📄 প্রারম্ভিকা
إِنَّ الْحَمْدُ للهِ ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ ، وَنَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا ، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا ، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ ، وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَريكَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি পরিপূর্ণ দ্বীন হিসাবে আমাদেরকে ইসলাম দান করেছেন, যে দ্বীনে মানুষের পক্ষ থেকে কোন সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন হয় না। সালাত ও সালাম তাঁরই রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি, যিনি আল্লাহর দ্বীনের রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করেছেন, কোথাও কোন কার্পণ্য করেননি। দ্বীন হিসাবে যা কিছু এসেছে তিনি তা উম্মতের কাছে পৌছে দিয়েছেন ও নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে গেছেন। তাঁর সাহাবায়ে কিরামের প্রতি আল্লাহর রাহমাত বর্ষিত হোক, যারা ছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর আদর্শ ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ পালনে সকলের চেয়ে অগ্রগামী। ইসলামী জীবন বিধান তত্ত্ব ও তথ্যগতভাবে দুটো মৌলিক বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত। একটি হচ্ছে
পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন। অপরটি হচ্ছে রাসূল (সাঃ) এর হাদীস।
পবিত্র কুরআন উপস্থাপন করেছে ইসলামের মূল কাঠামো আর রাসূলের হাদীস সেই কাঠামোর উপর গড়ে তুলেছে একটি পূর্নাঙ্গ ইমারত। তাই ইসলামী শরিয়াতে কুরআনের পরেই হাদীসের স্থান। প্রকৃতপক্ষে হাদীস হচ্ছে কুরআনেরই ব্যাখ্যাস্বরুপ। এজন্য ইসলামী জীবন বিধানে কুরআনের পাশাপাশি হাদীসের গুরুত্বও অনাস্বীকার্য। অতএব, একজন মুসলিমের বিশ্বাস হল- "মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বার্তাবাহক (রাসূল)।
সুতরাং বার্তাবাহককে বিশ্বাস করা মানে প্রেরিত বার্তাকে বিশ্বাস করা। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব বার্তা নিয়ে এসেছেন তা দু ধরণের- এক ধরণের বার্তা জিব্রাইল (আঃ) পড়ে শুনাতেন; তা হল কুরআন। আর এক ধরনের বার্তা পড়ে শুনানো হত না; বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ দিয়ে বের হত; তা হল হাদীস। কেননা রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ তথা হাদীস ইসলামের জ্ঞানের দ্বিতীয় মূল উৎস।
হাদীস না থাকলে ইসলামের অনেক বিষয় সঠিকভাবে যেমন বুঝা যেত না তেমনই অনেক মূল আমলও সঠিক ভাবে করা যেত না।
হাদীসের ব্যাপারে 'সহীহ হাদীস কথাটি শোনে নাই এমন মুসলমান পৃথিবীতে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে সহীহ হাদীস বলতে প্রচলিত হাদীস শাস্ত্রে কী বুঝানো হয়েছে, এ কথাটি সঠিকভাবে
জানে এমন মুসলমানের সংখ্যাও ভীষণ কম। আর 'সহীহ হাদীসের প্রচলিত অর্থটি অধিকাংশ মুসলমানের জানা না থাকার কারণে মুসলমান জাতির যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাণ নির্ণয় করা অসম্ভব। সহীহ হাদীস বলতে প্রচলিত হাদীস শাস্ত্রে কী বুঝায় বিষয়টি সঠিকভাবে না জানা পর্যন্ত, আমি নিজেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি বলে আজ পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তাই হাদীস সম্বন্ধে মানব মনে সংশয় সৃষ্টি করা নয় বরং হাদীসের ভাণ্ডার থেকে ভুল হাদীস বাদ দিয়ে নির্ভুল হাদীস গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা ও হাদীস যাচাইয়ের সহজ পন্থা উপস্থাপন করে দুনিয়া ও আখিরাতে জাতির ব্যাপক কল্যাণ করাই বর্তমান প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য।
অধিকন্তু আরও বলা যায় যে, ইসলাম মানুষের জন্য আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ ও শ্বাশত জীবন বিধান। এতে মানব কল্যাণের যাবতীয় দিক বর্ণিত হয়েছে। ইসলামী জীবনাদর্শের মূল উৎস হল আল্লাহর 'ওহী' তথা পবিত্র কোরআন ও হাদীস। আল্লাহ তায়ালা নিজেই যিক্র তথা ওহী-কে হেফাযত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, "আমিই উপদেশ (সম্বলিত কোরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষণকারী।" (সূরা আল হিজর, আয়াত ৯)। এই ঘোষণা পূর্বেকার কোন আসমানী কিতাব সম্পর্কে তিনি দেননি। ফলে সেগুলির কোন অস্তিত্ব এখন পৃথিবীতে নেই। অনেকের ধারণা 'যিক্র' বলে আল্লাহ কেবল কোরআনের
হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন, হাদীসের নেননি। একথা ঠিক নয়।
কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অনত্র বলেন, "(আজ) তোমার কাছেও কিতাব নাযিল করেছি, যাতে করে যে (শিক্ষা) মানুষদের জন্যে তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, তুমি তা তাদের সুস্পষ্টভাবে বোঝাতে পারো, যেন তারা (নিজেরাও একটু) চিন্তা ভাবনা করে"¹। আর কোরআনের ব্যাখ্যাই হল হাদীস। যা রসূল (সাঃ) নিজ ইচ্ছা মোতাবেক বলতেন না, যতক্ষণ না তাঁর কাছে 'ওহী' নাযিল হত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى "আর তিনি মনগড়া কথা বলে না।"
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়'²।
রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "জেনে রেখ! আমি কোরআন প্রাপ্ত হয়েছি ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু"³। সে বস্তুটি নিঃসন্দেহে 'হাদীস', যার অনুসরণ ব্যতীত কেউ মুমিন হতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আমি তোমার মালিকের শপথ, এরা কিছুতেই ঈমানদার
হতে পারবে না, যতোক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় তোমাকে (শর্তহীনভাবে) বিচারক মেনে নেবে, অতঃপর তুমি যা ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না, বরং তোমার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তকরণে মেনে নেবে"⁴। হযরত হাসান বিন আতিয়্যাহ বলেন, "জিব্রাইল (আঃ) সুন্নাহ (হাদীসের অপর নাম) নিয়েও নবীজির কাছে অবতরণ করতেন যেভাবে তিনি কুরআন নিয়ে অবতরণ করতেন।" সুতরাং সুন্নাহর প্রতি সকল মুসলিমের ঈমান আনা অপরিহার্য।" ইসলামের শত্রুরা অতি প্রাচীন কাল থেকে ইসলামী জ্ঞানের প্রধান দুটি উৎস কুরআন ও সুন্নাহকে বিকৃত করার জন্য যুগে যুগে অনেক প্রয়াশ চালিয়েছে। কিন্তু সে চেষ্টায় তারা কখনো সফল হয়নি। যখনি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে ইসলামী জ্ঞানের বাহক আলেম সমাজ সত্যকে মুসলমানদের সামনে দিবালোকের মত নিটোল সচ্ছভাবে তুলে ধরেছেন এবং বাতিল সব মত ও পথ থেকে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন। তাদের সেসব লেখনীকে পুঁজি করে তাদের অনুসরণে হাদীসের মর্যাদা এবং হাদীসশাস্ত্রের গ্রন্থায়ন, সংকলন ও হাদীস সংকলনে আলেমদের সতর্কতার ইতিহাস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ এ প্রবন্ধে তুলে ধরছি যেন সাধারণ মুসলিমরা এ ধরণের বিপজ্জনক ও গোমরাহীর পথ থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে পারেন।
টিকাঃ
¹ সূরা আন নাহল, আয়াত ৪৪
² সূরা নাজম ৫৩, আয়াত নং – ৩-৪
³ আবূ দাউদ, মিশকাত হা/১৬৩
⁴ সূরা আন্ নিসা, আয়াত ৬৫
📄 ওহী (الوحى) এবং হাদীস (حديث)
আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সৃষ্টির সেরা রূপে সৃষ্টি করার পরও তার পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী রাসূলগণ প্রেরণ করেছেন। তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কিছু মহান মানুষকে বেছে নিয়ে তাদের কাছে তাঁর বাণী, ওহী বা প্রত্যাদেশ (revelation) প্রেরণ করেছেন। মানুষ যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যেসব বিষয় জানতে পারেনা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা সে সকল বিষয় ওহীর মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন। এছাড়া মানুষ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে যে সকল বিষয় ভাল বা মন্দ বলে বুঝতে পারে সে সকল বিষয়েও ভাল-মন্দের পর্যায়, গুরুত্ব, পালনের উপায় ইত্যাদি তিনি ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন।
ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের সংরক্ষণ ও তার অনুসরণ ব্যতীত মানব জাতি ও মানব সভ্যতার সংরক্ষণ সম্ভব নয়। স্বার্থের সংঘাত, হানাহানি ও স্বার্থপরতা দূর করে প্রকৃত ভালবাসা, সেবা ও মানবীয় মূল্যবোধগুলির বিকাশ করতে ওহীর জ্ঞানের উপরই নির্ভর করতে হবে। বিশ্বাস, সততা, পাপ, পূণ্য, স্রষ্টা, পরকাল ইত্যাদি বিষয়ে ওহীর বাইরে মানবীয় বিবেক, অভিজ্ঞতা বা গবেষণার আলোকে যা কিছু বলা হয় সবই বিতর্ক, সংঘাত ও বিভক্তি বৃদ্ধি করে। কারণ এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত্য কখনোই ওহী ছাড়া মানবীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে জানা যায় না। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা
করলে আমরা দেখতে পাই যে, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের বিকৃতি বা বিলুপ্তির কারণেই বিভিন্ন জাতি বিভ্রান্ত হয়েছে।
মূলতঃ কুরআন হাদীসের বর্ণনা ও বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ দুটিঃ
১. অবহেলা, মুখস্ত না রাখা বা অসংরক্ষণের ফলে ওহীলব্ধ জ্ঞান বা গ্রন্থ হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
২. মানবীয় কথাকে ওহীর নামে চালানো বা ওহীর সাথে মানবীয় কথা বা জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটানো*।
প্রথম পর্যায়ে ওহীর জ্ঞান একেবারে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী নামে কিছু জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে, যার মধ্যে মানবীয় জ্ঞান ভিত্তিক কথাও সংরক্ষিত থাকে। কোন কথাটি ওহী বা কোন কথাটি মানবীয় তা জানার বা পৃথক করার কোনো উপায় থাকেনা। ফলে 'ওহী' নামে সংরক্ষিত গ্রন্থ বা জ্ঞান মূল্যহীন হয়ে যায়।
পূর্ববর্তী অধিকাংশ জাতি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ওহীর জ্ঞানকে বিকৃত করেছে। ইহুদী, খ্রীস্টান ও অন্যান্য অধিকাংশ ধর্মাবলম্বীদের নিকট
টিকাঃ
* ডঃ খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ ১১-১৫
📄 ওহী নাযিল হওয়ার ধরন
‘ধর্মগ্রন্থ’, Divine Scripture ইত্যাদি নামে কিছু গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। যেগুলির মধ্যে অগণিত মানবীয় কথা, বর্ণনা ও মতামত সংমিশ্রিত রয়েছে। ওহী ও মানবীয় কথাকে পৃথক করার কোনো পথ নেই এবং সেগুলো থেকে ওহীর শিক্ষা নির্ভেজালভাবে উদ্ধার করার কোনো পথ নেই। ‘ওহী’ (أوحى) অর্থ ইশারা করা, কিছু লিখে পাঠানো, কোন কথা সহ লোক পাঠানো, গোপনে অপরের সাথে কথা বলা, অপরের অজ্ঞাতসারে কোন লোককে কিছু জানিয়ে দেয়া। ওহী প্রসঙ্গে শায়খ আবুদুল্লাহ শারকাভী বলেছেন- ‘ওহী’ অর্থ জানাইয়া দেয়া। আর শরীয়তের পরিভাষায় ওহী হল- ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তার নবীগণকে কোন বিষয় বলে দেয়া বা ফেরেশতা পাঠান কিংবা স্বপ্ন যোগে অথবা ইলহামের সাহায্যে জানিয়ে দেয়া। এই শব্দটি ‘আদেশ দান’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়’⁶।
রাসুলে করীম (সঃ) এর নিকট বিভিন্ন ভাবে ওহী নাযিল হত। ওহী নাযিল হওয়ার ধরনগুলো নিম্নরূপ আলোচনা করা হলোঃ-
১। সত্য স্বপ্নঃ নবুয়ত লাভের প্রথম পর্যায়ে নবী করীম (সঃ) স্বপ্ন দেখতে পেতেন এবং তার এ স্বপ্ন বাস্তবে হুবহু মিলে যেতো। এই
স্বপ্নগুলো ছিল অত্যন্ত ভালো। এখানে সহীহুল বুখারীর হাদীসটি উল্লেখ করা যায়। হাদীসটি নিম্নরূপঃ
হদ্দাসানা ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর, ক্বালা হাদ্দাসানা আল-লাইস, আন উক্বাইল, আন ইবনি শিহাব, আন উরওয়াতা ইবনু যুবাইর, আন আয়েশা উম্মিল মু'মিনীন, আন্নাহা ক্বলাত আওওয়ালা মা বুদিয়া বিহী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনাল ওয়াহ্য়ীর্ রুইয়াস সালিহাতু ফিন নাউমি, ফাকানা লা ইয়ারা রুইয়া ইল্লা জাআত মিছলা ফালাক্বিস সুব্হি, ছুম্মা হুববিবা ইলাইহিল খালাউ, ওয়াকানা ইয়াখলু বিগারি হিরাইন ফাইয়াতাহান্নাছু ফিহি - ওয়াহুয়াত তাবুদু - আল-লায়ালিয়া যাওয়াাতিল আদাদি ক্ববলা আন ইয়ানযিয়া ইলা আহলিহি, ওয়া ইয়াতাযাওওয়াদু লিযালিকা, ছুম্মা ইয়ারজিউ ইলা খাদিজাতা, ফাইয়াথাযাওওয়াদু লিমিছলিহা, হাত্তা জাআহু আল-হাক্কু ওয়াহুয়া ফি গারি হিরাইন, ফাজাআহু আল-মালাকু ফাক্বালা ইকরা।
ক্বলা "মা আনা বিক্বারি"। ক্বলা "ফাআখাযানি ফাগাত্তনি হাত্তা বালাগ মিন্নিল জাহদা ছুম্মা আরসালানি ফাক্বলা ইকরা। ক্বুলতু মা আনা বিক্বারি। ফাআখাযানি ফাগাত্তনাস সানিয়াতা হাত্তা বালাগ মিন্নিল জাহদা ছুম্মা আরসালানি ফাক্বলা ইকরা ফাক্বুলতু মা আনা বিক্বারি। ফাআখাযানি ফাগাত্তনি সসালিছা, ছুম্মা আরসালানি ফাক্বলা ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক * খালাক আল-ইনসানা মিন আলাক * ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম}"। ফরাজাআ বিহা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ারজুফু ফুয়া দুহু, ফাদাখালা আলা খাদিজাতা বিনতু খুওয়াইলিদিন রাদিয়াল্লাহু আনহা ফাক্বলা "যাম্মিলুনি যাম্মিলুনি"। ফাযাম্মালুহু হাত্তা যাহাবা আনহুর রাউউ, ফাক্বলা লি খাদিজাতা
ওয়া আখবারাহাল খাবারা "লাক্বাদ খাশিয়তু আলা নাফসি"। ফাক্বলাত খাদিজাতু কাল্লা ওয়াল্লাহি মা ইউখযিকাল্লাহু আবাদান, ইন্নাকা লাতাসিলুর রাহিমা, ওয়া তাহমিলুল কাল্লা, ওয়া তাকসিবুল মা'দুমা, ওয়া তাক্বরিদ দ্দাইফা, ওয়া তুঈনু আলা নাওয়ায়বিল হাক্কি ফানত্বলাক্বাত বিহী খাদিজাতু হাত্তা আতাত বিহি ওয়ারাক্বাতা বনাউফালিবনি আসাদিবনি আবদুল উজজা ইবনা আম্মি খাদিজাতা - ওয়াকানা ইমরআন তানাচ্ছরা ফিল জাহেলিয়াতি, ওয়াকানা ইয়াকতুবুল কিতাবাল ইবরানিয়্যা, ফাইয়াকতুবু মিনাল ইনজিলি বিল ইবরানিয়্যাতি মা শাআল্লাহু আন ইয়াকতুব, ওয়াকানা শাইয়ান কাবিরান ক্বাদ আমিয়া - ফাক্বলাত লাহু খাদিজাতু ইয়া ইবনা আম্মি ইসমাউ মিনাবনি আখিক। ফাক্বলা লাহু ওয়ারাক্বাতু ইয়া ইবনা আখি মাযা
تَرَى فَأَخْبَرَهُ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم خَبَرَ مَا رَأَى. فَقَالَ لَهُ وَرَقَةً هَذَا النَّامُوسُ الَّذِي نَزَّلَ اللَّهُ عَلَى مُوسَى صلى الله عليه وسلم يا لَيْتَنِي فِيهَا جَذَعًا، لَيْتَنِي أَكُونُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " أَوَمُخْرِجِيَّ هُمْ ". قَالَ نَعَمْ، لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَا جِئْتَ بِهِ إِلَّا عُودِيَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِي يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًا مُؤَزِّرًا. ثُمَّ لَمْ يَنْشَبْ وَرَقَةُ أَنْ تُوُفِِّيَ وَفَتَرَ الْوَحْيُ
ইয়াহইয়া ইব্ন বুকায়র (রহঃ) ......... আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনি 'হেরা' গুহায় নির্জনে থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ......... এইভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তারপর খাদীজা (রাঃ) -র কাছে ফিরে এসে আবার অনুরূপ সময়ের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন। এমনিভাবে 'হেরা' গুহায় অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে ওহী এলো। তাঁর কাছে ফিরিশতা এসে বললেন, 'পড়ুন'। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেনঃ "আমি বললাম, 'আমি পড়িনা'। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হলো। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে
বললেন, ‘পড়ুন’। আমি বললামঃ আমিতো পড়ি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হলো। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ ‘পড়ুন’। আমি জবাব দিলাম, ‘আমিতো পাড়ি না’ – রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন। তারপর তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন।
এরপর ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ুন আর আপনার রব মহামহিমান্বিত।” (৯৬: ১-৩)। তারপর এ আয়াত নিয়ে ররাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ফিরে এলেন। তাঁর অন্তর তখন কাঁপছিল।
তিনি খাদীজা এর কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও।’ তাঁরা তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর ভয় দূর হলো। তখন তিনি খাদীজা (রাঃ) এর কাছে সকল ঘটনা জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি নিজের উপর আশংকা বোধ করছি। খাদীজা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম, কখখনো না। আল্লাহ্ আপনাকে কখখনো অপমানিত করবেন না।
আপনিতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। এরপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নাওফিল ইব্ন ‘আবদুল আসাদ ইব্ন ‘আবদুল ‘উযযার কাছে গেলেন, যিনি জাহিলী যুগে ‘ঈসায়’ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
ইবরানী ভাষা লিখতে জানতেন এবং আল্লাহ্ তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইনজীল থেকে অনুবাদ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাঁকে বললেন, 'হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা! তুমি কী দেখ?' রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) যা দেখেছিলেন, সবই খুলে বললেন। তখন ওয়ারাকা তাঁকে বললেন, 'ইনি সে দূত যাঁকে আল্লাহ্ মূসা (আঃ) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন।
আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে।' রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেনঃ তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অতীতে যিনিই তোমার মত কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব।' এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা (রাঃ) ইন্তিকাল করেন। আর ওহী স্থগিত থাকে।*
২। দিল বা মনের পটে উদ্রেক হওয়াঃ রাসূল (সাঃ) এ সম্মন্ধে বলেছেন-"জিবরাঈল ফেরেশতা আমার মনের পটে এই কথা ফুঁকে
দিলেন যে নির্দিষ্ট রিযিক পূর্ণ রূপে গ্রহণ করার ও নির্দিষ্ট আয়ুষ্কালপূর্ণ হওয়ার আগে কোন প্রাণীই মরতে পারে না"⁹。
৩। ঘন্টা ধ্বনির মত শব্দে ওহী নাযিল হওয়াঃ
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ - رضى الله عنها - أَنَّ الْحَارِثِ بْنَ هِشَامٍ - رضى الله عنه - سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولٌ أَحْيَانًا "اللَّهِ كَيْفَ يَأْتِيكَ الْوَحْيُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَأْتِينِي مِثْلَ صَلْصَلَةِ الْجَرَسِ - وَهُوَ أَشَدُّهُ عَلَيَّ - فَيُفْصَمُ عَنِّي وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ، وَأَحْيَانًا يَتَمَثَّلُ لِيَ الْمَلَكُ رَجُلاً فَيُكَلِّمُنِي فَأَعِي مَا يَقُولُ ". قَالَتْ عَائِشَةُ رضى الله عنها وَلَقَدْ رَأَيْتُهُ يَنْزِلُ عَلَيْهِ الْوَحْيُ فِي الْيَوْمِ الشَّدِيدِ الْبَرْدِ، فَيَفْصِمُ عَنْهُ وَإِنَّ جَبِينَهُ لَيَتَفَصَّدُ عَرَقًا
আবদুল্লাহ্ ইব্ন ইউসুফ (রহঃ)....... 'আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হারিস ইব্ন হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আপনার প্রতি ওহী কিভাবে আসে? রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেনঃ কোন সময় তা ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচাইতে কষ্টদায়ক হয় এবং তা সমাপ্ত হতেই ফিরিশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই, আবার কখনো ফিরিশতা মানুষের আকৃতিতে আমার সঙ্গে কথা বলে। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে ফেলি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি
প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘام ঝরে পড়ত। (তথ্যসূত্রঃ সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, অধ্যায় ১, হাদীস নং ২, ওহীর সূচনা অধ্যায়)¹⁰。
৪। ব্যক্তি বেশেঃ এ প্রসংগে রাসুল (সাঃ) বলেছেন- “কখনও ফেরেশতা কোন ব্যক্তির রূপ ধারণ করে আমার নিকট আসেন, তিনি আমার সাথে কথা বলেন এবং যা বলেন তা আমি ঠিকভাবে আয়ত্ত করে নেই"¹¹। সুতরাং, ব্যক্তি বেশে জিবরাঈল (আঃ) বেশির ভাগ সময় হযরত দাহিয়া কালবী নামক সাহাবীর রূপ ধরে আসতেন। ফেরেশতা কেন দাহিয়া কালবীর রূপ ধারণ করতেন এর কারণ বলতে গিয়ে আল্লামা বদর উদ্দীন আইনী লিখেছেন-“অন্যান্য সাহাবীদের পরিবর্তে বিশেষভাবে দাহিয়া কালবীর রূপ ধারণ করে ফেরেশতার আগমন করার কারণ এই যে, তিনিই সে সময়ের লোকদের মধ্যে সর্বাধিক সুশ্রী ও সুন্দর চেহারা বিশিষ্ট ছিলেন”¹²। হাদীসে জিবরাঈল এর শ্রেষ্ঠতম উদাহরন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ
وَحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، جَمِيعًا عَنِ ابْنِ عُلَيَّةً، قَالَ زُهَيْرُ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ أَبِي حَيَّانَ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ بْنِ عَمْرِو بْنِ جَرِيرٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمًا بَارِزًا لِلنَّاسِ فَأَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْإِيمَانُ
قَالَ " أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكِتَابِهِ وَلِقَائِهِ وَرُسُلِهِ وَتُؤْمِنَ بِالْبَعْثِ الْآخِرِ " . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الإِسْلَامُ قَالَ " الْإِسْلَامُ أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ وَلَا تُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَتُقِيمَ الصَّلاةَ الْمَكْتُوبَةَ وَتُؤَدِّيَ الزَّكَاةَ الْمَفْرُوضَةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ " . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الإِحْسَانُ قَالَ " أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنَّكَ إِنْ لَا تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ " . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى السَّاعَةُ قَالَ " مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ وَلَكِنْ سَأُحَدِّثُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا إِذَا وَلَدَتِ الْأَمَةُ رَبِّهَا فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا وَإِذَا كَانَتِ الْعُرَاةُ الْحُفَاةُ رُءُوسَ النَّاسِ فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا وَإِذَا تَطَاوَلَ رِعَاءُ الْبَهْمِ فِي الْبُنْيَانِ فَذَاكَ مِنْ أَشْرَاطِهَا فِي خَمْسٍ لَا يَعْلَمُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ " . ثُمَّ تَلا صلى الله عليه وسلم { إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} " . قَالَ ثُمَّ أَدْبَرَ الرَّجُلُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " رُدُّوا عَلَى الرَّجُلَ " . فَأَخَذُوا لِيَرُدُّوهُ فَلَمْ يَرَوْا شَيْئًا . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " هَذَا جِبْرِيلُ جَاءَ لِيُعَلِّمَ النَّاسَ دِينَهُمْ "
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের মজলিসে হাজির হলেন। তার পরনের পোশাক ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুল ছিল কুচকুচে কালো। তার মধ্যে সফরের কোন আলামত দেখা যাচ্ছিল না এবং আমাদের মধ্যে কেউ তাকে চিনতেও পারছিল না। তিনি এসেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে
বসলেন এবং নিজের দুই হাটু তাঁর দুই হাটুর সাথে মিলিয়ে এবং তাঁর দুই হাত নিজের দুই উরুর উপর রেখে বললেনঃ "হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "ইসলাম হচ্ছে তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমজান মাসের সাওম পালন করবে এবং হজ্জে যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করবে।" আগন্তক বললেনঃ "আপনি ঠিক বলেছেন।"
(উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন) তাঁর এ আচরণে আমরা বিস্মিত হলাম, তিনি নবীর কাছে প্রশ্ন করছেন আবার তাঁর জবাব তিনি নিজেই সত্যায়ন করছেন। আগন্তুক ব্যক্তিটি আবার বললেনঃ "আমাকে ইমান সম্পর্কে বলুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "ইমান হল আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, পরকালের প্রতি এবং তাকদীরের ভালমন্দের প্রতি তোমার বিশ্বাস স্থাপন করা।" আগন্তক বললেন, "আপনি সত্যই বলেছেন।" আগন্তক ব্যক্তিটি আবার বললেনঃ "আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তুমি তাকে নাও দেখতে পাও তবে মনে কর যে তিনি
তোমাকে দেখছেন।" আগন্তক আবার বললেনঃ "আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারীর চাইতে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি জানেন না।" আগন্তক বললেনঃ "তাহলে আমাকে এর আলামত সম্পর্কে বলুন।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "ক্রীতদাসীরা তাদের মনিবকে প্রসব করবে এবং তুমি খালি পা ও নগ্নদেহ গরীব মেষ রাখালদেরকে সুউচ্চ দালান কোঠা নির্মাণ করতে দেখবে এবং তা নিয়ে গর্ব করতে দেখবে।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "অতপর আগন্তক চলে গেলেন এবং আমি অবাক হয়ে অনেকক্ষণ সেখানে কাটালাম।" অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেনঃ "হে উমর! তুমি কি জান, প্রশ্নকারী কে"? আমি বললামঃ "আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-ই অধিক জানেন।" তিনি বললেনঃ "তিনি ছিলেন জিবরাঈল, তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি এসেছিলেন "¹³。
৫। জিবরাঈল (আঃ) এর নিজস্ব আকৃতিতেঃ এ সম্পর্কে রাসূলে করীম (সঃ) বলেছেন- "আমি পথ চলছিলাম হঠাৎ উর্ধ্বদিক হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেই ফেরেশতা যিনি ইতোপূর্বে হেরার গুহায় আমার নিকট এসেছিলেম, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে
একটি আসনে উপবিষ্ট। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা সূরা মুদাসসির নাযিল করেন।” হাদীসটি নিম্নরূপঃ
قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَأَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ الْأَنْصَارِيُّ، قَالَ - وَهُوَ يُحَدِّثُ عَنْ فَتْرَةِ الْوَحْيِ، فَقَالَ - فِي حَدِيثِهِ " بَيْنَا أَنَا أَمْشِي، إِذْ سَمِعْتُ صَوْتًا، مِنَ السَّمَاءِ، فَرَفَعْتُ بَصَرِي فَإِذَا الْمَلَكُ الَّذِي جَاءَنِي بِحِرَاءٍ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِيُّ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، فَرُعِبْتُ مِنْهُ، فَرَجَعْتُ فَقُلْتُ زَمِّلُونِي. فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ * قُمْ فَأَنْذِرْ إِلَى قَوْلِهِ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ فَحَمِيَ الْوَحْيُ وَتَتَابَعَ ". تَابَعَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ وَأَبُو صَالِحٍ وَتَابَعَهُ هِلَالُ بْنُ رَدَّادٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ. وَقَالَ يُونُس وَمَعْمَرٌ " بَوَادِرُهُ "
ইব্ন শিহাব (রাঃ) ......... জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ আনসারী (রাঃ) ওহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেনঃ একদা আমি হেঁটে চলেছি, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়ায শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, সেই ফিরিশতা, যিনি হেরায় আমার কাছে এসেছিলেন, আসমান ও যমীনের মাঝখানে একটি কুরসীতে বসে আছেন। এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তৎক্ষণাৎ আমি ফিরে এসে বললাম, 'আমাকে বস্ত্রাবৃত কর।' তারপর আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করলেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠুন, সতর্কবাণী প্রচার করুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন।"
(৭৪: ১-৪) এরপর ব্যাপকভাবে পর পর ওহী নাযিল হতে লাগল। আবদুল্লাহ্ ইব্ন ইউসুফ (রহঃ) ও আবু সালেহ্ (রহঃ) অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হেলাল ইন্ন রাদ্দাদ (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
৬। পর্দার অন্তরালঃ পর্দার অন্তরাল থেকে রাসূলে করীম (সঃ) এর সাথে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার কথা বলা এবং ওহী নাযিল করা- এই প্রকার ওহী নাযিলের ব্যাপারে কোন মধ্যস্থতাকারী অর্থাৎ ফেরেশতার দরকার হয় না। আল্লাহ তায়ালা সরাসরি তাঁর রাসূলকে পর্দার অন্তরাল থেকে ওহী নাযিল করেন। এ প্রসংগে পবিত্র কোরআন এ বলা হয়েছে- "আল্লাহ কোন লোকের সাথে কথা বলেন না, তবে তিনি ওহী নাযিল করেন কিংবা পর্দার অন্তরাল হতে কথা বলেন।” (সুরা আশশুরা, ৫১)। সুতরাং, ওহী সম্মন্ধে আলোচনা করার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, আসলে হাদীসও কি ওহী? এ সম্পর্কে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম তার হাদীস সংকলনের ইতিহাসের ৬২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- "আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবীর প্রতি যে ওহী নাযিল করেছেন, তাই হচ্ছে হাদীসের মূল উৎস। আল্লাহ প্রেরিত ওহী প্রধানত দুই প্রকারের- প্রথম প্রকারের ওহীকে বলে ওহীয়ে মাতলু - সাধারণ পঠিতব্য ওহী, যাকে ওহীয়ে জ্বলীও বলে। আর দ্বিতীয় প্রকারের ওহীকে 'ওহীয়ে গায়রে মাতলু' বলে। এটা সাধারণত তেলাওয়াত করা হয় না। যার অপর নাম 'ওহীয়ে খফ'
প্রচ্ছন্ন ওহী। যা হতে জ্ঞান লাভ করার সুত্র এবং এ সুত্রে লব্ধ জ্ঞান উভয়ই বুঝানো হয়।” আমরা জানি কোরআনের পরই হাদীসের স্থান। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন- “হে নবী! আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং তুমি যা জানতে না তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। এই আয়াতে উল্লেখিত আল-কিতাব অর্থ কোরআন মজীদ এবং হিকমত অর্থ সুন্নাত বা হাদীসে রাসূল (এবং এ উভয় জিনিসই আল্লহর নিকট হতে আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ”)। এখন নিশ্চয়ই বুঝা গেল হাদীসও এক প্রকার ওহী।
টিকাঃ
⁶ হাদীসের পরিচয়, যিলহজ আলী, সুহৃদ প্রকাশন, পৃষ্ঠা নং- ২৫
⁷ হাদীস সংকলনের ইতিহাস - মওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং- ৫১
* সহীহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ১ :: হাদীস ৩
⁹ হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মওলানা আব্দুর রহীম, পৃঃ ৫০
¹⁰ সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, অধ্যায় ১, হাদীস নং ২, ওহীর সূচনা অধ্যায়
¹¹ সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, ১ম পৃঃ
¹² হাদীস সংকলনের ইতিহাস, মাওলানা আব্দুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, পৃষ্ঠা নং- ৫৪।
¹³ কিতাবুল ঈমান অধ্যায় :: সহিহ মুসলিম :: খন্ড ১ :: হাদীস ৪
📄 ওহীর প্রকারভেদ
বস্তুতঃ আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর নিকট যে ওহী পাঠাতেন তা ছিল দু প্রকারের। প্রথম প্রকার ওহী কুরআন, যা তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো শব্দ ও অর্থসহ আক্ষরিকভাবে মুখস্থ করতেন, সাহাবীদেরকে মুখস্থ করাতেন এবং লিখাতেন। দ্বিতীয় প্রকার ওহীর মূল অর্থ, 'জ্ঞান' বা 'প্রজ্ঞা' আল্লাহ তাঁর উপর নাযিল করতেন। তিনি নিজের ভাষায় তা সাহাবীদেরকে বলতেন, শিক্ষা দিতেন, মুখস্থ করাতেন এবং কখনো কখনো লিখাতেন। কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে প্রথম প্রকার ওহীকে 'কিতাব' বা গ্রন্থ এবং দ্বিতীয় প্রকার ওহীকে 'হিকমাহ' বা প্রজ্ঞা বলে অভিহিত করা হয়েছে। একস্থানে মহান আল্লাহ বলেনঃ
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্য অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাঁর আয়াত তাদের নিকট আবৃত্তি করেন, তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং কিতাব ও হিকমাহ তাদেরকে শিক্ষা দেন, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যেই ছিল।”¹⁴。
সুতরাং, এই পুস্তক বা কিতাব হলো কুরআন করীম, যা হুবহু ওহীর শব্দে ও বাক্যে সংকলিত হয়েছে। আর হিকমাহ বা প্রজ্ঞা হলো ওহীর মাধ্যমে প্রদত্ত অতিরিক্ত প্রায়োগিক জ্ঞান যা হাদীস নামে সংকলিত হয়েছে। কাজেই ইসলামে ওহী দুই প্রকারঃ কুরআন ও হাদীস। ইসলামের এই দুই মূল উৎসকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওহীর জ্ঞানকে হুবহু নির্ভেজালভাবে সংরক্ষণের জন্য একদিকে কুরআন ও হাদীসকে হুবহু শাব্দিকভাবে মুখস্ত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় এমন কোনো কথাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে¹⁵। যেসব কথা আল্লাহ ও তাঁর
টিকাঃ
¹⁴ সূরা (৩) আল-ইমরান: ১৬৪ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা বাকারা: ১২৯, ১৫১, ২৩১ আয়াত; সূরা নিসা: ১১৩ আয়াত; সূরা আহযাব ৩৪ আয়াত; সূরা জুমুআহ ২ আয়াত
¹⁵ হাদীসের নামে জালিয়াতি : ডঃ আব্দুল্লাহ খন্দকার জাহাঙ্গীর, পৃষ্ঠা নং – ১৯