📄 সংশয়-১০ : হাদীছ হুকুমগতভাবে যান্নী বা ধারণা নির্ভর
হাদীছ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিদের নিকট অজানা নয় যে, খবর ওয়াহিদ হাদীছকে বিদ্বানদের একটি দল 'যান্নী' আখ্যায়িত করেছেন, যা প্রবল ধারণার অর্থ দেয় এবং এর ভিত্তিতে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব হয়। কিন্তু হাদীছ অস্বীকারকারীগণ বিদ্বানদের এই 'যান্নী' শব্দটি হাদীছ অস্বীকারের জন্য দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং ধারণা করেছেন, যেহেতু হাদীছ 'যান্নী' বা ধারণা নির্ভর, অতএব তা শারঈ বিষয়ে বৈধ নয়। তাদের দলীল হ'ল, আল্লাহ বলেছেন, وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا 'আর নিশ্চয় ধারণা সত্যের মোকাবেলায় কোনই কাজে আসে না।'
পর্যালোচনা: ক. খবর ওয়াহিদ হাদীছ 'যান্নী' হওয়া বিদ্বানদের একটি বিশেষ পরিভাষা। যার অর্থ হ'ল, খবর ওয়াহিদ হাদীছ যাবতীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর অপেক্ষাকৃত প্রবল ধারণাভিত্তিক জ্ঞান প্রদান করে। বিদ্বানগণ হাদীছটির সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রবল সতর্কতাস্বরূপ আল্লাহর ওপর যিম্মাদারী ছেড়ে দিতে খবর ওয়াহিদকে 'যান্নী' বলেন। যেমনভাবে একজন মুফতী নিজের প্রদত্ত ফৎওয়ার উপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখার পরও বলেন যে, والله أعلم 'আল্লাহই অধিক অবগত'। সুতরাং এখানে 'যান্নী' পরিভাষাটি উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত নিন্দিত ধারণা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র পরিভাষা। বিদ্বানগণ খবর ওয়াহিদকে যখন 'যান্নী' বলেন, তখন তার ওপর প্রবল ধারণাভিত্তিক নিশ্চিত বিশ্বাস রেখে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব বলে থাকেন। অর্থাৎ তারা খবর ওয়াহিদকে অনিশ্চিত )الوهم( বা সন্দেহ )الشك( পূর্ণ মনে করেন না, বরং নিশ্চিত বিশ্বাসই মনে করেন। তবে তা মুতাওয়াতিরের মত পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইয়াক্বীন নয়-শুধু এ কথা বুঝানোর জন্য বলা হয়ে থাকে খবর ওয়াহিদ দ্বারা 'যান্ন' লাভ হয়ে থাকে। সুতরাং এতে হাদীছের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা ক্ষুণ্ণ হয় না। উপরন্তু বিদ্বানদের একটি বড় দল তথা মুহাদ্দিছগণ খবর ওয়াহিদ হাদীছকে 'যান্নী' আখ্যা দেওয়া সমর্থন করেন না। বরং প্রমাণসাপেক্ষে তা ইলমুল ইয়াক্বীন বা নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে মনে করেন, যা আমরা অন্যত্র আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
খ. হাদীছকে যদি 'যান্নী' হওয়ার অভিযোগে পরিত্যাগ করতে হয়, তবে কুরআনও পরিত্যাগ করার অবকাশ সৃষ্টি হয়। কেননা কুরআন বিশুদ্ধতার দিক থেকে 'ক্বাতঈ' বা অকাট্য হলেও অর্থগত দিক থেকে অনেক সময় 'যান্নী' (ظني الدلالة)। যেমন তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে- وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ 'আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন 'কুরু' পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকবে। এখানে 'কুরু' শব্দটি দু'টি অর্থ বহন করে। (১) হায়েয বা ঋতু। (২) তুহুর বা ঋতু শেষে পবিত্রতালাভ। সুতরাং আয়াতটি 'যান্নী' অর্থ দেয়। এখন এই কারণে কি কুরআন বর্জন করতে হবে যে, তা 'যান্নী' অর্থ প্রদান করে?
গ. কুরআন নিজেই 'যান্ন'-কে শারঈ দলীল হিসাবে ব্যবহার করেছে। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ সে স্ত্রীকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তাহ'লে সে যতক্ষণ তাকে ব্যতীত অন্য স্বামী গ্রহণ না করে, ততক্ষণ উক্ত স্ত্রী তার জন্য সিদ্ধ হবে না। অতঃপর যদি উক্ত স্বামী তাকে তালাক দেয়, তখন তাদের উভয়ের পুনরায় ফিরে আসায় কোন দোষ নেই, যদি তারা (দৃঢ়) ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহ্র সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে।' অর্থাৎ এই আয়াতে আল্লাহ পুনরায় স্বামী ও স্ত্রীকে একত্রিত হওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন, যদি তারা উভয়ে আল্লাহ্র সীমারেখার মধ্যে থেকে দাম্পত্য জীবন পরিচালনার (দৃঢ়) ধারণা রাখে। সুতরাং আল্লাহ নিজেই এখানে 'যান্ন'কে শারঈ দলীল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। অতএব খবর ওয়াহিদ হাদীছ 'যান্নী' হওয়ার কারণে তার ওপর আমল পরিত্যাগের কোন সুযোগ নেই।
ঘ. ইসলামী শরী'আতে 'যান্ন'-কে সরাসরি দলীল হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন শারঈ হুকুমসমূহ বাস্তবায়নের মূল স্থান হ'ল আদালত। কিন্তু কেউ কি নিশ্চয়তা দিতে পারে যে, আদালত থেকে প্রত্যেক বিচারক যে হুকুম প্রদান করেন তা শতভাগ সঠিক? যেমন রাসূল (ছা.) বলেন, إنما أنا بشر، وإنكم تختصمون إلي، ولعل بعضكم أن يكون ألحن بحجته من بعض، وأقضي له على نحو ما أسمع، فمن قضيت له من حق أخيه شيئا فلا يأخذ، فإنما أقطع له قطعة 'আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা আমার নিকট বিবাদ মিমাংসার জন্য এসে থাক। তোমাদের এক পক্ষ অন্য পক্ষ অপেক্ষা দলীল-প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে অধিক পারদর্শী হ’তে পারে। অতএব আমি যেভাবে (তোমাদের বক্তব্য) শুনি সেই মোতাবেক ফয়ছালা দেয়ার পর যদি কাউকে তার অন্য ভাইয়ের হক্ দিয়ে দেই, তাহ’লে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, আমি তার জন্য জাহান্নামের একটি অংশই পৃথক করে দিচ্ছি।' অর্থাৎ রাসূল (ছা.) নিজেই যদি তাঁর বিচার শতভাগ সঠিক বা ‘ক্বাতঈ’ হওয়ার নিশ্চয়তা না দেন, তবে অন্যদের ক্ষেত্রে তা কিভাবে অকাট্য নিশ্চয়তা বহন করবে? সুতরাং বিচারিক আদালতগুলো ‘যান্ন’ বা প্রবল ধারণা ভিত্তিক দলীলের আলোকেই পরিচালিত হয়, যা সুপরিজ্ঞাত বিষয়।
দ্বিতীয়ত, আদালত সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করে থাকে। কিন্তু আমরা সকলেই জানি যে, সাক্ষ্য কখনও ভুল হ’তে পারে কিংবা সাক্ষ্যদাতা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েও সাক্ষ্য দিতে পারে। কিন্তু তারপরও সাক্ষীর সততার ওপর আস্থা রাখা হয়। পৃথিবীর মুসলিম, অমুসলিম সমস্ত আদালত সাক্ষ্যের উপর নির্ভরশীল, যা আদ্যোপান্ত ‘যান্নী’। সাক্ষীর জন্য সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতাকে শর্ত করা হয় এজন্য যেন প্রবল ধারণার মাধ্যমে সঠিক বিষয়টি অবগত হওয়া যায়।
فَإِنْ عُثِرَ عَلَى أَنَّهُمَا اسْتَحَقَّا إِثْمًا فَأَخَرَانِ يَقُومَانِ مَقَامَهُمَا مِنَ الَّذِينَ اسْتَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْأَوْلَيَانِ فَيُقْسِمَانِ بِاللَّهِ لَشَهَادَتْنَا أَحَقُّ مِنْ شَهَadَتِهِمَا وَمَا اعْتَدَيْنَا إِنَّا إِذًا لَمِنَ الظَّالِمِينَ
কিন্তু যদি জানা যায় যে, তারা পাপে লিপ্ত হয়েছে, তাহলে প্রথম দু’ব্যক্তি যাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে তাদের থেকে অপর দু’ব্যক্তি এদের স্থলাভিষিক্ত হবে। অতঃপর তারা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলবে, ‘অবশ্যই আমাদের সাক্ষ্য তাদের সাক্ষ্য থেকে অধিক সত্য এবং আমরা সীমালঙ্ঘন করিনি; করলে অবশ্যই আমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হব’। এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সাক্ষীর ভুল হ’তে পারে। ফলে সকল প্রকার সাক্ষ্য ‘যান্নী’, কিন্তু তা শারঈ আইনে দলীল হিসাবে পরিগৃহীত।
৬. পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক তথ্যই পঞ্চেন্দ্রিয় তথা মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণ করা সম্ভব। এমনকি পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা প্রাপ্ত তথ্যও সব সময় নিশ্চয়তাবোধক অর্থ দেয় না। যেমন আমরা রাতের আসমানে খালি চোখে যে তারকার সংখ্যা প্রত্যক্ষ করি, তা সত্য ধারণা দেয় না। কেননা তারার প্রকৃত সংখ্যা আমাদের প্রত্যক্ষকৃত তারকার চেয়ে শত-কোটিগুণ বেশী, যা প্রমাণিত সত্য। অথচ আমরা তা স্বচক্ষেই দেখেছি। দূর পাহাড়ের বড় বড় বৃক্ষরাজি আমাদের চোখে ক্ষুদ্র শাখার মত দেখায়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। অতএব একান্ত স্বচক্ষে দেখা জিনিসও যখন ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তখন সীমিত মানবীয় সামর্থ্য দিয়ে কোন বিষয়ে অকাট্য জ্ঞান লাভের দাবী করা সুকঠিন বিষয়।
চ. খবর ওয়াহিদ 'সুপ্রসিদ্ধ' (مشهور) না হওয়াই তার সঠিক না হওয়ার দলীল- এই দাবীর জবাবে ড. আলী জারীশাহ (১৯৩৫-২০১১খ্রি.) বলেন, কোন বিষয় সুপ্রসিদ্ধ হওয়ার সাথে তার সঠিক হওয়ার সম্পর্ক নেই, যেমন সম্পর্ক নেই সত্য এবং বাস্তবতার মাঝে। সত্য কখনও বাস্তব হ'তে পারে, আবার অবাস্তবও হ'তে পারে। তেমনি বাস্তবতা কখনও সত্য হ'তে পারে, আবার অসত্যও হ'তে পারে। অনুরূপভাবে সুপ্রসিদ্ধ বিষয় কখনও সঠিক হ'তে পারে, তেমনি বেঠিকও হ'তে পারে। আবার সঠিক বিষয় কখনও সুপ্রসিদ্ধ হ'তে পারে, আবার অপ্রসিদ্ধও হ'তে পারে।
ছ. আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.) সম্পর্কে বলেছেন, 'আমার রাসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা তোমরা বর্জন কর'। সুতরাং তা যদি বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া যায়, তবে তার ওপরই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। তাকে অকাট্য এবং ধারণানির্ভর ভাগে বিভক্ত করে কিছু অংশকে স্বীকার করা এবং কিছু অংশ পরিত্যাগ করা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র নীতিবিরোধী। আল্লাহ বলেন, أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ 'তোমরা আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর, আর কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে, পার্থিব জীবনে তাদের দুর্গতি ছাড়া কিছুই পাওয়ার নেই। আর ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।'
টিকাঃ
১৫৫. সূরা আন-নাজম, আয়াত নং: ২৮।
১৫৬. নূর মোহাম্মদ আ'জমী, হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৯-১০।
১৫৭. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ২२৮।
১৫৮. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ২৩০।
১৫৯. ছহীহুল বুখারী, হা/২৪৫৮, ২৬৮০, ৬৯৬৯ প্রভৃতি; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৩।
১৬০. সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত নং: ১০৭।
১৬১. ইসমাঈল সালাফী, হজ্জিয়াতে হাদীছ, পৃ. ৩৩-৩৫।
১৬২. ড. আলী জারীশাহ, মাহাদিরুশ শারী'আহ আল-ইসলামিয়াহ, পৃ. ৩৫।
১৬৩. সূরা হাশর, ৭ নং আয়াত।
১৬৪. ড. মুহাম্মাদ আলী আছ-ছাবৃনী, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ আল-মুতাহহারাহ, পৃ. ৫৯-৬০।
১৬৫. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ৮৫।