তোমরা সালাত আদায় কর, যেমন আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ"⁴⁷। আল্লাহ তা'আলা হাজ্ব ফরয করেছেন, কিন্তু তার মাসায়েল বর্ণনা করেন নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাসায়েল বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ
«لِتَأْخُذُوا مَنَاسِكَكُمْ» رواه مسلم.
"তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের মাসায়েল শিখে নাও”। ⁴⁸ আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করেছেন, কিন্তু কোন্ সম্পদ, কি পরিমাণ ফসল ও কোন্ জাতীয় ব্যবসায়ী পণ্যে যাকাত ফরয হবে, তার বর্ণনা দেন নি, অনুরূপ তার প্রত্যেকটির নিসাবও বর্ণনা করেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে তার পরিপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। অতএব হাদীস ব্যতীত কুরআন বুঝা অসম্ভব।
৬. কুরআনে বর্ণিত অনেক সাধারণ নীতিকে হাদীস খাস করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
( يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَدِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ١١) [النساء : ١١]
"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ"। ⁴⁹
উত্তরাধিকার বা মিরাসের ক্ষেত্রে এখানে কুরআন একটি সাধারণ নীতির বর্ণনা দিয়েছে, যা প্রত্যেক মাতা-পিতা ও তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু হাদীস খাস করে দিয়েছে যে, পিতা নবী হলে তার সম্পদের মধ্যে মিরাস প্রতিষ্ঠিত হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«نحن معاشر الأنبياء لا نورث ما تركناه صدقة» رواه مسلم.
"আমরা নবীদের জামাত, আমাদের কেউ উত্তরাধিকার হয় না, আমাদের রেখে যাওয়া সম্পদ সদকা"। ⁵⁰ আর উত্তরাধিকারী থেকে হত্যাকারীকে বাদ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
«لا يرث القاتل»، رواه الترمذي وأحمد وغيرهما، وصححه الألباني.
“হত্যাকারী উত্তরাধিকার হবে না”।⁵¹ অতএব কুরআনের সাধারণ নীতি শামিল করলেও হাদীসের কারণে নবীদের সম্পদে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং সন্তান হত্যাকারী হলে পিতার সম্পদের মিরাস পাবে না।
৭. কুরআনে বর্ণিত অনেক অনির্দিষ্ট বিধানকে হাদীস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
﴿وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا﴾ [المائدة: ٣٨] (৩৮)
“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও”।⁵² এখানে হাত কাটার স্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি, হাতের কব্জি, বাহু ও ভুজ সবার উপর (يد) শব্দের প্রয়োগ হয়। কিন্তু হাদীস তা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, কব্জি থেকে হাত কাঁটা হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল তাই ছিলঃ
«أتي بسارق فقطع يده من مفصل الكف». رواه الدار قطني.
"জনৈক চোরকে উপস্থিত করা হলে তার হাত কব্জি থেকে কর্তন করা হয়"⁵³。
৮. কুরআনে বর্ণিত বিধানকে হাদীস কখনো শক্তিশালী করেছে, কখনো তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ, এসব ইবাদতের বর্ণনা যদিও কুরআনে রয়েছে, তথাপি হাদীস তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

টিকাঃ
³¹ সূরা নিসা: (৫৯)
³² সূরা মুহাম্মদ: (৩৩)
³³ সূরা আন-নিসা: (৮০)
³⁴ সূরা আল-হাশর: (৭)
³⁵ সূরা আহযাব: (৩৬)
³⁶ সূরা আন-নিসা: (৬৫)
³⁷ সূরা আন-নূর: (৫১)
³⁸ সূরা আল-হাক্কাহ: (৪৪-৪৭)
³⁹ সূরা আত-তাওবাহ: (২৯)
⁴⁰ সূরা আল-আরাফ: (১৫৭)
⁴¹ সূরা আন-নাহল: (88)
⁴² সূরা আন-নাহল: (৬৪)
⁴³ সূরা নিসা: (১১৩)
⁴⁴ সূরা আহযাব: (৩৪)
⁴⁵ সূরা আলে-ইমরান: (১৬৪)
⁴⁶ আর-রেসালা: (৭৮)
⁴⁷ বুখারী: (৫৫৭৬)
⁴⁸ মুসলিম (১২৯৭)
⁴⁹ সূরা নিসা: (১১)
⁵⁰ মুসলিম।
⁵¹ তিরমিযী ও ইমাম আহমদ প্রমুখগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আলবানি তা সহিহ বলেছেন।
⁵² সূরা আল-মায়েদা: (৩৮)
⁵³ দারা কুতনি; সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, নং ১৭২৪৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00