📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


পরিশেষে বলতে হয়, ইসলামের ইতিহাস শুরু থেকে নানা মতবাদ আর বিসংবাদে মুসলিম উম্মাহ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, তবুও মুসলিম উম্মাহর নৈতিক আদর্শসমূহ, মৌল নীতিসমূহ কখনই ভ্রষ্টতার করালগ্রাসে হারিয়ে যায় নি। বরং সমস্ত আক্রমণ থেকে ইসলামের মৌল নীতিসমূহ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় রক্ষা পেয়েছে। সালাফে সালেহীন এবং মুহাদ্দিছ ওলামায়ে কেরামের সমাবেশে প্রচেষ্টায় দ্বীনের বিশুদ্ধ ভিত্তি সর্বযুগে অব্যাহতভাবে অটুট ছিল, আজও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যত নতুন নতুন মতবাদের ভিড় জমুক না কেন, তা টিকে থাকতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। এটাই ঐতিহাসিক সত্য।
আলোচ্য বইয়ে হাদীছ অস্বীকারকারীদের ২৫টি সংশয় খণ্ডনে যে পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে হাদীছের প্রামাণিকতা সম্পর্কে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা নয়। এরপরও জানা প্রয়োজন যে, প্রতিটি বিষয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের অবতারণা এবং প্রতিটি বিশ্বাসকে যুক্তি ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানের আলোকে পরীক্ষা করার চেষ্টা কেবল সন্দেহের উপর সন্দেহই বৃদ্ধি করে। কোন সুস্থ চিন্তার বিকাশ ঘটায় না। আস্থাহীনতা এবং চঞ্চলতায় আত্মহারা হওয়া ছাড়া এতে বিশেষ কোন লাভ হয় না এবং মূল উদ্দেশ্য তথা সত্যের মুখোমুখিও হওয়া যায় না। আর সন্দেহ-সংশয় তো অবিশ্বাসীদের প্রাচীনতম রোগ। যে রোগের নিরাময় ইলমুল ইয়াক্বীন বা সুনিশ্চিত জ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস ছাড়া অর্জিত হয় না। ঠিক তেমনি রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ সংরক্ষণের জন্য লক্ষ লক্ষ মুহাদ্দিছীনে কেরাম যে অতুলনীয় ইলমী প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা যাদের নেই, তাদের প্রচেষ্টাকে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকৃতি দেয়ার মত শুদ্ধ অন্তর যাদের নেই, সর্বোপরি আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করবেন, এর প্রতি যাদের বিশ্বাস নেই, তারা পরিষ্কারভাবে অন্তরের রোগে রোগাক্রান্ত, যার কোন নিরাময় নেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কুরআন ও হাদীছ মুসলমানদের নিশ্চিত বিশ্বাসের জায়গা। এখানে পশ্চিমা দর্শনের সমালোচনামূলক মনোভাব (Critical Approach) খাটে না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেমন তারা ক্রিটিকাল হওয়ার চেষ্টা চালায় সেটা দুনিয়াবী সকল ক্ষেত্রে পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর দেয়া বিধানের উপর নয়। আল্লাহর বিধান শাশ্বত, অপরিবর্তনশীল। তা বুঝতে হয়ত আমরা কখনও ভুল করতে পারি, কিন্তু তাতে সত্যের অবস্থান নড়চড় হয় না। কোন জিনিস সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর তা 'মানবীয় প্রচেষ্টা' মনে করে তার অবস্থানকে দূর্বল করার চেষ্টা করা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এতে কোন জ্ঞানও নেই, সততাও নেই। আছে কেবল শঠতা এবং হঠকারিতা। এজন্যই দেখা যায় যারা হাদীছ সংকলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত কুরআন সংকলনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মূলতঃ তাদের উদ্দেশ্য তা-ই- ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইসলামের বিধি-বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
সর্বোপরি উপরোক্ত পর্যালোচনাসমূহের আলোকে গবেষকদের উপকারার্থে আমরা কিছু ফলাফল এবং প্রস্তাবনা এখানে উল্লেখ করব।
ক. ফলাফল:
(১) ইসলামী শরী'আতের মূল দু'টি উৎস হ'ল কুরআন ও হাদীছ। কুরআন হ'ল ইসলামী শরী'আতের প্রধান উৎস এবং হাদীছ হ'ল দ্বিতীয় উৎস যা কুরআনের মতই আল্লাহ্র অহী হিসাবে পরিগণিত এবং কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে সংরক্ষিত। উভয়ই পরস্পরের পরিপূরک। একটি অপরটি থেকে কোন অবস্থাতেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়।
(২) রাসূল (ছা.)-এর যুগেই মুখস্থকরণ এবং লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে হাদীছ সংরক্ষণ করা শুরু হয়েছিল এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণের প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থেকেছে। অতঃপর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাবদ্ধকরণ শুরু হয়েছে হিজরী ২য় শতকের শুরু থেকে। সুতরাং কুরআনের মত হাদীছও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
(৩) হাদীছ ও সুন্নাহর মাঝে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। শারঈ আহকাম সাব্যস্ত করার জন্য সুন্নাহ ও হাদীছ সমার্থবোধকভাবেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মুহাদ্দিছ, উছুলবিদ এবং সকল মাযহাবের ফক্বীহগণ হাদীছ ও সুন্নাহকে সমার্থকভাবেই ব্যবহার করেছেন।
(৪) ইসলামী শরী'আতের দলীল হওয়ার জন্য হাদীছ বা সুন্নাহ কারও আমলের মুখাপেক্ষী নয় এবং হাদীছের বিপরীতে কোন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর 'আমল মুতাওয়ারাছ' বা 'পরম্পরাভিত্তিক আমল' শরী'আতের দলীল নয়। কেননা হাদীছের বিপরীতে কোন ইজমা', কিয়াস ও কারও ব্যক্তিগত মন্তব্য স্থান পেতে পারে না; সেটা 'পরম্পরা ভিত্তিক আমল' বা সামাজিক প্রচলন হোক কিংবা কোন অনুসরণীয় ব্যক্তির মতামত হৌক। অনুরূপভাবে প্রাচ্যবিদ ও কিছু আধুনিকতাবাদী মুসলিম পণ্ডিতের ধারণা অনুযায়ী সুন্নাহ কখনও 'সামাজিক রেওয়ায' বা 'প্রচলন' অর্থেও মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত হয়নি।
(৫) হাদীছ ইসলামী শরী'আতের বুনিয়াদী উৎস হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর মাঝে কারও কোন দ্বিমত নেই। আহলুস সুন্নাহ ওয়া জামা'আতের সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, কোন হাদীছ ছহীহ বা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হ'লে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব, তা বহু সূত্রে (মুতাওয়াতির) বর্ণিত হোক কিংবা একক সূত্রে (আহাদ)। আক্বীদা ও আহকাম সর্বক্ষেত্রেই হাদীছ নিরংকুশভাবে আমলযোগ্য। অনুসরণীয় চার ইমামসহ মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ বিদ্বানগণ সকলেই রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ্ একচ্ছত্র মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ মত ও রায়ের ওপর নিঃশর্তভাবে হাদীছকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
(৬) মুসলিম উম্মাহর মাঝে ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে সর্বপ্রথম দ্বিধার সৃষ্টি হয় মু'তাযিলাদের মাধ্যমে, যখন তারা হাদীছকে মুতাওয়াতির ও আহাদ দু'ভাবে বিভক্ত করে এবং খবর ওয়াহিদ হাদীছকে 'যান্নী' বা সন্দিগ্ধ আখ্যা দিয়ে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। মু'তাযিলাদের এই যুক্তিবাদী ও ভ্রান্ত চিন্তাধারার দূরবর্তী প্রভাব পড়ে আহলুস সুন্নাহর অনেক বিদ্বানের উপর। বিশেষত ফকীহ বিদ্বানগণের মাঝে এই মত প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফলে তাঁরা খবর ওয়াহিদ হাদীছ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিয়াসী যুক্তির ভিত্তিতে নানা শর্তারোপ করেছেন।
(৭) খবর ওয়াহিদকে ফক্বীহগণের বড় একটি দল এবং একদল মুহাদ্দিছ 'যান্নী' বা প্রবল ধারণানির্ভর আখ্যায়িত করলেও বিশুদ্ধ মত হ'ল, ছহীহ সূত্রে সাব্যস্ত হ'লে এবং উপযুক্ত প্রমাণ সংযুক্ত হ'লে খবর ওয়াহিদ নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে।
(৮) প্রাথমিক যুগে হাদীছ অস্বীকার নীতির যে আবির্ভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তা রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহর আইনী মর্যাদাকে স্বীকৃতিদানের প্রশ্ন থেকে সৃষ্টি হয়নি, বরং তার পিছনে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থ নিহিত ছিল। আর মু'তাযিলাগণ খবর ওয়াহিদ অস্বীকারের নীতি গ্রহণ করলেও তা মূলত রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ অস্বীকারের নিমিত্তে ছিল না। সুতরাং প্রাথমিক যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ্ আইনী মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেনি। কিন্তু আধুনিক যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ্র আইনী মর্যাদাকে নাকচ করেছেন, যা অভিনব।
(৯) হাদীছের প্রতি সন্দেহবাদী একদল পণ্ডিত রয়েছেন, যারা সরাসরি হাদীছ অস্বীকারকারী না হ'লেও অনেক ক্ষেত্রে হাদীছ অস্বীকারকারীদের চেয়ে হাদীছ শাস্ত্র ও মুহাদ্দিছদের গৃহীত নীতিমালার প্রতি অধিক বিদ্বেষভাব প্রদর্শন করেছেন। হাদীছ শাস্ত্র সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞানই তাদেরকে এ পথে প্রবৃত্ত করেছে বলে অনুমিত হয়।
(১০) প্রাচ্যবাদী হাদীছ গবেষণার সূত্র ধরে আধুনিক যুগে মুসলিম সমাজে হাদীছ অস্বীকার নীতির আবির্ভাব ঘটেছে এবং আমাদের পর্যবেক্ষণে হাদীছ অস্বীকারকারী প্রায় সকল ব্যক্তি প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতদের গবেষণা দ্বারা প্রভাবিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে হাঙ্গেরিয়ান প্রাচ্যবিদ ইগনাজ গোল্ডজিহারের মাধ্যমে প্রাচ্যবাদী হাদীছ গবেষণা শুরু হয় এবং বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বৃটিশ প্রাচ্যবিদ জোসেফ শাখতের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সেই অবধি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদীছ বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হ'ল হাদীছ ইসলামী শরী'আতের কোন উৎস নয় এবং বর্তমানে মুসলমানদের নিকট যে হাদীছ ভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে রাসূল (ছা.)-এর বক্তব্য ও কর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং তা পরবর্তী যুগের মুসলিম শাসক ও বিদ্বানগণ কর্তৃক রচিত। তাদের মতে, বিশেষত শরীআতের হুকুম-আহকাম বিষয়ক হাদীছসমূহ সবই জাল ও বানোয়াট।
(১১) প্রাচ্যবিদ হাদীছ গবেষকদের লেখনীসমূহ পর্যালোচনা করে আমরা যে বিষয়গুলি লক্ষ্য করেছি, তা হ'ল- (ক) তাঁদের গবেষণার উৎসসমূহ অত্যন্ত সীমিত। তারা সামান্য কিছু হাদীছ পর্যালোচনা করে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তা সমগ্র হাদীছ শাস্ত্রের ওপর আরোপ করেন। ফলে তাদের গবেষণা অত্যন্ত দুর্বল ও সংকীর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত (খ) তাঁদের গবেষণায় সারলীকরণের প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। মুহাদ্দিছগণ যেমন কোন হাদীছ যঈফ বা জাল হ'লে কেবল সেই হাদীছটি বর্জন করেন। অথচ এর বিপরীতে প্রাচ্যবিদগণ তাদের গবেষণায় কোন হাদীছ ত্রুটিপূর্ণ পেলে সেই হাদীছকে অযৌক্তিকভাবে পুরা হাদীছশাস্ত্রই জাল হওয়ার প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করেন। (গ) আরবী ভাষাগত দুর্বলতা এবং হাদীছশাস্ত্রে বুৎপত্তি না থাকায় তাঁরা মুহাদ্দিছগণের ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো প্রায়শই বুঝতে ব্যর্থ হন, যা তাদেরকে পদে পদে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে। (ঘ) তাঁরা মুহাদ্দিছদের গৃহীত হাদীছ সমালোচনা নীতির প্রতি গভীরভাবে অশ্রদ্ধাশীল এবং সন্দেহবাদী (Skeptic)। ফলে হাদীছশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁরা বহুলাংশেই অজ্ঞতার শিকার। (ঙ) মুহাদ্দিছগণের গৃহীত নীতিমালাকে তারা ভিন্ন মোড়কে এমন চটকদারভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তারা নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন। যেমন জোসেফ শাখতের প্রধান দু'টি মতবাদ- সনদের সংযোগসূত্র তত্ত্ব (Common Link Theory) এবং পশ্চাদ-অভিক্ষেপ তত্ত্ব (Backgrowth of Isnads) মুহাদ্দিছগণেরও আলোচ্য বিষয়। তাঁরা এ বিষয়গুলো নিয়ে হাজার বছর পূর্বেই আলোচনা করেছেন এবং নিয়মতান্ত্রিক সমাধান প্রদান করেছেন। অথচ জোসেফ শাখত এই মীমাংসিত বিষয়গুলিকে হাদীছ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর মূল হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
(চ) তাঁদের হাদীছ গবেষণা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান, যদি তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাও হয়, তবুও তা সভ্যতার সংঘাত থেকে সৃষ্ট। কেননা নিয়মতান্ত্রিক গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণের দাবী নিয়ে তারা যেভাবে সুস্পষ্ট তথ্যবিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রামাণ্য তথ্যের পরিবর্তে অনাবশ্যকভাবে কাল্পনিক অনুমানের আশ্রয় নিয়েছেন, তাতে সত্য উদ্ঘাটনের চেয়ে মতাদর্শিক স্বার্থ চরিতার্থের প্রচেষ্টাই অধিকতর স্পষ্ট হয়।
(ছ) সর্বোপরি প্রাচ্যবাদী হাদীছ গবেষণা মূলতঃ তাদের বিশ্ব দর্শন (Worldview)-এরই প্রতিনিধিত্ব করে। যেহেতু তারা প্রত্যাদেশভিত্তিক জীবনব্যবস্থায় বিশ্বাসী নন, সেহেতু ইসলামী জীবনব্যবস্থায় কুরআন ও হাদীছ তথা আল্লাহ্ অহীর অস্তিত্ব স্বীকার করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের গবেষণারীতির সাথে তাদের রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের গবেষণা পরিচালিত এবং ফলাফলও ভিন্ন। এজন্য কোন কোন প্রাচ্যবিদ এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে চিন্তাকাঠামোগত সংঘর্ষ (Clash of Paradigm) হিসাবে স্বীকারও করেছেন।
(১২) মুসলিম সমাজের হাদীছ অস্বীকারকারীদের আপত্তিসমূহ পর্যালোচনাকালে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, তারাও প্রাচ্যবিদদের মতই সারলীকরণে অভ্যস্ত। কিছু ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণাকে তারা তত্ত্ব আকারে খাঁড়া করতে চেয়েছেন, যা অতিশয় দুর্বল এবং অজ্ঞতার ওপর ভিত্তিশীল। হাদীছ শাস্ত্রের খুঁটিনাটি দিকসমূহ সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞান, মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের প্রতি অশ্রদ্ধা, যুক্তিবাদ নির্ভরতা, পশ্চিমা চিন্তাদর্শনে প্রভাবিত হওয়া এবং সর্বোপরি কুরআন ব্যাখ্যায় নিজস্ব চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার পথে হাদীছকে বাধা মনে করা প্রভৃতি বিষয় তাদেরকে এই পথ অবলম্বনে উৎসাহিত করেছে বলে অনুমান করা যায়।
(১৩) আমরা এই পুস্তকে হাদীছ অস্বীকারকারী এবং প্রাচ্যবিদদের মোট ২৫টি আপত্তি ও অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করেছি এবং লক্ষ্য করেছি যে, এসকল আপত্তি ও সমালোচনা সর্বতোভাবে অসার এবং ভিত্তিহীন। নিছক সন্দেহ, ভুল ধারণা, কাল্পনিক তথ্য এবং বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ ছাড়া হাদীছ অস্বীকারের পিছনে উপযুক্ত কোন দলীল তাদের কাছে নেই।
খ. প্রস্তাবনাসমূহ:
আমরা অস্বীকার করি না যে, হাদীছকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিদ্বানদের মধ্যেও কিছু তত্ত্বীয় বিতর্ক রয়েছে, বিশেষতঃ হাদীছ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু যুক্তিবাদী শর্তারোপ, যা প্রকৃতপক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো দূর করা এবং হাদীছের চর্চাকে সমাজে আরো বিস্তৃত করতে পারলে তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক সমাজ গড়ার পর ইনশাআল্লাহ সুগম হবে। এ ব্যাপারে আমাদের প্রস্তাবনাসমূহ নিম্নরূপ:
(১) মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহদের মধ্যে হাদীছকেন্দ্রিক নীতিগত যে বিভক্তি পরিলক্ষিত হয়, তার পিছনে আমরা প্রধান কারণ হিসাবে লক্ষ্য করেছি মানত্বিক বা যুক্তিবাদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব। এই প্রভাবকে যদি অপসারণ করা সম্ভব হয়, তবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মধ্যে হাদীছকেন্দ্রিক কোন বিভক্তির অবকাশ থাকে না। তাছাড়া এতে সন্দেহ নেই যে, হাদীছ সম্পর্কে ফক্বীহ ও মুতাকাল্লিমগণের তুলনায় মুহাদ্দিছগণের গৃহীত নীতিই সর্বযুগে নিরাপদ ও সত্যানুবর্তী প্রমাণিত হয়েছে। অতএব মুসলিম উম্মাহর ঐক্যপ্রয়াসী বিদ্বানগণ নিঃশর্তভাবে হাদীছ অনুসরণের নীতি বাস্তবায়নে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে বিভক্তি দূরীকরণের পথে একটি বড় অগ্রগতি সাধিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশেষত সমকালীন মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে (ifaale Raa الرجوع إلي الكتاب والسنة الصحيحة of হাদীছের দিকে প্রত্যাবর্তন'-এর যে ইতিবাচক ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এই নীতি অবলম্বনেরই একটি সুফল বলে প্রতীয়মান হয়।
(২) ফিক্হী মাযহাবের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, হাদীছের প্রতি আমাদের এই নীতির ব্যাপারে ঐক্যমত হওয়া উচিৎ যে, কোন হাদীছ মুহাদ্দিছগণের নীতিমালার আলোকে বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে তা নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করে নিতে হবে। হাদীছের মর্যাদা সংরক্ষণে এবং শারঈ ক্ষেত্রে পারস্পরিক মতপার্থক্য দূরীকরণে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হ'তে পারে। বস্তুত কোন সত্যসন্ধানী ব্যক্তির জন্য এই নীতি অবলম্বন করা কঠিন বিষয় নয়।
(৩) মৌলিক বিশ্বাসগত এবং আমলগত ক্ষেত্রগুলোতে মুসলিম উম্মাহকে যতদূর সম্ভব সর্বজনস্বীকৃত অবস্থান (Common Ground) খুঁজে নিতে হবে। আর সেটা একমাত্র সম্ভব তুলনামূলক অধিকতর বিশুদ্ধ হাদীছের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমাদের বিতর্ক থাকবেই, তবে সকল বিদ্বানের চেষ্টা থাকতে হবে যতদূর সম্ভব সুন্নাহ্র নিকটবর্তী ফৎওয়াটি অনুসন্ধানের জন্য। মুসলিম উম্মাহর সফলতা এই পথেই নিহিত বলে আমরা মনে করি।
(৪) হাদীছ অস্বীকারকারী এবং প্রাচ্যবিদদের ভ্রান্তিসমূহ অপনোদনে মুসলিম বিদ্বানগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে এ প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষত ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন এতে বিভ্রান্ত না হয়, এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সেই সাথে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নিয়মিত সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। এছাড়া ইংরেজী, ফ্রেঞ্চসহ বহুল প্রচলিত আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোতে মুসলিম বিশেষজ্ঞদের অধীনে একটি ইসলামী বিশ্বকোষ রচনার আশু প্রয়োজন। কেননা প্রচলিত বিশ্বকোষসমূহ প্রাচ্যবিদদের তত্ত্বাবধানে লিখিত। ফলে হাদীছ বিষয়ে তাদের ভ্রান্তিপূর্ণ পর্যবেক্ষণই সেখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ বিষয়ে মদীনায় প্রতিষ্ঠিত مجمع خادم الحرمين الشريفين الملك সালমান بن عبد العزيز آل سعود للحديث النبوي الشريف প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
(৫) সমাজে হাদীছ বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। বিশেষত বাংলাদেশের উচ্চতর দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে এখনও পর্যন্ত উলূমুল হাদীছ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ এবং হাদীছ বিভাগসমূহেও উলূমুল হাদীছ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উচ্চতর গবেষণা হয় না। এই দৈন্যদশা দূর করতে হবে এবং হাদীছ শাস্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের অবগত করাতে হবে। যাতে এ বিষয়ে তারা উচ্চতর গবেষণার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে এবং হাদীছ অস্বীকারকারী, হাদীছের প্রতি সন্দেহবাদী ও প্রাচ্যবিদদের ভ্রান্তিসমূহ খণ্ডনে উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে।
سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك، اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب
*****

টিকাঃ
৫৩০. আলীগড় আন্দোলনের ভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে জোরালোভাবে কলম ধরা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ (১৮৮৮-১৯৫৮খ্রি.)-এর মন্তব্যটি এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, مشکل یاد رکھو کہ تمام طوائف منتظمین فلسفہ قدیم کے مقابلے میں بھی ناکام رہے تھے ۔ آج نام نہاد فلسفہ جدید کے مقابلے میں اسی طرح ناکام رہیں گے۔ اس وقت بھی صرف اصحاب حدیث اور طریق سلف ہی کامیاب و منصور ہوئے تھے اور آج بھی اس میدان میں بازی انھیں کے ہاتھ ہیں۔ فقھاء منتظمین میں سے آج تک کوئی اس میدان کا مرد نہیں اٹھا۔ মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত যুক্তিবাদী কালাম শাস্ত্রবিদ সম্প্রদায় যেমন প্রাচীন দর্শনের (গ্রীক ও অন্যান্য দর্শন) বিপরীতে ব্যর্থ হয়েছিল, আজও তারা একইভাবে তথাকথিত নয়া দর্শনের (পশ্চিমা আধুনিকতাবাদ) বিপরীতে ব্যর্থ হবে। অপরদিকে সেই সময়ও যেমন কেবলমাত্র আছহাবুল হাদীছ তথা হাদীছের অনুসারী এবং সালাফদের পথ অনুসরণকারীরা সফল ও বিজয়ী ছিলেন, তেমনি আজও বাজি তাদের হাতেই। ফক্বীহ ও মুতাকাল্লিমগণ আজ পর্যন্ত কেউই এই ময়দানে টিকে থাকতে পারে নি। দ্র. মুহাম্মাদ ইকরাম, মওজে কাউছার (লাহোর: ইদারায়ে ছাকাফাতে ইসলামিয়া, ২২তম সংস্করণ: ২০০৩ খ্রি.), পৃ. ২৬২।
৫৩১. ইমাম আবু শামা আল-মাক্বদীসী (৫৯৬-৬৬৫খ্রি.)-এর মন্তব্যটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ينبغي لمن اشتغل بالفقه ألا يقتصر على مذهب إمام ويعتقد في كل مسألة صحة ما كان أقرب إلى دلالة الكتاب والسنة المحكمة، وذلك سهل عليه إذا كان أتقن معظم العلوم المتقدمة، وليجتنب التعصب والنظر في طرائق الخلاف المتأخرة، فإنها مضيعة للزمان والصفوة مكدرة তাদের উচিৎ হবে, যে কোন একজন ইমামের মাযহাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকা এবং প্রতিটি মাসআলার ক্ষেত্রে যেটি কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলীলের নিকটবর্তী হবে তাতেই আস্থা রাখা। যারা পূর্বযুগের অধিকাংশ জ্ঞানসমূহে পারদর্শিতা অর্জন করেছেন, তাদের জন্য এটি সহজ কাজ। তাদের জন্য আরও উচিৎ হবে গোঁড়ামি ত্যাগ করা এবং পরবর্তীদের মতবিরোধপূর্ণ অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দেয়া। কেননা এগুলো সময় নষ্টকারী এবং খুবই অপ্রীতিকর বিষয়।' দ্র. শাহ ওয়ালিউল্লাহ আদ-দিহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00