📄 সংশয়-৩ : ছাহাবীগণ সকলেই সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ছিলেন না
হাদীছ অস্বীকারকারীদের দাবী হ'ল, ছাহাবীগণ সকলে আস্থাভাজন ছিলেন না। তারাও আমাদের মত মানুষ ছিলেন। সুতরাং তারাও ভুল বা মিথ্যা বলতে পারেন। তাদের মধ্যে অনেকে মুনাফিক ও কবীরা গুনাহগারও ছিলেন। সুতরাং তাদের ওপর কি একচেটিয়াভাবে নির্ভর করা যায়? ড. আহমাদ ويظهر أن الصحابة أنفسهم في زمنهم كان يضع بعضهم بعضاً , موضع النقد، ويترلون بعضاً منزلة أسمى من بعض তাদের যুগে নিজেরাই একে অপরের সমালোচনা করতেন এবং (বিশ্বস্ততার ব্যাপারে) কতিপয়কে কতিপয়ের উপরে স্থান দিতেন।
পর্যালোচনা :
ক. সকল মুসলিম বিদ্বান একমত যে, ছাহাবীগণ প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, كان الصحابة رضى الله عنهم قد كفينا البحث عن أحوالهم الإجماع أهل الحق من المسلمين وهم أهل السنة والجماعة على أنهم كلهم عدول 'ছাহাবীদের (নৈতিক) অবস্থান সম্পর্কে চুল-চেরা বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই কেননা মুসলমানদের মধ্যে হক্বপন্থীগণ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, তারা প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ।' ইবনু কাছীর বলেন, والصحابة كلهم عدول عند أهل السنة والجماعة ... وقول المعتزلة : الصحابة عدول إلا من قاتل علياً قول باطل مرذول و مردود 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ'র নিকট ছাহাবীগণ প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন.. মু'তাযিলাদের এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল ও ভিত্তিহীন যে, ছাহাবীরা ন্যায়পরায়ণ, তবে যারা আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তারা ব্যতীত।
ছাহাবীদের ন্যায়পরায়ণতা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছা.)-এর সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত। কেননা আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর রাসূল (ছা.)-এর সাহচর্যের জন্য নির্বাচন করেছিলেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই কুরআন ও সুন্নাহ তথা ইসলামী শরী'আহ মানবজাতির নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরাই এই দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে বিজয়ী করেছিলেন এবং পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে দ্বীনকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং দ্বীনের প্রতি তাদের দরদ ও দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহ ও রাসূল (ছা.)-এর প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল প্রশ্নাতীত। সুতরাং তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আর উষ্ট্রের যুদ্ধে এবং ছিফীনের যুদ্ধে তাদের মাঝে যে বিবাদ ঘটেছিল, তা এক অনিচ্ছাকৃত সংঘাত ছিল কিংবা তাদের ইজতিহাদগত ভুল ছিল। এতে তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা ক্ষুণ্ণ হয় না।
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে তাদের চেহারায় সিজদার প্রভাব থেকে। এই আয়াতে আল্লাহ স্বয়ং ছাহাবীদের ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। এছাড়া ছাহাবীদের সপক্ষে অনেক জায়গায় সাক্ষ্য দিয়েছেন রাসূল (ছা.)। যার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদীছটি হ'ল, خير الناس قرني، ثم الذين يلونهم، ثم الذين يلونهم ‘আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। এই হাদীছে একই সাথে তাবেঈদের ব্যাপারেও সাক্ষ্য প্রদান করা হয়েছে।
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
আনছারগণের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম দিককার এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে নিষ্ঠার সাথে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তষ্ট। এই আয়াতটিতে আল্লাহ একইসাথে ছাহাবী এবং তাদেরকে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণকারী তাবেঈদের প্রশংসা করেছেন, যা তাদের সততার জন্য সাক্ষ্য হিসাবে যথেষ্ট।
সুতরাং সরাসরি আল্লাহ এবং রাসূল (ছা.) কর্তৃক সততার সাক্ষ্যপ্রাপ্ত ছাহাবীদের সম্পর্কে শরী'আতের ব্যাপারে মিথ্যা ও খেয়ানতের সন্দেহ করা এবং তাদের ওপর কোন অপবাদ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিহ্বা আড়ষ্ঠ হওয়া উচিৎ। ইবনুছ ছালাহ (৬৪৩হি.) বলেন, إن الأمة مجمعة على تعديل جميع الصحابة، ومن لابس الفتن منهم فكذلك بإجماع العلماء الذين يعتد بهم في الإجماع، إحسانا للظن بهم، ونظرا إلى ما تمهد لهم من المآثر، وكان الله - سبحانه وتعالى - أتاح الإجماع على ذلك لكونهم نقلة الشريعة
'মুসলিম উম্মাহ সকল ছাহাবীর বিশ্বস্ততার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছে। এছাড়া যাদেরকে ফিতনা স্পর্শ করেছে (তথা উষ্ট্রের যুদ্ধ ও ছিফীনের যুদ্ধ প্রভৃতি) তাদের ব্যাপারেও ঐক্যমত পোষণ করেছেন এমন বিদ্বানগণ, যাদের ইজমা' গ্রহণযোগ্য হিসাবে পরিগণিত। তাদের প্রতি সুধারণা এবং (মুসলিম উম্মাহর জন্য) তাদের অবদানকে বিবেচনায় রেখে এই ঐক্যমত হয়েছে। যেন আল্লাহ নিজেই এই ইজমা'র পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, কেননা তারা ছিলেন শরী'আতের ধারক ও বাহক।
খ. ছাহাবীগণ পরস্পরের সত্যবাদিতা সম্পর্কে সন্দেহ করতেন বা একে অপরের মিথ্যুক বলতেন- এ মর্মে যত বর্ণনা এসেছে তার একটিও বিশুদ্ধ নয়, বরং শী'আদের তৈরীকৃত। বরং এ বিষয়ে সঠিক বক্তব্য হ'ল, যখনই তাঁরা কোন ছাহাবীর নিকট হাদীছ শ্রবণ করতেন সাথে সাথে তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিতেন, কখনও সন্দেহ পোষণ করতেন না। যেমন আল বারা ইবনু আযিব ليس كلنا سمع حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم ، كانت (রা.) বলেন, لنا ضيعة وأشغال، ولكن الناس لم يكونوا يكذبون يومئذ، فيحدث الشاهد الغائب 'আমাদের সকলেই রাসূল (ছা.) হ'তে হাদীছ শুনেছে তা নয়, কেননা আমাদের কৃষিখামার ছিল, কাজকর্ম ছিল। কিন্তু সেই যুগে মানুষ মিথ্যা কথা বলত না এবং তারা উপস্থিতরা অনুপস্থিতদের নিকট হাদীছ পৌঁছে দিত। ' আনাস (রা.) বলেন, ليس كل ما نحدثكم عن رسول الله صلى الله عليه وسلم ولكن حدثنا أصحابنا, ونحن قوم لا يكذب بعضنا بعضا ا سمعناه منه যে সকল হাদীছ তোমাদের নিকট বর্ণনা করি, তার প্রতিটিই রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে শুনেছি এমন নয়। বরং আমাদের সাথীরা আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন। আর আমরা এমন কওম ছিলাম যারা একে অপরকে মিথ্যুক বলত না।
তবে কিছু বর্ণনা এসেছে যেমন, আল-ওয়ালিদ ইবনু উকুবা (রা.)। যিনি বনু মুস্তালিক গোত্র থেকে ফিরে মিথ্যাভাবে রাসূল (ছা.)-কে বলেছিলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আব্দুর রহমান ইবনু উদাইস আল-বালভী (রা.) যিনি ফিতনার উদ্ভবকালে ওছমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে হাদীছ রচনা করে রাসূল (ছা.)-এর নামে মিথ্যাচার করেছিলেন। কিন্তু এ বর্ণনাগুলির সনদ দুর্বল, যা গ্রহণযোগ্য নয়। আর যদি বর্ণনাগুলো গ্রহণযোগ্যও হয়ে থাকে, তবুও এমন দু'একজনের জন্য বাকী প্রায় লক্ষাধিক ছাহাবীর ন্যায়পরায়ণতা ক্ষুণ্ণ হয় না। আর হাদীছ গ্রন্থসমূহে এই দু'জন ছাহাবীর বর্ণনাও ১টির বেশী পাওয়া যায় না। হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণামতে যদি তারা মিথ্যুক হয়ে থাকেন এবং মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই হাদীছ সংকলকরা সে হাদীছগুলি তাদের গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করতেন। কিন্তু তা দেখা যায় না। এখান থেকে অধিকতর প্রমাণিত হয় যে, মুহাদ্দিছদের গৃহীত নীতি সঠিক।
এছাড়া আয়েশা (রা.)-এর সম্মুখে আবুদ দারদা (রা.)- এর একটি মন্তব্য 's be is a re s لا وتر لمن أدركه الصبح নেই'- উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, كذب أبو الدرداء 'আব্দুদ দারদা মিথ্যা বলেছে'। এটি মিথ্যা অর্থ ভুল করা। কেননা এটি আবূ দারদার একটি নিজস্ব মন্তব্য ছিল। আর কেউ নিজের মত পেশ করলে তাকে মিথ্যুক বলা অপ্রাসঙ্গিক। অতএব এখানে আবু দারদা (রা.) ভুল করেছেন, এই অর্থ নিতে হবে।
গ. রাসূল (ছা.)-এর যুগে যারা মুনাফিক ছিল তারা ছাহাবীর সংজ্ঞায় পড়ে না। কেননা তারা বাহ্যিকভাবে ঈমান প্রকাশ করলেও অন্তরে কুফরী পোষণ করত। সুতরাং তারা ছাহাবী নয়। আর এই মুনাফিকদের সম্পর্কে রাসূল (ছা.) যেমন জানতেন, তেমনি ছাহাবীরাও অবগত ছিলেন। কুরআন তাদের চাল-চলন সম্পর্কে খুঁটিনাটি সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মুনাফিকদের পক্ষে রাসূল (ছা.) ও তাঁর ছাহাবীদের চোখ এড়িয়ে থাকার কোন সুযোগ ছিল না।
ঘ. ছাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ কবীরা গুনাহগার ছিলেন যেমন আয়েশা (রা.)-কে অপবাদদানকারীগণ, যেমন হাসান ইবনু ছাবিত, মিসতাহ ইবনু আছাছাহ এবং হামনা বিনতু জাহাশ। রাসূল (ছা.) তাদের ওপর হদের শাস্তি আরোপ করেছিলেন। তারা ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত গণ্য হবে কিনা এ বিষয়ে অধিকাংশ ফক্বীহ মত পোষণ করেছেন যে, যদি এমন অপরাধী তওবা করে, তবে সে আর ফাসিক হিসাবে গণ্য হবে না এবং তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে। আর এজন্য মুহাদ্দিছগণ হাসান ইবনু ছাবিত এবং হামনা বিনতু জাহশের হাদীছ তাঁদের গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং ফাসিক এবং কবীরা গুণাহগার যদি তওবা করে তবে সে বিশ্বস্ত হিসাবে গণ্য হবে।
ঙ. ছাহাবীদেরও মানবীয় ভুল-ভ্রান্তি থাকা স্বাভাবিক-এই প্রশ্নের জবাবে ড. মুহুত্বফা আল আ'যামী (২০১৭খ্রি.) বলেন, যারা এই যুক্তি প্রদান করেন, মূলত তারাই মানবীয় প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী অস্বীকার করেন। কেননা তারা মানুষের অন্তরে পরিচর্যার প্রভাব উপলব্ধি করতে পারেন না, মানবহৃদয়ের পরিশুদ্ধিতে ধর্মীয় অনুভূতি এবং শিক্ষার গভীর প্রভাবকে গুরুত্ব দেন না। মানবহৃদয় কোন জড় পদার্থের মত প্রাণহীন নয়। বরং হৃদয় যখন বিশুদ্ধ ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ হয়, তাওহীদের আক্বীদায় সিঞ্চিত হয়, তখন তা এমনকি ফিরিশতাদের মর্যাদা থেকেও উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়। আবার যখন তা অপবিত্র হয়ে যায়, তখন শয়তানের চেয়ে নিম্নস্তরে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মানবহৃদয়ের স্বাভাবিক প্রকৃতি হ'ল তা স্থিতিস্থাপক, যা কোন দেশ-কাল-পাত্র দিয়ে সরল সূত্রে পরিমাপ করা যায় না। অতএব ছাহাবীদের অবস্থানকে অন্য কারও সাথে তুলনা করা বা অন্যদের অবস্থানকে ছাহাবীদের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। কেননা তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর নবীর সহচর হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এই দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।
এর অর্থ এই নয় যে, আমরা তাদের ন্যায়পরায়ণতাকে সাধারণ স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মানবীয় ভুল-ভ্রান্তি থাকার সম্ভাবনা নাকচ করছি। কিন্তু ছাহাবীদের এই প্রজন্ম হাদীছ বর্ণনায় অতীব সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি আমাদের নিকট থেকে আদায় করে নিয়েছেন। এরূপ অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, إنه ليمنعني أن أحدثكم حديثا كثيرا أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من تعمد علي كذبا، فليتبوأ مقعده من النار নিকট আমি অনেক হাদীছ বর্ণনা করতাম। কিন্তু রাসূল (ছা.)-এর এই কথাটি আমাকে বাঁধাগ্রস্থ করে 'যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচার করল সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়।' আব্দুর রহমান ইবনু আবী লায়লা বলেন আমি যায়েদ ইবনু আরকাম (রা.)- কে বললাম, আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর কিছু হাদীছ শোনান। তিনি বললেন, كبرنا ونسينا، والحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم شديد 'আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং (অনেক কিছুই) ভুলে গেছি। রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ বর্ণনা করা খুবই কঠিন দায়িত্ব।
তবে ছাহাবীদের যদি কখনও হাদীছ বর্ণনায় ভুল হ'ত, তখন অপর ছাহাবীরাই তা সংশোধন করে দিতেন। যেমন আয়েশা (রা.) অনেক ছাহাবীকে সংশোধন করে দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ রাসূল (ছা.)-এর কতবার ওমরা আদায় করেছিলেন এ সম্পর্কে ইবনু উমার (রা.) বলেন যে, তিনি চার বার ওমরা আদায় করেছিলেন এবং এর মধ্যে একবার ছিল রজব মাসে। একথা আয়েশা (রা.) জানতে পারলে তিনি বললেন, রাসূল (ছা.) কখনও রজব মাসে ওমরা আদায় করেননি। অনুরূপভাবে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব ইবনু আব্বাস (রা.)-এর একটি ভুল সংশোধন করে দেন যখন তিনি বলেছিলেন, রাসূল (ছা.) মায়মূনা (রা.)-কে বিবাহ করেছিলেন মুহরিম অবস্থায়।
এ সকল উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, সকল ছাহাবীর ন্যায়পরায়ণতার উপর আস্থা রাখার অর্থ তারা মানবীয় সকল ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে মনে করা নয়। তবে রাসূল (ছা.)-এর পরিচর্যার ফসল হিসাবে তারা এ সকল ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য সদা তৎপর থাকতেন। মুহাদ্দিছগণ যারা ছাহাবীদের সকলকে ন্যায়পরায়ণ ঘোষণা করেছেন, তারাও কিন্তু ছাহাবীদের এ ধরনের কোন ভুল থাকাকে অস্বীকার করেননি; বরং এমন ভুল হ'লে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ সকল ভুল তাদের ন্যায়পরায়ণতায় কোন প্রভাব ফেলে না, যার দলীল আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।
চ. ছাহাবীরা একে অপরের নিকট কখনও কখনও প্রমাণ চাইতেন যেমন আবূ বকর (রা.) মুগীরা ইবনু শু'বা (রা.)-এর নিকট থেকে সাক্ষী চেয়েছেন এবং উমার (রা.) আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর নিকট সাক্ষী তলব করেছিলেন। এই প্রমাণ চাওয়ার অর্থ তারা মিথ্যা বলতে পারেন এমন সন্দেহ করা নয়। বরং এর পিছনে বিশেষ হিকমত নিহিত ছিল। আর তা হ'ল, তাঁরা হাদীছ গ্রহণে বিশেষ সতর্কতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নীতি মুসলমানদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, হাদীছের মর্ম বোঝা এবং তা থেকে হুকুম-আহকাম বের করা, কিংবা কোনো হাদীছ মানসূখ হয়েছে কি না তা জানার ক্ষেত্রে ছাহাবীদের সকলেই সম পর্যায়ের ছিলেন না। মানবীয় দৃষ্টিকোন থেকে এই জ্ঞানগত পার্থক্য থাকবেই। ফলে কোন হাদীছ বর্ণিত হ'লে তা সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্যে কখনও তারা পরস্পরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং সাক্ষী তলব করেছেন, যাতে হাদীছটির পূর্বাপর সম্পর্কে জানা যায় এবং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হ'লে সংশোধন করে দেওয়া যায়। এর মধ্যে সত্যাসত্য যাচাইয়ের কোন সম্পর্ক ছিল না।
টিকাঃ
২০১. মাহমুদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩১২, ৩২৬, ৩২৭।
২০২. ড. আহমাদ আমীন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ২১৬।
২০৩. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতী'আব ফী মা'রিফাল আসহাব (বৈরূত: দারুল জীল, ১৯৯২খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯।
২০৪. ইবনু কাছীর, আল-বা ইছুল হাছীছ, পৃ. ১৮১-১৮২।
২০৫. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৪৮; ইবনু কাছীর, আল-বা'ইফুল হাছীছ, পৃ. ১৮২-১৮৩।
২০৬. সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯।
২০৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৬৫০-৩৬৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৩।
২০৮. সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০।
২০৯. ইবনুছ ছালাহ, মুক্তাদ্দামা ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২৯৫।
২১০. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৬৩।
২১১. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৩৮৫।
২১২. তদেব, পৃ. ৩৮৫।
২১৩. ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১০১; ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আল-ইহাবাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪৮১; আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪১৩।
২১৪. ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৫২; ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
২১৫. নিহাদ আব্দুল হালীম উবাইদ, আল-ওয়াযঊ ফিল হাদীছ ওয়া আছারুহুস সাইয়িআহ আলাল উম্মাহ (অপ্রকাশিত মাস্টার্স থিসিস) (মক্কা : জামি'আতুল মালিক আব্দুল আযীয, তাবি), পৃ. ১৯৪-২১১।
২১৬. মুসনাদ আহমাদে আল-ওয়ালিদ ইবনু উকুবা (রা.) থেকে ১টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে (হা/১৬৩৭৯, যার সূত্র যঈফ এবং আব্দুর রহমান ইবনু উদাইস (রা.) থেকে ১টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে ইমাম ত্ববারাণীর 'মু'জামুল আওসাত্ব' গ্রন্থে (হা/৩২৮৯)। এর সনদও দুর্বল।
২১৭. মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক, হা/৪৬০৩।
২১৮. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নান্দ ইনদাল মুহাদ্দিছীন (রিয়াদ: মাকতাবাতুল কাওছার, ১৯৯০খ্রি.), পৃ. ১২১।
২১৯. তদেব, পৃ. ১১০-১১১।
২২০. সুনানুত তিরমিযী, হা/৩১৮০-৩১৮১।
২২১. মুছত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নাকুন্দ ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ১১৭-১১৮।
২২২. ছহীহুল বুখারী, হা/১০৮।
২২৩. সুনান ইবনু মাজাহ, হা/২৫, সনদ ছহীহ।
২২৪. ছহীহুল বুখারী, হা/১৭৭৬-১৭৭৭।
২২৫. ইবনু রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪।
২২৬. দ্র. ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নাক্বদ ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ১২৩-১২৬।
২২৭. দ্র. আস-সিবায়ী, আস-সন্নাত ওয়া মাকানাতহা, প, ২৬৪-২৬৬।
📄 সংশয়-৪ : সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী আবূ হুরায়রা (রা.) নির্ভরযোগ্য নন
তিনি ছিলেন নিরক্ষর এবং দেরীতে ইসলাম গ্রহণকারী। এতদসত্ত্বেও তাঁর সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী হওয়া অবিশ্বাস্য ব্যাপার, যা তার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আবূ হুরায়রা (রা.) ৫৩৭৫টি হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী, যা সকল ছাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক। এজন্য হাদীছ অস্বীকারকারীগণ তাঁর প্রতিই সবচেয়ে বেশী খড়গহস্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ করা হয়েছে। যেমন : (১) তিনি ছিলেন নিরক্ষর, যিনি লিখতে বা পড়তে জানতেন না। (২) তিনি খায়বার যুদ্ধের পর ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূল (ছা.)-এর সঙ্গ পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর। অথচ তিনি সর্বাধিক বর্ণনাকারী কীভাবে হলেন? (৩) ছাহাবীগণ তাঁর অধিক হাদীছ বর্ণনার সমালোচনা করতেন। (৪) তিনি ছিলেন মৃগীরোগী এবং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ প্রভৃতি। তাঁর বিরুদ্ধে ভব্যতার সমস্ত সীমারেখা অতিক্রম করে একটি পুস্তক রচনা করেছেন মাহমূদ আবূ রাইয়াহ যার নাম তাখলিছ করে রাখা হয়েছে شخ المغيرۃ أبو هريرة 'মযীরাহ' খাদ্যের ভক্ষক আবু হুরায়রা'। প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার সর্বপ্রথম তাঁর বিরুদ্ধে এই সমালোচনামূলক অবস্থান নেন। অতঃপর ড. আহমাদ আমীন তাঁর 'ফাজরুল ইসলাম' গ্রন্থে এই সমালোচনার পরিধি দীর্ঘ করেন।
পর্যালোচনা: আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ করা হয়েছে তাঁর অধিকাংশই তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সমালোচনায় পূর্ণ। এ সকল সমালোচনার দীর্ঘ জবাব প্রদান করেছেন ড. মুছত্বফা আস-সিবাঈ, আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, ড. উজাজ আল-খত্বীব প্রমুখ। নিম্নে মৌলিক কয়েকটি সমালোচনা খণ্ডন করা হ'ল।
ক. নিরক্ষরতা তৎকালীন আরব জাতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছা.) নিরক্ষর ছিলেন। ছাহাবীগণ যারা হাদীছ বর্ণনা করতেন তারা অধিকাংশই স্মৃতি থেকে হাদীছ বর্ণনা করতেন। নিয়মাতান্ত্রিকভাবে কেউ লিপিবদ্ধ করতেন না, একমাত্র আব্দুল্লাহ ইবুন আমর ইবনুল আছ (রা.) ব্যতীত। হাদীছ শাস্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিমাত্রেরই এই তথ্য জানা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আবূ হুরায়রা (রা.) অত্যন্ত স্মৃতিধর ও মর্যাদাবান ছাহাবী ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল (ছা.)-এর মসজিদেই অবস্থান করতেন এবং রাসূল (ছা.)-এর সাথে আমৃত্যু প্রতিমুহূর্তে সঙ্গ দিয়েছেন। রাসূল (ছা.) তাঁর জন্য বিশেষ দো'আ করেছিলেন। যেমন আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ইন্নি আসমাউ মিনকা হাদীসান কাছিরান আনসাহু?
ফাস্তাতা রিদাআকা ফাবাসাততুহু, কালা: ফাগরাফা বি ইয়াদাইহি, ছুম্মা কালা: দ্বুম্মা, ফাদ্বাম্মাতুহু, فামা নাসিতু শাইয়ান বা'দাহু 'আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার নিকট হ'তে অনেক হাদীছ শুনি কিন্তু ভুলে যাই।' তিনি বললেন, তোমার চাদর মেলে ধর। আমি তা মেলে ধরলাম। তিনি দু'হাত একত্রিত করে তাতে কিছু ঢেলে দেয়ার মত করে বললেন, এটা তোমার বুকের সাথে লাগাও। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর থেকে আমি আর কিছুই ভুলে যাই নি।'
ছাহাবী ইবনু উমার (রা.) বলেন, আনতা ইয়া আবা হুরায়রা কুন্তা আলযামানা লিরাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া আ'লামানা বি হাদীছিহি আমাদের মধ্যে রাসূল (ছা.)-এর সর্বাধিক সান্নিধ্য লাভকারী ব্যক্তি এবং তাঁর হাদীছ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ব্যক্তি।' আবূ হুরায়রা (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযার সাথে যাত্রার সময় ইবনু উমার (রা.) বলেছিলেন, কানা মিম্মান ইয়াহফাযু হাদীছা রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আলাল মুসলিমীন মুসলমানদের জন্য রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহ হেফাযতকারী।'
একদা মদীনায় প্রখ্যাত ছাহাবী আবু আইয়ুব আল-আনসারী (রা.)- কে আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে দেখে জিজ্ঞাসা করা হ'ল আপনি রাসূল (ছা.)-এর এত মর্যাদাবান ছাহাবী হয়ে আবূ হুরায়রা (রা.) হ'তে বর্ণনা করছেন? তিনি বললেন, لأن أحدث عن أبي هريرة أحب إلى من أن أحدث عن النبي صلى الله عليه وسلم 'আমার কাছে রাসূল (ছা.) থেকে (সরাসরি) বর্ণনা করার চেয়ে আবূ হুরায়রা থেকে হাদীছ বর্ণনা করা অধিক প্রিয়তর।' অর্থাৎ আবু হুরায়রা (রা.) অধিক হাদীছ জানতেন বলে তিনি নিজে সরাসরি বর্ণনার চেয়ে তাঁকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
মদীনার প্রখ্যাত তাবেঈ বিদ্বান আবু ছালিহ আস-সাম্মান (১০১হি.) كان أبو هريرة من أحفظ أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ولم يكن بأفضلهم 'আবূ হুরায়রা (রা.) ছাহাবীদের মধ্যে সর্বোত্তম না হ'লেও সর্বাধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন।
ইমাম আশ-শাফেঈ (২০৪ হি.) বলেন, أبو هريرة أحفظ من روی الحديث في دهره 'আবূ হুরায়রা তাঁর যুগে হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছের হাফিয।
ইমাম আল-বুখারী (২৫৬হি.) বলেন, روى عنه نحو الثمانمائة من أهل ) العلم، وكان أحفظ من روى الحديث في عصره মধ্যে) প্রায় ৮ শত বিদ্বান তাঁর নিকট হ'তে হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং তিনি তাঁর যুগের হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছের হাফিয।
ইমাম আল-হাকিম আন-নায়সাপুরী (৪০৫হি.) বলেন, قد تحريت الابتداء من فضائل أبي هريرة رضي الله عنه الحفظه الحديث المصطفى صلى الله عليه وسلم، وشهادة الصحابة والتابعين له بذلك، فإن كل من طلب حفظ الحديث من أول الإسلام وإلى عصرنا هذا فإنهم من أتباعه وشيعته إن هو
أولهم وأحقهم باسم الحفظ 'আমি আবূ হুরায়রা (রা.)-এর মর্যাদাসমূহের বর্ণনা সর্বাগ্রে নিয়ে এসেছি যেহেতু তিনি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের হাফিয ছিলেন এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণ এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। ইসলামের শুরু থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত প্রত্যেক যে ব্যক্তি হাদীছ সংরক্ষণের অভিপ্রায় রাখে, তারা তাঁরই দল ও জোটভুক্ত। তিনি 'হিফয' (মুখস্থকরণ ও সংরক্ষণ) শব্দটির জন্য সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি। অতঃপর তিনি যায়দ ইবনু ছাবিত, আবূ আইয়ূব আল-আনছারী, উবাই ইবনু কা'ব সহ ২৮ জন ছাহাবীর নাম এনেছেন যারা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
هافظ الذهبي হাফিয আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.) বলেন, وكان حفظ أبي هريرة
الخارق من معجزات النبوة 'আবূ হুরায়রা (রা.)-এর স্মৃতিশক্তি ছিল রাসূল (ছা.)-এর একটি মু'জিযা। তিনি বলেন, المسلمون قديما وحديثا بحديثه لحفظه، وجلالته، وإتقانه، وفقهه তাঁর হাদীছকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছে, তাঁর মুখস্থশক্তি, মর্যাদা, সূক্ষ্মতা এবং বিজ্ঞতার কারণে। অন্যত্র বলেন, اليه المنتهى في حفظ ما سمعه من الرسول عليه السلام وأدائه بحروفه 'রাসূল (ছা.) হ'তে শ্রুত হাদীছসমূহ মুখস্থ করা এবং তা শব্দে শব্দে বর্ণনা করার ব্যাপারে তিনি হ'লেন সর্বোচ্চ শিখরে।' তিনি আরও বলেন, وقد كان أبو هريرة وثيق الحفظ، ما علمنا أنه أخطأ في حديث 'আবূ হুরায়রা (রা.) ছিলেন অটুট মুখস্থশক্তির অধিকারী। আমরা জানি না যে তিনি কোন হাদীছ বর্ণনায় ভুল করেছেন।
إبن كثير ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন وقد كان أبو هريرة من الصدق والحفظ والديانة والعبادة والزهادة والعمل الصالح على جانب عظيم হুরায়রা সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি, দ্বীনদারী, ইবাদত, দুনিয়াত্যাগী মনোভাব এবং সৎ আমলের দিক থেকে অনেক উঁচু অবস্থানে ছিলেন।
তিনি নিজে হাদীছ লিপিবদ্ধ না করলেও তাঁর নিকট থেকে কয়েকজন তাবেঈ হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী (২০১৭খ্রি.) বাশীর ইবনু নাহীক, হাম্মام ইবনু মুনাব্বিহসহ ১০ জন তাবেঈর নাম উল্লেখ করেছেন যারা তাঁর নিকট থেকে কোন না কোন সময় হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
উপরোক্ত বর্ণনাসমূহে আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে ছাহাবী, তাবেঈ এবং পরবর্তী যুগের বিদ্বানদের এই ভূয়সী প্রশংসা এবং সাক্ষ্যই প্রমাণ করে যে, রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ সংরক্ষণে তিনি কি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সুতরাং তিনি নিজে হাদীছ লিপিবদ্ধ করেননি, এটি তার বিরুদ্ধে আপত্তির কোন কারণ হ'তে পারে না।
খ. ইসলাম গ্রহণ দেরীতে করলেও ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (ছা.)-এর সাথেই থাকতেন এবং তাঁর সাথে সর্বদা চলা-ফেরা করতেন। তাঁর সাথে হজ্জে গমন করেছিলেন এবং প্রতিটি যুদ্ধেই থাকতেন। সুতরাং তাঁর অবস্থানকালীন মেয়াদ কম হ'লেও তিনি একাধারে দীর্ঘ সময় রাসূল (ছা.)-এর সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলেন। ফলে তাঁর পক্ষে রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে অসংখ্য হাদীছ শোনার সুযোগ হয়েছিল। যেমন এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ (রা.)। একদা তাঁর নিকট এক ব্যক্তি আবূ হুরায়রা (রা.) সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে জিজ্ঞাসা করল, আবু হুরায়রা (রা.) বেশী হাদীহ জানেন না আপনারা?... তখন তিনি আবূ হুরায়রা (রা.) সম্পর্কে বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি যা শুনেছেন যা আমরা শুনিনি এবং তিনি যা জেনেছেন যা আমরা জানতে পারিনি- এমন সব ব্যাপারে তাঁর প্রতি কোন সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। আমরা লোকেরা ছিলাম ব্যস্ত এবং পরমুখাপেক্ষী। আমাদের বাড়ী ছিল, পরিবার ছিল। আমরা রাসূল (ছা.)-এর নিকট দিনের একটা সময় আসতাম এবং চলে যেতাম। কিন্তু আবূ হুরায়রা ছিলেন দরিদ্র মানুষ। তার না ছিল অর্থসম্পদ, আর না ছিল পরিবার, সন্তান- সন্ততি। অতঃপর তিনি বলেন, إنما كانت يده مع يد النبي صلى الله عليه وسلم، وكان يدور معه حيثما دار، ولا يشك أنه قد علم ما لم نعلم وسمع ما لم نسمع، ولم يتهمه أحد منا أنه تقول على رسول الله صلى الله عليه وسلم ما
لم يقل ‘তাঁর হাত থাকত সবসময় রাসূল (ছা.)-এর হাতের সাথে অর্থাৎ তিনি রাসূল (ছা.)-এর অন্তরঙ্গ থাকতেন এবং যেখানেই তিনি যেতেন তিনি তাঁর সাথে যেতেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশের কিছু নেই যে তিনি যা জানেন তা আমরা জানি না এবং যা তিনি শুনেছেন তা আমরা শুনিনি। আমাদের মধ্যে কেউ তার প্রতি এই অপবাদ দেননি যে, তুমি রাসূল (ছা.) সম্পর্কে এমন কথা বল যা তিনি বলেননি।
আবূ হুরায়রা (রা.) নিজেই বলেন, লোকে বলে আবূ হুরায়রা অধিক হাদীছ বর্ণনা করে। (জেনে রাখ,) কিতাবে এই আয়াত যদি না থাকত, তবে আমি একটি হাদীছও পেশ করতাম না। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ আমি সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও পথনির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পরও যারা তা গোপন রাখে, তাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও তাদেরকে লা'নত করে। (প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমার মুহাজির ভাইরা বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ে এবং আমার আনছার ভাইয়েরা জমা- জমির কাজে মশগুল থাকত। আর আবূ হুরায়রা খেয়ে না খেয়ে রাসূল (ছা.)- এর নিবিড় সাহচর্যে থাকত। ফলে সে উপস্থিত থাকত (এমন জায়গায়) যেখানে তারা উপস্থিত থাকত না এবং সে আয়ত্তে রাখত (এমন হাদীছ), যা তারা রাখত না।'
দ্বিতীয়ত, তিনি নিজে হাদীছ শ্রবণের জন্য অত্যন্ত সজাগ এবং উদগ্রীব থাকতেন। তিনি বলেন, صحبت رسول الله صلى الله عليه وسلم
ثلاث سنين لم أكن في سني أحرص على أن أعي الحديث مني فيهن রাসূল (ছা.)-এর সঙ্গ পেয়েছিলাম ৩ বছর। আমার জীবনে হাদীছ মুখস্ত করার আগ্রহ এই তিন বছরের চেয়ে বেশী আর কখনও ছিল না। রাসূল (ছা.) স্বয়ং তাঁর প্রশংসা করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একদা রাসূল (ছা.)- কে প্রশ্ন করা হ'ল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? রাসূল (ছা.) বললেন, আবু হুরায়রা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞাসা করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীছের প্রতি তোমার বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা'আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে। উবাই ইবনু কা'ব (রা.) বলেন, كان أبو هريرة جريئا على النبي صلى الله عليه وسلم يسأله عن أشياء لا نسأله عنها 'আবূ হুরায়রা (রা.) রাসূল (ছা.)-এর নিকাট একজন সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁকে এমন সব প্রশ্ন করতেন, যা আমরা করতে পারতাম না।
তৃতীয়ত, তিনি রাসূল (ছা.)-এর সাথে তিনটি বছর কাটিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর জীবনের শেষ বছরসমূহ। মদীনায় তখন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। ফলে রাসূল (ছা.) তাঁর উম্মতের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানের অখণ্ড অবসর পেয়েছিলেন। আর আব্ হুরায়রা (রা.) এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়টি তাঁর সাথে অবস্থান করায় তাঁর প্রতিটি নকল ও হারকাত স্বচক্ষে দেখেছিলেন ও স্বকর্ণে শুনেছিলেন এবং তা সংরক্ষণ করেছিলেন। ফলে এই তিনটি বছর তাঁর নিকট বহু বছরের সমতুল্য ছিল। ফলে তাঁর হাদীছ বর্ণনার সংখ্যাও অনেক বেশী হয়েছিল। অন্যদিকে তিন বছর অর্থ আরবী মাস অনুযায়ী ১০৬২দিন। এর বিপরীতে তাঁর বর্ণিত মোট হাদীছ সংখ্যা সর্বমোট ৫৩৭৪টি। অর্থাৎ গড়ে তিনি প্রতিদিন ৫টি হাদীছ শুনেছেন, যার মধ্যে কথ্য, কর্মগত ও স্বীকৃতিমূলক হাদীছ সবই রয়েছে। সুতরাং সবমিলিয়ে এই সংখ্যা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। উপরন্ত হাদীছের এই সমষ্টিগত সংখ্যাটি কেবল ছহীহ হাদীছের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর মধ্যে জাল ও যঈফ বর্ণনাও সন্নিবেশিত রয়েছে। আরও রয়েছে এমন হাদীছ, যা বহু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। রয়েছে এমন হাদীছ যা তিনি সরাসরি রাসূল (ছা.) হ'তে শ্রবণ করেননি বরং অপরাপর ছাহাবীদের মাধ্যমে জেনেছেন। সুতরাং এগুলো যদি বাদ দেয়া হয় তবে হাদীছের মূল সংখ্যাও অনেক কমে যাবে। ছহীহুল বুখারীতে তাঁর বর্ণিত পুনরুল্লেখসহ মোট হাদীছের সংখ্যা ৪৪৬টি, যা এক মজলিসেই পাঠ করে শোনানো সম্ভব। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যারা তাঁর বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তারা কেবল সংখ্যাই গণনা করেছেন, পারিপার্শ্বিকতা খতিয়ে দেখেননি। নতুবা তাঁর সম্পর্কে এই আপত্তি তুলতেন না।
ড. মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান আ'যামী (জনা: ১৯৪৩খ্রি.) তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, আবূ হুরায়রা (রা.) বর্ণিত মোট হাদীছ সংখ্যা তাঁর অনুসন্ধান মোতাবেক পুনরাবৃত্তি ছাড়া ১৩৩৬টি। এর মধ্যে আবূ হুরায়রা (রা.) এককভাবে বর্ণনা করেছেন ২২০টি হাদীছ। সম্প্রতি অপর একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, কুতুবে ছিত্তাহ্-এ তাঁর এককভাবে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ১০টি এবং সামগ্রিকভাবে মোট ৪২টি। অর্থাৎ মাত্র এই কয়েকটি হাদীছ তিনি এককভাবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তাঁর বর্ণিত বাকি সকল হাদীছ অন্যান্য ছাহাবী থেকেও বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এই পরিসংখ্যান জানার পর আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অধিক বর্ণনা সম্পর্কে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
মুহাম্মাদ রশীদ রিযা (১৯৩৫খ্রি.) আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অধিক হাদীছ বর্ণনার সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত কারণগুলো ছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছেন- আবূ হুরায়রা (রা.) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রসঙ্গক্রমে কিংবা প্রসঙ্গহীনভাবে হাদীছ বর্ণনা করতেন যাতে মানুষ জ্ঞান আহরণ করতে পারে। যেখানে অন্য ছাহাবীদের ক্ষেত্রে দেখা যেত তারা সাধারণত প্রয়োজন সাপেক্ষে কিংবা কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হ'লে হাদীছ বর্ণনা করতেন। তাছাড়া তিনি রাসূল (ছা.) হ'তে সরাসরি বর্ণনা ছাড়াও অন্যান্য ছাহাবীদের সূত্রেও অনেক হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যে সকল হাদীছ তাঁর ইসলামগ্রহণের পূর্বেই রাসূল (ছা.) হ'তে তাঁরা শুনেছিলেন। মোটকথা তিনি হাদীছের প্রচার ও প্রসারকেই তিনি তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান করে নিয়েছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় বেশী হয়েছে।
গ. আবু হুরায়রা (রা.) বহু সংখ্যক হাদীছ বর্ণনার কারণে কতিপয় ছাহাবী ও তাবেঈ তাঁর প্রতি সন্দেহ পোষণ করেছিলেন, যা আমরা উপরে উল্লেখিত হাদীছসমূহে লক্ষ্য করেছি। আর এই সন্দেহের জবাব আবু হুরায়রা (রা.) নিজেই প্রদান করেছিলেন, যা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে। ড. আস-সিবাঈ (১৯৬৪খ্রি.) বলেন, এটা স্বাভাবিক যে অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ সত্ত্বেও এত অধিক হাদীছ বর্ণনার কারণে কিছু তাবেঈ এবং শহর থেকে দূরবর্তী স্থানে বসবাসকারী ছাহাবীর মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। তারা ভেবেছিলেন যে, বড় বড় ছাহাবীগণ যত হাদীছ বর্ণনা করেন না তার চেয়ে বেশী বর্ণনা করেন আবূ হুরায়রা (রা.)। এটা কীভাবে? এই প্রশ্ন তাঁরা আবূ হুরায়রা (রা.)-কে সরাসরি করেছিলেন। তাঁর প্রতি কুধারণা বা মিথ্যারোপ করার জন্য নয়, বরং জানার কৌতুহল থেকে করেছিলেন। অতঃপর যখন আবূ হুরায়রা (রা.) জবাব দিলেন তাঁরা খুশীমনে স্বীকার করে নিলেন। সুতরাং এই সন্দেহ আবু হুরায়রা (রা.)-এর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সন্দেহ ছিল না। নতুবা ২৫ জন ছাহাবীসহ প্রায় ৮ শত বর্ণনাকারী কিভাবে তাঁর নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন, যদি তাঁর সত্যবাদিতার উপর আস্থা না রাখেন? তিনিই সেই ছাহাবী যাকে মর্যাদাবান ছাহাবীগণ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। যেমন একবার আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রা.)-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি একটি ফৎওয়া জানার জন্য আসলে তিনি তাঁকে বললেন, এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) এবং আবূ হুরায়রা (রা.)-এর নিকট যাও। অতঃপর লোকটি এসে তাঁদের দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলে ইবনু আব্বাস (রা.) বললেন, أفته يا أبا هريرة، فقد جاءتك معضلة 'হে আবু হুরায়রা! আপনি ফৎওয়াটি দিন, আপনার নিকট প্রশ্ন এসেছে।' অতঃপর তিনি ফৎওয়া দানের পর ইবনু আব্বাস (রা.) তাঁর সমর্থনে বললেন, مثل ذلك 'এটাই ফৎওয়া।'
সুতরাং তাঁর বিশ্বস্ততার প্রতি কোন ছাহাবী বা তাবেঈ কুধারণা পোষণ করবেন, তা অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত, আয়েশা (রা.), ইবনু আব্বাস (রা.) প্রমুখ তাঁর কিছু হাদীছ গ্রহণ করেননি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাঁরা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন; বরং এটি হাদীছের মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য কিংবা হাদীছ বর্ণনায় ভুল করলে তা সংশোধন করে দেয়ার প্রয়াস ছিল মাত্র। অনুরূপভাবে উমার (রা.) কর্তৃক তাঁর অধিক হাদীছ বর্ণনার প্রতি নিষেধাজ্ঞাস্বরূপ যে সকল হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তার সনদসূত্র দুর্বল, যা ইতোপূর্বে গত হয়েছে। আর যদি এ সকল বর্ণনা ছহীহও ধরে নেয়া হয়, তবে এর পিছনে উমার (রা.)-এর বিশেষ হিকমত ছিল যে, মানুষ যেন রাসূল (ছা.)- এর হাদীছকে ক্রীড়ার বস্তু হিসাবে পরিণত না করে এবং যাচাই-বাছাই বিহীনভাবে গ্রহণ না করে। তিনি এর দ্বারা কখনই আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি।
ঘ. আবু হুরায়রা (রা.) অধিক হাদীছ বর্ণনা করার সুযোগে হাদীছ জালকারীরা তাঁর নামে অসংখ্য হাদীছ জাল করার সুযোগ পেয়েছে মর্মে প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার এবং ড. আহমাদ আমীন প্রমুখ যে অভিযোগ করেছেন, তার উত্তরে বলা যায় যে, হাদীছ জালকারীদের এই তৎপরতা আবূ হুরায়রা (রা.)- এর সাথেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং আয়েশা (রা.), ইবনু আব্বাস (রা.), ইবনু উমার (রা.) প্রমুখের নামেও অসংখ্য জাল হাদীছ রচনা করা হয়েছে। এর জন্য আবূ হুরায়রা (রা.) বা বিশেষ কোন ছাহাবী দায়ী নন। বরং জালকারীরাই দায়ী। আর তাদের এই অপকর্মের কারণে কোন ছাহাবীর হাদীছকে সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ চিহ্নিত করা অমূলক।
৫. তাঁকে মৃগীরোগী এবং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন হিসাবে আখ্যায়িত করার মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার ঠিক একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন যে পদ্ধতিতে প্রাচ্যবিদরা রাসূল (ছা.)-এর অহী প্রাপ্তিকেও মৃগীরোগের ফলশ্রুতি হিসাবে অপবাদ দিয়েছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) তাঁর নিজের অবস্থা বর্ণনা করছেন যে, (অনেক সময়) মিম্বর এবং আয়েশা (রা.)-এর হুজরার মাঝখানে ক্ষুধায় আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতাম। লোকেরা বলাবলি করত আবূ হুরায়রাকে পাগলামী বা মৃগীরোগ ধরেছে। অথচ আমি পাগল ছিলাম না; বরং ক্ষুধার তাড়নায় আমার এরূপ অবস্থা হ'ত। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে প্রাচ্যবিদগণ তাঁকে রোগী এবং হালকা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করার যে প্রয়াস চালিয়েছেন, তা খুবই দুঃখজনক। আহলুছ ছুফ্ফার অধিবাসী হিসাবে তিনি রাসূল (ছা.)-এর খেদমতে থেকে যৎসামান্য খানা পেলেই তাতে সন্তুষ্ট থাকতেন এবং হাদীছ শ্রবণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে কোথাও যেতেন না। এজন্য কখনও তিনি উপোস থাকতে থাকতে পেটে পাথর চাপা দিয়েও রাখতেন। এসবের কিছুর মধ্যে তাঁর দুনিয়াত্যাগী এবং পরহেযগারিতার ভাবমূর্তিই ফুটে ওঠে। অথচ একে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে প্রাচ্যবিদগণ যে অপবাদ প্রদান করেছেন, তা শুধু তাদের ইসলাম বিদ্বেষী অবস্থানকেই প্রকট করে।
টিকাঃ
২২৮. দ্র. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৯৮-৩৬১; আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ১৪০-২২৭; ড. উজাজ আল-খত্বীব, আবু হুরায়রা রাবিয়াতুল ইসলাম (আবিদীন: মাকতাবা ওয়াহাবাহ, ১৯৮২খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২৭৬; যিয়াউর রহমান আল-আ'যামী, আবু হুরায়রা ফী যূয়ী' মারভিয়াতিহি বি শাওয়াহিদিহা ওয়া হালি ইনফিরাদিহা (অপ্রকাশিত এম.এ. থিসিস) (মক্কা: জামি'আহ মালিক আব্দুল আযীয, ১৯৭২-১৯৭৩খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৭০০; আব্দুল মুনঈম আল-ইযক্ষ্মী, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (বৈরূত: দারুল কলম, ২য় প্রকাশ: ১৯৮১খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৫১৪; আব্দুল কাদির আস-সিন্দী, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (মদীনা: দারুল বুখারী, ১৯৯৭খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৯২; মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ হাওয়া, আবু হুরায়রা আছ-ছাহাবী আল-মুফতারা আলাইহ (কায়রো : দারুশ শা'ব, তাবি), পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৪২।
২২৯. ছহীহুল বুখারী, হা/১১৯, ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯২-২৪৯৩।
২৩০. মুসনাদ আহমাদ, হা/৪৪৫৩, সুনানুত তিরমিযী, হা/৩৮৩৬, সনদ ছহীহ।
২৩১. ইবনু সা'দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৪; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৭।
২৩২. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৭৫।
২৩৩. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
২৩৪. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭৮।
২৩৫. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতী'আব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৭৭১; ইবনু হাজার আল- আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৩।
২৩৬. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১ ৭৩-এর আলোচনা।
২৩৭. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৯৪।
২৩৮. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০৯।
২৩৯. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬১৯।
২৪০. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২১।
২৪১. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১১০।
২৪২. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফীল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৬-৯৯।
২৪৩. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৮-১০৯।
২৪৪. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৭২।
২৪৫. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৯।
২৪৬. ছহীহুল বুখারী, হা/১১৮, ২০৪৭, ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯২-২৪৯৩।
২৪৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৫৯১।
২৪৮. হুহীহুল বুখারী, হা/৯৯, ৬৫৭০।
২৪৯. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৬৬।
২৫০. ইবনুল জাওযী, তালক্বীহু ফুহূমি আহলিল আছার (বৈরূত: দারুল আরকাম, ১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ২৬৩।
২৫১. যিয়াউর রহমান আল-আ'যামী, আবূ হুরায়রা ফী যূয়ী' মারভিয়াতিহি বি শাওয়াহিদিহা ওয়া হালি ইনফিরাদিহা, পৃ. ৭-৮।
২৫২. মুহাম্মাদ রশীদ রিযা, আস-সুন্নাহ ওয়া ছিহহাতুহা ওয়াশ শারী'আহ ওয়া মাতানাতুহা (কায়রো: মাজাল্লাতুল মানার, ১৯তম খণ্ড, শা'বান/১৩৩৪হি.) পৃ. ২৫।
২৫৩. মুহসিন নাবীল, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (রা.), E. http://www.dd-sunnah.net/records/view/action/view/id/1779/
২৫৪. মুহাম্মাদ রশীদ রিযা, আস-সুন্নাহ ওয়া ছিহাতুহা ওয়াশ শারী'আহ ওয়া মাতানাতুহা, পৃ. ২৫।
২৫৫. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩১১-৩১২।
২৫৬. মুওয়াত্ত্বা মালিক, তাহক্বীক মুছত্বফা আল-আ'যামী, হা/২১১০।
২৫৭. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৯৩।
২৫৮. ছহীহুল বুখারী, হা/৭৩২৪।
২৫৯. ছহীহুল বুখারী, হা/৬৪৫২।
📄 সংশয়-৫ : মুজতাহিদ ইমামগণ হাদীছকে গুরুত্ব প্রদান করেন নি
ইমাম আবু হানীফা হাদীছকে গুরুত্ব দিতেন না। ইমাম মালিকও হাদীছের পরিবর্তে নিজ শহরে প্রচলিত আমলকে গুরুত্ব দিতেন।
হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.)-এর শর্তাবলী কঠোর ছিল এবং ইমাম মালিক (১৭৯হি.) মদীনাবাসীর আমলকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করতেন। যদি তারা হাদীছকে ইসলামী শরী'আতের উৎসই মনে করতেন, তবে তারা এই নীতি কেন গ্রহণ করেছিলেন? প্রাচ্যবিদ এবং হাদীছ অস্বীকারকারীগণ এই সূত্র ধরে হাদীছ ইসলামী শরী'আতের উৎস নয় প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
পর্যালোচনা: ক. ইমাম আবু হানীফা বা ইমাম মালিকসহ কোন ইমামই হাদীছ পরিত্যাগের জন্য কিংবা তার প্রতি গুরুত্বহীনতার জন্য এ সকল শর্তারোপ করেননি; বরং তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিত হওয়া। ড. রিফ'আত ফাওযী বলেন, 'দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীতে বিদ্বানদের কাউকে কিছু হাদীছ পরিত্যাগ করতে দেখা যায়, যেমন কোন হাদীছ ছাহাবীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ না হ'লে বা তাঁরা দলীল হিসাবে গ্রহণ না করলে, কিংবা কোন কোন শহরে তার ওপর আমল না করা হ'লে বিশেষত মদীনায় আমল না করা হ'লে। এক্ষেত্রে তারা হাদীছের পরিবর্তে ছাহাবীদের বক্তব্য কিংবা মদীনাবাসীর আমলকে গ্রহণ করতেন। তাদের এই নীতি গ্রহণের পিছনে দু'টি কারণ প্রণিধানযোগ্য: (১) তাঁরা ছাহাবীদের বক্তব্য এবং মদীনাবাসীর আমল এই জন্য প্রাধান্য দিতেন না যে, তা সুন্নাহর মত মর্যাদাবান ও গুরুত্বপূর্ণ। বরং তারা হাদীছটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হয়েছিলেন এবং তাদের কাছে মনে হয়েছিল যে, হাদীছটি রাসূল (ছা.)-এর নয়। হয়ত হাদীছের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন বিচ্ছিন্নতা আছে। (২) তাঁরা মূলত রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের জন্যই এই নীতি অবলম্বন করেছিলেন। কেননা তারা যখন মদীনাবাসীর আমল বা কোন ছাহাবীর বক্তব্যকে গ্রহণ করেন, তখন তা এই বিশ্বাস থেকে গ্রহণ করেন যে আমলটি নিশ্চয়ই রাসূল (ছা.)-এর সূত্রে তাদের নিকট পৌঁছেছে কিংবা ছাহাবী নিশ্চয়ই রাসূল (ছা.)- এর সুন্নাহ থেকেই আমলটি গ্রহণ করেছিলেন।
খ. যদি হাদীছকে গুরুত্বহীনই মনে করবেন, তবে কেন ইমাম মালিক (১৭৯হি.) তাঁর বিখ্যাত হাদীছগ্রন্থ 'মুওয়াত্ত্বা মালিক' সংকলন করলেন? অনুরূপভাবে ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) নিজে কোন হাদীছগ্রন্থ সংকলন না করলেও তাঁর বর্ণিত হাদীছ পরবর্তীকালে সংকলিত হয়েছে। সুতরাং তাঁরা হাদীছকে ইসলামী শরী'আতের অপরিহার্য দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। নতুবা তাঁরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের অনুসরণীয় ইমাম হওয়ারই যোগ্য হ'তেন না।
গ. হাদীছ সম্পর্কে বিস্তর অবগতি থাকা সত্ত্বেও ইমাম আবূ হানীফা (১৫০হি.) হ'তে বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা কম হওয়ার কারণ ছিল তিনি হাদীছ থেকে ফিকহী মাসআলা নির্ণয়ে অধিক ব্যস্ত থাকতেন। একই কারণে ইমাম মালিক (১৭৯হি.) এবং ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.)-ও তাঁদের অবগতির তুলনায় অনেক কম হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যেমনভাবে আবু বকর এবং উমার (রা.)-এর বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা কম, অথচ তাঁদের সমসাময়িক অন্যদের বর্ণনা অনেক বেশী।
ঘ. একথা অনস্বীকার্য যে, ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) হাদীছের ব্যাপারে কম মনোযোগী ছিলেন মর্মে বিদ্বানদের মধ্যে প্রাথমিক যুগ থেকেই একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। যেমন খত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) তাঁর 'তারীখু বাগদাদ'-এ এমন অনেক বর্ণনা এনেছেন যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি হাদীছের ব্যাপারে গুরুত্বহীনতা প্রকাশ করেছেন, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে হাদীছের প্রতি অবহেলা প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) চার শতেরও বেশী হাদীছ পরিত্যাগ করেছেন। তিনি ওয়াক্বী' ইবনুল জারাহ (১৯৭হি.) হ'তে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি দেখেছি আবু হানীফা ২০০টি হাদীছ পরিত্যাগ করেছেন। অনুরূপভাবে ইবনু আবী শায়বাহ (২৩৫হি.) তাঁর 'আল-মুছান্নাফ' গ্রন্থে هذا ما خالف به أبو حنيفة الأثر الذي جاء عن الرد على أبي حنيفة অধ্যায়ে ১২৫টি মাসআলা উল্লেখ করেছেন যেখানে তিনি হাদীছ বিরোধী ফৎওয়া প্রদান করেছেন। এছাড়া ইমাম আবূ হানীফার সংগৃহীত হাদীছও অতি অল্পসংখ্যক দাবী করেছেন অনেক বিদ্বান। যেমন ইবনু হিব্বান (৩৫৪হি.) বলেন, তিনি মাত্র ১৩০টি হাদীছ বর্ণনা করেছিলেন। ইবনু খালদুন (৮০৮খ্রি.) বলেন, আবু حنيفة رضي الله تعالى عنه يقال بلغت روايته إلى سبعة عشر حديثا أو نحوها সম্পর্কে বলা হয় যে, তাঁর বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা ১৭টি বা অনুরূপ।
এ সকল প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, প্রথমত, ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) আহলুর রায় বা রায়পন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ফিকহী মাসআলা নির্ণয়ে অধিক মশগুল থাকা এবং কিয়াস বা রায় অবলম্বনের কারণে সমকালীন মুহাদ্দিছদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ফলে একদল মানুষ তাঁর গুণগ্রাহী যেমন ছিল, তেমনি তাঁর প্রতি বিরাগভাজন মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) তাঁর প্রতি বিরাগভাজনদের এ সকল মতামত কেবল একজন ঐতিহাসিক হিসাবে স্বীয় গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। তিনি ইমাম আবু হানীফার মর্যাদাহানী করতে চেয়েছেন, তা নয়।
দ্বিতীয়ত, এ সকল মন্তব্যের অধিকাংশেরই সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় না এবং সুস্থ বিবেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয় না। আর সত্যতা নিশ্চিত হ'লেও তা প্রমাণের ভার মতামত প্রকাশকারীদের উপরই বর্তাবে। কেননা আমাদের দৃষ্টিতে এ সকল মন্তব্য যথার্থ নয়। এর কারণ হ'ল ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) থেকে অসংখ্য এমন মত প্রকাশিত হয়েছে, যা হাদীছের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা প্রকাশ করে। খত্ত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) স্বয়ং এমন অনেক মত উদ্ধৃত করেছেন যা হাদীছের পক্ষে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে।
যেমন তিনি ইবনুছ ছাবাহ হ'তে বর্ণনা করেন, وكان إذا وردت عليه مسأل
فيها حديث صحيح اتبعه، وإن كان عن الصحابة والتابعين، وإلا قاس وأحسن القياس 'যখনই তাঁর সম্মুখে কোন মাসআলায় ছহীহ হাদীছ পেশ করা হ'ত তিনি তার অনুসরণ করতেন এমনকি যদি তা কোন ছাহাবী বা তাবেঈ'র বক্তব্য হয়। নতুবা তিনি কিয়াস করতেন এবং যথার্থভাবেই করতেন।"
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, সুফিয়ান আছ-ছাওরী (১৬১হি.)-কে ফিকহী বিষয়ে তাঁর নীতি সম্পর্কে ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) বলেন, آخذ بكتاب الله فما لم أجد فبسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، فإن لم أجد في كتاب الله ولا سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، أخذت بقول أصحابه
ফিক্হী বিষয়ে প্রথমত কিতাবুল্লাহ থেকে হুকুম গ্রহণ করি। যদি আল্লাহর কিতাবে না পাওয়া যায় তবে রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহ থেকে হুকুম গ্রহণ করি। আর যদি আল্লাহর কিতাবেও না পাওয়া যায় এবং রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহেও না পাওয়া যায়, তবে আমি ছাহাবীদের বক্তব্য থেকে দলীল গ্রহণ করি...।'
এছাড়া তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত মত হ'ল- إذا صح الحديث فهو مذهبي 'যখন কোন হাদীছ ছহীহ প্রমাণিত হবে, তখন সেটিই আমার মাযহাব।' সুতরাং হাদীছ ও সুন্নাহর প্রতি এমন বলিষ্ঠ নীতি গ্রহণকারী একজন ব্যক্তি হাদীছের প্রতি তাচ্ছিল্য করবেন এবং গুরুত্বহীনতা প্রকাশ করবেন, তা অবিশ্বাস্য। অতএব সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর সম্পর্কে সবচেয়ে ন্যায়ানুগ কথা হবে তিনি কখনও ছহীহ হাদীছ পাওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিত্যাগ করেননি। ইবনু তায়মিয়া (৭২৮হি.) বলেন, ومن ظن بأبي حنيفة أو غيره من أئمة المسلمين أنهم يتعمدون مخالفة الحديث الصحيح لقياس أو غيره فقد أخطأ
عليهم وتكلم إما بظن وإما هوى 'যে ব্যক্তি আবু হানীফা অথবা ইসলামের অন্যান্য ইমামদের সম্পর্কে ধারণা করে যে, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ছহীহ হাদীছের বিরোধিতা করেছেন, কিয়াস বা অন্য কোন কারণে, সে নিঃসন্দেহে তাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করেছে এবং তাদের সম্পর্কে কুধারণা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতামূলক মন্তব্য করেছে।
তৃতীয়ত, ওয়াক্বী' ইবনুল জারাহ (১৯৭হি.), ইবনু আবী শায়বাহ (২৩৫হি.) প্রমুখের মতে তিনি যে সকল মাসআলায় হাদীছের বিরোধিতা করেছেন, তা তাঁর ইচ্ছাকৃত ছিল না। বরং হয়ত সে বিষয়ক হাদীছগুলি তাঁর শর্ত মোতাবেক ছহীহ প্রমাণিত হয়নি কিংবা হাদীছটি তাঁর নিকট পৌঁছেনি কিংবা হাদীছটি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হওয়ায় গ্রহণ করেননি। খবর ওয়াহিদের গ্রহণে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক শর্তসমূহ গ্রহণও এর পিছনে একটি বড় কারণ ছিল। বিশেষত বাগদাদে হাদীছ জালকরণের ফিৎনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ইরাক পরিণত হয়েছিল হাদীছ জালকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে। এমনকি ইরাককে বলা হ'ত دار ضرب الحديث 'হাদীছ ভাঙ্গার কেন্দ্র'। ফলে স্বভাবতই এই পরিস্থিতি তাঁকে হাদীছ গ্রহণের ক্ষেত্রে অতীব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে এবং হাদীছ গ্রহণে কঠিন শর্তারোপ করতে বাধ্য করেছিল, যেন দ্বীনের মধ্যে বাতিল বক্তব্য ও আমলের অনুপ্রবেশ না ঘটে। আর সম্ভবত এজন্যই তিনি হাদীছ সংগ্রহের কাজে অন্যদের মত তেমন একটা সফরে বের হননি। সর্বোপরি হাদীছ সম্পর্কে তাঁর গৃহীত নীতিতে কিছু ভুল থাকতেই পারে। ইয়াযীদ ইবনু হারূন বলেন, أبو حنيفة رجل من الناس، خطوه كخطاً الناس وصوابه كصواب الناس 'ইমাম আবূ হানীফা (১৫০হি.) একজন মানুষ। মানুষ হিসাবে তিনি ভুলও করেছেন এবং ঠিকও করেছেন।' কিন্তু এ কারণে তাঁকে হাদীছ বিরোধী কিংবা হাদীছের প্রতি কম গুরুত্ব প্রদর্শনকারী হিসাবে সাব্যস্ত করা যায় না।
চতুর্থত, পূর্ববর্তী বিদ্বানগণ যেমন ইবনু হিব্বান (৩৫৪হি.), ইবনু খালদূন (৮০৮খ্রি.) প্রমুখ বিদ্বানের মতানুযায়ী তিনি অতি স্বল্পসংখ্যক হাদীছ অবগত ছিলেন, তা বিস্ময়কর। বাগদাদকে জাল হাদীছ রচনার সূতিকাগার যখন বলা হয়েছে, তখন নিশ্চিতভাবে সেখানে হাদীছ বর্ণনার ব্যাপক প্রচলন ছিল। সুতরাং ইমাম আবূ হানীফার মত একজন বিখ্যাত অনুসরণীয় ইমাম এবং ফকীহের হাদীছ সম্পর্কে অবগতি না থাকা বাস্তবতার বিপরীত প্রতীয়মান - হয়। বিশেষত তাঁর নিজস্ব কোন রচনা না থাকলেও তাঁর বর্ণিত হাদীছসমূহ তাঁর ছাত্রগণ সংকলন করেছেন, যা আবুল মুআইয়িদ মুহাম্মাদ ইবনু মাহমূদ আল-খাওয়ারিযিমী (৬৬৫হি.) একত্রে সংকলন করেছেন جامع مسانيد الإمام الأعظم শিরোনামে। এটি ১৫টি মুসনাদের সংকলন এবং প্রায় পাঁচ শত হাদীছ সংকলিত হয়েছে। এছাড়া ইমাম আবূ হানীফার ছাত্র ও শিষ্যদের হাদীছ গ্রন্থ সংকলন থেকেও প্রতীয়মান হয় যে কুফায় হাদীছের যথেষ্ট প্রচলন ছিল। বিশেষ করে ইবনু মাসঊদ (রা.), আলী (রা.), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.) প্রমুখ ছাহাবী যে শহরে অবস্থান করেছিলেন, বিশিষ্ট তাবেঈ মাসরূক ইবনু আজদা', আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ, আলক্বামাহ প্রমুখ তাবেঈ যে শহরের বাসিন্দা ছিলেন, সেই শহরে হাদীছের এমন দৈন্যদশা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে হিজাযের মত হাদীছ বর্ণনার ব্যাপক প্রচলন ছিল না বলে সম্ভবত কৃষ্ণায় তুলনামূলক হাদীছের প্রসার কম হয়েছিল।
টিকাঃ
২৬০. ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফীল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ১৪-১৫।
২৬১. আবূ ইউসূফ, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, আবু নাঈম আল-আস্ফাহানী সহ বেশ কয়েকজন বিদ্বান ইমাম আবূ হানীফা বর্ণিত হাদীছ সমূহের সংকলন করেন 'আল-মুসনাদ' নামে। আবুল মুআইয়িদ মুহাম্মাদ ইবনু মাহমূদ আল-খাওয়ারিযিমী (৬৬৫হি.) এমন মোট ১৫টি মুসনাদ একত্রে জমা করে সংকলন করেন ا جامع المسانيد
২৬২. আবূ যাহ্, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২৮৪-২৮৫।
২৬৩. ড. মুহাম্মাদ বালতাজী, মানাহিজুত তাশরী' আল-ইসলামী ফিল কারনিছ ছানী আল- হিজরী (কায়রো: দারুস সালাম, ২০০৭খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২২১-২২৩।
২৬৪. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৩৮৫-৩৯৪।
২৬৫. তদেব, পৃ. ৩৯০।
২৬৬. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুছান্নাফ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২৭৭-৩২৫।
২৬৭. ইবনু হিব্বان, আল-মাজরহীন (আলেপ্পো : দারুল ওয়াঈ', ১৩৯৬হি.), ৩য় খণ্ড, পৃ. ৬৩।
২৬৮. ইবনু খালদুন, তারীখু ইবনু খালদুন (বৈরূত : দারুল ফিকর, ২য় প্রকাশ : ১৯৮৮খ্রি.), ১্ম খণ্ড, পৃ. ৫৬১।
২৬৯. ইবনু হাজার আল-হায়ছামী আল-মাক্কী, আল-খাইরাতুল হিসান ফী মানাক্কিবিল ইমাম আল-আ'যام, (মিসর : মাতবা'আতুস সা'আদাহ, ১৩২৪হি.), পৃ. ৭৯।
২৭০. খত্বীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৩৪০।
২৭১. তদেব, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৩৬৫।
২৭২. ইবনু তায়মিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২০শ খণ্ড, পৃ. ৩০৪।
২৭৩. ইবনু তায়মিয়া, রফ'উল মালাম আন আইম্মাতিল আ'লাম, পৃ. ৯-৩৪; আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৪২০-৪২১; ড. মুহাম্মাদ কাসিম আব্দুহু আল-হারিছী, মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা বায়নাল মুহাদ্দিছীন (মক্কা: মাতাবিউছ ছাফা, ১৪১৩হি.), পৃ. ৩১৮।
২৭৪. আবূ যাহু, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২৪০; আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৪০৪।
২৭৫. খতীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৩৬৬।
২৭৬. ইণ্ডিয়ার হায়দারাবাদ, দাক্ষিণাত্য থেকে ২ খণ্ডে প্রকাশিত। প্রকাশকাল: ১৩৩২ হিজরী।
২৭৭. আবূ যাহ্, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২৮৪-২৮৫; আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৪১৪-৪১৫; মুবাশির হোসাইন, আহাদীছে আহকাম আওর ফুকাহায়ে ইরাক (ইসলামাবাদ: ইদারায়ে তাহকীকাতে ইসলামী, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ, ২০১৫খ্রি.), পৃ. ২৭৯-২৮০।