📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৫ : ইলমুর রিজাল শাস্ত্র মুহাদ্দিছদের নিজস্ব রচনা

📄 সংশয়-৫ : ইলমুর রিজাল শাস্ত্র মুহাদ্দিছদের নিজস্ব রচনা


প্রাচ্যবিদগণ মুহাদ্দিছদের রচিত রাবীদের জীবনী শাস্ত্রের উপর আস্থা রাখেন না। তারা মনে করেন এগুলো মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনা, যার নির্ভরযোগ্যতা খতিয়ে দেখার সুযোগ নেই। তারা আরও মনে করেন যে, একজন রাবী সত্যবাদী বা ন্যায়পরায়ণ হলেই কি তার বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য? এমন কি হ'তে পারে না, যে তিনি তার স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নি?

পর্যালোচনা:
ইলমুর রিজাল বা রাবীদের জীবনী শাস্ত্র হ'ল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম জীবনচরিতভিত্তিক বিশ্বকোষ, যা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান অনুশীলন ও তথ্য সংরক্ষণের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। স্প্রেঙ্গার (১৮৯৩খ্রি.) বলেন, মুসলমানদের রচনাসম্ভারের একটি গৌরবজ্জ্বল দিক হ'ল এর জীবনচরিত সমগ্র। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই আর না অতীতে কখনও ছিল যারা বারো শতাব্দীকাল ধরে সকল বিদ্বান মানুষের জীবনী নথিভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যদি মুসলমানদের জীবনীমূলক রচনাসমূহ একত্রিত করা হয়, তবে সম্ভবত আমরা প্রায় পাঁচ লক্ষ বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবনচরিতের সন্ধান পাব। ফলে তাদের ইতিহাসের এমন একটি যুগ পাওয়া যাবে না এবং এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাওয়া যাবে না, যেখানে তাদের কোন প্রতিনিধি নেই (অর্থাৎ সকল যুগের এবং সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মানুষের জীবনী সংরক্ষিত হয়েছে)। ৫২৭

শিবলী নো'মানী (১৯১৪খ্রি.) বলেন, 'কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের এই গৌরবের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া যাবে না। তারা তাদের নবী (ছাঃ)-এর জীবনেতিহাস ও ঘটনাবলীর একেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশকে এমনভাবে সংরক্ষণ করেছেন যে, আজ পর্যন্ত অন্য কোন ব্যক্তির জীবনেতিহাস এরূপ বিশুদ্ধ পন্থায় পূর্ণাঙ্গভাবে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভবনা নেই'। ২৮

সুতরাং এই বিরাট তথ্যসম্ভারকে যারা কেবল মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনা হিসাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে চান, তারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, হঠকারী ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাছাড়া জ্ঞানীরাই জ্ঞানের মূল্যায়ন করতে পারেন, অজ্ঞরা নয়। সুতরাং তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি স্রেফ অজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে। নিম্নে তাদের আপত্তি খণ্ডন করা হ'ল।

ক. মুহাদ্দিছগণ রাবীদের সম্পর্কে যে সকল তথ্য একত্রিত করেছেন, তা তাদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন নয়; বরং তারা বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ এসব জীবনীগ্রন্থে নথিভুক্ত করেছেন। এসকল নথি রচনার পিছনে তাঁদের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ ছিল না যে, রাবীদের প্রতি নিজস্ব স্বার্থপ্রণোদিত কোন মন্তব্য করবেন। তাছাড়া জীবনীগ্রন্থের সংখ্যা একটি/দু'টি নয়, বরং দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষভাগে এই রচনাকর্ম শুরু হয়েছিল এবং নবম শতাব্দী পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অনেক জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তথ্যসমূহ যাচাই-বাছাই (Cross-check) হয়েছে। তাই এ সকল জীবনীগ্রন্থ সাধারণ ইতিহাসগ্রন্থের চেয়ে বহু গুণ বেশী নির্ভরযোগ্য। এখন প্রশ্ন হ'ল, যদি গবেষকদের নিকট প্রাচীন কোন ইতিহাসগ্রন্থ তথ্যসূত্র হিসাবে গৃহীত হয়ে থাকে, তবে ঠিক কোন যুক্তিতে রাবীদের জীবনীগ্রন্থসমূহকে তথ্যসূত্র হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না? তাছাড়া ইতিহাসের অন্য সব তথ্যের মত এই তথ্যগুলোও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত গবেষণারীতির দাবীকে অগ্রাহ্য করে যদি এক লহমায় এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ বর্জন করা হয় কেবল মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনার অভিযোগ তুলে, তবে একই অভিযোগে অন্যান্য সকল প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থও কেন বর্জন করা হবে না? কেননা সেগুলিও তো কোন এক মানুষের হাতেই লিখিত। আর প্রতিটি মানুষ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ইতিহাস রচনা করে থাকেন, ভিন্ন কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। প্রাচ্যবিদগণ কি তবে পর্বযুগের সমস্ত ইতিহাসগ্রন্থ এবং ঐতিহাসিক নথিসমূহ বর্জন করে এক ইতিহাসশূন্য পৃথিবী দেখার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন?

খ. রাবী ন্যায়পরায়ণ হ'লেই তাঁর সকল বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নয়। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তিনি যদি কোন হাদীছ বর্ণনা করেন, তবে সাধারণভাবে তা গ্রহণযোগ্যই হবে। কেননা স্বাভাবিক প্রকৃতিগত দাবী মোতাবেক মুহাদ্দিছগণ বর্ণনাকারীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হন এবং যতক্ষণ না তার মধ্যে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, ততক্ষণ তাকে সত্যবাদী হিসাবেই ধরে নেন। আর সত্যবাদিতাকেই তাঁদের যোগ্যতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। কেননা ইসলামে ন্যায়পরায়ণতার মূল্য সবচেয়ে বেশী। ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যবাদিতার কারণেই কোন মানুষের ভেতর নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং যখন তিনি ন্যায়পরায়ণ তথা সত্যবাদী হন, স্বাভাবিকভাবে তাঁর বর্ণনার ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। অপরপক্ষে কোন ব্যক্তির উপর প্রমাণহীনভাবে সন্দেহ পোষণ করা এবং মিথ্যারোপ করা ইসলামের নীতিমালা বহির্ভূত।

গ. সত্যবাদী ব্যক্তিও কোন স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হ'তে পারেন কি না?- এর জবাবে আমরা বলব, অবশ্যই পারেন। কিন্তু তা প্রমাণসাপেক্ষ। যদি তা প্রমাণিত হয়, এমনকি যদি এ ব্যাপারে সামান্য সন্দেহও সৃষ্টি হয়, তবে মুহাদ্দিছগণ সেই রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করেন না। আবার ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণ করলেও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেন। এ কারণেই ইবনু শিহাব আয-যুহরী (১২৪হি.)-এর মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছও যখন মুরসাল তথা বিচ্ছিন্ন সূত্রে কোন হাদীছ বর্ণনা করেন, তখন তাঁর বর্ণনা মুহাদ্দিছগণ গ্রহণ করেন না। ইবনু জুরাইজ (১৫০হি.)-এর মত সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ যখন কোন হাদীছ 'আনআনাহ' সূত্রে তথা সরাসরি শিক্ষকের নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন এমন কথা স্পষ্টভাবে না বলেন, তখন তার হাদীছ গ্রহণ করা হয় না। কেননা তিনি 'তাদলীস' তথা কখনও কখনও স্বীয় শিক্ষকের নাম উল্লেখ না করে সনদ বর্ণনা করতেন বলে অভিযোগ ছিল। সুতরাং মুহাদ্দিছগণ কখনই কোন রাবীর নিকট থেকে নির্বিচারে হাদীছ গ্রহণ করেন না, তিনি যতই সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ হোন না কেন।

ঘ. মুহাদ্দিছগণ সবকিছুর উপর কেন রাবীর ন্যায়পরায়ণতা বা সত্যবাদিতাকে এত গুরুত্ব দিলেন? এ বিষয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফ্রেড ডোনার (জনা: ১৯৪৫খ্রি.)-এর একটি পর্যবেক্ষণ বেশ গুরুত্বের দাবী রাখে। তিনি বলেন, 'এটা স্বাভাবিক ছিল যে, যখন মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের জন্য পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি হ'ল, তখন মুসলমানরা এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য ধর্মনিষ্ঠতা বা সত্যবাদিতার বিচারকে সর্বপ্রথমে অগ্রাধিকার দিলেন। মানব সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কিংবা কোন ব্যক্তির অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য যেসব বৈশিষ্ট্য ব্যবহৃত হয় তা হ'ল- গোত্রীয় বা পারিবারিক পরিচয়, ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা সম্পত্তি, শ্রেণী, জাতীয়তা প্রভৃতি। কিন্তু ইসলামের মৌলিক কাঠামোতে এসবের কোন স্থান নেই। এজন্য সংক্ষেপে বলা যায়, প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের নিকট আইনী বৈধতার অর্থ ছিল ধর্মনিষ্ঠতা (তাক্বওয়া)- এর ভিত্তিতে আইনী বৈধতা। ১৫২৯

মুসলমানদের এই ধর্মনিষ্ঠতার ধারণাটিই সম্ভবত প্রাচ্যবিদদের জন্য হজম করা কঠিন হয়। কেননা তাঁরা মনে করেন, একটি বিবাদ মেটানোর জন্য পক্ষগুলোর পারস্পরিক স্বার্থই প্রধান বিচার্য বিষয়, এখানে 'ধর্মনিষ্ঠতা'র বিবেচনা অস্বাভাবিক। একই ঘটনা ঘটেছে মুহাদ্দিছদের 'ন্যায়পরায়ণতা'র শর্ত অনুধাবনের সময়ও। কেননা তাদের ধারণায় এখানে প্রধান বিচার্য বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল এ সকল বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিস্বার্থ, তাদের ধর্মনিষ্ঠতা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এজন্য গোল্ডজিহের, শাখত বারাংবার হাদীছ বর্ণনার পিছনে রাবীদের ব্যক্তিস্বার্থ খুঁজেছেন। কিন্তু ইসলাম জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছে ধর্মনিষ্ঠতাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে, ইহকালে ও পরকালে ধর্মনিষ্ঠতা বা তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়। এমনকি এই শ্রেষ্ঠত্বের মূল্য জাতি, বর্ণ, সম্পদশালীতা এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সর্বপ্রকার স্বার্থের ঊর্ধ্বে। আর যখন এই শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হয়, তখন মানুষের নিকট সকল প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ তুচ্ছ হয়ে যায় এবং নৈতিক ও পরকালীন স্বার্থই সর্বাগ্রে প্রাধান্য পায়, যা প্রাচ্যবিদগণ অনুধাবন করতে অপারগ।

টিকাঃ
৫২৭. The Glory of the literature of the Mohammadans is its literary biography. There is no nation nor has there been any which like them has during the twelve centuries recorded the life of every man of letters. If the biographical records of the Musalmans are collected, we should probably have accounts of the lives of half a million of distinguished persons, and it would be found that there is not a decennium of their history, nor a place of importance which has not its representatives (Alov Sprenger, Introduction to "Al-Isabah" by Ibn-i-Hazar, A biographical dictionary of persons who knew Muhammad (Bishops College press, Calcutta, 1856), গৃহীত: ড. আব্দুর রউফ যাফর, উলূমুল হাদীছ, পৃ. ১২১)।
৫২৮. ড. মোহাম্মাদ বেলাল হোসেন, হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরূপণ: প্রকৃতি ও পদ্ধতি (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ২০০৯ খ্রি.), পৃ. ৬৬; গৃহীত: শিবলী নু'মানী, সিরাতুন নাবাভী, ১ম খণ্ড (করাচী: দারুল ইশা'আত, ১৯৮৪ খ্রি.), পৃ. ১১।
৫২৯. It was natural.. that when there arose within the community of Believers political and social tensions and disputes over leadership.. the Believers first resorted to considerations of piety to resolve those issues. Other distinctions commonly used in human societies to settle disputes and establish an individual's status- tribal or family affiliation, historical associations, or claims based on property, class, ethnicity, etc.- do not appear as part of the original Islamic scheme of things.....Legitimation among earliest believers, in short, meant legitimation through piety (Taqwa). Fred M. Donner, Narratives of Islamic Origins (Princeton, New Jersey: The Darwin press, 198), p. 98-99.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00