📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৪ : হাদীছের ইসনাদ হ’ল বানোয়াট বস্তু

📄 সংশয়-৪ : হাদীছের ইসনাদ হ’ল বানোয়াট বস্তু


জোসেফ শাখত বলেন, ইসনাদ হ'ল নিজের মতকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ করার জন্য তা ঊর্ধ্বতন কোন কর্তৃপক্ষের সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যম, যা বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী পরবর্তীকালে রচনা করেছিল। এজন্য রাসূল (ছা.) ও তাঁর ছাহাবীদের প্রতি নিসবতকৃত বা আরোপিত সনদসমূহ তথা হিজরী ১ম শতাব্দী থেকে ২য় শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত যে সকল রাবীদের নাম সনদে যুক্ত হয়েছে তা সবই ব্যতিক্রমহীনভাবে জাল ও বানোয়াট সংযোজন।
তাঁর ভাষায়,..that portions of Isnāds that extended into the first half of the second century and into the first century are without exception arbitrary and artificially fabricated। এই তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য তিনি ২টি পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। (১) Backgrowth of Isnads বা পশ্চাদ-অভিক্ষেপ তত্ত্ব: এর অর্থ হ'ল হাদীছের সনদকে বর্ধিত করে রাসূল (ছা.) পর্যন্ত সংযুক্ত করা, যার অর্থ প্রাথমিক সংকলনে যে হাদীছ মাওকুফ বা ছাহাবীদের বর্ণনা হিসাবে উল্লেখিত হয়েছিল, পরবর্তী সংকলনে তা মারফু' বা সরাসরি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ হিসাবে বর্ণিত হওয়া। ৪৯৩ (২) Common Link Theory বা সংযোগসূত্র তত্ত্ব। অর্থাৎ সনদের যে অংশে নির্দিষ্ট একজন বর্ণনাকারীকে কেন্দ্র (مدار الإسناد) করে অন্যান্য সনদ থেকে দুই বা ততোধিক বর্ণনাকারী এসে একত্রিত হয়েছে, সেই বর্ণনাকারীকে 'হাদীছ জালকারী' হিসাবে চিহ্নিত করা।
তিনি সনদকে দুই ভাগে ভাগ করে 'সংযোগসূত্র'-এর পূর্বাংশকে তিনি Fictitious higher part (বানোয়াট উর্ধ্বাংশ, যে অংশে ১ম শতাব্দীর রাবী বা বর্ণনাকারীদের নাম রয়েছে) এবং পরবর্তী অংশকে Real lower part (সঠিক নিম্নাংশ, যে অংশে ২য় ও ৩য় শতাব্দীর রাবীদের নাম রয়েছে) আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, 'মাদারুস সানাদ' বা সনদের সংযোগস্থলের এই রাবী বা বর্ণনাকারীগণই হাদীছ জাল করা এবং তা রাসূল (ছা.)-এর প্রতি সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রকৃত ভূমিকা রেখেছেন। ৪৯৪ তিনি ইসনাদ পদ্ধতি আদ্যোপান্ত জাল ও বানোয়াট মনে করেন। তাঁর ধারণা হ'ল, একটি হাদীছের যত অতিরিক্ত ইসনাদ (মুতাবা'আত ও শাওয়াহিদ) রয়েছে, তা সৃষ্টি হয়েছে ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.)-এর যুগে। এর মাধ্যমে মু'তাযিলাদের আরোপিত খবর ওয়াহিদ হাদীছের বিরুদ্ধে আপত্তিসমূহ দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়া 'যিয়াদাতুছ ছিকাহ' বা রাবীদের কর্তৃক হাদীছের মতনে বৃদ্ধি করা, পারিবারিক ইসনাদসমূহ প্রভৃতি ইসনাদ জাল হওয়ার প্রকাশ্য দলীল। মুছতুফা আল- আ'যামী (২০১৭হি.) তাঁর উপস্থাপিত এসকল প্রমাণাদি বিস্তারিতভাবে খণ্ডন করেছেন তাঁর On Schacht's Origins Of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে।

পর্যালোচনা:
শাখতের এই চরমপন্থী অনুসিদ্ধান্ত তাঁর পূর্ববর্তী অনুসিদ্ধান্তের সাথে সম্পৃক্ত। যেহেতু তিনি বিশ্বাস করেন যে, ১ম হিজরী শতাব্দীতে রাসূল (ছা.)- এর কোন হাদীছের অস্তিত্ব ছিল না, অতএব ইসনাদের অস্তিত্ব থাকারও কোন প্রশ্ন আসে না। ৪৯৫ এজন্য ১ম শতাব্দীতে ইসনাদের সপক্ষে প্রাপ্ত যে কোন প্রমাণ তাকে অপরিহার্যভাবে অস্বীকার করতে হয়েছে। ইবনু সীরীন (১১০হি.)- لم يكونوا يسألون عن الإسناد، فلما وقعت الفتنة، قالوا: سموا لنا رجالكم 'প্রথম যুগে মানুষ ইসনাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না। অতঃপর যখন 'ফিতনা' শুরু হয়, তখন মানুষ বলতে লাগল, তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বল। ৪৯৬ এই বর্ণনাটি শাখতের মতে জাল। কেননা তিনি মনে করেন 'ফিল্মা'র অর্থ হ'ল উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনু ইয়াযীদ (১২৬হি.)-এর হত্যাকাণ্ড। আর ইবনু সীরীনের মৃত্যু ১১০ হিজরীতে। অতএব এই বর্ণনাটি মিথ্যাভাবে ইবনু সীরীনের নামে প্রযুক্ত করা হয়েছে; ৪৯৭ অথচ এটি ইতিহাসস্বীকৃত বিষয় যে মুসলমানদের প্রথম ফিতনা বলতে আলী (রা.) এবং মু'আবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার ছিফ্ফীনের যুদ্ধকে বুঝানো হয়ে থাকে। যেহেতু ইবনু সীরীনের মৃত্যু ১১০ হিজরীতে, সেহেতু তিনি ৩৭ হিজরীতে সংঘটিত হওয়া ফিতনাকে উদ্দেশ্য করাই স্বাভাবিক। ইতিহাস বিশ্লেষণে এটিই অধিকতর বোধগম্য। কেননা এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই মুসলমানরা সুন্নী ও শী'আসহ বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয় এবং বিশেষত শী'আরা ব্যাপকভাবে হাদীছ জাল করে। এজন্য মুহাদ্দিছগণ এই সময়কেই ইসনাদের উৎপত্তিকাল নির্ধারণ করেছেন। অথচ শাখত তাঁর তত্ত্বকে ঠিক রাখতে সুদূর ১২৬ হিজরীতে সংঘটিত খলীফা ওয়ালীদ ইবনু ইয়াযীদ হত্যাকাণ্ডের মত একটি ঘটনাকে নিয়ে এসেছেন, যা মুসলমানদের মধ্যে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ফিতনা ছিল না যে তাকে কেন্দ্র করে হাদীছ জাল করার মত বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হ'তে পারে। যে কোন নিরপেক্ষ গবেষক তা স্বীকার করবেন। অতঃপর ইবনু সীরীনের মৃত্যু সালের সাথে তা সমন্বয় করতে না পেরে নির্বিচারে হাদীছটি জাল বলে অভিহিত করলেন। এভাবেই শাখত ও তাঁর সমচিন্তকরা বার বার সত্যের মুখোমুখি হ'তে অস্বীকার করেছেন কিংবা এড়িয়ে গেছেন। নিম্নের উদাহরণগুলি থেকে তা আরও স্পষ্ট হবে।

ক. শাখত তাঁর পশ্চাদ-অভিক্ষেপ তত্ত্বটি প্রমাণের জন্য বেশ কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে, একটি হাদীছ ইমাম মালিক (১৭৯ হি.) উল্লেখ করেছেন কোন ছাহাবীর বর্ণনা বা মাওকূফ হিসাবে, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে ইমাম শাফেঈ (২০৪ হি.) সেই হাদীছ ত্রুটিপূর্ণ মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, দুই প্রজন্ম পর ইমাম বুখারী (২৫৬ হি.) সেই একই হাদীছ বর্ণনা করেছেন পূর্ণাঙ্গ সূত্রে মারফু হিসাবে। ৪৯৮ তাঁর এই পর্যবেক্ষণ নিশ্চিতভাবে সত্য, যা মুহাদ্দিছগণের নিকট সুপরিচিত একটি প্রাচীন সমস্যা। তাঁরা এর সমাধানের জন্য ইলমুল ইলাল শাস্ত্রের আবিষ্কার করেছেন এবং এসকল ইসনাদের মধ্যে কোনটি বর্জনযোগ্য এবং কোনটি অধিকতর সঠিক ও প্রাধান্যযোগ্য তা নির্ণয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং এটি কোন নতুন বিষয় নয় এবং অসমাধানযোগ্য বিষয়ও নয়। কিন্তু এর ভিত্তিতে কি শাখতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, রাসূল (ছা.) পর্যন্ত মারফু সূত্রে বর্ণিত সকল হাদীছের সনদই এমন ত্রুটিপূর্ণ? কিংবা অবিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত কোন হাদীছই নেই?

পশ্চাদ-অভিক্ষেপ তত্ত্বটি মুহাদ্দিছদের নিকট 'যিয়াদাহ' বা বর্ণনাকারীর বর্ধিতকরণ হিসাবে পরিচিত। এটি 'ইলালুল হাদীছ' শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ইমাম দারাকুনী (৩৮৫হি.) এ বিষয়ে সংকলিত তাঁর সুপ্রসিদ্ধ كتاب العلل الواردة في الأحاديث النبوية গ্রন্থে ৪১২৭টি হাদীছ উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে হাদীছের সনদ ও মতনের আভ্যন্তরীণ নানা প্রায়োগিক (Technical) ত্রুটি-বিচ্যুতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ সকল ত্রুটিপূর্ণ হাদীছের একটি বড় অংশ হ'ল কোন হাদীছের সনদসমূহে 'মারফু/মাওফ, মাওছুল/মুনকাতিঈ প্রভৃতি দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ একজন রাবী হয়ত কোন হাদীছকে ছাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। অপর রাবী তা সরাসরি রাসূল (ছা.) হ'তেই বর্ণনা করেছেন। আবার অন্য একজন রাবী তা 'মুরসাল' সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এই সমস্যাগুলো কখনও কোন রাবীর ব্যক্তিগত ত্রুটির কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে কোন বর্ণনাটি প্রণিধানযোগ্য। ক্ষেত্রবিশেষে হাদীছটির উভয়সূত্রই সঠিক হ'তে পারে। কেননা কোন হাদীছ একই সাথে মারফু' হতে পারে, আবার মাওকুফও হ'তে পারে। এটা এ জন্য যে, হয়ত দু'টি হাদীছ ভিন্ন ভিন্ন উপলক্ষে বর্ণিত হয়েছে। অথবা বর্ণনাকারী ছাহাবী হয়ত একবার তাঁর শ্রুত হাদীছটি রাসূল (ছা.) হ'তে সরাসরি বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে কোন ফৎওয়া দেওয়ার সময় হাদীছটি নিজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। সুতরাং বিষয়টি কেবলই প্রায়োগিক (Technical) বিষয়, যার সাথে হাদীছ জাল হওয়া বা না হওয়ার সম্পর্ক নেই। হাদীছ শাস্ত্র সম্পর্কে অনভিজ্ঞতার দরুণ শাখত বিষয়টিকে অভিনব মনে করেছেন এবং তার তত্ত্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দলীল মনে করেছেন। আদতে তা কোন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বলা বাহুল্য, এই 'পশ্চাদ-অভিক্ষেপ' সম্পর্কে গবেষণা প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিছগণই করেছেন। বর্তমান যুগেও মুহাদ্দিছগণ রাবীদের এমন বর্ণনাগুলো সম্পর্কে গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। ৪৯৯

সমকালীন অন্যান্য প্রাচ্যবিদরাই শাখতের এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেমন জোনাথান ব্রাউন (জন্ম: ১৯৭৭খ্রি.) বলেন, মুহাদ্দিছগণ 'পশ্চাদ-অভিক্ষেপ'কে বর্ণনাকারীর زياده বা সংযোজন হিসাবে দেখতেন। এটি তিন প্রকার। (১) সনদে সংযোজন, (২) মতনে সংযোজন এবং (৩) নিয়মতান্ত্রিক মতন সংযোজন (অর্থাৎ মতনের গুরুত্ব বৃদ্ধির জন্য মওকুফ হাদীছকে মারফু হাদীছে রূপান্তরকরণ)। এই ৩য় প্রকার বৃদ্ধিকরণ বা সংযোজনটিই আমাদের আলোচ্য বিষয়। শাখত এবং পশ্চিমা গবেষকদের মতে 'নিয়মতান্ত্রিক মতন সংযোজন' মারফু' হাদীছের জাল হওয়া প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে মুহাদ্দিছদের নিকট বর্ণনাকারীর সততা এবং সহযোগী বর্ণনার (মুতাবা'আত ও শাওয়াহেদ) উপস্থিতি পাওয়া গেলে একটি হাদীছের মাওকুফ এবং মারফু' উভয় সূত্রই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কেননা একজন ছাহাবী কোন ব্যাপারে হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে যেমন সরাসরি মুহাম্মাদ (ছা.)-এর বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন, তেমনিভাবে নিজের ভাষাতেও হুকুমটি বর্ণনা করতে পারেন। সুতরাং দু'টির মাঝে কোন বৈপরীত্য নেই।৫০০ তিনি বিভিন্ন যুগে মুহাদ্দিছদের রচিত 'ইলাল' সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহ বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, শাখতীয় আপত্তিসমূহের ব্যাপারে মুহাদ্দিছগণ বহু পূর্ব থেকেই সতর্ক ছিলেন এবং যথাযথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।৫০১

ইউরী রুবিন (জন্ম: ১৯৪৪খ্রি.) পাণ্ডুলিপি বিশ্লেষণ (Systemetic textual analysis) পদ্ধতির সাহায্যে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, শাখতের ইসনাদের 'পশ্চাদ-অভিক্ষেপ' তত্ত্বটি সারবত্তাহীন। তিনি বলেন, শাখতের প্রদত্ত উদাহরণগুলো কেবল এতটুকুই প্রকাশ করে যে একটি হাদীছের সম্পূর্ণ ইসনাদের (মুত্তাছিল) পাশাপাশি অসম্পূর্ণ ইসনাদও (মুনকাতি') থাকতে পারে। কিন্তু এমন কোন প্রমাণ নেই যে, অসম্পূর্ণ ইসনাদ (মুনকাতি') থেকে সম্পূর্ণ ইসনাদের (মুত্তাছিল) জন্ম হয়েছে। ৫০২ তবে পশ্চাদ-অভিক্ষেপ' কখনই ঘটেনি এমন নয়। মুহাদ্দিছগণ এমন কিছু অসৎ বর্ণনাকারীকে চিহ্নিত করেছেন যারা 'মুরসাল' হাদীছকে 'মারফু' হাদীছে পরিণত করেছেন। কিন্তু এটা কখনই স্বাভাবিক পদ্ধতি ছিল না যেমনটি শাখতের ধারণা। বরং তা ছিল ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত যাকে মুহাদ্দিছগণ সনদের কোন অসৎ বর্ণনাকারীর কর্ম হিসাবে অভিহিত করেছেন। ৫০০ পরিশেষে তিনি বলেন, '.. the lack of evidence of backward growth of Isnads deprives Schacht of one of its basic dating tolls.' 'পশ্চাদ-অভিক্ষেপের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণাদির ঘাটতি শাখতকে হাদীছের কাল-নির্ধারণী অন্যতম এই মৌলিক অস্ত্রটি থেকে বঞ্চিত করেছে।৫০৪

হেরাল্ড মোজকি (জন্ম: ১৯৪৮খ্রি.) বলেন, শাখত যে সকল উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন তা প্রমাণ করে যে, তিনি ধারণাই করতে পারেন নি যে, ২য় শতাব্দীর প্রথমভাবে কিংবা তারও পূর্বে কোন হাদীছ দুই বা ততোধিক বর্ণনাকারী বর্ণনা করতে পারে। কেননা শাখত মনে করেন যে, একটি হাদীছের অধিকাংশ ইসনাদ অতিরিক্ত কোন কর্তৃপক্ষ কিংবা স্বয়ং বর্ণনাকারীগণ কর্তৃক প্রণীত অথবা আগাগোড়াই জাল। তাঁর এই মতামতসমূহ স্বল্প কিছু উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত অবাধ সারলীকরণ। সবচেয়ে বড় কথা এগুলি তাঁর দাবী মাত্র, কোন প্রমাণিত বিষয় নয়। ৫০৫

জোনাথন ব্রাউন (১৯৭৭খ্রি.) বলেন, 'হাজারো হাদীছের মধ্যে শাখত মাত্র ৪৭টি উদাহরণের ওপর ভিত্তি করে ইসনাদের পশ্চাদ-অভিক্ষেপের ব্যাপারে তাঁর উপসংহার টেনেছেন, যা তার ধারণায় সমগ্র হাদীছ ভাণ্ডারের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতাকে বিনষ্ট করেছে। ৫০৬

সুতরাং শাখতের নিকট 'পশ্চাদ-অভিক্ষেপ' তত্ত্ব ইসনাদের জাল হওয়ার প্রমাণে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হ'লেও বাস্তবে এই তত্ত্ব হাদীছ শাস্ত্র সম্পর্কে কেবল তাঁর নিরেট অজ্ঞতারই প্রমাণ বহন করে। তাঁর এই অতি দুর্বল অনুসিদ্ধান্ত গবেষণার প্রাথমিক শর্তই পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যে সমস্যার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তা মুহাদ্দিছগণ হাজার বছর পূর্বেই চিহ্নিত করেছেন এবং তার সমাধানও বের করেছেন। সুতরাং এই মীমাংসিত বিষয়ে তাঁর গবেষণা যে কোন মুহাদ্দিছ বিদ্বানের নিকট স্রেফ অবান্তর প্রতীয়মান হবে।

খ. শাখত তাঁর 'সংযোগসূত্র' তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কোন হাদীছের ইসনাদসমূহের যে অংশে কয়েকজন রাবী একজন নির্দিষ্ট রাবী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন, সেই নির্দিষ্ট রাবী হলেন হাদীছটি জালকারী। যেমন একটি সনদ- আমর ইবনু দীনার (১২৬হি.) থেকে কোন হাদীছ বর্ণনা করেছেন ইবরাহীম ইবনু ইয়াযীদ আল-খাওযী (১৫১হি.)/সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ (১৯৮হি.)/আবূর রবী' আস-সাম্মান (মৃত্যুসাল অজ্ঞাত)<আমর ইবনু দীনার (১২৬হি.)/আবূ সালামাহ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (৯৪/১০৪হি.) আবূ হুরায়রা (রা.) রাসূল (ছা.)। এই সনদে আমর ইবনু দীনার থেকে তিন জন বর্ণনাকারী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। সুতরাং শাখতের মতে এই আমর ইবনু দীনার হ'লেন এই হাদীছের সংযোগস্থলের রাবী, যিনি কিনা সনদের পূর্বাংশে আবূ সালামাহ্ আবূ হুরায়রা রাসূল (ছা.) অংশটি জুড়ে দিয়ে হাদীছটি রচনা করেছেন এবং তার থেকে পরবর্তী তিন জন বর্ণনাকারী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। শাখতের মতে, আমর ইবনু দীনারই হলেন এই হাদীছটির জন্মদাতা এবং তার রচনাকালই হ'ল হাদীছটির প্রকৃত জন্মকাল। তাঁর ভাষায়, The existence of common transmitters enables us to assign a firm date to many traditions and to the doctrines represented by them 'এই সংযোগস্থলের বর্ণনাকারীগণ আমাদেরকে অনেক হাদীছ বা মতবাদের সঠিক উৎপত্তিকাল নির্ণয় করতে সাহায্য করে।'৫০৭ আর যে সকল হাদীছে 'সংযোগসূত্র' নেই সে সকল হাদীছ সরাসরি প্রাথমিক হাদীছ সংকলক আব্দুর রায্যাক ইবনু হাম্মাম (২১১হি), আহমাদ ইবনু হাম্বল (২৪১হি.) প্রমুখ কর্তৃক জালকৃত। তাঁর উত্তরসূরী জুইনবল এবং মাইকেল কুক এই তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।

এর জবাবে আমরা তিনটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ 'সংযোগসূত্র' বা مدار الإسناد সম্পর্কে সবিশেষ অবগত ছিলেন এবং তারা এ সংক্রান্ত ত্রুটি নিরসনে সূক্ষ্ম নীতিমালা অবলম্বন করেছেন।৫০৮ যেমন আয-যাহাবী (৭৮৪হি.) বলেন,
فانظر اول شئ إلى أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم الكبار والصغار، ما فيهم أحد إلا وقد انفرد بسنة، فيقال له: هذا الحديث لا يتابع عليه، وكذلك التابعون، كل واحد عنده ما ليس عند الآخر من العلم، وما اتعرض لهذا، فإن هذا مقرر على ما ينبغي في علم الحديث، وإن تفرد الثقة المتقن يعد صحيحا غريبا، وإن تفرد الصدوق ومن دونه يعد منكراً، وإن إكثار الراوي من الأحاديث التي لا يوافق عليها لفظا أو إسنادا يصيره متروك الحديث '(ইসনাদ সমালোচনায়) প্রথমে লক্ষ্য কর রাসূল (ছা.)-এর জ্যেষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ (সকল) ছাহাবীদের প্রতি। তাদের মধ্যে এমন একজন নেই যিনি এককভাবে কোন হাদীছ বর্ণনা করেন নি। তখন বলা হবে যে, হাদীছটির কোন মুতাবা'আত (সহযোগী বর্ণনা) নেই। অনুরূপই বিষয় তাবেঈদের ক্ষেত্রেও। তাদের প্রত্যেকের নিকটই এমন হাদীছ ছিল, যা অন্যদের কাছে ছিল না।
আমি এ বিষয়ে এখানে আলোচনা করতে চাই না, কেননা এটি হাদীছ শাস্ত্রের একটি স্বীকৃত বিষয়। আর যদি (পরবর্তী যুগে) কোন একক বর্ণনাকারী ছিকাহ (শক্তিশালী) এবং নির্ভরযোগ্য হন, তবে তাঁর বর্ণনা ছহীহ গারীব (অর্থাৎ বিশুদ্ধ তবে অপ্রসিদ্ধ বর্ণনা) হিসাবে গণ্য হবে। আর যদি এই একক বর্ণনাকারী হাদূক (সাধারণ সত্যবাদী) বা এরও নিম্ন পর্যায়ের হন, তবে তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর কোন বর্ণনাকারী যখন অধিক হারে এমন হাদীছ বর্ণনা করবেন, যার শব্দে ও সনদে কোন সামঞ্জস্যতা পাওয়া যায় না, তবে তিনি একজন পরিত্যক্ত বর্ণনাকারীতে পরিণত হবেন। ১৫০৯

অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণ সংযোগসূত্রের একক রাবীর প্রতি অতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন। এসকল রাবী শক্তিশালী বর্ণনাকারী না হ'লে তাঁর তার বর্ণনা গ্রহণ করতেন না। এমনকি রাবী শক্তিশালী হ'লেও তার বর্ণনা এক্ষেত্রে 'গারীব' বা অপ্রসিদ্ধ ঘোষণা করে তাতে ভুল থাকার সম্ভবনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আর যে সব বর্ণনার মধ্যে প্রকৃতই ভুল থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তার কথা তো বলাই বাহুল্য। হাকিম আন-নায়সাপূরী (৪০৫হি.) ও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ৫১০ তাঁছাড়া ইলালুল হাদীছের অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তুই হ'ল 'সংযোগসূত্র'-এর বর্ণনাকারীর ভুল-ত্রুটি। ইমাম তিরমিযী, ইমাম দারাকুতনী এ বিষয়ে পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং অন্যান্য মুহাদ্দিছগণও হাদীছ বর্ণনার সময়ই ইসনাদের কোন রাবীর تفرد )একক বর্ণনা) সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। সুতরাং 'সংযোগসূত্র'-এর বর্ণনাকারী সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ পুরোপুরিভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং এ বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।

সুতরাং হাজার বছর পর শাখতের কৃত এই দাবীর মাঝে কোন অভিনবত্ব নেই। শাখতের কট্টর সমর্থক মাইকেল কুক শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, শাখতের এই তত্ত্ব (সংযোগসূত্র তত্ত্ব) হাদীছ সমালোচনার নতুন কোন পদ্ধতির জন্ম দেয় না। মূলত এটি তথ্যের বিনাশ সাধন করে, কোন তথ্য সরবরাহ করে না। ০১১

দ্বিতীয়ত, শাখতের নির্বিচার দাবী 'সংযোগসূত্র'-এর বর্ণনাকারী মাত্রই হাদীছটি জাল করেছেন। কিন্তু এর দলীল কোথায়? মুহাদ্দিছগণ বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা, অন্য বর্ণনাকারীদের সাথে তাঁর বর্ণনার তুলনা এবং পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হন যে, বর্ণনাকারী সত্যিই হাদীছটি পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর নিকট থেকে শুনেছেন কি না। সুতরাং তাঁরা এই বর্ণনাকারীর বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু শাখত ও তার সমর্থকদের নিকট এমন কী দলীল রয়েছে, যে ঢালাওভাবে সকল বর্ণনাকারীকে মিথ্যা বর্ণনাকারী হিসাবে সাব্যস্ত করা যাবে? এর পিছনে কল্পনাবিলাস ব্যতীত বাস্তব কোন দলীল রয়েছে? এই কাল্পনিক সন্দেহবাদী ধারণার অসারতা প্রকাশ করতে গিয়ে মুছত্বফা আল-আ'যামী (২০১৭খ্রি.) যথার্থই বলেছেন যে, শাখতের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত করে যে, বর্তমান যুগে কোন সাংবাদিক যখন বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য জমা করে তাঁর অনুসন্ধানসমূহ পত্রিকায় প্রকাশ করেন, তখন আবশ্যিকভাবে ধরে নিতে হবে যে, সে এ সকল তথ্য জাল করেছে। কেননা পত্রিকাটির হাজারো পাঠককে কেবল তাকেই সংবাদটির একমাত্র সোর্স বা সূত্র হিসাবে গ্রহণ করতে হয়। ৫১২

সুতরাং শাখতের এই তত্ত্ব একেবারেই ভিত্তিহীন এবং অজ্ঞতাপ্রসূত।

তৃতীয়ত, শাখতের ইসনাদ জাল হওয়া এবং সংযোগসূত্র তত্ত্ব যে স্রেফ কল্পনানির্ভর- এ প্রসঙ্গে আমরা এখানে হেরাল্ড মোজকি (জন্ম : ১৯৪৮খ্রি.)-এর পর্যবেক্ষণটি তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেন, 'কিছু সম্ভবনার কথা তুলে ধরা ছাড়া সত্যি সত্যিই ইসনাদ জাল করা হয়েছে এমন উদাহরণ শাখত ও কুক খুব সামান্যই দিতে পেরেছেন। শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে এবং ইসনাদ জাল করার বিরল কিছু উদাহরণের কারণে পুরো ইসনাদ ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করার কোন যুক্তি নেই। মধ্যযুগে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ কোন সরকারী দলীলপত্রকে ঐতিহাসিক সূত্র হিসাবে পরিত্যাগ করেননি এমন যুক্তিতে যে, তাতে কখনও এমন জাল করার ঘটনা ঘটে থাকে, যা চিহ্নিত করা কঠিন। ৫১৩

তিনি বলেন, 'সংযোগসূত্র'-এর রাবীগণকে সাধারণভাবে সর্বপ্রথম বৃহত্তর আকারে হাদীছ সংগ্রাহক ও পেশাদার নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষক এবং নির্দিষ্টভাবে হিজরী প্রথম শতাব্দীর মুহাদ্দিছ হিসাবে দেখা উচিত, যাদের মাধ্যমে হাদীছের জ্ঞান চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। তাঁদের মাধ্যমেই মূলত সনদের প্রসার ঘটেছিল। পূর্বসূরীদের কাছ থেকে তারা হয়ত সনদসহ বা সনদবিহীন হাদীছ সংগ্রহ করেছিলেন। অতঃপর প্রাপ্ত সনদের মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সনদটি তারা উল্লেখ করেছেন। এ কারণে 'সংযোগসূত্র'-এর উর্ধ্বতন রাবী সাধারণত একজন হয়ে থাকেন এবং একই কারণে অধিকাংশ প্রাথমিক 'সংযোগসূত্র' ছাহাবীদের উপর না হয়ে তাবেঈদের উপর সৃষ্টি হয়েছে। ৫১৪

তিনি আরও বলেন, ইসনাদ পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল বর্ণনা পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা। এর নৈতিক ভিত্তি ছিল যে, যার নিকট থেকে তথ্য পেয়েছি তার নাম আমাকে উল্লেখ করতে হবে। জেনেশুনে এর ব্যতিক্রম করলে বর্ণনাটি মিথ্যা ও অসততা হিসাবে গণ্য হবে। নিশ্চিতভাবেই এই প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট পরিচিত ছিল এবং তৎকালীন জ্ঞানী সমাজ সামগ্রিকভাবে এই প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটছে কি না তার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। এতে এটি প্রমাণিত হয় না যে, ইসনাদ জাল হওয়ার ঘটনা ঘটে নি, কিন্তু জ্ঞানী সমাজের উপস্থিতিতে এত বৃহদাকারে জাল করার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা ভাবা অসম্ভব। যদি এই বিজ্ঞতাপূর্ণ ইসনাদ প্রক্রিয়া কেবলমাত্র বা প্রধানত নির্ভরশীলতা সৃষ্টির ছলনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে হাদীছকে আইনসিদ্ধ করার জন্য ইসনাদ প্রক্রিয়া অর্থহীন বিষয়ে পরিণত হয়। ইমাম শাফেঈ কর্তৃক নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হাদীছের ওপর জোর প্রদান করার বিষয়টিও অযৌক্তিক এবং প্রতারণাপূর্ণ হয়ে পড়ে, যদি তিনি জেনে থাকেন যে তার সময়কালে প্রচলিত অধিকাংশ হাদীছের সনদ জাল। ৫১৫

তিনি যথার্থই প্রশ্ন রাখেন, Was the whole system of Muslim Hadit criticism only a manoeuvre of deception? Who had to be deceived? Other Muslim scholars? They must have been aware of the pointlessness and vanity of all the efforts to maintain high standards of transmission, if forgery of isnads was part and parcel of the daily scholarly practice. 'মুসলমানদের সমগ্র হাদীছ সমালোচনা পদ্ধতি কি তবে কেবলমাত্র প্রতারণার কৌশলই ছিল? এতে কারা প্রতারিত হয়েছিল? অন্য মুসলিম বিদ্বানরা? যদি ইসনাদ জাল করাই তাদের বিদ্যাচর্চার প্রাত্যহিক অংশ হ'ত, তবে তাঁরা নিশ্চয়ই হাদীছ বর্ণনার উচ্চ মানদণ্ড ধরে রাখার জন্য তাঁদের যাবতীয় প্রচেষ্টার অর্থহীনতা ও অসারতা সম্পর্কে সচেতন হ'তেন! (অর্থাৎ এটি স্রেফ প্রতারণা হ'লে হাদীছের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণের জন্য তাদের এত পরিশ্রমের কোন অর্থই হয় না)। ৫১৬

গ. শাখত হাদীছের মুতাবা'আত ও শাওয়াহিদ বা সমান্তরাল সূত্রগুলিকে বানোয়াট হাদীছের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য একটি ব্যর্থ প্রয়াস মনে করেন এবং এগুলি আগাগোড়া জাল হিসাবে অনুমান করেন। যে বিষয়টি মুহাদ্দিছদের নিকট ইসনাদ ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী দিক বিবেচিত হয়, সেটিকে উল্টো জাল প্রমাণ করার জন্য শাখত, জুইনবল ও কুকের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা বিস্ময়কর। এর প্রতিউত্তর না দিয়ে কেবল এর ফলাফল কী হ'তে পারে তা নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ডেভিড পাওয়ার্সের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে উল্লেখ করা হ'ল। তিনি সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) হ'তে বর্ণিত একটি হাদীছ সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। হাদীছের ভাষ্য হ'ল, একবার সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসূল (ছা.) তাঁকে দেখতে গেলেন। এমতাবস্থায় তিনি রাসূল (ছা.)-কে বললেন, আমি (সম্পদ) অছিয়ত করতে চাই, আমার একটি মাত্র কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি অর্ধেক সম্পদ অছিয়ত করতে চাইলেন। রাসূল (ছা.) বললেন, অর্ধেক অনেক। তখন তিনি বলেন, তবে এক-তৃতীয়াংশ? রাসূল (ছা.) বললেন, ঠিক আছে এক-তৃতীয়াংশ করতে পার, তবে এক-তৃতীয়াংশও অনেক বেশী। ৫১৭ এই হাদীছটি জাল হিসাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এবং মাইকেল কুক। কিন্তু তাদের বিপরীতে ড. ডেভিড পাওয়ার্স তাঁর গবেষণায় হাদীছটির অন্যান্য সূত্রগুলো একত্রিত করে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন-
এক- এটি অস্বাভাবিক যে, আমরা আমাদের অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে কেবলমাত্র নবী মুহাম্মাদের বিবরণ ছাড়া এমন কোন তাবেঈ পাইনি, যিনি সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ অছিয়ত সম্পর্কে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছেন।

দুই- সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ৫৫ হিজরীতে। সুতরাং এটা কৌতূহলের বিষয় যে, ১ম হিজরী শতাব্দীর প্রান্তভাগে কোন ভাবেঈ তাঁর ব্যক্তিগত মতটি রাসূল (ছা.)-এর নামে বানোয়াটভাবে প্রচলন ঘটানোর জন্য এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন যিনি ১০ হিজরীতে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন!
তিন- সর্বোপরি এটা হয় অদ্ভুত কিংবা একটি চমকপ্রদ কাকতালীয় ঘটনা যে, ৬ জন তাবেঈ যারা উমাইয়া সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে অবস্থান করেন এবং ধারণা করা যায় প্রত্যেকেই স্বতন্ত্রভাবে হাদীছটি জাল করার কাজে লিপ্ত হয়েছিলেন, তারা অছিয়ত এক-তৃতীয়াংশে সীমাবদ্ধ করা এবং জাল সনদের মাধ্যমে তা রাসূল (ছা.)-এর বক্তব্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকলেই একই গল্প ফেঁদেছিলেন। আর সকলের জাল সনদ ঐ একজন ছাহাবীতে এসেই মিলিত হয়েছিল। যদি এই ঘটনাটি কোন জ্যেষ্ঠ তাবেঈ প্রথম আবিষ্কার করে থাকেন, তবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল যে, কনিষ্ঠ তাবেঈগণ ভিন্ন কোন ছাহাবীকে বেছে নেবেন, যাতে তাদের মতবাদটি আরও জোরালো হয়। ৫১৮

ডেভিড পাওয়ার্সের উপরোক্ত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শাখতীয় তত্ত্বের বাস্তবতা কতটা অস্বাভাবিক এবং সারবত্তাহীন।

ঘ. 'পারিবারিক ইসনাদ' তথা সন্তান<বাবা<দাদা, ভাগিনা<খালা, দাস<মনীব প্রভৃতি ইসনাদকে শাখত সাধারণভাবে অপ্রামাণ্য বলে দাবী করেছেন। তিনি মনে করেন, এই পদ্ধতি ইসনাদকে নিরাপদ দেখানোর একটি প্রয়াসমাত্র। ৫১৯ মুহাদ্দিছরাও কিছু কিছু পারিবারিক সনদকে দুর্বল বলেছেন। যেমন মা'মার ইবনু মুহাম্মাদের বর্ণনা তাঁর পিতা থেকে, ঈসা ইবনু আব্দিল্লাহ তাঁর পিতা থেকে, কাছীর ইবনু আব্দিল্লাহ তাঁর পিতা থেকে, মূসা ইবনু মাতির তাঁর পিতা থেকে, ইয়াহইয়া ইবনু আব্দিল্লাহ তাঁর পিতা থেকে প্রভৃতি ইসনাদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিছগণ আপত্তি করেছেন। ৫২০ কিন্তু এর ভিত্তিতে শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঢালাওভাবে সকল পারিবারিক ইসনাদকে অপ্রামাণ্য ঘোষণা করার কোন সুযোগ আছে কী? বরং পারিবারিক সনদের উপস্থিতি থাকাই তো অতি স্বাভাবিক। কেননা স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে, কোন পরিবারের কর্তার কর্মকাণ্ডকে তাঁর সন্তানরা অনুসরণ করেন কিংবা তাঁর উত্তরাধিকার বহন করেন। সুতরাং উত্তরাধিকার যদি জ্ঞানীয় সম্পদ হয়, তবে তাতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। নাবিয়া এ্যাবোট (১৯৮১খ্রি.) এই পারিবারিক ইসনাদকে প্রথম শতাব্দীতে হাদীছ সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন আনাস ইবনু মালিক এবং আব্দুল্লাহ ইবন্ আমর ইবনুল আছ (রা.)-এর পারিবারিক ইসনাদ, যারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর হাদীছ সংরক্ষণ করেছিলেন। ৫২১

শাখতের পারিবারিক ইসনাদ অস্বীকারের ধরনকে নিন্দা করে মুছত্বফা আল-আ'যামী (২০১৭খ্রি.) বলেন, তাঁর এই তত্ত্ব খণ্ডনের জন্য বেশীদূর যেতে হবে না। যদি পিতা সম্পর্কে পুত্রের বর্ণনা বা তার বিপরীত, কিংবা স্বামী সম্পর্কে স্ত্রীর বর্ণনা বা তার বিপরীত, কিংবা একজন সহকর্মী থেকে অপর সহকর্মীর বর্ণনা যদি সর্বদা অগ্রহণযোগ্য হয়, তবে এতদ্ভিন্ন আর কোন উপায়ে কারো জীবনী লেখা সম্ভব? এতদসত্ত্বেও পূর্ববর্তী মুহাদ্দিছগণ পারিবারিক ইসনাদকে পূর্ণভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং সন্দেহজনক ইসনাদসমূহকে পরিত্যাগ করেছেন। সুতরাং এ বিষয়ে শাখত প্রদত্ত উদাহরণগুলো পর্যালোচনারও বিশেষ প্রয়োজন নেই। ৫২২

ঙ. সর্বশেষে ইসনাদ পদ্ধতির ইতিহাস সম্পর্কে বলা যায়, এর শুরু হয়েছিল রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশাতেই। ছাহাবীরা পরস্পরকে সূত্র হিসাবে উল্লেখ করে নিজেদের মধ্যে হাদীছ বর্ণনা করতেন। পূর্ব থেকে আরবদের মধ্যে এই চর্চা ছিল বলে এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই রাসূল (ছা.)-এর যুগে অব্যাহত ছিল। তবে ফিতনা তথা ছিফফীন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে শী'আরা জাল হাদীছ রচনা শুরু করলে ইসনাদ ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পায়। অবশেষে হিজরী প্রথম শতকের শেষভাগে মুসলিম বিশ্বের শহরে শহরে শিক্ষাগার ছড়িয়ে পড়লে এবং জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তাবেঈদের মধ্যে রিহলা তথা বিভিন্ন শহরে ভ্রমণের সংস্কৃতি শুরু হ'লে ইসনাদ ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ পরিগ্রহণ করে। এটিই হ'ল ইসনাদ পদ্ধতি শুরুর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। জার্মান প্রাচ্যবিদ Josef Horovitz (১৯৩১খ্রি.) তাঁর Alter und Ursprung des Isnad প্রবন্ধে বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। ৫২৩ অতএব শাখতসহ তাঁর সমচিন্তকদের ধারণা মোতাবেক ইসনাদের জন্মকাল হিজরী ২য় শতাব্দীতে নয় বরং প্রথম শতাব্দীতেই।

আর ইসনাদ পদ্ধতির বাস্তবতা ও উপযোগিতা সম্পর্কে এতটুকুই বলা যায় যে, সহজভাবে বুঝতে গেলে ইসনাদ পদ্ধতি হ'ল বর্তমানে যেমন পিএইচ.ডি গবেষণা করা হয় কোন একজন শিক্ষকের অধীনে এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে কাজ করার পর একজন ছাত্র ডিগ্রি লাভ করেন, ঠিক তেমনই প্রক্রিয়া হ'ল ইসনাদ; যা একজন ছাত্র তাঁর শিক্ষকের নিকট যোগ্যতার পরীক্ষা দেয়ার পর লাভ করেন এবং পরবর্তীদের নিকট সেই জ্ঞান পৌঁছে দেন। এই ইসনাদ ব্যবস্থা মুসলিম উম্মাহর অনন্য গৌরবের স্মারক। মুহাদ্দিছরা সব সময়ই ইসনাদকে যেমন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি ইসনাদের বিচ্ছিন্নতা এবং এর মধ্যকার বিভিন্ন প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রত্যক্ষ ত্রুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁরা কোন রাবী অন্য রাবীদের নামে মিথ্যা বক্তব্য চালিয়ে দিতে পারেন এমন সম্ভাবনাও নাকচ করেন নি। আর একারণেই তাঁরা সনদের ত্রুটিসমূহ দূর করার জন্য শত-সহস্র কি.মি. দূরত্বের পথ অতিক্রম করতেন এবং রাবীদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিশ্চিত হ'তেন। ইলমুর রিজাল শাস্ত্রে তাঁরা সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারীর ব্যক্তি পরিচয় এবং তাঁর জীবনাচার সংরক্ষণ করেছেন। তারা প্রতিটি রাবীর শিক্ষক ও ছাত্রের তালিকা সংরক্ষণ করেছেন এবং এই শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে কারা তার অধিক থেকে অধিকতর নিকটবর্তী ছিল, তাদের মধ্যে স্তরভেদ করেছেন। এত সব আয়োজনের একটিই লক্ষ্য ছিল যেন কোন ব্যক্তি মিথ্যা হাদীছ রচনা করলে সহজেই তা চিহ্নিত করা যায়। আর এভাবে তাঁরা ইসনাদের মাধ্যমে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক পরিপূর্ণ হাদীছ সংরক্ষণ ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছেন। বিশ্ব ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বপ্রথম কোন যুগের লক্ষাধিক মানুষের জীবনী সংরক্ষণের প্রচেষ্টা, যা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান ও তথ্যভিত্তিক সভ্যতার এক আলোকজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুতরাং এই শাস্ত্রকে অস্বীকার করা এবং অগ্রাহ্য করা কেবল নিরেট অজ্ঞতা কিংবা জ্ঞানপাপেরই পরিচয়।

আবূ হাতিম আর-রাযী (২৭৭হি.) বলেন: لم يكن في أمة من الأمم منذ خلق الله آدم أمناء يحفظون آثار الرسول إلا في هذه الأمة আদম সৃষ্টির পর থেকে পৃথিবীতে এমন কোন জাতি অতিক্রান্ত হয়নি, যাদের মধ্যকার বিশ্বস্ত ব্যক্তিরা তাদের রাসূলের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করেছেন, একমাত্র এই মুসলিম উম্মাহ ব্যতীত। ৫২৪

ইবনুল মুযাফ্ফর আল-হাতিমী (৩৮৮হি.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ এই জাতিকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন ইসনাদের মাধ্যমে। প্রাচীন ও আধুনিক এমন কোন জাতি নেই, যাদের নিকট ইসনাদ রয়েছে। তাদের কাছে কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে মাত্র। তারা তাদের কিতাবের সাথে বহিরাগত সংবাদসমূহ মিশ্রিত করে ফেলেছে। তাদের নবীদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলের যা কিছু নাযিল হয়েছে এবং যা তারা অসমর্থিত ও অবিশ্বস্ত সূত্র থেকে সংগ্রহ করে তাদের কিতাবের সাথে জুড়ে দিয়েছে তা পার্থক্য করার কোন ক্ষমতা তাদের নেই। আর এই মুসলিম উম্মাহ প্রত্যেক যুগে বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার জন্য সুপরিচিত ব্যক্তির নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণ করেছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তারা এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। অতঃপর তার উপর কঠোর অনুসন্ধান চালিয়েছে যাতে তারা অধিক থেকে অধিকতর বিশুদ্ধ বর্ণনা সম্পর্কে অবগত হ'তে পারে। অতঃপর তারা হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছেন বিশ বা ততোধিক সূত্র থেকে, যতক্ষণ না তা থেকে ভুল-ভ্রান্তিগুলো দূর করা গেছে এবং তার প্রতিটি শব্দ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় নে'আমত। ৫২৫

ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) বলেন, একজন বিশ্বস্ত রাবী থেকে অপর একজন বিশ্বস্ত রাবী পর্যন্ত বর্ণনাপরম্পরার মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন সূত্রে রাসূল (ছা.) পর্যন্ত পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলিম জাতিকে অন্যান্য সকল জাতির উপর অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। আর অবিচ্ছিন্ন সূত্র ইহুদীদের নিকটও অনেক রয়েছে। কিন্তু তারা মূসা (আ.)-এর ততটুকু নিকটবর্তী হ'তে পারে না, যতটা আমরা মুহাম্মাদ (ছা.)-এর নিকটবর্তী হ'তে পারি। বরং তাদের অবস্থা হ'ল তারা এবং মূসা (আ.)-এর মাঝে রয়েছে ৩০টি যুগ বা প্রজন্মের দূরত্ব। তারা কেবল শামউন বা অনুরূপ কারো নিকটবর্তী হ'তে পেরেছে। ৫২৬
সুতরাং ইসনাদ পদ্ধতি সম্পর্কে শাখত বা কতিপয় প্রাচ্যবিদের শিশুতোষ কষ্টকল্পনা এবং বিভ্রান্তিকর অবৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার এই অমূল্য সম্পদ বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং বিশ্বসমাজে ইসনাদের অনন্য প্রতিরোধ শক্তি নতুনভাবে উদ্ভাসিত হয়।

টিকাঃ
৪৯৩. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 165-166.
৪৯৪. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 175.
৪৯৫. Mustafa al-Azami, On Schacht's Origins Of Muhammadan Jurisprudence, p. 167.
৪৯৬. ছহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫; খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১২২।
৪৯৭. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 36-37.
৪৯৮. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 165-166.
৪৯৯. এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য লেখকের মাস্টার্স থিসিস (অপ্রকাশিত(- مرویات الامامين عمرو بن دينار ومنصور بن المعتمر المعلة بالاختلاف عليهما في كتاب العلل للإمام الدارقطني )ইসলামাবাদ: ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ, ২০১৭) দ্রষ্টব্য।
৫০০. Jonathan Brown, Critical Rigour Vs Juridicial Pragmatism, p. 14.
৫০১. Ibid, p. 15-37.
৫০২. Uri Rubin, The Eye of the Beholder, p. 235-236.
৫০৩. Ibid, p.238.
৫০৪. Ibid, p. 260.
৫০৫. Herald Motzki, Dating Muslim Traditions, p. 221.
৫০৬. Jonathan Brown, Critical Rigor vs. Juridical Pragmatism, p. 8.
৫০৭. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 175. মজার ব্যাপার হ'ল, শাখত তাঁর গ্রন্থে উদাহরণ হিসাবে এমন কোন হাদীছের সনদ উল্লেখ করেননি যেখানে সংযোগসূত্র হ'লেন ছাহাবী বা তাবেঈ। কেননা এতে হাদীছের জন্মকাল প্রথম শতাব্দীতে স্বীকার করার ঝুঁকি নিতে হয়, যা তাঁর তত্ত্বের খেলাফ। গবেষক।
৫০৮. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪১৯-৪২১।
৫০৯. আয-যাহাবী, মীযানুল ই'তিদাল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪০-১৪১।
৫১০. হাকিম আন-নায়সাপুরী, মা'রিফাতু উলূমিল হাদীছ, পৃ. ৯৬-১০২।
৫১১. Michel cook, Early Muslim Dogma: A source-Critical Study, p. 116.
৫১২. Mustafa al-Azami, On Schacht's Origins Of Muhammadan Jurisprudence, р. 200.
৫১৩. Herald Motzki, 'Dating Muslim Traditions', p. 235.
৫১৪. Herald Motzki, Whither Hadith Studies, p. 50-54; Idem, Dating Muslim Traditions, p. 227-228; Idem, Al-Radd Ala l-Radd: Concerning the Method of Hadith Analysis, published in Analysing Muslim Tradition, p. 210-211.
৫১৫. Herald Motzki, Dating Muslim Traditions, p. 235.
৫১৬. Ibid, p. 235.
৫১৭. ছহীহুল বুখারী, ২৭৪৩-২৭৪৪, ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৮।
৫১৮. David S. Powers, On Bequests in Early Islam, p. 195.
৫১৯. Joseph Schacht, The Origins of Muhammadan Jurisprudence, p. 170.
৫২০. Mustafa al-Azami, On Schacht's Origins Of Muhammadan Jurisprudence, p. 197.
৫২১. Nabia Abbott, Studies In Arabic Literary Papyri, Vol. II, P. 32-33.
৫২২. Mustafa al-Azami, On Schacht's Origins Of Muhammadan Jurisprudence, p. 197.
৫২৩. Ibid, p. 154-155, 167-167.
৫২৪. শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩০।
৫২৫. খত্বীব আল-বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃ. ৪০; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩০।
৫২৬. نقل الثقة عن الثقة يبلغ به النبي صلى الله عليه وسلم مع الاتصال، خص الله به মুসলিমين دون سائر الملل، وأما مع الإرسال والإعضال فيوجد في كثير من اليهود، لكن لا يقربون من موسى قربنا من محمد صلى الله عليه وسلم، بل يقفون بحيث يكون بينهم وبين موسى أكثر من ثلاثين عصرا، وإنما يبلغون إلى شمعون ونحوه। দ্র. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০৪।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৫ : ইলমুর রিজাল শাস্ত্র মুহাদ্দিছদের নিজস্ব রচনা

📄 সংশয়-৫ : ইলমুর রিজাল শাস্ত্র মুহাদ্দিছদের নিজস্ব রচনা


প্রাচ্যবিদগণ মুহাদ্দিছদের রচিত রাবীদের জীবনী শাস্ত্রের উপর আস্থা রাখেন না। তারা মনে করেন এগুলো মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনা, যার নির্ভরযোগ্যতা খতিয়ে দেখার সুযোগ নেই। তারা আরও মনে করেন যে, একজন রাবী সত্যবাদী বা ন্যায়পরায়ণ হলেই কি তার বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য? এমন কি হ'তে পারে না, যে তিনি তার স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নি?

পর্যালোচনা:
ইলমুর রিজাল বা রাবীদের জীবনী শাস্ত্র হ'ল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম জীবনচরিতভিত্তিক বিশ্বকোষ, যা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান অনুশীলন ও তথ্য সংরক্ষণের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। স্প্রেঙ্গার (১৮৯৩খ্রি.) বলেন, মুসলমানদের রচনাসম্ভারের একটি গৌরবজ্জ্বল দিক হ'ল এর জীবনচরিত সমগ্র। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই আর না অতীতে কখনও ছিল যারা বারো শতাব্দীকাল ধরে সকল বিদ্বান মানুষের জীবনী নথিভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যদি মুসলমানদের জীবনীমূলক রচনাসমূহ একত্রিত করা হয়, তবে সম্ভবত আমরা প্রায় পাঁচ লক্ষ বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবনচরিতের সন্ধান পাব। ফলে তাদের ইতিহাসের এমন একটি যুগ পাওয়া যাবে না এবং এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাওয়া যাবে না, যেখানে তাদের কোন প্রতিনিধি নেই (অর্থাৎ সকল যুগের এবং সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মানুষের জীবনী সংরক্ষিত হয়েছে)। ৫২৭

শিবলী নো'মানী (১৯১৪খ্রি.) বলেন, 'কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের এই গৌরবের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া যাবে না। তারা তাদের নবী (ছাঃ)-এর জীবনেতিহাস ও ঘটনাবলীর একেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশকে এমনভাবে সংরক্ষণ করেছেন যে, আজ পর্যন্ত অন্য কোন ব্যক্তির জীবনেতিহাস এরূপ বিশুদ্ধ পন্থায় পূর্ণাঙ্গভাবে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভবনা নেই'। ২৮

সুতরাং এই বিরাট তথ্যসম্ভারকে যারা কেবল মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনা হিসাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে চান, তারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, হঠকারী ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাছাড়া জ্ঞানীরাই জ্ঞানের মূল্যায়ন করতে পারেন, অজ্ঞরা নয়। সুতরাং তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি স্রেফ অজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে। নিম্নে তাদের আপত্তি খণ্ডন করা হ'ল।

ক. মুহাদ্দিছগণ রাবীদের সম্পর্কে যে সকল তথ্য একত্রিত করেছেন, তা তাদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন নয়; বরং তারা বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ এসব জীবনীগ্রন্থে নথিভুক্ত করেছেন। এসকল নথি রচনার পিছনে তাঁদের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ ছিল না যে, রাবীদের প্রতি নিজস্ব স্বার্থপ্রণোদিত কোন মন্তব্য করবেন। তাছাড়া জীবনীগ্রন্থের সংখ্যা একটি/দু'টি নয়, বরং দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষভাগে এই রচনাকর্ম শুরু হয়েছিল এবং নবম শতাব্দী পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অনেক জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তথ্যসমূহ যাচাই-বাছাই (Cross-check) হয়েছে। তাই এ সকল জীবনীগ্রন্থ সাধারণ ইতিহাসগ্রন্থের চেয়ে বহু গুণ বেশী নির্ভরযোগ্য। এখন প্রশ্ন হ'ল, যদি গবেষকদের নিকট প্রাচীন কোন ইতিহাসগ্রন্থ তথ্যসূত্র হিসাবে গৃহীত হয়ে থাকে, তবে ঠিক কোন যুক্তিতে রাবীদের জীবনীগ্রন্থসমূহকে তথ্যসূত্র হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না? তাছাড়া ইতিহাসের অন্য সব তথ্যের মত এই তথ্যগুলোও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত গবেষণারীতির দাবীকে অগ্রাহ্য করে যদি এক লহমায় এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ বর্জন করা হয় কেবল মুহাদ্দিছদের একপেশে রচনার অভিযোগ তুলে, তবে একই অভিযোগে অন্যান্য সকল প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থও কেন বর্জন করা হবে না? কেননা সেগুলিও তো কোন এক মানুষের হাতেই লিখিত। আর প্রতিটি মানুষ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ইতিহাস রচনা করে থাকেন, ভিন্ন কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। প্রাচ্যবিদগণ কি তবে পর্বযুগের সমস্ত ইতিহাসগ্রন্থ এবং ঐতিহাসিক নথিসমূহ বর্জন করে এক ইতিহাসশূন্য পৃথিবী দেখার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন?

খ. রাবী ন্যায়পরায়ণ হ'লেই তাঁর সকল বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নয়। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তিনি যদি কোন হাদীছ বর্ণনা করেন, তবে সাধারণভাবে তা গ্রহণযোগ্যই হবে। কেননা স্বাভাবিক প্রকৃতিগত দাবী মোতাবেক মুহাদ্দিছগণ বর্ণনাকারীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হন এবং যতক্ষণ না তার মধ্যে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, ততক্ষণ তাকে সত্যবাদী হিসাবেই ধরে নেন। আর সত্যবাদিতাকেই তাঁদের যোগ্যতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। কেননা ইসলামে ন্যায়পরায়ণতার মূল্য সবচেয়ে বেশী। ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যবাদিতার কারণেই কোন মানুষের ভেতর নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং যখন তিনি ন্যায়পরায়ণ তথা সত্যবাদী হন, স্বাভাবিকভাবে তাঁর বর্ণনার ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। অপরপক্ষে কোন ব্যক্তির উপর প্রমাণহীনভাবে সন্দেহ পোষণ করা এবং মিথ্যারোপ করা ইসলামের নীতিমালা বহির্ভূত।

গ. সত্যবাদী ব্যক্তিও কোন স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হ'তে পারেন কি না?- এর জবাবে আমরা বলব, অবশ্যই পারেন। কিন্তু তা প্রমাণসাপেক্ষ। যদি তা প্রমাণিত হয়, এমনকি যদি এ ব্যাপারে সামান্য সন্দেহও সৃষ্টি হয়, তবে মুহাদ্দিছগণ সেই রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করেন না। আবার ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণ করলেও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করেন। এ কারণেই ইবনু শিহাব আয-যুহরী (১২৪হি.)-এর মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছও যখন মুরসাল তথা বিচ্ছিন্ন সূত্রে কোন হাদীছ বর্ণনা করেন, তখন তাঁর বর্ণনা মুহাদ্দিছগণ গ্রহণ করেন না। ইবনু জুরাইজ (১৫০হি.)-এর মত সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ যখন কোন হাদীছ 'আনআনাহ' সূত্রে তথা সরাসরি শিক্ষকের নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন এমন কথা স্পষ্টভাবে না বলেন, তখন তার হাদীছ গ্রহণ করা হয় না। কেননা তিনি 'তাদলীস' তথা কখনও কখনও স্বীয় শিক্ষকের নাম উল্লেখ না করে সনদ বর্ণনা করতেন বলে অভিযোগ ছিল। সুতরাং মুহাদ্দিছগণ কখনই কোন রাবীর নিকট থেকে নির্বিচারে হাদীছ গ্রহণ করেন না, তিনি যতই সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ হোন না কেন।

ঘ. মুহাদ্দিছগণ সবকিছুর উপর কেন রাবীর ন্যায়পরায়ণতা বা সত্যবাদিতাকে এত গুরুত্ব দিলেন? এ বিষয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফ্রেড ডোনার (জনা: ১৯৪৫খ্রি.)-এর একটি পর্যবেক্ষণ বেশ গুরুত্বের দাবী রাখে। তিনি বলেন, 'এটা স্বাভাবিক ছিল যে, যখন মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের জন্য পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি হ'ল, তখন মুসলমানরা এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য ধর্মনিষ্ঠতা বা সত্যবাদিতার বিচারকে সর্বপ্রথমে অগ্রাধিকার দিলেন। মানব সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কিংবা কোন ব্যক্তির অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য যেসব বৈশিষ্ট্য ব্যবহৃত হয় তা হ'ল- গোত্রীয় বা পারিবারিক পরিচয়, ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা সম্পত্তি, শ্রেণী, জাতীয়তা প্রভৃতি। কিন্তু ইসলামের মৌলিক কাঠামোতে এসবের কোন স্থান নেই। এজন্য সংক্ষেপে বলা যায়, প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের নিকট আইনী বৈধতার অর্থ ছিল ধর্মনিষ্ঠতা (তাক্বওয়া)- এর ভিত্তিতে আইনী বৈধতা। ১৫২৯

মুসলমানদের এই ধর্মনিষ্ঠতার ধারণাটিই সম্ভবত প্রাচ্যবিদদের জন্য হজম করা কঠিন হয়। কেননা তাঁরা মনে করেন, একটি বিবাদ মেটানোর জন্য পক্ষগুলোর পারস্পরিক স্বার্থই প্রধান বিচার্য বিষয়, এখানে 'ধর্মনিষ্ঠতা'র বিবেচনা অস্বাভাবিক। একই ঘটনা ঘটেছে মুহাদ্দিছদের 'ন্যায়পরায়ণতা'র শর্ত অনুধাবনের সময়ও। কেননা তাদের ধারণায় এখানে প্রধান বিচার্য বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল এ সকল বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিস্বার্থ, তাদের ধর্মনিষ্ঠতা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এজন্য গোল্ডজিহের, শাখত বারাংবার হাদীছ বর্ণনার পিছনে রাবীদের ব্যক্তিস্বার্থ খুঁজেছেন। কিন্তু ইসলাম জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছে ধর্মনিষ্ঠতাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে, ইহকালে ও পরকালে ধর্মনিষ্ঠতা বা তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়। এমনকি এই শ্রেষ্ঠত্বের মূল্য জাতি, বর্ণ, সম্পদশালীতা এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সর্বপ্রকার স্বার্থের ঊর্ধ্বে। আর যখন এই শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হয়, তখন মানুষের নিকট সকল প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ তুচ্ছ হয়ে যায় এবং নৈতিক ও পরকালীন স্বার্থই সর্বাগ্রে প্রাধান্য পায়, যা প্রাচ্যবিদগণ অনুধাবন করতে অপারগ।

টিকাঃ
৫২৭. The Glory of the literature of the Mohammadans is its literary biography. There is no nation nor has there been any which like them has during the twelve centuries recorded the life of every man of letters. If the biographical records of the Musalmans are collected, we should probably have accounts of the lives of half a million of distinguished persons, and it would be found that there is not a decennium of their history, nor a place of importance which has not its representatives (Alov Sprenger, Introduction to "Al-Isabah" by Ibn-i-Hazar, A biographical dictionary of persons who knew Muhammad (Bishops College press, Calcutta, 1856), গৃহীত: ড. আব্দুর রউফ যাফর, উলূমুল হাদীছ, পৃ. ১২১)।
৫২৮. ড. মোহাম্মাদ বেলাল হোসেন, হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরূপণ: প্রকৃতি ও পদ্ধতি (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ২০০৯ খ্রি.), পৃ. ৬৬; গৃহীত: শিবলী নু'মানী, সিরাতুন নাবাভী, ১ম খণ্ড (করাচী: দারুল ইশা'আত, ১৯৮৪ খ্রি.), পৃ. ১১।
৫২৯. It was natural.. that when there arose within the community of Believers political and social tensions and disputes over leadership.. the Believers first resorted to considerations of piety to resolve those issues. Other distinctions commonly used in human societies to settle disputes and establish an individual's status- tribal or family affiliation, historical associations, or claims based on property, class, ethnicity, etc.- do not appear as part of the original Islamic scheme of things.....Legitimation among earliest believers, in short, meant legitimation through piety (Taqwa). Fred M. Donner, Narratives of Islamic Origins (Princeton, New Jersey: The Darwin press, 198), p. 98-99.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00