📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-১ : হাদীছের সংরক্ষণ পদ্ধতি ছিল শ্রুতি ও স্মৃতিবাহিত

📄 সংশয়-১ : হাদীছের সংরক্ষণ পদ্ধতি ছিল শ্রুতি ও স্মৃতিবাহিত


হাদীছ অস্বীকাকারী এবং প্রাচ্যবিদদের একটি সাধারণ যুক্তি হ'ল, হাদীছ মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছে। অতএব এতে বর্ণনাকারী স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে নিশ্চয়ই ভুল করবেন। মানুষ মাত্রই এমন ভুল হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং হাদীছ সংকলনের যুগ পর্যন্ত হাদীছ সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে না। এজন্য হাদীছ শরী'আতের কোন দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

পর্যালোচনা:

ক. প্রাথমিক যুগে মুখস্থকরণ এবং শ্রুতিবর্ণনাই ছিল জ্ঞান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম। বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে লেখনীকে মুখস্তকরণের চেয়ে অধিকতর বিশ্বস্ত এবং প্রামাণিক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হ'ল যে, লেখনীতেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে কিংবা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করতে পারলে বিনষ্টও হয়ে যায়। এ জন্য মুহাদ্দিছগণকে দেখা যায় যে, তারা লেখনীর চেয়ে শ্রুতিবর্ণনাকে অধিক প্রাধান্য দিতেন। তারা বর্ণনাকারীদের বর্ণনা গ্রহণের সময় তাদের শ্রুত বর্ণনা (সিমা') সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছেন, অথচ লিখিত বর্ণনা (মুকাতাবা, মুনাওয়ালা) গ্রহণে মতবিরোধ করেছেন। তারা কোন বর্ণনাকারীর নিকট থেকে হাদীছ গ্রহণই করতেন না যতক্ষণ না তার স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে তারা আশ্বস্ত হতেন। এমনকি কেবল স্মৃতিশক্তির তারতম্যের কারণে তারা হাদীছকে 'ছহীহ' ও 'হাসান' দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। সুতরাং হাদীছ শাস্ত্রে 'স্মৃতিশক্তি' কোন সাধারণ বিষয় নয় বরং এটি হাদীছ বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত উপকরণ (Technical term)। মুহাদ্দিছগণ 'আসমাউর রিজাল' এবং 'জারাহ ও তা'দীল' শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন এই উদ্দেশ্যে, যাতে বর্ণনাকারীদেরকে উক্ত মানদণ্ডে যাচাই করা সম্ভব হয়। কারও স্মৃতিশক্তি যদি ত্রুটিপূর্ণ এবং দুর্বল হত, তবে তার হাদীছ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই গৃহীত হ'ত না, যদি না অপর কোন শক্তিশালী হাদীছ তার সপক্ষে না থাকত।

এখানে আরও লক্ষ্যণীয় যে, এসকল বর্ণনাকারীদের স্মৃতিশক্তিকে সাধারণ কিচ্ছা বর্ণনাকারীর মেধার সাথে তুলনা করার সুযোগ নেই। কেননা যারা হাদীছ মুখস্থ করতেন এবং অপরের কাছে পৌঁছে দিতেন তাদের নৈতিক অবস্থান এমন ছিল যে, তারা হৃদয়ের পূর্ণ আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে উপলব্ধি করতেন যে তাদের দায়িত্বটা কত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জানতেন তাদের সামান্য অবহেলা ও ভুলের কারণে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদেরকে নিন্দিত হতে হবে। এই বিশ্বাস তাদেরকে এক প্রগাঢ় নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে সর্বদা উজ্জীবিত রাখত। একজন সাংবাদিক কোন রাষ্ট্রপ্রধান সম্পর্কে সংবাদ তৈরী করার সময় যেমন কঠোর সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা অবলম্বন করে থাকে, তার চেয়ে বহুগুণ দায়িত্বশীলতা ও অভিনিবেশ সহকারে ছাহাবী ও তাবেগণ তাদের প্রাণপুরুষ রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ প্রচার করেছেন। এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্ত বতাকে যারা অস্বীকার করেন, তারা যেন দিনের আলোকে হস্ততালু দিয়ে আড়াল করতে চান।

ছাহাবীগণ রাসূল (ছা.)-এর প্রতিটি পদক্ষেপের অনুসরণ করতেন। এমনকি হাদীছ বর্ণনার সময় যে ভঙ্গিতে তিনি বর্ণনা করেছেন, সেই বর্ণনাভঙ্গিকে পর্যন্ত তারা প্রজন্ম পরম্পরায় নকল করতেন। যা হাদীছ শাস্ত্রে 'মুসালসাল হাদীছ১৮ নামে পরিচিত। তারা কোন হাদীছের অর্থ বুঝতে না পারলে তা পুনরায় জিজ্ঞাসা করে স্পষ্ট হয়ে নিতেন। তারা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন কিভাবে ও কোন পরিবেশে রাসূল (ছা.) কী বলেছেন এবং কী করেছেন। সুতরাং তারা প্রত্যেকেই স্বয়ং ছিলেন হাদীছের লিখিত পাণ্ডুলিপির সমতুল্য। কেবল একটি নয় বরং শত শত লিখিত পাণ্ডুলিপি। মানাযির আহসান গিলানী (১৮৯২-১৯৫৬খ্রি.) তাই যথার্থই বলেছেন, ছাহাবীদের সংখ্যা এবং তাদের মুখস্থশক্তি এবং আমলের উপর তাদের চূড়ান্ত আগ্রহের বাস্তবতাকে সামনে রাখলে এটা বলা মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না যে, আমাদের ঐ ইতিহাস যার নাম হাদীছ, তার পূর্ণাঙ্গ এবং অপূর্ণাঙ্গ জীবন্ত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা রাসূল (ছা.)-এর যুগেই লাখের কোঠায় পৌঁছে গিয়েছিল।

অতএব এটি ভাবার কোন অবকাশ নেই যে, হাদীছ শাস্ত্র প্রাথমিক যুগে লিখিত সংকলিত না হওয়ায় তা সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় নি; বরং তৎকালীন সমাজে মুখস্থকরণই যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও নিরাপদ মাধ্যম ছিল, তার বড় প্রমাণ হ'ল মুহাদ্দিছগণ শ্রুতিবর্ণনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন এবং স্মৃতিশক্তিকে হাদীছ বর্ণনাকারীদের প্রধানতম যোগ্যতা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।

উচ্ছ্বলবিদ বা ইসলামী আইনজ্ঞদের নিকটও লিখিত হাদীছের তুলনায় শ্রুত হাদীছের গুরুত্বই অধিক। যেমন ইমাম আমেদী বলেন, أن تكون رواية أحد الخبرين عن سماع من النبي عليه السلام، والرواية الأخرى عن كتاب، فرواية السماع أولى لبعدها عن تطرق التصحيف والغلط. হাদীছের মধ্যে একটি হাদীছ যদি হয় রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে শ্রুত এবং অপরটি হয় কিতাবে লিপিবদ্ধ; তবে ভুল এবং ওলট-পালট হওয়ার সম্ভবনা থেকে দূরবর্তী হওয়ার কারণে শ্রুত বর্ণনাটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে'।

সুতরাং লেখনী জ্ঞান সংরক্ষণের একমাত্র মাধ্যম নয় এবং সর্বোত্তম মাধ্যমও নয়। বরং মুখস্থকরণ ও হৃদয়াঙ্গমই জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। বিশেষ করে প্রাচীনকালে যখন লেখনীর কোন প্রচলন ছিল না, তখন শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে ধারণ করাই একমাত্র এবং সর্বাধিক শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

খ. জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য লিপিবদ্ধকরণ শ্রুতিবর্ণনার চেয়ে অধিকতর নিশ্চয়তা বহন করে না। কেননা জ্ঞান সংরক্ষণের সঠিক উপায় হ'ল, একজন সুপরিচিত ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি অপর একজন সুপরিচিত ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির নিকট তা পৌঁছে দেবেন, সেটা শ্রুতিবর্ণনার ভিত্তিতে হোক, কিংবা লেখনীর ভিত্তিতে হোক। যদি দু'টি একত্রিত হয় তবে নিঃসন্দেহে তা সংরক্ষণের অধিকতর শক্তিশালী উপায়। কিন্তু যদি ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা হারিয়ে যায়, তবে শ্রুতিবর্ণনা বা লেখনীর কোন মূল্য থাকে না; বরং এক্ষেত্রে যদি লেখক ছাড়া শুধুমাত্র লেখনী থাকে, তবে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। কেননা লেখকের নাম-পরিচয় ছাড়া লেখনীর কোনই মূল্য নেই। যার বাস্ত ব প্রমাণ হ'ল ইহুদী এবং খৃষ্টানগণ, যারা তাওরাত ও ইঞ্জিল লিপিবদ্ধ করত, কিন্তু ন্যায়পরায়ণতা না থাকায় তারা কিতাবের মধ্যে নানা বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটিয়েছিল। এমনকি এর লেখকদের পরিচয়ও সঠিকভাবে জানা যায় না। ফলে এই কিতাবদ্বয়ের কোন কিছুই আমাদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না বরং তা আমরা মূল আল্লাহ প্রেরিত কিতাবের বিরোধী বলে বিশ্বাস করি। আল্লাহ নিজেই তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ জন্য, যারা নিজেদের হাতে কিতাব লেখে এবং বলে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হ'তে আগত। যাতে তার বিনিময়ে সামান্য কিছু অর্থ রোজগার করতে পারে। অতএব দুর্ভোগ, তাদের হস্ত যা লিপিবদ্ধ করেছে তার জন্য এবং দুর্ভোগ তাদের উপার্জনের জন্য। এজন্য মুহাদ্দিছগণ সর্বাগ্রে বর্ণনাকারীর পরিচয়, তার বিশ্বস্ততা এবং মুখস্থ ও হৃদয়াঙ্গমের শক্তি যাচাই করতেন, তারপর তার বর্ণনা গ্রহণ করতেন।

গ. শুধু হাদীছের ক্ষেত্রেই নয়, বরং প্রাচীন আরবী কবিতা, বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, বংশলতিকা প্রভৃতি সংরক্ষণেও তৎকালীন আরব সমাজ সব সময় শ্রুতি বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। উদাহরণস্বরূপ আরব কবিদের কবিতাসমূহও ৩য় শতাব্দী হিজরীর পূর্বে গ্রন্থাবদ্ধ হয়নি। এগুলো মানুষের স্মৃতিতে কিংবা কারো ব্যক্তিগত চিরকুটে সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তী প্রজনো আল-আসমারী (২১৩হি.), আবু উবাইদাহ (১৫৭হি.) প্রমুখের মাধ্যমে তা গ্রন্থাবদ্ধ হয়। শুধুমাত্র ইসলামী জ্ঞান ও কবিতার ক্ষেত্রেই নয় বরং ইতিহাস, ব্যাকরণ, সাহিত্য, দর্শন ও কলার বিভিন্ন শাখাতেও তা সমভাবে মূল্যায়িত হত। এজন্য মুসলিম সমাজে আগাগোড়াই স্মৃতিনির্ভর জ্ঞান প্রাধান্য পেয়েছে। এমনকি আধুনিক যুগে লেখনীর যাবতীয় উপায়-উপকরণ উপস্থিত এবং মুখস্থকরণের প্রয়োজনীয়তা নিতান্তই গৌণ; কিন্তু তা সত্ত্বেও সারা বিশ্বে লক্ষ-কোটি কুরআনের পূর্ণ হাফেয রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত তৈরী হচ্ছে। সুতরাং যে যুগে লিখিত সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল অপ্রচলিত এবং মুখস্থকরণই ছিল জ্ঞান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম, সে যুগে হাদীছ মুখস্থকরণের মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়েছিল, তাতে বিস্ময়ের কি রয়েছে? সমগ্র কুরআন মুখস্থকরণ যদি লক্ষ-কোটি মানুষের পক্ষে এই যুগেই সম্ভব হয়, তবে যে যুগ ছিল নিখাঁদ স্মৃতি নির্ভরতার যুগ, সে যুগে হাদীছ মুখস্থ রাখা কী এতই সুকঠিন ব্যাপার ছিল?

ঘ. পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিছগণ হাদীছ লিখিতভাবে সংকলিত হওয়ার পরও শ্রুত বস্তুকে একচেটিয়াভাবে প্রাধান্য দিতেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হ'ল ২য় শতকের শুরু থেকেই প্রায় প্রত্যেক মুহাদ্দিছের নিকট হাদীছের লিখিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত থাকলেও তারা অপরের নিকট হাদীছ বর্ণনা করতেন 'আমাদেরকে বলেছেন' (أخبرنا) কিংবা 'আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন' (حدثنا) প্রভৃতি শ্রুতিবাচক শব্দ দ্বারা। অর্থাৎ তারা পুস্তকের চেয়ে ব্যক্তিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন। তারা পাণ্ডুলিপি নির্ভর জ্ঞান এবং এতদসংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তির সম্ভবনা দূর করার জন্য পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি হাদীছটি বর্ণনাকারী উস্তাদ থেকে স্বকর্ণে শ্রবণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। এজন্য হাদীছ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গ্রন্থের বা পাণ্ডুলিপির উদ্ধৃতি প্রদানের নিয়ম ছিল না। বরং বর্ণনাকারী শিক্ষকের নাম উল্লেখ করার নিয়ম ছিল। মুহাদ্দিছদের পরিভাষায় 'আমাদেরকে বলেছেন' (أخبرنا) কিংবা 'আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন' (حدثنا) পরিভাষাটির অর্থ হ'ল আমি তাঁর পুস্তকটি তাঁর নিজের কাছে বা তাঁর অমুক ছাত্রের কাছে পড়ে স্বকর্ণে শুনে তা থেকে হাদীছটি উদ্ধৃত করছি।

এজন্য ইমাম বুখারী (২৫৬হি.) তাঁর গ্রন্থে হাদীছ বর্ণনার সময় ইমাম মালিক সূত্রে অনেক হাদীছ বর্ণনা করলেও কোথাও মুওয়াত্ত্বা মালিক গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেননি, বরং সরাসরি যারা ইমাম মালিকের মুখ থেকে শুনেছেন তাদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ ছহীহ বুখারীর একটি হাদীছ - حدثنا عبد الله بن مسلمة، عن مالك، عن أبي الزناد، عن الأعرج، عن أبي هريرة: أن رسول الله صلى الله عليه وسلم ذكر يوم الجمعة، فقال: فيه ساعة، لا يوافقها عبد مسلم، وهو قائم يصلي، يسأل الله تعالى شيئا، إلا أعطاه إياه وأشار بيده يقللها 'আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসলামা, তিনি মালিক থেকে, তিনি আবুয যিনাদ থেকে, তিনি আ'রাজ থেকে, তিনি আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল (ছা.) শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই দিনের মধ্যে একটি সময় রয়েছে কোন মুসলিম যদি সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ছালাতরত অবস্থায় আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন। রাসূল (ছা.) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন যে, এই সুযোগটি স্বল্প সময়ের জন্য। '

একই হাদীছ ইমাম মুসলিম (২৫৬হি.) যখন উল্লেখ করছেন, তখন حدثنا يحيى بن يحيى، قال: قرأت على مالك، ح وحدثنا قتيبة بن سعيد، عن مالك بن أنس عن أبي الزناد، عن الأعرج، عن أبي هريرة অর্থাৎ তিনি দুইটি সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন একটি হ'ল ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া থেকে যিনি ইমাম মালিকের নিকট হাদীছটি পাঠ করে ইমাম মুসলিমের নিকট বর্ণনা করেছেন আর অপর সূত্রে কুতাইবা ইবনু সাঈদ ইমাম মালিকের নিকট থেকে শ্রবণ করে তাঁকে সংবাদ দিয়েছেন। এখানেও দেখা যায় ইমাম মুসলিম 'মুওয়াত্ত্বা মালিক' কিতাব থেকে উদ্ধৃতি না দিয়ে সরাসরি বর্ণনাকারীর শ্রুতির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। অপচ সেই বর্ণনাকারী নিজেই বলছেন যে, তিনি ইমাম মালিকের নিকট হাদীছটি লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠ করেছিলেন।

অনুরূপভাবে আবু দাউদ (২৭৫হি.), আত-তিরমিযী (২৭৯হি.), আন-নাসাঈ (৩০৩হি.), ইবনু হিব্বান (৩৫৩হি.), আত-তাবারানী (৩৬০হি.) সকলেই হাদীছটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন কিন্তু কেউই 'মুওয়াত্ত্বা মালিক' কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দেন নি। এমনকি পঞ্চম শতকের মুহাদ্দিছ আবু বকর আল-বায়হাক্বী (৪৫৮হি.) হাদীছটি কয়েকটি সূত্রে ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেন। কিন্তু কোথাও 'মুওয়াত্ত্বা মালিক'-এর উদ্ধৃতি দেননি। যেমন: وأخبرنا علي بن أحمد بن عبدان، أنبأ أحمد بن عبيد الصفار، ثنا إسماعيل القاضي، ثنا عبد الله هو القعنبي وأخبرنا محمد بن عبد الله الحافظ، ثنا علي بن عيسى، ثنا موسى عن مالك أخبرنا أبو عبد - بن محمد الذهلي، ثنا يحيى بن يحيى قال: قرأت على مالك الله الحافظ، وأبو زكريا بن أبي إسحاق المزكي، وأبو بكر بن الحسن القاضي قالوا: ثنا أبو العباس محمد بن يعقوب، أنبأ الربيع بن سليمان، أنبأ الشافعي، أنبأ مالك প্রভৃতি সনদ।

এ সকল সনদে ইমাম বায়হাক্বী ধারাবাহিক অন্তত ৮টি স্তরের বর্ণনাকারীর নাম ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তারা সকলেই )أخبرنا( কিংবা )حدثنا( শব্দ দ্বারা শ্রুতিবর্ণনা করেছেন। এর অর্থ তারা কেবল মৌখিকভাবে শুনেছেন তা নয়, বরং পুস্তকটি ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারীকে বিশুদ্ধভাবে পাঠ করতে শুনেছেন কিংবা বর্ণনাকারী তাঁর নিকট নিজেই পাঠ করেছেন। এভাবে প্রত্যেকেই তাঁর ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারীর নিকট সরাসরি শ্রবণ করেছেন কিংবা তাঁর নিকট পুস্তকটি পাঠ করেছেন। এটাই হ'ল মর্মার্থ। কেননা ইমাম মালিকের 'মুওয়াত্তা' কিতাবটি তখন বাজারে কিনতে পাওয়া যেত। বাজার থেকে সেই পাণ্ডুলিপি কিনে সরাসরি তার উদ্ধৃতি দিয়েই মুহাদ্দিছগণ হাদীছটি উল্লেখ করতে পারতেন। কিন্তু সতর্কতাবশত এবং লিপিবদ্ধ বস্তুতে ভুল-ভ্রান্তি থাকার আশংকায় তারা হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির ওপর এককভাবে নির্ভর করেননি; বরং ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি প্রজন্যে পাণ্ডুলিপিটি পাঠকারী কিংবা শ্রবণকারীদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আর এভাবে মূল পুস্তকটি উপস্থিত থাকলেও মুহাদ্দিছগণ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই পুস্তকের উদ্ধৃতি না দিয়ে শ্রুতির উদ্ধৃতি দিতেন।

স্মৃতিনির্ভর এ পদ্ধতি বর্তমান যুগে প্রচলিত গ্রন্থের নাম এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখ করে যে তথ্যসূত্র প্রদান করা হয়, তার চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম ও নিরাপদ। যার প্রমাণ হ'ল- ইহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মগ্রন্থ সংকলন করতেন। কিন্তু তবুও তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে পড়েছে এবং তাতে এত বেশী ভুল রয়েছে যা গণনা করে শেষ করা যায় না। যে কোন ইহুদী ও খৃষ্টান পণ্ডিত এ কথা একবাক্যে স্বীকার করেন; কিন্তু মুসলমানরা তাদের ধর্মগ্রন্থে এই ভুল-ভ্রান্তি ও বিকৃতি প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেননা তারা মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করতেন।

এছাড়া এখান থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, হাদীছ ৩য় শতকে লিপিবদ্ধ হয় নি, বরং ১ম শতাব্দী থেকেই লিখিতভাবে সংকলিত হয়েছে। কিন্তু মুহাদ্দিছগণ সে পাণ্ডুলিপিকে তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার না করে বর্ণনাকারীদেরকে তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার করতেন। মুহাদ্দিছদের এই পদ্ধতি না জানার কারণে সম্পূর্ণ অজ্ঞতাবশত ধারণা করা হয় যে, হাদীছ শত শত বছর ধরে কেবল শ্রুতিবর্ণনার ভিত্তিতেই সংরক্ষিত হয়েছে।

ঙ. আধুনিক যুগে প্রচলিত উৎস সমালোচনা (Source criticism) পদ্ধতি ব্যবহার করে একদল প্রাচ্যবিদ পণ্ডিত হাদীছ শাস্ত্রের বিশুদ্ধতাকে অস্বীকার করেছেন এ কারণে যে, তা শ্রুতিনির্ভর বর্ণনা। তাদের নিকট মুহাদ্দিছগণের গৃহীত অবিচ্ছিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত শ্রুত বর্ণনা (Verbal source) হাদীছের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করে না। এর পরিবর্তে তারা দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রমাণ (Visual source) তথা প্রত্নতাত্ত্বিক, লৈখিক প্রভৃতি প্রমাণকে সত্যতা নির্ণয়ের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। ফলে হাদীছ সম্পর্কে তাদের গবেষণা ধারা পরিণত হয়েছে অতি সংকীর্ণ ও বাস্তবতাবিরোধী। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পারিপার্শ্বিকতাকে সঠিকভাবে বিবেচনায় না এনে কেবল দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রমাণকে একমাত্র অবলম্বন করার অসহিষ্ণু, সংশয়বাদী এবং একদেশদর্শী নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা অবলীলায় ইতিহাসের এক জাজ্বল্যমান বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন এবং কাল্পনিক অবস্থান থেকে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। যার ফলে প্রমাণ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষে কেবল ধারণার বশবর্তী হয়ে এবং পক্ষপাতমূলকভাবে হাদীছ শাস্ত্রকে বিতর্কিত করা সম্ভব হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে মুহাদ্দিছগণের নীতি ছিল অনেক বেশী বাস্তবতাভিত্তিক, নমনীয় এবং বহুদেশদর্শী। মুখস্থকরণ বা শ্রুতিনির্ভরতাকে তারা কখনও যেমন অগ্রাহ্য করেননি, তেমনি একচেটিয়াভাবে গ্রহণও করেননি। কেননা তারা ছিলেন সেই যুগের এবং সেই সমাজের সন্তান। তারা ভালভাবেই জানতেন তৎকালীন শ্রুতিনির্ভর জ্ঞান বিনিময়ের আদ্যপান্ত। ফলে তারা সমকালীন প্রেক্ষাপট থেকে সর্বাধিক উপযুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতেই হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই করেছেন এবং তাদের গবেষণাকে ঢালাও মন্তব্য ও উৎকট সারলীকরণ থেকে মুক্ত রেখেছেন। মূলত তারাই ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্মোহ বিশ্লেষণমূলক গবেষণা ধারার আবিষ্কারক।

অন্যদিকে প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতগণ ইতিহাস বিশ্লেষণের যে সূত্র গ্রহণ করেছেন তাতেও কেবল লিখিত এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুই প্রাথমিক উপাত্ত হিসাবে গৃহীত। ফলে তারা হাদীছের চূড়ান্ত লিপিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বে আরও যে সকল ধাপ (আমল, মুখস্থকরণ, ব্যক্তিগত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ প্রভৃতি) ছিল তা বেমালুম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন কিংবা তার দূরবর্তী ব্যাখ্যা দিয়ে তথ্যবিকৃতি ঘটিয়েছেন। দুঃখের বিষয় সমকালীন মুসলিম পণ্ডিতগণও এতে প্রভাবিত হয়ে প্রাচ্যবিদদের মত খণ্ডন করার সময় মুখস্থকরণ পদ্ধতির চেয়ে লেখনীর মাধ্যমে হাদীছ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকেই অধিক গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন। অথচ এটা ছিল সর্বশেষ ধাপ, যার প্রাথমিক ধাপগুলো ছিল হাদীছ মুখস্থকরণ, হাদীছের উপর আমল। আর তা ধারাবাহিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। সুতরাং লিখিত সংকলনের পূর্বে হাদীছ সংরক্ষণের এ দুটি মৌলিক মাধ্যম (Device)-কে আমাদেরকে সক্রিয় বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুবা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হবে। আর মূলত এ বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারার দরুণই প্রাচ্যবিদসহ অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরী হয়েছে যে, হাদীছ যেহেতু রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর সংকলিত হয়েছে, সুতরাং তা ইমাম বুখারী ও তৎকালীন মুহাদ্দিছদের নিজস্ব রচনা। যা সর্বৈব ইতিহাস অজ্ঞতার ফসল।

চ. প্রাচ্যবিদদের কেউ কেউ প্রমাণ করেছেন যে, প্রাথমিক যুগে জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রধানত মৌখিকভাবে হ'লেও লেখনীর প্রচলনও সমভাবে প্রচলিত ছিল। আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ড. নাবিয়া এ্যাবোট (১৮৯৭-১৯৮১খ্রি.) তাঁর Studies in Arabic literary papyri গ্রন্থের ২য় খণ্ডে তিনি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিসমূহ বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ছাহাবীগণ মৌখিকভাবে ছাড়াও হাদীছ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতেন। এই গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন যে, হাদীছের আনুষ্ঠানিকভাবে সংকলন শুরু হওয়ার পূর্বে তথা ১ম শতাব্দী হিজরীর পূর্বেই অধিকাংশ হাদীছ কারও না কারও দ্বারা এবং কোন না কোন স্থানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। তিনি বলেন, Oral and written transmission went hand in hand almost from the start, that the tradition of Muhammad as trasmitted by his companions and their successors were, as a rule, scrupulously scrutinized at each step of the transmission

'মৌখিক এবং লিখিত আকারে হাদীছ বর্ণনার চল প্রায় শুরু থেকে হাত ধরাধরি করে চলে আসছিল। প্রতিটি যুগে ছাহাবী বা তাবেঈগণ থেকে বর্ণিত মুহাম্মাদ (ছা.)-এর হাদীছসমূহ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বর্ণনা করা হ'ত।

একইভাবে অপর জার্মান প্রাচ্যবিদ গ্রেগর শোয়েলার (জনা: ১৯৪৪) তাঁর The Genesis of Literature in Islam: From the Aural to the Read গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে, ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রথমত মৌখিকভাবে ও শ্রুতিনির্ভর পদ্ধতিতে জ্ঞানের প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু তাঁর অর্থ এই নয় যে, লেখনীর প্রচলন তখন ছিল না। বরং লেখনীকে প্রাথমিক যুগে দেখা হত স্মৃতিশক্তির সহায়ক (Mnemonic aid) হিসেবে। তিনি বলেন যে, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারের যুগে তথা সপ্তম থেকে দশম খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে শিক্ষাদান এবং জ্ঞান বিতরণের পদ্ধতি হিসাবে একদিকে যেমন শ্রুতিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহৃত হ'ত, অপরদিকে লিখিত পদ্ধতিও ব্যবহৃত হ'ত। অতঃপর ধীরে ধীরে সময়ের বিবর্তনে এই চর্চার পরিসমাপ্তি ঘটে এবং মৌখিক জ্ঞান বিতরণ পদ্ধতি লিখিত পদ্ধতিতে এসে স্থায়িত্ব লাভ করে। তিনি সফলভাবে, প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, ইসলামী সাহিত্যের বিশাল সম্ভারের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ ব্যক্তিগতভাবে এবং শুধুমাত্র মৌখিক শুনানীর মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। বস্তুত ইসলামী জ্ঞান মৌখিক ও লিখিত উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে পরিচালিত হ'ত এবং ধারাবাহিকভাবে সময়ের বিবর্তনে তা রূপান্তরিত হয়েছে মৌখিক থেকে লিখিত রূপে।

সুতরাং প্রাথমিক যুগে কেবলমাত্র শ্রুতিবাহিত পদ্ধতির সাহায্যে হাদীছ সংরক্ষিত হয়েছে- এ তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, যা স্বয়ং প্রাচ্যবিদরাই খণ্ডন করেছেন।


টিকাঃ
১৬৬. ইবনে হাজার আসক্বালানী, হাদিউস সারী মুকাদ্দামাতু ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬।
১৬৭. Muhammad Taqi Usmani, The Authority of Sunnah, p. 86-88.
১৬৮. এই হাদীছের উদাহরণ হ'ল যেমন আনাস (রা.) রাসূল (ছা.) হ'তে বর্ণনা করেন, لا يجد العبد حلاوة الإيمان حتى يؤمن بالقدر خيره وشره، وحلوه، ومر 2017 Rofa ، قال : وقبض رسول الله صلى الله عليه وسلم على لحيته، فقال: آمنت بالقدر خيره وشره وحلوه ومره কোন ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না সে তাক্বদীরের ভাল-মন্দ এবং তার মিষ্টতা ও তিক্ততার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে। আনাস (রা.) বলেন, অতঃপর রাসূল (ছা.) তাঁর নিজের দাড়ি ধরলেন এবং বললেন, আমি তাক্বদীরের ভাল-মন্দ এবং তার মিষ্টতা ও তিক্ততা প্রতি বিশ্বাস করি'। হাদীছটি উল্লেখের সময় আনাস (রা.) নিজেও রাসূল (ছা.)-এর অনুকরণে দাড়ি ধরেন। অতঃপর পরবর্তী সমস্ত রাবী যখন হাদীছটি বর্ণনা করতেন তখন একইভাবে নিজেদের দাড়ি ধারণ করতেন। রাসূল (ছা.)-এর কথা ও বাচনভঙ্গি এভাবে হুবহু নকল করার পদ্ধতিকে মুসালসাল হাদীছ বলা হয়। ইমাম আল-হাকিম (৪০৫হি.) এই উদাহরণটি তাঁর স্তর পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতাসহ প্রদান করেছেন (মা'রিফাতু উলূমিল হাদীছ (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ২য় প্রকাশ: ১৯৭৭খ্রি.), পৃ. ৩১-৩২)।
১৬৯. মানাযির আহসান গিলানী, তাদবীনে হাদীছ, পৃ. ৪৪।
১৭০. Muhammad Taqi Usmani, The Authority of Sunnah, p. 88.
১৭১. আবুল হাসান আল-আমিদী, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৮৪।
১৭২. দ্র. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুল হাদীছ, পৃ. ৩৯৯।
১৭৩. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ৭৯।
১৭৪. Gregor Schoeler, The Genesis of Literature in Islam: From the Aural to the Read, p. 5.
১৭৫. Ibid, p. 54-120, 122-123.
১৭৬. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুল ফীল হাদীছ আন-নববী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৮৭-৫৯৪; ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি (ঝিনাইদহ: আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ৩য় প্রকাশ: ২০০৮খ্রি.), পৃ. ৯১-৯২।
১৭৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৯৩৫।
১৭৮. ছহীহুল মুসলিম, হা/৮৫২।
১৭৯. সুনান আবী দাউদ, হা/১০৪৬।
১৮০. সুনানুত তিরমিযী, হা/৪৯১।
১৮১. আস-সুনানুল কুবরা, হা/১৭৬০।
১৮২. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/২৭৭২।
১৮৩. কিতাবুদ দু'আ, হা/১৭০।
১৮৪. আল-বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, হা/৫৯৯৮।
১৮৫. ড. আযিয়া আলী তুহা, মানহাজিয়াতু জামঈস সুন্নাহ ওয়া জামঈল আনাজীল (কুয়েত: দারুল বুহুছ আল-ইলমিয়াহ, ১৯৭৮খ্রি.), পৃ. ১৬৮; ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, পৃ. ৯৫।
১৮৬. John Wansbrough, The Sectarian Milieu: Content and Composition of Islamic Salvation History (Oxford: Oxford, UP, 1978); Patricia Crone and Michael Cook, Hagarism, Albrecht Noth, The Early Arabic Historical Tradition: A Source-Critical Study, trans. Michael Bonner (Princeton: The Darwin Press, Inc., 1994).
১৮৭. অনেক সময় লিখিত প্রমাণও তাদের কাছে যথেষ্ট হয় নি। ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে লিখিত রাসূল (ছা.)-এ চিঠিসমূহকেও তারা শব্দগত সমালোচনা (Textual criticism) তথা প্রাচীন লিপিবিজ্ঞান (Palaeography), স্থানিক বিবরণ (Topography) প্রভৃতি গবেষণা সূত্রে ফেলে বানোয়াট প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন। দ্র. W. Montgomery Watt, Muhammad at Medina (Oxford: Clarendon Press, 1956) p. 346; R. B. Serjeant, Early Arabic Prose, Cambridge History of Arabic Literature: Arabic Literature to the End of the Umayyad Period (Cambridge; New York: Cambridge University Press, 1983) p. 152; Albrecht Noth, The Early Arabic Historical Tradition: A Source-Critical Study, p. 7.
১৮৮. Sarah Zubair Mirza, Oral Tradition and Scribal Conventions in the Documents attributed to the prophet Muhammad (Unpublished Doctoral Thesis) (University of Michigan, 2010), p. 281.
১৮৯. Nabia Abbott, Studies in Arabic Literary Papyri : Quranic Commentary and Tradition, vol. 2, p. 6-7.
১৯০. Ibid, vol. 2, p. 39.
১৯১. Ibid, vol. 2, p. 2.
১৯২. Gregor Schoeler, The Genesis of Literature in Islam: From the Aural to the Read, p. 2-3.
১৯৩. Ibid, p. 7, 123.
১৯৪. Ibid, p. 125.

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-২ : হাদীছ হ’ল অনারবদের ষড়যন্ত্রের ফসল

📄 সংশয়-২ : হাদীছ হ’ল অনারবদের ষড়যন্ত্রের ফসল


আসলাম জয়রাজপুরী, তামান্না ইমাদী প্রমুখ ব্যক্তি হাদীছ শাস্ত্রকে অনারব মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রমূলক উদ্ভাবন দাবী করেছেন। তামান্না ইমাদী বলেন, '..অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, মুনাফিকরা 'রাসূল (ছা.) বলেছেন'-এর আওয়াজ এতই বুলন্দ করল এবং মানুষকে হাদীছ জমা করার ব্যাপারে এমনভাবে প্ররোচিত করল যে, মুসলিম দেশসমূহে শত-সহস্র হাদীছ বর্ণনার হিড়িক পড়ল এবং লক্ষ লক্ষ হাদীছ সংকলনকারী সৃষ্টি হল। ফলে মানুষের দৃষ্টি কুরআন থেকে এতটা দূরে সরে গেল যে, আলিম, ফক্বীহ এবং মুফতীগণ কুরআন থেকে মাসআলা গ্রহণের পরিবর্তে হাদীছের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে লাগলেন।... এভাবেই হাদীছকে কুরআনের সমমান সম্পন্ন বানিয়ে দেয়া হল'।

পর্যালোচনা:

সম্ভবত হাদীছ শাস্ত্রের বিখ্যাত ছয়টি গ্রন্থের সংকলকগণ তথা ইমাম বুখারী (২৫৬হি.), মুসলিম (২৬১হি.), আবূ দাউদ (২৭৫হি.), তিরমিযী (২৭৯হি.), নাসাঈ (৩০৩হি.) এবং ইবনু মাজাহ (২৭৩হি.) খোরাসানের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী হওয়ায় এই ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়েছে। নিম্নে তাদের ধারণা খণ্ডন করা হ'ল।

ক. উমর (রা.)-এর যুগে ২৩ হিজরীতে পারস্য ও খোরাসান অঞ্চল মুসলমানদের করায়ত্ত্ব হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে সেখানকার অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। দ্বিতীয় শতাব্দী হিজরীর শুরুতে যখন হাদীছ সংকলনকর্ম আরম্ভ হয়, তখন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে অনারব মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল নিতান্তই নগণ্য। আব্বাসীয় আমলে অনারব বার্মাকীরা কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল, কিন্তু তারা আরবী ভাষা সম্পর্কেই বিশেষ জ্ঞান রাখত না, কুরআন ও সুন্নাহর খেদমত করা তো দূরের কথা। সুতরাং প্রাথমিক যুগে হাদীছ সংকলনকর্মে যেখানে অনারব মুসলমানদের কোন অংশগ্রহণ নেই, সেখানে ষড়যন্ত্র থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয়ত হাদীছ সংকলনের স্বর্ণযুগে আরব মুহাদ্দিছগণ যে সকল হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলন করেছিলেন তাদের সূত্র থেকে সংগৃহীত হাদীছগুলিই অনারব মুহাদ্দিছগণ তাঁদের স্বীয় গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছিলেন। অর্থাৎ তাদের সংকলিত গ্রন্থের হাদীছসমূহ ২য় শতকে সংকলিত হাদীছগ্রন্থসমূহে পূর্ব থেকেই সংরক্ষিত ছিল। তারা কেবল নতুনভাবে বিন্যাস করেছিলেন। এটি ছিল ইসলামের প্রভাবে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শুরু হওয়া ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার এক অনন্য সাধারণ নির্দশন, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। সুতরাং এতে ষড়যন্ত্র খোঁজা নিতান্তই অবান্তর ও ইতিহাস অজ্ঞতার ফসল।

খ. সন্দেহ নেই যে, পরবর্তীকালে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় আরবদের তুলনায় অনারবগণই বেশী অগ্রসর হয়েছিলেন। ফলে পারস্য-খোরাসান ও আন্দালুসিয়ার যমীনে এমন অসংখ্য মুসলিম বিদ্বানের জন্ম হয়েছিল, যারা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে আরবদের থেকেও অগ্রসরতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন। এর কারণ হিসাবে ইবনু খালদুন (৮০৮হি.) উল্লেখ করেন, আরবদের মধ্যে বেদুঈন জীবনব্যবস্থা এবং সরলতা বিদ্যমান ছিল। এজন্য শাস্ত্র ও শিল্পকলায় তারা তেমন পারদর্শী ছিল না। তার প্রয়োজনও তাদের হ'ত না। কিন্তু অনারব মুসলমানরা এই নতুন দ্বীনকে জানা এবং আরব সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে আরবী ভাষা ও শিল্পকলার সাথে পরিচিত হ'তে লাগল। শত সহস্র মাইল পাড়ি দিয়ে তাঁরা আরবদের নিকট দ্বীনে জ্ঞান আহরণ করতে লাগল। অতঃপর যুগ পরিক্রমায় তাদের হাত ধরেই বিশেষত আরবী ব্যকরণ, উছুলুল ফিক্‌হ, উছুলুত তাফসীর, উছুলুল হাদীছ ইত্যাদি শাস্ত্রের জন্ম হয়। আর এভাবেই তাদের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চার নানা দিক ও বিভাগ উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই জ্ঞানচর্চার পিছনে কোন প্রকার ষড়যন্ত্র নিহিত ছিল-এই মন্তব্য আধুনিককালের কিছু হাদীছ অস্বীকারকারী এবং প্রাচ্যবিদ ব্যতীত বিগত হাজার বছরে কোন একজন বিদ্বানও উচ্চারণ করেননি। স্বয়ং তৎকালীন আরবগণই যেখানে তাদের বিরুদ্ধে অনারবদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বেখবর ছিলেন, সেখানে এত বছর পর আবিষ্কৃত এই অভিনব তথ্যের কী মূল্য থাকতে পারে?

গ. যিয়াউদ্দীন ইছলাহী ১ম শতাব্দী হিজরী থেকে শুরু করে ৮ম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হাদীছ সংকলনে ব্যাপৃত ৭০ জন মুহাদ্দিছের জীবনী উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে মাত্র ১২ জন হ'লেন অনারব। তাছাড়া ইমাম বুখারী (২৫৬হি.) এবং ইমাম ইবনু মাজাহ (২৭৩হি.) ব্যতীত কুতুবে ছিত্তার বাকি ইমামগণের জন্য খোরাসানে হ'লেও তাঁরা আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন। যেমন ইমাম মুসলিম ছিলেন 'বনূ কুশাইর' গোত্রের এবং আবু দাউদ ও তিরমিযী ছিলেন যথাক্রমে 'বনূ আব্দ', 'বনূ সালীম' গোত্রের। আর ইমাম নাসাঈ'র গোত্র সম্পর্কে না জানা গেলেও ঐতিহাসিকগণ তাঁকে আরব বংশোদ্ভূত উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বংশগত পরিচয় নিয়ে কোন বিভ্রান্তির অবকাশ নেই, আর না অতীতকালে কেউ কখনও প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলাম প্রসারের সেই যুগে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ইসলামের কেন্দ্রভূমি আরবের মাটিতে এসে মানুষ দ্বীন শিক্ষা করেছে। কেউ আরবের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কেউবা জীবনের সিংহভাগ আরবের মাটিতে কাটিয়ে শেষ জীবনে নিজ শহরে ফিরে গেছেন। কারও বংশপরিচয় তাকে জ্ঞানার্জনে বাধার সৃষ্টি করেনি। এটি ছিল জাতি-গোত্র-বর্ণ নির্বিশেষে ইসলামের আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং বহুজাতিক সৌন্দর্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত।


টিকাঃ
১৯৫. তামান্না ইমাদী, ই'জাযুল কুরআন ওয়া ইখতিলাফে ক্বিরাআত, পৃ. ২২৫, ইসমাঈল সালাফী, হুজ্জিয়াতে হাদীছ, পৃ. ৪২।
১৯৬. তামান্না ইমাদী, ই'জাযুল কুরআন ওয়া ইখতিলাফে ক্বিরাআত, পৃ. ২৩০-২৩১।
১৯৭. মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, হজ্জিয়াতে হাদীহ, পৃ. ৪১-৪৪।
১৯৮. ইবনু খালদুন, মুকাদ্দামাহ ইবনু খালদুন, বঙ্গানুবাদ: গোলাম সামদানী কোরায়শী (ঢাকা: দিব্যপ্রকাশ, ৩য় মুদ্রণ: ২০১৫খ্রি.), ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৬-৩৪৯।
১৯৯. যিয়াউদ্দীন ইছলাহী, তাযকিরাতুল মুহাদ্দিছীন (লাহোর: দারুল বালাগ, ২০১৪খ্রি.)। দ্র. ১ম ও ২য় খণ্ড।
২০০. হুফীউর রহমান মুবারকপুরী, ইনকারে হাদীছ হজ্ব ইয়া বাতিল (হায়দারাবাদ : তাওহীদ ওয়া সুন্নাহ ফাউণ্ডেশন, ২০০৮খ্রি.), পৃ. ১৮-২০।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৩ : ছাহাবীগণ সকলেই সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ছিলেন না

📄 সংশয়-৩ : ছাহাবীগণ সকলেই সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ছিলেন না


হাদীছ অস্বীকারকারীদের দাবী হ'ল, ছাহাবীগণ সকলে আস্থাভাজন ছিলেন না। তারাও আমাদের মত মানুষ ছিলেন। সুতরাং তারাও ভুল বা মিথ্যা বলতে পারেন। তাদের মধ্যে অনেকে মুনাফিক ও কবীরা গুনাহগারও ছিলেন। সুতরাং তাদের ওপর কি একচেটিয়াভাবে নির্ভর করা যায়? ড. আহমাদ ويظهر أن الصحابة أنفسهم في زمنهم كان يضع بعضهم بعضاً , موضع النقد، ويترلون بعضاً منزلة أسمى من بعض তাদের যুগে নিজেরাই একে অপরের সমালোচনা করতেন এবং (বিশ্বস্ততার ব্যাপারে) কতিপয়কে কতিপয়ের উপরে স্থান দিতেন।

পর্যালোচনা :

ক. সকল মুসলিম বিদ্বান একমত যে, ছাহাবীগণ প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। ইবনু আব্দিল বার্র (৪৬৩হি.) বলেন, كان الصحابة رضى الله عنهم قد كفينا البحث عن أحوالهم الإجماع أهل الحق من المسلمين وهم أهل السنة والجماعة على أنهم كلهم عدول 'ছাহাবীদের (নৈতিক) অবস্থান সম্পর্কে চুল-চেরা বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই কেননা মুসলমানদের মধ্যে হক্বপন্থীগণ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, তারা প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ।' ইবনু কাছীর বলেন, والصحابة كلهم عدول عند أهل السنة والجماعة ... وقول المعتزلة : الصحابة عدول إلا من قاتل علياً قول باطل مرذول و مردود 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ'র নিকট ছাহাবীগণ প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন.. মু'তাযিলাদের এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল ও ভিত্তিহীন যে, ছাহাবীরা ন্যায়পরায়ণ, তবে যারা আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তারা ব্যতীত।

ছাহাবীদের ন্যায়পরায়ণতা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছা.)-এর সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত। কেননা আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর রাসূল (ছা.)-এর সাহচর্যের জন্য নির্বাচন করেছিলেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই কুরআন ও সুন্নাহ তথা ইসলামী শরী'আহ মানবজাতির নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরাই এই দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে বিজয়ী করেছিলেন এবং পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে দ্বীনকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং দ্বীনের প্রতি তাদের দরদ ও দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহ ও রাসূল (ছা.)-এর প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল প্রশ্নাতীত। সুতরাং তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আর উষ্ট্রের যুদ্ধে এবং ছিফীনের যুদ্ধে তাদের মাঝে যে বিবাদ ঘটেছিল, তা এক অনিচ্ছাকৃত সংঘাত ছিল কিংবা তাদের ইজতিহাদগত ভুল ছিল। এতে তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা ক্ষুণ্ণ হয় না।

مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ

তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে তাদের চেহারায় সিজদার প্রভাব থেকে। এই আয়াতে আল্লাহ স্বয়ং ছাহাবীদের ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। এছাড়া ছাহাবীদের সপক্ষে অনেক জায়গায় সাক্ষ্য দিয়েছেন রাসূল (ছা.)। যার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদীছটি হ'ল, خير الناس قرني، ثم الذين يلونهم، ثم الذين يلونهم ‘আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। এই হাদীছে একই সাথে তাবেঈদের ব্যাপারেও সাক্ষ্য প্রদান করা হয়েছে।

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

আনছারগণের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম দিককার এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে নিষ্ঠার সাথে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তষ্ট। এই আয়াতটিতে আল্লাহ একইসাথে ছাহাবী এবং তাদেরকে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণকারী তাবেঈদের প্রশংসা করেছেন, যা তাদের সততার জন্য সাক্ষ্য হিসাবে যথেষ্ট।

সুতরাং সরাসরি আল্লাহ এবং রাসূল (ছা.) কর্তৃক সততার সাক্ষ্যপ্রাপ্ত ছাহাবীদের সম্পর্কে শরী'আতের ব্যাপারে মিথ্যা ও খেয়ানতের সন্দেহ করা এবং তাদের ওপর কোন অপবাদ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিহ্বা আড়ষ্ঠ হওয়া উচিৎ। ইবনুছ ছালাহ (৬৪৩হি.) বলেন, إن الأمة مجمعة على تعديل جميع الصحابة، ومن لابس الفتن منهم فكذلك بإجماع العلماء الذين ‎ ‎ يعتد بهم في الإجماع، إحسانا للظن بهم، ونظرا إلى ما تمهد لهم من المآثر، وكان الله - سبحانه وتعالى - أتاح الإجماع على ذلك لكونهم نقلة الشريعة

'মুসলিম উম্মাহ সকল ছাহাবীর বিশ্বস্ততার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছে। এছাড়া যাদেরকে ফিতনা স্পর্শ করেছে (তথা উষ্ট্রের যুদ্ধ ও ছিফীনের যুদ্ধ প্রভৃতি) তাদের ব্যাপারেও ঐক্যমত পোষণ করেছেন এমন বিদ্বানগণ, যাদের ইজমা' গ্রহণযোগ্য হিসাবে পরিগণিত। তাদের প্রতি সুধারণা এবং (মুসলিম উম্মাহর জন্য) তাদের অবদানকে বিবেচনায় রেখে এই ঐক্যমত হয়েছে। যেন আল্লাহ নিজেই এই ইজমা'র পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, কেননা তারা ছিলেন শরী'আতের ধারক ও বাহক।

খ. ছাহাবীগণ পরস্পরের সত্যবাদিতা সম্পর্কে সন্দেহ করতেন বা একে অপরের মিথ্যুক বলতেন- এ মর্মে যত বর্ণনা এসেছে তার একটিও বিশুদ্ধ নয়, বরং শী'আদের তৈরীকৃত। বরং এ বিষয়ে সঠিক বক্তব্য হ'ল, যখনই তাঁরা কোন ছাহাবীর নিকট হাদীছ শ্রবণ করতেন সাথে সাথে তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিতেন, কখনও সন্দেহ পোষণ করতেন না। যেমন আল বারা ইবনু আযিব ليس كلنا سمع حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم ، كانت (রা.) বলেন, لنا ضيعة وأشغال، ولكن الناس لم يكونوا يكذبون يومئذ، فيحدث الشاهد الغائب 'আমাদের সকলেই রাসূল (ছা.) হ'তে হাদীছ শুনেছে তা নয়, কেননা আমাদের কৃষিখামার ছিল, কাজকর্ম ছিল। কিন্তু সেই যুগে মানুষ মিথ্যা কথা বলত না এবং তারা উপস্থিতরা অনুপস্থিতদের নিকট হাদীছ পৌঁছে দিত। ' আনাস (রা.) বলেন, ليس كل ما نحدثكم عن رسول الله صلى الله عليه وسلم ولكن حدثنا أصحابنا, ونحن قوم لا يكذب بعضنا بعضا ا سمعناه منه যে সকল হাদীছ তোমাদের নিকট বর্ণনা করি, তার প্রতিটিই রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে শুনেছি এমন নয়। বরং আমাদের সাথীরা আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন। আর আমরা এমন কওম ছিলাম যারা একে অপরকে মিথ্যুক বলত না।

তবে কিছু বর্ণনা এসেছে যেমন, আল-ওয়ালিদ ইবনু উকুবা (রা.)। যিনি বনু মুস্তালিক গোত্র থেকে ফিরে মিথ্যাভাবে রাসূল (ছা.)-কে বলেছিলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আব্দুর রহমান ইবনু উদাইস আল-বালভী (রা.) যিনি ফিতনার উদ্ভবকালে ওছমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে হাদীছ রচনা করে রাসূল (ছা.)-এর নামে মিথ্যাচার করেছিলেন। কিন্তু এ বর্ণনাগুলির সনদ দুর্বল, যা গ্রহণযোগ্য নয়। আর যদি বর্ণনাগুলো গ্রহণযোগ্যও হয়ে থাকে, তবুও এমন দু'একজনের জন্য বাকী প্রায় লক্ষাধিক ছাহাবীর ন্যায়পরায়ণতা ক্ষুণ্ণ হয় না। আর হাদীছ গ্রন্থসমূহে এই দু'জন ছাহাবীর বর্ণনাও ১টির বেশী পাওয়া যায় না। হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণামতে যদি তারা মিথ্যুক হয়ে থাকেন এবং মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই হাদীছ সংকলকরা সে হাদীছগুলি তাদের গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করতেন। কিন্তু তা দেখা যায় না। এখান থেকে অধিকতর প্রমাণিত হয় যে, মুহাদ্দিছদের গৃহীত নীতি সঠিক।

এছাড়া আয়েশা (রা.)-এর সম্মুখে আবুদ দারদা (রা.)- এর একটি মন্তব্য 's be is a re s لا وتر لمن أدركه الصبح নেই'- উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, كذب أبو الدرداء 'আব্দুদ দারদা মিথ্যা বলেছে'। এটি মিথ্যা অর্থ ভুল করা। কেননা এটি আবূ দারদার একটি নিজস্ব মন্তব্য ছিল। আর কেউ নিজের মত পেশ করলে তাকে মিথ্যুক বলা অপ্রাসঙ্গিক। অতএব এখানে আবু দারদা (রা.) ভুল করেছেন, এই অর্থ নিতে হবে।

গ. রাসূল (ছা.)-এর যুগে যারা মুনাফিক ছিল তারা ছাহাবীর সংজ্ঞায় পড়ে না। কেননা তারা বাহ্যিকভাবে ঈমান প্রকাশ করলেও অন্তরে কুফরী পোষণ করত। সুতরাং তারা ছাহাবী নয়। আর এই মুনাফিকদের সম্পর্কে রাসূল (ছা.) যেমন জানতেন, তেমনি ছাহাবীরাও অবগত ছিলেন। কুরআন তাদের চাল-চলন সম্পর্কে খুঁটিনাটি সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মুনাফিকদের পক্ষে রাসূল (ছা.) ও তাঁর ছাহাবীদের চোখ এড়িয়ে থাকার কোন সুযোগ ছিল না।

ঘ. ছাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ কবীরা গুনাহগার ছিলেন যেমন আয়েশা (রা.)-কে অপবাদদানকারীগণ, যেমন হাসান ইবনু ছাবিত, মিসতাহ ইবনু আছাছাহ এবং হামনা বিনতু জাহাশ। রাসূল (ছা.) তাদের ওপর হদের শাস্তি আরোপ করেছিলেন। তারা ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত গণ্য হবে কিনা এ বিষয়ে অধিকাংশ ফক্বীহ মত পোষণ করেছেন যে, যদি এমন অপরাধী তওবা করে, তবে সে আর ফাসিক হিসাবে গণ্য হবে না এবং তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে। আর এজন্য মুহাদ্দিছগণ হাসান ইবনু ছাবিত এবং হামনা বিনতু জাহশের হাদীছ তাঁদের গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং ফাসিক এবং কবীরা গুণাহগার যদি তওবা করে তবে সে বিশ্বস্ত হিসাবে গণ্য হবে।

ঙ. ছাহাবীদেরও মানবীয় ভুল-ভ্রান্তি থাকা স্বাভাবিক-এই প্রশ্নের জবাবে ড. মুহুত্বফা আল আ'যামী (২০১৭খ্রি.) বলেন, যারা এই যুক্তি প্রদান করেন, মূলত তারাই মানবীয় প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী অস্বীকার করেন। কেননা তারা মানুষের অন্তরে পরিচর্যার প্রভাব উপলব্ধি করতে পারেন না, মানবহৃদয়ের পরিশুদ্ধিতে ধর্মীয় অনুভূতি এবং শিক্ষার গভীর প্রভাবকে গুরুত্ব দেন না। মানবহৃদয় কোন জড় পদার্থের মত প্রাণহীন নয়। বরং হৃদয় যখন বিশুদ্ধ ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ হয়, তাওহীদের আক্বীদায় সিঞ্চিত হয়, তখন তা এমনকি ফিরিশতাদের মর্যাদা থেকেও উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়। আবার যখন তা অপবিত্র হয়ে যায়, তখন শয়তানের চেয়ে নিম্নস্তরে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মানবহৃদয়ের স্বাভাবিক প্রকৃতি হ'ল তা স্থিতিস্থাপক, যা কোন দেশ-কাল-পাত্র দিয়ে সরল সূত্রে পরিমাপ করা যায় না। অতএব ছাহাবীদের অবস্থানকে অন্য কারও সাথে তুলনা করা বা অন্যদের অবস্থানকে ছাহাবীদের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। কেননা তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর নবীর সহচর হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এই দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।

এর অর্থ এই নয় যে, আমরা তাদের ন্যায়পরায়ণতাকে সাধারণ স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মানবীয় ভুল-ভ্রান্তি থাকার সম্ভাবনা নাকচ করছি। কিন্তু ছাহাবীদের এই প্রজন্ম হাদীছ বর্ণনায় অতীব সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি আমাদের নিকট থেকে আদায় করে নিয়েছেন। এরূপ অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, إنه ليمنعني أن أحدثكم حديثا كثيرا أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من تعمد علي كذبا، فليتبوأ مقعده من النار নিকট আমি অনেক হাদীছ বর্ণনা করতাম। কিন্তু রাসূল (ছা.)-এর এই কথাটি আমাকে বাঁধাগ্রস্থ করে 'যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচার করল সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়।' আব্দুর রহমান ইবনু আবী লায়লা বলেন আমি যায়েদ ইবনু আরকাম (রা.)- কে বললাম, আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর কিছু হাদীছ শোনান। তিনি বললেন, كبرنا ونسينا، والحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم شديد 'আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং (অনেক কিছুই) ভুলে গেছি। রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ বর্ণনা করা খুবই কঠিন দায়িত্ব।

তবে ছাহাবীদের যদি কখনও হাদীছ বর্ণনায় ভুল হ'ত, তখন অপর ছাহাবীরাই তা সংশোধন করে দিতেন। যেমন আয়েশা (রা.) অনেক ছাহাবীকে সংশোধন করে দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ রাসূল (ছা.)-এর কতবার ওমরা আদায় করেছিলেন এ সম্পর্কে ইবনু উমার (রা.) বলেন যে, তিনি চার বার ওমরা আদায় করেছিলেন এবং এর মধ্যে একবার ছিল রজব মাসে। একথা আয়েশা (রা.) জানতে পারলে তিনি বললেন, রাসূল (ছা.) কখনও রজব মাসে ওমরা আদায় করেননি। অনুরূপভাবে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব ইবনু আব্বাস (রা.)-এর একটি ভুল সংশোধন করে দেন যখন তিনি বলেছিলেন, রাসূল (ছা.) মায়মূনা (রা.)-কে বিবাহ করেছিলেন মুহরিম অবস্থায়।

এ সকল উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, সকল ছাহাবীর ন্যায়পরায়ণতার উপর আস্থা রাখার অর্থ তারা মানবীয় সকল ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে মনে করা নয়। তবে রাসূল (ছা.)-এর পরিচর্যার ফসল হিসাবে তারা এ সকল ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য সদা তৎপর থাকতেন। মুহাদ্দিছগণ যারা ছাহাবীদের সকলকে ন্যায়পরায়ণ ঘোষণা করেছেন, তারাও কিন্তু ছাহাবীদের এ ধরনের কোন ভুল থাকাকে অস্বীকার করেননি; বরং এমন ভুল হ'লে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ সকল ভুল তাদের ন্যায়পরায়ণতায় কোন প্রভাব ফেলে না, যার দলীল আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

চ. ছাহাবীরা একে অপরের নিকট কখনও কখনও প্রমাণ চাইতেন যেমন আবূ বকর (রা.) মুগীরা ইবনু শু'বা (রা.)-এর নিকট থেকে সাক্ষী চেয়েছেন এবং উমার (রা.) আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর নিকট সাক্ষী তলব করেছিলেন। এই প্রমাণ চাওয়ার অর্থ তারা মিথ্যা বলতে পারেন এমন সন্দেহ করা নয়। বরং এর পিছনে বিশেষ হিকমত নিহিত ছিল। আর তা হ'ল, তাঁরা হাদীছ গ্রহণে বিশেষ সতর্কতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নীতি মুসলমানদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, হাদীছের মর্ম বোঝা এবং তা থেকে হুকুম-আহকাম বের করা, কিংবা কোনো হাদীছ মানসূখ হয়েছে কি না তা জানার ক্ষেত্রে ছাহাবীদের সকলেই সম পর্যায়ের ছিলেন না। মানবীয় দৃষ্টিকোন থেকে এই জ্ঞানগত পার্থক্য থাকবেই। ফলে কোন হাদীছ বর্ণিত হ'লে তা সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্যে কখনও তারা পরস্পরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং সাক্ষী তলব করেছেন, যাতে হাদীছটির পূর্বাপর সম্পর্কে জানা যায় এবং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হ'লে সংশোধন করে দেওয়া যায়। এর মধ্যে সত্যাসত্য যাচাইয়ের কোন সম্পর্ক ছিল না।


টিকাঃ
২০১. মাহমুদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩১২, ৩২৬, ৩২৭।
২০২. ড. আহমাদ আমীন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ২১৬।
২০৩. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতী'আব ফী মা'রিফাল আসহাব (বৈরূত: দারুল জীল, ১৯৯২খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯।
২০৪. ইবনু কাছীর, আল-বা ইছুল হাছীছ, পৃ. ১৮১-১৮২।
২০৫. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৪৮; ইবনু কাছীর, আল-বা'ইফুল হাছীছ, পৃ. ১৮২-১৮৩।
২০৬. সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯।
২০৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৬৫০-৩৬৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৩।
২০৮. সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০।
২০৯. ইবনুছ ছালাহ, মুক্তাদ্দামা ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২৯৫।
২১০. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৬৩।
২১১. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ৩৮৫।
২১২. তদেব, পৃ. ৩৮৫।
২১৩. ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১০১; ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আল-ইহাবাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪৮১; আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪১৩।
২১৪. ইবনু সা'দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৫২; ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৮১।
২১৫. নিহাদ আব্দুল হালীম উবাইদ, আল-ওয়াযঊ ফিল হাদীছ ওয়া আছারুহুস সাইয়িআহ আলাল উম্মাহ (অপ্রকাশিত মাস্টার্স থিসিস) (মক্কা : জামি'আতুল মালিক আব্দুল আযীয, তাবি), পৃ. ১৯৪-২১১।
২১৬. মুসনাদ আহমাদে আল-ওয়ালিদ ইবনু উকুবা (রা.) থেকে ১টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে (হা/১৬৩৭৯, যার সূত্র যঈফ এবং আব্দুর রহমান ইবনু উদাইস (রা.) থেকে ১টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে ইমাম ত্ববারাণীর 'মু'জামুল আওসাত্ব' গ্রন্থে (হা/৩২৮৯)। এর সনদও দুর্বল।
২১৭. মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক, হা/৪৬০৩।
২১৮. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নান্দ ইনদাল মুহাদ্দিছীন (রিয়াদ: মাকতাবাতুল কাওছার, ১৯৯০খ্রি.), পৃ. ১২১।
২১৯. তদেব, পৃ. ১১০-১১১।
২২০. সুনানুত তিরমিযী, হা/৩১৮০-৩১৮১।
২২১. মুছত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নাকুন্দ ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ১১৭-১১৮।
২২২. ছহীহুল বুখারী, হা/১০৮।
২২৩. সুনান ইবনু মাজাহ, হা/২৫, সনদ ছহীহ।
২২৪. ছহীহুল বুখারী, হা/১৭৭৬-১৭৭৭।
২২৫. ইবনু রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪।
২২৬. দ্র. ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, মানহাজুন নাক্বদ ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ১২৩-১২৬।
২২৭. দ্র. আস-সিবায়ী, আস-সন্নাত ওয়া মাকানাতহা, প, ২৬৪-২৬৬।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৪ : সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী আবূ হুরায়রা (রা.) নির্ভরযোগ্য নন

📄 সংশয়-৪ : সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী আবূ হুরায়রা (রা.) নির্ভরযোগ্য নন


তিনি ছিলেন নিরক্ষর এবং দেরীতে ইসলাম গ্রহণকারী। এতদসত্ত্বেও তাঁর সর্বাধিক হাদীছ বর্ণনাকারী হওয়া অবিশ্বাস্য ব্যাপার, যা তার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আবূ হুরায়রা (রা.) ৫৩৭৫টি হাদীছ বর্ণনাকারী ছাহাবী, যা সকল ছাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক। এজন্য হাদীছ অস্বীকারকারীগণ তাঁর প্রতিই সবচেয়ে বেশী খড়গহস্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ করা হয়েছে। যেমন : (১) তিনি ছিলেন নিরক্ষর, যিনি লিখতে বা পড়তে জানতেন না। (২) তিনি খায়বার যুদ্ধের পর ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূল (ছা.)-এর সঙ্গ পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর। অথচ তিনি সর্বাধিক বর্ণনাকারী কীভাবে হলেন? (৩) ছাহাবীগণ তাঁর অধিক হাদীছ বর্ণনার সমালোচনা করতেন। (৪) তিনি ছিলেন মৃগীরোগী এবং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ প্রভৃতি। তাঁর বিরুদ্ধে ভব্যতার সমস্ত সীমারেখা অতিক্রম করে একটি পুস্তক রচনা করেছেন মাহমূদ আবূ রাইয়াহ যার নাম তাখলিছ করে রাখা হয়েছে شخ المغيرۃ أبو هريرة 'মযীরাহ' খাদ্যের ভক্ষক আবু হুরায়রা'। প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার সর্বপ্রথম তাঁর বিরুদ্ধে এই সমালোচনামূলক অবস্থান নেন। অতঃপর ড. আহমাদ আমীন তাঁর 'ফাজরুল ইসলাম' গ্রন্থে এই সমালোচনার পরিধি দীর্ঘ করেন।

পর্যালোচনা: আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ করা হয়েছে তাঁর অধিকাংশই তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সমালোচনায় পূর্ণ। এ সকল সমালোচনার দীর্ঘ জবাব প্রদান করেছেন ড. মুছত্বফা আস-সিবাঈ, আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, ড. উজাজ আল-খত্বীব প্রমুখ। নিম্নে মৌলিক কয়েকটি সমালোচনা খণ্ডন করা হ'ল।

ক. নিরক্ষরতা তৎকালীন আরব জাতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ছা.) নিরক্ষর ছিলেন। ছাহাবীগণ যারা হাদীছ বর্ণনা করতেন তারা অধিকাংশই স্মৃতি থেকে হাদীছ বর্ণনা করতেন। নিয়মাতান্ত্রিকভাবে কেউ লিপিবদ্ধ করতেন না, একমাত্র আব্দুল্লাহ ইবুন আমর ইবনুল আছ (রা.) ব্যতীত। হাদীছ শাস্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিমাত্রেরই এই তথ্য জানা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আবূ হুরায়রা (রা.) অত্যন্ত স্মৃতিধর ও মর্যাদাবান ছাহাবী ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল (ছা.)-এর মসজিদেই অবস্থান করতেন এবং রাসূল (ছা.)-এর সাথে আমৃত্যু প্রতিমুহূর্তে সঙ্গ দিয়েছেন। রাসূল (ছা.) তাঁর জন্য বিশেষ দো'আ করেছিলেন। যেমন আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ইন্নি আসমাউ মিনকা হাদীসান কাছিরান আনসাহু?

ফাস্তাতা রিদাআকা ফাবাসাততুহু, কালা: ফাগরাফা বি ইয়াদাইহি, ছুম্মা কালা: দ্বুম্মা, ফাদ্বাম্মাতুহু, فামা নাসিতু শাইয়ান বা'দাহু 'আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার নিকট হ'তে অনেক হাদীছ শুনি কিন্তু ভুলে যাই।' তিনি বললেন, তোমার চাদর মেলে ধর। আমি তা মেলে ধরলাম। তিনি দু'হাত একত্রিত করে তাতে কিছু ঢেলে দেয়ার মত করে বললেন, এটা তোমার বুকের সাথে লাগাও। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর থেকে আমি আর কিছুই ভুলে যাই নি।'

ছাহাবী ইবনু উমার (রা.) বলেন, আনতা ইয়া আবা হুরায়রা কুন্তা আলযামানা লিরাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া আ'লামানা বি হাদীছিহি আমাদের মধ্যে রাসূল (ছা.)-এর সর্বাধিক সান্নিধ্য লাভকারী ব্যক্তি এবং তাঁর হাদীছ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ব্যক্তি।' আবূ হুরায়রা (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর জানাযার সাথে যাত্রার সময় ইবনু উমার (রা.) বলেছিলেন, কানা মিম্মান ইয়াহফাযু হাদীছা রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আলাল মুসলিমীন মুসলমানদের জন্য রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহ হেফাযতকারী।'

একদা মদীনায় প্রখ্যাত ছাহাবী আবু আইয়ুব আল-আনসারী (রা.)- কে আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে দেখে জিজ্ঞাসা করা হ'ল আপনি রাসূল (ছা.)-এর এত মর্যাদাবান ছাহাবী হয়ে আবূ হুরায়রা (রা.) হ'তে বর্ণনা করছেন? তিনি বললেন, لأن أحدث عن أبي هريرة أحب إلى من أن أحدث عن النبي صلى الله عليه وسلم 'আমার কাছে রাসূল (ছা.) থেকে (সরাসরি) বর্ণনা করার চেয়ে আবূ হুরায়রা থেকে হাদীছ বর্ণনা করা অধিক প্রিয়তর।' অর্থাৎ আবু হুরায়রা (রা.) অধিক হাদীছ জানতেন বলে তিনি নিজে সরাসরি বর্ণনার চেয়ে তাঁকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

মদীনার প্রখ্যাত তাবেঈ বিদ্বান আবু ছালিহ আস-সাম্মান (১০১হি.) كان أبو هريرة من أحفظ أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ولم يكن بأفضلهم 'আবূ হুরায়রা (রা.) ছাহাবীদের মধ্যে সর্বোত্তম না হ'লেও সর্বাধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন।

ইমাম আশ-শাফেঈ (২০৪ হি.) বলেন, أبو هريرة أحفظ من روی الحديث في دهره 'আবূ হুরায়রা তাঁর যুগে হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছের হাফিয।

ইমাম আল-বুখারী (২৫৬হি.) বলেন, روى عنه نحو الثمانمائة من أهل ) العلم، وكان أحفظ من روى الحديث في عصره মধ্যে) প্রায় ৮ শত বিদ্বান তাঁর নিকট হ'তে হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং তিনি তাঁর যুগের হাদীছ বর্ণনাকারীদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীছের হাফিয।

ইমাম আল-হাকিম আন-নায়সাপুরী (৪০৫হি.) বলেন, قد تحريت الابتداء من فضائل أبي هريرة رضي الله عنه الحفظه الحديث المصطفى صلى الله عليه وسلم، وشهادة الصحابة والتابعين له بذلك، فإن كل من طلب حفظ الحديث من أول الإسلام وإلى عصرنا هذا فإنهم من أتباعه وشيعته إن هو

أولهم وأحقهم باسم الحفظ 'আমি আবূ হুরায়রা (রা.)-এর মর্যাদাসমূহের বর্ণনা সর্বাগ্রে নিয়ে এসেছি যেহেতু তিনি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের হাফিয ছিলেন এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণ এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। ইসলামের শুরু থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত প্রত্যেক যে ব্যক্তি হাদীছ সংরক্ষণের অভিপ্রায় রাখে, তারা তাঁরই দল ও জোটভুক্ত। তিনি 'হিফয' (মুখস্থকরণ ও সংরক্ষণ) শব্দটির জন্য সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি। অতঃপর তিনি যায়দ ইবনু ছাবিত, আবূ আইয়ূব আল-আনছারী, উবাই ইবনু কা'ব সহ ২৮ জন ছাহাবীর নাম এনেছেন যারা তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

هافظ الذهبي হাফিয আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.) বলেন, وكان حفظ أبي هريرة

الخارق من معجزات النبوة 'আবূ হুরায়রা (রা.)-এর স্মৃতিশক্তি ছিল রাসূল (ছা.)-এর একটি মু'জিযা। তিনি বলেন, المسلمون قديما وحديثا بحديثه لحفظه، وجلالته، وإتقانه، وفقهه তাঁর হাদীছকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছে, তাঁর মুখস্থশক্তি, মর্যাদা, সূক্ষ্মতা এবং বিজ্ঞতার কারণে। অন্যত্র বলেন, اليه المنتهى في حفظ ما سمعه من الرسول عليه السلام وأدائه بحروفه 'রাসূল (ছা.) হ'তে শ্রুত হাদীছসমূহ মুখস্থ করা এবং তা শব্দে শব্দে বর্ণনা করার ব্যাপারে তিনি হ'লেন সর্বোচ্চ শিখরে।' তিনি আরও বলেন, وقد كان أبو هريرة وثيق الحفظ، ما علمنا أنه أخطأ في حديث 'আবূ হুরায়রা (রা.) ছিলেন অটুট মুখস্থশক্তির অধিকারী। আমরা জানি না যে তিনি কোন হাদীছ বর্ণনায় ভুল করেছেন।

إبن كثير ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন وقد كان أبو هريرة من الصدق والحفظ والديانة والعبادة والزهادة والعمل الصالح على جانب عظيم হুরায়রা সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি, দ্বীনদারী, ইবাদত, দুনিয়াত্যাগী মনোভাব এবং সৎ আমলের দিক থেকে অনেক উঁচু অবস্থানে ছিলেন।

তিনি নিজে হাদীছ লিপিবদ্ধ না করলেও তাঁর নিকট থেকে কয়েকজন তাবেঈ হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী (২০১৭খ্রি.) বাশীর ইবনু নাহীক, হাম্মام ইবনু মুনাব্বিহসহ ১০ জন তাবেঈর নাম উল্লেখ করেছেন যারা তাঁর নিকট থেকে কোন না কোন সময় হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

উপরোক্ত বর্ণনাসমূহে আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে ছাহাবী, তাবেঈ এবং পরবর্তী যুগের বিদ্বানদের এই ভূয়সী প্রশংসা এবং সাক্ষ্যই প্রমাণ করে যে, রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ সংরক্ষণে তিনি কি বিশাল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সুতরাং তিনি নিজে হাদীছ লিপিবদ্ধ করেননি, এটি তার বিরুদ্ধে আপত্তির কোন কারণ হ'তে পারে না।

খ. ইসলাম গ্রহণ দেরীতে করলেও ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (ছা.)-এর সাথেই থাকতেন এবং তাঁর সাথে সর্বদা চলা-ফেরা করতেন। তাঁর সাথে হজ্জে গমন করেছিলেন এবং প্রতিটি যুদ্ধেই থাকতেন। সুতরাং তাঁর অবস্থানকালীন মেয়াদ কম হ'লেও তিনি একাধারে দীর্ঘ সময় রাসূল (ছা.)-এর সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলেন। ফলে তাঁর পক্ষে রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে অসংখ্য হাদীছ শোনার সুযোগ হয়েছিল। যেমন এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ (রা.)। একদা তাঁর নিকট এক ব্যক্তি আবূ হুরায়রা (রা.) সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে জিজ্ঞাসা করল, আবু হুরায়রা (রা.) বেশী হাদীহ জানেন না আপনারা?... তখন তিনি আবূ হুরায়রা (রা.) সম্পর্কে বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি যা শুনেছেন যা আমরা শুনিনি এবং তিনি যা জেনেছেন যা আমরা জানতে পারিনি- এমন সব ব্যাপারে তাঁর প্রতি কোন সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। আমরা লোকেরা ছিলাম ব্যস্ত এবং পরমুখাপেক্ষী। আমাদের বাড়ী ছিল, পরিবার ছিল। আমরা রাসূল (ছা.)-এর নিকট দিনের একটা সময় আসতাম এবং চলে যেতাম। কিন্তু আবূ হুরায়রা ছিলেন দরিদ্র মানুষ। তার না ছিল অর্থসম্পদ, আর না ছিল পরিবার, সন্তান- সন্ততি। অতঃপর তিনি বলেন, إنما كانت يده مع يد النبي صلى الله عليه وسلم، وكان يدور معه حيثما دار، ولا يشك أنه قد علم ما لم نعلم وسمع ما لم نسمع، ولم يتهمه أحد منا أنه تقول على رسول الله صلى الله عليه وسلم ما

لم يقل ‘তাঁর হাত থাকত সবসময় রাসূল (ছা.)-এর হাতের সাথে অর্থাৎ তিনি রাসূল (ছা.)-এর অন্তরঙ্গ থাকতেন এবং যেখানেই তিনি যেতেন তিনি তাঁর সাথে যেতেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশের কিছু নেই যে তিনি যা জানেন তা আমরা জানি না এবং যা তিনি শুনেছেন তা আমরা শুনিনি। আমাদের মধ্যে কেউ তার প্রতি এই অপবাদ দেননি যে, তুমি রাসূল (ছা.) সম্পর্কে এমন কথা বল যা তিনি বলেননি।

আবূ হুরায়রা (রা.) নিজেই বলেন, লোকে বলে আবূ হুরায়রা অধিক হাদীছ বর্ণনা করে। (জেনে রাখ,) কিতাবে এই আয়াত যদি না থাকত, তবে আমি একটি হাদীছও পেশ করতাম না। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ আমি সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও পথনির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পরও যারা তা গোপন রাখে, তাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও তাদেরকে লা'নত করে। (প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমার মুহাজির ভাইরা বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ে এবং আমার আনছার ভাইয়েরা জমা- জমির কাজে মশগুল থাকত। আর আবূ হুরায়রা খেয়ে না খেয়ে রাসূল (ছা.)- এর নিবিড় সাহচর্যে থাকত। ফলে সে উপস্থিত থাকত (এমন জায়গায়) যেখানে তারা উপস্থিত থাকত না এবং সে আয়ত্তে রাখত (এমন হাদীছ), যা তারা রাখত না।'

দ্বিতীয়ত, তিনি নিজে হাদীছ শ্রবণের জন্য অত্যন্ত সজাগ এবং উদগ্রীব থাকতেন। তিনি বলেন, صحبت رسول الله صلى الله عليه وسلم

ثلاث سنين لم أكن في سني أحرص على أن أعي الحديث مني فيهن রাসূল (ছা.)-এর সঙ্গ পেয়েছিলাম ৩ বছর। আমার জীবনে হাদীছ মুখস্ত করার আগ্রহ এই তিন বছরের চেয়ে বেশী আর কখনও ছিল না। রাসূল (ছা.) স্বয়ং তাঁর প্রশংসা করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একদা রাসূল (ছা.)- কে প্রশ্ন করা হ'ল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? রাসূল (ছা.) বললেন, আবু হুরায়রা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞাসা করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীছের প্রতি তোমার বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা'আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে। উবাই ইবনু কা'ব (রা.) বলেন, كان أبو هريرة جريئا على النبي صلى الله عليه وسلم يسأله عن أشياء لا نسأله عنها 'আবূ হুরায়রা (রা.) রাসূল (ছা.)-এর নিকাট একজন সাহসী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁকে এমন সব প্রশ্ন করতেন, যা আমরা করতে পারতাম না।

তৃতীয়ত, তিনি রাসূল (ছা.)-এর সাথে তিনটি বছর কাটিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর জীবনের শেষ বছরসমূহ। মদীনায় তখন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। ফলে রাসূল (ছা.) তাঁর উম্মতের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদানের অখণ্ড অবসর পেয়েছিলেন। আর আব্ হুরায়রা (রা.) এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়টি তাঁর সাথে অবস্থান করায় তাঁর প্রতিটি নকল ও হারকাত স্বচক্ষে দেখেছিলেন ও স্বকর্ণে শুনেছিলেন এবং তা সংরক্ষণ করেছিলেন। ফলে এই তিনটি বছর তাঁর নিকট বহু বছরের সমতুল্য ছিল। ফলে তাঁর হাদীছ বর্ণনার সংখ্যাও অনেক বেশী হয়েছিল। অন্যদিকে তিন বছর অর্থ আরবী মাস অনুযায়ী ১০৬২দিন। এর বিপরীতে তাঁর বর্ণিত মোট হাদীছ সংখ্যা সর্বমোট ৫৩৭৪টি। অর্থাৎ গড়ে তিনি প্রতিদিন ৫টি হাদীছ শুনেছেন, যার মধ্যে কথ্য, কর্মগত ও স্বীকৃতিমূলক হাদীছ সবই রয়েছে। সুতরাং সবমিলিয়ে এই সংখ্যা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। উপরন্ত হাদীছের এই সমষ্টিগত সংখ্যাটি কেবল ছহীহ হাদীছের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর মধ্যে জাল ও যঈফ বর্ণনাও সন্নিবেশিত রয়েছে। আরও রয়েছে এমন হাদীছ, যা বহু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। রয়েছে এমন হাদীছ যা তিনি সরাসরি রাসূল (ছা.) হ'তে শ্রবণ করেননি বরং অপরাপর ছাহাবীদের মাধ্যমে জেনেছেন। সুতরাং এগুলো যদি বাদ দেয়া হয় তবে হাদীছের মূল সংখ্যাও অনেক কমে যাবে। ছহীহুল বুখারীতে তাঁর বর্ণিত পুনরুল্লেখসহ মোট হাদীছের সংখ্যা ৪৪৬টি, যা এক মজলিসেই পাঠ করে শোনানো সম্ভব। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যারা তাঁর বর্ণিত হাদীছ সংখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তারা কেবল সংখ্যাই গণনা করেছেন, পারিপার্শ্বিকতা খতিয়ে দেখেননি। নতুবা তাঁর সম্পর্কে এই আপত্তি তুলতেন না।

ড. মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান আ'যামী (জনা: ১৯৪৩খ্রি.) তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, আবূ হুরায়রা (রা.) বর্ণিত মোট হাদীছ সংখ্যা তাঁর অনুসন্ধান মোতাবেক পুনরাবৃত্তি ছাড়া ১৩৩৬টি। এর মধ্যে আবূ হুরায়রা (রা.) এককভাবে বর্ণনা করেছেন ২২০টি হাদীছ। সম্প্রতি অপর একজন গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, কুতুবে ছিত্তাহ্-এ তাঁর এককভাবে বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ১০টি এবং সামগ্রিকভাবে মোট ৪২টি। অর্থাৎ মাত্র এই কয়েকটি হাদীছ তিনি এককভাবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তাঁর বর্ণিত বাকি সকল হাদীছ অন্যান্য ছাহাবী থেকেও বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এই পরিসংখ্যান জানার পর আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অধিক বর্ণনা সম্পর্কে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

মুহাম্মাদ রশীদ রিযা (১৯৩৫খ্রি.) আবূ হুরায়রা (রা.)-এর অধিক হাদীছ বর্ণনার সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত কারণগুলো ছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছেন- আবূ হুরায়রা (রা.) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রসঙ্গক্রমে কিংবা প্রসঙ্গহীনভাবে হাদীছ বর্ণনা করতেন যাতে মানুষ জ্ঞান আহরণ করতে পারে। যেখানে অন্য ছাহাবীদের ক্ষেত্রে দেখা যেত তারা সাধারণত প্রয়োজন সাপেক্ষে কিংবা কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হ'লে হাদীছ বর্ণনা করতেন। তাছাড়া তিনি রাসূল (ছা.) হ'তে সরাসরি বর্ণনা ছাড়াও অন্যান্য ছাহাবীদের সূত্রেও অনেক হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যে সকল হাদীছ তাঁর ইসলামগ্রহণের পূর্বেই রাসূল (ছা.) হ'তে তাঁরা শুনেছিলেন। মোটকথা তিনি হাদীছের প্রচার ও প্রসারকেই তিনি তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান করে নিয়েছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় বেশী হয়েছে।

গ. আবু হুরায়রা (রা.) বহু সংখ্যক হাদীছ বর্ণনার কারণে কতিপয় ছাহাবী ও তাবেঈ তাঁর প্রতি সন্দেহ পোষণ করেছিলেন, যা আমরা উপরে উল্লেখিত হাদীছসমূহে লক্ষ্য করেছি। আর এই সন্দেহের জবাব আবু হুরায়রা (রা.) নিজেই প্রদান করেছিলেন, যা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে। ড. আস-সিবাঈ (১৯৬৪খ্রি.) বলেন, এটা স্বাভাবিক যে অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ সত্ত্বেও এত অধিক হাদীছ বর্ণনার কারণে কিছু তাবেঈ এবং শহর থেকে দূরবর্তী স্থানে বসবাসকারী ছাহাবীর মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। তারা ভেবেছিলেন যে, বড় বড় ছাহাবীগণ যত হাদীছ বর্ণনা করেন না তার চেয়ে বেশী বর্ণনা করেন আবূ হুরায়রা (রা.)। এটা কীভাবে? এই প্রশ্ন তাঁরা আবূ হুরায়রা (রা.)-কে সরাসরি করেছিলেন। তাঁর প্রতি কুধারণা বা মিথ্যারোপ করার জন্য নয়, বরং জানার কৌতুহল থেকে করেছিলেন। অতঃপর যখন আবূ হুরায়রা (রা.) জবাব দিলেন তাঁরা খুশীমনে স্বীকার করে নিলেন। সুতরাং এই সন্দেহ আবু হুরায়রা (রা.)-এর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সন্দেহ ছিল না। নতুবা ২৫ জন ছাহাবীসহ প্রায় ৮ শত বর্ণনাকারী কিভাবে তাঁর নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন, যদি তাঁর সত্যবাদিতার উপর আস্থা না রাখেন? তিনিই সেই ছাহাবী যাকে মর্যাদাবান ছাহাবীগণ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। যেমন একবার আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রা.)-এর নিকট জনৈক ব্যক্তি একটি ফৎওয়া জানার জন্য আসলে তিনি তাঁকে বললেন, এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। তুমি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) এবং আবূ হুরায়রা (রা.)-এর নিকট যাও। অতঃপর লোকটি এসে তাঁদের দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলে ইবনু আব্বাস (রা.) বললেন, أفته يا أبا هريرة، فقد جاءتك معضلة 'হে আবু হুরায়রা! আপনি ফৎওয়াটি দিন, আপনার নিকট প্রশ্ন এসেছে।' অতঃপর তিনি ফৎওয়া দানের পর ইবনু আব্বাস (রা.) তাঁর সমর্থনে বললেন, مثل ذلك 'এটাই ফৎওয়া।'

সুতরাং তাঁর বিশ্বস্ততার প্রতি কোন ছাহাবী বা তাবেঈ কুধারণা পোষণ করবেন, তা অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আয়েশা (রা.), ইবনু আব্বাস (রা.) প্রমুখ তাঁর কিছু হাদীছ গ্রহণ করেননি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাঁরা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন; বরং এটি হাদীছের মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য কিংবা হাদীছ বর্ণনায় ভুল করলে তা সংশোধন করে দেয়ার প্রয়াস ছিল মাত্র। অনুরূপভাবে উমার (রা.) কর্তৃক তাঁর অধিক হাদীছ বর্ণনার প্রতি নিষেধাজ্ঞাস্বরূপ যে সকল হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তার সনদসূত্র দুর্বল, যা ইতোপূর্বে গত হয়েছে। আর যদি এ সকল বর্ণনা ছহীহও ধরে নেয়া হয়, তবে এর পিছনে উমার (রা.)-এর বিশেষ হিকমত ছিল যে, মানুষ যেন রাসূল (ছা.)- এর হাদীছকে ক্রীড়ার বস্তু হিসাবে পরিণত না করে এবং যাচাই-বাছাই বিহীনভাবে গ্রহণ না করে। তিনি এর দ্বারা কখনই আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেননি।

ঘ. আবু হুরায়রা (রা.) অধিক হাদীছ বর্ণনা করার সুযোগে হাদীছ জালকারীরা তাঁর নামে অসংখ্য হাদীছ জাল করার সুযোগ পেয়েছে মর্মে প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার এবং ড. আহমাদ আমীন প্রমুখ যে অভিযোগ করেছেন, তার উত্তরে বলা যায় যে, হাদীছ জালকারীদের এই তৎপরতা আবূ হুরায়রা (রা.)- এর সাথেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং আয়েশা (রা.), ইবনু আব্বাস (রা.), ইবনু উমার (রা.) প্রমুখের নামেও অসংখ্য জাল হাদীছ রচনা করা হয়েছে। এর জন্য আবূ হুরায়রা (রা.) বা বিশেষ কোন ছাহাবী দায়ী নন। বরং জালকারীরাই দায়ী। আর তাদের এই অপকর্মের কারণে কোন ছাহাবীর হাদীছকে সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ চিহ্নিত করা অমূলক।

৫. তাঁকে মৃগীরোগী এবং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন হিসাবে আখ্যায়িত করার মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার ঠিক একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন যে পদ্ধতিতে প্রাচ্যবিদরা রাসূল (ছা.)-এর অহী প্রাপ্তিকেও মৃগীরোগের ফলশ্রুতি হিসাবে অপবাদ দিয়েছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) তাঁর নিজের অবস্থা বর্ণনা করছেন যে, (অনেক সময়) মিম্বর এবং আয়েশা (রা.)-এর হুজরার মাঝখানে ক্ষুধায় আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতাম। লোকেরা বলাবলি করত আবূ হুরায়রাকে পাগলামী বা মৃগীরোগ ধরেছে। অথচ আমি পাগল ছিলাম না; বরং ক্ষুধার তাড়নায় আমার এরূপ অবস্থা হ'ত। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে প্রাচ্যবিদগণ তাঁকে রোগী এবং হালকা বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করার যে প্রয়াস চালিয়েছেন, তা খুবই দুঃখজনক। আহলুছ ছুফ্ফার অধিবাসী হিসাবে তিনি রাসূল (ছা.)-এর খেদমতে থেকে যৎসামান্য খানা পেলেই তাতে সন্তুষ্ট থাকতেন এবং হাদীছ শ্রবণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে কোথাও যেতেন না। এজন্য কখনও তিনি উপোস থাকতে থাকতে পেটে পাথর চাপা দিয়েও রাখতেন। এসবের কিছুর মধ্যে তাঁর দুনিয়াত্যাগী এবং পরহেযগারিতার ভাবমূর্তিই ফুটে ওঠে। অথচ একে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে প্রাচ্যবিদগণ যে অপবাদ প্রদান করেছেন, তা শুধু তাদের ইসলাম বিদ্বেষী অবস্থানকেই প্রকট করে।


টিকাঃ
২২৮. দ্র. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৯৮-৩৬১; আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ১৪০-২২৭; ড. উজাজ আল-খত্বীব, আবু হুরায়রা রাবিয়াতুল ইসলাম (আবিদীন: মাকতাবা ওয়াহাবাহ, ১৯৮২খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২৭৬; যিয়াউর রহমান আল-আ'যামী, আবু হুরায়রা ফী যূয়ী' মারভিয়াতিহি বি শাওয়াহিদিহা ওয়া হালি ইনফিরাদিহা (অপ্রকাশিত এম.এ. থিসিস) (মক্কা: জামি'আহ মালিক আব্দুল আযীয, ১৯৭২-১৯৭৩খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৭০০; আব্দুল মুনঈম আল-ইযক্ষ্মী, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (বৈরূত: দারুল কলম, ২য় প্রকাশ: ১৯৮১খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৫১৪; আব্দুল কাদির আস-সিন্দী, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (মদীনা: দারুল বুখারী, ১৯৯৭খ্রি.), পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৯২; মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ হাওয়া, আবু হুরায়রা আছ-ছাহাবী আল-মুফতারা আলাইহ (কায়রো : দারুশ শা'ব, তাবি), পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৪২।
২২৯. ছহীহুল বুখারী, হা/১১৯, ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯২-২৪৯৩।
২৩০. মুসনাদ আহমাদ, হা/৪৪৫৩, সুনানুত তিরমিযী, হা/৩৮৩৬, সনদ ছহীহ।
২৩১. ইবনু সা'দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫৪; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৭।
২৩২. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৭৫।
২৩৩. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
২৩৪. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭৮।
২৩৫. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতী'আব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৭৭১; ইবনু হাজার আল- আসক্বালানী, আল-ইছাবাহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৩।
২৩৬. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১ ৭৩-এর আলোচনা।
২৩৭. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৯৪।
২৩৮. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০৯।
২৩৯. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬১৯।
২৪০. তদেব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২১।
২৪১. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১১০।
২৪২. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফীল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৬-৯৯।
২৪৩. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৮-১০৯।
২৪৪. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৭২।
২৪৫. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৯।
২৪৬. ছহীহুল বুখারী, হা/১১৮, ২০৪৭, ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৯২-২৪৯৩।
২৪৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৫৯১।
২৪৮. হুহীহুল বুখারী, হা/৯৯, ৬৫৭০।
২৪৯. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৬১৬৬।
২৫০. ইবনুল জাওযী, তালক্বীহু ফুহূমি আহলিল আছার (বৈরূত: দারুল আরকাম, ১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ২৬৩।
২৫১. যিয়াউর রহমান আল-আ'যামী, আবূ হুরায়রা ফী যূয়ী' মারভিয়াতিহি বি শাওয়াহিদিহা ওয়া হালি ইনফিরাদিহা, পৃ. ৭-৮।
২৫২. মুহাম্মাদ রশীদ রিযা, আস-সুন্নাহ ওয়া ছিহহাতুহা ওয়াশ শারী'আহ ওয়া মাতানাতুহা (কায়রো: মাজাল্লাতুল মানার, ১৯তম খণ্ড, শা'বান/১৩৩৪হি.) পৃ. ২৫।
২৫৩. মুহসিন নাবীল, দিফাউন আন আবী হুরায়রা (রা.), E. http://www.dd-sunnah.net/records/view/action/view/id/1779/
২৫৪. মুহাম্মাদ রশীদ রিযা, আস-সুন্নাহ ওয়া ছিহাতুহা ওয়াশ শারী'আহ ওয়া মাতানাতুহা, পৃ. ২৫।
২৫৫. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ৩১১-৩১২।
২৫৬. মুওয়াত্ত্বা মালিক, তাহক্বীক মুছত্বফা আল-আ'যামী, হা/২১১০।
২৫৭. আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, পৃ. ২৯৩।
২৫৮. ছহীহুল বুখারী, হা/৭৩২৪।
২৫৯. ছহীহুল বুখারী, হা/৬৪৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00