📄 সংশয়-৬ : রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন
মুনকিরে হাদীছদের দাবী, রাসূল (ছা.) আল্লাহ্ পক্ষ থেকে কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন। তিনি কোন বিধান প্রবর্তক ছিলেন না। তিনিও অন্যান্য মানুষের মত কুরআন অনুসরণের জন্য আদ্দিষ্ট ছিলেন। এর প্রমাণে অন্যান্য আয়াতের সাথে রাসূল (ছা.) বর্ণিত কিছু হাদীছও দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। যেমন রাসূল (ছা.) ছহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীছে মন্তব্য করেন, وَقَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابُ اللهِ 'আমি তোমাদের নিকট ছেড়ে যাচ্ছি এমন একটি বস্তু যা ধারণ করলে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। আর সেটি হ'ল আল্লাহ্ কিতাব। এছাড়া রাসূল (ছা.) তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় বললেন, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় লিখে দিতে চাই, যার পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না।' অতঃপর উমার (রা.) উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, রাসূল (ছা.) এখন তীব্র যন্ত্রণায় আক্রান্ত। তোমাদের নিকট কুরআন রয়েছে। আমাদের জন্য আল্লাহ্ কিতাবই যথেষ্ট। (وَعِنْدَكُمْ الْقُرْآنُ حَسْبُنَا كِتَابُ اللهِ) সুতরাং এসব থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ কুরআনের ভিত্তিতেই প্রযোজ্য। তিনি কুরআন প্রচারের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন, হাদীছ নয়।
পর্যালোচনা: ক. রাসূল (ছা.)-কে কেবল কুরআন প্রচারক হিসাবে আল্লাহ প্রেরণ করেননি; বরং মানবজাতির জন্য শিক্ষক হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সমাজের বুকে কুরআনের শিক্ষাসমূহ সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন, যা হাদীছ হিসাবে সংরক্ষিত হয়ে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। আল্লাহ বলেন, لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ 'উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াত সমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল (ছা.) কেবল কুরআন তেলাওয়াতকারী ছিলেন না, বরং মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে তিনি তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষাও প্রদান করেছেন। কেননা যদি শুধুমাত্র কুরআন পড়ে শুনানোই রাসূল (ছা.)-এর দায়িত্ব হ'ত তাহ'লে عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ ۦيَتْلُو বলাই যথেষ্ট হ'ত, পুনরায় وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ বলার প্রয়োজন ছিল না।
খ. আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ "আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। এই আয়াতে (النطق) বা কথা বলার অর্থ কুরআন তিলাওয়াত নয়, বরং নবীর নিজের মুখের ভাষা। আর দ্বীন সংক্রান্ত তাঁর যে কোন কথাই হাদীছ। এ বিষয়ে কুরআনে অসংখ্য প্রমাণ মওজুদ রয়েছে।
গ. উপস্থাপিত হাদীছসমূহে কুরআনকে উল্লেখ করা হয়েছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে (عَلَى وَجْهِ التَغْلِيْبِ), যেহেতু কুরআন শরী'আতের প্রধানতম উৎস। ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, রাসূল (ছা.) তাঁর এই বক্তব্যে কেবল কুরআনকে উল্লেখ করেছেন এই জন্য যে, কুরআন হ'ল সর্বপ্রধান, বাকীগুলো তার অনুগামী। আর তাতে সকল কিছুর বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে, হয় সরাসরি নছের মাধ্যমে কিংবা ইস্তিম্বাত (অন্যান্য দলীলের ভিত্তিতে বিধি-বিধান নির্ণয় করা)-এর মাধ্যমে। মানুষ যখন কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশসমূহও অনুসরণ করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا "রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।
ঘ. কুরআনের অন্যান্য বহু আয়াতে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের নির্দেশ স্পষ্টতই সাক্ষ্য দেয় যে, এই আনুগত্য কেবল কুরআনের পাঠকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য নয়, বরং শরীআ'তের ব্যাখ্যাদানকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য। নতুবা তাঁর আনুগত্যের বিশেষ কোন মূল্য থাকত না এবং প্রকারান্তরে তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ অর্থহীন হয়ে যেত। কেননা এর ফলে কুরআনের পাঠককারী হিসাবে তিনি এবং সাধারণ পাঠকের মাঝে কোনই পার্থক্য থাকত না। যা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। অতএব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে রাসূল (ছা.)-এর শিক্ষা বা সুন্নাহ্ও কুরআনের মতই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্যভাবে অনুসরণীয়।
টিকাঃ
৫২. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮।
৫৩. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩৭।
৫৪. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪।
৫৫. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৫৬. সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৬১।
📄 সংশয়-৭ : রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন
প্রাথমিক এবং আধুনিক যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীদের সবচেয়ে বড় দলীল হ'ল, রাসূল (ছা.) প্রথমাবস্থায় হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মতে, হাদীছ যদি ইসলামী আইনের উৎস বা দলীল হ'ত, তাহ'লে অবশ্যই আল্লাহ্ নবী বা ছাহাবীগণ তার লিখন, সংকলন এবং হেফাযতের ব্যবস্থা নিতেন- যেমনভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে নিয়েছিলেন। গোলাম আহমাদ পারভেয বলেন, 'সুন্নাহ যদি দ্বীনের অংশ হ'ত, তবে রাসূল (ছা.) নিশ্চয়ই কুরআনের মত হাদীছ সংরক্ষণের জন্যও লিপিবদ্ধকরণ, মুখস্তকরণ বা পাঠদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। দ্বীনের এই বৃহৎ অংশটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় হ'তেন না। কেননা নবুঅতের অবস্থান থেকে উম্মাহর জন্য দ্বীনকে সংরক্ষিতভাবে প্রদানই কাম্য ছিল। কিন্তু রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের জন্যই সংরক্ষণের যাবতীয় ব্যবস্থা নিলেন, অথচ হাদীছের জন্য কোন কিছুই করেননি। উপরন্ত হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছেন এ মর্মে যে, 'তোমরা আমার নিকট থেকে কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখে নিও না। যদি কেউ আমার থেকে কুরআন ভিন্ন কিছু লিপিবদ্ধ করে, তবে তা যেন মুছে ফেলে।
এ সম্পর্কে তারা রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদীছসমূহ উপস্থাপন করেন এবং যে সকল ছাহাবী এবং তাবেঈ হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে অনাগ্রহ পোষণ করতেন কিংবা নিষেধ করতেন তাদেরকেও তারা দলীল হিসাবে গ্রহণ করেন। বিশেষত খুলাফায়ে রাশিদীন যেমন আবূ বকর, উমার এবং আলী (রা.)-এর বর্ণনাসমূহ। কেননা আবু বকর সম্পর্কে এমন বর্ণনা এসেছে যে, তিনি পাঁচশত হাদীছ লিপিবদ্ধ করার পর তা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। আর উমার (রা.) ছিলেন হাদীছ বর্ণনার ঘোর বিরোধী এবং দীর্ঘ একমাস ইস্তিখারার পর তিনি হাদীছ সংকলন না করার সিদ্ধান্ত নেন। আলী (রা.)-ও অনুরূপভাবে বিরোধী ছিলেন। আর রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ লিখনের আদেশসূচক হাদীছসমূহ তারা দুর্বল মনে করেন, কিংবা নিষেধাজ্ঞার হাদীছটি দ্বারা আদেশসূচক হাদীছসমূহ রহিত হয়েছে মনে করেন।
পর্যালোচনা:
রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে সাময়িক নিষেধ করেছিলেন, তবে পরবর্তীতে অনুমতি দিয়েছিলেন, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। নিম্নে উপরোক্ত দাবীসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।
ক. হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে রাসূল (ছা.) হ'তে মোট ৩টি নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদীছ এসেছে, যেগুলি আবু সাঈদ আল-খুদরী, আবূ হুরায়রা এবং যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.) বর্ণনা করেছেন। তবে একমাত্র আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) বর্ণিত হাদীছটি ব্যতীত অন্যগুলি যঈফ। আর এই হাদীছটিও মারফু' হওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইমাম বুখারী বলেন, এটি মাওকুফ হওয়াই ছহীহ। এতদ্ব্যতীত ছাহাবী এবং তাবেঈগণ হ'তে কিছু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে লিপিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে, যার মধ্যে কিছু বর্ণনা ছহীহ রয়েছে এবং কিছু যঈফও রয়েছে। কিন্তু এসকল হাদীছের বিপরীতে রাসূল (ছা.) হ'তে হাদীছ লিখনের অনুমতি ও নির্দেশসূচক হাদীছ রয়েছে এবং একইভাবে ছাহাবী ও তাবেঈদের পক্ষ থেকেও লেখনীর অনুমতিসূচক অসংখ্য হাদীছ পাওয়া যায়। ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী ৫২ জন ছাহাবীর তালিকাসহ ১ম হিজরী শতকে হাদীছ লিপিবদ্ধকারী জ্যেষ্ঠ ৫৩ জন তাবেঈ এবং কনিষ্ঠ ২৫২ জন তাবেঈ'র তালিকা বৃত্তান্ত সহকারে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তাদের হাদীছ লেখনীর অনুমোদন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
খ. হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে এই পরস্পরবিরোধী বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে বিদ্বানদের বক্তব্য হ'ল প্রাথমিক পর্যায়ে কুরআনের সাথে সংমিশ্রণের আশংকায় রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। তবে সে আশংকা বিদূরিত হওয়ার পর তিনি লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেন। অপর একদল বিদ্বানের মতে, আদেশের হাদীছগুলি দ্বারা নিষেধের হাদীছটি মানসূখ হয়ে গেছে। আর ছাহাবী ও তাবেঈগণ যেমন আবূ বকর (রা.), উমার (রা.), আলী (রা.), আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.), আবূ হুরায়রা (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) প্রমুখ ছাহাবীগণ মূলত মানুষের মুখস্থ ছেড়ে লেখনীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এবং ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়ার শংকা থেকে হাদীছ লিপিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা অধিকাংশই এই অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন এবং তাঁদের পক্ষ থেকেও হাদীছ লিপিবদ্ধ করার দলীল পাওয়া গেছে। সুতরাং হাদীছ লিপিবদ্ধকরণে রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞা এবং ছাহাবী ও তাবেঈদের বিরূপভাব সবই ছিল একটি সাময়িক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। আর হাদীছ সংরক্ষণের প্রশ্নে তাদের মধ্যে বিতর্ক হয়নি, বরং বিতর্ক ছিল কেবল সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে অর্থাৎ তা মুখস্থকরণের মাধ্যমে হবে নাকি লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে। ইমাম নববী বলেন, ثم أجمع المسلمون على جوازها وزال ذلك الخلاف অর্থাৎ '(প্রাথমিক দ্বিধাগ্রস্থতার পর) মুসলমানরা লেখনীর বৈধতার ব্যাপারে সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে মতপার্থক্য দূর হয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা যদি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বহাল থাকত তবে ছাহাবীরা কখনই হাদীছ লিপিবদ্ধ করতেন না।
গ. মিসরীয় বিদ্বান রশীদ রিযা এ ব্যাপারে একক ব্যক্তি যিনি ভিন্নমত পোষণ করেন যে, রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞার হাদীছটি দ্বারা আদেশসূচক হাদীছ সমূহ রহিত হয়েছে। এর পক্ষে তিনি দু'টি দলীল পেশ করেছেন। (১) নবীর মৃত্যুর পর কতিপয় ছাহাবীর হাদীছ লেখনী থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরকে নিষেধ করা। (২) ছাহাবীদের হাদীছ সংকলন এবং তা প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ না করা। কেননা যদি তাঁরা সংকলন করতেন এবং প্রচার করতেন, তবে তাদের সংকলনসমূহ 'মুতাওয়াতির' সূত্রে আমাদের নিকট পৌঁছাতো। রশিদ রিযার এই ধারণা সঠিক নয়, যা পূর্বেই স্পষ্ট করা হয়েছে। ছাহাবী ও তাবেঈগণের সময়কালে হাদীছ কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে মুহাদ্দিছগণের হাদীছ সংগ্রহ ও বর্ণনা পদ্ধতি কী ছিল সে সম্পর্কে কোন ধারণা ব্যতীত তিনি এই মন্তব্য করেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘ. রাসূল (ছা.) যে হাদীছে লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন, সেই একই হাদীছের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, وحدثوا عني، ولا حرج، ومن كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار (যা শোন তা) বর্ণনা কর, তাতে কোন অসুবিধা নেই। আর যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়। অর্থাৎ লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে এর দ্বারা হাদীছ বর্ণনা করা অর্থাৎ হাদীছের প্রামাণিকতাকে নাকচ করা মোটেও উদ্দেশ্য ছিল না।
ঙ. ছাহাবীগণের মধ্যে আবূ বকর (রা.) ও উমার (রা.) হাদীছ বর্ণনার কঠোর বিরোধী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। একথার কিছুটা বাস্তবতা থাকলেও সর্বাংশে সত্য নয়। যেমন আবু বকর (রা.) তাঁর নিজের কাছে লিখিত পাঁচশত হাদীছের পাণ্ডুলিপিটি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন মর্মে আয়েশা (রা.) বর্ণিত প্রসিদ্ধ কাহিনীটি বিশুদ্ধ নয়; বরং তিনি নিজেই বাহরাইনের গভর্নর আনাস ইবনু মালিক (রা.) এবং আমর ইবনুল আছ (রা.)-এর নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন, যাতে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ লিখিত ছিল। তবে আবূ মুলাইকা থেকে মুরসাল সূত্রে একটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর পর আবু বকর (রা.) মানুষকে একত্রিত করে বললেন, إنكم تحدثون عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أحاديث تختلفون فيها والناس بعدكم أشد اختلافا فلا تحدثوا عن رسول الله شيئا، فمن سألكم فقولوا بيننا وبينكم كتاب الله فاستحلوا حلاله وحرموا حرامه তোমরা রাসূল (ছা.) থেকে হাদীছ বর্ণনা করছ এবং তাতে বিভিন্নতা করছ। মানুষ তোমাদের পর আরও বেশী মতভেদ করবে। অতএব রাসূল (ছা.) হ'তে কোন কিছু বর্ণনা করো না। তোমাদের নিকট কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, তবে তোমরা বলে দাও, আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর কিতাব। অতএব তাতে যা হালাল করা হয়েছে তা হালাল মনে কর এবং যা হারাম করা হয়েছে তা হারাম কর।
আবূ বকর (রা.)-এর এই বর্ণনাটি যদি বিশুদ্ধ হয় তবে এর উদ্দেশ্য এমন হ'তে পারে যে, মতপার্থক্যের সময় অধিক হাদীছ বর্ণনা থেকে সতর্ক করা। কেননা এতে রাসূল (ছা.) যে অর্থে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, সে ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হ'তে পারে। এজন্য বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর ইমাম যাহাবী أن مراد الصديق التثبت في الأخبار والتحري لا سد باب (984হি.) বলেন,
الرواية এর মাধ্যমে আবু বকর (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে অধিক যাচাই-বাছাই ও সতর্কতা অবলম্বন করা। তিনি হাদীছ বর্ণনার দুয়ার বন্ধ করেননি।' এর প্রমাণ হ'ল দাদীর সম্পত্তি বিষয়ক রাসূল (ছা.)-এর হাদীছটি যখন তাঁর নিকট উল্লেখিত হয়েছিল তিনি নির্দ্বিধায় কবুল করে নিয়েছিলেন। তিনি খারিজীদের মত একথা বলেননি যে 'আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।'
অনুরূপভাবে উমার (রা.) সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে যে, তিনি হাদীছ সংকলনকর্ম শুরু করার ব্যাপারে ছাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। ছাহাবীরা তাঁকে হাদীছ সংকলনের ব্যাপারে ইতিবাচক পরামর্শ দিলেন। অতঃপর উমার (রা.) একমাস ব্যাপী ইস্তিখারা করেন। অবশেষে তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহসমূহ লিখে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্মরণ হ'ল যে, পূর্ববর্তী কওমরা আল্লাহর কিতাব ছেড়ে দিয়ে নিজেদের লেখা কিতাবসমূহে মজে গিয়েছিল। অতএব আল্লাহ্র কসম আমি আল্লাহর কিতাবের সাথে অন্য কিছুর মিশ্রণ ঘটাব না।” এছাড়া আরও কিছু বর্ণনা রয়েছে যেমন:
-তিনি মানুষের কাছে রক্ষিত হাদীছের পাণ্ডুলিপিসমূহ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ফরমান পাঠিয়েছিলেন যে, অনুরূপ কোন পান্ডুলিপি থাকলে তা মুছে ফেলতে হবে।
-তিনি আবূ হুরায়রা (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন যে, তুমি অবশ্যই হাদীছ বর্ণনা পরিত্যাগ করবে, নতুবা তোমাকে দাওসের ভূখণ্ডে (নির্বাসনে) পাঠিয়ে দেব।
-তিনি কা'ব আল-আহবারকে বলেছিলেন যে, তুমি হাদীছ বর্ণনা ছাড়বে, নতুবা তোমাকে কুরদা নামক এলাকায় (নির্বাসনে) প্রেরণ করব।
-তিনি আবূ যার, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ এবং আবুদ দারদা (রা.)- কে ডেকে পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তোমরা রাসূল (ছা.) থেকে বেশী বেশী হাদীছ বর্ণনা করছ কেন? অতঃপর তাদেরকে মদীনায় বন্দী করে রাখলেন।
-আবূ হুরায়রা (রা.) বলতেন, আমি এমন অনেক হাদীছ বর্ণনা করি, যা উমার (রা.)-এর যুগে বর্ণনা করলে আমার মাথা কাটা যেত। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, উমার (রা.)-এর মৃত্যুর পূর্বে আমরা 'আল্লাহর রাসূল (ছা.) বলেছেন' এ কথা বলতে পারতাম না। আমরা তাঁর চাবুককে ভয় করতাম।
এই বর্ণনাসমূহের মধ্যে কেবল প্রথম বর্ণনাটি ছহীহ। বাকি বর্ণনাগুলোর সূত্র সবই যঈফ কিংবা বিচ্ছিন্ন, যা দলীলযোগ্য নয়। প্রথম বর্ণনাটি বরং হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের পক্ষেই একটি দলীল। কেননা ছাহাবীরা উমার (রা.)- কে লিপিবদ্ধ করার পরামর্শই দিয়েছিলেন। কিন্তু উমার (রা.) তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কেবল কুরআন লিপিবদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছিলেন। এর পিছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন:
(১) তিনি কুরআনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই সাথে হাদীছ মানুষের অন্তরে মুখস্থ থেকে যাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন। যেন মানুষ উভয়টির মাঝে সংমিশ্রণ না ঘটিয়ে ফেলে।
(২) তিনি এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন মানুষের অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি চাননি দূর-দূরান্তের বিভিন্ন রাজ্যের নতুন নতুন ইসলামগ্রহণকারী মানুষ কোন বিভ্রান্তিতে পড়ে যাক এবং কুরআন ও হাদীছকে সংমিশ্রিত করে ফেলুক। সেজন্য বিচক্ষণতার সাথে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কেবল কুরআনকেই মানুষের অন্তরে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন এবং সুন্নাহকে তার আপন গতিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।"
(৩) তিনি হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে যে কড়াকড়ি করতেন, তা কেবল হাদীছের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য। এর প্রমাণ হ'ল উমার (রা.) ও আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর মধ্যকার প্রসিদ্ধ ঘটনাটি, যেখানে তিনি উমার (রা.)- কে তিনবার সালাম দিয়ে না পেয়ে ফিরে এসেছিলেন এবং উমার (রা.) তাঁর এই কর্মের ব্যাপারে দলীল ও সাক্ষী তলব করেন। অবশেষে সাক্ষী হিসাবে আবূ সাঈদ খুদরী (রা.)- কে পাওয়ার পর তিনি হাদীছটি কবুল করেন। উমার (রা.) ঐ ঘটনার পর আবু মূসা আল-আশ'আরী (রা.)- কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, 'আমি তোমাকে দোষী বানাতে চাই নি, কিন্তু আমি ভয় পাই যে, মানুষ রাসূল (ছা.)-এর নামে হাদীছ রটনা করা শুরু করবে'।
(৪) তিনি হাদীছকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যেন রাসূল (ছা.)-এর নামে নিজের ইচ্ছামত কেউ যেন কিছু বলতে সাহস না করে। ফলে পরবর্তীরা যেন এই শিক্ষা নেয় যে, উমার (রা.) হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূল (ছা.)-এর মর্যাদাবান ছাহাবীদের ওপর যখন এত কড়াকড়ি করেছেন, তখন তাদের জন্য বিষয়টি কত কঠিন হতে পারে। আর শয়তানের প্ররোচনায় রাসূল (ছা.)-এর নামে কোন মিথ্যা রটনা করার পরিণাম কত ভয়ংকর হতে পারে।
(৫) ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন, উমার (রা.)-এর কড়াকড়ি সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ এই অর্থে গ্রহণ করতে হবে যে, তিনি এমন হাদীছ বর্ণনার বিষয়ে শংকিত ছিলেন যা মানুষ ভুল বুঝে ভুল স্থানে ব্যবহার করতে পারে। আর কেউ যখন বেশী হাদীছ বর্ণনা করে তখন স্বভাবতই ভুল বা প্রমাদের আশংকা থাকে। ফলে মানুষ সেই ভুলটিই সঠিক ভেবে গ্রহণ করে বসতে পারে।
সুতরাং আবু বকর (রা.) ও উমার (রা.) সম্পর্কে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহ হাদীছ অস্বীকারের পিছনে কোন দলীল হ'তে পারে না। কেননা এগুলো প্রায় সবই দুর্বল বর্ণনা। আর যেগুলি ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। উপরন্তু এ সকল বর্ণনা যদি বিশুদ্ধও হ'ত তবুও কোন ছাহাবী বা তাবেঈ'র ব্যক্তিগত মতামতের কারণে ইসলামী শরী'আতে সুন্নাহর অবস্থান নিঃসন্দেহে দুর্বল হয় না। কেননা সুন্নাহর মর্যাদা কুরআন দ্বারাই সুপ্রতিষ্ঠিত।
চ. ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগে কুরআনের মত আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীছ সংকলনের উদ্যোগ না নেয়ার প্রধান কারণ ছিল, কুরআনের মত হাদীছের কোন নির্দিষ্ট সীমানা ও চৌহদ্দি ছিল না। কেননা রাসূল (ছা.)-এর পুরো জীবনচিত্রই হল হাদীছের বিষয়বস্তু। প্রত্যেক ছাহাবী রাসূল (ছা.)-কে যতটুকু দেখেছেন ও শুনেছেন, তাঁর ভিত্তিতেই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর এই ছাহাবীদের সংখ্যাও ১ লক্ষের কম ছিল না। ফলে দেশে- বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থানকারী ছাহাবীদের বর্ণিত সমস্ত হাদীছ একত্রিত করা ও গ্রন্থাবদ্ধ করার জন্য স্বভাবতঃই দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সকল ছাহাবী এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং রাসূল (ছা.)-এর সাথে সমানভাবে সহাবস্থান করেননি। কেউ আগে মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ পরে। কেউবা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সেসকল স্থানে তাঁদের ছাত্র ও শিষ্যদের কাছে বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হাদীছ বর্ণনা করেছিলেন। সুতরাং হাদীছের এক বিশাল ভাণ্ডার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। সেসকল হাদীছ একত্রিত করা এবং গ্রন্থাবদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন ছিল দূরদূরান্ত সফর করার। ফলে লেখনীর অপ্রচলন এবং যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতার সেই যুগে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে কাজ আঞ্জাম দেয়া অসম্ভবই ছিল। ধীরে ধীরে বছরের পর বছর মুহাদ্দিছদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সংমিশ্রণের আশংকার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য সতর্কতা অবলম্বনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাদীছ শাস্ত্র সংকলিত ও গ্রন্থাবন্ধ হয়।
তৃতীয়ত, যেহেতু রাসূল (ছা.)-এর যিন্দেগীর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের পুরো সময়কাল পর্যন্ত হাদীছের গণ্ডি সুবিস্তৃত, কাজেই তার সমস্ত কথা, আমল, অনুমতি ও স্বীকৃতিসমূহ কাগজে বা খেঁজুর পাতায় এক জায়গায় লিখে সুরক্ষিত করে রাখা কঠিন, বরং অসম্ভব কাজ ছিল। কেননা এমন বিশালাকার কাজের জন্য বহু সংখ্যক ছাহাবীর অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হ'ত। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশায় লেখকের সংখ্যাও ছিল বেশ অপ্রতুল। সুতরাং যে কয়জন লেখক ছিলেন, তারা কেবল রাসূল (ছা.)-এর স্থায়ী মু'জিযা তথা কুরআন লিপিবদ্ধ করার কাজেই আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আর সুন্নার ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তিগত এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু লিখিত সংকলন করলেও মূলত তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা এবং তাঁর বাণীসমূহ মুখস্থকরণের উপরই অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
চতুর্থত, প্রাথমিক যুগে কুরআন সংকলন এবং কুরআনের প্রচারই ছিল ছাহাবীদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রস্থল। কেননা কুরআন ইসলামী শরী'আতের মূল ভিত্তি। তাছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করা হয় এবং এর ভাষা, শব্দ ও বর্ণ সবকিছুই সুনির্দিষ্ট, যাতে কোন প্রকার আক্ষরিক পরিবর্তন- পরিবর্ধনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সুতরাং কুরআনকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়াই ছিল ছাহাবীদের নিকট মুখ্য বিষয়। অতঃপর ওছমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংরক্ষণপর্ব পুরোপুরি নিশ্চয়তার সাথে সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মুসলমানরা ভিন্ন দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
জ. যুক্তিগত দিক থেকে বলা যায় যে, কোন জিনিস দলীলযোগ্য হওয়ার জন্য লিপিবদ্ধ হওয়া শর্ত নয়। এর প্রমাণ হ'ল স্বয়ং কুরআন। কুরআন যে অকাট্য দলীল হিসাবে গৃহীত হয়েছে তা লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণে নয়, বরং শব্দগতভাবে তা আমাদের নিকট অসংখ্য বিশ্বস্ত সূত্রে ( التواتر اللفظي) পৌঁছানোর কারণে। অর্থাৎ কুরআন যদি লিপিবদ্ধ নাও থাকত তবুও তা আমাদের নিকট অকাট্য দলীল হ'ত। সুতরাং লিপিবদ্ধ হওয়া কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ কোন বৈশিষ্ট্য নয়। ড. আব্দুল গণি আব্দুল খালিক (১৯৮৩খ্রি.) বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, প্রথম যে বস্তু বা বস্তুসমূহের ওপর সরাসরি অহির বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সেই বস্তুর কোন সন্ধান কি এখন পাওয়া যায়? তবে আমরা কিসের ভিত্তিতে নিশ্চিত হচ্ছি যে, আমাদের নিকট রক্ষিত কুরআন প্রকৃতই অহির ভিত্তিতে নাযিলকৃত কুরআন? কিসের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হচ্ছি যে, তাতে কোন প্রকার রদবদল হয়নি? এই নিশ্চয়তা পেয়েছি কেবলমাত্র সত্যবাদী এবং ন্যায়পরণতায় বিশ্বস্ত একদল বিরাট সংখ্যক মানুষের প্রদত্ত সংবাদের মাধ্যমে, যাদের কোন মিথ্যার ওপর ঐক্যমত হওয়া সম্ভব নয়। অতঃপর প্রত্যেক যুগে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বস্ত সংবাদদাতাদের মাধ্যমে আমরা মূলসূত্র তথা মূল যে দলটি হাদীছ লিখন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন, তাদের নিকট পৌঁছাতে পারি এবং নিশ্চিত হতে পারি যে, এটিই সেই মূল কুরআনের অনুলিপি। অনুরূপভাবে যারা প্রথম কুরআন লিপিবদ্ধ করেছেন কিংবা লিপিবদ্ধ হ'তে দেখেছিলেন, তারাও কুরআনকে অকাট্য দলীল হিসাবে গ্রহণের ব্যাপারে লিপিবদ্ধ কুরআনের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। কেননা তাঁরা তো সরাসরি রাসূল (ছা.) থেকেই কুরআন শ্রবণ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্ব থেকেই শ্রবণসূত্রে কুরআন তাঁদের নিকট অকাট্য দলীল ছিল।
দ্বিতীয়ত, কুরআনের সকল অনুলিপি তৈরী হয়েছিল মূলত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে যেটি যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.) প্রস্তুত করেছিলেন। সুতরাং কিসের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হচ্ছি যে যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.)-এর প্রস্তুতকৃত এই একক পাণ্ডুলিপিতে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা যথার্থই রাসূল (ছা.)-এর ওপর নাযিলকৃত কুরআন? এই নিশ্চয়তা পাওয়ার একমাত্র উপায় হ'ল, ছাহাবীগণ সকলেই তাঁদের স্মৃতির ভিত্তিতে এর সত্যতা এবং বিশুদ্ধতার ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সুতরাং একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, লিপিবদ্ধ হওয়া প্রাথমিক দলীল নয়, এটি একটি সহযোগী দলীল মাত্র।
তৃতীয়ত, যারা মনে করেন যে, লিপিবদ্ধ হলেই কেবল দলীলযোগ্য হয় তারা এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন যদি কোন ইহুদী বা খৃষ্টান এসে তাদেরকে বলেন যে, কুরআন প্রামাণ্য গ্রন্থ নয়, কেননা সেটি আসমান থেকে লিখিতভাবে নাযিল হয়নি। যদি কুরআন প্রামাণ্য দলীলই হ'ত, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ গুরুত্ব সহকারে তা লিখিত আকারে নাযিল করতেন, যেমনটি তাওরাত ও ইঞ্জিলের ক্ষেত্রে করেছেন? এর উত্তর আমরা এভাবে দেই যে, প্রথমত রাসূল (ছা.)-এর নিষ্পাপত্ব এবং তাঁর নিকট হ'তে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীগণই আমাদের নিকট দলীল। এই বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের বর্ণনা যখন আমাদের নিকট মুতাওয়াতির সূত্রে পৌঁছে তখন আমরা সেটি নিশ্চিত দলীল হিসাবে গ্রহণ করি। আর হাদীছ অস্বীকারকারীগণ যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চান তবে তাদেরকে স্বীকার করতেই হবে যে, লিপিবদ্ধ হওয়া দলীল হওয়ার জন্য শর্ত নয়। বরং বর্ণনাকারীর সংখ্যা মুতাওয়াতির পর্যায়ের হওয়া বা বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত হওয়ার মাধ্যমেই দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও তা খবর ওয়াহিদ হয়। কেননা কুরআন লিপিবদ্ধ আকারে প্রেরিত হয়নি; বরং রাসূল (ছা.) হ'তে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। আর এটা যদি তারা স্বীকার করে নেন, তবে নিঃসন্দেহে তারা এ কথা বলার সুযোগ পাবেন না যে, কুরআনই কেবল দলীল, হাদীছ দলীল নয়; কেননা তা প্রাথমিক যুগে লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি।
ইবনু হাজার আল-আসকালানী (৮৫২হি.) বলেন, والمستفاد من بعثه المصاحف إنما هو ثبوت إسناد صورة المكتوب فيها إلى عثمان لا أصل ثبوت القرآن فإنه متواتر عندهم '(ওছমান রা.)-এর কুরআনের মুছহাফসমূহ প্রেরণের মধ্য দিয়ে এটিই কেবল প্রতীয়মান হয় যে, কুরআনের লিখিত রূপটির সনদসূত্র ওছমান (রা.) পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু এটি মূল কুরআন হওয়ার প্রমাণ বহন করে না; বরং কুরআন তাদের নিকট মুতাওয়াতির সূত্রেই প্রমাণিত ছিল।
ইবনুল জাযারী (৮৩৩হি.) বলেন, إن الاعتماد في نقل القرآن على حفظ القلوب والصدور لا على حفظ المصاحف والكتب، وهذه أشرف خصيصة من الله تعالى لهذه الأمة.... وذلك بخلاف أهل الكتاب الذين لا يحفظونه إلا في الكتب ولا يقرءونه كله إلا نظرا لا عن ظهر قلب হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি লিখিত কিতাব বা মুছহাফের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং হৃদয়ে মুখস্থ ধারণের ওপর নির্ভরশীল। এটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে মর্যাদাবান বৈশিষ্ট্য। ... এটি আহলুল কিতাবদের বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা যারা তাদের কিতাব একমাত্র লিপিবদ্ধ উপায়ে সংরক্ষণ করে এবং কেবল দেখে দেখে পাঠ করে; মুখস্থ পাঠ করে না।
ঝ. যদি প্রাথমিক অবস্থায় কুরআনের প্রচার ও প্রসার সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই সুন্নাহর আনুষ্ঠানিক সংকলন শুরু হ'ত তবে কুরআনের সাথে সুন্নাহসহ মানুষের মতামতও কুরআনের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে যেত। ফলে পুরো ইসলামী শরী'আত দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরী হ'ত। সুতরাং নিঃসন্দেহে প্রথম পর্যায়ে সুন্নাহ লিপিবদ্ধ না হওয়ার পিছনে মহান আল্লাহর বিশেষ কোন হিকমত নিহিত ছিল। ড. হাম্মাম আব্দুর রহীম বলেন, যদি এটা না হ'ত তবে কুরআনের আয়াতের ওপর ব্যাখ্যা ও মতামতের স্তূপ জমে যেত। ফলে কুরআন লিপিবদ্ধকারক এবং পরবর্তীদের জন্য কুরআনের সাথে সুন্নাহ ও ফক্বীহদের রায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা দুষ্কর হয়ে পড়ত। পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে এই ঘটনাই ঘটেছিল। ফলে খাঁটি বস্তুর সাথে মানুষের কল্পিত জিনিস, ভুলের সাথে সঠিক, স্বপ্নের সাথে অহী সব মিলেমিশে একাকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মূলবস্তুটিই হারিয়ে যেত এবং সংযোজন-পরিবর্ধনের মাঝে চাপা পড়ে যেত। ফলে অহীর নিজস্বতা এবং সুমহান তাৎপর্য আর অবশিষ্ট থাকত না। যেমনভাবে ইহুদী এবং খৃষ্টানদের নিকট অহী স্রেফ একটি ইতিহাসের বয়ান হয়ে পড়েছে তথা যা কিছু ইতিহাসে ঘটেছে সবই অহীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
টিকাঃ
৫৭. আবু সাঈদ আল-খুদরী বর্ণিত, রাসূল (ছা.) বলেন, لا تكتبوا عني، ومن كتب عني غير القرآن فليمحه، وحدثوا عني ولا حرج، ومن كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار )ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৪)। দ্র. ড. খাদিম ইলাহী বখশ, আল-কুরআনিউন ওয়া শুবহাতুহুম, পৃ. ২২৩-২২৪।
৫৮. ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৬-৭৮; আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৩৪-৪৩; রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফিল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪৬।
৫৯. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৮; খত্ত্বীব বাগদাদীও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন (তাকুয়ীদুল ইলম, পৃ. ৩১)।
৬০. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৪-৩২৫।
৬১. দ্র. ইবনু কুতায়বা আদ-দীনাওয়ারী, তা'বীলু মুখতালাফিল হাদীছ, পৃ. ৪১২; খতীব আল-বাগদাদী, তাকুয়ীদুল ইলম, পৃ. ৫৭; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯; ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৮; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৯৫; আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪৪৪; আবূ যাহু, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১২৩-১২৪)।
৬২. খত্বীব আল-বাগদাদী, তাক্বয়ীদুল ইলম, পৃ. ৩৬-৪৩, ৪৯-৬১, ৮৭-৯৮; মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৩।
৬৩. মুহিউদ্দীন আন-নববী, আল-মিনহাজ শারহু মুসলিম, ১৮শ খণ্ড, পৃ. ১৩০।
৬৪. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯।
৬৫. রশীদ রিযা, 'আত-তাদভীন ফিল ইসলাম' (মাজাল্লাতুল মানার, কায়রো, ১০ম খণ্ড: শাওয়াল/১৩২৫হি, সংখ্যা), পৃ. ৭৬৭।
৬৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৪।
৬৭. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪২৩-৪২৪।
৬৮. শামসুদ্দীন ইবনুল জাযারী, আন-নাশরু ফিল কিরাআতিল আল-আশরি (মিসর: আল- মাতবা'আহ আত-তিজারিয়াহ আল-কুবরা, তাবি), ১ম খণ্ড, পৃ. ৬।
৬৯. ড. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪।
৭০. আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯।
৭১. আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯।
৭২. আল-বায়হাক্বী, আল-মাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা (কুয়েত: দারুল খুলাফা, তাবি), পৃ. ৪০৭, হা/৭৩১; ইবনু আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৪; খতীব আল-বাগদাদী, তাকয়ীদুল ইলম, পৃ. ৪৯।
৭৩. খত্বীব আল-বাগদাদী, তাকয়ীদুল ইলম, পৃ. ৫১-৫৩।
৭৪. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০০-৬০১।
৭৫. তদেব।
৭৬. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৩৭৪; আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৫৫৫।
৭৭. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০২-৬০৩।
৭৮. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ার আল-কাশিফাহ, পৃ. ১৫৪-১৫৫; মুহত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাত ফীল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, ১৩৩-১৩৪।
৭৯. আবু যাহু, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২৩৪।
৮০. তদেব, পৃ. ১২৬।
৮১. ছহীহুল বুখারী, হা/২০৬২, ৬২৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৫৩।
৮২. أما إني لم أتهمك. ولكني خشيت أن يتقول الناس على رسول الله صلى الله عليه وسلم - মুওয়াত্ত্বা মালিক (তাহক্বীক: মুহত্বফা আল-আ'যামী), হা/৩৫৪০। অন্য বর্ণনায় এসেছে - والله إن كنت لأمينا على حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم - আল্লাহর কসম! আমি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের যিম্মাদারী নিয়ে বসতে চাই না, বরং কেবল বর্ণনার যথার্থতা নিশ্চিত হ'তে চেয়েছিলাম।' -ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৩০। অনুরূপ অন্য এক ঘটনায় উবাই ইবনু কা'ব (রা.) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, হে উমার! আপনি রাসূল (ছা.)- এর ছাহাবীদের ওপর আযাব হয়ে দাঁড়াবেন না। তখন উমার (রা.) বলেন, سبحان الله إنما سمعت شيئا فأحببت أن أتثبت 'সুবহানাল্লাহ। আমি তো কেবল যে বিষয়টি শুনেছিলাম, তা পরখ করে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম' (প্রাগুক্ত, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৩০)।
৮৩. খত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) বলেন, وفي تشديد عمر أيضا على الصحابة، وفي روايتهم حفظ لحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم، وترهيب لمن لم يكن من الصحابة أن يدخل في السنن ما ليس منها، لأنه إذا رأى الصحابي المقبول القول، المشهور بصحبة النبي صلى الله عليه وسلم، قد تشدد عليه في روايته، كان هو أجدر أن يكون للرواية أهيب، ولما يلقي الشيطان في النفس من تحسين الكذب أرهب খত্বীব আল-বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃ. ৯১।
৮৪. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
৮৫. মুহতুফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফীল হাদীছ আন-নববী, পৃ. ৮০।
৮৬. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪২৩; আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতহা, প. ৫৮-৫৯।
৮৭. দ্র. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪০৭-৪০৯।
৮৮. দ্র. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজ্জিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪০০-৪০১।
৮৯. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৪।
৯০. তদেব।
৯১. ড. হাম্মام আব্দুল হালীম সাঈদ, আল-ফিকরুল মানহাজী ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ৪০-৪১।
📄 সংশয়-৮ : হাদীছ অনেক দেরীতে সংকলন শুরু করা হয়েছিল
তারা মনে করেন, হাদীছ ২য় হিজরী শতাব্দীর পূর্বে সংকলিত হয়নি। কেননা উমর ইবনু আব্দিল আযীয তাঁর শাসনামলে (৯৯-১০১হি.) সর্বপ্রথম হাদীছ সংকলনের নির্দেশ প্রদান করেন। সুতরাং রাসূল (ছা.)-এর জীবনকাল থেকে প্রায় ৮০ বছর পর সংকলন শুরু হওয়ায় হাদীছ তার নির্ভেজাল রূপে সংকলিত হয়নি; বরং তাতে আহলুল কিতাবদের গ্রন্থসমূহের মত নানা ভুল-ভ্রান্তি এবং পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটেছে। যেহেতু ছাহাবীদের আমলে হাদীছ সংকলন হয়নি, অতএব পরবর্তী যুগের লোকেরা তাতে অনেক মিথ্যা হাদীছের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। সুতরাং হাদীছের বিশুদ্ধতার ওপর আস্থা রাখা যায় না। ড. আহমাদ আমীন, মাহমূদ আবূ রাইয়াহ, মুছত্বফা আল-মাহদূভী, আহমাদ ছুবহী মানছুরসহ প্রায় সকল হাদীছ অস্বীকারকারী এই আপত্তি পেশ করেছেন। প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহের, জোসেফ শাখত প্রমুখও এই মতের প্রবক্তা।
পর্যালোচনা:
২য় অধ্যায়ে আমরা রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশায় এবং ছাহাবীদের যুগে ধারাবাহিক হাদীছ সংকলনের প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরেছি, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হাদীছ সংকলন আনুষ্ঠানিকভাবে ২য় শতাব্দী হিজরীর শুরুতে হলেও প্রাথমিক ধাপে তার প্রস্তুতি অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি ধারায় রাসূল (ছা.) জীবদ্দশাতেই শুরু হয়েছিল। সুতরাং হাদীছ অস্বীকারকারীদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। নিম্নে তাদের বক্তব্যসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।
ক. ইবনু শিহাব আয-যুহরীকে সর্বপ্রথম হাদীছ সংকলক বলা হয়, যিনি উমাইয়া খলীফা উমার ইবনু আব্দিল আযীয (১০১হি.)-এর নির্দেশক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীছ সংকলন শুরু করেন। ইমাম মালিক (১৭৯হি.) বলেন, তিনিই প্রথম যিনি হাদীছ সংকলন করেন তিনি হলেন ইবনু শিহাব আয-যুহরী (১২৪হি.)। কিন্তু এখানে তাঁকে প্রথম সংকলক বলতে কী বুঝানো হয়েছিল, তা জানা প্রয়োজন। এজন্য প্রথমত লক্ষ্যণীয় হ'ল دون বা تلوين শব্দটি। ইবনু মানযূর (৭১১হি.) বলেন, الديوان مجتمع الصحف দীওয়ান শব্দের অর্থ হ'ল ছহীফা বা ছোট ছোট লিখিত পাণ্ডুলিপির সমষ্টি। ' আয-যাবীদী (১২০৫হি.) বলেন, دَونَهُ تَدوينا: جَمَعَهُ অর্থাৎ জমা করা বা একত্রিত করা। অর্থাৎ এখানে সংকলক অর্থ লিপিবদ্ধকারক নয় বরং বিক্ষিপ্ত লিখিত বস্তুসমূহ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জমাকারী। সুতরাং ইবনু শিহাব আয-যুহরী ছিলেন প্রথম লিখিত হাদীছের পাণ্ডুলিপিসমূহ একত্রকারী। এই অর্থটি আরও পরিষ্কার হয় ইবনু হাজার 'আল- আসক্বালানী (৮৫২হি.)-এর মন্তব্যে। তিনি বলেন, أن آثار النبي صلى الله عليه وسلم لم تكن في عصر أصحابه وكبار تبعهم مدونة في الجوامع ولا مرتبة 'রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহ ছাহাবী এবং জ্যেষ্ঠ তাবেঈদের যুগে গ্রন্থাবন্ধ এবং সুবিন্যস্ত আকারে সংরক্ষিত ছিল না। তিনি অব্যবহিত পরই বলেন, حدث في أواخر عصر التابعين تدوين الآثار وتبويب الأخبار তাবেঈদের যুগের শেষের দিকে হাদীছ সমূহ জমা করা শুরু হ'ল এবং তা অধ্যায়ভিত্তিকভাবে সাজানো হ'তে লাগল। অর্থাৎ তাঁর মন্তব্যে এটিই পরিষ্কার হয় যে, ছাহাবী এবং তাবেঈদের যুগে হাদীছ বর্তমান যুগের মত গ্রন্থাকারে ছিল না বা অধ্যায়ভিত্তিকভাবে সুসজ্জিত ছিল না। তবে তাবেঈদের যুগের শেষের দিকে হাদীছ জমা করা হয় এবং অধ্যায় ভিত্তিকভাবে বিন্যাস শুরু হয়। অর্থাৎ এটি ছিল হাদীছ সংরক্ষণের দ্বিতীয় পর্যায়। যার পূর্বে প্রথম পর্যায়ে ছাহাবীগণ ছোট ছোট পাণ্ডুলিপিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। হাদীছ সংরক্ষণের এই প্রথম পর্যায় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের মধ্যে পার্থক্য ধরতে না পারার কারণেই সকল হাদীছ অস্বীকারকারী এবং প্রাচ্যবিদ এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েছেন যে, ইবনু শিহাব আয-যুহরীই প্রথম হাদীছ লিপিবদ্ধ করেন এবং ২য় শতাব্দী হিজরীর পূর্বে হাদীছ লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়নি। বরং ইবনু শিহাব আয-যুহরী ছিলেন হাদীছ সংকলনের দ্বিতীয় পর্যায় তথা একত্রিতকরণ ও বিন্যাস্তকরণ আরম্ভকারী। আর প্রথম পর্যায় শুরু হয়েছিল রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশাতেই। এছাড়া ছাহাবী এবং জ্যেষ্ঠ তাবেঈদের লিখিত ছহীফাসমূহ ছিল অসংখ্য, যা সর্বজনবিদিত। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে, হাদীছ ১ম শতাব্দীতেই লিপিবদ্ধ হয়েছিল এবং তা রাসূল (ছা.)- এর জীবদ্দশাতেই। অতঃপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ইবনু শিহাব আয-যুহরীর মাধ্যমে তা একত্রিত ও সুবিন্যস্ত করা হয় এবং তৃতীয় পর্যায়ে তা গ্রন্থাকারে রূপ পরিগ্রহ করে।
ড. ফুয়াদ সেযগীন হাদীছ সংকলনের এই তিনটি পর্যায়কে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর 'তারিখুত তুরাছ আল-আরাবী' গ্রন্থে'। তিনি বলেন হাদীছ সংকলন তিনটি ধাপ অতিক্রম করেছিল। (১) كتابة الحديث : এই ধাপে ছহীফা এবং জুয নামে ছোট ছোট পাণ্ডুলিপিতে হাদীছ লিখিত হ'ত। এটি ছিল রাসূল (ছা.)-এর যুগ, ছাহাবী এবং জ্যেষ্ঠ তাবেঈদের যুগ। (২) تدوين الحديث : এই ধাপে পূর্ব ধাপে বিক্ষিপ্তভাবে লিখিত ছহীফা ও জুযসমূহ একত্রিত করা হয়। প্রথম শতাব্দী হিজরীর শেষভাগ এবং ২য় শতাব্দী হিজরীর প্রথমভাগ ছিল এর ব্যাপ্তিকাল। (৩) تصنيف الحديث : এই ধাপে হাদীছসমূহ বিষয়বস্তু অনুসারে অধ্যায়ভিত্তিকভাবে সজ্জায়ন শুরু হয়। ২য় হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধের মধ্যভাগ থেকে শুরু হয়ে ২য় হিজরীর শেষভাগ পর্যন্ত এই ধাপ চলমান ছিল, যতদিন না ছাহাবীদের নাম অনুসারে নতুন ধারার বিন্যাসপদ্ধতি শুরু হয়, যা 'আল-মুসনাদ' নামে পরিচিত। প্রাচ্যবিদদের মধ্যে নাবিয়া এ্যাবোট এবং গ্রেগর শোয়েলার জোরালোভাবে এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন।
সুতরাং হাদীছ লিপিবদ্ধ হওয়া শুরু হয়েছিল রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশাতেই। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তার একত্রিতকরণ শুরু হয় ১ম শতাব্দীর হিজরীর শুরুতে। যেমনভাবে কুরআন লিপিবদ্ধ হয়েছিল রাসূল (ছা.)-এর যুগে। তবে তা একত্রিত করে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাবদ্ধ করা হয়েছিল ওছমান (রা.)-এর যুগে। সুতরাং ২য় হিজরী শতাব্দীর পূর্বে হাদীছ সংকলন শুরু হয়নি, এ কথা আদৌ সত্য নয়, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
খ. হাদীছ সংকলন শুধুমাত্র লেখনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং তা একই সাথে মুখস্তকরণের মাধ্যমেও চলমান ছিল। মুহাদ্দিছগণ বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (العدالة) এবং সঠিকভাবে ধারণক্ষমতা (الضبط)-কে সবার ঊর্ধ্বে রাখেন। আর সঠিকভাবে ধারণক্ষমতা (الضبط) দুই ভাবে বিভক্ত। (১) ضبط صدر : বর্ণনাকারী তাঁর শ্রুত বিষয়টি এমনভাবে মুখস্থ রেখেছেন এবং হৃদয়াঙ্গম করেছেন যে, যে কোন সময় তিনি তা নিজের স্মৃতি থেকে উপস্থাপন করতে পারেন। (২) ضبط کتاب : বর্ণনাকারী তাঁর নিকট লিখিত পান্ডুলিপিটি নিজের কাছে এমন সতর্কতার সাথে সংরক্ষণে রেখেছেন যে লেখনীর সময় তাতে কোন ভুল-ভ্রান্তির অনুপ্রবেশ ঘটেনি এবং লেখনীর পরও তাতে কোন ত্রুটি সৃষ্টি হয়নি। তবে মুহাদ্দিছদের নিকট ضبط صدر বা মুখস্থকরণই প্রাধান্য পেত। এমনকি ইমাম মালিক (১৭৯হি.) বর্ণনাকারীর নিকট লেখনী থাকা সত্ত্বেও মুখস্থ থাকাকে অপরিহার্য মনে করতেন। ইমাম আবু হানীফা (১৫০হি.) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। কেননা মুখস্থকরণের চেয়ে লেখনীতে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভবনা অধিকতর বেশী থাকে। এর কারণ লেখনীতে মানবীয় ত্রুটির বাইরেও বহিরাগত নানামুখী ত্রুটির সম্ভবনা থাকে। যেমন পানিতে ভিজে নষ্ট হওয়া, পোকায় কেটে ফেলা, লেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়া, লেখকের অবর্তমানে কেউ তাতে সংযোজন-বিয়োজন করা, লেখকের প্রমাদের কারণে এক শব্দ অন্য শব্দে রূপান্তরিত হওয়া (التصحيف والتحريف) (তাসহিফ ওয়াল তাহরীফ) ইত্যাদি। ফলে পবিত্র কুরআনও রাসূল (ছা.)-এর যুগে এবং পরবর্তী তিন খলীফার যুগে মূলত মুখস্থ পদ্ধতিতেই সংরক্ষিত ছিল। ওহমান (রা.) গ্রন্থাবদ্ধ করার পরই প্রথম কুরআনের লিপিবদ্ধরূপের প্রসার ঘটে।
সুতরাং ১ম শতাব্দীতে হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের কাজ তুলনামূলক কম হ'লেও মুখস্থকরণের মাধ্যমে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ছাহাবী এবং জ্যেষ্ঠ তাবেঈদের মুখস্থকরণ এবং লেখনীর এই যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই হাদীছ সংকলনের দ্বিতীয় ধাপ তথা একত্রিকরণ (التدوین) (তাদউইন) কাজ শুরু হয়েছিল। যদি পূর্ববর্তী ধাপে তা সংরক্ষণ করা না হ'ত তবে এই দ্বিতীয় ধাপ তথা একত্রিকরণের কাজ শুরু হওয়ার কোন প্রশ্নই উঠত না। সুতরাং হাদীছ সংকলনকর্ম সময়মতই শুরু হয়েছিল এবং তা যথাযথভাবে সংরক্ষিতও হয়েছিল। তবে তা একত্রিত করা এবং গ্রন্থে পরিণত করার কাজটি সঙ্গত কারণে বিলম্বিত হয়েছিল।
গ. উমার ইবনু আব্দিল আযীয (১০১হি.) যখন হাদীছ একত্রিকরণের নির্দেশ দিলেন, তখন তা স্রেফ ধর্মীয় আবেগবশত ছিল না; বরং এর পিছনে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রেক্ষাপট ছিল। মূলত ছাহাবীদের যুগেই হাদীছ সংকলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। উমার (রা.) এ ব্যাপারে ছাহাবীদের সাথে পরামর্শও করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করে তিনি এ কাজ থেকে ফিরে আসেন। অতঃপর তাবেঈদের যুগে এই প্রয়োজনীয়তা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে উমার ইবনু আব্দিল আযীযের যুগে তা প্রকট আকার ধারণ করে। কেননা ছাহাবীগণ তখন অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করেছিলেন, যারা ছিলেন সুন্নাহের প্রধান ধারক ও বাহক। জ্যেষ্ঠ তাবেঈগণ যারা ছাহাবীদের নিকট থেকে সুন্নাহের ভাণ্ডার সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন তারাও তখন জীবনের প্রান্তসীমায় চলে এসেছিলেন। অপরদিকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিবাদের ডামাডোলে জাল হাদীছ রচনার প্রবণতা তুঙ্গে উঠেছিল। সব মিলিয়ে তিনি আশংকা করেছিলেন যে, সুন্নাহর ভাণ্ডার এখনই একত্রিত না করলে তা অচিরেই আপন বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হবে।
انظروا حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم - যেমন তাঁর নিজের ভাষা - فاكتبوه فإني قد خفت دروس العلم وذهاب أهله 'তোমরা রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ সম্পর্কে খোঁজ কর এবং তা লিপিবদ্ধ করা শুরু কর। কেননা আমি হাদীছের বিলুপ্তি এবং হাদীছের ধারক-বাহকদের প্রস্থান (মৃত্যু)-এর আশংকা করছি। সুতরাং এ কথা ভাবার প্রশ্নই ওঠে না যে, ১ম শতাব্দীর পূর্বে হাদীছ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। উমার বিন আব্দুল আযীযের নির্দেশে তা মূলতঃ একত্রিত করা শুরু হয়েছিল।
এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, উমার ইবনু আব্দিল আযীয (৬১-১০১হি.) খিলাফতে আসীন হয়ে মদীনায় তাঁর নিযুক্ত গভর্নর আবূ বকর ইবনু হাযম আনছারী (১২০হি.)-এর নিকট হাদীছ লিপিবদ্ধ করার জন্য ফরমান পাঠান। তিনি তাকে আরও নির্দেশ দেন যে, আমরাহ বিনত আব্দির রহমান (৯৮হি.) এবং কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবী বাকর (১২০হি.)-এর কাছে সংরক্ষিত হাদীছ সমূহ লিপিবদ্ধ করতে। কেননা তারা ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর হাদীছ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, হাদীছ আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করার পূর্বেই মানুষের কাছে তা ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষিত ছিল। নতুবা উমার ইবনু আব্দিল আযীয তাঁকে বিশেষভাবে আমরাহ এবং কাসিম ইবনু মুহাম্মাদের নিকট রক্ষিত হাদীছসমূহ লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিতেন না। তাঁর এই নির্দেশই প্রমাণ করে যে, এই নির্দেশের পূর্ব থেকে হাদীছ সংরক্ষিত ছিল।
ঘ. হাদীছ সংকলনের শুরুতে মুহাদ্দিছগণ শহরে শহরে তৎকালীন বিদ্বানদের মজলিসে গেলেন যারা হাদীছ সংরক্ষণ এবং সংকলনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তারা তাদের নিকট থেকে যথাযথসূত্রে প্রাপ্ত হাদীছসমূহ একত্রিত করতে লাগলেন। তাদের লিখিত পাণ্ডুলিপি সমূহে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের সাথে ছাহাবী ও তাবেঈদের ব্যাখ্যা ও ফৎওয়াসমূহও লিপিবদ্ধ ছিল। অতঃপর ধীরে ধীরে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহ পৃথক করা এবং হাদীছ বর্ণনাকারীদের নাম-ঠিকুজি সংরক্ষণ করা, হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই করা প্রভৃতি ধাপগুলো পেরিয়ে হাদীছ সংকলন কর্ম পূর্ণতা পায়। এই পর্যায়ে এসে মুহাদ্দিছগণ হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের সূক্ষ্ম পদ্ধতিও আবিষ্কার করেন। অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণ কখনই ঢালাওভাবে সকল হাদীছ বিশুদ্ধ মনে করতেন না, যেমনটি হাদীছ অস্বীকারকারীগণ ধারণা করেছেন; বরং একটি কঠোর নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাদীছের শুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইসনাদ সংরক্ষণ এবং বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত শাস্ত্রের জন্ম ঘটেছিল প্রায় হাদীছ সংকলনকর্ম শুরু হওয়ার সময়কাল থেকেই। মূলত রাসূল (ছা.)-এর সতর্কতাবাণী- من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار করবে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয় মোতাবেক ছাহাবীগণ মিথ্যা বর্ণনার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, যা আমরা আবু বকর ও উমার (রা.)-সহ অন্যান্য ছাহাবীদের গৃহীত নীতিতে স্পষ্ট লক্ষ্য করেছি। পরবর্তীতে তাবেঈগণও একই রূপ সতর্ক পদক্ষেপ নেন। যেমন বছরার বিখ্যাত তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (১১০হি.) বলেন, لم يكونوا يسألون عن الإسناد، فلما وقعت الفتنة قالوا سموا لنا رجالكم، فينظر إلى أهل السنة فيؤخذ، حديثهم وينظر إلى أهل البدع فلا يؤخذ حديثهم সনদ জিজ্ঞাসা করত না। কিন্তু যখন ফিতনা সৃষ্টি হ'ল তখন তারা বলতে শুরু করল, তোমাদের লোকদের নাম বল। যদি দেখা যেত সে আহলুস সুন্নাহ'র অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি, তখন তার হাদীছ গ্রহণ করা হ'ত, আর যখন দেখা যেত সে বিদ'আতী ব্যক্তি, তখন তার হাদীছ আর গৃহীত হ'ত না। কুফার ফক্বীহ ইবরাহীম আন-নাখঈ (৯৬হি.)-কে সনদের আবির্ভাবের কারণ জিজ্ঞাসা করা হ'লে তিনি বলেন, أنه كثر الكذب على علي في تلك الأيام 'তখন আলী (রা.)-এর ওপর (শী'আদের) মিথ্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছিল।' অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীছ সংকলনের পূর্বেই বিভিন্ন শহরের বিদ্বানগণ সনদের মাধ্যমে হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই শুরু করেছিলেন। সুতরাং এ কথা বলা নিঃসন্দেহে হঠকারিতামূলক যে, হাদীছ সংকলনের কাজ দেরীতে শুরু হয়েছিল বলে তার শুদ্ধতার ওপর আস্থা রাখা যায় না।
৬. যুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, কুরআন রাসূল (ছা.)-এর যুগে সংকলিত হ'লেও তা একত্রিকরণের কাজ সুসম্পন্ন হ'তে প্রায় ৩০ বছর সময় লেগেছিল। অতএব হাদীছের এই বিশাল ভাণ্ডার ছাহাবীদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে একত্রিত করার কর্ম সঙ্গত কারণে বিলম্বিত হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং এর ভিত্তিতে হাদীছের প্রামাণিকতা অস্বীকার করা অযৌক্তিক।
রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর পূর্বেই কুরআন লিপিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল। অথচ ছাহাবী যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.)-কে যখন আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি ভীত-কম্পিত হয়ে বললেন, فو الله لو كلفوني نقل جبل من الجبال ما كان أثقل على مما أمرني به من جمع القرآن 'আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমাকে একটি পর্বত এক স্থান হ'তে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহ'লেও আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হ'ত না।' আমি বললাম, যে কাজ রসূল (ছা.) করেন নি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন? অতঃপর তিনি বলেন যে, আবু বকর ও উমার (রা.)-এর অব্যাহত তাগাদায় আল্লাহ আমার বক্ষ উন্মোচিত করে দিলেন। এর পর আমি কুরআন অনুসন্ধানের কাজে লেগে গেলাম এবং খেজুর পাতা, প্রস্তর খণ্ড এবং মানুষের বক্ষ থেকে আমি তা সংগ্রহ করতে লাগলাম। যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.)-এর এই বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, লিপিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত কুরআনকে একত্রিত করাও তাঁর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম কর্ম মনে হয়েছিল। এমনকি তিনি এ-ও ভেবেছিলেন যে, রাসূল (ছা.) যখন একত্রিতভাবে সংকলন করে যান নি, অতএব আমাদের জন্যও তা উচিৎ হবে কি না। সুতরাং কুরআন সংকলনকে কেন্দ্র করেই যখন এত প্রকার প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছিল, তখন হাদীছের বিশাল ভাণ্ডারকে লিপিবদ্ধভাবে সংরক্ষণ করার কর্ম শুরু করার বিষয়টি কতটা দুরূহ ও অনতিক্রম্য ছিল? শুধু এই একটি বিষয় বিবেচনায় রাখলেই হাদীছ দেরীতে লিপিবদ্ধকরণ সংক্রান্ত কোন সন্দেহ থাকার অবকাশ থাকে না।
টিকাঃ
৯২. দ্র. ড. ঈমাদ আস-সাইয়েদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাহ আন-নববিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৬-৩৪৪৭।
৯৩. ইবনু আব্দিল বার্র, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩২০, ৩৩১।
৯৪. আবু নাঈম আল-আছবাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৬৩।
৯৫. ইবনু মানযুর, লিসানুল আরাব, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ১৬৬।
৯৬. মুরতাযা আয-যাবীদী, তাজুল আরূস, ৩৫শ খণ্ড, পৃ. ৩৫।
৯৭. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী (হাদিউস সারী), ১ম খণ্ড, পৃ. ৬।
৯৮. ফুয়াদ সেযগীন, তারীখুত তুরাছ আল-আরাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২০।
৯৯. Nabia Abbott, Studies in Arabic Literary Papyri: Quranic Commentary and Tradition, vol. 2, p. 6-7.
১০০. Gregor Schoeler, The Genesis of Literature in Islam: From the Aural to the Read, p. 2-7.
১০১. ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দামাহ ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ১০৪-১০৬, ১৮১-১৮৩।
১০২. ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফিল ক্বারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ১৬৩- ১৬৪।
১০৩. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ার আল-কাশিফাহ, পৃ. ৭৭।
১০৪. আব্দুস সালাম আল-মুবারাকপুরী, সীরাতুল ইমাম আল-বুখারী (শারজাহ: দারুল ফাতহ, ৮ম প্রকাশ: ১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ১৮১-১৮২।
১০৫. সহীহুল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১; সুনানুদ দারিমী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪০১, হা/৫০৪-৫০৫।
১০৬. ছহীহুল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১; সুনান আদ-দারিমী, হা/৫০৪-৫০৫, সনদ ছহীহ।
১০৭. ইবনু সা'দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৯৫; আব্দুর রহমান ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত তা'দীল (বৈরূত: দারু ইহইয়াহিত তুরাহ আল-আরাবী, ১৯৫২খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২১।
১০৮. দ্র. ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফিল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৬৬- ৬৭।
১০৯. ছহীহুল বুখারী, হা/১০৭।
১১০. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১২২।
১১১. ইবনু রজব আল-হাম্বলী, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৫।
১১২. ছহীহুল বুখারী, হা/৪৯৮৬।
📄 সংশয়-৯ : হাদীছের অর্থগত বর্ণনা (الرواية بالمعنى) প্রমাণ করে যে, হাদীছ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি
হাদীছ অস্বীকারকারীগণ বলে থাকেন যে, হাদীছ সংকলনে বিলম্ব ঘটার ফলে তাতে শব্দগত বর্ণনার পরিবর্তে অর্থগত বর্ণনা )الرواية بالمعني( তথা ভাবার্থের প্রচলন ঘটেছে। ফলে হাদীছ বর্ণনায় প্রচুর কম-বেশী হয়েছে এবং হাদীছের মৌলিক অর্থের পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটেছে। সুতরাং হাদীছ শরী'আতের দলীল হওয়ার উপযুক্ত নয়। এমনকি এজন্য আরবী বৈয়াকরণিকগণ হাদীছ দ্বারা কোন দলীল পেশ করেন না। কেননা হাদীছের শব্দসমূহ রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত শব্দ নয়; বরং বর্ণনাকারীদের নিজস্ব শব্দচয়ন। হাদীছ যদি অহী হ'ত তবে অবশ্যই তা শব্দগতভাবে সংরক্ষিত হ'ত। অনুরূপভাবে প্রাচ্যবিদগণও হাদীছের Narrative Structure- কে কেন্দ্র করে সমালোচনার প্রয়াস পেয়েছেন এবং একে হাদীছ মনগড়া হওয়ার দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।
পর্যালোচনা:
হাদীছের অর্থগত বর্ণনা (الرواية بالمعني) মুহাদ্দিছদের নিকট একটি সুপরিচিত বিষয়। এটি বৈধ না অবৈধ তা নিয়ে মুহাদ্দিছদের মধ্যে শুরু থেকেই মতভেদ ছিল। এ বিষয়ে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করেছেন। ছাহাবী, তাবেঈ এবং পরবর্তী বিদ্বানদের একটি অংশ হাদীছের অর্থগত বর্ণনাকে বৈধ মনে করতেন না। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) সামান্য শব্দগত পরিবর্তনকেও গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। একবার তাঁর সামনে এক ব্যক্তি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ উল্লেখ করলেন যে, إنما مثل المنافق مثل الشاة بين الربيضين من الغنم 'মুনাফিকের উদাহরণ হ'ল, ছাগলের দু'টি পালের মধ্যে আবর্তনকারী ছাগলের মত।' আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তৎক্ষণাৎ সংশোধনী দিয়ে বললেন যে, বাক্যটি এমন নয়; বরং রাসূল (ছা.) বলেছেন, مثل المنافق مثل الشاة بين الغنمين এখানে দু'টি বাক্যের অর্থ একই। কেবল শব্দের সামান্য পার্থক্য হয়েছে। তবুও আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় তাঁর সম্মুখে জনৈক ব্যক্তি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করছিলেন। তিনি সিয়াম ও হজ্জকে আগে-পরে করে বর্ণনা করেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) তাকে বললেন, لا، ولكن حج البيت وصيام رمضان، هكذا قال رسول الله صلى الله عليه وسلم 'না এভাবে নয়, বরং বায়তুল্লাহয় হজ্জ্ব এবং রামাযানের ছিয়াম। এভাবেই রাসূল (ছা.) বলেছেন। এখানে তিনি শব্দের সামান্য আগে-পরে হওয়াকেও অনুমোদন করেননি। অনুরূপভাবে তাবেঈ ফক্বীহ আল-ক্বাসিম ইবনু মুহাম্মাদ (১০৭হি.) এবং মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (১১০হি.), ইমাম মালিক (১৭৯হি.), আব্দুর রহমান ইবনুল মাহদী (১৯৮হি.) প্রমুখও হাদীছের শব্দগত বর্ণনার ওপর জোর দিতেন এবং অর্থগত বর্ণনা করাকে নিষেধ করতেন।
তারা মনে করতেন, রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত শব্দসমূহের মাঝে কম-বেশী করা হ'লে তাতে অর্থগত পরিবর্তনের আশংকা থাকে। যেমন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, من سمع حديثا فحدث به کما سمع، فقد سلم ‘যে ব্যক্তি কোন হাদীছ শুনল এবং যেভাবে শুনল সেভাবেই বর্ণনা করল, সে ব্যক্তি নিরাপদ থাকল। আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর (১১০হি.) বলেন, والله إني لأحدث بالحديث فما أدع منه حرفا 'আল্লাহ্র কসম! আমি যখন হাদীছ বর্ণনা করি তখন (সংক্ষেপায়নের উদ্দেশ্যে) একটি শব্দও ছাড়ি না।
তবে অধিকাংশ বিদ্বানের মতে, অর্থগত বর্ণনা শর্তসাপেক্ষ বৈধ। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.), আনাস ইবনু মালিক (রা.), ইবরাহীম আন-নাখঈ (৯৬হি.), আমের আশ-শা'বী (১০০হি.), হাসান আল-বছরী (১১০হি.) প্রমুখ অর্থগত হাদীছ বর্ণনায় আপত্তি করতেন না, যদি মূল মর্মার্থ ঠিক থাকে। এজন্যই আমরা হাদীছ শাস্ত্রে সূত্র ভেদে একই হাদীছ ভিন্ন ভিন্ন শব্দে দেখতে পাই, যদি ভাবার্থ একই হয়ে থাকে। ছাহাবী এবং তাবেঈদের মধ্যে মূল অর্থ ঠিক রেখে এমন ভাবার্থবোধক বর্ণনার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কেননা তারা সুন্নাহর ক্ষেত্রে শব্দের চেয়ে অর্থের প্রতি বেশী গুরুত্বারোপ করতেন।
ছাহাবী ওয়াছিলাহ ইবনুল আছক্কা' (রা.)- কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হ'লে তিনি বলেন, 'তোমাদের সামনে কুরআন লিপিবদ্ধ রয়েছে, তবুও তোমরা মুখস্থ করতে বেগ পাও এবং তাতে (শব্দে) কম-বেশী হচ্ছে কি না সন্দেহে পতিত হও। তাহ'লে হাদীছের ক্ষেত্রে কী হ'তে পারে, যা আমরা হয়তবা একবারই রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে শুনেছি?... অতএব আমরা অর্থগতভাবে হাদীছ বর্ণনা করলে তা-ই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।
হাসান বাছরী (১১০হি.) এবং ইবনু শিহাব আয-যুহরী (১২৪হি.) বলেন, لا بأس بالحديث إذا أصبت المعنى '(অর্থগতভাবে) হাদীছ বর্ণনায় কোন সমস্যা নেই যদি অর্থটি সঠিক থাকে।
হাসান বাছরী (১১০হি.) এর পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন أن الله تعالى قد قص من أنباء ما قد سبق قصصا كرر ذكر بعضها في مواضع بألفاظ مختلفة، والمعنى واحد (কুরআনে) বর্ণনা করেছেন এবং বিভিন্ন স্থানে গল্পগুলোর অংশবিশেষ ভিন্ন ভিন্ন শব্দে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার অর্থ একই। অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই কুরআনে যেমন আদম (আ.), মূসা (আ.) প্রমুখের সাথে কথোপকথনগুলো অনেক স্থানে উল্লেখ করেছেন এবং তাতে শব্দগুলো স্থান ভেদে বেশ পরিবর্তিত হয়েছে, যদিও তাতে অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সুতরাং অর্থগত বর্ণনা বৈধ।
মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (১১০হি.) বলেন, كنت أسمع الحديث من عشرة المعنى واحد واللفظ مختلف যার অর্থ এক; কিন্তু শব্দ বিভিন্ন।
তাবেঈ যুরারাহ ইবনু আওফা (৯৩হি.) বলেন, لقيت أناسا من أصحاب رسول الله، فاجتمعوا في المعنى واختلفوا علي في اللفظ، فقلت لبعضهم ذلك، فقال: لا بأس ما لم يحيل المعنى আমি রাসূল (ছা.)-এর ছাহাবীদের মধ্য থেকে অনেকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তারা (হাদীছ বর্ণনা করতেন), যা অর্থের দিক থেকে একই হ'ত, যদিও শব্দের দিক থেকে বিভিন্ন হ'ত। আমি তাদের কাউকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এতে কোন সমস্যা নেই, যতক্ষণ না অর্থ পরিবর্তিত হয়।
ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) এই মতের পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেন রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ إن هذا القرآن أنزل على سبعة أحرف فاقرءوا ما تيسر 'নিশ্চয়ই কুরআন সাতটি হরফে নাযিল হয়েছে, অতঃপর তোমরা পড় যা তোমাদের জন্য সহজ হয়। তিনি বলেন, যদি আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি সহজতার জন্য কুরআন সাতটি হরফে নাযিল করে থাকেন, এটা জানিয়ে দিতে যে শব্দ ভিন্ন হ'লেও তা পাঠ করা বৈধ, যতক্ষণ না তাতে অর্থের কোন পরিবর্তন আসে; তবে কুরআন ভিন্ন অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে তা আরও বেশী বৈধ, যদি না অর্থের পরিবর্তন হয়। আর প্রত্যেক যেসব হাদীছে কোন হুকুম উল্লিখিত হয় না, তাতে শব্দের পরিবর্তন ঘটলেও অর্থের পরিবর্তন ঘটে না।
আল-আমিদী (৬৩১হি.) এটি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা' রয়েছে মন্তব্য করে বলেন, ،والمختار مذهب الجمهور، ويدل عليه النص، والإجماع والأثر والمعقول 'এটাই হ'ল জুমহুর বিদ্বানদের গৃহীত মাযহাব। যা নছ, ইজমা', আছার এবং যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত।
وَﻣِﻦْ ﺃَﻗْﻮَﻯ ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, حُجَجِهِمْ الإِجْمَاعُ ﻋَﻠَﻰ ﺟَﻮَﺍﺯِ ﺷَﺮْﺡِ ﺍﻟﺸَّﺮِﻳﻌَﺔِ ﻟِﻠْﻌَﺠَﻢِ ﺑِﻠِﺴَﺎﻧِﻬَﺎ ﻟِﻠْﻌَﺎﺭِﻑِ ﺑِﻪِ، ﻓَﺈِﺫَﺍ 0 0 3 ﺟَﺎﺯَ ﺍﻟْﺈِﺑْﺪَﺍﻝُ ﺑِﻠُﻐَﺔٍ ﺃُﺧْﺮَﻯ، ﻓَﺠَﻮَﺍﺯُﻩُ ﺑِﺎﻟﻠُّﻐَﺔِ ﺍﻟْﻌَﺮَﺑِﻴَّﺔِ ﺃَﻭْﻟَﻰ দলীল হ'ল অনারব ভাষাভাষীদের জন্য তাদের ভাষায় শরী'আতের বিধানসমূহ ব্যাখ্যা করার অনুমোদনে মুসলিম উম্মাহর ইজমা'। যদি তা অন্য ভাষায় পরিবর্তন করা বৈধ হয়, তবে আরবী ভাষার মধ্যে (তার শব্দগত পরিবর্তন) অধিকতর বৈধ।
আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী (১৩৮৬হি.) বলেন, 'আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি যে ছাহাবীগণ স্বাভাবিক নিয়মেই দ্বীন প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যারা রাসূল (ছা.)-এর বিবরণ শব্দে শব্দে মুখস্থ রাখতে পেরেছিলেন তারা সেভাবেই প্রচার করেছিলেন। আর যারা অর্থ মনে রেখেছিলেন তারা অর্থগতভাবে হাদীছ প্রচার করেছিলেন। এটি একটি সুনিশ্চিত বিষয় যাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এই নীতিই রাসূল (ছা.)- এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর ছাহাবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।
সুতরাং কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ছাহাবী এবং তাবেঈদের যুগে বাধ্যগত অবস্থায় হাদীছের অর্থগত বিবরণ প্রচলিত ছিল। তবে তা শর্তহীন ছিল না। বরং অর্থগত বর্ণনাকারীর জন্য ইমাম শাফেঈসহ বিদ্বানগণ কিছু কঠোর শর্ত নির্ধারণ করেছেন। যেমন: (১) তাকে আরবী ভাষা এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহ সর্ম্পকে অভিজ্ঞ হতে হবে। (২) বাক্যের অর্থ এবং অন্তর্গত ফিক্হ সম্পর্কে জ্ঞাত হ'তে হবে। (৩) কিসে অর্থের পরিবর্তন ঘটে বা না ঘটে সে সম্পর্কে সচেতন হ'তে হবে। এভাবে যদি কোন বর্ণনাকারী অর্থের পরিবর্তন সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হয়, তবেই তার জন্য অর্থগত বর্ণনা বৈধ হবে। অন্যথায় তাকে শব্দগতভাবেই বর্ণনা করতে হবে।
এছাড়া অর্থগতভাবে বর্ণনা করার সময় আরও খেয়াল রাখতে হবে যে, হাদীছটির মতনটি যেন (جوَﺍﻣِﻊُ ﺍﻟْﻜَﻠِﻢِ )সারগর্ভ বাক্য) বা রাসূল (ছা.)-এর 'সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য'-এর অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং এমন না হয় যা দ্বারা ইবাদত করা হয়। যেমন আযানের বাক্যসমূহ, বিভিন্ন মাসনূন দোআ ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, হাদীছ সংকলন সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থগত বর্ণনার এই নীতি সাধারণভাবে আর বৈধ নয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহাদ্দিছদের নিকট কোন হাদীছ মূল শব্দে বর্ণনা করাই সাধারণ নীতি। কিন্তু হাদীছের মূল শব্দটি ভুলে গেলে ইলম গোপনের আশংকায় শর্তসাপেক্ষে অর্থগত বর্ণনার অনুমোদন রয়েছে, যদি তাতে অর্থের পরিবর্তন না হয়। আর যদি অর্থ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সকল বিদ্বানের ঐক্যমতে অর্থগত বর্ণনা নিষিদ্ধ। খত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) বলেন, وليس بين أهل العلم خلاف في أن ذلك لا يجوز للجاهل بمعنى الكلام وموقع الخطاب ، والمحتمل منه وغير المحتمل 'বিদ্বানদের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, বাক্যের অর্থ, প্রাসঙ্গিকতা, সম্ভাব্যতা ও অসম্ভাব্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অর্থগত বর্ণনা বৈধ নয়।
সুতরাং হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণামতে প্রথম যুগে ঢালাওভাবে হাদীছের অর্থগত বর্ণনার প্রচলন ছিল একথা মোটেও সত্য নয় এবং যারা অর্থগত বর্ণনা করতেন তাদের জন্যও হাদীছের মূল অর্থে কোন পরিবর্তন ঘটানোর কোন অনুমোদন ছিল না। ফলে এর মাধ্যমে হাদীছের অর্থে বিকৃতি ঘটা কিংবা হাদীছের মৌলিকত্ব বিনষ্ট হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিশেষত ছাহাবী এবং তাবেঈদের এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন থেকে এটি জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়। নিম্নে আমরা এ বিষয়ে হাদীছ অস্বীকারকারীদের আরও কিছু ধারণা খণ্ডন করব।
ক. কুরআনের মত হাদীছও কেন শব্দগতভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হ'ল না? এই প্রশ্নের জবাবে ড. আবু যাহু বলেন, কুরআনকে শব্দগতভাবে সংরক্ষণের কারণ ছিল এই যে, কুরআন তেলাওয়াত হ'ল ইবাদত। তার আয়াতসমূহ হ'ল আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মু'জিযাস্বরূপ। এজন্য তা অর্থগত বর্ণনার কোন অনুমোদন নেই। বরং তার নাযিলকৃত শব্দ হুবহু সংরক্ষণ করা আবশ্যক। আর হাদীছ শব্দগতভাবে সংরক্ষণ না করার কারণ হ'ল, হাদীছের ক্ষেত্রে শব্দ নয় বরং অর্থ হ'ল মুখ্য বিষয়। এজন্য হাদীছ তেলাওয়াতও করা হয় না। হাদীছের মতনসমূহ মু'জিযাও নয়। সুতরাং তার অর্থগত বর্ণনায় কোন বাধা নেই। দ্বিতীয়ত, কুরআনের শব্দগত সংরক্ষণ সমগ্র শরীআতের জন্য রক্ষাকবচ। আর সুন্নাহর ক্ষেত্রে অর্থগত সংরক্ষণে দায়মুক্তি প্রদান মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সহজীকরণ। কেননা যদি মুসলিম উম্মাহ কুরআনের মত সুন্নাহকেও শব্দে শব্দে সংরক্ষণ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হ'ত, তবে তাদেরকে হাজারো সীমাবদ্ধতা ও সংকটের সম্মুখীন হ'তে হ'ত। আবার যদি সুন্নাহর মত কুরআনও অর্থগতভাবে বর্ণনার সুযোগ থাকত তবে কিছু মানুষ তাতে অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ পেত যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত নয়। ফলে আল্লাহ কুরআনকে শব্দগতভাবে সংরক্ষণ করে একদিকে শরী'আতকে রক্ষা করেছেন। অপরদিকে সুন্নাহকে অর্থগতভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন। তৃতীয়ত, আমরা লক্ষ্য করেছি যে সুন্নাহর অর্থগত বর্ণনা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। ফলে শব্দগতভাবে সংরক্ষিত না হ'লেও এর মূল অর্থে বিকৃতি ঘটার কোন সুযোগ নেই। চতুর্থত, যদি বলা হয় যে, রাসূল (ছা.) শব্দগতভাবে সংরক্ষণ করে গেলে সুন্নাহর প্রতি আস্থা রাখা যেত, তাহ'লে এ কথার দ্বারা রাসূল (ছা.)-এর ওপর সরাসরি অভিযোগের তীর ছোড়া হয় যে, তিনি সঠিকভাবে দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব পালন করেননি কিংবা সুন্নাহ দ্বীনের অংশ নয়। এ দু'টি কথাই মানুষকে পথভ্রষ্টকারী।
খ. কুরআনের মত হাদীছ শব্দগতভাবে নাযিল হয়নি। সুতরাং তা শব্দগতভাবে সংরক্ষণের কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। এজন্য রাসূল (ছা.) নিজেই অর্থগত বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ একই বিষয়ের বিবরণ সময় ও স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে প্রদান করেছেন। যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ আমল সম্পর্কে যতবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রতিবার তিনি কিছুটা পরিবর্তিত উত্তর প্রদান করেছেন। ফলে যে কোন সাধারণ পাঠক ভেবে বসতে পারে যে, এটি স্ববিরোধিতা কিংবা বর্ণনাকারীর দুর্বলতা বা অর্থগত বর্ণনার ফল। অথচ বাস্তবতা হ'ল, রাসূল (ছা.) ছিলেন মানসিক চিকিৎসক। তিনি প্রত্যেক মানুষকে তার উপযোগী করে প্রয়োজনীয় উত্তর প্রদান করতেন বা প্রশ্নকারীর অবস্থা বুঝে উত্তর দিতেন। তাঁর নিকট দেশ-বিদেশ থেকে সর্বদা মানুষ আসত এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করত। তিনি সকলের অবস্থা অনুযায়ী সংক্ষেপে কিংবা দীর্ঘ করে প্রশ্নের উত্তর দিতেন। ফলে একই প্রশ্নের উত্তরে কখনও কোন বর্ণনাকারীর বর্ণনায় দীর্ঘ করে কিংবা সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। এটা বর্ণনাকারী বা অর্থগত বর্ণনার ত্রুটি নয়। বরং এভাবেই রাসূল (ছা.) বর্ণনা করেছিলেন। যেমনভাবে কুরআনেও আমরা লক্ষ্য করি যে, নবীদের কাহিনী বর্ণনার সময় একই ঘটনা বিভিন্ন সূরায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের ওপর অবিশ্বাসী অজ্ঞ পাঠক এটি কুরআনের ভুল ও স্ববিরোধীতা ধরে নিতে পারে। অথচ বাস্তবে তা নয়। কেননা কুরআনে কোন প্রকার ভুল বা মিথ্যার সন্নিবেশ ঘটার সুযোগ নেই। সুতরাং হাদীছের অর্থগত বর্ণনাকে এর দুর্বলতা ভাবার সুযোগ নেই।
গ. বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীছসমূহ যদি আমরা প্রায়োগিকভাবে বিশ্লেষণ করি তাহ'লে দেখব যে, কোন হাদীছে শব্দগত কিছু পরিবর্তন আসলেও তার বিষয়বস্তুতে মৌলিক কোন পরিবর্তন আসে নি। উদাহরণস্বরূপ এ পর্যন্ত প্রাপ্ত হাদীছ শাস্ত্রের সর্বাধিক প্রাচীন লিখিত সংকলন ছহীফা হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ, যা ১ম হিজরী শতকে সংকলিত হয়েছিল, তাতে মূসা (আ.)-এর বস্ত্র উন্মোচিত হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনাটি এসেছে। একই হাদীছ প্রায় দুইশত বছর পর ৩য় হিজরী শতকে সংকলিত ছহীহুল বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ মা'মার ইবনু রাশেদ আব্দুর রায্যাক ইবনু হাম্মام ইসহাকু ইবনু ইবরাহীম ইবনু নাছর (বুখারী), মুহাম্মাদ ইবনু রাফি' (মুসলিম) সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে হুবহু প্রায় একই শব্দে। অনুরূপভাবে হাদীছটি ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা (রা.) থেকে অন্য দুই বর্ণনাকারী খাল্লাস ইবনু আমর (১০০হি.) এবং মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ আল-কুরাশী সূত্রে এবং ইমাম মুসলিম অপর একজন বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ ইবনু শাক্বীক আল-উকাইলী (১০৮হি.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। অথচ লক্ষ্যণীয় যে এই দীর্ঘ পরিক্রমায় নানা সূত্রের বর্ণনাকারী ভেদে হাদীছের শব্দগত কিছু পরিবর্তন হ'লেও মূল বিষয়বস্তুর কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
এজন্য প্রাচ্যবিদদের মধ্যে যারা হাদীছের এই বর্ণনাধারা সম্পর্কে তুলনামূলক গবেষণা চালিয়েছেন তাঁরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, হাদীছ বর্ণনাকারীগণ রাসূল (ছা.)-এর বাণীকে যথাযথ ও সুসংহতভাবেই সংরক্ষণ করেছেন। যেমন ড. নাবিয়া এ্যাবোট (১৮৯৭-১৯৮১খ্রি.) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ Studies in Arabic literary papyri গ্রন্থে তিনি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিসমূহ বিশ্লেষণ করে বিষদভাবে তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীদের বর্ণনায় তেমন কোন বিভক্তি দেখা যায়নি শব্দের কিছু পার্থক্য ছাড়া। এমনিভাবে মুসনাদ আবূ দাউদ আত-তায়ালিসীর হাদীছসমূহের বর্ণনাভঙ্গির ওপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী আমেরিকান গবেষক R. Marston Speight (১৯২৪-২০১১খ্রি.) মুসনাদ তায়ালিসী'র ২৭৬৭টি হাদীছের ওপর বর্ণনাভঙ্গি গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, যুগপরম্পরায় হাদীছ বর্ণনাকারীগণের অর্থগত বর্ণনা বিস্ময়করভাবে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছসমূহে মৌলিক কোন পরিবর্তন সাধন করেনি। তিনি বলেন, This investigation of two-, three-, and four-part narrative forms contributes to a fuller appreciation of hadith in their phenomenal reality and in their total living context. It helps us to see how hadith transmitters informed the memory of the prophetic model with clear and consistent structural line.
ঘ. হাদীছের শব্দগত বিভিন্নতা কেবল প্রভাবিত করে কওলী তথা রাসূল (ছা.)-এর কথ্য হাদীছকে, যা তুলনামূলক কম সংখ্যক। কিন্তু বেশীর ভাগ হাদীছসমূহ তথা ফে'লী (কর্মগত) এবং তাকুরীরী (অনুমোদনসূচক) হাদীছসমূহে এর কোন প্রভাব নেই। কেননা কোন কর্ম বা অনুমোদনের বিবরণ কখনও একই শব্দে হ'তে পারে না। বর্ণনাকারী ভেদে তাতে ভিন্নতা আসবেই, যা সুপরিজ্ঞাত বিষয়। সুতরাং কথা উঠতে পারে কেবল সে সকল হাদীছে যেখানে ছাহাবী বলেছেন ...قال رسول الله صلى الله عليه وسلم রাসূল (ছা.) বলেছেন..'। যদি এই কওলী হাদীছগুলো বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় দুই জন বা তিন ছাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে কতিপয় শব্দের কম-বেশী ছাড়া মূল বক্তব্যের কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ছাহাবীগণ এবং পরবর্তী বর্ণনাকারীগণ হাদীছ বর্ণনার সময় শব্দগত বিবরণের চেষ্টায় কোন অবহেলা করেননি। বরং তারা সাধ্যমত হুবহু বর্ণনার চেষ্টা করেছেন। এতে কখনও হয়ত শব্দের আগ-পিছ হয়েছে কিংবা কোন শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যা হাদীছের মূল অর্থ বা বিষয়বস্তুর কোন পরিবর্তন ঘটায় নি।
৬. হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীগণ এমনই সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে قال, أو كما ورد, أو كما قال, أو نحوه, أو شبهه : Ja (ছা.) সম্ভবত অনুরূপ বলেছেন' বা 'সম্ভবত এভাবে বর্ণিত হয়েছে' ইত্যাদি অনিশ্চয়তাবোধক বক্তব্য। হাদীছ গ্রন্থসমূহে এমন উদাহরণ অসংখ্য পাওয়া যায়। শুধু রাসূল (ছা.)-ই নন বরং ঊর্ধ্বতন যে কোন বর্ণনাকারী বা তার বর্ণনা সম্পর্কে তাঁরা এমন সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং সন্দেহ হলেই তা প্রকাশ করতেন। যা মুহাদ্দিছদের নিকট شك من الراوى )বর্ণনাকারীর সন্দেহ( হিসাবে পরিচিত। ইমাম ইবনু মাজাহ (২৭৩হি.) তাঁর সুনানে একটি অধ্যায় باب التوقي في الحديث عن رسول الله صلى الله عليه وسلم -108 (রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন) শিরোনামে এবং এতে ছাহাবী ও তাবেঈদের সতর্কতা সম্পর্কে বেশ কিছু বর্ণনা একত্রিত করেছেন। যেমন ইবনু সীরীন হ'তে বর্ণিত আনাস (রা.) রাসূল (ছা.) হ'তে কোন হাদীছ বর্ণনার সময় ভীত হ'তেন এবং বলতেন: أو كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم অথবা রাসূল (ছা.) অনুরূপ বলেছেন'। তাবেঈ এবং তৎপরবর্তী যুগেও অনেক বর্ণনাকারী এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন বর্ণ ও অব্যয় পর্যন্ত পরিত্যাগ করতেন না। সুলায়মান ইবনু মিহরান আল-আ'মাশ كان هذا العلم عند أقوام كان أحدهم لأن يخر من السماء al 19 (1) أحب إليه من أن يزيد فيه واوا أو ألفا أو دالا মানুষের নিকট রক্ষিত ছিল যাদের কারো নিকট হাদীছের মধ্যে 'ওয়াও', 'আলিফ', 'দাল' বৃদ্ধি করা থেকে আসমান থেকে পড়ে যাওয়াই অধিক প্রিয়তর ছিল।
ইমাম মুসলিম (২৬১হি.)-এর 'ছহীহ' অধ্যয়ন করলে এই সতর্কতা চমৎকারভাবে অনুধাবন করা যায়। তিনি মতনে সামান্য একটি সমার্থবোধক শব্দের পরিবর্তন পেলেও তা উল্লেখ করেছেন। যাতে অর্থের কোনই পরিবর্তন হয় না কিংবা হলেও এত সূক্ষ্ম পরিবর্তন যা প্রকৃত জ্ঞানী ব্যতীত কেউ অনুভব করতে পারবে না। এছাড়া ইমাম আহমাদ (২৪১হি.) তাঁর মুসনাদে এবং আবূ দাউদ তাঁর সুনানে এই নীতি সূক্ষ্মভাবে অবলম্বন করেছেন। এছাড়া কোন হাদীছের ক্ষেত্রে সত্য সত্যই এমন শব্দ যদি ঢুকে যায় যা রাসূল (ছা.)-এর বর্ণিত বাক্য নয় বলে অনুমিত হয়, তবে মুহাদ্দিছগণ সেটি المدرج বা অনুপ্রবিষ্ট কথা হিসাবে চিহ্নিত করে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, হাদীছের অর্থগত বর্ণনার কারণে হাদীছের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতায় কোন প্রভাব পড়ে না। আর এতে হাদীছের অর্থে ও বিষয়বস্তুতে কোন বিকৃতিরও প্রশ্ন আসে না। অতএব এ যুক্তিও এখানে প্রযোজ্য নয় যে, হাদীছের ভাষ্যসমূহ রাসূল (ছা.)-এর নিজের বর্ণিত শব্দ নয় বরং তা পরবর্তী বর্ণনাকারীদের নিজস্ব চয়ন। বরং অর্থগত বর্ণনকে আমরা কুরআনের প্রচলিত বিভিন্ন 'কিরাআত'-এর সাথে তুলনা করতে পারি, যাতে শব্দের ভিন্নতায় মূল অর্থের পরিবর্তন হয় না।
চ. কতিপয় প্রাচীন ভাষাবিদ যেমন সিবওয়াইহ (১৮০হি.), আবুল হাসান আল-কিসাঈ (১৮৯হি.), আবু যাকারিয়া আল-ফারা (২০৭হি.) প্রমুখ বিশুদ্ধ আরবী ভাষার দলীল হিসাবে তাঁদের গ্রন্থসমূহে কুরআনের আয়াত কিংবা আরবী কবিতাসমূহ ব্যবহার করলেও হাদীছের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেননি কেন? এ প্রশ্নের জবাবে ড. ছুবহী ছালিহ বলেন, এর কারণ সম্ভবত তৎকালীন সময়ে হাদীছ ও ফিকহের পণ্ডিত ব্যতীত অন্যদের নিকট হাদীছগ্রন্থ সমূহের দুষ্প্রাপ্যতা। নতুবা তারা আরবী কবিতার আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে হাদীছ থেকেই উদ্ধৃতি দিতেন, যেমনটি দেখা গেছে পরবর্তী ভাষাবিদদের ক্ষেত্রে।
যেমন আবুল মানছুর আল-আযহারী (৩৭০হি.) সংকলিত تهذيب اللغة , ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ আল-জাওহারী (৩৯৩হি.) সংকলিত الصحاح, ইবনু ফারিস (৩৯৫হি.) সংকলিত معجم مقاييس اللغة প্রভৃতি অভিধানে হাদীছ থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে। সুতরাং এই যুক্তিও হাদীছ অস্বীকারের জন্য কোন দলীল হ'তে পারে না।
টিকাঃ
১১৩. মাহমুদ আবু রাইয়াহ, আযওয়াউন আলাস সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ, পৃ. ৩৪৫।
১১৪. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭১-২১১।
১১৫. তদেব, পৃ. ১৭৩।
১১৬. তদেব, পৃ. ১৭৬।
১১৭. তদেব, পৃ. ১৮৬।
১১৮. ইবনু আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫০; খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৮৯।
১১৯. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৬৭।
১২০. আস-সারাখসী, উছুলুস সারাখসী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৫; ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফীল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪১৩।
১২১. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭২।
১২২. তদেব, পৃ. ১৯০।
১২৩. ইবনুছ ছালাহ, মুক্কাদ্দামাতু ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২১৪; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুর্গীছ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৮; জামালুদ্দীন আল-কাসিমী, কাওয়াঈদুত তাহদীছ, পৃ. ২২১।
১২৪. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৮৬, ড. রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফীল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪২১।
১২৫. ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দামাতু ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ২১৪।
১২৬. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৫।
১২৭. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ২০৭। এ বিষয়ে খতীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) ৩টি মারফু হাদীছ উল্লেখ করেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূল (ছা.)- কে জিজ্ঞাসা করল যে, হে রাসূল! আমরা আপনার নিকট হাদীছ শুনি। কিন্তু ঠিক যেভাবে শুনেছি, সেভাবে অনেক সময় অপরের নিকট বর্ণনা করতে পারি না। তখন রাসূল (ছা.) বললেন إذا لم تحرموا حلالا ولا تحلوا حراما وأصبتم المعنى فلا بأس 'যদি তোমরা হারামকে হালাল না কর এবং হালালকে হারাম না কর এবং অর্থ ঠিক রাখতে পার তবে কোন সমস্যা নেই' (পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৯-২০০)। কিন্তু এগুলোর কোনটিই ছহীহ নয়। আল-জাওয়াক্বানী (৫৪৩হি.) বলেন, هذا حديث باطل، وفي إسناده اضطراب 'এই হাদীছ বাতিল এবং এর সনদে অসংলগ্নতা রয়েছে'। দ্র. আল-জাওরাকানী, আল-আবাজ্বীল ওয়াল মানাকীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৩। ইবনু রজব (৭৯৫হি.) এ প্রসঙ্গে বলেন, روي فيه أحاديث مرفوعة، لا يصح شيء منها বিষয়ে কিছু মারফু' হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যার কোনটিই ছহীহ নয়'। দ্র. ইবনু রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৯।
১২৮. আর-রামহারমুখী, আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল, পৃ. ৫২৯।
১২৯. খত্ত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ২০৬।
১৩০. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭০; ইবনু রজব, শারহ ইলালিত তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৮।
১৩১. ছহীহুল বুখারী, হা/৬৯৩৬; ৭৫৫০।
১৩২. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২৭০।
১৩৩. আল-আমিদী, আল-ইহকাম ফী উছলিল আহকাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০৩।
১৩৪. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৯৭; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৬।
১৩৫. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৭৮।
১৩৬. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ৩৮০; আর-রামহারমুখী, আল-মুহাদ্দিছুল ফাছিল, পৃ. ৫২৯।
১৩৭. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৭-৫৩৮; আবু যাহ্, আল- হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২০১।
১৩৮. ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, جميع ما تقدم يتعلق بالجواز وعدمه، ولا شك أن الأولى إيراد الحديث بألفاظه دون التصرف فيه (নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৯৭)।
১৩৯. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৭।
১৪০. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৯৮।
১৪১. আবু যাহ্, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২০১।
১৪২. তদেব, পৃ. ২০৭-২০৮।
১৪৩. হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ, ছহীফাহ হাম্মাদ ইবনু মুনাব্বিহ, তাহক্বীক: আলী হাসান আলী আব্দুল হামীদ (বৈরূত: আল-মাকতাবুল ইসলামী, ১৯৮৭খ্রি.), পৃ. ৪৪, হা/৬০।
১৪৪. ছহীহুল বুখারী, হা/২৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৯।
১৪৫. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৪o৪।
১৪৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৯।
১৪৭. Nabia Abbott, Studies in Arabic Literary Papyri: Quranic Commentary and Tradition, vol. 2, p.1.
১৪৮. The Musnad of Al-Tayalisi: A Study of Islamic Hadith as Oral Literature (Connecticut (USA) : Hartford Seminary Foundation, 1970).
১৪৯. Narrative Structures in the Hadith (Chicago: Journal of Near Eastern Studies, Vol. 59, No. 4 (Oct., 2000), pp. 271.
১৫০. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৭৯।
১৫১. সুনান ইবনু মাজাহ, হা/২৪।
১৫২. খতীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ, পৃ. ১৭৭।
১৫৩. শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪১।
১৫৪. ছুবহী ছালিহ, উলূমুল হাদীছ ওয়া মুহত্বলাহুহু, পৃ. ৩২২।