📄 সংশয়-৩ : হাদীছ প্রায়শই বিবেক ও যুক্তিবিরোধী
হাদীছ অস্বীকারকারীদের দাবী হ'ল, অনেক হাদীছ রয়েছে স্বাভাবিক মানবীয় বিবেক-বুদ্ধির বিরোধী। ইসলাম বিবেকসম্মত ধর্ম। অতএব বিবেকবিরুদ্ধ এ সকল হাদীছ গ্রহণযোগ্য হ'তে পারে না। হাদীছের প্রতি সন্দেহবাদী কিছু ব্যক্তিও অনুরূপ ধারণা করেন যে, হাদীছের সনদ ছহীহ হ'লেও মতন যদি বিবেকবিরুদ্ধ হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং সকল হাদীছকে আকুল দিয়ে যাচাই করতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমেরও অনেক হাদীছ অস্বীকার করেন। তারা রাসূল (ছা.)-এর মু'জিযাসমূহ, তাঁর যাদুগ্রস্থ হওয়া, কবরের আযাব, শাফা'আতসহ বহু গায়েবী বিষয় অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, نأخذ بنص الكتاب وبدليل العقل 'আমরা কেবল কিতাব থেকে এবং আকূল বা বিবেক থেকে দলীল গ্রহণ করব। অতীতে মু'তাযিলাগণ এই যুক্তি পেশ করে বিশেষত অদৃশ্যের জ্ঞান বিষয়ক হাদীছসমূহ অস্বীকার করেছিল এবং বর্তমানেও হাদীছ অস্বীকারকারীদের অধিকাংশই এই যুক্তি অবলম্বন করেন। মিসরীয় বিদ্বান মুহাম্মাদ আল-গায্যালী (১৯১৭-১৯৯৬খ্রি.) তাঁর প্রসিদ্ধ 'ফিকহুস সীরাহ' গ্রন্থের শুরুতে 'কিতাবুল ফিতান' সম্পর্কিত সকল হাদীছ অস্বীকার করেছেন। তিনি ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, কবরের আযাবও তিনি স্বীকার করেন না; অথচ ছহীহ বুখারীতে তা বর্ণিত হয়েছে! তাঁর বক্তব্য হ'ল, وأعرضت عن أحاديث أخرى توصف بالصحة؛ لأنها في فهمي لدين الله، وسياسة "‘আল-দাওয়াহ’- لم تنسجم مع السياق العام পরিণ্যাত করেছি, যা কিনা ছহীহ বলে কথিত! কেননা আল্লাহর দ্বীন এবং দাওয়াতী কৌশলসমূহ সম্পর্কে এ সকল হাদীছ আমার বুঝ মোতাবেক সাধারণ পারিপার্শ্বিকতার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।"
পর্যালোচনা:
প্রথমেই জানা প্রয়োজন যে, রাসূল (ছা.) হ'তে বর্ণিত হাদীছকে নিরংকুশভাবে আকুল তথা বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে বিচার করার নীতি প্রাথমিক যুগের বিদ'আতী দলগুলো কর্তৃক উদ্ভাবিত। এই নীতি সর্বযুগে নবী- রাসূলদেরকে অস্বীকারকারী কাফের ও মুশরিকদের অনুসৃত নীতি। ইবনুল কাইয়িম (৭৫২হি.) বলেন, معارضة أمر الرسل أو خيرهم بالمعقولات إنما هي
طريقة الكفار، ومن تأمل معارضة المشركين للرسل بالعقول وجدها
أقوى من معارضة الجهمية 'রাসূলগণ এবং তাদের প্রদত্ত সংবাদসমূহকে বুদ্ধি- বিবেক দ্বারা প্রতিরোধের চেষ্টা, এটি কাফেরদের অনুসৃত পথ। যদি কেউ রাসূলদের বিরোধিতায় মুশরিকদের বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার সম্পর্কে গবেষণা করে, তবে তা জাহমিয়া (নব্য বুদ্ধিবাদী দল)-দের থেকে অধিকতর শক্তিশালী পাবে। ইবনু আবীল ইয (৭৯২হি.) বলেন, بل كل فريق من أرباب البدع
يعرض النصوص على بدعته، وما ظنه معقولا শরী'আতের নছসমূহ (কুরআন ও হাদীছ)- কে তাদের বিদ'আতী পথ ও মতের উপর স্থাপন করে, যাকে তারা বিবেকসম্মত ধারণা করে (অতঃপর যা বিবেকসম্মত মনে হয় তা গ্রহণ করে, আর যা বিবেকবিরুদ্ধ মনে হয়, তা বর্জন করে)। অনুরূপভাবে আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.)-ও উল্লেখ করেছেন, فإن محصول مذهبهم تحكيم عقول الرجال دون الشرع، وهو أصل من الأصول التي بني عليها أهل الابتداع في الدين، بحيث إن الشرع إن وافق آراءهم قبلوه، وإلا ردوه 'তাদের মতবাদের সারকথা হ'ল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে শরী'আতের ওপর স্থান দেয়া। এটাই হ'ল বিদ'আতীদের অন্যতম মূলনীতি যা তারা দ্বীনের মধ্যে প্রয়োগ করে। যদি শরী'আত তাদের মতের সাথে মিলে যায়, তবে গ্রহণ করে আর যদি না মিলে তবে বর্জন করে।
সুতরাং বিদ্বানদের এ সকল বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হাদীছ গ্রহণ ও বর্জনে আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তিকে চূড়ান্ত মানদণ্ডে পরিণত করা যুগে যুগে বিদ'আতী দলসমূহের অনুসৃত নীতি। সুতরাং বর্তমান যুগেও যারা এই দাবী তুলেছেন, তারা কোন না কোন সূত্রে এই দলসমূহের উত্তরসূরীর ভূমিকা পালন করছেন। নিম্নে তাদের যুক্তিসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।
ক. নিঃসন্দেহে ইসলাম হ'ল ফিতরাতী বা প্রাকৃতিক নিয়ম সম্মত ধর্ম, যার সকল আইন ও বিধান মানুষের স্বাভাবিক ও সুস্থ বুদ্ধির অনুকূলে। যে দ্বীনের নিয়ম-কানুনসমূহ বিবেকবিরোধী, তা কখনও প্রাকৃতিক ধর্ম নয় বরং মনগড়া, কপোলকল্পিত ধর্ম। ফলে কেবল ইসলামের বিধানসমূহই নয়, বরং তার সকল চিন্তাধারাই বিবেকসম্মত। শরী'আতের সাথে সাথে ইসলাম তাই বুদ্ধিবৃত্তিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের বারবার মানুষকে চিন্তা-গবেষণার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কখনও কখনও মানুষের বিবেক এবং অহীর মাঝে বাহ্যিক বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে যে কারণ তা হ'ল, আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান ও তথ্য লাভের জন্য যে সকল মাধ্যম দান করেছেন, তার প্রতিটির নিজস্ব একটি গণ্ডি রয়েছে এবং এই গণ্ডির মধ্যকার বিষয়বস্তুই কেবল সে ধারণ করতে পারে। ফলে তার গণ্ডির বাইরে এই মাধ্যমগুলো আর কার্যকর থাকে না। এই মাধ্যমগুলোর প্রথমটি হ'ল, পঞ্চেন্দ্রিয় (The Five Senses)। এই জ্ঞান কম-বেশী পৃথিবীর সকল প্রাণীকূলকে আল্লাহ দান করেছেন, যা দ্বারা দৈনন্দিন সকল কর্ম সম্পাদিত হয়। কিন্তু এখানেই আল্লাহ জ্ঞানের সীমানা নির্ধারণ করে দেননি; বরং দ্বিতীয় পর্যায়ে পঞ্চেন্দ্রিয় বহির্ভূত অপর এক মাধ্যম দান করেছেন, আর তা হ'ল আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তি (Intellect)। একে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ও বলা হয়।
এই পর্যায়ের জ্ঞানই মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা করে দিয়েছে। আর এর মাধ্যমেই সে পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পরিভ্রমণ করতে পারে। কিন্তু এই আকূলেরও একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি রয়েছে, যার মধ্যকার সবকিছুকে সে আয়ত্ত্ব করতে পারে। কিন্তু তার বাইরে সে আর কর্মক্ষম থাকে না। কিন্তু এখানেও আল্লাহ জ্ঞানের সীমানা নির্ধারণ করে দেননি। বরং এই তৃতীয় পর্যায়ের জন্য আল্লাহ জ্ঞানলাভের অপর একটি মাধ্যম দান করেছেন। আর তা হ'ল অহী (Revelation)। আর এটি মানুষের জন্য জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমানা হিসাবে পরিগণিত। আর এটিই হ'ল সেই স্থান, যেখানে এসে একজন মুমিন ব্যক্তি এবং একজন ঈমানহীন ব্যক্তির মাঝে পার্থক্যরেখা সূচিত হয়। একজন মুমিনের ঈমানের স্বীকৃতি বাস্তবায়িত হয় অহীর জ্ঞানের নিকট নিঃশর্ত আত্মসমার্পণের মাধ্যমে।
এখানে কয়েকটি বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন তা হ'ল, প্রথমত, আকূলের সাথে অহীর জ্ঞান কখনই সমতুল্য নয়। কেননা একটি হ'ল সসীম জ্ঞান, অপরটি হ'ল চূড়ান্ত জ্ঞান। যেখানে আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তির সীমানা শেষ হয়ে যায়, ঠিক সেখান থেকে অহীর সীমানা শুরু হয়। সুতরাং যে পর্যায়ে এসে আমরা অহীর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি সেখানে বুদ্ধিবৃত্তির কোন অনুপ্রবেশ নেই এবং তা ব্যবহার করতে চাওয়াই হ'ল নির্বুদ্ধিতার কাজ। যদিও এর অর্থ নয় যে, এক্ষেত্রে আকুল ব্যবহার করা অর্থহীন। কিন্তু তা হ'তে হবে তার নিজস্ব গণ্ডি ও সীমারেখার মধ্যে।
দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসহ যে সকল আকুলী বা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান রয়েছে, তা সীমাহীন নয়, বরং তা 'যান্নী' বা প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তিশীল, যা ভুল বা সঠিক উভয়ই হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। সুতরাং অহীর অকাট্য এবং চূড়ান্ত জ্ঞানকে পরীক্ষা করার জন্য প্রবল ধারণাভিত্তিক জ্ঞানকে কোনভাবেই মানদণ্ড হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। কেননা আকুল বা বৃদ্ধিবৃত্তির জন্য এমন কোন ধরাবাঁধা নীতি নেই, যার সাহায্যে সত্য বা মিথ্যা চূড়ান্তভাবে পার্থক্য করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, আকুল এবং অহী উভয়ই মানুষের হেদায়েত বা পথনির্দেশ লাভের জন্য দু'টি মাধ্যম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ই পরস্পরের সহযোগী। অতএব উভয়ের মাঝে যদি কোন দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তবে তা নিশ্চিতভাবে মৌলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং বাহ্যিক। এজন্য প্রথমে আকুল এবং অহীর মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা চালাতে হবে। কিন্তু যদি সমন্বয় করা সম্ভব না হয়, তবে একটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। অর্থাৎ সেটি হ'ল অহী। কেননা আকূল হ'ল 'যান্নী' বা প্রবল ধারণানির্ভর জ্ঞান এবং অহী হ'ল 'কাতৃঈ' বা অকাট্য জ্ঞান।
আকুল এবং অহী'র পার্থক্য সম্পর্কে এই মৌলিক বিষয়টি মাথায় রেখেই ইসলামী শরী'আতের বিধি-বিধানসমূহকে যাচাই করতে হবে। কেননা যে সকল ছহীহ হাদীছের সমালোচনা করা হয়েছে, তার অধিকাংশই এই কারণে যে, হাদীছ অস্বীকারকারীদের নিকট তা বাহ্যিকভাবে আকুল বা আধুনিক বিজ্ঞানের খেলাফ প্রতীয়মান হয়। যদিও বাস্তবতায় তা মূলত অগভীর চিন্তাধারা এবং আকূলের অপব্যবহার করারই ফলশ্রুতি। তারা এক্ষেত্রে মৌলিক যে ভুলটি করেন তা হ'ল, অহী এবং আকূলকে তাঁরা সমমর্যাদার স্থানে বসিয়ে থাকেন কিংবা অহীর জ্ঞানের ওপর আকূলকেই অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
খ. মুহাদ্দিছগণ হাদীছের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আকূলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন, তবে তা যথারীতি নিজস্ব সীমারেখার মধ্যে। আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী (১৯৬৬খ্রি.) বলেন, হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের সময় চারটি স্থানে মুহাদ্দিছগণ আকুলের ব্যবহার করেছেন। যথা:
(১) হাদীছটি শ্রবণ বা অবগত হওয়ার সময়। এসময় তারা হাদীছ বর্ণনাকারীর ভৌগলিক অবস্থান, বয়স, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সবকিছু যাচাই করেন অর্থাৎ তিনি সঠিকভাবে হাদীছটি শ্রবণ করেছেন কিনা তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার হাদীছ গ্রহণ করা হয় না। 'মুরসাল' ও 'তাদলীস' এক্ষেত্রে বড় দু'টি উদাহরণ। অর্থাৎ বর্ণনাকারী যত বড় পণ্ডিত ও নির্ভরযোগ্যই হন না কেন, যদি সঠিকভাবে শ্রবণ করেছেন বলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হয়, তবে তার হাদীছ অগ্রহণযোগ্য হয়।
(২) হাদীছটি বর্ণনাকালে। এই পর্যায়ে তারা বর্ণনাকারী কয়েকটি গুণ অনুসন্ধান করেন। যেমন: (ক) মুসলিম হওয়া। (খ) বয়ঃপ্রাপ্তি। (গ) বুদ্ধিসম্পন্নতা। (ঘ) সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা। (ঙ) মেধা বা সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রভৃতি।
(৩) বর্ণনাকারীদের ওপর হুকুম আরোপ করার সময়। এই পর্যায়ে তারা বর্ণনাকারীদের বর্ণনাসমূহের মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করেন। যদি এমন হয় যে, কোন বর্ণনাকারীর বর্ণনা অপর বর্ণনাকারীদের সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে তারা ঐ একক বর্ণনাকারীকে 'মুনকার', 'মুযতারিব' হিসাবে চিহ্নিত করেন। এভাবে তাঁরা বর্ণনাকারীদের বর্ণিত প্রতিটি হাদীছ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন এবং বৈপরীত্য অনুসন্ধান করেন।
(৪) হাদীছের ওপর শুদ্ধাশুদ্ধির হুকুম আরোপ করার সময়। এ পর্যায়ে তারা দেখেন যে, হাদীছের বিষয়বস্তু স্বতঃসিদ্ধ বিবেকের বিরোধী কি না। কেননা বিবেকের বিরোধিতা হাদীছ জাল হওয়ার অন্যতম নিদর্শন। যেমন ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) হাদীছ জাল হওয়ার আলামতসমূহ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, أن يخالف الحديث العقل ولا يقبل تأویلا 'হাদীছটি এমন বিবেকবিরোধী হয়, যা কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।
অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণ হাদীছ যাচাইয়ের সময় বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যবহার করেন না- এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে হাদীছ অস্বীকারকারীদের সাথে মুহাদ্দিছদের নীতির পার্থক্য হ'ল তারা আকুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কখনও সীমা অতিক্রম করেন না বা স্বেচ্ছাচারিতামূলক সারলীকরণ করেন না। বরং কোন হাদীছ বিবেকবিরোধী মনে হ'লে বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুণঃনিরীক্ষণ করেন। অতঃপর যদি সবদিক থেকে হাদীছটি ত্রুটিমুক্ত পান, তবে আকূলকে নাকুল তথা অহীর জ্ঞানের অনুবর্তী করে দেন এবং হাদীছটির পক্ষে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর মাধ্যমে সমন্বয় করেন। কেননা অহী হ'ল অকাট্য জ্ঞান এবং আকূল হ'ল প্রবল ধারণানির্ভর অনিশ্চিত জ্ঞান, যা কখনও অহীর ওপর প্রাধান্য পেতে পারে না। যেমন আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, إذا تعاضد النقل والعقل على المسائل الشرعية؛ فعلى شرط أن يتقدم النقل فيكون متبوعا، ويتأخر العقل فيكون تابعا، فلا يسرح العقل في مجال النظر إلا بقدر ما يسرحه النقل 'যদি শারঈ বিধানে নাকুল (অহী) এবং আকুল (বুদ্ধিবৃত্তি) পরস্পরকে শক্তিশালী করে, তবুও শর্ত হ'ল নকূলকে অগ্রগণ্য করতে হবে। ফলে তা হবে অনুসরণীয় এবং আকূলকে পশ্চাদগামী করা হবে এবং তা হবে অনুসারী। আর বিতর্কের ক্ষেত্রে আকুলকে উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করা যাবে না, নকুল যতটুকু শিথিলতা দিয়েছে ততটুকু ব্যতিরিকে। অর্থাৎ আকুলকে সর্বদা ব্যবহার করতে হবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুকূলে রেখে।
গ. মুহাদ্দিছরা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে আকূলের চেয়ে বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ত তার ওপর অধিকতর নির্ভর করেছেন কেন?- এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায় মানুষের আকুল পূর্ণাঙ্গ নয়। আকূলের ব্যবহারও বহুমুখী এবং প্রাসঙ্গিকতাভেদে পরিবর্তনশীল। ফলে যে কোন তথ্যের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে মুহাদ্দিছদের নিকট তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য কোন ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষী যা বর্ণনা করেন তাকে তারা সর্বাধিক প্রাধান্য দেন। জ্ঞান সংরক্ষণে এটিই তাদের নিকট সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। একই দৃষ্টান্ত দেখা যায় পৃথিবীর সকল আদালত ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে। এ সকল আদালতসমূহও প্রধানত সত্য সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল। আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ الاعتصام গ্রন্থের ১০ম অধ্যায়ে আকূলের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তির জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা সে অতিক্রম করতে পারে না। সে তার প্রতিটি কাংখিত বস্তুকে নিজের বোধগম্যতার অধীনস্ত করতে পারে না। যদি তা করতে পারত, তবে অতীত ও বর্তমানে কি ঘটছে না ঘটছে সবকিছুই বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তি মহান প্রভুরই সমকক্ষ হয়ে যেত। আর যদি সে সব বুবোই ফেলত, তবে কীভাবে বুঝত? কেননা আল্লাহর জ্ঞানের কোন সীমা-পরিসীমা নেই, কিন্তু মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। যা সসীম তা কখনও অসীমের সমকক্ষ হ'তে পারে না।
দ্বিতীয়ত, আকুল দ্বারা হাদীছ যাচাই করতে গেলে অবশ্যই তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হ'ত। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ফিকহী গ্রন্থসমূহ। এসব গ্রন্থের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বিভিন্ন ইজতিহাদী বিধান নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আকুলী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রায় প্রদান করেছেন। হাদীছের ক্ষেত্রেও যদি এমন নিজস্ব বিবেক অনুযায়ী শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের সুযোগ দেয়া হ'ত, তবে হাদীছ শাস্ত্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন হ'ত। এজন্য তাঁরা এ সকল যুক্তিভিত্তিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার জন্য হাদীছ যাচাইয়ের সময় অত্যন্ত সচেতনভাবে আকূলের ব্যবহারকে সর্বব্যাপী হ'তে দেন নি, বরং তা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রেখেছেন।
আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) এই বিতর্কের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন। তিনি হাদীছ অস্বীকারকারীদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন যে, হাদীছ যাচাইয়ে তারা যে আকূলকে প্রাধান্য দিতে বলছেন, সেটি কোন আকুল?
দার্শনিকদের আকুল? তাদের মধ্যে অসংখ্য মতভেদ রয়েছে। পূর্ববর্তীদের সাথে পরবর্তীদের মিল নেই।
সাহিত্যিকদের আকুল? তারা তো কেবল গল্প-কাহিনী নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
أن الله جعل للعقول في إدراكها حدا تنتهي إليه لا تتعداه، ولم يجعل لها سبيلا إلى 020 الإدراك في كل مطلوب. ولو كانت كذلك لاستوت مع الباري تعالى في إدراك جميع ما كان وما يكون وما لا يكون، إذ لو كان كيف كان يكون، فمعلومات الله - لا تتناهى ومعلومات العبد متناهية والمتناهي لا يساوي ما لا يتناهى. শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৩১।
চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা গণিতজ্ঞদের আকুল? তাদের সাথে শারঈ বিধানের সম্পর্ক কী?
মুহাদ্দিছদের আকুল? তার ওপর তো যুক্তিবাদীরা বিশ্বাস করে না, বরং তা অগভীর এবং সরল আবেগ বলে তাচ্ছিল্য করেন।
ফক্বীহদের আকুল? তাদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য মাযহাব। আর তাদের বুদ্ধিবৃত্তিও তো যুক্তিবাদীদের নিকট মুহাদ্দিছদের মতই অগভীর!
ধর্মহীনদের আকুল? তারাও অসংখ্য দলে বিভক্ত। কারো সাথে কারো চিন্ত াধারার মিল নেই।
এখন যদি তারা বলেন যে, আমরা মুমিনদের আকুলের ওপর আস্থা রাখি যারা এক আল্লাহ এবং ইসলামের প্রতি বিশ্বাস রাখেন। তবে প্রশ্ন আসবে, কোন মাযহাবের মুমিনদের আকূল উদ্দেশ্য? যদি বলা হয় সুন্নীগণ, তবে শী'আ' বা মু'তাযিলারা এতে একমত হবে না। যদি বলা হয় শীআ'গণ, তবে সুন্নীরা তাতে একমত হবে না। যদি বলা হয় মু'তাযিলাগণ, তবে কোন অধিকাংশ মুসলমান তাতে একমত হবে না। সুতরাং কোন আকূলকে তারা মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করবেন?
অতএব সারকথা হ'ল, আকূল ব্যবহারে মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহদের নীতিই গ্রহণযোগ্য। কেননা তারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে আকূলের ব্যবহার করেছেন, যতটুকু শরী'আহ অনুমতি দেয় এবং আত্মপ্রতারিত যুক্তিবাদীরা ব্যতীত অন্যান্য বিজ্ঞ বিদ্বানদের গৃহীত নীতি অনুমোদন করে।
ঘ. মুহাদ্দিছগণ যে সকল হাদীছ ছহীহ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন, তাতে এমন কোন হাদীছ নেই যা সুস্থ বিবেকের বিরোধী। তবে কোন কোন হাদীছ হয়ত ব্যাখ্যা না জানার কারণে আশ্চর্যবোধক মনে হ'তে পারে। কিন্তু যখন এ সকল হাদীছ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হবে, তখন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক।
কেননা কোন কিছু বোধগম্য না হ'লেই তা বিবেকবিরোধী হয় না। আবার আজকে যা বিবেকবিরোধী মনে হয়, আগামীকাল তা বিবেকবিরোধী না-ও থাকতে পারে। বিবেকের কাছে আশ্চর্যজনক হওয়াটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ব্যাপার। সংস্কৃতি এবং পরিবেশ ভেদে তা পরিবর্তনশীলও। এর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতিও নেই। যেমন এককালে কোন প্রাণী বিহীন যান হতে পারে, তা ভাবনার অতীত ছিল। কিন্তু আজকের যুগে তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শতবছর পূর্বেও গ্রামের মানুষের কাছে বেতারযন্ত্র ছিল বিস্ময়কর বস্তু। তারা এটিকে শহরবাসীদের বানানো মিথ্যাচার গণ্য করত। এমনকি বেতারযন্ত্র যখন তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হ'ল তবুও তারা বিশ্বাস করল না। তারা ভাবল এই যন্ত্রের মধ্যে বসে আসলে জীন-ভূত কথা বলছে। ঠিক যেমনভাবে আজও শিশুরা ধারণা করে যে এর মধ্যে কোন মানুষ বসে রয়েছে যে কথা বলছে। সুতরাং ইসলামের মধ্যে এমন কোন বিষয় নেই যা বিবেক অস্বীকার করে। তবে তাতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা আমাদের নিকট বিস্ময়কর ও কল্পনাতীত অনুভূত হ'তে পারে। যেমন মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনাসমূহ, গায়েবী অন্যান্য বিষয়সমূহ। কিন্তু একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হ'ল সে নিজের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির ভিত্তিতে তা সরাসরি অস্বীকার করে না; বরং সঠিক সূত্র থেকে তার সত্যতা যাচাই করে দেখে। অতঃপর সত্যতা পেলে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। আর এজন্য আল্লাহ সূরা বাক্বারাহ্ শুরুতে মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ 'যারা গায়েবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন (আয়াত: ৩)।'
আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) বলেন, কিছু মানুষ এমন আছে যে, তারা বিবেকবিরোধী হওয়া আর বিস্ময়কর হওয়ার মাঝে কোন পার্থক্য করে না। তার দু'টি বিষয়কে একই মনে করে অস্বীকার করার জন্য তৎপর হয়। অথচ কোন বিষয় বিবেকবিরোধী তখনই মনে হয়, যখন তা অসম্ভব হয়। কিন্তু যে বস্তুটি বিস্ময়কর হয় তা আমাদের বোধের অগম্য হওয়ার কারণে সৃষ্ট হয়। সুতরাং অসম্ভব এবং অবোধগম্য- এ দু'টি বিষয়ের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা গতকাল অসম্ভব ছিল, কিন্তু আজ তা বাস্তবে রূপলাভ করেছে। যেমন আজকের যুগে মানুষ চন্দ্রে গমন করছে, অথচ মধ্যযুগে যদি কেউ এ কথা বলত, তবে নিশ্চিতভাবে তাকে পাগল মনে করা হ'ত। কিন্তু আজকের যুগে তা অতি স্বাভাবিক। সুতরাং মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিকে সর্বেসর্বা ভাবার কোন কারণ নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি হাদীছ অস্বীকারকারীরা যে সকল হাদীছ নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছেন, তা হয় প্রাচীন যুগের কোন সম্প্রদায়ের কাহিনী কিংবা গায়েব বা অদৃশ্যের সংবাদবিষয়ক হাদীছ। যেমন মাহমূদ আবু রাইয়াহ একটি হাদীছকে উদাহরণস্বরূপ নিয়ে এসেছেন, আবূ হুরায়রা ও আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীছ- إن في الجنة لشجرة يسير الراكب في ظلها مائة عام لا يقطعها দিয়ে একজন আরোহী ব্যক্তি যদি একশত বছরও যাত্রা করে তবুও সে অতিক্রম করতে পারবে না।' মাহমূদ আবু রাইয়া এই হাদীছটির বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রা (রা.)- কে প্রকারান্তরে মিথ্যুক প্রমাণিত করতে চেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হ'ল, এই হাদীছে বিস্ময় বোধ করার কী রয়েছে? জান্নাত কি অদৃশ্যের বিষয় নয়? আমরা সেই জগৎ সম্পর্কে আল্লাহ যতটুকু জানিয়েছেন ততটুকুর বাইরে কী জানি? যে বিষয়টি আমাদের সীমাবদ্ধ কল্পনারই বাইরের বস্তু তা কীভাবে আমরা নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে অস্বীকার করতে পারি? বরং এ বিষয়ে সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যার পরিবর্তে মানবীয় বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটানোই নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। যে অন্ধ কখনও পৃথিবীর আলো দেখে নি, সে কি হাতির বিবরণ শুনে তার বাস্তবতা অনুমান করতে পারবে? উপরন্তু সেই ব্যক্তি যদি নিজের মত করে হাতির আকার কল্পনা করে তা নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু করে, তবে তার ব্যাপারে কী বলা যেতে পারে?
৫. আকূলকে প্রাধান্য দান করে যদি অদৃশ্যবিষয়ক হাদীছগুলি অস্বীকার করা হয়, তবে তা কুরআনে বর্ণিত গায়েবী বিষয়গুলিকেও অস্বীকার করা অপরিহার্য করে দেয়। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (ছা.)-এর হাতের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল, সুলায়মান (আ.) তাঁর রাজত্বের পশু-পাখি, জিনদের ভাষা বুঝতেন এবং তারা তাঁর অনুগত ছিল। এ সকল বিষয় কি হাদীছ অস্বীকারকারীগণ স্বীকার করবেন? এটি যদি স্বাভাবিক বুদ্ধি বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে একইরূপ বিষয় রাসূল (ছা.) কর্তৃক হাদীছ হিসাবে বর্ণিত হ'লে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না কেন?
চ. ছহীহ হাদীছ কখনওবা বোধের অতীত (مخالف الفهم) হ'তে পারে, কিন্তু বিবেকের বিরোধী (مخالف العقل) হয় না। ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) বলেন, 'আমি সাধ্যমত শরী'আতের দলীলসমূহ সম্পর্কে গবেষণা করেছি। কিন্তু এমন একটি যথার্থ কিয়াস দেখিনি যা ছহীহ হাদীছের বিরোধী হ'তে পারে। তেমনিভাবে বিশুদ্ধ সূত্রের কোন বর্ণনাকে দেখিনি সুস্পষ্ট যুক্তির বিরোধী হ'তে। বরং যখনই দেখেছি কোন কিয়াস হাদীছের বিরোধিতা করছে, তখন দু'টির একটি অবশ্যই যঈফ প্রমাণিত হয়েছে। তবে এই ছহীহ ক্বিয়াস এবং বাতিল কিয়াসের মধ্যে পার্থক্য করার জ্ঞান অনেক বিজ্ঞ আলেমের নিকট পর্যন্ত নেই, তাহ'লে অন্যদের ক্ষেত্রে কী হতে পারে?
ছ. মুসলিম বিদ্বানদের চিরন্তন নীতি হ'ল, আকুল ও অহীর দ্বন্দ্বে সর্বশেষ ফয়ছালাকারী হ'ল অহী। কেননা শরী'আতের ওপর আকুলকে প্রাধান্য দিতে চাওয়াই হল আকুল বিরোধী কর্ম। কেননা আকুল সাক্ষ্য দেয় যে, শরী'আহ প্রণেতা এবং তাঁর প্রেরিত অহী আকূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানসম্পন্ন। সুতরাং কেউ যদি অহীর ওপর আকুলকে স্থান দিতে চায় তবে সে আকূলের এই সাক্ষ্যকে বাতিল করে দেয়। আর যদি আকূলের সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যায়, তবে তার কথাও বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং অহীর জ্ঞানই চূড়ান্ত ফয়ছালাকারী। এ বিষয়ে আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য সুপ্রসিদ্ধ। তিনি বলেন, لو كان الدين بالرأي لكان أسفل الخف أولى بالمسح من أعلاه নিজস্ব বুদ্ধি অনুযায়ী হ'ত, তবে মোজার উপরে মাসাহ করার চেয়ে নিচে মাসাহ করাই অধিক উপযুক্ত হ'ত। আবুল মুযাফ্ফর আছ-ছানা'আনী (৪৮৯হি.) বলেন, اعلم أن مذهب أهل السنة أن العقل لا يوجب شيئا على أحد ولا يرفع شيئا عنه ولا حظ له في تحليل أو تحريم ولا تحسين ولا تقبيح 'জেনে রাখ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হ'ল আকুল কোন কিছু মানুষের ওপর আবশ্যক করে না, কোন কিছু বিদূরিতও করে না। কোন কিছু হালাল ও হারাম প্রতিপন্নেও তার কোন ভূমিকা নেই। কোন কিছুর ভাল-মন্দ নির্ধারণেও তা গুরুত্বহীন। আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, وإن ا الحجة القاطعة والحاكم الأعلى هو الشرع لا غير
ফয়ছালাকারী হ'ল শরী'আত, অন্য কিছু নয়।' ইবনু খালদুন (৮০৮হি.)।
فإذا هدانا الشارع إلى مدرك فينبغي أن نقدمه على مدار كنا ونثق به دونها ولا ننظر في تصحيحه بمدارك العقل ولو عارضه بل نعتمد ما أمرنا به اعتقادا وعلما ونسكت عما لم نفهم من ذلك ونفوضه إلى الشارع ونعزل العقل عنه
'যদি শরী'আত প্রবর্তক (আল্লাহ) কোন দলীলের দিকে পথপ্রদর্শন করেন, তবে আমাদের উচিত হবে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তির উপর তাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং কেবল তার প্রতিই আস্থা রাখা। সে দলীলকে সত্যায়নের জন্য আমাদেরকে কোন আকুলী দলীলের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন নেই এমনকি যদি তা বুদ্ধির বিপরীতও হয়। বরং আমাদেরকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তার ওপরই বিশ্বাসগতভাবে এবং জ্ঞানগতভাবে নির্ভর করা উচিত হবে। আর যা আমাদের বোধের অতীত হবে তা সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকব এবং শরী'আত প্রবর্তক (আল্লাহ)-এর দিকে তা সোপর্দ করব। তাতে আকূল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকব।
অতএব আকুল শরী'আতকে অনুধাবন এবং তার কার্যকারিতা উপলব্ধির জন্য বড় মাধ্যম হ'তে পারে। তা শারঈ বিধানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হ'তে পারে। কিন্তু কখনই শারঈ বিধান বাতিলযোগ্য করার ক্ষমতা রাখে না। তেমনি শরী'আতের কোন দলীলকে শুধু বুদ্ধির ভিত্তিতে বাতিলও করতে পারে না। এভাবে ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে আকূলকে সমর্থন করেছে এবং আকূলের সমর্থন গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাকে কখনই সার্বভৌম হ'তে দেয়নি; বরং সার্বভৌমত্ব কেবল নকূলের। যা চূড়ান্ত জ্ঞান হিসাবে এবং অহীর বিধান হিসাবে মানবজাতির নিকট প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ আল্লাহ্র চেয়ে কে অধিক উত্তম?'
টিকাঃ
৩১৮. মাহমূদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩৫১।
৩১৯. মুহাম্মাদ আল-গায্যালী, ফিকহুস সীরাহ (দামিশক: দারুল কলম, ১৪২৭হি.), পৃ. ১২-১৪। দুঃখজনক হ'লেও সত্য যে হাদীছ অস্বীকারকারীদের মত আধুনিক যুগে কিছুসংখ্যক ইসলামপন্থী বিদ্বানও হাদীছকে রেওয়ায়েত দ্বারা যাচাইয়ের পরিবর্তে আকুল ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে তাঁরা 'দিরায়াত', 'তাফাক্কুহ' 'খাছ যওক' বা বিশেষ রুচিবোধ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করলেও তা আকুলকেই নির্দেশ করে। আবুল আ'লা মওদূদী (১৯৭৯খ্রি.), আমীন আহসান ইছলাহী (১৯৯৭খ্রি.) প্রমুখের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। দ্র. আবুল আ'লা মওদূদী, তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৬১, আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে হাদীছ, পৃ. ৯১-৯২, ৯৯; মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, হুজ্জিয়াতে হাদীছ, পৃ. ১৪৯-১৫২)।
৩২০. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাছারুছ ছাওয়াঈক আল-মুরসালাহ, পৃ. ১২৪।
৩২১. ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাহ আত-তাহাভিয়াহ, পৃ. ৩৫৪।
৩২২. আশ-শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৭২।
৩২৩. পবিত্র কুরআনের মানবীয় জ্ঞানের এই ধারাবাহিকতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُل 1 CAR أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا 'যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না।
নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় প্রত্যেকটির বিষয়ে তোমরা (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৬)। এখানে জ্ঞানের মাধ্যম হিসাবে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- শ্রবণ (বিশ্বস্ত ব্যক্তির প্রদত্ত সংবাদ), দর্শন (অভিজ্ঞতা) ও অন্তঃকরণ (বুদ্ধিবৃত্তি)। এই তিনটি উৎসই মূলত মানবীয় জ্ঞান তৈরী করে। আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ইসলামে তিনটি উপায়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়- (১) বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদ, যা সংবাদদাতার সত্যবাদিতার কারণে শ্রোতা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে। যেমন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ। (২) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যার যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে। (৩) বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, যে বিষয়ে কোন বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদও নেই কিংবা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও নেই। দ্র. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩৫।
৩২৪. ড. মুহাম্মাদ আকরাম ওয়ারাক, মুতুনে হাদীছ পর জাদীদ যেহেন কী ইশকালাত (গুজরানওয়ালা: শরী'আহ একাডেমী, ২য় প্রকাশ: ২০১৬খ্রি.), পৃ. ৪০৯-৪১১। এ বিষয়ে বিশেষভাবে পাঠ্য হ'ল ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) রচিত গ্রন্থ درء تعارض العقل والنقل যা ১০ খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছে।
৩২৫. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৬।
৩২৬. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭।
৩২৭. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিছ ছালাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৫।
৩২৮. আশ-শাত্বিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৫।
৩২৯. أن الله جعل للعقول في إدراكها حدا تنتهي إليه لا تتعداه، ولم يجعل لها سبيلا إلى 020 الإدراك في كل مطلوب. ولو كانت كذلك لاستوت مع الباري تعالى في إدراك جميع ما كان وما يكون وما لا يكون، إذ لو كان كيف كان يكون، فمعلومات الله - لا تتناهى ومعلومات العبد متناهية والمتناهي لا يساوي ما لا يتناهى. শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৩১।
৩৩০. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩৯-৪১। অন্যত্র তিনি বলেন, ولا أدري أي عقل يريدون أن يحكموه ويعطوه من السلطة أكثر مما أعطاه علماؤنا في قواعدهم الدقيقة؟ ليس عندنا عقل واحد نقيس به الأمور، بل العقول متفاوتة، والمقاييس مختلفة والمواهب متباينة فما لا يعقله فلان ولا يفهمه، قد يراه آخر معقولاً مفهوماً । দ্র. অদেব, পৃ. ২৭৮।
৩৩১. ছহীহুল বুখারী, হা/৩২৫১-৩২৫২।
৩৩২. সূরা আল-কামার, আয়াত: ৫৪।
৩৩৩. সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭৯-৮১, আন-নামল, আয়াত: ১৫-৪৪।
৩৩৪. ইবনু তায়মিয়া, মাজমূ'উল ফাতাওয়া, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৬৭।।
৩৩৫. সুনান আবী দাউদ, হা/১৬২।
৩৩৬. আবুল মুযাফ্ফর আস-সাম'আনী, আল-ইনতিছারু লি আছহাবিল হাদীছ, পৃ. ৭৫।
৩৩৭. আশ-শাত্বিবী, আল-ইতিসাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৭২।
৩৩৮. ইবনু খালদুন, তারীখু ইবনু খালদুন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৫৪।
৩৩৯. সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৫০।
📄 সংশয়-৪ : কুরআনবিরোধী হ’লে হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়
হাদীছ অস্বীকারকারীগণ তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য অপর একটি মূলনীতি ব্যবহার করেন। আর তা হ’ল, প্রতিটি হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য কুরআনের সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। যদি তা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তবেই গ্রহণযোগ্য হবে, আর যদি কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তবে তা পরিত্যাগ করতে হবে। কেননা তা রাসূল (ছা.)-এর বাণী নয়। এজন্য তাঁরা হাদীছ থেকেও দলীল পেশ করে থাকেন। যেমন : আব্দুল্লাহ ইবনু উমার হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছা.) বলেন, «إِنَّهُ سَيَفْشُوا عَنِّي أَحَادِيْثُ فَمَا أَتَاكُمْ مِنْ حَدِيْثِيْ فَاقْرَءُ وا كِتَابَ اللهِ وَاعْتَرُ وهُ فَمَا وَافَقَ كِتَابَ اللهِ فَأَنَا قُلْتُهُ، وَمَا لَمْ يُوَافِقْ كِتَابَ اللهِ فَلَمْ أَقُلْهُ -আমার নামে অনেক হাদীছ প্রকাশিত হবে। সুতরাং তোমাদের নিকট আমার যে হাদীছ পৌঁছাবে, (তার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য) তোমরা কুরআন পাঠ কর এবং কুরআনের মোতাবেক পরীক্ষা কর। যদি কুরআনের সাথে মিলে যায় তবে সেটি আমি বলেছি আর যদি না মিলে তবে আমি তা বলি নি।
পূর্বযুগে রাফিযী, মু'তাযিলা এবং যিনদিকগণ এই যুক্তি পেশ করেছিল। বর্তমান যুগে ড. আহমাদ আমীন, ডা. তাওফীক হিন্দী, মাহমূদ আবূ রাইয়াহ, জামাল বান্না, আহমাদ ছুবহী মানছূর প্রমুখ এই মতাবলম্বন করেছেন। পাকিস্তানের আমীন আহসান ইসলাহী, জাভিদ আহমাদ গামেদী ও এই মতের সমর্থক। তাদের মতে, কুরআনেই হ’ল একমাত্র দলীল এবং সুন্নাহ কেবল তাতে নিশ্চয়তাবোধক অর্থ প্রদান করে। সুতরাং যে সকল বিধান কুরআনে নেই, তা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তা রাসূল (ছা.) বলেনও নি। সুতরাং তা কোন দলীল নয়। এই যুক্তিতে তাঁরা রজমের হাদীছসহ অনেক হাদীছ অস্বীকার করেছেন। আমীন আহসান ইছলাহী বলেন,
کوئے حدیث جو کسی پہلو سے قرآن کے خلاف ہو گی وہ قبول نہیں کی جائے گی হাদীছ যদি কোন এক দিক থেকে কুরআনের বিপরীত হয়, তবে তা কবুল করা যাবে না।' তিনি হাদীছ কুরআনের বিপরীত হওয়ার স্বরূপ ব্যাখ্যা করে
اگر حدیث صریحا قران مجید کے الفاظ اور اسکے سیاق و نظم کے خلاف پڑرہی ہو تو ایسے مقامات پر توقف کرنا چاہیے اور اسی صورت میں حدیث کو جھوڑنا چاہیئے কোন হাদীছ স্পষ্টভাবে কুরআনের শব্দ, তার পূর্বাপর এবং বাকরীতির বিপরীত হয়, তবে এ সকল স্থানে হাদীছটির ব্যাপারে সিদ্ধান্তগ্রহণ মূলতবী রাখা উচিৎ এবং এই অবস্থায় হাদীছটি পরিত্যাগ করা উচিৎ। অর্থাৎ কুরআনের সাথে কেবল অর্থগত মিল থাকলেই যথেষ্ট নয়, শব্দগতভাবেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হ'তে হবে! এজন্যই বোধ হয় জামাল বান্না বলেন, وقد تتملكنا
الدهشة عندما نري إعمال هذا المعيار سيجعلنا نستبعد قرابة نصف الأحاديث المتداولة بين الناس 'আমরা বিস্ময়াভূত হয়েছি যখন দেখেছি যে, এই মূলনীতি প্রয়োগ করতে পারলে আমরা বর্তমানে মানুষের মাঝে প্রচলিত প্রায় অর্ধেক হাদীছই বাতিল ঘোষণা করতে পারব। অন্যত্র তিনি বলেন, 'এই মূলনীতির মাধ্যমে দুই থেকে তিন হাজার হাদীছ বাতিল করা সম্ভব যার মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই হবে বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ।
পর্যালোচনা:
এই মূলনীতি পুরোপুরিভাবে অগ্রহণযোগ্য। কেননা আমরা আগেই জেনেছি যে, সুন্নাহ হ'ল কুরআনের ব্যাখ্যা এবং কুরআনের ওপর অতিরিক্ত বিধান সংযোজনকারী। যেহেতু কুরআনে এই দু'টি বিষয়ই উল্লেখিত হয়নি, সুতরাং তাদের মূলনীতি অনুসারে ইসলামী শরী'আতে হাদীছের ভূমিকা কেবল কুরআনের নিশ্চয়তাপ্রদানকারীতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যা একাধারে হাদীছের প্রামাণিকতাকেই নাকচ করে দেয়। ফলে হাদীছ অস্বীকারকারীদের একটি সুদৃঢ় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে এই মূলনীতি। বিশেষ করে কুরআনের বিপরীতে হাদীছকে উপস্থাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নে তাদের দলীলসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।
ক. ইমাম ত্বাবারাণী বর্ণিত যে হাদীছটি দলীল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিতান্তই দুর্বল।” ইবনু হাজার আল-আসকালানী (৮৫২হি.) বলেন, হাদীছটি বেশ কিছু সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কোনটিই ত্রুটিমুক্ত নয়। নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী (১৯৯৯খ্রি.) এ মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলি একত্রিত করেছেন। কিন্তু সবগুলিরই সনদ খুবই দুর্বল কিংবা জাল। সুতরাং এই মর্মের সকল হাদীছ বাতিল হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিছদের মধ্যে ইজমা' হয়ে গেছে।
ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) বলেন, ما روى هذا أحد يثبت حديثه في
شيء صغر ولا كبر ... وهذه أيضا رواية منقطعة عن رجل مجهول، ونحن لا نقبل مثل هذه الرواية في شيء 'এই হাদীছটি এমন একজনও বর্ণনা করেনি যার হাদীছ ছোট-বড় কোন বিষয়ে গ্রহণযোগ্য হয়... এটি এক অপরিচিত লোকের বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর এই জাতীয় বর্ণনা আমরা কোন কিছুতেই গ্রহণ করতে পারি না।'
আল-খাত্তাবী (৩৮৮হি.) إلا أني أوتيت الكتاب ومثله معه 'নিশ্চয়ই আমি কিতাব প্রাপ্ত হয়েছি এবং তার সাথে অনুরূপ'- হাদীছটির ব্যাখ্যা বলেন, এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাদীছকে কুরআনের ভিত্তিতে যাচাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই। কেননা যখনই তা রাসূল (ছা.) হ’তে ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলীল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর কতিপর ব্যক্তি যা বর্ণনা করেছে এই মর্মে যে, যখন তোমাদের নিকট হাদীছ পৌঁছাবে, তখন তা কুরআন দ্বারা পরীক্ষা কর। যদি কুরআনের সাথে তা মিলে যায় তবে তা গ্রহণ কর, আর যদি বিরোধী হয়, তবে তা গ্রহণ করো না।- এই হাদীছ বাতিল যার কোন ভিত্তি নেই। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (২৩৩হি.) বলেছেন, হাদীছটি যিন্দীকরা তৈরী করেছে।
ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) এই হাদীছগুলির দুর্বলতা উল্লেখ করার পর বলেন, هل يستجيز هذا إلا كذاب زندیق کافر 'কোন মিথ্যুক, যিন্দিক, কাফের ব্যতীত এমন কথা কেউ বলতে পারে?
আল-বায়হাক্বী (৪৫৮হি.) বলেন, 'যে হাদীছটিতে হাদীছকে কুরআনের সাথে পরস্পর তুলনা করতে বলা হয়েছে তা অশুদ্ধ, বাতিল। হাদীছটি নিজেই তার বাতিল হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত করে। কুরআনের কোথাও বলা হয় নি যে, হাদীছকে কুরআনের নিরিখে গ্রহণ করতে হবে।
ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, وقد أمر الله عز وجل بطاعته واتباعه أمرا مطلقا محملا لم يقيد بشيء ولم يقل ما وافق كتاب الله كما قال بعض أهل الزيغ 'আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণের জন্য শর্তহীনভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, কোনরূপ সীমা বেঁধে দেননি। তিনি বলেননি যে, কেবল আল্লাহর কিতাবে সাথে যা মিলবে তার অনুসরণ কর, যেমনটি কিছু বিভ্রান্ত মানুষ বলে থাকে।
খ. হাদীছটি যদি ছহীহ ধরে নেয়া হয় তবুও তাদের পক্ষে দলীল নয়, বরং তাদের বিরুদ্ধেই দলীল। কেননা তাদের কথা মত যদি হাদীছটি কুরআনের ওপর আরোপ করা হয়, তবে তা বাতিল প্রমাণিত হয়, কেননা কুরআনে রাসূল (ছা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্যের কথা এসেছে। ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) যথার্থই বলেন, সর্বপ্রথম আমরা ঐ হাদীছটিকেই কুরআনের সাথে তুলনা করব, যেটি তোমরা উল্লেখ করেছ। যখন আমরা তুলনা করলাম, তখন দেখলাম হাদীছটি কুরআনের বিরোধী। কেননা আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَالْتَهُوا রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও। তিনি আরও বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হ'ল, আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি।
ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, কিছু বিদ্বান হাদীছটির ব্যাপারে (রসিকতাসুলভ) মন্তব্য করেছেন যে, সব কিছুর পূর্বে আমরা হাদীছটি কুরআনের নিরিখে যাচাই করি এবং তার উপরই নির্ভর করি। অতঃপর যখন আমরা হাদীছটি কুরআনের সাথে তুলনা করলাম তখন দেখলাম হাদীছটি কুরআনের বিরোধী। কেননা আমরা কুরআনের কোথাও পাইনি যেখানে বলা হয়েছে যে, রাসূল (ছা.)-এর কোন হাদীছ গ্রহণ করা যাবে না, যদি তা কুরআনের সাথে না মিলে। বরং আমরা পেয়েছি যে, কুরআন রাসূল (ছা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছে এবং কোন অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধাচরণ করার ব্যাপারে সর্তক করেছে।
দ্বিতীয়ত, কোন কোন হাদীছে শুধু 'কিতাবুল্লাহ'র অনুসরণের যে কথা এসেছে তার ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, المراد بكتاب الله في الحديث المرفوع حكمه وهو أعم من أن يكون نصا أو مستنبطا 'মারফু' হাদীছ সমূহে আল্লাহর কিতাব থেকে উদ্দেশ্য হ'ল- আল্লাহ্র কিতাবের হুকুম। আর এই হুকুম যেমন সকল নছ (কুরআন ও হাদীছ)- কে বুঝায়, তেমনি নছের আলোকে উদ্ভাবিত বিধানসমূহকেও বুঝায়।
গ. আমীন আহসান ইছলাহী তাঁর মতের সপক্ষে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.)-এর একটি উক্তি তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি বলেন, ولا يقبل خبر الواحد في منافاة حكم العقل وحكم القرآن الثابت المحكم
আকূলের বিরোধী হলে এবং কুরআন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোন বিধানের বিপরীত হলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমীন আহসান ইছলাহী ছাহেব ও তাঁর অনুসারীরা বস্তুত উলূমুল হাদীছ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন না। নতুবা মুহাদ্দিছদের পরিভাষাসমূহ নিজের বুঝ মত শাব্দিক অর্থ করে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করতেন না। তাঁরা জানেনই না যে, পরস্পরবিরোধী হাদীছসমূহের ব্যাপারে মুহাদ্দিছদের নিজস্ব নীতি রয়েছে যা 'মুখতালিফুল হাদীছ'-এর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তাঁরা জানেন না যে, মুহাদ্দিছগণও কোন হাদীছ ছহীহ হওয়ার জন্য কুরআনের পরিপন্থী না হওয়াকে শর্ত করেছেন এবং খতীব আল-বাগদাদী সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তবে মুহাদ্দিছদের নিকট এই বৈপরীত্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া ভিন্ন। তাদের নিকট হাদীছ ও কুরআন পরস্পর বিরোধী হওয়ার অর্থ সেখানে আর কোন ব্যাখ্যার অবকাশ না থাকা এবং কোন সমন্বয়ের সুযোগ না থাকা। বস্তুত এমন ঘটনা যঈফ এবং জাল হাদীছ ব্যতীত কোন ছহীহ হাদীছের ক্ষেত্রে ঘটে না। কেননা এই বৈপরীত্য নিষ্পত্তির জন্য জন্য মুহাদ্দিছদের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আর তা হ'ল, (১) উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধন করা, নতুবা নাসিখ-মানসূখ চিহ্নিত করা, সেটি সম্ভব না হ'লে কোন একটিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। সেটিও সম্ভব না হ'লে দু'টির ওপরই আমল মুলতবী রাখা, যতক্ষণ না তার অর্থ স্পষ্ট হয়। সুতরাং মুহাদ্দিছগণ কেবলমাত্র বাহ্যিক বৈপরীত্যের কারণে কোন হাদীছ বর্জন করেন না, যেমনটি হাদীছ অস্বীকারকারীগণ করে থাকেন।
ঘ. যুক্তিভিত্তিক দলীল হ'ল, যদি কেবল ঐ হাদীছগুলিকেই গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, যেগুলি কুরআনের সাথে হুবহু এক ও অভিন্ন হবে, তবে এই প্রশ্ন অপরিহার্যভাবে সৃষ্টি হয় যে, তাহ'লে হাদীছের আর বিশেষ প্রয়োজন কী? কুরআনই তো এককভাবে যথেষ্ট ছিল! হাদীছের প্রয়োজন তো তখনই দেখা দেয়, যখন কুরআনে বর্ণিত কোন সংক্ষিপ্ত বা অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা জানা রাসূল (ছা.) ব্যতীত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুতরাং রাসূল (ছা.) হাদীছ গ্রহণ বা বর্জনের জন্য তা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বা না হওয়াকে শর্তযুক্ত করা একেবারেই অযৌক্তিক। এর পক্ষে শারঈ কোন দলীলও নেই।
দ্বিতীয়ত, কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وحي يوحى 'আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। এই আয়াতের প্রতি যদি লক্ষ্য রাখা হয় এবং রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের সাথে কুরআনের পরস্পর তুলনা করে উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য খোঁজা হয় তবে তা অহীর সাথে অহীকে পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে দেয়ারই নামান্তর নয়? অতঃপর যদি কোন ব্যক্তি নিজের ত্রুটিপূর্ণ মানবীয় বিচার-বুদ্ধি দিয়ে এর মধ্যে ফয়ছালা করতে চায় এবং কোন একটিকে দুর্বল ঘোষণার দুঃসাহস করে, তবে তা কতটা ভয়ানক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়? বরং এটি তো সরাসরি আল্লাহ প্রেরিত অহী তথা কুরআনের বিশুদ্ধতার প্রতিই সন্দেহবাদ আরোপের নামান্তর। কেবল তা-ই নয়, এর মাধ্যমে রাসূল (ছা.)-এর রিসালাতকে চরমভাবে অবমাননা করা হয়। কেননা এতে রাসূল (ছা.)-এর আদেশ-নিষেধের আর কোন মূল্য থাকে না। মানুষের জন্য তার সুন্নাহ অনুসরণেরও কোন আবশ্যকতা থাকে না। এভাবে সমগ্র দ্বীন মানুষের খেয়াল-খুশীতে পরিণত হবে।
ঙ. সর্বশেষ কথা হ'ল, রাসূল (ছা.)-এর কোন ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হাদীছ নিজেই শরী'আতের একটি দলীলে পরিণত হয়ে যায়। যা অন্য কোন দলীল দিয়ে যাচাই করার কোন প্রয়োজন থাকে না। বরং তা সর্বাবস্থায় গ্রহণযোগ্য মনে করা ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়। দ্বিতীয়ত, কোন ছহীহ হাদীছ কখনও কুরআনের পরিপন্থীও হ'তে পারে না, যে কুরআন দ্বারা তা যাচাই করতে হবে। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ একই আল্লাহ প্রেরিত অহী।
আবুল মুযাফ্ফর ইবনুস সাম'আনী (৪৮৯হি.) বলেন, ،متى ثبت الخبر صار أصلا من الأصول، ولا يحتاج إلى عرضه على أصل آخر 'যখন কোন হাদীছ ছহীহ সাব্যস্ত হয়, তখন শরী'আতের একটি উছুলে পরিণত হয়। ফলে তা অপর কোন দলীলের সাথে তুলনা করার মুখাপেক্ষী থাকে না।'
ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) বলেন, ليس في الحديث الذي صح شيء يخالف القرآن ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত এমন কোন হাদীছ নেই যা কুরআনের বিরোধী হয়। তিনি অন্যত্র বলেন, '(কুরআন-হাদীছ সম্পর্কে) অজ্ঞ কোন ব্যক্তির ধারণায় যদি দু'টি হাদীছ বা দু'টি আয়াত কিংবা একটি হাদীছ ও একটি আয়াত পরস্পরবিরোধী মনে হয়, তবুও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দু'টির ওপরই আমল করা অপরিহার্য।... কেননা প্রতিটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং প্রতিটিই আনুগত্য ওয়াজিব হওয়া এবং ব্যবহারযোগ্যতার দিক দিয়ে সমান, কোন পার্থক্য নেই।'
আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, 'হাদীছ হয় স্রেফ আল্লাহর অহী, নতুবা রাসূল (ছা.)-এর ইজতিহাদ যা কিতাব ও সুন্নাহর ছহীহ দলীল দ্বারা সমর্থিত। দু'টি দিক থেকেই হাদীছের সাথে কুরআনের কখনও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হ'তে পারে না। কেননা রাসূল (ছা.) নিজের প্রবৃত্তি থেকে কোন কথা বলেন না। তিনি যা-ই বলেন, তা আল্লাহর অহী প্রাপ্ত হয়েই বলেন।
পাকিস্তানের সাবেক গ্রান্ড মুফতী মুহাম্মাদ শফী (১৯৭৬খ্রি.) ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কিত রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ لم يكذب إبراهيم إلا ثلاث كذبات 'ইবরাহীম (আ.) তিনটি স্থানে ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি-এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'মির্জা কাদিয়ানী ও প্রাচ্যবিদদের মোহগ্রস্থ মুসলমানগণ এই হাদীছটি বিশুদ্ধ সনদবিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এ কারণে ভ্রান্ত ও বাতিল বলে দিয়েছে যে, এর কারণে আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম (আ.)- কে মিথ্যা বলা যরূরী হয়ে পড়ে। কাজেই খলীলুল্লাহকে মিথ্যাবাদী বলার চেয়ে সনদের বর্ণনাকারীদের মিথ্যাবাদী বলে দেয়া সহজতর। কেননা হাদীছটি কুরআনের পরিপন্থী। তারা এ থেকে একটি সামগ্রিক নীতি আবিষ্কার করেছে যে, যে হাদীছ কুরআনের পরিপন্থী হবে, তা যতই শক্তিশালী, বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা প্রমাণিত হোক না কেন, মিথ্যা ও ভ্রান্ত আখ্যায়িত হবে। এই নীতিটি সস্থানে তো সম্পূর্ণ নির্ভুল এবং মুসলিম উম্মাহর নিকট অপরিহার্যভাবে স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু মুসলিম বিদ্বানগণ সারা জীবনের পরিশ্রম ব্যয় করে যেসব হাদীছকে শক্তিশালী এবং বিশুদ্ধ সনদ দ্বারা প্রমাণিত পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে একটি হাদীছও এরূপ নেই, যাকে কুরআনের পরিপন্থী বলা যায়। বরং স্বল্পবুদ্ধিতা এবং বক্রবুদ্ধিতার ফলেই যে হাদীছকে তারা রদ করতে চায় তাকে কুরআন পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে থাকে এবং এই বলে ছেড়ে দেয় যে, এই হাদীছটি কুরআনের বিরোধী হওয়ায় গ্রহণযোগ্য নয়। যেভাবে এই হাদীছটির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
টিকাঃ
৩৪০. আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা/ ১০২২৪।
৩৪১. ড. ঈমাম আস-সাইয়িদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাযায়াতু ফী কিতাবিত্ তা'দীল ইসলাম, পৃ. ২২০-২২১।
৩৪২. আমীন আহসান ইসলাহী, মায়ারী তাদাস্সুরে হাদীছ, পৃ. ২৬।
৩৪৩. জাভেদ আহমাদ গামেদী, মীযান, পৃ. ৬২।
৩৪৪. এমনকি আবুল আ'লা মওদূদীর মতামত ও বিষয়ে বিশেষ ভিন্নতা নয়। দ্র. আবুল আ'লা মওদূদী, তাফসীরুল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪০-২৪৪, ঐ, তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৯-৪৬১; ঐ, রাসায়েল ও মাসায়েল, ১ ম খণ্ড, পৃ. ৫৭-৫৮, ২৩৩; ৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৭।
৩৪৫. ড. ঈমাদ আস-সাইয়েদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, পৃ. ২২০।
৩৪৬. আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে হাদীছ, পৃ. ২৮।
৩৪৭. আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে কুরআন, পৃ. ২১৯।
৩৪৮. জামাল বান্না, আস-সুন্নাতু ওয়া দাওরুহা ফিল ফিকহিল জাদীদ (কায়রো: দারুল ফিকর, ১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ২৪৮।
৩৪৯. তদেব, পৃ. ২৬৫।
৩৫০. নূরুদ্দীন আল-হায়ছামী, মাজমাউয যাওয়াইদ, হা/৭৮৭; ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭০; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, আল-মাক্বাছিদুল হাসানাহ (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ১৯৮৫খ্রি.), হা/৫৯; পৃ. ৮৩; ইসমাঈল আল-আজলুনী, কাশফুল খাফা (কায়রো: মাকতাবাতুল কুদসী, ১৩৫৭হি.), হা/২২০; ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৬।
৩৫১. শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, আল-মাক্বাছিদুল হাসানাহ, পৃ. ৮৩।
৩৫২. নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যাঈফাহ, হা/১০৮৩-১০৯০, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৩-২১১।
৩৫৩. আবূ যাহু, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ৩১৪।
৩৫৪. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২২৫।
৩৫৫. আল-খাত্তাবী, মা'আলিমুস সুনান, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৯৯।
৩৫৬. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উত্তুলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৮।
৩৫৭. والحديث الذي روي في عرض الحديث على القرآن باطل لا يصح، وهو ينعكس ٥٤٩٠ ا على نفسه بالبطلان، فليس في القرآن دلالة على عرض الحديث على القرآن আল-বায়হাক্বী, দালাইলুন নুবুওয়াহ (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, ১৪০৫হি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭।
৩৫৮. ইবনু আব্দিল বার, জামি'উ বায়ানিল ইলম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১৮৯।
৩৫৯. সূরা আন-হাশর, আয়াত: ৭।
৩৬০. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০।
৩৬১. ইবনু আব্দিল বার্র, জামি'ট বায়ানিল ইলম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১৮৯।
৩৬২. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৩।
৩৬৩. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৪৩২।
৩৬৪. ড. ঈমাদ আস-সাইয়েদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, পৃ. ২৩৬
৩৬৫. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৭৯।
৩৬৬. গাযী উযাইর, ইনকারে হাদীছ কা নায়া রূপ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৭।
৩৬৭. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৩৬৮. জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, কাওয়াঈদুত তাহদীছ, পৃ. ৯৮।
৩৬৯. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০।
৩৭০. إذا تعارض الحديثان أو الآيتان أو الآية والحديث فيما يظن من لا يعلم ففرض على ٥٩٥٠ كل مسلم استعمال كل ذلك... وكل من عند الله عز وجل وكل سواء في باب وجوب الطاعة والاستعمال ولا فرق ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১।
৩৭১. فإن الحديث إما وحي من الله صرف، وإما اجتهاد من الرسول - عليه الصلاة ٥٩٥ والسلام معتبر بوحي صحيح من كتاب أو سنة، وعلى كلا التقديرين لا يمكن فيه التناقض مع كتاب الله؛ لأنه عليه الصلاة والسلام ما ينطق عن الهوى، إن هو إلا وحي يوحى। দ্র. আশ-শাত্বিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৩৫।
৩৭২. ছহীহুল বুখারী, হা/৫০৮৪, ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৭১।
৩৭৩. ফখরুদ্দীন রাযী (৬০৪হি.) সর্বপ্রথম হাদীছটির ব্যাপারে আপত্তি তোলেন। অতঃপর আধুনিক যুগে ভারত উপমহাদেশে হামীদুদ্দীন ফারাহী (১৯৩০খ্রি.), শিবলী নোমানী (১৯১৪খ্রি.), আবুল আ'লা মাওদূদী (১৯৭৯খ্রি.), আমীন আহসান ইছলাহী (১৯৯৭খ্রি.) এবং হাদীছ অস্বীকারকারীদের মধ্যে আসলাম জয়রাজপুরী (১৯৫৫খ্রি.), গোলাম আহমাদ পারভেষ (১৯৮৫খ্রি.) প্রমুখ হাদীছটির ওপর আপত্তি জানিয়ে রদ করেছেন। দ্র. ড. মুহাম্মাদ আকরাম ওয়ারাক, মুতুনে হাদীছ পর জাদীদ যেহেন কী ইশকালাত, পৃ, ২৯০-২৯১।
৩৭৪. মুহাম্মাদ শফী, তাফসীর মাআরেফুল কোরআন, বঙ্গানুবাদ: মুহিউদ্দীন খান (মদীনা: বাদশাহ ফাহাদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩হি.), পৃ. ৮৮১।
📄 সংশয়-৫ : হাদীছ ছহীহ-যঈফ নির্ণয় করা মুহাদ্দিছদের নিজস্ব ইজতিহাদী বিষয়
সুতরাং তা মানা অপরিহার্য নয়।
হাদীছ অস্বীকারকারী তুর্কী লেখক Mustafa İslamoglu (জন্ম: ১৯৬০খ্রি.) বলেন, 'ছহীহ হাদীছ হল মুহাদ্দিছদের ব্যক্তিগত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ কিছু হাদীছ। এর মানে এই নয় যে, এগুলো সত্যিই রাসূলের হাদীছ। তার প্রমাণ হ'ল, ইমাম বুখারী যাদেরকে ছিকাহ বা শক্তিশালী হিসাবে উল্লেখ করেছেন এমন প্রায় ৬০০ রাবী থেকে ইমাম মুসলিম হাদীছ গ্রহণ করেননি। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, এগুলো সব মুহাদ্দিছদের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের উপর ভিত্তি শীল। সুতরাং কারো ব্যক্তিগত মূল্যায়নের মাধ্যমে কোন চিরন্তন সত্য নির্ণিত হতে পারে না এবং তা মুসলিম উম্মাহ তর্কাতীতভাবে গ্রহণ করতে পারে না। তা করতে আমরা বাধ্যও নই। সুতরাং হাদীছকে অবশ্যই কুরআন দ্বারা যাচাই করতে হবে। ইতিপূর্বে ড. আহমাদ আমীন, মাহমূদ আবু রাইয়াহ, আসলাম জয়রাজপুরী প্রমুখ উপরোক্ত যুক্তিতে এবং জারাহ ও তা'দীলের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিছদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে উদাহরণ হিসাবে নিয়ে এসে মুহাদ্দিছদের গৃহীত নীতির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন।
পর্যালোচনা : মুহাদ্দিছদের হাদীছ সমালোচনা নীতিমালার প্রতি অনাস্থাসূচক বক্তব্য আধুনিক যুগে প্রাচ্যবিদদের মাধ্যমেই প্রথম শুরু হয়েছে। এর সাথে যোগ দিয়েছেন আধুনিকতাবাদী কিছু মুসলিম বিদ্বানও। কিন্তু হানাফী বিদ্বান ইবনুল হুমام (৮৬১হি.)-এর মন্তব্য থেকে বোঝা যায় পূর্বযুগেও এই ধারণার অস্তিত্ব ছিল। যেমন তিনি বলেন, 'ইমাম মুসলিম তাঁর গ্রন্থে অনেক এমন বর্ণনাকারীর বর্ণনা নিয়ে এসেছেন, যারা সমালোচনা মুক্ত নয়, আবার ছহীহ বুখারীতে সমালোচিত বর্ণনাকারীর বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং বর্ণনাকারীদের বিষয়টি বিদ্বানদের ইজতিহাদের ওপরই আবর্তিত হয়।... হাদীছের হাসান, ছহীহ, যঈফ হওয়া সনদের ভিত্তিতে 'যান্নী' সিদ্ধান্ত মাত্র। সুতরাং বাস্তবে ছহীহটি ভুল হওয়া এবং যঈফটি ছহীহ হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
অপর হানাফী বিদ্বান যাফর আহমাদ উছমানী (১৯৭৪খ্রি.) বলেন, إن تضعيف الرجال وتوثيقهم وتصحيح الحديث وتحسينها أمر اجتهادي ولكل وجهة 'বর্ণনাকারীদেরকে যঈফ বা শক্তিশালী ঘোষণা করা এবং হাদীছকে ছহীহ বা হাসান আখ্যায়িত করার বিষয়টি ইজতিহাদী। প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'কোন একজনের নিকট একটি হাদীছ ছহীহ হওয়ার অর্থ এমন নয় যে অপরজনের নিকটও হাদীছটি ছহীহ হবে, আবার কোন একজনের নিকট হাদীছটি যঈফ হওয়ার অর্থ অপরজনের নিকটও তা যঈফ হবে এমন নয়। ' এই বক্তব্যের টীকায় সমকালীন প্রসিদ্ধ হানাফী বিদ্বান আব্দুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ (১৯৯৭খ্রি.) লিখেছেন, فإن دعواه الصحة والحسن في حديث لا تتأتي ولا تتمشي بدون Enter تقليده رأي المحدثين في ذلك فأي فرق بين تقليدهم وتقليد المجتهدين দাবী করে যে, কোন হাদীছ ছহীহ বা হাসান, তার পক্ষে এ হুকুম দেয়া সম্ভব নয় মুহাদ্দিছদের মতামতের অন্ধানুসরণ ব্যতীত। অতএব মুহাদ্দিছদের অন্ধানুসরণ এবং মুজতাহিদদের অন্ধানুসরণের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
আবুল আ'লা মওদূদী (১৯৭৯খ্রি.)-ও অনুরূপ মত প্রকাশ করে বলেন, 'মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণের খিদমত সর্বস্বীকৃত। এতে কোন কথা নেই। কথা কেবল এ বিষয়ে যে, পুরোপুরিভাবে তাঁদের উপরে ভরসা করা কতটুকু সঠিক হবে। হাজার হৌক তাঁরা তো ছিলেন মানুষই। অতএব কিভাবে আপনি একথা বলতে পারেন যে, তাঁরা যে হাদীছকে 'ছহীহ' সাব্যস্ত করেছেন, আসলেই সেটা ছহীহ? অধিকন্তু যার কারণে তাদের মধ্যে হাদীছের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধারণার সৃষ্টি হয়, সেটি হ'ল রেওয়ায়াতের (বর্ণনার) দৃষ্টিকোণ, দিরায়াতের (যুক্তি গ্রাহ্যতার) দৃষ্টিকোণ নয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশীর বেশী সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গি, ফিকহ বা তাৎপর্য অনুধাবন তাদের বিষয়বস্তু ছিল না। নিচে এই মতাবলম্বীদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডন করা হ'ল।
ক. হাদীছ সংগ্রহ, সংকলন এবং সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণের পর সর্বশেষ স্তর হ'ল, তার ওপর হুকুম আরোপ করা। আর তা হ'ল হাদীছটিকে ছহীহ বা যঈফ সাব্যস্ত করা। এটি নিঃসন্দেহে ইজতিহাদী বিষয়, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এই ইজতিহাদ তথাকথিত ব্যক্তিগত মানদণ্ড বা অভিরুচির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং হাদীছের ইসনাদ ও মতনের উপর সুদীর্ঘ গবেষণার নিয়মতান্ত্রিক ও প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত, যার পিছনে রয়েছে হাজারো বিদ্বানের কঠোর সাধনা এবং সীমাহীন কায়িক ও মানসিক পরিশ্রম। এজন্য তাদের গবেষণা ও তার ফলাফলের ওপর বিদ্বানগণ একবাক্যে ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং তা আমলযোগ্য দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। মুহাদ্দিছদের গবেষণা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নির্মোহ এবং নিয়মতান্ত্রিক। কোন বিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে তাদের গৃহীত নীতিমালার গভীরতা, সক্ষমতা এবং সুদৃঢ়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানবেতিহাসে এর চেয়ে কোন নিরাপদ এবং শ্রেষ্ঠ নীতিমালা অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি। যা সমালোচনামূলক গবেষণাধারা (Critical Study)-এর সর্বোচ্চতম নমুনা প্রতিষ্ঠা করেছে। আমেরিকান গবেষক এরিক ডিকেনসন (জন্ম: ১৯৬১খ্রি.) ইবনু আবী হাতেম (৩২৭হি.) সংকলিত الجرح والتعديل গ্রন্থের ভূমিকা تقدمة المعرفة বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তিনি হাদীছ সমালোচনা শাস্ত্রের সূক্ষ্মতা লক্ষ্য করে বিমোহিত হন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে, 'সত্যিই যদি ছহীহ হাদীছ থেকে থাকে, তবে এটা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, মুহাদ্দিছগণ ছহীহ হাদীছগুলো চিহ্নিত করতে সম্ভাব্য সর্বোত্তম পন্থাই উদ্ধাবন করেছিলেন।'
খ. মুহাদ্দিছদের এই গবেষণাধারাকে বুঝতে হ'লে প্রথমে জানতে হবে যে, কী কী বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা শ্রেষ্ঠত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। যেমন:
সততা: ওয়াকী' ইবনুল জারাহ (১৯৮হি.) বলেন, هذه صناعة لا يرتفع فيها إلا صادق منه “এটি এমন একটি শাস্ত্র যাতে সত্যবাদী ছাড়া কেউ টিকে থাকতে পারে না।” এই গুণাবলী অর্জনে যে আল্লাহভীতি, ন্যায়নিষ্ঠা, যাবতীয় পাপ থেকে বেঁচে থাকা, আমানতদারিতা, আল্লাহর দ্বীনকে সঠিকভাবে হেফাযত করার জন্য সুতীব্র দায়বোধ প্রয়োজন ছিল তা মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেন। দ্বীনের পথে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হ'ল সততা ও সত্যবাদিতা, নতুবা মানুষের কাছে কখনও বিশ্বস্ততা অর্জন করা সম্ভব নয়। আর-রাগিব আল-আস্ফাহানী (৫০২হি.) বলেন, هو أصل المحمودات وركن النبوات ونتيجة التقوى ولولاه لبطلت أحكام الشرائع '(সত্যবাদিতা) হ'ল সকল প্রশংসনীয় বিষয়ের মূল, নবুওয়াতের ভিত্তি এবং আল্লাহভীতির ফলশ্রুতি। যদি সত্যবাদিতা না থাকত তবে শরী'আতের সমন্ত বিধানসমূহ অকার্যকর হয়ে যেত। এজন্যই আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।' মুহাদ্দিছগণকে আল্লাহ তাঁর দ্বীনের সংরক্ষণের জন্যই সম্ভবত সততার মূর্ত প্রতীকে পরিণত করেছিলেন।
খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) তাঁর 'আল-জামি' লি আখলাক্বির রাবী' গ্রন্থে এরূপ অনেক উদাহরণ নিয়ে এসেছেন। যেমন ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন إِنِّي لَأُحَدِّثُ بِالْحَدِيثِ فَأَسْهَرُ لَهُ مَخَافَةَ أَنْ أَكُونَ قَدْ أَخْطَأْتُ (২০০হি.) বলেন, فيه 'আমি হাদীছ বর্ণনা করি আর রাতে বিনিদ্র থাকি এই ভয়ে যে, আমি তাতে কোন ভুল করে ফেললাম কি না। শু'বা (১৬০হি.) বলেন, আমি সুলায়মান আত-তায়মীর চেয়ে সত্যবাদী আর কাউকে দেখিনি। যখন তিনি কোন হাদীছ বর্ণনা করতেন, তাঁর চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেত।
এই সততা বজায় রাখার প্রতিজ্ঞা থেকেই তাঁরা 'ইসনাদ' ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছিলেন। ইবনু সীরীন বলেন, كان في الزمان الأول لا يسألون عن الإسناد، فلما وقعت الفتنة، سألوا عن الإسناد যুগে তারা ইসনাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত না। কিন্তু যখন ফিতনা সংঘটিত হ'ল, তখন তারা ইসনাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগল। ফলে এই সততার চর্চা ইলমুল হাদীছের সর্বত্র কঠোরভাবে চর্চিত হয়েছে, যা মুহাদ্দিছ বিদ্বানদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
বস্তুনিষ্ঠতা ও আমানতদারিতা: মুহাদ্দিছদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বস্তুনিষ্ঠতা। ফলে কোন প্রকার বহিরাগত চাপ বা ব্যক্তিগত অনুরাগ কিংবা বিরাগ তাদেরকে পথচ্যুত করতে পারেনি। এই নিখাঁদ বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে তাঁদের গৃহীত পদ্ধতিসমূহ ছিল - (ক) ইসনাদ সংরক্ষণ। (খ) বর্ণনাকারীদের প্রকৃত অবস্থা সাধ্যমত পুংখানুপুংখ যাচাই করা। (গ) আহকামগত হাদীছের ক্ষেত্রে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার জন্য তারা এমন বর্ণনাকারীকে কেবল গ্রহণযোগ্য মনে করেছিলেন যারা সকল প্রকার অভিযোগ থেকে মুক্ত। (ঘ) তারা কারো প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে মতামত প্রকাশ করতেন না এবং সত্য প্রকাশে কখনও ভয় পেতেন না। এমনকি নিজের পিতা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধেও তারা 'জারাহ' (সমালোচনা) করতে দ্বিধা করতেন না। (ঙ) তাঁরা এমন কোন ব্যক্তির সমালোচনা গ্রহণ করতেন না, যারা তার সাথী বা সমসাময়িক, বিশেষত যারা হিংসাবশত সাথীদের ব্যাপারে কোন কথা বলতে পারেন। এ সকল কঠোর নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে তাঁদের একটিই উদ্দেশ্য ছিল যেন ইসলামী শরী'আহ্বর মধ্যে কোন বাতিলের অনুপ্রবেশ না ঘটতে পারে। আর ঘটলেও তা যেন সহজে চিহ্নিত করা যায়।
ধৈর্য এবং অধ্যাবসায় : হাদীছ একত্রিত করা এবং তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য মুহাদ্দিছগণ যে অস্বাভাবিক পরিশ্রম করেছেন, পৃথিবীর অন্য কোন শাস্ত্রে তার নযীর পাওয়া যায় না। কখনও একটি মাত্র হাদীছ সংগ্রহের জন্য তারা একটি দেশ সফর করতেন। এরূপ অসংখ্য ঘটনা হাদীছ শাস্ত্রের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ইবনুল মুসাইয়িব (৯৪হি.) বলেন, إني كنت لأسير الأيام والليالي في طلب الحديث الواحد হাদীছ সংগ্রহের জন্য দিন-রাত সফর করতাম। ইমাম বুখারী (২৫৬হি.) হাদীছ সংগ্রহের অভিযানে মাত্র ২১ বছর বয়সেই আরব ও খোরাসানের প্রায় সমস্ত শহর পরিভ্রমণ করেন। এমন পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের নযীর দেখিয়েছিলেন হাদীছ শাস্ত্রের অন্য ইমামগণও।
সাধারণ জীবনযাপন ও পরহেযগারিতা : মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ কালিমামুক্ত, পবিত্র জীবন যাপন করতেন। তারা নিজেদের পরহেযগারিতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারতপক্ষে কখনও শাসকদের নিকটবর্তী হ'তেন না এবং তাদের দারস্থও হ'তেন না। হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (১৬৭হি.) বলতেন, যদি কোন শাসক তোমাকে আহ্বান করে সূরা ইখলাছ পাঠের জন্য, তবুও তার কাছে যেও না। তারা শাসকদের উপহারও ফেরৎ দিতেন যার শত শত নযীর রয়েছে। তারা শাসকের সাথে সম্পর্ক রাখা বা তাদের উপহার গ্রহণ করাকে ফিতনা মনে করতেন এবং দুনিয়াদারীর প্রতি আকর্ষণসৃষ্টির কারণ মনে করতেন। এই আপোষহীন মনোভাব তাঁরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে বজায় রাখতেন।
বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা অনুসরণ: জাল হাদীছ চিহ্নিত করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে হাদীছ সংগ্রহ, সংকলন ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেন। তাঁরা প্রণয়ন করেছিলেন ইলমুল ইসনাদ, ইলমুল মতন, ইলমুর রিওয়ায়াহ, ইলমু রিজালিল হাদীছ, ইলমুল জারাহ ওয়াত তা'দীল, ইলমু ঈলালিল হাদীছ, ইলমু মুস্তালাহিল হাদীছের মত হাদীছ সমালোচনা শাস্ত্রের কঠোর নিয়মতান্ত্রিক হাতিয়ার। * একটি মাত্র হাদীছকে বিশুদ্ধভাবে সংগ্রহের জন্য তারা যে অমানুষিক পরিশ্রম করতেন, তা ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তী হয়ে আছে।
সুতরাং এ সকল বৈশিষ্ট্য থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, সাধারণ অন্য যে কোন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকদের চেয়ে হাদীছ গবেষকদের অবস্থান ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তাঁদেরকে যেন এই দ্বীনের হেফাযতের জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) বলেন, 'প্রতিটি শাস্ত্রের জন্য বিশেষ লোক রয়েছে, যারা সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। তবে মুহাদ্দিছগণ হ'লেন তাদের সবার চেয়ে উঁচু মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তারা সর্বাধিক সত্যবাদী, সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং সর্বাধিক ধর্মপ্রাণ। তারা বর্ণনাকারীদের জারাহ ও তা'দীলের ক্ষেত্রে আমানতদারিতা, সত্যবাদিতা বজায় রাখা এবং এ ব্যাপারে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় ছিলেন অনেক উচ্চস্থানীয়। যদিও তাদের মধ্যে জ্ঞানে এবং ন্যায়পরায়ণতায় স্তরভেদ ছিল যেমনটি সকল জ্ঞানের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
গ. হাদীছ শাস্ত্রে গৃহীত নীতিমালাকে মুহাদ্দিছদের ইজতিহাদী সিদ্ধান্ত বলার সুযোগ নেই। কেননা এতে ধারণা বা কল্পনার স্থান নেই, বরং তা প্রত্যক্ষ দর্শন (مشاهدات) কিংবা শ্রবণ (مسموعات)-এর ওপর নির্ভরশীল জ্ঞান। যে সকল শর্তারোপ করা হয়েছে যেমন- সনদের অবিচ্ছিন্নতা, রাবীদের শক্তিশালী হওয়া, বর্ণনাকারী এবং যার নিকট থেকে বর্ণনা করা হচ্ছে, তারা সমসাময়িক যুগের হওয়া এবং তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হওয়া, হাদীছ শ্রবণ করা প্রভৃতি শর্তসমূহ সবই পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধিযোগ্য ও প্রত্যক্ষ জ্ঞান। এছাড়া মুহাদ্দিছগণ বর্ণনাকারীদের অবস্থা বর্ণনার জন্য জারাহ ও তা'দীলের যে সকল শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা অধিকাংশই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ধারণার বশবর্তী হয়ে কিংবা ক্বিয়াস করে বলেন না। উদাহরণস্বরূপ রাসূল (ছা.)-এর সত্যবাদিতা এমনই সুনিশ্চিত বিষয় ছিল যে, কাফিররাও তীব্র শত্রুতা সত্ত্বেও তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। এর পক্ষে তাদের দলীল ছিল এই যে, রাসূল (ছা.) কখনও মিথ্যা বলেননি। সুতরাং জারাহ ও তা'দীল কোন ধারণানির্ভর জ্ঞান নয়, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নির্ভর জ্ঞান, যা অকাট্য। তেমনিভাবে কোন বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীছ অপর বর্ণনাকারীদের বিরোধী হওয়ার বিষয়টিও সুস্পষ্ট, এতে কোন ধারণার অবকাশ নেই। কোন ছহীহ হাদীছের মধ্যে গোপন ত্রুটি না থাকার শর্তারোপ করা একটি নেতিবাচক শর্ত। এটিও ধারণার মাধ্যমে জানা যায় না বরং তা বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখাপেক্ষী। অতএব হাদীছ শাস্ত্র কারও ব্যক্তিগত চিন্তানির্ভর জ্ঞান নয় বরং বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ একটি শাস্ত্রের নাম।
ঘ. একজন মুহাদ্দিছ এবং একজন ফক্বীহের ইজতিহাদ এক নয়। কারণ একজন ফক্বীহ যখন কোন মাসআলা নির্ণয় করেন, তখন তিনি তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্তকে কখনও চূড়ান্ত ঘোষণা করেন না এবং তার ওপর আমল করা অন্যদের জন্য ওয়াজিবও বলেন না। কিন্তু একজন মুহাদ্দিছ যখন কোন হাদীছ ছহীহ বলে চিহ্নিত করেন, তখন ইসনাদ এবং অন্যান্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব হয়ে যায়। এই বিষয়ে বিদ্বানদের মাঝে কোন বিতর্ক নেই। যারা উভয় ইজতিহাদকে এক দৃষ্টিতে দেখেন তাঁরা অবশ্যই জানেন যে, একজন সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বর্ণনার ওপর আস্থা রাখা একটি সর্বসম্মত বিষয়। এতে পৃথিবীর কোন বিবেকসম্পন্ন মানুষের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব নেই। কুরআনেই বলা হয়েছে যে দু'জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচারক ফয়ছালা করবেন। সুতরাং মুহাদ্দিছের ইজতিহাদ কোন ব্যক্তিগত রায়ের নাম নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিদ্বানগণ বলেছেন যে, إذا صح الحديث فهو مذهبي 'যখন কোন (বিষয়ে) হাদীছ ছহীহ পাওয়া যাবে, তখন সেটিই আমরা মাযহাব।' বিদ্বানগণ এজন্য যঈফ হাদীছকেও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার দিতেন। কেননা কোন হাদীছ মূলগতভাবে অকাট্য, কিন্তু তাতে সন্দেহের অনুপ্রবেশ ঘটে বর্ণনাকারীদের কারণে। আর ক্বিয়াস হ'ল মূলগতভাবেই ধারণানির্ভর। সুতরাং মুহাদ্দিছের ইজতিহাদ এবং ফকীহের ইজতিহাদের প্রকৃতি নিঃসন্দেহে ভিন্ন। ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) বলেন, 'যদি দু'জন ফক্বীহ কোন দ্বীনের কোন শাখাগত বিষয়ে পরস্পর মতভেদ করেন, তখন বিতর্ককারীর জন্য দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় না; তবে হাদীছ ব্যতীত, যে হাদীছটি সম্পর্কে সে জানে যে, হাদীছটি দলীলযোগ্য কিংবা কোন মুহাদ্দিছ তাকে ছহীহ বলেছেন। এই মন্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফক্বীহের রায় দ্বারা দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় না, কিন্তু মুহাদ্দিছের রায় দ্বারা দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং উভয়ের ইজতিহাদের মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
৬. যদি মুহাদ্দিছদের প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত মানদণ্ড মোতাবেক বা ইজতিহাদী না হয়, তবে তাদের মধ্যে কোন হাদীছ সম্পর্কে ছহীহ বা যঈফ রায় প্রদানে পারস্পারিক মতভেদ কেন দেখা দেয়?-এ প্রশ্নের জবাবে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়। যেমন:
(১) কিছু হাদীছের দু'টি সূত্র রয়েছে। একটি ছহীহ, অপরটি যঈফ। যখন এক মুহাদ্দিছের নিকট হাদীছটি যইফ সূত্র থেকে পৌঁছায় তখন তাকে যঈফ আখ্যা দেন; আর যখন ছহীহ সূত্রে পৌঁছায় তখন তাকে ছহীহ আখ্যা দেন।
(২) দু'জন মুহাদ্দিছের উভয়ের নিকট হাদীছটি যঈফ সূত্রে পৌঁছানোর পর একজন হাদীছটির সপক্ষে শাওয়াহিদ পেলে তাকে ছহীহ ঘোষণা করেন। অপরপক্ষে যিনি শাওয়াহিদের সন্ধান পান নি, তিনি হাদীছটিকে ছহীহ ঘোষণা করেন নি। মুহাদ্দিছগণ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোন হাদীছকে যখন 'হাসান লি যাতিহি' অথবা 'হাসান লি গায়রিহি' আখ্যা দিয়ে থাকেন।
(৩) দু'জন মুহাদ্দিছের উভয়ই যঈফ হাদীছটির পক্ষে শাওয়াহিদ পেয়েছেন, কিন্তু একজন হাদীছটির একটি বিশেষ সনদ ও মতনকে যঈফ ঘোষণা করেছেন। এজন্য সুনানুত তিরমিযীতে দেখা যায়, غريب بهذا اللفظ 'হাদীছটি এই শব্দে দুর্বল।'
(৪) কোন একজন হাদীছটি এই জন্য যঈফ আখ্যা দিয়েছেন যখন তিনি দেখেছেন যে, একজন ইমাম হাদীছটির কোন বর্ণনাকারীকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। অথচ সেই ইমাম পুনরায় অধিক বিশ্লেষণের পর তাঁর মন্তব্য থেকে সরে এসেছেন, যা এই মুহাদ্দিছ অবগত ছিলেন না।
চ. জারাহ ও তা'দীলের ক্ষেত্রে মতভেদের জবাবে কয়েকটি কারণ বর্ণনা করা যায়। যেমন:
(১) কোন ইমাম একজন বর্ণনাকারীর অবস্থা পর্যালোচনার পর তার মধ্যে এমন কিছু পাননি যে, তাকে ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণা করা যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই বর্ণনাকারীর আচরণে পরিবর্তন আসে। ফলে সেই একই ইমাম তাকে ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই ইমামের ছাত্ররা তাদের ওস্ত াদের উভয় কথাটি শ্রবণ করেছিলেন। ফলে যারা তাঁকে 'তা'দীল' করতে শুনেছিলেন তারা উক্ত বর্ণনাকারীকে শক্তিশালী বলেছেন। আর যারা 'জারাহ' করতে বা ত্রুটিপূর্ণ বলতে শুনেছিলেন তারা উক্ত বর্ণনাকারীকে দুর্বল বলেছেন। অথচ এই ছাত্ররা দু'টি ভিন্ন সময়ে ওস্তাদের নিকট থেকে শুনেছিলেন। এমন একজন রাবী ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু লাহি'আহ (১৭৫হি.)। যিনি প্রথমে ছিকাহ রাবী হিসাবেই পরিগণিত হ'তেন। কিন্তু তাঁর লাইব্রেরীতে আগুন লেগে সকল কিতাব পুড়ে যায়। ফলে তাঁর স্মৃতিশক্তি থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক ভুল করেন এবং যঈফ হিসাবে গণ্য হ'তে থাকেন।
(২) কখনও কোন ইমাম বর্ণনাকারী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেননি এবং তাঁর জ্ঞান মোতাবেক বর্ণনাকারীকে ত্রুটিপূর্ণ পান নি। কিন্তু অপর একজন ইমাম তার সম্পর্কে অধিক অবগত ছিলেন এবং তাকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়েছেন।
(৩) মানুষ হিসাবে প্রত্যেকেই সমান জ্ঞান ও মর্যাদার অধিকারী নয়। কিছু কমবেশী থাকেই। এমনকি নবীদের মধ্যে এমন তফাৎ ছিল। তেমনিভাবে মুহাদ্দিছদের মধ্যেও সব ধরণের ব্যক্তি ছিলেন। যাদের কেউ ছিলেন নরমপন্থী, কেউ মধ্যমপন্থী আবার কেউ কট্টরপন্থী। ফলে ইমাম আল-ই'জলী, ইবনু হিব্বান অপরিচিত রাবীদের ছিকাহ ঘোষণা করা বিষয়ে নরমপন্থা অবলম্বন করেছেন। অনুরূপভাবে ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম হাকিমও রাবীদের প্রতি অধিক সুধারণা রাখতেন। অপরদিকে ইমাম আহমাদ, ইমাম দারাকুলী, ইবনু আদী প্রমুখ ছিলেন মধ্যমপন্থী। আবার ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন, আবূ হাতিম আর-রাগী, ইমাম নাসাঈ প্রমুখ জারাহ করার ক্ষেত্রে অতিশয় কট্টরপন্থা এবং সতর্কতা অবলম্বন করতেন।
এ সকল কারণে রাবীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য কিছু হয়েছে। কিন্তু বিভক্তি নিরসন এবং সমন্বয় সাধনের জন্য মুহাদ্দিছগণ যথাযথ নীতি অবলম্বন করেছেন। 'জারাহ মুফাস্সার' (ত্রুটির বিস্তারিত বিবরণ), 'তা'দীল মুফাস্সার' (ন্যায়পরায়ণতার বিস্তারিত বিবরণ) প্রভৃতি পরিভাষা এজন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং জারাহ ও তা'দীলের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও তা নিষ্পত্তির জন্য মুহাদ্দিছদের নিকট নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাও রয়েছে।
ছ. ইমাম বুখারী যাদের নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণ করেছেন, এমন ছয়শ মুহাদ্দিছ থেকে ইমাম মুসলিম হাদীছ গ্রহণ করেন নি- এই মন্তব্য মুহাদ্দিছদের নীতি সম্পর্কে অজ্ঞতার ফসল। মুহাদ্দিছগণ সর্বদা চাইতেন উচ্চতর সনদে হাদীছ বর্ণনা করার জন্য। অথবা ইতিপূর্বে যে সনদ থেকে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তা ভিন্ন অন্য কোন সনদে হাদীছটি বর্ণনা করার জন্য। এতে সূত্র সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, হাদীছটির নিশ্চয়তাও তত বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং ইমাম বুখারী গৃহীত ছয় শত মুহাদ্দিছ থেকে ইমাম মুসলিম হাদীছ বর্ণনা না করার অর্থ এই নয় যে, তিনি তাদের পরিত্যাজ্য মনে করেছেন। যেমন ইমাম বুখারী তাঁর গ্রন্থে ইমাম শাফেঈ থেকে একটি হাদীছও বর্ণনা করেন নি। এর অর্থ এই নয় যে তিনি তাঁকে পরিত্যাজ্য মনে করেছেন। বরং সনদের উচ্চতা সন্ধান কিংবা নতুন নতুন সনদ সন্ধানের জন্য তাঁরা অনেক সময় পূর্ব উদ্ধৃত বর্ণনাকারীদের সনদ পুনরাবৃত্তি করতেন না।
জ. ড. আহমাদ আমীন সহ কতিপয় লেখক জারাহ-তা'দীলের এই মতভেদকে মুহাদ্দিছদের মাযহাবী দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্যের ফলাফল হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এর জবাবে আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) বলেন, জারাহ ও তা'দীল কখনও ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা মাযহাবী মতপার্থক্যের ওপর ভিত্তিশীল ছিল না। মুহাদ্দিছগণ শুধু মাযহাবী গোঁড়ামির কারণে কখনও বিরোধী ফিরকাসমূহের রাবীদের প্রত্যাখ্যান করেন না। তাদের মতপার্থক্যের ভিত্তি ছিল কেবলমাত্র রাবীর সত্যবাদিতা ও মিথ্যাবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ফাসিকী এবং তার সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং ভুলপ্রবণতা সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। এজন্য দেখা যায় হাদীছের কিতাব সমূহে এমনকি ছহীহাইন গ্রন্থদ্বয়েও অনেক বিদআতী ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণ করা হয়েছে, কেননা তাদের সত্যবাদিতা প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ বিদ'আতী হওয়া সত্ত্বেও তাদের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা হয় নি। যেমন: খারিজী রাবী ঈমরান ইবনু হিত্ত্বান (৮৪হি.) এবং শী'আ রাবী আবান ইবনু তাগাল্লুব (১৪১হি.)। সুতরাং জারাহ-তা'দীলের পশ্চাতে কোন মাযহাবী বিদ্বেষ, দুরভিসন্ধি বা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের কোন বিষয় ছিল না।
ঝ. বিদ্বানদের গৃহীত জারাহ ও তা'দীলের নীতিমালা যদি কেউ অধ্যয়ন করেন তবে স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে, জারাহ-তা'দীলের ক্ষেত্রে যে কারো মন্তব্য সরাসরি গৃহীত হয় না। যে সকল বিদ্বানের মন্তব্যকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় তাদের মধ্যেও স্তরভেদ করা হয়েছে- (১) কট্টরপন্থী (২) মধ্যমপন্থী এবং (৩) নরমপন্থী। সুতরাং যখন কোন মন্তব্য পরস্পরবিরোধী হয়, তখন সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে তার মধ্যে কোনটি অগ্রাধিকারযোগ্য তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রে এত সূক্ষ্ম নীতিমালার ব্যবহার করা হয়েছে যে, কেউ কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে মন্তব্য করলেও তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। এজন্য আয-যাহাবী (৭৪৮হি.) মন্তব্য করেন, لم يجتمع اثنان من علماء هذا الشأن قط على توثيق ضعيف، ولا على تضعيف ثقة
(জারাহ ও তা'দীল) বিদ্বানদের মধ্যে এমন দু'জন বিদ্বানকে পাওয়া যাবে না যারা কোন দুর্বল রাবীকে নির্ভরযোগ্য কিংবা কোন শক্তিশালী রাবীকে যঈফ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি বাস্তবে 'যঈফ' হয়ে থাকেন তবে তার ব্যাপারে এমন দু'জন বিদ্বান পাওয়া যাবে না যারা তাকে বাস্তবতার বিপরীতে 'নির্ভরযোগ্য' বলেছেন, আবার যদি কোন ব্যক্তি বাস্তবে 'ছিকাহ' বা শক্তিশালী হয়ে থাকেন, তবে এমন দু'জন বিদ্বান পাওয়া যাবে না যারা বাস্তবতার বিপরীতে তাকে 'যঈফ' বলেছেন। সুতরাং কোন ক্ষেত্রে যদি মতভেদ হয়েও থাকে, তবে সেখানে সঠিক মতটিও চিহ্নিত করার ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
অতএব এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, মুহাদ্দিছদের মধ্যে হাদীছ গ্রহণের মৌলিক শর্তাবলীসমূহ নিয়ে কোন মতভেদ নেই। যে সব মতভেদ রয়েছে, তা শাখাগত মতভেদ এবং সমাধানযোগ্য। আর তারা যে সকল হাদীছকে ছহীহ বলেন তা মৌলিক সকল শর্ত পূরণ করার পরই ছহীহ হিসাবে আখ্যায়িত হয়। এতে কারও কোন ব্যক্তিগত মতের স্থান নেই যে তাকে ইজতিহাদী মত আখ্যায়িত করে পরিত্যাগ করার সুযোগ রয়েছে, যেমনটি অনেকে ধারণা করে থাকেন। কেননা তা সুস্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। কোন ক্ষেত্রে অধিকতর শক্তিশালী দলীল উপস্থিত হওয়ার কারণে পূর্ববর্তী মুহাদ্দিছদের সিদ্ধান্ত ভুলও প্রমাণিত হ'তে পারে। সেক্ষেত্রে শক্তিশালী দলীলেরই অনুসরণ করতে হবে, যদি কেউ পরবর্তীতে তা চিহ্নিত করতে পারেন। অর্থাৎ হাদীছ শাস্ত্র পুরোটাই দলীলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে কোন মুহাদ্দিছ বা ইমামের অন্ধানুসরণ করা হয় না যদি তার ভুল প্রমাণিত হয়, এমনকি তিনি যদি ইমাম মালিকের মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছও হন। আর এই দলীলের মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণেই অদ্যাবধি হাদীছ গবেষণা সুনির্দিষ্ট নীতি মোতাবেক চলমান রয়েছে। মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী (১৯৯৯খ্রি.), শু'আইব আল-আরনাউত্ব প্রমুখ মুহাদ্দিছদের নিরবচ্ছিন্ন হাদীছ গবেষণা এর পক্ষে জোরালো সাক্ষ্য প্রদান করে।
ঞ. আবুল আ'লা মওদূদী প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ মুহাদ্দিছদের প্রতি যে যুক্তিতে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন, তা কোন ইলমী দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন নি, বরং ব্যক্তিগত কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন মাত্র। তাঁদের এই সন্দেহের জবাবে ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (১৯৪৮খ্রি.) বলেন, যদি কোন বিচারক আদালতে কোন আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষীদের মতামত বিশ্লেষণ করার পর আসামীকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং শাস্তি প্রদান করেন, সেক্ষেত্রে এ কথা বলা কি যুক্তিসংগত হবে যে, এই সাক্ষীদের মতামত প্রবল ধারণাভিত্তিক এবং এতে ভুলের সম্ভাবনা আছে, সুতরাং আদালতের এই বিচার গ্রহণযোগ্য নয়? দ্বিতীয়ত, কাউকে যদি বিচারকের দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহ'লে তিনি চুরি, যেনা, হত্যা প্রভৃতি অপরাধে আসামীদের বিচারকার্য কিসের ভিত্তিতে পরিচালনা করবেন? সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে না কি নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তি ও অভিরুচির ভিত্তিতে? নিঃসন্দেহে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। কেননা আল্লাহর আইনেও যেমন বিচারকার্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতীত গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি পৃথিবীর কোন আইনেও সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যতীত নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনার কোন মূল্য নেই। ঠিক একইভাবে মুহাদ্দিছদের নীতিমালাও সর্বজনগ্রাহ্য সাক্ষ্য আইনের মত নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগের সুযোগ নেই। বরং মুহাদ্দিছদের নীতিমালা সাক্ষ্য আইনের চেয়ে অনেক বেশী কঠিন এবং শক্তিশালী। কেননা বহু সাক্ষী আছে যারা মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করে থাকে। কিন্তু মুহাদ্দিছরা কেবল বর্ণনাকারীকে বিশ্বস্ত পেলেই তার বর্ণনার উপর নির্ভর করতেন না। বরং নানা দিক থেকে বর্ণনাকারী ও তার বর্ণনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পরই তা গ্রহণ করতেন।
দ্বিতীয়ত, যদি এই মতের প্রবক্তাগণের দাবী অনুযায়ী হাদীছ ছহীহ ও যঈফ নির্ধারণের জন্য যদি 'ব্যক্তিগত অভিরুচি' ব্যবহার করা হয়, তবে বিশেষ কোন ব্যক্তির অভিরুচিকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করবেন? এই অভিরুচির কায়দা-কানুন কী হবে? কেননা একজনের অভিরুচি অপরজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়াই স্বাভাবিক। ব্যক্তি ও পরিবেশ ভেদে প্রতিটি যুগে এই অভিরুচির পরিবর্তন হবেই। সুতরাং এই দাবী গ্রহণ করা হ'লে হাদীছসমূহ মানুষের ব্যক্তিগত অভিরুচির ফাঁদে আটকা পড়ে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং ইতিহাসের সম্পদে পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, সেক্ষেত্রে ইসলামের মধ্যে বিভিন্ন দল ও মতের দ্বন্দ্বকে কেবল প্রত্যেকের 'ব্যক্তিগত অভিরুচি' বলে বৈধতা প্রদান করতে হবে। সুতরাং কেউ কাউকে বলতে পারবে না যে, অমুক কর্মটি বৈধ নয়, কেননা সেটি হাদীছের খেলাফ। কেননা প্রত্যেকেই যার যার অভিরুচি মোতাবেক স্বাধীনভাবে হাদীছ গ্রহণ করবেন এবং বর্জন করবেন। যেহেতু কার অভিরুচি সঠিক না ভুল, তা নির্ণয়ের কোন সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। মাওলানা আবুল আ'লা মওদূদী নিজেই এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। সুতরাং এই মত একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা বলব, এই মতের প্রবক্তাদের বক্তব্য কুরআনে বর্ণিত মুশরিকদের এই দাবীর মতই যেখানে বলা হয়েছে- قَالُوا مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَمَا أَنْزَلَ الرَّحْمَنُ مِنْ شَيْءٍ إِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَكْذِبُونَ
আমাদের মতই মানুষ। আর পরম করুণাময় তো কিছুই অবতীর্ণ করেন নি। তোমরা শুধু মিথ্যেই বলছ’। অর্থাৎ মুশরিকরা যেমন নবীদেরকে মিথ্যুক বলতে চেয়েছে এই যুক্তিতে যে তারাও তাদের মত মানুষ, ঠিক একইভাবে তারাও মুহাদ্দিছগণের ভুল হওয়াকে অপরিহার্য করতে চাইছেন, এই যুক্তিতে যে তাঁরাও মানুষ। আর এই সম্ভাবনার কারণে মুহাদ্দিছরা দলীলভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে কোন হাদীছ ছহীহ ও যঈফ নির্ণয় করার পরও তাঁরা দাবী করেন যে, এগুলি তাদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমাদের প্রশ্ন হ'ল, এছাড়া আর কোন নীতিমালা অবলম্বন করলে তারা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবেন? যদি তাঁদের দাবী মোতাবেক 'ব্যক্তিগত অভিরুচি' ভিত্তিক কোন বিকল্প নীতিমালা সত্যিই থেকে থাকে, তবে তার অস্তিত্ব কোথায়? যদি সত্যিই এমন ব্যবস্থাপনা যুক্তিসঙ্গত ও নিরাপদ হ'ত, তবে মুহাদ্দিছগণ নিশ্চিতভাবে তা অবলম্বন করতেন। কেননা হাদীছ সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য এমন কোন উপায় নেই, যা তারা ব্যবহার করেন নি।
টিকাঃ
৩৭৫. দ্র. তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট- www.mustafaislamoglu.com.
৩৭৬. ড. আহমাদ আমীন, যুহাল ইসলাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১৭-১১৮; ঐ, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ২১৭।
৩৭৭. মাহমূদ আবূ রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩৩৩-৩৩৪।
৩৭৮. আসলাম জয়রাজপুরী, মাক্কামে হাদীছ, পৃ. ১২৭, ১৩৩-১৩৫।
৩৭৯. وقد أخرج مسلم عن كثير في كتابه ممن لم يسلم من غوائل الجرح وكذا في ٥٩٥ البخاري جماعة تكلم فيهم فدار الأمر في الرواة على اجتهاد العلماء فيهم... فإن وصف الحسن والصحيح والضعيف إنما هو باعتبار السند ظنا، أما في الواقع فيجوز غلط الصحيح وصحة الضعيف -ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৪৫-৪৪৬।
৩৮০. যাফর আহমাদ ওছমানী, কাওয়াইদুন ফী উলুমিল হাদীছ, পৃ. ৪৯।
৩৮১. তদেব, পৃ. ৫৫।
৩৮২. তদেব।
৩৮৩. সাইয়িদ আবুল আ'লা মওদূদী, তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৬।
৩৮৪. In the end, I think, any estimation of the efficacy of hadith criticism as a means for authenticating hadith must turn on the question of whether there were any authentic hadith at all. If there were, it must be granted that the critics devised the best possible means for identifying them. See: Eerik Dickinson, The Development of Early Muslim Hadith Criticism, p. 125-126.
৩৮৫. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-জামি' লি আখলাক্কির রাবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭।
৩৮৬. আর-রাগিব আল-আস্ফাহানী, আয-যারী'আতু ইলা মাকারিমিশ শারী'আহ (কায়রো: দারুস সালাম, ২০০৭খ্রি.), পৃ. ১৯৩।
৩৮৭. সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৯।
৩৮৮. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-জামি' লি আখলাক্কির রাবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০।
৩৮৯. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-জামি' লি আখলাক্কির রাবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৯।
৩৯০. ইবনু রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৪।
৩৯১. আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৫।
৩৯২. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১২শ খণ্ড, পৃ. ৩৯৪, ৪০৭।
৩৯৩. আয-মিযী, তাহযীবুল কামাল, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২৬৬।
৩৯৪. মুহাম্মাদ আলী ক্বাসিম আল-উমরী, দিরাসাতুন ফী মানহাজিন নাক্বদ ইন্দাল মুহাদ্দিছীন (জর্ডান: দারুন নাফাইস, ২০০০খ্রি.), পৃ. ৩৬২-৩৬২।
৩৯৫. ছিদ্দীক হাসান খান কনৌজী, আল-হিত্তাহ ফি যিকরিস সিহাহ আস-সিত্তাহ, পৃ. ১৪২; মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ৪২৯।
৩৯৬. খতীব আল-বাগদাদী, আর-রিহলাহ ফী তালাবিল হাদীছ (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, ১৩৯৫হি), পৃ. ১১৯, ১২৭, ১৯৫; ঐ, আল কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৪০২।
৩৯৭. فلكل علم رجال يعرفون به والعلماء بالحديث أجل هؤلاء قدرا ، وأعظمهم ٥٥٩٠ صدقا، وأعلاهم منزلة، وأكثر دينا، وهم من أعظم الناس صدقا وأمانة، وعلما وخبرة، فيما يذكرونه عن الجرح والتعديل .... كان بعضهم أعلم بذلك من بعض، وبعضهم أعدل من بعض في وزن كلامه، كما أن الناس في سائر العلوم كذلك ইবনু তায়মিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ (রিয়াদ: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৬খ্রি.), ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৪-৩৫।
৩৯৮. ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দামাতু ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২৮।
৩৯৯. দ্র. আব্দুস সালাম আল-মুবারাকপুরী, সীরাতুল ইমাম আল-বুখারী, পৃ. ৩৫১-৩৫২।
৪০০. ইবনু তায়মিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩০২।
৪০১. দ্র. আব্দুস সালাম আল-মুবারাকপুরী, সীরাতুল ইমাম আল-বুখারী, পৃ. ৩৫৩।
৪০২. অদেব, পৃ. ৩৫৩-৩৫৪।
৪০৩. আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৬০।
৪০৪. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৬৭-২৬৮।
৪০৫. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ১৩৮।
৪০৬. মুহাম্মাদ মুরতাযা ইবনু আয়েশ মুহাম্মাদ, আশ-শায়খ ছানাউল্লাহ আল-অমৃতসরী ওয়া জুহুদুহুদ দা 'আভিয়াহ (অপ্রকাশিত এম.এ. থিসিস) (রিয়াদ: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সউদ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৬খ্রি.), পৃ. ২৮৭-২৯০।
৪০৭. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯০।
৪০৮. মুহাম্মাদ মুরতাযা, আশ-শায়খ ছানাউল্লাহ আল-অমৃতসরী ওয়া জুহুদুহুদ দা'আভিয়াহ, পৃ. ২৯০।
৪০৯. সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১৫।
৪১০. ইবনু তাইমিয়া (৭২৮হি.) ইসনাদ এবং রেওয়ায়েত ভিত্তিক মুহাদ্দিছদের নীতিমালার প্রতি আনাস্থাশীল তৎকালীন রাফিযীদের অবস্থান সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তা এই মতাবলম্বীদের সাথে অনেকটা মিলে যায়। তিনি বলেন, وهم في ذلك شبيه باليهود والنصارى، فإنه ليس لهم إسناد والإسناد من خصائص هذه الأمة، وهو من خصائص الإسلام، ثم هو في الإسلام من خصائص أهل السنة. والرافضة من أقل الناس عناية ، إذ كانوا لا يصدقون إلا بما يوافق أهواءهم، وعلامة كذبه أنه يخالف هواهم। দ্র. ইবনু তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৭।