📄 সংশয়-৯ : হাদীছের অর্থগত বর্ণনা (الرواية بالمعنى) প্রমাণ করে যে, হাদীছ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি
হাদীছ অস্বীকারকারীগণ বলে থাকেন যে, হাদীছ সংকলনে বিলম্ব ঘটার ফলে তাতে শব্দগত বর্ণনার পরিবর্তে অর্থগত বর্ণনা )الرواية بالمعني( তথা ভাবার্থের প্রচলন ঘটেছে। ফলে হাদীছ বর্ণনায় প্রচুর কম-বেশী হয়েছে এবং হাদীছের মৌলিক অর্থের পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটেছে। সুতরাং হাদীছ শরী'আতের দলীল হওয়ার উপযুক্ত নয়। এমনকি এজন্য আরবী বৈয়াকরণিকগণ হাদীছ দ্বারা কোন দলীল পেশ করেন না। কেননা হাদীছের শব্দসমূহ রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত শব্দ নয়; বরং বর্ণনাকারীদের নিজস্ব শব্দচয়ন। হাদীছ যদি অহী হ'ত তবে অবশ্যই তা শব্দগতভাবে সংরক্ষিত হ'ত। অনুরূপভাবে প্রাচ্যবিদগণও হাদীছের Narrative Structure- কে কেন্দ্র করে সমালোচনার প্রয়াস পেয়েছেন এবং একে হাদীছ মনগড়া হওয়ার দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।
পর্যালোচনা:
হাদীছের অর্থগত বর্ণনা (الرواية بالمعني) মুহাদ্দিছদের নিকট একটি সুপরিচিত বিষয়। এটি বৈধ না অবৈধ তা নিয়ে মুহাদ্দিছদের মধ্যে শুরু থেকেই মতভেদ ছিল। এ বিষয়ে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করেছেন। ছাহাবী, তাবেঈ এবং পরবর্তী বিদ্বানদের একটি অংশ হাদীছের অর্থগত বর্ণনাকে বৈধ মনে করতেন না। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) সামান্য শব্দগত পরিবর্তনকেও গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। একবার তাঁর সামনে এক ব্যক্তি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ উল্লেখ করলেন যে, إنما مثل المنافق مثل الشاة بين الربيضين من الغنم 'মুনাফিকের উদাহরণ হ'ল, ছাগলের দু'টি পালের মধ্যে আবর্তনকারী ছাগলের মত।' আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তৎক্ষণাৎ সংশোধনী দিয়ে বললেন যে, বাক্যটি এমন নয়; বরং রাসূল (ছা.) বলেছেন, مثل المنافق مثل الشاة بين الغنمين এখানে দু'টি বাক্যের অর্থ একই। কেবল শব্দের সামান্য পার্থক্য হয়েছে। তবুও আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় তাঁর সম্মুখে জনৈক ব্যক্তি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করছিলেন। তিনি সিয়াম ও হজ্জকে আগে-পরে করে বর্ণনা করেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তাকে বললেন, لا، ولكن حج البيت وصيام رمضان، هكذا قال رسول الله صلى الله عليه وسلم 'না এভাবে নয়, বরং বায়তুল্লাহয় হজ্জ্ব এবং রামাযানের ছিয়াম। এভাবেই রাসূল (ছা.) বলেছেন। এখানে তিনি শব্দের সামান্য আগে-পরে হওয়াকেও অনুমোদন করেননি। অনুরূপভাবে তাবেঈ ফক্বীহ আল-ক্বাসিম ইবনু মুহাম্মাদ (১০৭হি.) এবং মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (১১০হি.), ইমাম মালিক (১৭৯হি.), আব্দুর রহমান ইবনুল মাহদী (১৯৮হি.) প্রমুখও হাদীছের শব্দগত বর্ণনার ওপর জোর দিতেন এবং অর্থগত বর্ণনা করাকে নিষেধ করতেন।
তারা মনে করতেন, রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত শব্দসমূহের মাঝে কম-বেশী করা হ'লে তাতে অর্থগত পরিবর্তনের আশংকা থাকে। যেমন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, من سمع حديثا فحدث به کما سمع، فقد سلم ‘যে ব্যক্তি কোন হাদীছ শুনল এবং যেভাবে শুনল সেভাবেই বর্ণনা করল, সে ব্যক্তি নিরাপদ থাকল। আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর (১১০হি.) বলেন, والله إني لأحدث بالحديث فما أدع منه حرفا 'আল্লাহ্র কসম! আমি যখন হাদীছ বর্ণনা করি তখন (সংক্ষেপায়নের উদ্দেশ্যে) একটি শব্দও ছাড়ি না।
তবে অধিকাংশ বিদ্বানের মতে, অর্থগত বর্ণনা শর্তসাপেক্ষ বৈধ। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.), আনাস ইবনু মালিক (রা.), ইবরাহীম আন-নাখঈ (৯৬হি.), আমের আশ-শা'বী (১০০হি.), হাসান আল-বছরী (১১০হি.) প্রমুখ অর্থগত হাদীছ বর্ণনায় আপত্তি করতেন না, যদি মূল মর্মার্থ ঠিক থাকে। এজন্যই আমরা হাদীছ শাস্ত্রে সূত্র ভেদে একই হাদীছ ভিন্ন ভিন্ন শব্দে দেখতে পাই, যদি ভাবার্থ একই হয়ে থাকে। ছাহাবী এবং তাবেঈদের মধ্যে মূল অর্থ ঠিক রেখে এমন ভাবার্থবোধক বর্ণনার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কেননা তারা সুন্নাহর ক্ষেত্রে শব্দের চেয়ে অর্থের প্রতি বেশী গুরুত্বারোপ করতেন।
ছাহাবী ওয়াছিলাহ ইবনুল আছক্কা' (রা.)- কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হ'লে তিনি বলেন, 'তোমাদের সামনে কুরআন লিপিবদ্ধ রয়েছে, তবুও তোমরা মুখস্থ করতে বেগ পাও এবং তাতে (শব্দে) কম-বেশী হচ্ছে কি না সন্দেহে পতিত হও। তাহ'লে হাদীছের ক্ষেত্রে কী হ'তে পারে, যা আমরা হয়তবা একবারই রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে শুনেছি?... অতএব আমরা অর্থগতভাবে হাদীছ বর্ণনা করলে তা-ই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।
হাসান বাছরী (১১০হি.) এবং ইবনু শিহাব আয-যুহরী (১২৪হি.) বলেন, لا بأس بالحديث إذا أصبت المعنى '(অর্থগতভাবে) হাদীছ বর্ণনায় কোন সমস্যা নেই যদি অর্থটি সঠিক থাকে।
হাসান বাছরী (১১০হি.) এর পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন أن الله تعالى قد قص من أنباء ما قد سبق قصصا كرر ذكر بعضها في مواضع بألفاظ مختلفة، والمعنى واحد (কুরআনে) বর্ণনা করেছেন এবং বিভিন্ন স্থানে গল্পগুলোর অংশবিশেষ ভিন্ন ভিন্ন শব্দে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার অর্থ একই। অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই কুরআনে যেমন আদম (আ.), মূসা (আ.) প্রমুখের সাথে কথোপকথনগুলো অনেক স্থানে উল্লেখ করেছেন এবং তাতে শব্দগুলো স্থান ভেদে বেশ পরিবর্তিত হয়েছে, যদিও তাতে অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সুতরাং অর্থগত বর্ণনা বৈধ।
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (১১০হি.) বলেন, كنت أسمع الحديث من عشرة المعنى واحد واللفظ مختلف যার অর্থ এক; কিন্তু শব্দ বিভিন্ন।
তাবেঈ যুরারাহ ইবনু আওফা (৯৩হি.) বলেন, لقيت أناسا من أصحاب رسول الله، فاجتمعوا في المعنى واختلفوا علي في اللفظ، فقلت لبعضهم ذلك، فقال: لا بأس ما لم يحيل المعنى আমি রাসূল (ছা.)-এর ছাহাবীদের মধ্য থেকে অনেকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তারা (হাদীছ বর্ণনা করতেন), যা অর্থের দিক থেকে একই হ'ত, যদিও শব্দের দিক থেকে বিভিন্ন হ'ত। আমি তাদের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এতে কোন সমস্যা নেই, যতক্ষণ না অর্থ পরিবর্তিত হয়।
ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) এই মতের পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেন রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ إن هذا القرآن أنزل على سبعة أحرف فاقرءوا ما تيسر 'নিশ্চয়ই কুরআন সাতটি হরফে নাযিল হয়েছে, অতঃপর তোমরা পড় যা তোমাদের জন্য সহজ হয়। তিনি বলেন, যদি আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি সহজতার জন্য কুরআন সাতটি হরফে নাযিল করে থাকেন, এটা জানিয়ে দিতে যে শব্দ ভিন্ন হ'লেও তা পাঠ করা বৈধ, যতক্ষণ না তাতে অর্থের কোন পরিবর্তন আসে; তবে কুরআন ভিন্ন অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে তা আরও বেশী বৈধ, যদি না অর্থের পরিবর্তন হয়। আর প্রত্যেক যেসব হাদীছে কোন হুকুম উল্লিখিত হয় না, তাতে শব্দের পরিবর্তন ঘটলেও অর্থের পরিবর্তন ঘটে না।
আল-আমিদী (৬৩১হি.) এটি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা' রয়েছে মন্তব্য করে বলেন, ،والمختار مذهب الجمهور، ويدل عليه النص، والإجماع والأثر والمعقول 'এটাই হ'ল জুমহুর বিদ্বানদের গৃহীত মাযহাব। যা নছ, ইজমা', আছার এবং যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত।
وَﻣِﻦْ ﺃَﻗْﻮَﻯ ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, حُجَجِهِمْ الإِجْمَاعُ ﻋَﻠَﻰ ﺟَﻮَﺍﺯِ ﺷَﺮْﺡِ ﺍﻟﺸَّﺮِﻳﻌَﺔِ ﻟِﻠْﻌَﺠَﻢِ ﺑِﻠِﺴَﺎﻧِﻬَﺎ ﻟِﻠْﻌَﺎﺭِﻑِ ﺑِﻪِ، ﻓَﺈِﺫَﺍ 0 0 3 ﺟَﺎﺯَ ﺍﻟْﺈِﺑْﺪَﺍﻝُ ﺑِﻠُﻐَﺔٍ ﺃُﺧْﺮَﻯ، ﻓَﺠَﻮَﺍﺯُﻩُ ﺑِﺎﻟﻠُّﻐَﺔِ ﺍﻟْﻌَﺮَﺑِﻴَّﺔِ ﺃَﻭْﻟَﻰ দলীল হ'ল অনারব ভাষাভাষীদের জন্য তাদের ভাষায় শরী'আতের বিধানসমূহ ব্যাখ্যা করার অনুমোদনে মুসলিম উম্মাহর ইজমা'। যদি তা অন্য ভাষায় পরিবর্তন করা বৈধ হয়, তবে আরবী ভাষার মধ্যে (তার শব্দগত পরিবর্তন) অধিকতর বৈধ।
আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী (১৩৮৬হি.) বলেন, 'আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি যে ছাহাবীগণ স্বাভাবিক নিয়মেই দ্বীন প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যারা রাসূল (ছা.)-এর বিবরণ শব্দে শব্দে মুখস্থ রাখতে পেরেছিলেন তারা সেভাবেই প্রচার করেছিলেন। আর যারা অর্থ মনে রেখেছিলেন তারা অর্থগতভাবে হাদীছ প্রচার করেছিলেন। এটি একটি সুনিশ্চিত বিষয় যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এই নীতিই রাসূল (ছা.)- এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর ছাহাবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।
সুতরাং কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ছাহাবী এবং তাবেঈদের যুগে বাধ্যগত অবস্থায় হাদীছের অর্থগত বিবরণ প্রচলিত ছিল। তবে তা শর্তহীন ছিল না। বরং অর্থগত বর্ণনাকারীর জন্য ইমাম শাফেঈসহ বিদ্বানগণ কিছু কঠোর শর্ত নির্ধারণ করেছেন। যেমন: (১) তাকে আরবী ভাষা এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহ সর্ম্পকে অভিজ্ঞ হতে হবে। (২) বাক্যের অর্থ এবং অন্তর্গত ফিক্হ সম্পর্কে জ্ঞাত হ'তে হবে। (৩) কিসে অর্থের পরিবর্তন ঘটে বা না ঘটে সে সম্পর্কে সচেতন হ'তে হবে। এভাবে যদি কোন বর্ণনাকারী অর্থের পরিবর্তন সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হয়, তবেই তার জন্য অর্থগত বর্ণনা বৈধ হবে। অন্যথায় তাকে শব্দগতভাবেই বর্ণনা করতে হবে।
এছাড়া অর্থগতভাবে বর্ণনা করার সময় আরও খেয়াল রাখতে হবে যে, হাদীছটির মতনটি যেন (جوَﺍﻣِﻊُ ﺍﻟْﻜَﻠِﻢِ )সারগর্ভ বাক্য) বা রাসূল (ছা.)-এর 'সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য'-এর অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং এমন না হয় যা দ্বারা ইবাদত করা হয়। যেমন আযানের বাক্যসমূহ, বিভিন্ন মাসনূন দোআ ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, হাদীছ সংকলন সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থগত বর্ণনার এই নীতি সাধারণভাবে আর বৈধ নয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহাদ্দিছদের নিকট কোন হাদীছ মূল শব্দে বর্ণনা করাই সাধারণ নীতি। কিন্তু হাদীছের মূল শব্দটি ভুলে গেলে ইলম গোপনের আশংকায় শর্তসাপেক্ষে অর্থগত বর্ণনার অনুমোদন রয়েছে, যদি তাতে অর্থের পরিবর্তন না হয়। আর যদি অর্থ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সকল বিদ্বানের ঐক্যমতে অর্থগত বর্ণনা নিষিদ্ধ। খত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) বলেন, وليس بين أهل العلم خلاف في أن ذلك لا يجوز للجاهل بمعنى الكلام وموقع الخطاب ، والمحتمل منه وغير المحتمل 'বিদ্বানদের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, বাক্যের অর্থ, প্রাসঙ্গিকতা, সম্ভাব্যতা ও অসম্ভাব্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অর্থগত বর্ণনা বৈধ নয়।
সুতরাং হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণামতে প্রথম যুগে ঢালাওভাবে হাদীছের অর্থগত বর্ণনার প্রচলন ছিল একথা মোটেও সত্য নয় এবং যারা অর্থগত বর্ণনা করতেন তাদের জন্যও হাদীছের মূল অর্থে কোন পরিবর্তন ঘটানোর কোন অনুমোদন ছিল না। ফলে এর মাধ্যমে হাদীছের অর্থে বিকৃতি ঘটা কিংবা হাদীছের মৌলিকত্ব বিনষ্ট হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিশেষত ছাহাবী এবং তাবেঈদের এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন থেকে এটি জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়। নিম্নে আমরা এ বিষয়ে হাদীছ অস্বীকারকারীদের আরও কিছু ধারণা খণ্ডন করব।
ক. কুরআনের মত হাদীছও কেন শব্দগতভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হ'ল না? এই প্রশ্নের জবাবে ড. আবু যাহু বলেন, কুরআনকে শব্দগতভাবে সংরক্ষণের কারণ ছিল এই যে, কুরআন তেলাওয়াত হ'ল ইবাদত। তার আয়াতসমূহ হ'ল আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মু'জিযাস্বরূপ। এজন্য তা অর্থগত বর্ণনার কোন অনুমোদন নেই। বরং তার নাযিলকৃত শব্দ হুবহু সংরক্ষণ করা আবশ্যক। আর হাদীছ শব্দগতভাবে সংরক্ষণ না করার কারণ হ'ল, হাদীছের ক্ষেত্রে শব্দ নয় বরং অর্থ হ'ল মুখ্য বিষয়। এজন্য হাদীছ তেলাওয়াতও করা হয় না। হাদীছের মতনসমূহ মু'জিযাও নয়। সুতরাং তার অর্থগত বর্ণনায় কোন বাধা নেই। দ্বিতীয়ত, কুরআনের শব্দগত সংরক্ষণ সমগ্র শরীআতের জন্য রক্ষাকবচ। আর সুন্নাহর ক্ষেত্রে অর্থগত সংরক্ষণে দায়মুক্তি প্রদান মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সহজীকরণ। কেননা যদি মুসলিম উম্মাহ কুরআনের মত সুন্নাহকেও শব্দে শব্দে সংরক্ষণ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হ'ত, তবে তাদেরকে হাজারো সীমাবদ্ধতা ও সংকটের সম্মুখীন হ'তে হ'ত। আবার যদি সুন্নাহর মত কুরআনও অর্থগতভাবে বর্ণনার সুযোগ থাকত তবে কিছু মানুষ তাতে অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ পেত যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত নয়। ফলে আল্লাহ কুরআনকে শব্দগতভাবে সংরক্ষণ করে একদিকে শরী'আতকে রক্ষা করেছেন। অপরদিকে সুন্নাহকে অর্থগতভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন। তৃতীয়ত, আমরা লক্ষ্য করেছি যে সুন্নাহর অর্থগত বর্ণনা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। ফলে শব্দগতভাবে সংরক্ষিত না হ'লেও এর মূল অর্থে বিকৃতি ঘটার কোন সুযোগ নেই। চতুর্থত, যদি বলা হয় যে, রাসূল (ছা.) শব্দগতভাবে সংরক্ষণ করে গেলে সুন্নাহর প্রতি আস্থা রাখা যেত, তাহ'লে এ কথার দ্বারা রাসূল (ছা.)-এর ওপর সরাসরি অভিযোগের তীর ছোড়া হয় যে, তিনি সঠিকভাবে দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব পালন করেননি কিংবা সুন্নাহ দ্বীনের অংশ নয়। এ দু'টি কথাই মানুষকে পথভ্রষ্টকারী।
খ. কুরআনের মত হাদীছ শব্দগতভাবে নাযিল হয়নি। সুতরাং তা শব্দগতভাবে সংরক্ষণের কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। এজন্য রাসূল (ছা.) নিজেই অর্থগত বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ একই বিষয়ের বিবরণ সময় ও স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে প্রদান করেছেন। যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ আমল সম্পর্কে যতবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রতিবার তিনি কিছুটা পরিবর্তিত উত্তর প্রদান করেছেন। ফলে যে কোন সাধারণ পাঠক ভেবে বসতে পারে যে, এটি স্ববিরোধিতা কিংবা বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বা অর্থগত বর্ণনার ফল। অথচ বাস্তবতা হ'ল, রাসূল (ছা.) ছিলেন মানসিক চিকিৎসক। তিনি প্রত্যেক মানুষকে তার উপযোগী করে প্রয়োজনীয় উত্তর প্রদান করতেন বা প্রশ্নকারীর অবস্থা বুঝে উত্তর দিতেন। তাঁর নিকট দেশ-বিদেশ থেকে সর্বদা মানুষ আসত এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করত। তিনি সকলের অবস্থা অনুযায়ী সংক্ষেপে কিংবা দীর্ঘ করে প্রশ্নের উত্তর দিতেন। ফলে একই প্রশ্নের উত্তরে কখনও কোন বর্ণনাকারীর বর্ণনায় দীর্ঘ করে কিংবা সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। এটা বর্ণনাকারী বা অর্থগত বর্ণনার ত্রুটি নয়। বরং এভাবেই রাসূল (ছা.) বর্ণনা করেছিলেন। যেমনভাবে কুরআনেও আমরা লক্ষ্য করি যে, নবীদের কাহিনী বর্ণনার সময় একই ঘটনা বিভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের ওপর অবিশ্বাসী অজ্ঞ পাঠক এটি কুরআনের ভুল ও স্ববিরোধীতা ধরে নিতে পারে। অথচ বাস্তবে তা নয়। কেননা কুরআনে কোন প্রকার ভুল বা মিথ্যার সন্নিবেশ ঘটার সুযোগ নেই। সুতরাং হাদীছের অর্থগত বর্ণনাকে এর দুর্বলতা ভাবার সুযোগ নেই।
গ. বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীছসমূহ যদি আমরা প্রায়োগিকভাবে বিশ্লেষণ করি তাহ'লে দেখব যে, কোন হাদীছে শব্দগত কিছু পরিবর্তন আসলেও তার বিষয়বস্তুতে মৌলিক কোন পরিবর্তন আসে নি। উদাহরণস্বরূপ এ পর্যন্ত প্রাপ্ত হাদীছ শাস্ত্রের সর্বাধিক প্রাচীন লিখিত সংকলন ছহীফা হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ, যা ১ম হিজরী শতকে সংকলিত হয়েছিল, তাতে মূসা (আ.)-এর বস্ত্র উন্মোচিত হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনাটি এসেছে। একই হাদীছ প্রায় দুইশত বছর পর ৩য় হিজরী শতকে সংকলিত ছহীহুল বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ মা'মার ইবনু রাশেদ আব্দুর রায্যাক ইবনু হাম্মام ইসহাকু ইবনু ইবরাহীম ইবনু নাছর (বুখারী), মুহাম্মাদ ইবনু রাফি' (মুসলিম) সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে হুবহু প্রায় একই শব্দে। অনুরূপভাবে হাদীছটি ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা (রা.) থেকে অন্য দুই বর্ণনাকারী খাল্লাস ইবনু আমর (১০০হি.) এবং মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ আল-কুরাশী সূত্রে এবং ইমাম মুসলিম অপর একজন বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ ইবনু শাক্বীক আল-উকাইলী (১০৮হি.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। অথচ লক্ষ্যণীয় যে এই দীর্ঘ পরিক্রমায় নানা সূত্রের বর্ণনাকারী ভেদে হাদীছের শব্দগত কিছু পরিবর্তন হ'লেও মূল বিষয়বস্তুর কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
এজন্য প্রাচ্যবিদদের মধ্যে যারা হাদীছের এই বর্ণনাধারা সম্পর্কে তুলনামূলক গবেষণা চালিয়েছেন তাঁরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, হাদীছ বর্ণনাকারীগণ রাসূল (ছা.)-এর বাণীকে যথাযথ ও সুসংহতভাবেই সংরক্ষণ করেছেন। যেমন ড. নাবিয়া এ্যাবোট (১৮৯৭-১৯৮১খ্রি.) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ Studies in Arabic literary papyri গ্রন্থে তিনি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিসমূহ বিশ্লেষণ করে বিষদভাবে তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীদের বর্ণনায় তেমন কোন বিভক্তি দেখা যায়নি শব্দের কিছু পার্থক্য ছাড়া। এমনিভাবে মুসনাদ আবূ দাউদ আত-তায়ালিসীর হাদীছসমূহের বর্ণনাভঙ্গির ওপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী আমেরিকান গবেষক R. Marston Speight (১৯২৪-২০১১খ্রি.) মুসনাদ তায়ালিসী'র ২৭৬৭টি হাদীছের ওপর বর্ণনাভঙ্গি গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যুগপরম্পরায় হাদীছ বর্ণনাকারীগণের অর্থগত বর্ণনা বিস্ময়করভাবে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহে মৌলিক কোন পরিবর্তন সাধন করেনি। তিনি বলেন, This investigation of two-, three-, and four-part narrative forms contributes to a fuller appreciation of hadith in their phenomenal reality and in their total living context. It helps us to see how hadith transmitters informed the memory of the prophetic model with clear and consistent structural line.
ঘ. হাদীছের শব্দগত বিভিন্নতা কেবল প্রভাবিত করে কওলী তথা রাসূল (ছা.)-এর কথ্য হাদীছকে, যা তুলনামূলক কম সংখ্যক। কিন্তু বেশীর ভাগ হাদীছসমূহ তথা ফে'লী (কর্মগত) এবং তাকুরীরী (অনুমোদনসূচক) হাদীছসমূহে এর কোন প্রভাব নেই। কেননা কোন কর্ম বা অনুমোদনের বিবরণ কখনও একই শব্দে হ'তে পারে না। বর্ণনাকারী ভেদে তাতে ভিন্নতা আসবেই, যা সুপরিজ্ঞাত বিষয়। সুতরাং কথা উঠতে পারে কেবল সে সকল হাদীছে যেখানে ছাহাবী বলেছেন ...قال رسول الله صلى الله عليه وسلم রাসূল (ছা.) বলেছেন..'। যদি এই কওলী হাদীছগুলো বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় দুই জন বা তিন ছাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে কতিপয় শব্দের কম-বেশী ছাড়া মূল বক্তব্যের কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ছাহাবীগণ এবং পরবর্তী বর্ণনাকারীগণ হাদীছ বর্ণনার সময় শব্দগত বিবরণের চেষ্টায় কোন অবহেলা করেননি। বরং তারা সাধ্যমত হুবহু বর্ণনার চেষ্টা করেছেন। এতে কখনও হয়ত শব্দের আগ-পিছ হয়েছে কিংবা কোন শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যা হাদীছের মূল অর্থ বা বিষয়বস্তুর কোন পরিবর্তন ঘটায় নি।
৬. হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীগণ এমনই সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে قال, أو كما ورد, أو كما قال, أو نحوه, أو شبهه : Ja (ছা.) সম্ভবত অনুরূপ বলেছেন' বা 'সম্ভবত এভাবে বর্ণিত হয়েছে' ইত্যাদি অনিশ্চয়তাবোধক বক্তব্য। হাদীছ গ্রন্থসমূহে এমন উদাহরণ অসংখ্য পাওয়া যায়। শুধু রাসূল (ছা.)-ই নন বরং ঊর্ধ্বতন যে কোন বর্ণনাকারী বা তার বর্ণনা সম্পর্কে তাঁরা এমন সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সন্দেহ হলেই তা প্রকাশ করতেন। যা মুহাদ্দিছদের নিকট شك من الراوى )বর্ণনাকারীর সন্দেহ( হিসাবে পরিচিত। ইমাম ইবনু মাজাহ (২৭৩হি.) তাঁর সুনানে একটি অধ্যায় باب التوقي في الحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم -108 (রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন) শিরোনামে এবং এতে ছাহাবী ও তাবেঈদের সতর্কতা সম্পর্কে বেশ কিছু বর্ণনা একত্রিত করেছেন। যেমন ইবনু সীরীন হ'তে বর্ণিত আনাস (রা.) রাসূল (ছা.) হ'তে কোন হাদীছ বর্ণনার সময় ভীত হ'তেন এবং বলতেন: أو كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم অথবা রাসূল (ছা.) অনুরূপ বলেছেন'। তাবেঈ এবং তৎপরবর্তী যুগেও অনেক বর্ণনাকারী এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন বর্ণ ও অব্যয় পর্যন্ত পরিত্যাগ করতেন না। সুলায়মান ইবনু মিহরান আল-আ'মাশ كان هذا العلم عند أقوام كان أحدهم لأن يخر من السماء al 19 (1) أحب إليه من أن يزيد فيه واوا أو ألفا أو دالا মানুষের নিকট রক্ষিত ছিল যাদের কারো নিকট হাদীছের মধ্যে 'ওয়াও', 'আলিফ', 'দাল' বৃদ্ধি করা থেকে আসমান থেকে পড়ে যাওয়াই অধিক প্রিয়তর ছিল।
ইমাম মুসলিম (২৬১হি.)-এর 'ছহীহ' অধ্যয়ন করলে এই সতর্কতা চমৎকারভাবে অনুধাবন করা যায়। তিনি মতনে সামান্য একটি সমার্থবোধক শব্দের পরিবর্তন পেলেও তা উল্লেখ করেছেন। যাতে অর্থের কোনই পরিবর্তন হয় না কিংবা হলেও এত সূক্ষ্ম পরিবর্তন যা প্রকৃত জ্ঞানী ব্যতীত কেউ অনুভব করতে পারবে না। এছাড়া ইমাম আহমাদ (২৪১হি.) তাঁর মুসনাদে এবং আবূ দাউদ তাঁর সুনানে এই নীতি সূক্ষ্মভাবে অবলম্বন করেছেন। এছাড়া কোন হাদীছের ক্ষেত্রে সত্য সত্যই এমন শব্দ যদি ঢুকে যায় যা রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত বাক্য নয় বলে অনুমিত হয়, তবে মুহাদ্দিছগণ সেটি المدرج বা অনুপ্রবিষ্ট কথা হিসাবে চিহ্নিত করে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, হাদীছের অর্থগত বর্ণনার কারণে হাদীছের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতায় কোন প্রভাব পড়ে না। আর এতে হাদীছের অর্থে ও বিষয়বস্তুতে কোন বিকৃতিরও প্রশ্ন আসে না। অতএব এ যুক্তিও এখানে প্রযোজ্য নয় যে, হাদীছের ভাষ্যসমূহ রাসূল (ছা.)-এর নিজের বর্ণিত শব্দ নয় বরং তা পরবর্তী বর্ণনাকারীদের নিজস্ব চয়ন। বরং অর্থগত বর্ণনকে আমরা কুরআনের প্রচলিত বিভিন্ন 'কিরাআত'-এর সাথে তুলনা করতে পারি, যাতে শব্দের ভিন্নতায় মূল অর্থের পরিবর্তন হয় না।
চ. কতিপয় প্রাচীন ভাষাবিদ যেমন সিবওয়াইহ (১৮০হি.), আবুল হাসান আল-কিসাঈ (১৮৯হি.), আবু যাকারিয়া আল-ফারা (২০৭হি.) প্রমুখ বিশুদ্ধ আরবী ভাষার দলীল হিসাবে তাঁদের গ্রন্থসমূহে কুরআনের আয়াত কিংবা আরবী কবিতাসমূহ ব্যবহার করলেও হাদীছের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেননি কেন? এ প্রশ্নের জবাবে ড. ছুবহী ছালিহ বলেন, এর কারণ সম্ভবত তৎকালীন সময়ে হাদীছ ও ফিকহের পণ্ডিত ব্যতীত অন্যদের নিকট হাদীছগ্রন্থ সমূহের দুষ্প্রাপ্যতা। নতুবা তারা আরবী কবিতার আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে হাদীছ থেকেই উদ্ধৃতি দিতেন, যেমনটি দেখা গেছে পরবর্তী ভাষাবিদদের ক্ষেত্রে।
যেমন আবুল মানছুর আল-আযহারী (৩৭০হি.) সংকলিত تهذيب اللغة , ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ আল-জাওহারী (৩৯৩হি.) সংকলিত الصحاح, ইবনু ফারিস (৩৯৫হি.) সংকলিত معجم مقاييس اللغة প্রভৃতি অভিধানে হাদীছ থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে। সুতরাং এই যুক্তিও হাদীছ অস্বীকারের জন্য কোন দলীল হ'তে পারে না।
টিকাঃ
১১৩. মাহমুদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩৪৫।
১১৪. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭১-২১১।
১১৫. তদেব, পৃ. ১৭৩।
১১৬. তদেব, পৃ. ১৭৬।
১১৭. তদেব, পৃ. ১৮৬।
১১৮. ইবনু আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫০; খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৮৯।
১১৯. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৬৭।
১২০. আস-সারাখসী, উছুলুস সারাখসী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৫; ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফীল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪১৩।
১২১. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭২।
১২২. তদেব, পৃ. ১৯০।
১২৩. ইবনুছ ছালাহ, মুক্কাদ্দামাতু ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২১৪; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুর্গীছ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৮; জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, কাওয়াঈদুত তাহদীছ, পৃ. ২২১।
১২৪. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৮৬, ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফীল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪২১।
১২৫. ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দামাতু ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২১৪।
১২৬. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৫।
১২৭. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ২০৭। এ বিষয়ে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) ৩টি মারফু হাদীছ উল্লেখ করেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূল (ছা.)- কে জিজ্ঞাসা করল যে, হে রাসূল! আমরা আপনার নিকট হাদীছ শুনি। কিন্তু ঠিক যেভাবে শুনেছি, সেভাবে অনেক সময় অপরের নিকট বর্ণনা করতে পারি না। তখন রাসূল (ছা.) বললেন إذا لم تحرموا حلالا ولا تحلوا حراما وأصبتم المعنى فلا بأس 'যদি তোমরা হারামকে হালাল না কর এবং হালালকে হারাম না কর এবং অর্থ ঠিক রাখতে পার তবে কোন সমস্যা নেই' (পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৯-২০০)। কিন্তু এগুলোর কোনটিই ছহীহ নয়। আল-জাওয়াক্বানী (৫৪৩হি.) বলেন, هذا حديث باطل، وفي إسناده اضطراب 'এই হাদীছ বাতিল এবং এর সনদে অসংলগ্নতা রয়েছে'। দ্র. আল-জাওরাকানী, আল-আবাজ্বীল ওয়াল মানাকীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৩। ইবনু রজব (৭৯৫হি.) এ প্রসঙ্গে বলেন, روي فيه أحاديث مرفوعة، لا يصح شيء منها বিষয়ে কিছু মারফু' হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যার কোনটিই ছহীহ নয়'। দ্র. ইবনু রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৯।
১২৮. আর-রামহারমুখী, আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল, পৃ. ৫২৯।
১২৯. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ২০৬।
১৩০. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭০; ইবনু রজব, শারহ ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৮।
১৩১. ছহীহুল বুখারী, হা/৬৯৩৬; ৭৫৫০।
১৩২. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭০।
১৩৩. আল-আমিদী, আল-ইহকাম ফী উছলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০৩।
১৩৪. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৯৭; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৬।
১৩৫. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৭৮।
১৩৬. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ৩৮০; আর-রামহারমুখী, আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল, পৃ. ৫২৯।
১৩৭. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৭-৫৩৮; আবু যাহ্, আল- হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২০১।
১৩৮. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, جميع ما تقدم يتعلق بالجواز وعدمه، ولا شك أن الأولى إيراد الحديث بألفاظه دون التصرف فيه (নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৯৭)।
১৩৯. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৭।
১৪০. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৯৮।
১৪১. আবু যাহ্, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২০১।
১৪২. তদেব, পৃ. ২০৭-২০৮।
১৪৩. হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ, ছহীফাহ হাম্মাদ ইবনু মুনাব্বিহ, তাহক্বীক: আলী হাসান আলী আব্দুল হামীদ (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৯৮৭খ্রি.), পৃ. ৪৪, হা/৬০।
১৪৪. ছহীহুল বুখারী, হা/২৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৯।
১৪৫. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৪o৪।
১৪৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৯।
১৪৭. Nabia Abbott, Studies in Arabic Literary Papyri: Quranic Commentary and Tradition, vol. 2, p.1.
১৪৮. The Musnad of Al-Tayalisi: A Study of Islamic Hadith as Oral Literature (Connecticut (USA) : Hartford Seminary Foundation, 1970).
১৪৯. Narrative Structures in the Hadith (Chicago: Journal of Near Eastern Studies, Vol. 59, No. 4 (Oct., 2000), pp. 271.
১৫০. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৭৯।
১৫১. সুনান ইবনু মাজাহ, হা/২৪।
১৫২. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭৭।
১৫৩. শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪১।
১৫৪. ছুবহী ছালিহ, উলূমুল হাদীছ ওয়া মুহত্বলাহুহু, পৃ. ৩২২।
📄 সংশয়-১০ : হাদীছ হুকুমগতভাবে যান্নী বা ধারণা নির্ভর
হাদীছ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিদের নিকট অজানা নয় যে, খবর ওয়াহিদ হাদীছকে বিদ্বানদের একটি দল 'যান্নী' আখ্যায়িত করেছেন, যা প্রবল ধারণার অর্থ দেয় এবং এর ভিত্তিতে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব হয়। কিন্তু হাদীছ অস্বীকারকারীগণ বিদ্বানদের এই 'যান্নী' শব্দটি হাদীছ অস্বীকারের জন্য দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং ধারণা করেছেন, যেহেতু হাদীছ 'যান্নী' বা ধারণা নির্ভর, অতএব তা শারঈ বিষয়ে বৈধ নয়। তাদের দলীল হ'ল, আল্লাহ বলেছেন, وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا 'আর নিশ্চয় ধারণা সত্যের মোকাবেলায় কোনই কাজে আসে না।'
পর্যালোচনা: ক. খবর ওয়াহিদ হাদীছ 'যান্নী' হওয়া বিদ্বানদের একটি বিশেষ পরিভাষা। যার অর্থ হ'ল, খবর ওয়াহিদ হাদীছ যাবতীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর অপেক্ষাকৃত প্রবল ধারণাভিত্তিক জ্ঞান প্রদান করে। বিদ্বানগণ হাদীছটির সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রবল সতর্কতাস্বরূপ আল্লাহর ওপর যিম্মাদারী ছেড়ে দিতে খবর ওয়াহিদকে 'যান্নী' বলেন। যেমনভাবে একজন মুফতী নিজের প্রদত্ত ফৎওয়ার উপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখার পরও বলেন যে, والله أعلم 'আল্লাহই অধিক অবগত'। সুতরাং এখানে 'যান্নী' পরিভাষাটি উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত নিন্দিত ধারণা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র পরিভাষা। বিদ্বানগণ খবর ওয়াহিদকে যখন 'যান্নী' বলেন, তখন তার ওপর প্রবল ধারণাভিত্তিক নিশ্চিত বিশ্বাস রেখে তার ওপর আমল করা ওয়াজিব বলে থাকেন। অর্থাৎ তারা খবর ওয়াহিদকে অনিশ্চিত )الوهم( বা সন্দেহ )الشك( পূর্ণ মনে করেন না, বরং নিশ্চিত বিশ্বাসই মনে করেন। তবে তা মুতাওয়াতিরের মত পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য ইয়াক্বীন নয়-শুধু এ কথা বুঝানোর জন্য বলা হয়ে থাকে খবর ওয়াহিদ দ্বারা 'যান্ন' লাভ হয়ে থাকে। সুতরাং এতে হাদীছের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা ক্ষুণ্ণ হয় না। উপরন্তু বিদ্বানদের একটি বড় দল তথা মুহাদ্দিছগণ খবর ওয়াহিদ হাদীছকে 'যান্নী' আখ্যা দেওয়া সমর্থন করেন না। বরং প্রমাণসাপেক্ষে তা ইলমুল ইয়াক্বীন বা নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে মনে করেন, যা আমরা অন্যত্র আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
খ. হাদীছকে যদি 'যান্নী' হওয়ার অভিযোগে পরিত্যাগ করতে হয়, তবে কুরআনও পরিত্যাগ করার অবকাশ সৃষ্টি হয়। কেননা কুরআন বিশুদ্ধতার দিক থেকে 'ক্বাতঈ' বা অকাট্য হলেও অর্থগত দিক থেকে অনেক সময় 'যান্নী' (ظني الدلالة)। যেমন তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে- وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ 'আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন 'কুরু' পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকবে। এখানে 'কুরু' শব্দটি দু'টি অর্থ বহন করে। (১) হায়েয বা ঋতু। (২) তুহুর বা ঋতু শেষে পবিত্রতালাভ। সুতরাং আয়াতটি 'যান্নী' অর্থ দেয়। এখন এই কারণে কি কুরআন বর্জন করতে হবে যে, তা 'যান্নী' অর্থ প্রদান করে?
গ. কুরআন নিজেই 'যান্ন'-কে শারঈ দলীল হিসাবে ব্যবহার করেছে। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ সে স্ত্রীকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তাহ'লে সে যতক্ষণ তাকে ব্যতীত অন্য স্বামী গ্রহণ না করে, ততক্ষণ উক্ত স্ত্রী তার জন্য সিদ্ধ হবে না। অতঃপর যদি উক্ত স্বামী তাকে তালাক দেয়, তখন তাদের উভয়ের পুনরায় ফিরে আসায় কোন দোষ নেই, যদি তারা (দৃঢ়) ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহ্র সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে।' অর্থাৎ এই আয়াতে আল্লাহ পুনরায় স্বামী ও স্ত্রীকে একত্রিত হওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন, যদি তারা উভয়ে আল্লাহ্র সীমারেখার মধ্যে থেকে দাম্পত্য জীবন পরিচালনার (দৃঢ়) ধারণা রাখে। সুতরাং আল্লাহ নিজেই এখানে 'যান্ন'কে শারঈ দলীল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। অতএব খবর ওয়াহিদ হাদীছ 'যান্নী' হওয়ার কারণে তার ওপর আমল পরিত্যাগের কোন সুযোগ নেই।
ঘ. ইসলামী শরী'আতে 'যান্ন'-কে সরাসরি দলীল হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন শারঈ হুকুমসমূহ বাস্তবায়নের মূল স্থান হ'ল আদালত। কিন্তু কেউ কি নিশ্চয়তা দিতে পারে যে, আদালত থেকে প্রত্যেক বিচারক যে হুকুম প্রদান করেন তা শতভাগ সঠিক? যেমন রাসূল (ছা.) বলেন, إنما أنا بشر، وإنكم تختصمون إلي، ولعل بعضكم أن يكون ألحن بحجته من بعض، وأقضي له على نحو ما أسمع، فمن قضيت له من حق أخيه شيئا فلا يأخذ، فإنما أقطع له قطعة 'আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা আমার নিকট বিবাদ মিমাংসার জন্য এসে থাক। তোমাদের এক পক্ষ অন্য পক্ষ অপেক্ষা দলীল-প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে অধিক পারদর্শী হ’তে পারে। অতএব আমি যেভাবে (তোমাদের বক্তব্য) শুনি সেই মোতাবেক ফয়ছালা দেয়ার পর যদি কাউকে তার অন্য ভাইয়ের হক্ দিয়ে দেই, তাহ’লে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা, আমি তার জন্য জাহান্নামের একটি অংশই পৃথক করে দিচ্ছি।' অর্থাৎ রাসূল (ছা.) নিজেই যদি তাঁর বিচার শতভাগ সঠিক বা ‘ক্বাতঈ’ হওয়ার নিশ্চয়তা না দেন, তবে অন্যদের ক্ষেত্রে তা কিভাবে অকাট্য নিশ্চয়তা বহন করবে? সুতরাং বিচারিক আদালতগুলো ‘যান্ন’ বা প্রবল ধারণা ভিত্তিক দলীলের আলোকেই পরিচালিত হয়, যা সুপরিজ্ঞাত বিষয়।
দ্বিতীয়ত, আদালত সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করে থাকে। কিন্তু আমরা সকলেই জানি যে, সাক্ষ্য কখনও ভুল হ’তে পারে কিংবা সাক্ষ্যদাতা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েও সাক্ষ্য দিতে পারে। কিন্তু তারপরও সাক্ষীর সততার ওপর আস্থা রাখা হয়। পৃথিবীর মুসলিম, অমুসলিম সমস্ত আদালত সাক্ষ্যের উপর নির্ভরশীল, যা আদ্যোপান্ত ‘যান্নী’। সাক্ষীর জন্য সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতাকে শর্ত করা হয় এজন্য যেন প্রবল ধারণার মাধ্যমে সঠিক বিষয়টি অবগত হওয়া যায়।
فَإِنْ عُثِرَ عَلَى أَنَّهُمَا اسْتَحَقَّا إِثْمًا فَأَخَرَانِ يَقُومَانِ مَقَامَهُمَا مِنَ الَّذِينَ اسْتَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْأَوْلَيَانِ فَيُقْسِمَانِ بِاللَّهِ لَشَهَادَتْنَا أَحَقُّ مِنْ شَهَadَتِهِمَا وَمَا اعْتَدَيْنَا إِنَّا إِذًا لَمِنَ الظَّالِمِينَ
কিন্তু যদি জানা যায় যে, তারা পাপে লিপ্ত হয়েছে, তাহলে প্রথম দু’ব্যক্তি যাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে তাদের থেকে অপর দু’ব্যক্তি এদের স্থলাভিষিক্ত হবে। অতঃপর তারা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলবে, ‘অবশ্যই আমাদের সাক্ষ্য তাদের সাক্ষ্য থেকে অধিক সত্য এবং আমরা সীমালঙ্ঘন করিনি; করলে অবশ্যই আমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হব’। এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সাক্ষীর ভুল হ’তে পারে। ফলে সকল প্রকার সাক্ষ্য ‘যান্নী’, কিন্তু তা শারঈ আইনে দলীল হিসাবে পরিগৃহীত।
৬. পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক তথ্যই পঞ্চেন্দ্রিয় তথা মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণ করা সম্ভব। এমনকি পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা প্রাপ্ত তথ্যও সব সময় নিশ্চয়তাবোধক অর্থ দেয় না। যেমন আমরা রাতের আসমানে খালি চোখে যে তারকার সংখ্যা প্রত্যক্ষ করি, তা সত্য ধারণা দেয় না। কেননা তারার প্রকৃত সংখ্যা আমাদের প্রত্যক্ষকৃত তারকার চেয়ে শত-কোটিগুণ বেশী, যা প্রমাণিত সত্য। অথচ আমরা তা স্বচক্ষেই দেখেছি। দূর পাহাড়ের বড় বড় বৃক্ষরাজি আমাদের চোখে ক্ষুদ্র শাখার মত দেখায়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। অতএব একান্ত স্বচক্ষে দেখা জিনিসও যখন ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তখন সীমিত মানবীয় সামর্থ্য দিয়ে কোন বিষয়ে অকাট্য জ্ঞান লাভের দাবী করা সুকঠিন বিষয়।
চ. খবর ওয়াহিদ 'সুপ্রসিদ্ধ' (مشهور) না হওয়াই তার সঠিক না হওয়ার দলীল- এই দাবীর জবাবে ড. আলী জারীশাহ (১৯৩৫-২০১১খ্রি.) বলেন, কোন বিষয় সুপ্রসিদ্ধ হওয়ার সাথে তার সঠিক হওয়ার সম্পর্ক নেই, যেমন সম্পর্ক নেই সত্য এবং বাস্তবতার মাঝে। সত্য কখনও বাস্তব হ'তে পারে, আবার অবাস্তবও হ'তে পারে। তেমনি বাস্তবতা কখনও সত্য হ'তে পারে, আবার অসত্যও হ'তে পারে। অনুরূপভাবে সুপ্রসিদ্ধ বিষয় কখনও সঠিক হ'তে পারে, তেমনি বেঠিকও হ'তে পারে। আবার সঠিক বিষয় কখনও সুপ্রসিদ্ধ হ'তে পারে, আবার অপ্রসিদ্ধও হ'তে পারে।
ছ. আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.) সম্পর্কে বলেছেন, 'আমার রাসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা তোমরা বর্জন কর'। সুতরাং তা যদি বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া যায়, তবে তার ওপরই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। তাকে অকাট্য এবং ধারণানির্ভর ভাগে বিভক্ত করে কিছু অংশকে স্বীকার করা এবং কিছু অংশ পরিত্যাগ করা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র নীতিবিরোধী। আল্লাহ বলেন, أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدَّ الْعَذَابِ 'তোমরা আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর, আর কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে, পার্থিব জীবনে তাদের দুর্গতি ছাড়া কিছুই পাওয়ার নেই। আর ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে।'
টিকাঃ
১৫৫. সূরা আন-নাজম, আয়াত নং: ২৮।
১৫৬. নূর মোহাম্মদ আ'জমী, হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস, পৃ. ৯-১০।
১৫৭. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ২२৮।
১৫৮. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ২৩০।
১৫৯. ছহীহুল বুখারী, হা/২৪৫৮, ২৬৮০, ৬৯৬৯ প্রভৃতি; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৩।
১৬০. সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত নং: ১০৭।
১৬১. ইসমাঈল সালাফী, হজ্জিয়াতে হাদীছ, পৃ. ৩৩-৩৫।
১৬২. ড. আলী জারীশাহ, মাহাদিরুশ শারী'আহ আল-ইসলামিয়াহ, পৃ. ৩৫।
১৬৩. সূরা হাশর, ৭ নং আয়াত।
১৬৪. ড. মুহাম্মাদ আলী আছ-ছাবৃনী, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ আল-মুতাহহারাহ, পৃ. ৫৯-৬০।
১৬৫. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত নং: ৮৫।