📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-১ : রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য কেবল তাঁর জীবদ্দশাতেই প্রযোজ্য

📄 সংশয়-১ : রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য কেবল তাঁর জীবদ্দশাতেই প্রযোজ্য


সমকালীন যুগের একজন লেখক মুহাম্মাদ ইবনু দীব শাহরূর বলেন, রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ হ'ল ছাহাবীদের জন্য ৭ম শতাব্দীর সমাজব্যবস্থার উপর প্রযোজ্য নীতিমালা। তাই একবিংশ শতাব্দীতে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর অগ্রগতি সাধন করতে চাইলে অবশ্যই বাস্তবধর্মী (Pragmatic) এবং চলমান সমাজব্যবস্থার উপযোগী ব্যাখ্যা (Contextual Interpretation)-এর মাধ্যমে ইসলামের বিধানসমূহ ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি আরও বলেন, কুরআনই হ'ল একমাত্র অহী, যা অপরিবর্তনীয়। আর হাদীছ হ'ল মানবীয় ইজতিহাদের নাম। রাসূল (ছা.) ছিলেন প্রথম মুজতাহিদ। হাদীছ হ'ল তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ, যা কালের বিবর্তনে পরিবর্তনীয়। এছাড়া খাজা আহমাদ দ্বীন, জামাল বান্না প্রমুখও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন।

পর্যালোচনা: রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশায় তাঁর সুন্নাহ বলবৎ থাকা এবং তাঁর মৃত্যুর পর তা বাতিল হওয়ার এই অভিনব দাবী এতই অগ্রহণযোগ্য যে, এর সপক্ষে দূরতম দলীলও নেই এবং সাধারণ যুক্তিবোধও তা সমর্থন করে না। নিরেট বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত এই দাবীর সাথে ইসলামের আক্বীদা-বিশ্বাস, মূলনীতি ও কর্মধারার কোন সম্পর্ক নেই। নিম্নে এর জবাব উপস্থাপিত হ'ল।

ক. কুরআন ও সুন্নাহ মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত জীবনবিধান হিসাবে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন। রাসূল (ছা.) ছিলেন শেষনবী এবং তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে অহী অবতরণের ধারা পরিসমাপ্ত হয়েছে। অতঃপর তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং এই দ্বীন নিছক রাসূল (ছা.)-এর ব্যক্তিজীবনের জন্য কিংবা তাঁর সমকালীন মানুষদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি; বরং তা কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত সমগ্র মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ এবং অবধারিত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। এই আয়াতসমূহে আল্লাহ কেবল ছাহাবীদেরকে সম্বোধন করেননি; বরং সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করেছেন। ইবনুল কাইয়িম (৭৫২খ্রি.) বলেন, وإن قالوا: بل كان ذلك للصحابة فقط، قالوا الباطل، وخصصوا خطاب الله بدعوى كاذبة، إذ خطابه تعالى بالآيات التي ذكرها عموم لكل مسلم في الأبد، ولزمهم مع هذه العظيمة أن دين الإسلام غير كامل عندنا বলে যে, এই সম্বোধন কেবল ছাহাবীদের জন্য, তাহ'লে এ কথা বাতিল। তারা আল্লাহ্র সম্বোধনকে সীমায়িত করেছে মিথ্যা দাবী তুলে। কেননা এ সকল আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ চিরকাল যত মুসলিম আসবে তাদের সকলকে সম্বোধন করেছেন। আর তাদের এই ভয়ংকর দাবী তাদের জন্য এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক করে দেয় যে, ইসলাম আমাদের নিকট অপূর্ণাঙ্গ ধর্ম। '

সুতরাং এই ধারণার কোন অবকাশ নেই যে, ইসলামী শরী'আত নির্দিষ্ট কোন জাতি বা যুগ কিংবা বিশেষ কোন পরিস্থিতির জন্য নাযিল করা হয়েছে।

খ. রাসূল (ছা.) কেবল একজন শাসক ছিলেন না যে তাঁর আনুগত্য কেবল তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তাবাহক। তিনি শাসক হিসাবে আনুগত্য পাবার হক্কদার নন, বরং একজন রাসূল হিসাবে আনুগত্য পাবার হক্বদার। যদি তিনি কেবল শাসক হতেন, তবে তাঁর শাসনকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর আনুগত্য সীমাবদ্ধ হওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু তিনি যেহেতু একজন রাসূল, সেহেতু তিনি যতদিন মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকবে এবং মুহাম্মাদ (ছা.) তাঁদের রাসূল হিসাবে পরিগণিত হ'তে থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি এই আনুগত্যের অধিকারী থাকবেন। এখন প্রশ্ন থাকে যে, রাসূল (ছা.)-এর রিসালাতের পরিধি কতটুকু? তিনি কি নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা পর্যন্ত রাসূল? কিংবা কোন নির্দিষ্ট জাতির রাসূল? এর উত্তরে আল্লাহ বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا 'আর আমরা তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করেছি।' قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا আপনি (মুহাম্মাদ) বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।

তَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا তিনি আরও বলেন 'তিনি বরকতময় যিনি তাঁর বান্দার ওপর ফুরকান নাযিল করেছেন যেন সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে। সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الرَّسُولُ بِالْحَقِّ مِنْ رَبِّكُمْ فَآمِنُوا خَيْرًا لَكُمْ وَإِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا 'হে মানবজাতি, অবশ্যই তোমাদের নিকট রাসূল এসেছে, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য সহকারে। সুতরাং তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর, তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি অবিশ্বাস কর, তবে (মনে রেখ) নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।

এ আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, রাসূল (ছা.) কেবল একটি জনগোষ্ঠীর জন্য নন, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। আর তাঁর রিসালাত নির্দিষ্ট একটি স্থান বা সময়ের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে সর্বশেষ আয়াতটিতে সকল মানবজাতিকে আহ্বান করা হয়েছে রাসূল (ছা.)-এর প্রতি ঈমান আনার জন্য। সুতরাং কারো পক্ষে বলার সুযোগ নেই যে, রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য কেবল তার নিজের সমকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য; বরং সকল যুগের এবং সকল স্থানের মানুষের ওপর এই আনুগত্য অপরিহার্য হয়ে যায়।

গ. মুহাম্মাদ (ছা.) ছিলেন সর্বশেষ রাসূল। তাঁর পর আর কোন রাসূল আসবেন না। আল্লাহ বলেন, مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহ্র রাসূল ও শেষনবী। আল্লাহ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত। অর্থাৎ মুহাম্মাদ (ছা.) নবীদের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী। পূর্ববর্তী নবীগণ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আগমন করেছিলেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (ছা.)-এর পর যেহেতু আর কোন নবী আসবেন না, সুতরাং তাঁর রিসালত সকল সীমানা অতিক্রম করে সকল জাতি ও সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাসূল (ছা.) বলেন, كانت بنو إسرائيل تسوسهم الأنبياء، كلما هلك نبي خلفه نبي، وإنه لا نبي بعدي، وسيكون خلفاء فيكثرون ‘বনু ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মাহদের শাসন করতেন। যখন কোন একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হ’তেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই। তবে অনেক খলীফা হবে। সুতরাং যদি রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর সাথে তাঁর রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটে, তবে মানুষ রিসালাতের হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হবে। সুতরাং কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূল (ছা.) কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য রাসূল। আর যদি তিনি সর্বযুগের নবী হন তবে এ কথা বলার আর সুযোগ থাকে না যে, তাঁর সুন্নাহ আধুনিক যুগের জন্য প্রযোজ্য নয় কিংবা এই যুগের মুসলমানরা রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ মানতে বাধ্য নয়।

ঘ. কুরআনই যদি একমাত্র অপরিবর্তনীয় অহী হয়, তবে সেই অপরিবর্তনীয় অহি-ই রাসূল (ছা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্যের হুকুম দিয়েছে। সুতরাং কুরআনের হুকুমের মত সুন্নাহর হুকুম পালনও বলবৎ থাকবে। কেননা কুরআনের হুকুম কেবল মক্কা বা মদীনাবাসীদের জন্য নয়। এই হুকুম সমগ্র পৃথিবীবাসীর জন্য। যেমন আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا الله إيماندارগণ! তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের।'" এই আয়াতে এবং অন্যান্য বহু আয়াতে আল্লাহ্র আনুগত্যের সাথে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যকে একত্রে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি আনুগত্যকে যদি স্থায়ী ধরা হয়, তবে অপরটিকে অস্থায়ী ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। কেননা কুরআনে অন্যত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের মাঝে এমন বিভক্তির দেয়াল তোলার বিষয়ে সতর্ক করেছে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا - أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا

অবিশ্বাস করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় ও বলে যে, আমরা কতক নবীকে বিশ্বাস করি ও কতক নবীকে অবিশ্বাস করি, আর এভাবে তারা মধ্যবর্তী একটা পথ অবলম্বন করতে চায়। ওরাই হ'ল প্রকৃত কাফের। আর আমরা কাফেরদের জন্য অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।

সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মাঝে কোন পার্থক্য করার সুযোগ নেই। কেননা যদি সাময়িক ও সীমিত হয় তবে উভয়ই হবে, যদি বিশ্বজনীন ও চিরস্থায়ী হয় তবে উভয়ই হবে। অর্থাৎ যদি হাদীছকে সীমিত সময়ের জন্য মনে করা হয়, তবে কুরআনও সীমিত সময়ের জন্য প্রমাণিত হবে।

ঙ. রাসূল (ছা.) যে আরবদের মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন তারা আরবী ভাষা সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতেন। তারা কুরআনী বর্ণনার ধরন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারা অহী অবতরণের সময়কাল এবং প্রেক্ষাপটসমূহ সবকিছু স্বচক্ষে দেখেছেন। তারা সরাসরি রাসূল (ছা.)-এর মুখ থেকেই কুরআন শুনেছেন। তারা কুরআনকে সঠিকভাবে বুঝার উপায়সমূহ খুব ভালভাবেই জানতেন। এতদসত্ত্বেও তারা কুরআন সম্পর্কে রাসূল (ছা.)-এর ব্যাখ্যা জানার মুখাপেক্ষী ছিল এবং তারা সেই ব্যাখ্যাকে শিরোধার্য হিসাবে গ্রহণ করতেন। সুতরাং এই যুগের একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে ভাবতে পারে যে, তার জন্য রাসূল (ছা.)-এর ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই? অথচ সে ছাহাবীদের মত আরবী ভাষা ও তার ধরন সম্পর্কে অভিজ্ঞ নয় এবং ছাহাবীদের মত রাসূল (ছা.)-এর ওপর কুরআন নাযিল হওয়াও সে দেখে নি? সুতরাং ছাহাবীগণ যদি রাসূল (ছা.)-এর ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন, তবে এই যুগের মানুষ আরও কত গুণ বেশী মুখাপেক্ষী হ'তে পারে, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

চ. রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহও কুরআনের মত অপরিবর্তনীয় বিধান, যা মূলত আল্লাহরই প্রেরিত অহি। সুতরাং এতে কোন মানবীয় ইজতিহাদের সুযোগ নেই। এতে কোন প্রকার পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের অধিকার কাউকে দেওয়া হয় নি। আল্লাহ বলেন, وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ 'আর আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তনকারী নেই।' অন্যত্র আল্লাহ বলেন, لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তন হয় না। তিনি আরও বলেন, وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ 'তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই।

ছ. রাসূল (ছা.)-এর এমন কোন সুন্নাহ নেই যা যুগের আবর্তনে পরিবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে; বরং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সর্বক্ষেত্রে তা ব্যবহার্য। প্রতিটি যুগ ও সময়ে তা সমানভাবে প্রযোজ্য। আর এজন্যই 'ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান' হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। প্রতিটি সুন্নাহ এমন সার্বজনীনতা রাখে যে তা কোন যুগ ও সময়ের বন্ধনে বাঁধা যায় না। যেমন রাসূল (ছা.) বলেছেন أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ 'মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়পাত্র, যিনি মানুষের জন্য অধিক উপকারী। এখন প্রশ্ন হ'ল, রাসূল (ছা.)-এর এই নির্দেশনা প্রাচীন যুগের বলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কি তা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করতে হবে? কখনই নয়। সুতরাং কোন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এই চিন্তাধারা পোষণ করা সম্ভব নয় যে, সুন্নাহ কেবল প্রাথমিক যুগের জন্য প্রযোজ্য।


টিকাঃ
২৭৮. মুহাম্মাদ দীব শাহরুর, আল-কিতাব ওয়াল কুরআন: কিরাআহ মু'আছারাহ, পৃ. ৫৫০।
২৭৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭1-৫72।
২৮০. দ্র. ড. খাদিম ইলাহী বখশ, আল-কুরআনিউন ওয়া শুবহাতুহুম হাওলাস সুন্নাহ, পৃ. ২৩০-২৩১; ড. আদনান মাহমুদ যুরযূর, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ ওয়া উলূমুহা বাইনা আহলিস সুন্নাহ ওয়াশ শী'আহ আল-ইমামিয়াহ (আম্মান: দারুল আ'লাম, ২০০৮খ্রি.), পৃ. ১০৪।
২৮১. সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩।
২৮২. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাছারুছ হাওয়াঈক আল-মুরসালাহ, পৃ. ৫৭০।
২৮৩. সূরা সাবা, আয়াত: ২৮।
২৮৪. সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৮।
২৮৫. সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ১।
২৮৬. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭০।
২৮৭. সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০।
২৮৮. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৪৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪২।
২৮৯. Taqi Usmani, The Authority of Sunnah, p. 61-65.
২৯০. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯।
২৯১. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫০-১৫১।
২৯২. আবুল আলা মওদূদী, সুন্নাতে রাসূলের আইনগত মর্যাদা, বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মাদ মুসা (ঢাকা: শতাব্দী প্রকাশনী, ৫ম প্রকাশ: ২০১২খ্রি.), পৃ. ২৮৪।
২৯৩. Taqi Usmani, The Authority of Sunnah, p. 65-66.
২৯৪. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৩৪।
২৯৫. সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬৪।
২৯৬. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১১৫।
২৯৭. আত-ত্ববারানী, আল-মু'জামুহু ছাগীর, হা/৮৬১। নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-২ : হাদীছ প্রায়শই পরস্পরবিরোধী

📄 সংশয়-২ : হাদীছ প্রায়শই পরস্পরবিরোধী


হাদীছের মাঝে অসংখ্য স্ববিরোধিতা দেখা যায়। অতএব তা কখনও ইসলামী আইনের ভিত্তি হ'তে পারে না। হাদীছ অস্বীকারকারীগণ প্রায়শই এই যুক্তি প্রদান করে থাকেন। পাকিস্তানী লেখক গোলাম জিলানী বারক বলেন, 'হাদীছসমূহ এতই পরস্পরবিরোধী যে, কিয়ামত পর্যন্ত তাতে আসল তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাবে না। তবুও মোল্লারা চারিদিকে হৈ চৈ করছে এই বলে যে, হাদীছ আল্লাহর অহী।'

পর্যালোচনা:

ক. কুরআন ও হাদীছ উভয়ই আল্লাহ্র প্রেরিত অহী হ'লে তার মধ্যে কোথাও কোন পরস্পরবিরোধিতা থাকতে পারে না এবং নেই-ও। যেমন আল্লাহ এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا 'আর যদি তা (কুরআন) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত। সুতরাং মূল কিতাব তথা কুরআনে অসংগতি থাকবে না, অথচ ব্যাখ্যায় পরস্পরবিরোধিতা থাকবে-এটা অসম্ভব। এজন্য ইবনু খুযায়মাহ (৩১১হি.) বলেন, لا أعرف أنه روي عن النبي صلى الله عليه وسلم حديثان بإسنادين صحيحين متضادان ، فمن كان عنده فليأت به حتى أؤلف بينهما 'আমি রাসূল (ছা.) হ'তে বর্ণিত এমন দু'টি হাদীছ সম্পর্কে জানি না যার সনদ ছহীহ অথচ পরস্পরবিরোধী। যার কাছে এমন কোন হাদীছ আছে, সে তা নিয়ে আসুক, আমি সামঞ্জস্যবিধান করে দেব।

খ. হাদীছগ্রন্থসমূহ যারা অধ্যয়ন করেন, তারা জানেন যে, ফযীলত, আদব-আখলাক, মু'জিযাসমূহের বর্ণনা এবং জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনাসম্বলিত হাদীছে কোন বৈপরীত্য হয় না। বাহ্যিক যে অল্পকিছু হাদীছে বৈপরীত্য দেখা যায় তা কেবল আহকামগত হাদীছে। আর এ বৈপরীত্যসমূহ সমন্বয়ের জন্য মুসলিম বিদ্বানগণ বহুপূর্বেই উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) রচিত اختلاف الحديث ইবনু কুতায়বা আদ-দীনওয়ারী (২৭৪হি.) রচিত تأويل مختلف الحديث, আবূ জা'ফর আত-তাহাবী (৩২১হি.) রচিত شرح مشكل الآثار, আবু বকর ইবনু ফাওরাক (৪০৬হি.) রচিত مشكل الحديث وبيانه আবূ মুহাম্মাদ আল-কাছারী (৬০৮হি.) রচিত شرح مشکل الحديث প্রভৃতি। এছাড়া মুহাদ্দিছগণ হাদীছের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য উছুলুল হাদীছে যে সকল মূলনীতি ব্যবহার করেন, তার মধ্যেও বেশ কিছু পদ্ধতি (Device) ব্যবহার করেন শুধুমাত্র হাদীছ সমূহের আন্তবিরোধ দূরীকরণের জন্য। যেমন, المنكر المحفوظ, الشاذ , مختلف الحديث المعلل المضطرب المنسوخ الناسخ المعروف বাহ্যিক বৈপরীত্য যদি কিছু থাকেও তবে তা নিষ্পত্তির জন্য যথাযথ ব্যবস্থাও রয়েছে।

গ. প্রশ্ন হ'ল, কোন জিনিসের মধ্যে বাহ্যিকভাবে পারস্পরিক বৈপরীত্য অনুভূত হ'লেই কি তা বাতিল ও অগ্রণযোগ্য প্রমাণিত হয়? বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ঘোষিত বস্তু তথা আইন ও সংবিধান লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তাতে বহু ভুল ও স্ববিরোধিতা রয়েছে। এখন সে জন্য কি পুরো আইন ও সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়? এমনকি কুরআনেও এমন আয়াত অনেক রয়েছে যা বাহ্যত পরস্পরবিরোধী মনে হয়। হাদীছ অস্বীকারকারীগণ কি সেগুলিও বাতিলযোগ্য মনে করেন? যেমন: কুরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে যে, الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ 'আজ আমি তাদের মুখসমূহে মোহর মেরে দেব, এবং তাদের হাতসমূহ আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা-সমূহ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত। এই আয়াতে কিয়ামতের দিন মুখের উপর মোহর মেরে দেয়ার কথা এসেছে। অথচ অন্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, মানুষের যবান তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে। আল্লাহ বলেন, يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ 'যেদিন তাদের জিহ্বাগুলো, তাদের হাতগুলো ও তাদের পাগুলো তারা যা করত, সে ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।' অর্থাৎ এই দুই আয়াত বাহ্যত পরস্পরবিরোধী। এক্ষণে এর জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় না করিয়ে চোখ বন্ধ করে আয়াতটি কি অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা যাবে? অবশ্যই নয়। মূলত মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও বুদ্ধির কারণে কুরআন ও হাদীছের মধ্যে অনেক সময় এমন বৈপরীত্য অনুভূত হ'তে পারে। আর এই বৈপরীত্য দূরীকরণে মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ কিছু নীতিমালা অবলম্বন করে থাকেন। যেমন:

(১) কোন কোন বৈপরীত্য সাধারণ ব্যাখ্যার সাহায্যে দূর করা সম্ভব। যেমন: একটি হাদীছে এসেছে যে, لا عدوى ولا طيرة 'কোন রোগ সংক্রমণ নেই, কোন শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অপর হাদীছে এসেছে, فر من المجذوم فرارك من الأسد 'তুমি কুষ্ঠরোগী থেকে পলায়ন কর, যেভাবে সিংহ দেখলে পলায়ন করে থাক। অন্য হাদীছে এসেছে لا توردوا الممرض على المصح 'রোগাক্রান্ত উট নীরোগ উটের সাথে মিশ্রিত করবে না। হাদীছগুলি বাহ্যত পরস্পরবিরোধী মনে হয়। এগুলো মধ্যে সমন্বয়ের জন্য বিদ্বানগণ বলেন, রোগসমূহ নিজ থেকে সংক্রামক নয়, কিন্তু আল্লাহ কোন সুস্থ ব্যক্তি অসুস্থ ব্যক্তির সাথে মেলামেশাকে রোগটি সংক্রামণের কারণ বানিয়ে দেন। এছাড়া আরও বিভিন্ন কারণে রোগটি হ'তে পারে। প্রথম হাদীছে রাসূল (ছা.) জাহিলী যুগের এই ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছেন যে, রোগটি প্রকৃতিগতভাবে সংক্রামক। এজন্য তিনি অন্যত্র বলেছিলেন, فمن أعدى الأول 'তা'হলে প্রথমটির (উট) মধ্যে কীভাবে এ রোগ সংক্রমিত হ'ল। ' আর দ্বিতীয় হাদীছে রাসূল (ছা.) বলেছেন যে, আল্লাহ মেলামেশাকে রোগের কারণ বানিয়েছেন। সুতরাং ঐ ক্ষতি থেকে বেঁচে থাক যা অন্যের রোগের কারণে সৃষ্টি হয়।

(২) কখনও দু'টি পরস্পরবিরোধী হাদীছের মধ্যে একটির সনদ শক্তিশালী হয়, অপরটির দুর্বল হয়। সেক্ষেত্রে যঈফ হাদীছটি আমল অযোগ্য হয়ে যায়। তখন আর কোন বৈপরীত্য থাকে না।

(৩) কখনও দু'টি বাহ্যত বিরোধী মনে হ'লেও শরী'আতে দু'টি হাদীছের উপরই আমল করা বৈধ। জনগণের সুবিধার্থে রাসূল (ছা.) দু'টি আমলকে জায়েয করেছেন। যেমন: একটি হাদীছে এসেছে যে, রাসূল (ছা.) স্ত্রীমিলনের পর ছালাতের ন্যায় অযু করতেন। কিন্তু অপর হাদীছে এসেছে রাসূল (ছা.) পানিতে হাত না লাগিয়েই ঘুমিয়ে পড়তেন।

(৪) কখনও এমন বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় যা ক্ষেত্রবিশেষে দু'টিই আমলযোগ্য। যেমন: একবার রাসূল (ছা.) এক কওমের আবর্জনার স্থলে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেন। অথচ অন্য হাদীছে আয়েশা (রা.) বলেন যে, রাসূল (ছা.) কখনও দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেন নি। এই দু'টি হাদীছের মাঝে সমন্বয় এভাবে করা হয় যে, রাসূল (ছা.) নিজ গৃহে কখনও দাঁড়িয়ে প্রসাব করতেন না যেমনটি আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু অপর হাদীছে রাসূল (ছা.) এমন একটি স্থানে ছিলেন যেখানে বসে প্রস্রাব করার অবস্থা ছিল না, বরং তাতে অপবিত্রতা লেগে যেতে পারত অথবা রাসূল (ছা.)-এর অন্য কোন সমস্যা ছিল, যে কারণে তিনি বসতে পারেননি। এমন অবস্থা কারো হ'লে সে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে।

(৫) যদি বিপরীতার্থক দু'টি হাদীছের মধ্যে কোনটি আগের এবং কোনটি পরের হুকুম তা জানা যায়, তবে প্রথম হুকুমটি মানসূখ বা রহিত হিসাবে ধর্তব্য হবে এবং দ্বিতীয়টির ওপর আমল করতে হবে। তিনটি দিক থেকে হাদীছ মানসূখ বা রহিতকরণ সাব্যস্ত হয়। (ক) রাসূল (ছা.) নিজেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবেন। যেমন তিনি কবর যিয়ারত সম্পর্কে বলেছেন, 'আমি তোমাদেরকে প্রথমে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমাদেরকে যিয়ারতের অনুমতি দিচ্ছি। কেননা এথেকে আখেরাতের কথা স্মরণ হয়। (খ) ছাহাবী নিজেই স্পষ্ট করে দেবেন। যেমন জাবির (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ছা.)-এর শেষ আমল ছিল তিনি আগুনে পাকানো জিনিস খাওয়ার পর অযু করতেন না। (গ) ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে অবগত হ'তে পারা। যেমন: শাদ্দাদ ইবনু আওস (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ছা.) বলেছেন, শিঙ্গা যে নেয় এবং শিঙ্গা যে করায় উভয়ের ছিয়াম নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ইবনু আব্বাস (রা.) অপর হাদীছে বলেন যে, রাসূল (ছা.) ইহরাম অবস্থায় এবং ছিয়াম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। এই হাদীছে ইবনু আব্বাস (রা.) যেহেতু বিদায় হজ্জে রাসূল (ছা.)-এর সাথে ছিলেন এবং শাদ্দাদ ইবনু আওস (রা.)-এর বর্ণনা মক্কা বিজয়ের সময়কালের প্রমাণিত হয়, সেহেতু ইবনু আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনাটি নাসিখ বা রহিতকারী এবং শাদ্দাদ ইবনু আওস (রা.)-এর বর্ণনাটি মানসূখ বা রহিত হিসাবে গণ্য হবে।

(৬) যদি নাসখের বিষয়টিও পরিষ্কার না বোঝা যায়, সেক্ষেত্রে যে কোন একটি হুকুমকে 'তারজীহ' বা অগ্রাধিকারদানের কিছু নীতি রয়েছে। যেমন: (ক) সনদের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার। (খ) মতন বা বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে অগ্রাধিকার (গ) باعتبار المدلول বা মর্মার্থের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার। (ঘ) باعتبار الأمور الخارجية বা পারিপার্শ্বিকতা ও প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার। মুহাদ্দিছ বিদ্বানগণ অগ্রাধিকার প্রদানের এরূপ প্রায় ৫০টি সম্ভাব্য দিক উল্লেখ করেছেন।

(৭) ব্যাখ্যা, সমন্বয়করণ, রহিতকরণ ও অগ্রাধিকার প্রদানের এই নীতিগুলো অবলম্বনের পরও যদি কোন হাদীছদ্বয়ের মাঝে বৈপরীত্য দূর না করা যায়, সেক্ষেত্রে উভয় হাদীছের ওপর আমল মুলতবী রাখতে হবে, যতক্ষণ না তার কোন ব্যাখ্যা না জানা যায়। আর এটি ঘটার সম্ভাবনা অতি বিরল।

ঘ. ইসলামী শরী'আতের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিমাত্রেই জানেন যে, শারঈ বিধানগুলো নয় একই সাথে মানুষের জন্য আরোপ করা হয় নি; বরং ধীরে ধীরে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে এ সকল বিধান নাযিল হয়েছে এবং পূর্ণতা লাভ করেছে। আর ধারাবাহিকভাবে যার গঠনকার্য সম্পন্ন হয়, তার ওপর কখনও বৈপরীত্য বা স্ববিরোধিতার হুকুম প্রদান করা যায় না।

৬. বিপরীতমুখী হাদীহসমূহের পরিমাণও এত স্বল্প যে পরিসংখ্যানে তা এক হাজার হাদীছের মধ্যে একটি হ'তে পারে। সুতরাং কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এই অতি স্বল্প ব্যতিক্রমের কারণে পুরো হাদীছের বিশাল ভাণ্ডারকে অস্বীকার করা কি যুক্তিসঙ্গত হ'তে পারে? তাছাড়া বিপরীতমুখী হাদীছগুলোর কারণে বৈপরীত্যহীন হাদীছ পরিত্যাগ করার দাবীও নেহায়েত মূর্খতার পরিচায়ক।


টিকাঃ
২৯৮. গোলাম জিলানী বারকু, দো ইসলাম, পৃ. ৩৮১; গৃহীত: আব্দুর রউফ ঝাণ্ডানগরী, ছিয়ানাতে হাদীছ (ঝাণ্ডানগর, নেপাল): জামিআ' সিরাজুল উলুম, ২য় প্রকাশ: ১৯৮৭ খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২১-২২।
২৯৯. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২।
৩০০. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৩৩২; ইবনুই ছালাহ, মুকাদ্দামাহ ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২৮৫।
৩০১. আব্দুস সাত্তার হাম্মাদ, হুজিয়াতে হাদীছ (লাহোর: দারুস সালাম, ২০০৬খ্রি.), পৃ. ৮৩.
৩০২. সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৬৫।
৩০৩. সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৪।
৩০৪. ছহীহুল বুখারী, হা/৫৭৭২, ৫৭৭৬।
৩০৫. মুসনাদ আহমাদ, হা/৯৭২২, হাদীছ ছহীহ।
৩০৬. ছহীহুল বুখারী, হা/৫৭৭৪।
৩০৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৫৭৭০।
৩০৮. ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দামাহ ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২৮৪-২৮৫।
৩০৯. ছহীহুল বুখারী, হা/২৮৮।
৩১০. সুনান ইবনু মাজাহ, হা/৫৮১, সনদ ছহীহ।
৩১১. ছহীহুল বুখারী, হা/২৪৭১।
৩১২. সুনানুত তিরমিযী, হা/১২, সনদ ছহীহ।
৩১৩. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৬-৯৭৭।
৩১৪. সুনান আবী দাউদ, হা/১৯২, সনদ ছহীহ।
৩১৫. সুনান আবী দাউদ, হা/২৩৬৯, সনদ ছহীহ।
৩১৬. ছহীহুল বুখারী, হা/১৯৩৮-১৯৩৯।
৩১৭. দ্র. আশ-শাওকানী, ইরশাদুল ফুকূল, ২য় খণ্ড, ২৫৭-২৭৩; ড. লুৎফী ইবনু মুহাম্মাদ আয-যুগাইর, আত-তা'আরুয ফিল হাদীছ, পৃ. ৩১৯-৩৮২।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৩ : হাদীছ প্রায়শই বিবেক ও যুক্তিবিরোধী

📄 সংশয়-৩ : হাদীছ প্রায়শই বিবেক ও যুক্তিবিরোধী


হাদীছ অস্বীকারকারীদের দাবী হ'ল, অনেক হাদীছ রয়েছে স্বাভাবিক মানবীয় বিবেক-বুদ্ধির বিরোধী। ইসলাম বিবেকসম্মত ধর্ম। অতএব বিবেকবিরুদ্ধ এ সকল হাদীছ গ্রহণযোগ্য হ'তে পারে না। হাদীছের প্রতি সন্দেহবাদী কিছু ব্যক্তিও অনুরূপ ধারণা করেন যে, হাদীছের সনদ ছহীহ হ'লেও মতন যদি বিবেকবিরুদ্ধ হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং সকল হাদীছকে আকুল দিয়ে যাচাই করতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমেরও অনেক হাদীছ অস্বীকার করেন। তারা রাসূল (ছা.)-এর মু'জিযাসমূহ, তাঁর যাদুগ্রস্থ হওয়া, কবরের আযাব, শাফা'আতসহ বহু গায়েবী বিষয় অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, نأخذ بنص الكتاب وبدليل العقل 'আমরা কেবল কিতাব থেকে এবং আকূল বা বিবেক থেকে দলীল গ্রহণ করব। অতীতে মু'তাযিলাগণ এই যুক্তি পেশ করে বিশেষত অদৃশ্যের জ্ঞান বিষয়ক হাদীছসমূহ অস্বীকার করেছিল এবং বর্তমানেও হাদীছ অস্বীকারকারীদের অধিকাংশই এই যুক্তি অবলম্বন করেন। মিসরীয় বিদ্বান মুহাম্মাদ আল-গায্যালী (১৯১৭-১৯৯৬খ্রি.) তাঁর প্রসিদ্ধ 'ফিকহুস সীরাহ' গ্রন্থের শুরুতে 'কিতাবুল ফিতান' সম্পর্কিত সকল হাদীছ অস্বীকার করেছেন। তিনি ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, কবরের আযাবও তিনি স্বীকার করেন না; অথচ ছহীহ বুখারীতে তা বর্ণিত হয়েছে! তাঁর বক্তব্য হ'ল, وأعرضت عن أحاديث أخرى توصف بالصحة؛ لأنها في فهمي لدين الله، وسياسة "‘আল-দাওয়াহ’- لم تنسجم مع السياق العام পরিণ্যাত করেছি, যা কিনা ছহীহ বলে কথিত! কেননা আল্লাহর দ্বীন এবং দাওয়াতী কৌশলসমূহ সম্পর্কে এ সকল হাদীছ আমার বুঝ মোতাবেক সাধারণ পারিপার্শ্বিকতার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।"

পর্যালোচনা:

প্রথমেই জানা প্রয়োজন যে, রাসূল (ছা.) হ'তে বর্ণিত হাদীছকে নিরংকুশভাবে আকুল তথা বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে বিচার করার নীতি প্রাথমিক যুগের বিদ'আতী দলগুলো কর্তৃক উদ্ভাবিত। এই নীতি সর্বযুগে নবী- রাসূলদেরকে অস্বীকারকারী কাফের ও মুশরিকদের অনুসৃত নীতি। ইবনুল কাইয়িম (৭৫২হি.) বলেন, معارضة أمر الرسل أو خيرهم بالمعقولات إنما هي

طريقة الكفار، ومن تأمل معارضة المشركين للرسل بالعقول وجدها

أقوى من معارضة الجهمية 'রাসূলগণ এবং তাদের প্রদত্ত সংবাদসমূহকে বুদ্ধি- বিবেক দ্বারা প্রতিরোধের চেষ্টা, এটি কাফেরদের অনুসৃত পথ। যদি কেউ রাসূলদের বিরোধিতায় মুশরিকদের বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার সম্পর্কে গবেষণা করে, তবে তা জাহমিয়া (নব্য বুদ্ধিবাদী দল)-দের থেকে অধিকতর শক্তিশালী পাবে। ইবনু আবীল ইয (৭৯২হি.) বলেন, بل كل فريق من أرباب البدع

يعرض النصوص على بدعته، وما ظنه معقولا শরী'আতের নছসমূহ (কুরআন ও হাদীছ)- কে তাদের বিদ'আতী পথ ও মতের উপর স্থাপন করে, যাকে তারা বিবেকসম্মত ধারণা করে (অতঃপর যা বিবেকসম্মত মনে হয় তা গ্রহণ করে, আর যা বিবেকবিরুদ্ধ মনে হয়, তা বর্জন করে)। অনুরূপভাবে আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.)-ও উল্লেখ করেছেন, فإن محصول مذهبهم تحكيم عقول الرجال دون الشرع، وهو أصل من الأصول التي بني عليها أهل الابتداع في الدين، بحيث إن الشرع إن وافق آراءهم قبلوه، وإلا ردوه 'তাদের মতবাদের সারকথা হ'ল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে শরী'আতের ওপর স্থান দেয়া। এটাই হ'ল বিদ'আতীদের অন্যতম মূলনীতি যা তারা দ্বীনের মধ্যে প্রয়োগ করে। যদি শরী'আত তাদের মতের সাথে মিলে যায়, তবে গ্রহণ করে আর যদি না মিলে তবে বর্জন করে।

সুতরাং বিদ্বানদের এ সকল বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হাদীছ গ্রহণ ও বর্জনে আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তিকে চূড়ান্ত মানদণ্ডে পরিণত করা যুগে যুগে বিদ'আতী দলসমূহের অনুসৃত নীতি। সুতরাং বর্তমান যুগেও যারা এই দাবী তুলেছেন, তারা কোন না কোন সূত্রে এই দলসমূহের উত্তরসূরীর ভূমিকা পালন করছেন। নিম্নে তাদের যুক্তিসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।

ক. নিঃসন্দেহে ইসলাম হ'ল ফিতরাতী বা প্রাকৃতিক নিয়ম সম্মত ধর্ম, যার সকল আইন ও বিধান মানুষের স্বাভাবিক ও সুস্থ বুদ্ধির অনুকূলে। যে দ্বীনের নিয়ম-কানুনসমূহ বিবেকবিরোধী, তা কখনও প্রাকৃতিক ধর্ম নয় বরং মনগড়া, কপোলকল্পিত ধর্ম। ফলে কেবল ইসলামের বিধানসমূহই নয়, বরং তার সকল চিন্তাধারাই বিবেকসম্মত। শরী'আতের সাথে সাথে ইসলাম তাই বুদ্ধিবৃত্তিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের বারবার মানুষকে চিন্তা-গবেষণার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কখনও কখনও মানুষের বিবেক এবং অহীর মাঝে বাহ্যিক বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে যে কারণ তা হ'ল, আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান ও তথ্য লাভের জন্য যে সকল মাধ্যম দান করেছেন, তার প্রতিটির নিজস্ব একটি গণ্ডি রয়েছে এবং এই গণ্ডির মধ্যকার বিষয়বস্তুই কেবল সে ধারণ করতে পারে। ফলে তার গণ্ডির বাইরে এই মাধ্যমগুলো আর কার্যকর থাকে না। এই মাধ্যমগুলোর প্রথমটি হ'ল, পঞ্চেন্দ্রিয় (The Five Senses)। এই জ্ঞান কম-বেশী পৃথিবীর সকল প্রাণীকূলকে আল্লাহ দান করেছেন, যা দ্বারা দৈনন্দিন সকল কর্ম সম্পাদিত হয়। কিন্তু এখানেই আল্লাহ জ্ঞানের সীমানা নির্ধারণ করে দেননি; বরং দ্বিতীয় পর্যায়ে পঞ্চেন্দ্রিয় বহির্ভূত অপর এক মাধ্যম দান করেছেন, আর তা হ'ল আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তি (Intellect)। একে ষষ্ঠেন্দ্রিয়ও বলা হয়।

এই পর্যায়ের জ্ঞানই মানুষকে অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা করে দিয়েছে। আর এর মাধ্যমেই সে পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পরিভ্রমণ করতে পারে। কিন্তু এই আকূলেরও একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি রয়েছে, যার মধ্যকার সবকিছুকে সে আয়ত্ত্ব করতে পারে। কিন্তু তার বাইরে সে আর কর্মক্ষম থাকে না। কিন্তু এখানেও আল্লাহ জ্ঞানের সীমানা নির্ধারণ করে দেননি। বরং এই তৃতীয় পর্যায়ের জন্য আল্লাহ জ্ঞানলাভের অপর একটি মাধ্যম দান করেছেন। আর তা হ'ল অহী (Revelation)। আর এটি মানুষের জন্য জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমানা হিসাবে পরিগণিত। আর এটিই হ'ল সেই স্থান, যেখানে এসে একজন মুমিন ব্যক্তি এবং একজন ঈমানহীন ব্যক্তির মাঝে পার্থক্যরেখা সূচিত হয়। একজন মুমিনের ঈমানের স্বীকৃতি বাস্তবায়িত হয় অহীর জ্ঞানের নিকট নিঃশর্ত আত্মসমার্পণের মাধ্যমে।

এখানে কয়েকটি বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন তা হ'ল, প্রথমত, আকূলের সাথে অহীর জ্ঞান কখনই সমতুল্য নয়। কেননা একটি হ'ল সসীম জ্ঞান, অপরটি হ'ল চূড়ান্ত জ্ঞান। যেখানে আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তির সীমানা শেষ হয়ে যায়, ঠিক সেখান থেকে অহীর সীমানা শুরু হয়। সুতরাং যে পর্যায়ে এসে আমরা অহীর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি সেখানে বুদ্ধিবৃত্তির কোন অনুপ্রবেশ নেই এবং তা ব্যবহার করতে চাওয়াই হ'ল নির্বুদ্ধিতার কাজ। যদিও এর অর্থ নয় যে, এক্ষেত্রে আকুল ব্যবহার করা অর্থহীন। কিন্তু তা হ'তে হবে তার নিজস্ব গণ্ডি ও সীমারেখার মধ্যে।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসহ যে সকল আকুলী বা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান রয়েছে, তা সীমাহীন নয়, বরং তা 'যান্নী' বা প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তিশীল, যা ভুল বা সঠিক উভয়ই হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। সুতরাং অহীর অকাট্য এবং চূড়ান্ত জ্ঞানকে পরীক্ষা করার জন্য প্রবল ধারণাভিত্তিক জ্ঞানকে কোনভাবেই মানদণ্ড হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। কেননা আকুল বা বৃদ্ধিবৃত্তির জন্য এমন কোন ধরাবাঁধা নীতি নেই, যার সাহায্যে সত্য বা মিথ্যা চূড়ান্তভাবে পার্থক্য করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, আকুল এবং অহী উভয়ই মানুষের হেদায়েত বা পথনির্দেশ লাভের জন্য দু'টি মাধ্যম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ই পরস্পরের সহযোগী। অতএব উভয়ের মাঝে যদি কোন দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তবে তা নিশ্চিতভাবে মৌলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং বাহ্যিক। এজন্য প্রথমে আকুল এবং অহীর মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা চালাতে হবে। কিন্তু যদি সমন্বয় করা সম্ভব না হয়, তবে একটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। অর্থাৎ সেটি হ'ল অহী। কেননা আকূল হ'ল 'যান্নী' বা প্রবল ধারণানির্ভর জ্ঞান এবং অহী হ'ল 'কাতৃঈ' বা অকাট্য জ্ঞান।

আকুল এবং অহী'র পার্থক্য সম্পর্কে এই মৌলিক বিষয়টি মাথায় রেখেই ইসলামী শরী'আতের বিধি-বিধানসমূহকে যাচাই করতে হবে। কেননা যে সকল ছহীহ হাদীছের সমালোচনা করা হয়েছে, তার অধিকাংশই এই কারণে যে, হাদীছ অস্বীকারকারীদের নিকট তা বাহ্যিকভাবে আকুল বা আধুনিক বিজ্ঞানের খেলাফ প্রতীয়মান হয়। যদিও বাস্তবতায় তা মূলত অগভীর চিন্তাধারা এবং আকূলের অপব্যবহার করারই ফলশ্রুতি। তারা এক্ষেত্রে মৌলিক যে ভুলটি করেন তা হ'ল, অহী এবং আকূলকে তাঁরা সমমর্যাদার স্থানে বসিয়ে থাকেন কিংবা অহীর জ্ঞানের ওপর আকূলকেই অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

খ. মুহাদ্দিছগণ হাদীছের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আকূলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন, তবে তা যথারীতি নিজস্ব সীমারেখার মধ্যে। আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী (১৯৬৬খ্রি.) বলেন, হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের সময় চারটি স্থানে মুহাদ্দিছগণ আকুলের ব্যবহার করেছেন। যথা:

(১) হাদীছটি শ্রবণ বা অবগত হওয়ার সময়। এসময় তারা হাদীছ বর্ণনাকারীর ভৌগলিক অবস্থান, বয়স, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সবকিছু যাচাই করেন অর্থাৎ তিনি সঠিকভাবে হাদীছটি শ্রবণ করেছেন কিনা তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার হাদীছ গ্রহণ করা হয় না। 'মুরসাল' ও 'তাদলীস' এক্ষেত্রে বড় দু'টি উদাহরণ। অর্থাৎ বর্ণনাকারী যত বড় পণ্ডিত ও নির্ভরযোগ্যই হন না কেন, যদি সঠিকভাবে শ্রবণ করেছেন বলে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হয়, তবে তার হাদীছ অগ্রহণযোগ্য হয়।

(২) হাদীছটি বর্ণনাকালে। এই পর্যায়ে তারা বর্ণনাকারী কয়েকটি গুণ অনুসন্ধান করেন। যেমন: (ক) মুসলিম হওয়া। (খ) বয়ঃপ্রাপ্তি। (গ) বুদ্ধিসম্পন্নতা। (ঘ) সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা। (ঙ) মেধা বা সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রভৃতি।

(৩) বর্ণনাকারীদের ওপর হুকুম আরোপ করার সময়। এই পর্যায়ে তারা বর্ণনাকারীদের বর্ণনাসমূহের মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করেন। যদি এমন হয় যে, কোন বর্ণনাকারীর বর্ণনা অপর বর্ণনাকারীদের সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে তারা ঐ একক বর্ণনাকারীকে 'মুনকার', 'মুযতারিব' হিসাবে চিহ্নিত করেন। এভাবে তাঁরা বর্ণনাকারীদের বর্ণিত প্রতিটি হাদীছ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন এবং বৈপরীত্য অনুসন্ধান করেন।

(৪) হাদীছের ওপর শুদ্ধাশুদ্ধির হুকুম আরোপ করার সময়। এ পর্যায়ে তারা দেখেন যে, হাদীছের বিষয়বস্তু স্বতঃসিদ্ধ বিবেকের বিরোধী কি না। কেননা বিবেকের বিরোধিতা হাদীছ জাল হওয়ার অন্যতম নিদর্শন। যেমন ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) হাদীছ জাল হওয়ার আলামতসমূহ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, أن يخالف الحديث العقل ولا يقبل تأویلا 'হাদীছটি এমন বিবেকবিরোধী হয়, যা কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণ হাদীছ যাচাইয়ের সময় বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যবহার করেন না- এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে হাদীছ অস্বীকারকারীদের সাথে মুহাদ্দিছদের নীতির পার্থক্য হ'ল তারা আকুল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কখনও সীমা অতিক্রম করেন না বা স্বেচ্ছাচারিতামূলক সারলীকরণ করেন না। বরং কোন হাদীছ বিবেকবিরোধী মনে হ'লে বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুণঃনিরীক্ষণ করেন। অতঃপর যদি সবদিক থেকে হাদীছটি ত্রুটিমুক্ত পান, তবে আকূলকে নাকুল তথা অহীর জ্ঞানের অনুবর্তী করে দেন এবং হাদীছটির পক্ষে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর মাধ্যমে সমন্বয় করেন। কেননা অহী হ'ল অকাট্য জ্ঞান এবং আকূল হ'ল প্রবল ধারণানির্ভর অনিশ্চিত জ্ঞান, যা কখনও অহীর ওপর প্রাধান্য পেতে পারে না। যেমন আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, إذا تعاضد النقل والعقل على المسائل الشرعية؛ فعلى شرط أن يتقدم النقل فيكون متبوعا، ويتأخر العقل فيكون تابعا، فلا يسرح العقل في مجال النظر إلا بقدر ما يسرحه النقل 'যদি শারঈ বিধানে নাকুল (অহী) এবং আকুল (বুদ্ধিবৃত্তি) পরস্পরকে শক্তিশালী করে, তবুও শর্ত হ'ল নকূলকে অগ্রগণ্য করতে হবে। ফলে তা হবে অনুসরণীয় এবং আকূলকে পশ্চাদগামী করা হবে এবং তা হবে অনুসারী। আর বিতর্কের ক্ষেত্রে আকুলকে উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করা যাবে না, নকুল যতটুকু শিথিলতা দিয়েছে ততটুকু ব্যতিরিকে। অর্থাৎ আকুলকে সর্বদা ব্যবহার করতে হবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুকূলে রেখে।

গ. মুহাদ্দিছরা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে আকূলের চেয়ে বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ত তার ওপর অধিকতর নির্ভর করেছেন কেন?- এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায় মানুষের আকুল পূর্ণাঙ্গ নয়। আকূলের ব্যবহারও বহুমুখী এবং প্রাসঙ্গিকতাভেদে পরিবর্তনশীল। ফলে যে কোন তথ্যের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে মুহাদ্দিছদের নিকট তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য কোন ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষী যা বর্ণনা করেন তাকে তারা সর্বাধিক প্রাধান্য দেন। জ্ঞান সংরক্ষণে এটিই তাদের নিকট সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। একই দৃষ্টান্ত দেখা যায় পৃথিবীর সকল আদালত ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে। এ সকল আদালতসমূহও প্রধানত সত্য সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল। আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ الاعتصام গ্রন্থের ১০ম অধ্যায়ে আকূলের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের আকুল বা বুদ্ধিবৃত্তির জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা সে অতিক্রম করতে পারে না। সে তার প্রতিটি কাংখিত বস্তুকে নিজের বোধগম্যতার অধীনস্ত করতে পারে না। যদি তা করতে পারত, তবে অতীত ও বর্তমানে কি ঘটছে না ঘটছে সবকিছুই বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তি মহান প্রভুরই সমকক্ষ হয়ে যেত। আর যদি সে সব বুবোই ফেলত, তবে কীভাবে বুঝত? কেননা আল্লাহর জ্ঞানের কোন সীমা-পরিসীমা নেই, কিন্তু মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। যা সসীম তা কখনও অসীমের সমকক্ষ হ'তে পারে না।

দ্বিতীয়ত, আকুল দ্বারা হাদীছ যাচাই করতে গেলে অবশ্যই তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হ'ত। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ফিকহী গ্রন্থসমূহ। এসব গ্রন্থের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বিভিন্ন ইজতিহাদী বিধান নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আকুলী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রায় প্রদান করেছেন। হাদীছের ক্ষেত্রেও যদি এমন নিজস্ব বিবেক অনুযায়ী শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের সুযোগ দেয়া হ'ত, তবে হাদীছ শাস্ত্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন হ'ত। এজন্য তাঁরা এ সকল যুক্তিভিত্তিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার জন্য হাদীছ যাচাইয়ের সময় অত্যন্ত সচেতনভাবে আকূলের ব্যবহারকে সর্বব্যাপী হ'তে দেন নি, বরং তা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রেখেছেন।

আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) এই বিতর্কের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন। তিনি হাদীছ অস্বীকারকারীদের নিকট প্রশ্ন রেখেছেন যে, হাদীছ যাচাইয়ে তারা যে আকূলকে প্রাধান্য দিতে বলছেন, সেটি কোন আকুল?

দার্শনিকদের আকুল? তাদের মধ্যে অসংখ্য মতভেদ রয়েছে। পূর্ববর্তীদের সাথে পরবর্তীদের মিল নেই।

সাহিত্যিকদের আকুল? তারা তো কেবল গল্প-কাহিনী নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

أن الله جعل للعقول في إدراكها حدا تنتهي إليه لا تتعداه، ولم يجعل لها سبيلا إلى 020 الإدراك في كل مطلوب. ولو كانت كذلك لاستوت مع الباري تعالى في إدراك جميع ما كان وما يكون وما لا يكون، إذ لو كان كيف كان يكون، فمعلومات الله - لا تتناهى ومعلومات العبد متناهية والمتناهي لا يساوي ما لا يتناهى. শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৩১।

চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা গণিতজ্ঞদের আকুল? তাদের সাথে শারঈ বিধানের সম্পর্ক কী?

মুহাদ্দিছদের আকুল? তার ওপর তো যুক্তিবাদীরা বিশ্বাস করে না, বরং তা অগভীর এবং সরল আবেগ বলে তাচ্ছিল্য করেন।

ফক্বীহদের আকুল? তাদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য মাযহাব। আর তাদের বুদ্ধিবৃত্তিও তো যুক্তিবাদীদের নিকট মুহাদ্দিছদের মতই অগভীর!

ধর্মহীনদের আকুল? তারাও অসংখ্য দলে বিভক্ত। কারো সাথে কারো চিন্ত াধারার মিল নেই।

এখন যদি তারা বলেন যে, আমরা মুমিনদের আকুলের ওপর আস্থা রাখি যারা এক আল্লাহ এবং ইসলামের প্রতি বিশ্বাস রাখেন। তবে প্রশ্ন আসবে, কোন মাযহাবের মুমিনদের আকূল উদ্দেশ্য? যদি বলা হয় সুন্নীগণ, তবে শী'আ' বা মু'তাযিলারা এতে একমত হবে না। যদি বলা হয় শীআ'গণ, তবে সুন্নীরা তাতে একমত হবে না। যদি বলা হয় মু'তাযিলাগণ, তবে কোন অধিকাংশ মুসলমান তাতে একমত হবে না। সুতরাং কোন আকূলকে তারা মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করবেন?

অতএব সারকথা হ'ল, আকূল ব্যবহারে মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহদের নীতিই গ্রহণযোগ্য। কেননা তারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে আকূলের ব্যবহার করেছেন, যতটুকু শরী'আহ অনুমতি দেয় এবং আত্মপ্রতারিত যুক্তিবাদীরা ব্যতীত অন্যান্য বিজ্ঞ বিদ্বানদের গৃহীত নীতি অনুমোদন করে।

ঘ. মুহাদ্দিছগণ যে সকল হাদীছ ছহীহ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন, তাতে এমন কোন হাদীছ নেই যা সুস্থ বিবেকের বিরোধী। তবে কোন কোন হাদীছ হয়ত ব্যাখ্যা না জানার কারণে আশ্চর্যবোধক মনে হ'তে পারে। কিন্তু যখন এ সকল হাদীছ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হবে, তখন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক।

কেননা কোন কিছু বোধগম্য না হ'লেই তা বিবেকবিরোধী হয় না। আবার আজকে যা বিবেকবিরোধী মনে হয়, আগামীকাল তা বিবেকবিরোধী না-ও থাকতে পারে। বিবেকের কাছে আশ্চর্যজনক হওয়াটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ব্যাপার। সংস্কৃতি এবং পরিবেশ ভেদে তা পরিবর্তনশীলও। এর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতিও নেই। যেমন এককালে কোন প্রাণী বিহীন যান হতে পারে, তা ভাবনার অতীত ছিল। কিন্তু আজকের যুগে তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। শতবছর পূর্বেও গ্রামের মানুষের কাছে বেতারযন্ত্র ছিল বিস্ময়কর বস্তু। তারা এটিকে শহরবাসীদের বানানো মিথ্যাচার গণ্য করত। এমনকি বেতারযন্ত্র যখন তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হ'ল তবুও তারা বিশ্বাস করল না। তারা ভাবল এই যন্ত্রের মধ্যে বসে আসলে জীন-ভূত কথা বলছে। ঠিক যেমনভাবে আজও শিশুরা ধারণা করে যে এর মধ্যে কোন মানুষ বসে রয়েছে যে কথা বলছে। সুতরাং ইসলামের মধ্যে এমন কোন বিষয় নেই যা বিবেক অস্বীকার করে। তবে তাতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা আমাদের নিকট বিস্ময়কর ও কল্পনাতীত অনুভূত হ'তে পারে। যেমন মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনাসমূহ, গায়েবী অন্যান্য বিষয়সমূহ। কিন্তু একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হ'ল সে নিজের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির ভিত্তিতে তা সরাসরি অস্বীকার করে না; বরং সঠিক সূত্র থেকে তার সত্যতা যাচাই করে দেখে। অতঃপর সত্যতা পেলে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। আর এজন্য আল্লাহ সূরা বাক্বারাহ্ শুরুতে মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন, الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ 'যারা গায়েবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন (আয়াত: ৩)।'

আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) বলেন, কিছু মানুষ এমন আছে যে, তারা বিবেকবিরোধী হওয়া আর বিস্ময়কর হওয়ার মাঝে কোন পার্থক্য করে না। তার দু'টি বিষয়কে একই মনে করে অস্বীকার করার জন্য তৎপর হয়। অথচ কোন বিষয় বিবেকবিরোধী তখনই মনে হয়, যখন তা অসম্ভব হয়। কিন্তু যে বস্তুটি বিস্ময়কর হয় তা আমাদের বোধের অগম্য হওয়ার কারণে সৃষ্ট হয়। সুতরাং অসম্ভব এবং অবোধগম্য- এ দু'টি বিষয়ের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা গতকাল অসম্ভব ছিল, কিন্তু আজ তা বাস্তবে রূপলাভ করেছে। যেমন আজকের যুগে মানুষ চন্দ্রে গমন করছে, অথচ মধ্যযুগে যদি কেউ এ কথা বলত, তবে নিশ্চিতভাবে তাকে পাগল মনে করা হ'ত। কিন্তু আজকের যুগে তা অতি স্বাভাবিক। সুতরাং মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিকে সর্বেসর্বা ভাবার কোন কারণ নেই।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি হাদীছ অস্বীকারকারীরা যে সকল হাদীছ নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছেন, তা হয় প্রাচীন যুগের কোন সম্প্রদায়ের কাহিনী কিংবা গায়েব বা অদৃশ্যের সংবাদবিষয়ক হাদীছ। যেমন মাহমূদ আবু রাইয়াহ একটি হাদীছকে উদাহরণস্বরূপ নিয়ে এসেছেন, আবূ হুরায়রা ও আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীছ- إن في الجنة لشجرة يسير الراكب في ظلها مائة عام لا يقطعها দিয়ে একজন আরোহী ব্যক্তি যদি একশত বছরও যাত্রা করে তবুও সে অতিক্রম করতে পারবে না।' মাহমূদ আবু রাইয়া এই হাদীছটির বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং বর্ণনাকারী আবূ হুরায়রা (রা.)- কে প্রকারান্তরে মিথ্যুক প্রমাণিত করতে চেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হ'ল, এই হাদীছে বিস্ময় বোধ করার কী রয়েছে? জান্নাত কি অদৃশ্যের বিষয় নয়? আমরা সেই জগৎ সম্পর্কে আল্লাহ যতটুকু জানিয়েছেন ততটুকুর বাইরে কী জানি? যে বিষয়টি আমাদের সীমাবদ্ধ কল্পনারই বাইরের বস্তু তা কীভাবে আমরা নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে অস্বীকার করতে পারি? বরং এ বিষয়ে সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যার পরিবর্তে মানবীয় বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটানোই নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। যে অন্ধ কখনও পৃথিবীর আলো দেখে নি, সে কি হাতির বিবরণ শুনে তার বাস্তবতা অনুমান করতে পারবে? উপরন্তু সেই ব্যক্তি যদি নিজের মত করে হাতির আকার কল্পনা করে তা নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু করে, তবে তার ব্যাপারে কী বলা যেতে পারে?

৫. আকূলকে প্রাধান্য দান করে যদি অদৃশ্যবিষয়ক হাদীছগুলি অস্বীকার করা হয়, তবে তা কুরআনে বর্ণিত গায়েবী বিষয়গুলিকেও অস্বীকার করা অপরিহার্য করে দেয়। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (ছা.)-এর হাতের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল, সুলায়মান (আ.) তাঁর রাজত্বের পশু-পাখি, জিনদের ভাষা বুঝতেন এবং তারা তাঁর অনুগত ছিল। এ সকল বিষয় কি হাদীছ অস্বীকারকারীগণ স্বীকার করবেন? এটি যদি স্বাভাবিক বুদ্ধি বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে একইরূপ বিষয় রাসূল (ছা.) কর্তৃক হাদীছ হিসাবে বর্ণিত হ'লে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না কেন?

চ. ছহীহ হাদীছ কখনওবা বোধের অতীত (مخالف الفهم) হ'তে পারে, কিন্তু বিবেকের বিরোধী (مخالف العقل) হয় না। ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) বলেন, 'আমি সাধ্যমত শরী'আতের দলীলসমূহ সম্পর্কে গবেষণা করেছি। কিন্তু এমন একটি যথার্থ কিয়াস দেখিনি যা ছহীহ হাদীছের বিরোধী হ'তে পারে। তেমনিভাবে বিশুদ্ধ সূত্রের কোন বর্ণনাকে দেখিনি সুস্পষ্ট যুক্তির বিরোধী হ'তে। বরং যখনই দেখেছি কোন কিয়াস হাদীছের বিরোধিতা করছে, তখন দু'টির একটি অবশ্যই যঈফ প্রমাণিত হয়েছে। তবে এই ছহীহ ক্বিয়াস এবং বাতিল কিয়াসের মধ্যে পার্থক্য করার জ্ঞান অনেক বিজ্ঞ আলেমের নিকট পর্যন্ত নেই, তাহ'লে অন্যদের ক্ষেত্রে কী হতে পারে?

ছ. মুসলিম বিদ্বানদের চিরন্তন নীতি হ'ল, আকুল ও অহীর দ্বন্দ্বে সর্বশেষ ফয়ছালাকারী হ'ল অহী। কেননা শরী'আতের ওপর আকুলকে প্রাধান্য দিতে চাওয়াই হল আকুল বিরোধী কর্ম। কেননা আকুল সাক্ষ্য দেয় যে, শরী'আহ প্রণেতা এবং তাঁর প্রেরিত অহী আকূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানসম্পন্ন। সুতরাং কেউ যদি অহীর ওপর আকুলকে স্থান দিতে চায় তবে সে আকূলের এই সাক্ষ্যকে বাতিল করে দেয়। আর যদি আকূলের সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যায়, তবে তার কথাও বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং অহীর জ্ঞানই চূড়ান্ত ফয়ছালাকারী। এ বিষয়ে আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য সুপ্রসিদ্ধ। তিনি বলেন, لو كان الدين بالرأي لكان أسفل الخف أولى بالمسح من أعلاه নিজস্ব বুদ্ধি অনুযায়ী হ'ত, তবে মোজার উপরে মাসাহ করার চেয়ে নিচে মাসাহ করাই অধিক উপযুক্ত হ'ত। আবুল মুযাফ্ফর আছ-ছানা'আনী (৪৮৯হি.) বলেন, اعلم أن مذهب أهل السنة أن العقل لا يوجب شيئا على أحد ولا يرفع شيئا عنه ولا حظ له في تحليل أو تحريم ولا تحسين ولا تقبيح 'জেনে রাখ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হ'ল আকুল কোন কিছু মানুষের ওপর আবশ্যক করে না, কোন কিছু বিদূরিতও করে না। কোন কিছু হালাল ও হারাম প্রতিপন্নেও তার কোন ভূমিকা নেই। কোন কিছুর ভাল-মন্দ নির্ধারণেও তা গুরুত্বহীন। আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, وإن ا الحجة القاطعة والحاكم الأعلى هو الشرع لا غير

ফয়ছালাকারী হ'ল শরী'আত, অন্য কিছু নয়।' ইবনু খালদুন (৮০৮হি.)।

فإذا هدانا الشارع إلى مدرك فينبغي أن نقدمه على مدار كنا ونثق به دونها ولا ننظر في تصحيحه بمدارك العقل ولو عارضه بل نعتمد ما أمرنا به اعتقادا وعلما ونسكت عما لم نفهم من ذلك ونفوضه إلى الشارع ونعزل العقل عنه

'যদি শরী'আত প্রবর্তক (আল্লাহ) কোন দলীলের দিকে পথপ্রদর্শন করেন, তবে আমাদের উচিত হবে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তির উপর তাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং কেবল তার প্রতিই আস্থা রাখা। সে দলীলকে সত্যায়নের জন্য আমাদেরকে কোন আকুলী দলীলের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন নেই এমনকি যদি তা বুদ্ধির বিপরীতও হয়। বরং আমাদেরকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তার ওপরই বিশ্বাসগতভাবে এবং জ্ঞানগতভাবে নির্ভর করা উচিত হবে। আর যা আমাদের বোধের অতীত হবে তা সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকব এবং শরী'আত প্রবর্তক (আল্লাহ)-এর দিকে তা সোপর্দ করব। তাতে আকূল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকব।

অতএব আকুল শরী'আতকে অনুধাবন এবং তার কার্যকারিতা উপলব্ধির জন্য বড় মাধ্যম হ'তে পারে। তা শারঈ বিধানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হ'তে পারে। কিন্তু কখনই শারঈ বিধান বাতিলযোগ্য করার ক্ষমতা রাখে না। তেমনি শরী'আতের কোন দলীলকে শুধু বুদ্ধির ভিত্তিতে বাতিলও করতে পারে না। এভাবে ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে আকূলকে সমর্থন করেছে এবং আকূলের সমর্থন গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাকে কখনই সার্বভৌম হ'তে দেয়নি; বরং সার্বভৌমত্ব কেবল নকূলের। যা চূড়ান্ত জ্ঞান হিসাবে এবং অহীর বিধান হিসাবে মানবজাতির নিকট প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ আল্লাহ্র চেয়ে কে অধিক উত্তম?'


টিকাঃ
৩১৮. মাহমূদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩৫১।
৩১৯. মুহাম্মাদ আল-গায্যালী, ফিকহুস সীরাহ (দামিশক: দারুল কলম, ১৪২৭হি.), পৃ. ১২-১৪। দুঃখজনক হ'লেও সত্য যে হাদীছ অস্বীকারকারীদের মত আধুনিক যুগে কিছুসংখ্যক ইসলামপন্থী বিদ্বানও হাদীছকে রেওয়ায়েত দ্বারা যাচাইয়ের পরিবর্তে আকুল ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে তাঁরা 'দিরায়াত', 'তাফাক্কুহ' 'খাছ যওক' বা বিশেষ রুচিবোধ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করলেও তা আকুলকেই নির্দেশ করে। আবুল আ'লা মওদূদী (১৯৭৯খ্রি.), আমীন আহসান ইছলাহী (১৯৯৭খ্রি.) প্রমুখের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। দ্র. আবুল আ'লা মওদূদী, তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৬১, আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে হাদীছ, পৃ. ৯১-৯২, ৯৯; মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, হুজ্জিয়াতে হাদীছ, পৃ. ১৪৯-১৫২)।
৩২০. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাছারুছ ছাওয়াঈক আল-মুরসালাহ, পৃ. ১২৪।
৩২১. ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাহ আত-তাহাভিয়াহ, পৃ. ৩৫৪।
৩২২. আশ-শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৭২।
৩২৩. পবিত্র কুরআনের মানবীয় জ্ঞানের এই ধারাবাহিকতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُل 1 CAR أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا 'যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না।

নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় প্রত্যেকটির বিষয়ে তোমরা (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৬)। এখানে জ্ঞানের মাধ্যম হিসাবে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- শ্রবণ (বিশ্বস্ত ব্যক্তির প্রদত্ত সংবাদ), দর্শন (অভিজ্ঞতা) ও অন্তঃকরণ (বুদ্ধিবৃত্তি)। এই তিনটি উৎসই মূলত মানবীয় জ্ঞান তৈরী করে। আস-সিবাঈ (১৯৫৬খ্রি.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ইসলামে তিনটি উপায়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়- (১) বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদ, যা সংবাদদাতার সত্যবাদিতার কারণে শ্রোতা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে। যেমন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ। (২) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যার যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে। (৩) বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, যে বিষয়ে কোন বিশ্বস্ত সূত্রের সংবাদও নেই কিংবা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও নেই। দ্র. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩৫।
৩২৪. ড. মুহাম্মাদ আকরাম ওয়ারাক, মুতুনে হাদীছ পর জাদীদ যেহেন কী ইশকালাত (গুজরানওয়ালা: শরী'আহ একাডেমী, ২য় প্রকাশ: ২০১৬খ্রি.), পৃ. ৪০৯-৪১১। এ বিষয়ে বিশেষভাবে পাঠ্য হ'ল ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) রচিত গ্রন্থ درء تعارض العقل والنقل যা ১০ খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছে।
৩২৫. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৬।
৩২৬. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭।
৩২৭. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিছ ছালাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৫।
৩২৮. আশ-শাত্বিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৫।
৩২৯. أن الله جعل للعقول في إدراكها حدا تنتهي إليه لا تتعداه، ولم يجعل لها سبيلا إلى 020 الإدراك في كل مطلوب. ولو كانت كذلك لاستوت مع الباري تعالى في إدراك جميع ما كان وما يكون وما لا يكون، إذ لو كان كيف كان يكون، فمعلومات الله - لا تتناهى ومعلومات العبد متناهية والمتناهي لا يساوي ما لا يتناهى. শাত্বিবী, আল-ই'তিছাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৩১।
৩৩০. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩৯-৪১। অন্যত্র তিনি বলেন, ولا أدري أي عقل يريدون أن يحكموه ويعطوه من السلطة أكثر مما أعطاه علماؤنا في قواعدهم الدقيقة؟ ليس عندنا عقل واحد نقيس به الأمور، بل العقول متفاوتة، والمقاييس مختلفة والمواهب متباينة فما لا يعقله فلان ولا يفهمه، قد يراه آخر معقولاً مفهوماً । দ্র. অদেব, পৃ. ২৭৮।
৩৩১. ছহীহুল বুখারী, হা/৩২৫১-৩২৫২।
৩৩২. সূরা আল-কামার, আয়াত: ৫৪।
৩৩৩. সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭৯-৮১, আন-নামল, আয়াত: ১৫-৪৪।
৩৩৪. ইবনু তায়মিয়া, মাজমূ'উল ফাতাওয়া, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৫৬৭।।
৩৩৫. সুনান আবী দাউদ, হা/১৬২।
৩৩৬. আবুল মুযাফ্ফর আস-সাম'আনী, আল-ইনতিছারু লি আছহাবিল হাদীছ, পৃ. ৭৫।
৩৩৭. আশ-শাত্বিবী, আল-ইতিসাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৭২।
৩৩৮. ইবনু খালদুন, তারীখু ইবনু খালদুন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৫৪।
৩৩৯. সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৫০।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৪ : কুরআনবিরোধী হ’লে হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়

📄 সংশয়-৪ : কুরআনবিরোধী হ’লে হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়


হাদীছ অস্বীকারকারীগণ তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য অপর একটি মূলনীতি ব্যবহার করেন। আর তা হ’ল, প্রতিটি হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য কুরআনের সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। যদি তা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তবেই গ্রহণযোগ্য হবে, আর যদি কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তবে তা পরিত্যাগ করতে হবে। কেননা তা রাসূল (ছা.)-এর বাণী নয়। এজন্য তাঁরা হাদীছ থেকেও দলীল পেশ করে থাকেন। যেমন : আব্দুল্লাহ ইবনু উমার হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছা.) বলেন, «إِنَّهُ سَيَفْشُوا عَنِّي أَحَادِيْثُ فَمَا أَتَاكُمْ مِنْ حَدِيْثِيْ فَاقْرَءُ وا كِتَابَ اللهِ وَاعْتَرُ وهُ فَمَا وَافَقَ كِتَابَ اللهِ فَأَنَا قُلْتُهُ، وَمَا لَمْ يُوَافِقْ كِتَابَ اللهِ فَلَمْ أَقُلْهُ -আমার নামে অনেক হাদীছ প্রকাশিত হবে। সুতরাং তোমাদের নিকট আমার যে হাদীছ পৌঁছাবে, (তার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য) তোমরা কুরআন পাঠ কর এবং কুরআনের মোতাবেক পরীক্ষা কর। যদি কুরআনের সাথে মিলে যায় তবে সেটি আমি বলেছি আর যদি না মিলে তবে আমি তা বলি নি।

পূর্বযুগে রাফিযী, মু'তাযিলা এবং যিনদিকগণ এই যুক্তি পেশ করেছিল। বর্তমান যুগে ড. আহমাদ আমীন, ডা. তাওফীক হিন্দী, মাহমূদ আবূ রাইয়াহ, জামাল বান্না, আহমাদ ছুবহী মানছূর প্রমুখ এই মতাবলম্বন করেছেন। পাকিস্তানের আমীন আহসান ইসলাহী, জাভিদ আহমাদ গামেদী ও এই মতের সমর্থক। তাদের মতে, কুরআনেই হ’ল একমাত্র দলীল এবং সুন্নাহ কেবল তাতে নিশ্চয়তাবোধক অর্থ প্রদান করে। সুতরাং যে সকল বিধান কুরআনে নেই, তা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তা রাসূল (ছা.) বলেনও নি। সুতরাং তা কোন দলীল নয়। এই যুক্তিতে তাঁরা রজমের হাদীছসহ অনেক হাদীছ অস্বীকার করেছেন। আমীন আহসান ইছলাহী বলেন,

کوئے حدیث جو کسی پہلو سے قرآن کے خلاف ہو گی وہ قبول نہیں کی جائے گی হাদীছ যদি কোন এক দিক থেকে কুরআনের বিপরীত হয়, তবে তা কবুল করা যাবে না।' তিনি হাদীছ কুরআনের বিপরীত হওয়ার স্বরূপ ব্যাখ্যা করে

اگر حدیث صریحا قران مجید کے الفاظ اور اسکے سیاق و نظم کے خلاف پڑرہی ہو تو ایسے مقامات پر توقف کرنا چاہیے اور اسی صورت میں حدیث کو جھوڑنا چاہیئے কোন হাদীছ স্পষ্টভাবে কুরআনের শব্দ, তার পূর্বাপর এবং বাকরীতির বিপরীত হয়, তবে এ সকল স্থানে হাদীছটির ব্যাপারে সিদ্ধান্তগ্রহণ মূলতবী রাখা উচিৎ এবং এই অবস্থায় হাদীছটি পরিত্যাগ করা উচিৎ। অর্থাৎ কুরআনের সাথে কেবল অর্থগত মিল থাকলেই যথেষ্ট নয়, শব্দগতভাবেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হ'তে হবে! এজন্যই বোধ হয় জামাল বান্না বলেন, وقد تتملكنا

الدهشة عندما نري إعمال هذا المعيار سيجعلنا نستبعد قرابة نصف الأحاديث المتداولة بين الناس 'আমরা বিস্ময়াভূত হয়েছি যখন দেখেছি যে, এই মূলনীতি প্রয়োগ করতে পারলে আমরা বর্তমানে মানুষের মাঝে প্রচলিত প্রায় অর্ধেক হাদীছই বাতিল ঘোষণা করতে পারব। অন্যত্র তিনি বলেন, 'এই মূলনীতির মাধ্যমে দুই থেকে তিন হাজার হাদীছ বাতিল করা সম্ভব যার মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেকই হবে বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ।

পর্যালোচনা:

এই মূলনীতি পুরোপুরিভাবে অগ্রহণযোগ্য। কেননা আমরা আগেই জেনেছি যে, সুন্নাহ হ'ল কুরআনের ব্যাখ্যা এবং কুরআনের ওপর অতিরিক্ত বিধান সংযোজনকারী। যেহেতু কুরআনে এই দু'টি বিষয়ই উল্লেখিত হয়নি, সুতরাং তাদের মূলনীতি অনুসারে ইসলামী শরী'আতে হাদীছের ভূমিকা কেবল কুরআনের নিশ্চয়তাপ্রদানকারীতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যা একাধারে হাদীছের প্রামাণিকতাকেই নাকচ করে দেয়। ফলে হাদীছ অস্বীকারকারীদের একটি সুদৃঢ় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে এই মূলনীতি। বিশেষ করে কুরআনের বিপরীতে হাদীছকে উপস্থাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নে তাদের দলীলসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।

ক. ইমাম ত্বাবারাণী বর্ণিত যে হাদীছটি দলীল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিতান্তই দুর্বল।” ইবনু হাজার আল-আসকালানী (৮৫২হি.) বলেন, হাদীছটি বেশ কিছু সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কোনটিই ত্রুটিমুক্ত নয়। নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী (১৯৯৯খ্রি.) এ মর্মে বর্ণিত হাদীছগুলি একত্রিত করেছেন। কিন্তু সবগুলিরই সনদ খুবই দুর্বল কিংবা জাল। সুতরাং এই মর্মের সকল হাদীছ বাতিল হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিছদের মধ্যে ইজমা' হয়ে গেছে।

ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) বলেন, ما روى هذا أحد يثبت حديثه في

شيء صغر ولا كبر ... وهذه أيضا رواية منقطعة عن رجل مجهول، ونحن لا نقبل مثل هذه الرواية في شيء 'এই হাদীছটি এমন একজনও বর্ণনা করেনি যার হাদীছ ছোট-বড় কোন বিষয়ে গ্রহণযোগ্য হয়... এটি এক অপরিচিত লোকের বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর এই জাতীয় বর্ণনা আমরা কোন কিছুতেই গ্রহণ করতে পারি না।'

আল-খাত্তাবী (৩৮৮হি.) إلا أني أوتيت الكتاب ومثله معه 'নিশ্চয়ই আমি কিতাব প্রাপ্ত হয়েছি এবং তার সাথে অনুরূপ'- হাদীছটির ব্যাখ্যা বলেন, এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাদীছকে কুরআনের ভিত্তিতে যাচাইয়ের কোন প্রয়োজন নেই। কেননা যখনই তা রাসূল (ছা.) হ’তে ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলীল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর কতিপর ব্যক্তি যা বর্ণনা করেছে এই মর্মে যে, যখন তোমাদের নিকট হাদীছ পৌঁছাবে, তখন তা কুরআন দ্বারা পরীক্ষা কর। যদি কুরআনের সাথে তা মিলে যায় তবে তা গ্রহণ কর, আর যদি বিরোধী হয়, তবে তা গ্রহণ করো না।- এই হাদীছ বাতিল যার কোন ভিত্তি নেই। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (২৩৩হি.) বলেছেন, হাদীছটি যিন্দীকরা তৈরী করেছে।

ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) এই হাদীছগুলির দুর্বলতা উল্লেখ করার পর বলেন, هل يستجيز هذا إلا كذاب زندیق کافر 'কোন মিথ্যুক, যিন্দিক, কাফের ব্যতীত এমন কথা কেউ বলতে পারে?

আল-বায়হাক্বী (৪৫৮হি.) বলেন, 'যে হাদীছটিতে হাদীছকে কুরআনের সাথে পরস্পর তুলনা করতে বলা হয়েছে তা অশুদ্ধ, বাতিল। হাদীছটি নিজেই তার বাতিল হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত করে। কুরআনের কোথাও বলা হয় নি যে, হাদীছকে কুরআনের নিরিখে গ্রহণ করতে হবে।

ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, وقد أمر الله عز وجل بطاعته واتباعه أمرا مطلقا محملا لم يقيد بشيء ولم يقل ما وافق كتاب الله كما قال بعض أهل الزيغ 'আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণের জন্য শর্তহীনভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, কোনরূপ সীমা বেঁধে দেননি। তিনি বলেননি যে, কেবল আল্লাহর কিতাবে সাথে যা মিলবে তার অনুসরণ কর, যেমনটি কিছু বিভ্রান্ত মানুষ বলে থাকে।

খ. হাদীছটি যদি ছহীহ ধরে নেয়া হয় তবুও তাদের পক্ষে দলীল নয়, বরং তাদের বিরুদ্ধেই দলীল। কেননা তাদের কথা মত যদি হাদীছটি কুরআনের ওপর আরোপ করা হয়, তবে তা বাতিল প্রমাণিত হয়, কেননা কুরআনে রাসূল (ছা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্যের কথা এসেছে। ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) যথার্থই বলেন, সর্বপ্রথম আমরা ঐ হাদীছটিকেই কুরআনের সাথে তুলনা করব, যেটি তোমরা উল্লেখ করেছ। যখন আমরা তুলনা করলাম, তখন দেখলাম হাদীছটি কুরআনের বিরোধী। কেননা আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَالْتَهُوا রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও। তিনি আরও বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হ'ল, আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি।

ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, কিছু বিদ্বান হাদীছটির ব্যাপারে (রসিকতাসুলভ) মন্তব্য করেছেন যে, সব কিছুর পূর্বে আমরা হাদীছটি কুরআনের নিরিখে যাচাই করি এবং তার উপরই নির্ভর করি। অতঃপর যখন আমরা হাদীছটি কুরআনের সাথে তুলনা করলাম তখন দেখলাম হাদীছটি কুরআনের বিরোধী। কেননা আমরা কুরআনের কোথাও পাইনি যেখানে বলা হয়েছে যে, রাসূল (ছা.)-এর কোন হাদীছ গ্রহণ করা যাবে না, যদি তা কুরআনের সাথে না মিলে। বরং আমরা পেয়েছি যে, কুরআন রাসূল (ছা.)-এর নিঃশর্ত আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছে এবং কোন অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধাচরণ করার ব্যাপারে সর্তক করেছে।

দ্বিতীয়ত, কোন কোন হাদীছে শুধু 'কিতাবুল্লাহ'র অনুসরণের যে কথা এসেছে তার ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, المراد بكتاب الله في الحديث المرفوع حكمه وهو أعم من أن يكون نصا أو مستنبطا 'মারফু' হাদীছ সমূহে আল্লাহর কিতাব থেকে উদ্দেশ্য হ'ল- আল্লাহ্র কিতাবের হুকুম। আর এই হুকুম যেমন সকল নছ (কুরআন ও হাদীছ)- কে বুঝায়, তেমনি নছের আলোকে উদ্ভাবিত বিধানসমূহকেও বুঝায়।

গ. আমীন আহসান ইছলাহী তাঁর মতের সপক্ষে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.)-এর একটি উক্তি তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি বলেন, ولا يقبل خبر الواحد في منافاة حكم العقل وحكم القرآن الثابت المحكم

আকূলের বিরোধী হলে এবং কুরআন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোন বিধানের বিপরীত হলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমীন আহসান ইছলাহী ছাহেব ও তাঁর অনুসারীরা বস্তুত উলূমুল হাদীছ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন না। নতুবা মুহাদ্দিছদের পরিভাষাসমূহ নিজের বুঝ মত শাব্দিক অর্থ করে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করতেন না। তাঁরা জানেনই না যে, পরস্পরবিরোধী হাদীছসমূহের ব্যাপারে মুহাদ্দিছদের নিজস্ব নীতি রয়েছে যা 'মুখতালিফুল হাদীছ'-এর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তাঁরা জানেন না যে, মুহাদ্দিছগণও কোন হাদীছ ছহীহ হওয়ার জন্য কুরআনের পরিপন্থী না হওয়াকে শর্ত করেছেন এবং খতীব আল-বাগদাদী সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তবে মুহাদ্দিছদের নিকট এই বৈপরীত্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া ভিন্ন। তাদের নিকট হাদীছ ও কুরআন পরস্পর বিরোধী হওয়ার অর্থ সেখানে আর কোন ব্যাখ্যার অবকাশ না থাকা এবং কোন সমন্বয়ের সুযোগ না থাকা। বস্তুত এমন ঘটনা যঈফ এবং জাল হাদীছ ব্যতীত কোন ছহীহ হাদীছের ক্ষেত্রে ঘটে না। কেননা এই বৈপরীত্য নিষ্পত্তির জন্য জন্য মুহাদ্দিছদের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আর তা হ'ল, (১) উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধন করা, নতুবা নাসিখ-মানসূখ চিহ্নিত করা, সেটি সম্ভব না হ'লে কোন একটিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। সেটিও সম্ভব না হ'লে দু'টির ওপরই আমল মুলতবী রাখা, যতক্ষণ না তার অর্থ স্পষ্ট হয়। সুতরাং মুহাদ্দিছগণ কেবলমাত্র বাহ্যিক বৈপরীত্যের কারণে কোন হাদীছ বর্জন করেন না, যেমনটি হাদীছ অস্বীকারকারীগণ করে থাকেন।

ঘ. যুক্তিভিত্তিক দলীল হ'ল, যদি কেবল ঐ হাদীছগুলিকেই গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, যেগুলি কুরআনের সাথে হুবহু এক ও অভিন্ন হবে, তবে এই প্রশ্ন অপরিহার্যভাবে সৃষ্টি হয় যে, তাহ'লে হাদীছের আর বিশেষ প্রয়োজন কী? কুরআনই তো এককভাবে যথেষ্ট ছিল! হাদীছের প্রয়োজন তো তখনই দেখা দেয়, যখন কুরআনে বর্ণিত কোন সংক্ষিপ্ত বা অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা জানা রাসূল (ছা.) ব্যতীত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুতরাং রাসূল (ছা.) হাদীছ গ্রহণ বা বর্জনের জন্য তা কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বা না হওয়াকে শর্তযুক্ত করা একেবারেই অযৌক্তিক। এর পক্ষে শারঈ কোন দলীলও নেই।

দ্বিতীয়ত, কুরআনে আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وحي يوحى 'আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। এই আয়াতের প্রতি যদি লক্ষ্য রাখা হয় এবং রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের সাথে কুরআনের পরস্পর তুলনা করে উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য খোঁজা হয় তবে তা অহীর সাথে অহীকে পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে দেয়ারই নামান্তর নয়? অতঃপর যদি কোন ব্যক্তি নিজের ত্রুটিপূর্ণ মানবীয় বিচার-বুদ্ধি দিয়ে এর মধ্যে ফয়ছালা করতে চায় এবং কোন একটিকে দুর্বল ঘোষণার দুঃসাহস করে, তবে তা কতটা ভয়ানক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়? বরং এটি তো সরাসরি আল্লাহ প্রেরিত অহী তথা কুরআনের বিশুদ্ধতার প্রতিই সন্দেহবাদ আরোপের নামান্তর। কেবল তা-ই নয়, এর মাধ্যমে রাসূল (ছা.)-এর রিসালাতকে চরমভাবে অবমাননা করা হয়। কেননা এতে রাসূল (ছা.)-এর আদেশ-নিষেধের আর কোন মূল্য থাকে না। মানুষের জন্য তার সুন্নাহ অনুসরণেরও কোন আবশ্যকতা থাকে না। এভাবে সমগ্র দ্বীন মানুষের খেয়াল-খুশীতে পরিণত হবে।

ঙ. সর্বশেষ কথা হ'ল, রাসূল (ছা.)-এর কোন ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হাদীছ নিজেই শরী'আতের একটি দলীলে পরিণত হয়ে যায়। যা অন্য কোন দলীল দিয়ে যাচাই করার কোন প্রয়োজন থাকে না। বরং তা সর্বাবস্থায় গ্রহণযোগ্য মনে করা ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়। দ্বিতীয়ত, কোন ছহীহ হাদীছ কখনও কুরআনের পরিপন্থীও হ'তে পারে না, যে কুরআন দ্বারা তা যাচাই করতে হবে। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ একই আল্লাহ প্রেরিত অহী।

আবুল মুযাফ্ফর ইবনুস সাম'আনী (৪৮৯হি.) বলেন, ،متى ثبت الخبر صار أصلا من الأصول، ولا يحتاج إلى عرضه على أصل آخر 'যখন কোন হাদীছ ছহীহ সাব্যস্ত হয়, তখন শরী'আতের একটি উছুলে পরিণত হয়। ফলে তা অপর কোন দলীলের সাথে তুলনা করার মুখাপেক্ষী থাকে না।'

ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) বলেন, ليس في الحديث الذي صح شيء يخالف القرآن ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত এমন কোন হাদীছ নেই যা কুরআনের বিরোধী হয়। তিনি অন্যত্র বলেন, '(কুরআন-হাদীছ সম্পর্কে) অজ্ঞ কোন ব্যক্তির ধারণায় যদি দু'টি হাদীছ বা দু'টি আয়াত কিংবা একটি হাদীছ ও একটি আয়াত পরস্পরবিরোধী মনে হয়, তবুও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দু'টির ওপরই আমল করা অপরিহার্য।... কেননা প্রতিটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং প্রতিটিই আনুগত্য ওয়াজিব হওয়া এবং ব্যবহারযোগ্যতার দিক দিয়ে সমান, কোন পার্থক্য নেই।'

আশ-শাত্বিবী (৭৯০হি.) বলেন, 'হাদীছ হয় স্রেফ আল্লাহর অহী, নতুবা রাসূল (ছা.)-এর ইজতিহাদ যা কিতাব ও সুন্নাহর ছহীহ দলীল দ্বারা সমর্থিত। দু'টি দিক থেকেই হাদীছের সাথে কুরআনের কখনও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হ'তে পারে না। কেননা রাসূল (ছা.) নিজের প্রবৃত্তি থেকে কোন কথা বলেন না। তিনি যা-ই বলেন, তা আল্লাহর অহী প্রাপ্ত হয়েই বলেন।

পাকিস্তানের সাবেক গ্রান্ড মুফতী মুহাম্মাদ শফী (১৯৭৬খ্রি.) ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কিত রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ لم يكذب إبراهيم إلا ثلاث كذبات 'ইবরাহীম (আ.) তিনটি স্থানে ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি-এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'মির্জা কাদিয়ানী ও প্রাচ্যবিদদের মোহগ্রস্থ মুসলমানগণ এই হাদীছটি বিশুদ্ধ সনদবিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এ কারণে ভ্রান্ত ও বাতিল বলে দিয়েছে যে, এর কারণে আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম (আ.)- কে মিথ্যা বলা যরূরী হয়ে পড়ে। কাজেই খলীলুল্লাহকে মিথ্যাবাদী বলার চেয়ে সনদের বর্ণনাকারীদের মিথ্যাবাদী বলে দেয়া সহজতর। কেননা হাদীছটি কুরআনের পরিপন্থী। তারা এ থেকে একটি সামগ্রিক নীতি আবিষ্কার করেছে যে, যে হাদীছ কুরআনের পরিপন্থী হবে, তা যতই শক্তিশালী, বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা প্রমাণিত হোক না কেন, মিথ্যা ও ভ্রান্ত আখ্যায়িত হবে। এই নীতিটি সস্থানে তো সম্পূর্ণ নির্ভুল এবং মুসলিম উম্মাহর নিকট অপরিহার্যভাবে স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু মুসলিম বিদ্বানগণ সারা জীবনের পরিশ্রম ব্যয় করে যেসব হাদীছকে শক্তিশালী এবং বিশুদ্ধ সনদ দ্বারা প্রমাণিত পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে একটি হাদীছও এরূপ নেই, যাকে কুরআনের পরিপন্থী বলা যায়। বরং স্বল্পবুদ্ধিতা এবং বক্রবুদ্ধিতার ফলেই যে হাদীছকে তারা রদ করতে চায় তাকে কুরআন পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে থাকে এবং এই বলে ছেড়ে দেয় যে, এই হাদীছটি কুরআনের বিরোধী হওয়ায় গ্রহণযোগ্য নয়। যেভাবে এই হাদীছটির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।


টিকাঃ
৩৪০. আত-তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা/ ১০২২৪।
৩৪১. ড. ঈমাম আস-সাইয়িদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাযায়াতু ফী কিতাবিত্ তা'দীল ইসলাম, পৃ. ২২০-২২১।
৩৪২. আমীন আহসান ইসলাহী, মায়ারী তাদাস্সুরে হাদীছ, পৃ. ২৬।
৩৪৩. জাভেদ আহমাদ গামেদী, মীযান, পৃ. ৬২।
৩৪৪. এমনকি আবুল আ'লা মওদূদীর মতামত ও বিষয়ে বিশেষ ভিন্নতা নয়। দ্র. আবুল আ'লা মওদূদী, তাফসীরুল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪০-২৪৪, ঐ, তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৯-৪৬১; ঐ, রাসায়েল ও মাসায়েল, ১ ম খণ্ড, পৃ. ৫৭-৫৮, ২৩৩; ৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৭।
৩৪৫. ড. ঈমাদ আস-সাইয়েদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, পৃ. ২২০।
৩৪৬. আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে হাদীছ, পৃ. ২৮।
৩৪৭. আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাব্বুরে কুরআন, পৃ. ২১৯।
৩৪৮. জামাল বান্না, আস-সুন্নাতু ওয়া দাওরুহা ফিল ফিকহিল জাদীদ (কায়রো: দারুল ফিকর, ১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ২৪৮।
৩৪৯. তদেব, পৃ. ২৬৫।
৩৫০. নূরুদ্দীন আল-হায়ছামী, মাজমাউয যাওয়াইদ, হা/৭৮৭; ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭০; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, আল-মাক্বাছিদুল হাসানাহ (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ১৯৮৫খ্রি.), হা/৫৯; পৃ. ৮৩; ইসমাঈল আল-আজলুনী, কাশফুল খাফা (কায়রো: মাকতাবাতুল কুদসী, ১৩৫৭হি.), হা/২২০; ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৬।
৩৫১. শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, আল-মাক্বাছিদুল হাসানাহ, পৃ. ৮৩।
৩৫২. নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যাঈফাহ, হা/১০৮৩-১০৯০, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৩-২১১।
৩৫৩. আবূ যাহু, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ৩১৪।
৩৫৪. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২২৫।
৩৫৫. আল-খাত্তাবী, মা'আলিমুস সুনান, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৯৯।
৩৫৬. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উত্তুলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৮।
৩৫৭. والحديث الذي روي في عرض الحديث على القرآن باطل لا يصح، وهو ينعكس ٥٤٩٠ ا على نفسه بالبطلان، فليس في القرآن دلالة على عرض الحديث على القرآن আল-বায়হাক্বী, দালাইলুন নুবুওয়াহ (বৈরূত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, ১৪০৫হি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭।
৩৫৮. ইবনু আব্দিল বার, জামি'উ বায়ানিল ইলম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১৮৯।
৩৫৯. সূরা আন-হাশর, আয়াত: ৭।
৩৬০. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০।
৩৬১. ইবনু আব্দিল বার্র, জামি'ট বায়ানিল ইলম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১১৮৯।
৩৬২. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৩।
৩৬৩. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৪৩২।
৩৬৪. ড. ঈমাদ আস-সাইয়েদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাতুন নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, পৃ. ২৩৬
৩৬৫. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৭৯।
৩৬৬. গাযী উযাইর, ইনকারে হাদীছ কা নায়া রূপ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৭।
৩৬৭. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৩৬৮. জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, কাওয়াঈদুত তাহদীছ, পৃ. ৯৮।
৩৬৯. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০।
৩৭০. إذا تعارض الحديثان أو الآيتان أو الآية والحديث فيما يظن من لا يعلم ففرض على ٥٩٥٠ كل مسلم استعمال كل ذلك... وكل من عند الله عز وجل وكل سواء في باب وجوب الطاعة والاستعمال ولا فرق ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১।
৩৭১. فإن الحديث إما وحي من الله صرف، وإما اجتهاد من الرسول - عليه الصلاة ٥٩٥ والسلام معتبر بوحي صحيح من كتاب أو سنة، وعلى كلا التقديرين لا يمكن فيه التناقض مع كتاب الله؛ لأنه عليه الصلاة والسلام ما ينطق عن الهوى، إن هو إلا وحي يوحى। দ্র. আশ-শাত্বিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৩৫।
৩৭২. ছহীহুল বুখারী, হা/৫০৮৪, ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৭১।
৩৭৩. ফখরুদ্দীন রাযী (৬০৪হি.) সর্বপ্রথম হাদীছটির ব্যাপারে আপত্তি তোলেন। অতঃপর আধুনিক যুগে ভারত উপমহাদেশে হামীদুদ্দীন ফারাহী (১৯৩০খ্রি.), শিবলী নোমানী (১৯১৪খ্রি.), আবুল আ'লা মাওদূদী (১৯৭৯খ্রি.), আমীন আহসান ইছলাহী (১৯৯৭খ্রি.) এবং হাদীছ অস্বীকারকারীদের মধ্যে আসলাম জয়রাজপুরী (১৯৫৫খ্রি.), গোলাম আহমাদ পারভেষ (১৯৮৫খ্রি.) প্রমুখ হাদীছটির ওপর আপত্তি জানিয়ে রদ করেছেন। দ্র. ড. মুহাম্মাদ আকরাম ওয়ারাক, মুতুনে হাদীছ পর জাদীদ যেহেন কী ইশকালাত, পৃ, ২৯০-২৯১।
৩৭৪. মুহাম্মাদ শফী, তাফসীর মাআরেফুল কোরআন, বঙ্গানুবাদ: মুহিউদ্দীন খান (মদীনা: বাদশাহ ফাহাদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩হি.), পৃ. ৮৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00