📄 সংশয়-৪ : আল্লাহ কুরআন সহজ করেছেন
তাদের মতে, আল্লাহর বাণী- وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ ‘আমরা কুরআনকে সহজ করেছি উপদেশ লাভের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?’ এই আয়াত থেকে প্রমাণিয়ত হয় যে, কোরআন বোঝার জন্য হাদীছের প্রয়োজন নেই।
পর্যালোচনা:
এখানে কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ হ'ল, এতে বর্ণিত জীবন-বিধান সহজ-সরল ও বাস্তবায়নযোগ্য। যেমন ছালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, ছিয়াম রাখা, হজ্জ করর, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, অন্যায় ও অশ্লীলতা হ'তে দূরে থাকা ইত্যাদি। এগুলি যেকোন সাধারণ কুরআন পাঠক সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু কুরআন অনুধাবনের অর্থ তা নয়। যেমন আল্লাহ কিতাবٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ‘এই কিতাব যা আমরা আপনার নিকট নাযিল করেছি, তা বরকতমণ্ডিত। তা এজন্য নাযিল করেছি যাতে লোকেরা এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে এবং জ্ঞানীরা এ থেকে উপদেশ হাছিল করে।' তিনি জ্ঞানীদের তিরষ্কার করে বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا ‘কেন তারা কুরআন গবেষণা করে না? নাকি তাদের হৃদয়সমূহ তালাবদ্ধ? কুরআন গবেষণা ও তার মর্ম অনুধাবন ও তা থেকে বিধি-বিধান নির্ধারণ ও উপদেশ আহরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের ভাষা ও অলংকার সম্পর্কিত জ্ঞানে পরিপক্কতা অর্জন করা ও অন্যান্য যরূরী বিষয়ে দক্ষতা লাভ করা। বস্তুত, কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যাকারী হ'লেন রাসূলুল্লাহ (ছা.)। অতঃপর ছাহাবায়ে কেরাম, যাদের কাছে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করেছেন ও উপদেশ প্রদান করেছেন, যা লিপিবদ্ধ আছে ‘হাদীছ' ও ‘আছার' আকারে। অতএব কুরআন অনুধাবনের জন্য হাদীছের ব্যাখ্যা জানা অত্যাবশ্যক।
দ্বিতীয়ত, কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ যদি এটাই হয় যে, এর কোন ব্যাখ্যা বা তাফসীরের প্রয়োজন নেই, তবে রাসূল (ছা.)-এর আগমণের হেতু কী ছিল? মানুষের পক্ষে কি নিজেই সবকিছু বুঝে নেওয়া সম্ভব ছিল না? কেন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে কুরআনের ব্যাখ্যাকারী” হিসাবে প্রেরণ করলেন?
টিকাঃ
৪৫. সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ১৭, ২২, ৩২, ৪০।
৪৬. সূরা ছোয়াদ, আয়াত: ২৯।
৪৭. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪।
📄 সংশয়-৫ : আল্লাহর বিধান তথা কুরআনই চূড়ান্ত
মুনকিরে হাদীছ খাজা আহমাদ দ্বীন বলেন, ‘মানুষ শিরককে জীবিত করার জন্য বহু পথ আবিষ্কার করেছে। তারা বলে যে, আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ হ'লেন মূল সত্তা, যিনি আনুগত্যের হক্বদার। তবে আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ হ'ল মূল সত্তার আনুগত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই ভ্রষ্ট দলীলের মাধ্যমে তারা যাবতীয় প্রকারের শিরকের বৈধতা দিয়ে থাকে। কোন অপরিচিত ব্যক্তি কি কোন বিবাহিত মহিলার স্বামী হয়ে যায়, যদি মহিলার স্বামী তাকে সেই অপরিচিত ব্যক্তির স্ত্রী বলে? সাবধান! আল্লাহ কখনই এমন নির্দেশ দেননি। কেননা আল্লাহর বাণী হ'ল, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। অর্থাৎ তাদের দৃষ্টিতে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্যে শিরক করা।
পর্যালোচনা:
এই আয়াত দ্বারা রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য নাকচ করা হয়নি, কিংবা রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করা শিরকও নয়। স্রেফ অজ্ঞতার কারণে এরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। দলীলসমূহ নিম্নরূপ:
ক. আয়াতটি পবিত্র কুরআনে মোট ৩টি স্থানে এসেছে। প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। যেমন প্রথমে সূরা আল-আন'আমে আয়াতটি বর্ণিত হয়েছে কাফেররা তাঁর নিকট কুরআনের আয়াত নাযিল করার জন্য চাপ প্রয়োগের প্রেক্ষিতে। এই আয়াত নাযিলের মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই দাবী পূরণ করা রাসূল (ছা.)-এর আয়ত্তাধীন নয়, বরং আল্লাহর আয়ত্তাধীন। এ ব্যাপারে আল্লাহ এক এবং একক। পরের দু'টি আয়াত এসেছে সূরা ইউসুফে। প্রথম স্থানে ইউসুফ (আ.) তাঁর জেলখানার সহবন্দী দু'জনকে শিরক পরিত্যাগের উপদেশ দিয়ে আয়াতটি পাঠ করেছিলেন এবং পরবর্তী স্থানে ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদেরকে রাজার দরবারে প্রবেশের আদব- কায়দা শেখানোর সময় তাদের ওপর কোন বিপদের আশংকা থেকে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতাসূচক আয়াতটি পাঠ করেছিলেন। প্রতিটি স্থানে মানুষের অক্ষমতা এবং আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার কথা উদ্ভাসিত হয়েছে, যার কোন শরীক নেই। কিন্তু এসকল আয়াতে সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাসূচক কিছু নেই। এতে শিরকের প্রসঙ্গ তো নেই-ই, বরং তাওহীদই প্রকাশিত হয়। কেননা আল্লাহ নিজেই তাঁর রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাঁর নির্দেশকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারোও নেই। আল্লাহ বলেন, এ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ الْحُكْمُ 'সাবধান! হুকুম প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুতরাং এই নির্দেশ মান্য করাই তাওহীদ এবং অমান্য করাই শিরক। কেননা এতে রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণের এলাহী নির্দেশকে উপেক্ষা করে শরী'আত প্রণয়ন ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব আল্লাহ্র রাসূল ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, যার অধিকার আল্লাহ কাউকে দেননি। সুতরাং আল্লাহর ব্যাপারে এই অনধিকার চর্চাই বরং শিরক হিসাবে পরিগণিত হবে। খ. রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ যদি শিরক হয়, তবে প্রশ্ন আসে যে, রাসূল (ছা.) তবে কিসের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন? তিনি কি শিরক প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন? তাঁর সুন্নাহসমূহ কি আল্লাহ্ বিধান প্রতিষ্ঠারই নিমিত্ত নয়? আল্লাহ বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا 'রবের কসম তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে বিচারক নির্ধারণ করে, আর আপনি যে ফায়ছালা দেবেন, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনরূপ দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। এই আয়াতে আল্লাহ নিজের কসম খাওয়ার পর রাসূল (ছা.)-এর ফয়ছালা অনুসরণের যে হুকুম প্রদান করলেন, তা কি শিরকের প্রতি আহ্বান? অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহই কি শিরকের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন? যদি তা অসম্ভব হয়, তবে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের মাঝেই বরং তাওহীদের দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়। কেননা এই আনুগত্য সরাসরি আল্লাহরই হুকুম। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে এই আনুগত্যের নির্দেশ এসেছে যা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে দেখেছি। সুতরাং নিঃসন্দেহে রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহর আনুগত্য করা অপরিহার্য এবং তা প্রকৃতপক্ষে তাওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ।
টিকাঃ
৪৮. সূরা নাহল, আয়াত: ৪৪।
৪৯. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৭; সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০, ৬৭।
৫০. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৬২।
৫১. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫।
📄 সংশয়-৬ : রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন
মুনকিরে হাদীছদের দাবী, রাসূল (ছা.) আল্লাহ্ পক্ষ থেকে কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন। তিনি কোন বিধান প্রবর্তক ছিলেন না। তিনিও অন্যান্য মানুষের মত কুরআন অনুসরণের জন্য আদ্দিষ্ট ছিলেন। এর প্রমাণে অন্যান্য আয়াতের সাথে রাসূল (ছা.) বর্ণিত কিছু হাদীছও দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। যেমন রাসূল (ছা.) ছহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীছে মন্তব্য করেন, وَقَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابُ اللهِ 'আমি তোমাদের নিকট ছেড়ে যাচ্ছি এমন একটি বস্তু যা ধারণ করলে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। আর সেটি হ'ল আল্লাহ্ কিতাব। এছাড়া রাসূল (ছা.) তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় বললেন, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় লিখে দিতে চাই, যার পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না।' অতঃপর উমার (রা.) উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, রাসূল (ছা.) এখন তীব্র যন্ত্রণায় আক্রান্ত। তোমাদের নিকট কুরআন রয়েছে। আমাদের জন্য আল্লাহ্ কিতাবই যথেষ্ট। (وَعِنْدَكُمْ الْقُرْآنُ حَسْبُنَا كِتَابُ اللهِ) সুতরাং এসব থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ কুরআনের ভিত্তিতেই প্রযোজ্য। তিনি কুরআন প্রচারের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন, হাদীছ নয়।
পর্যালোচনা: ক. রাসূল (ছা.)-কে কেবল কুরআন প্রচারক হিসাবে আল্লাহ প্রেরণ করেননি; বরং মানবজাতির জন্য শিক্ষক হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সমাজের বুকে কুরআনের শিক্ষাসমূহ সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন, যা হাদীছ হিসাবে সংরক্ষিত হয়ে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। আল্লাহ বলেন, لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ 'উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াত সমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল (ছা.) কেবল কুরআন তেলাওয়াতকারী ছিলেন না, বরং মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে তিনি তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষাও প্রদান করেছেন। কেননা যদি শুধুমাত্র কুরআন পড়ে শুনানোই রাসূল (ছা.)-এর দায়িত্ব হ'ত তাহ'লে عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ ۦيَتْلُو বলাই যথেষ্ট হ'ত, পুনরায় وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ বলার প্রয়োজন ছিল না।
খ. আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ "আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। এই আয়াতে (النطق) বা কথা বলার অর্থ কুরআন তিলাওয়াত নয়, বরং নবীর নিজের মুখের ভাষা। আর দ্বীন সংক্রান্ত তাঁর যে কোন কথাই হাদীছ। এ বিষয়ে কুরআনে অসংখ্য প্রমাণ মওজুদ রয়েছে।
গ. উপস্থাপিত হাদীছসমূহে কুরআনকে উল্লেখ করা হয়েছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে (عَلَى وَجْهِ التَغْلِيْبِ), যেহেতু কুরআন শরী'আতের প্রধানতম উৎস। ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, রাসূল (ছা.) তাঁর এই বক্তব্যে কেবল কুরআনকে উল্লেখ করেছেন এই জন্য যে, কুরআন হ'ল সর্বপ্রধান, বাকীগুলো তার অনুগামী। আর তাতে সকল কিছুর বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে, হয় সরাসরি নছের মাধ্যমে কিংবা ইস্তিম্বাত (অন্যান্য দলীলের ভিত্তিতে বিধি-বিধান নির্ণয় করা)-এর মাধ্যমে। মানুষ যখন কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশসমূহও অনুসরণ করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا "রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।
ঘ. কুরআনের অন্যান্য বহু আয়াতে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের নির্দেশ স্পষ্টতই সাক্ষ্য দেয় যে, এই আনুগত্য কেবল কুরআনের পাঠকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য নয়, বরং শরীআ'তের ব্যাখ্যাদানকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য। নতুবা তাঁর আনুগত্যের বিশেষ কোন মূল্য থাকত না এবং প্রকারান্তরে তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ অর্থহীন হয়ে যেত। কেননা এর ফলে কুরআনের পাঠককারী হিসাবে তিনি এবং সাধারণ পাঠকের মাঝে কোনই পার্থক্য থাকত না। যা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। অতএব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে রাসূল (ছা.)-এর শিক্ষা বা সুন্নাহ্ও কুরআনের মতই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্যভাবে অনুসরণীয়।
টিকাঃ
৫২. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮।
৫৩. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩৭।
৫৪. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪।
৫৫. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৫৬. সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৬১।
📄 সংশয়-৭ : রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন
প্রাথমিক এবং আধুনিক যুগের হাদীছ অস্বীকারকারীদের সবচেয়ে বড় দলীল হ'ল, রাসূল (ছা.) প্রথমাবস্থায় হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মতে, হাদীছ যদি ইসলামী আইনের উৎস বা দলীল হ'ত, তাহ'লে অবশ্যই আল্লাহ্ নবী বা ছাহাবীগণ তার লিখন, সংকলন এবং হেফাযতের ব্যবস্থা নিতেন- যেমনভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে নিয়েছিলেন। গোলাম আহমাদ পারভেয বলেন, 'সুন্নাহ যদি দ্বীনের অংশ হ'ত, তবে রাসূল (ছা.) নিশ্চয়ই কুরআনের মত হাদীছ সংরক্ষণের জন্যও লিপিবদ্ধকরণ, মুখস্তকরণ বা পাঠদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। দ্বীনের এই বৃহৎ অংশটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় হ'তেন না। কেননা নবুঅতের অবস্থান থেকে উম্মাহর জন্য দ্বীনকে সংরক্ষিতভাবে প্রদানই কাম্য ছিল। কিন্তু রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের জন্যই সংরক্ষণের যাবতীয় ব্যবস্থা নিলেন, অথচ হাদীছের জন্য কোন কিছুই করেননি। উপরন্ত হাদীছ লিখতে নিষেধ করেছেন এ মর্মে যে, 'তোমরা আমার নিকট থেকে কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখে নিও না। যদি কেউ আমার থেকে কুরআন ভিন্ন কিছু লিপিবদ্ধ করে, তবে তা যেন মুছে ফেলে।
এ সম্পর্কে তারা রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদীছসমূহ উপস্থাপন করেন এবং যে সকল ছাহাবী এবং তাবেঈ হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে অনাগ্রহ পোষণ করতেন কিংবা নিষেধ করতেন তাদেরকেও তারা দলীল হিসাবে গ্রহণ করেন। বিশেষত খুলাফায়ে রাশিদীন যেমন আবূ বকর, উমার এবং আলী (রা.)-এর বর্ণনাসমূহ। কেননা আবু বকর সম্পর্কে এমন বর্ণনা এসেছে যে, তিনি পাঁচশত হাদীছ লিপিবদ্ধ করার পর তা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। আর উমার (রা.) ছিলেন হাদীছ বর্ণনার ঘোর বিরোধী এবং দীর্ঘ একমাস ইস্তিখারার পর তিনি হাদীছ সংকলন না করার সিদ্ধান্ত নেন। আলী (রা.)-ও অনুরূপভাবে বিরোধী ছিলেন। আর রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ লিখনের আদেশসূচক হাদীছসমূহ তারা দুর্বল মনে করেন, কিংবা নিষেধাজ্ঞার হাদীছটি দ্বারা আদেশসূচক হাদীছসমূহ রহিত হয়েছে মনে করেন।
পর্যালোচনা:
রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে সাময়িক নিষেধ করেছিলেন, তবে পরবর্তীতে অনুমতি দিয়েছিলেন, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। নিম্নে উপরোক্ত দাবীসমূহ খণ্ডন করা হ'ল।
ক. হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে রাসূল (ছা.) হ'তে মোট ৩টি নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদীছ এসেছে, যেগুলি আবু সাঈদ আল-খুদরী, আবূ হুরায়রা এবং যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.) বর্ণনা করেছেন। তবে একমাত্র আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) বর্ণিত হাদীছটি ব্যতীত অন্যগুলি যঈফ। আর এই হাদীছটিও মারফু' হওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইমাম বুখারী বলেন, এটি মাওকুফ হওয়াই ছহীহ। এতদ্ব্যতীত ছাহাবী এবং তাবেঈগণ হ'তে কিছু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে লিপিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে, যার মধ্যে কিছু বর্ণনা ছহীহ রয়েছে এবং কিছু যঈফও রয়েছে। কিন্তু এসকল হাদীছের বিপরীতে রাসূল (ছা.) হ'তে হাদীছ লিখনের অনুমতি ও নির্দেশসূচক হাদীছ রয়েছে এবং একইভাবে ছাহাবী ও তাবেঈদের পক্ষ থেকেও লেখনীর অনুমতিসূচক অসংখ্য হাদীছ পাওয়া যায়। ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী ৫২ জন ছাহাবীর তালিকাসহ ১ম হিজরী শতকে হাদীছ লিপিবদ্ধকারী জ্যেষ্ঠ ৫৩ জন তাবেঈ এবং কনিষ্ঠ ২৫২ জন তাবেঈ'র তালিকা বৃত্তান্ত সহকারে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তাদের হাদীছ লেখনীর অনুমোদন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
খ. হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে এই পরস্পরবিরোধী বর্ণনাসমূহ সম্পর্কে বিদ্বানদের বক্তব্য হ'ল প্রাথমিক পর্যায়ে কুরআনের সাথে সংমিশ্রণের আশংকায় রাসূল (ছা.) হাদীছ লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। তবে সে আশংকা বিদূরিত হওয়ার পর তিনি লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেন। অপর একদল বিদ্বানের মতে, আদেশের হাদীছগুলি দ্বারা নিষেধের হাদীছটি মানসূখ হয়ে গেছে। আর ছাহাবী ও তাবেঈগণ যেমন আবূ বকর (রা.), উমার (রা.), আলী (রা.), আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.), আবূ হুরায়রা (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) প্রমুখ ছাহাবীগণ মূলত মানুষের মুখস্থ ছেড়ে লেখনীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এবং ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়ার শংকা থেকে হাদীছ লিপিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা অধিকাংশই এই অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন এবং তাঁদের পক্ষ থেকেও হাদীছ লিপিবদ্ধ করার দলীল পাওয়া গেছে। সুতরাং হাদীছ লিপিবদ্ধকরণে রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞা এবং ছাহাবী ও তাবেঈদের বিরূপভাব সবই ছিল একটি সাময়িক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। আর হাদীছ সংরক্ষণের প্রশ্নে তাদের মধ্যে বিতর্ক হয়নি, বরং বিতর্ক ছিল কেবল সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে অর্থাৎ তা মুখস্থকরণের মাধ্যমে হবে নাকি লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে। ইমাম নববী বলেন, ثم أجمع المسلمون على جوازها وزال ذلك الخلاف অর্থাৎ '(প্রাথমিক দ্বিধাগ্রস্থতার পর) মুসলমানরা লেখনীর বৈধতার ব্যাপারে সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে মতপার্থক্য দূর হয়ে যায়। সুতরাং এ বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা যদি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বহাল থাকত তবে ছাহাবীরা কখনই হাদীছ লিপিবদ্ধ করতেন না।
গ. মিসরীয় বিদ্বান রশীদ রিযা এ ব্যাপারে একক ব্যক্তি যিনি ভিন্নমত পোষণ করেন যে, রাসূল (ছা.)-এর নিষেধাজ্ঞার হাদীছটি দ্বারা আদেশসূচক হাদীছ সমূহ রহিত হয়েছে। এর পক্ষে তিনি দু'টি দলীল পেশ করেছেন। (১) নবীর মৃত্যুর পর কতিপয় ছাহাবীর হাদীছ লেখনী থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরকে নিষেধ করা। (২) ছাহাবীদের হাদীছ সংকলন এবং তা প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ না করা। কেননা যদি তাঁরা সংকলন করতেন এবং প্রচার করতেন, তবে তাদের সংকলনসমূহ 'মুতাওয়াতির' সূত্রে আমাদের নিকট পৌঁছাতো। রশিদ রিযার এই ধারণা সঠিক নয়, যা পূর্বেই স্পষ্ট করা হয়েছে। ছাহাবী ও তাবেঈগণের সময়কালে হাদীছ কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে মুহাদ্দিছগণের হাদীছ সংগ্রহ ও বর্ণনা পদ্ধতি কী ছিল সে সম্পর্কে কোন ধারণা ব্যতীত তিনি এই মন্তব্য করেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘ. রাসূল (ছা.) যে হাদীছে লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন, সেই একই হাদীছের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, وحدثوا عني، ولا حرج، ومن كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار (যা শোন তা) বর্ণনা কর, তাতে কোন অসুবিধা নেই। আর যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নেয়। অর্থাৎ লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে এর দ্বারা হাদীছ বর্ণনা করা অর্থাৎ হাদীছের প্রামাণিকতাকে নাকচ করা মোটেও উদ্দেশ্য ছিল না।
ঙ. ছাহাবীগণের মধ্যে আবূ বকর (রা.) ও উমার (রা.) হাদীছ বর্ণনার কঠোর বিরোধী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। একথার কিছুটা বাস্তবতা থাকলেও সর্বাংশে সত্য নয়। যেমন আবু বকর (রা.) তাঁর নিজের কাছে লিখিত পাঁচশত হাদীছের পাণ্ডুলিপিটি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন মর্মে আয়েশা (রা.) বর্ণিত প্রসিদ্ধ কাহিনীটি বিশুদ্ধ নয়; বরং তিনি নিজেই বাহরাইনের গভর্নর আনাস ইবনু মালিক (রা.) এবং আমর ইবনুল আছ (রা.)-এর নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন, যাতে রাসূল (ছা.)-এর হাদীছ লিখিত ছিল। তবে আবূ মুলাইকা থেকে মুরসাল সূত্রে একটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূল (ছা.)-এর মৃত্যুর পর আবু বকর (রা.) মানুষকে একত্রিত করে বললেন, إنكم تحدثون عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أحاديث تختلفون فيها والناس بعدكم أشد اختلافا فلا تحدثوا عن رسول الله شيئا، فمن سألكم فقولوا بيننا وبينكم كتاب الله فاستحلوا حلاله وحرموا حرامه তোমরা রাসূল (ছা.) থেকে হাদীছ বর্ণনা করছ এবং তাতে বিভিন্নতা করছ। মানুষ তোমাদের পর আরও বেশী মতভেদ করবে। অতএব রাসূল (ছা.) হ'তে কোন কিছু বর্ণনা করো না। তোমাদের নিকট কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, তবে তোমরা বলে দাও, আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর কিতাব। অতএব তাতে যা হালাল করা হয়েছে তা হালাল মনে কর এবং যা হারাম করা হয়েছে তা হারাম কর।
আবূ বকর (রা.)-এর এই বর্ণনাটি যদি বিশুদ্ধ হয় তবে এর উদ্দেশ্য এমন হ'তে পারে যে, মতপার্থক্যের সময় অধিক হাদীছ বর্ণনা থেকে সতর্ক করা। কেননা এতে রাসূল (ছা.) যে অর্থে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, সে ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হ'তে পারে। এজন্য বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর ইমাম যাহাবী أن مراد الصديق التثبت في الأخبار والتحري لا سد باب (984হি.) বলেন,
الرواية এর মাধ্যমে আবু বকর (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে অধিক যাচাই-বাছাই ও সতর্কতা অবলম্বন করা। তিনি হাদীছ বর্ণনার দুয়ার বন্ধ করেননি।' এর প্রমাণ হ'ল দাদীর সম্পত্তি বিষয়ক রাসূল (ছা.)-এর হাদীছটি যখন তাঁর নিকট উল্লেখিত হয়েছিল তিনি নির্দ্বিধায় কবুল করে নিয়েছিলেন। তিনি খারিজীদের মত একথা বলেননি যে 'আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।'
অনুরূপভাবে উমার (রা.) সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে যে, তিনি হাদীছ সংকলনকর্ম শুরু করার ব্যাপারে ছাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। ছাহাবীরা তাঁকে হাদীছ সংকলনের ব্যাপারে ইতিবাচক পরামর্শ দিলেন। অতঃপর উমার (রা.) একমাস ব্যাপী ইস্তিখারা করেন। অবশেষে তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহসমূহ লিখে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্মরণ হ'ল যে, পূর্ববর্তী কওমরা আল্লাহর কিতাব ছেড়ে দিয়ে নিজেদের লেখা কিতাবসমূহে মজে গিয়েছিল। অতএব আল্লাহ্র কসম আমি আল্লাহর কিতাবের সাথে অন্য কিছুর মিশ্রণ ঘটাব না।” এছাড়া আরও কিছু বর্ণনা রয়েছে যেমন:
-তিনি মানুষের কাছে রক্ষিত হাদীছের পাণ্ডুলিপিসমূহ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ফরমান পাঠিয়েছিলেন যে, অনুরূপ কোন পান্ডুলিপি থাকলে তা মুছে ফেলতে হবে।
-তিনি আবূ হুরায়রা (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন যে, তুমি অবশ্যই হাদীছ বর্ণনা পরিত্যাগ করবে, নতুবা তোমাকে দাওসের ভূখণ্ডে (নির্বাসনে) পাঠিয়ে দেব।
-তিনি কা'ব আল-আহবারকে বলেছিলেন যে, তুমি হাদীছ বর্ণনা ছাড়বে, নতুবা তোমাকে কুরদা নামক এলাকায় (নির্বাসনে) প্রেরণ করব।
-তিনি আবূ যার, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ এবং আবুদ দারদা (রা.)- কে ডেকে পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তোমরা রাসূল (ছা.) থেকে বেশী বেশী হাদীছ বর্ণনা করছ কেন? অতঃপর তাদেরকে মদীনায় বন্দী করে রাখলেন।
-আবূ হুরায়রা (রা.) বলতেন, আমি এমন অনেক হাদীছ বর্ণনা করি, যা উমার (রা.)-এর যুগে বর্ণনা করলে আমার মাথা কাটা যেত। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, উমার (রা.)-এর মৃত্যুর পূর্বে আমরা 'আল্লাহর রাসূল (ছা.) বলেছেন' এ কথা বলতে পারতাম না। আমরা তাঁর চাবুককে ভয় করতাম।
এই বর্ণনাসমূহের মধ্যে কেবল প্রথম বর্ণনাটি ছহীহ। বাকি বর্ণনাগুলোর সূত্র সবই যঈফ কিংবা বিচ্ছিন্ন, যা দলীলযোগ্য নয়। প্রথম বর্ণনাটি বরং হাদীছ লিপিবদ্ধকরণের পক্ষেই একটি দলীল। কেননা ছাহাবীরা উমার (রা.)- কে লিপিবদ্ধ করার পরামর্শই দিয়েছিলেন। কিন্তু উমার (রা.) তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কেবল কুরআন লিপিবদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছিলেন। এর পিছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন:
(১) তিনি কুরআনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সেই সাথে হাদীছ মানুষের অন্তরে মুখস্থ থেকে যাওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন। যেন মানুষ উভয়টির মাঝে সংমিশ্রণ না ঘটিয়ে ফেলে।
(২) তিনি এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন মানুষের অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি চাননি দূর-দূরান্তের বিভিন্ন রাজ্যের নতুন নতুন ইসলামগ্রহণকারী মানুষ কোন বিভ্রান্তিতে পড়ে যাক এবং কুরআন ও হাদীছকে সংমিশ্রিত করে ফেলুক। সেজন্য বিচক্ষণতার সাথে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি কেবল কুরআনকেই মানুষের অন্তরে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন এবং সুন্নাহকে তার আপন গতিতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।"
(৩) তিনি হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে যে কড়াকড়ি করতেন, তা কেবল হাদীছের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য। এর প্রমাণ হ'ল উমার (রা.) ও আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা.)-এর মধ্যকার প্রসিদ্ধ ঘটনাটি, যেখানে তিনি উমার (রা.)- কে তিনবার সালাম দিয়ে না পেয়ে ফিরে এসেছিলেন এবং উমার (রা.) তাঁর এই কর্মের ব্যাপারে দলীল ও সাক্ষী তলব করেন। অবশেষে সাক্ষী হিসাবে আবূ সাঈদ খুদরী (রা.)- কে পাওয়ার পর তিনি হাদীছটি কবুল করেন। উমার (রা.) ঐ ঘটনার পর আবু মূসা আল-আশ'আরী (রা.)- কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, 'আমি তোমাকে দোষী বানাতে চাই নি, কিন্তু আমি ভয় পাই যে, মানুষ রাসূল (ছা.)-এর নামে হাদীছ রটনা করা শুরু করবে'।
(৪) তিনি হাদীছকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যেন রাসূল (ছা.)-এর নামে নিজের ইচ্ছামত কেউ যেন কিছু বলতে সাহস না করে। ফলে পরবর্তীরা যেন এই শিক্ষা নেয় যে, উমার (রা.) হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূল (ছা.)-এর মর্যাদাবান ছাহাবীদের ওপর যখন এত কড়াকড়ি করেছেন, তখন তাদের জন্য বিষয়টি কত কঠিন হতে পারে। আর শয়তানের প্ররোচনায় রাসূল (ছা.)-এর নামে কোন মিথ্যা রটনা করার পরিণাম কত ভয়ংকর হতে পারে।
(৫) ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন, উমার (রা.)-এর কড়াকড়ি সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ এই অর্থে গ্রহণ করতে হবে যে, তিনি এমন হাদীছ বর্ণনার বিষয়ে শংকিত ছিলেন যা মানুষ ভুল বুঝে ভুল স্থানে ব্যবহার করতে পারে। আর কেউ যখন বেশী হাদীছ বর্ণনা করে তখন স্বভাবতই ভুল বা প্রমাদের আশংকা থাকে। ফলে মানুষ সেই ভুলটিই সঠিক ভেবে গ্রহণ করে বসতে পারে।
সুতরাং আবু বকর (রা.) ও উমার (রা.) সম্পর্কে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহ হাদীছ অস্বীকারের পিছনে কোন দলীল হ'তে পারে না। কেননা এগুলো প্রায় সবই দুর্বল বর্ণনা। আর যেগুলি ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। উপরন্তু এ সকল বর্ণনা যদি বিশুদ্ধও হ'ত তবুও কোন ছাহাবী বা তাবেঈ'র ব্যক্তিগত মতামতের কারণে ইসলামী শরী'আতে সুন্নাহর অবস্থান নিঃসন্দেহে দুর্বল হয় না। কেননা সুন্নাহর মর্যাদা কুরআন দ্বারাই সুপ্রতিষ্ঠিত।
চ. ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগে কুরআনের মত আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীছ সংকলনের উদ্যোগ না নেয়ার প্রধান কারণ ছিল, কুরআনের মত হাদীছের কোন নির্দিষ্ট সীমানা ও চৌহদ্দি ছিল না। কেননা রাসূল (ছা.)-এর পুরো জীবনচিত্রই হল হাদীছের বিষয়বস্তু। প্রত্যেক ছাহাবী রাসূল (ছা.)-কে যতটুকু দেখেছেন ও শুনেছেন, তাঁর ভিত্তিতেই হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর এই ছাহাবীদের সংখ্যাও ১ লক্ষের কম ছিল না। ফলে দেশে- বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থানকারী ছাহাবীদের বর্ণিত সমস্ত হাদীছ একত্রিত করা ও গ্রন্থাবদ্ধ করার জন্য স্বভাবতঃই দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সকল ছাহাবী এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং রাসূল (ছা.)-এর সাথে সমানভাবে সহাবস্থান করেননি। কেউ আগে মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ পরে। কেউবা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং সেসকল স্থানে তাঁদের ছাত্র ও শিষ্যদের কাছে বিভিন্ন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে হাদীছ বর্ণনা করেছিলেন। সুতরাং হাদীছের এক বিশাল ভাণ্ডার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। সেসকল হাদীছ একত্রিত করা এবং গ্রন্থাবদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন ছিল দূরদূরান্ত সফর করার। ফলে লেখনীর অপ্রচলন এবং যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতার সেই যুগে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে কাজ আঞ্জাম দেয়া অসম্ভবই ছিল। ধীরে ধীরে বছরের পর বছর মুহাদ্দিছদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সংমিশ্রণের আশংকার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য সতর্কতা অবলম্বনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাদীছ শাস্ত্র সংকলিত ও গ্রন্থাবন্ধ হয়।
তৃতীয়ত, যেহেতু রাসূল (ছা.)-এর যিন্দেগীর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের পুরো সময়কাল পর্যন্ত হাদীছের গণ্ডি সুবিস্তৃত, কাজেই তার সমস্ত কথা, আমল, অনুমতি ও স্বীকৃতিসমূহ কাগজে বা খেঁজুর পাতায় এক জায়গায় লিখে সুরক্ষিত করে রাখা কঠিন, বরং অসম্ভব কাজ ছিল। কেননা এমন বিশালাকার কাজের জন্য বহু সংখ্যক ছাহাবীর অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হ'ত। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, রাসূল (ছা.)-এর জীবদ্দশায় লেখকের সংখ্যাও ছিল বেশ অপ্রতুল। সুতরাং যে কয়জন লেখক ছিলেন, তারা কেবল রাসূল (ছা.)-এর স্থায়ী মু'জিযা তথা কুরআন লিপিবদ্ধ করার কাজেই আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আর সুন্নার ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তিগত এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু লিখিত সংকলন করলেও মূলত তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা এবং তাঁর বাণীসমূহ মুখস্থকরণের উপরই অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
চতুর্থত, প্রাথমিক যুগে কুরআন সংকলন এবং কুরআনের প্রচারই ছিল ছাহাবীদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রস্থল। কেননা কুরআন ইসলামী শরী'আতের মূল ভিত্তি। তাছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করা হয় এবং এর ভাষা, শব্দ ও বর্ণ সবকিছুই সুনির্দিষ্ট, যাতে কোন প্রকার আক্ষরিক পরিবর্তন- পরিবর্ধনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সুতরাং কুরআনকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়াই ছিল ছাহাবীদের নিকট মুখ্য বিষয়। অতঃপর ওছমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংরক্ষণপর্ব পুরোপুরি নিশ্চয়তার সাথে সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মুসলমানরা ভিন্ন দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
জ. যুক্তিগত দিক থেকে বলা যায় যে, কোন জিনিস দলীলযোগ্য হওয়ার জন্য লিপিবদ্ধ হওয়া শর্ত নয়। এর প্রমাণ হ'ল স্বয়ং কুরআন। কুরআন যে অকাট্য দলীল হিসাবে গৃহীত হয়েছে তা লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণে নয়, বরং শব্দগতভাবে তা আমাদের নিকট অসংখ্য বিশ্বস্ত সূত্রে ( التواتر اللفظي) পৌঁছানোর কারণে। অর্থাৎ কুরআন যদি লিপিবদ্ধ নাও থাকত তবুও তা আমাদের নিকট অকাট্য দলীল হ'ত। সুতরাং লিপিবদ্ধ হওয়া কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ কোন বৈশিষ্ট্য নয়। ড. আব্দুল গণি আব্দুল খালিক (১৯৮৩খ্রি.) বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, প্রথম যে বস্তু বা বস্তুসমূহের ওপর সরাসরি অহির বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সেই বস্তুর কোন সন্ধান কি এখন পাওয়া যায়? তবে আমরা কিসের ভিত্তিতে নিশ্চিত হচ্ছি যে, আমাদের নিকট রক্ষিত কুরআন প্রকৃতই অহির ভিত্তিতে নাযিলকৃত কুরআন? কিসের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হচ্ছি যে, তাতে কোন প্রকার রদবদল হয়নি? এই নিশ্চয়তা পেয়েছি কেবলমাত্র সত্যবাদী এবং ন্যায়পরণতায় বিশ্বস্ত একদল বিরাট সংখ্যক মানুষের প্রদত্ত সংবাদের মাধ্যমে, যাদের কোন মিথ্যার ওপর ঐক্যমত হওয়া সম্ভব নয়। অতঃপর প্রত্যেক যুগে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বস্ত সংবাদদাতাদের মাধ্যমে আমরা মূলসূত্র তথা মূল যে দলটি হাদীছ লিখন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন, তাদের নিকট পৌঁছাতে পারি এবং নিশ্চিত হতে পারি যে, এটিই সেই মূল কুরআনের অনুলিপি। অনুরূপভাবে যারা প্রথম কুরআন লিপিবদ্ধ করেছেন কিংবা লিপিবদ্ধ হ'তে দেখেছিলেন, তারাও কুরআনকে অকাট্য দলীল হিসাবে গ্রহণের ব্যাপারে লিপিবদ্ধ কুরআনের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। কেননা তাঁরা তো সরাসরি রাসূল (ছা.) থেকেই কুরআন শ্রবণ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্ব থেকেই শ্রবণসূত্রে কুরআন তাঁদের নিকট অকাট্য দলীল ছিল।
দ্বিতীয়ত, কুরআনের সকল অনুলিপি তৈরী হয়েছিল মূলত একটি পাণ্ডুলিপি থেকে যেটি যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.) প্রস্তুত করেছিলেন। সুতরাং কিসের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হচ্ছি যে যায়েদ ইবনু ছাবিত (রা.)-এর প্রস্তুতকৃত এই একক পাণ্ডুলিপিতে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা যথার্থই রাসূল (ছা.)-এর ওপর নাযিলকৃত কুরআন? এই নিশ্চয়তা পাওয়ার একমাত্র উপায় হ'ল, ছাহাবীগণ সকলেই তাঁদের স্মৃতির ভিত্তিতে এর সত্যতা এবং বিশুদ্ধতার ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সুতরাং একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, লিপিবদ্ধ হওয়া প্রাথমিক দলীল নয়, এটি একটি সহযোগী দলীল মাত্র।
তৃতীয়ত, যারা মনে করেন যে, লিপিবদ্ধ হলেই কেবল দলীলযোগ্য হয় তারা এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন যদি কোন ইহুদী বা খৃষ্টান এসে তাদেরকে বলেন যে, কুরআন প্রামাণ্য গ্রন্থ নয়, কেননা সেটি আসমান থেকে লিখিতভাবে নাযিল হয়নি। যদি কুরআন প্রামাণ্য দলীলই হ'ত, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ গুরুত্ব সহকারে তা লিখিত আকারে নাযিল করতেন, যেমনটি তাওরাত ও ইঞ্জিলের ক্ষেত্রে করেছেন? এর উত্তর আমরা এভাবে দেই যে, প্রথমত রাসূল (ছা.)-এর নিষ্পাপত্ব এবং তাঁর নিকট হ'তে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীগণই আমাদের নিকট দলীল। এই বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের বর্ণনা যখন আমাদের নিকট মুতাওয়াতির সূত্রে পৌঁছে তখন আমরা সেটি নিশ্চিত দলীল হিসাবে গ্রহণ করি। আর হাদীছ অস্বীকারকারীগণ যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চান তবে তাদেরকে স্বীকার করতেই হবে যে, লিপিবদ্ধ হওয়া দলীল হওয়ার জন্য শর্ত নয়। বরং বর্ণনাকারীর সংখ্যা মুতাওয়াতির পর্যায়ের হওয়া বা বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত হওয়ার মাধ্যমেই দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও তা খবর ওয়াহিদ হয়। কেননা কুরআন লিপিবদ্ধ আকারে প্রেরিত হয়নি; বরং রাসূল (ছা.) হ'তে বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। আর এটা যদি তারা স্বীকার করে নেন, তবে নিঃসন্দেহে তারা এ কথা বলার সুযোগ পাবেন না যে, কুরআনই কেবল দলীল, হাদীছ দলীল নয়; কেননা তা প্রাথমিক যুগে লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি।
ইবনু হাজার আল-আসকালানী (৮৫২হি.) বলেন, والمستفاد من بعثه المصاحف إنما هو ثبوت إسناد صورة المكتوب فيها إلى عثمان لا أصل ثبوت القرآن فإنه متواتر عندهم '(ওছমান রা.)-এর কুরআনের মুছহাফসমূহ প্রেরণের মধ্য দিয়ে এটিই কেবল প্রতীয়মান হয় যে, কুরআনের লিখিত রূপটির সনদসূত্র ওছমান (রা.) পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু এটি মূল কুরআন হওয়ার প্রমাণ বহন করে না; বরং কুরআন তাদের নিকট মুতাওয়াতির সূত্রেই প্রমাণিত ছিল।
ইবনুল জাযারী (৮৩৩হি.) বলেন, إن الاعتماد في نقل القرآن على حفظ القلوب والصدور لا على حفظ المصاحف والكتب، وهذه أشرف خصيصة من الله تعالى لهذه الأمة.... وذلك بخلاف أهل الكتاب الذين لا يحفظونه إلا في الكتب ولا يقرءونه كله إلا نظرا لا عن ظهر قلب হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি লিখিত কিতাব বা মুছহাফের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং হৃদয়ে মুখস্থ ধারণের ওপর নির্ভরশীল। এটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে মর্যাদাবান বৈশিষ্ট্য। ... এটি আহলুল কিতাবদের বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা যারা তাদের কিতাব একমাত্র লিপিবদ্ধ উপায়ে সংরক্ষণ করে এবং কেবল দেখে দেখে পাঠ করে; মুখস্থ পাঠ করে না।
ঝ. যদি প্রাথমিক অবস্থায় কুরআনের প্রচার ও প্রসার সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই সুন্নাহর আনুষ্ঠানিক সংকলন শুরু হ'ত তবে কুরআনের সাথে সুন্নাহসহ মানুষের মতামতও কুরআনের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে যেত। ফলে পুরো ইসলামী শরী'আত দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরী হ'ত। সুতরাং নিঃসন্দেহে প্রথম পর্যায়ে সুন্নাহ লিপিবদ্ধ না হওয়ার পিছনে মহান আল্লাহর বিশেষ কোন হিকমত নিহিত ছিল। ড. হাম্মাম আব্দুর রহীম বলেন, যদি এটা না হ'ত তবে কুরআনের আয়াতের ওপর ব্যাখ্যা ও মতামতের স্তূপ জমে যেত। ফলে কুরআন লিপিবদ্ধকারক এবং পরবর্তীদের জন্য কুরআনের সাথে সুন্নাহ ও ফক্বীহদের রায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা দুষ্কর হয়ে পড়ত। পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থসমূহে এই ঘটনাই ঘটেছিল। ফলে খাঁটি বস্তুর সাথে মানুষের কল্পিত জিনিস, ভুলের সাথে সঠিক, স্বপ্নের সাথে অহী সব মিলেমিশে একাকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মূলবস্তুটিই হারিয়ে যেত এবং সংযোজন-পরিবর্ধনের মাঝে চাপা পড়ে যেত। ফলে অহীর নিজস্বতা এবং সুমহান তাৎপর্য আর অবশিষ্ট থাকত না। যেমনভাবে ইহুদী এবং খৃষ্টানদের নিকট অহী স্রেফ একটি ইতিহাসের বয়ান হয়ে পড়েছে তথা যা কিছু ইতিহাসে ঘটেছে সবই অহীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
টিকাঃ
৫৭. আবু সাঈদ আল-খুদরী বর্ণিত, রাসূল (ছা.) বলেন, لا تكتبوا عني، ومن كتب عني غير القرآن فليمحه، وحدثوا عني ولا حرج، ومن كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار )ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৪)। দ্র. ড. খাদিম ইলাহী বখশ, আল-কুরআনিউন ওয়া শুবহাতুহুম, পৃ. ২২৩-২২৪।
৫৮. ড. মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৬-৭৮; আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ারুল কাশিফাহ, পৃ. ৩৪-৪৩; রিফ'আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফিল কারনিছ ছানী আল-হিজরী, পৃ. ৪৬।
৫৯. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৮; খত্ত্বীব বাগদাদীও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন (তাকুয়ীদুল ইলম, পৃ. ৩১)।
৬০. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৪-৩২৫।
৬১. দ্র. ইবনু কুতায়বা আদ-দীনাওয়ারী, তা'বীলু মুখতালাফিল হাদীছ, পৃ. ৪১২; খতীব আল-বাগদাদী, তাকুয়ীদুল ইলম, পৃ. ৫৭; শামসুদ্দীন আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯; ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৮; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূত্বী, তাদরীবুর রাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৯৫; আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪৪৪; আবূ যাহু, আল-হাদীছু ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১২৩-১২৪)।
৬২. খত্বীব আল-বাগদাদী, তাক্বয়ীদুল ইলম, পৃ. ৩৬-৪৩, ৪৯-৬১, ৮৭-৯৮; মুহুত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৩।
৬৩. মুহিউদ্দীন আন-নববী, আল-মিনহাজ শারহু মুসলিম, ১৮শ খণ্ড, পৃ. ১৩০।
৬৪. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯।
৬৫. রশীদ রিযা, 'আত-তাদভীন ফিল ইসলাম' (মাজাল্লাতুল মানার, কায়রো, ১০ম খণ্ড: শাওয়াল/১৩২৫হি, সংখ্যা), পৃ. ৭৬৭।
৬৬. ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৪।
৬৭. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪২৩-৪২৪।
৬৮. শামসুদ্দীন ইবনুল জাযারী, আন-নাশরু ফিল কিরাআতিল আল-আশরি (মিসর: আল- মাতবা'আহ আত-তিজারিয়াহ আল-কুবরা, তাবি), ১ম খণ্ড, পৃ. ৬।
৬৯. ড. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৪।
৭০. আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯।
৭১. আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯।
৭২. আল-বায়হাক্বী, আল-মাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা (কুয়েত: দারুল খুলাফা, তাবি), পৃ. ৪০৭, হা/৭৩১; ইবনু আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৪; খতীব আল-বাগদাদী, তাকয়ীদুল ইলম, পৃ. ৪৯।
৭৩. খত্বীব আল-বাগদাদী, তাকয়ীদুল ইলম, পৃ. ৫১-৫৩।
৭৪. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০০-৬০১।
৭৫. তদেব।
৭৬. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৩৭৪; আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৫৫৫।
৭৭. আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০২-৬০৩।
৭৮. আব্দুর রহমান আল-মু'আল্লিমী, আল-আনওয়ার আল-কাশিফাহ, পৃ. ১৫৪-১৫৫; মুহত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাত ফীল হাদীছ আন-নববী, ১ম খণ্ড, ১৩৩-১৩৪।
৭৯. আবু যাহু, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছুন, পৃ. ২৩৪।
৮০. তদেব, পৃ. ১২৬।
৮১. ছহীহুল বুখারী, হা/২০৬২, ৬২৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৫৩।
৮২. أما إني لم أتهمك. ولكني خشيت أن يتقول الناس على رسول الله صلى الله عليه وسلم - মুওয়াত্ত্বা মালিক (তাহক্বীক: মুহত্বফা আল-আ'যামী), হা/৩৫৪০। অন্য বর্ণনায় এসেছে - والله إن كنت لأمينا على حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم - আল্লাহর কসম! আমি রাসূল (ছা.)-এর হাদীছের যিম্মাদারী নিয়ে বসতে চাই না, বরং কেবল বর্ণনার যথার্থতা নিশ্চিত হ'তে চেয়েছিলাম।' -ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৩০। অনুরূপ অন্য এক ঘটনায় উবাই ইবনু কা'ব (রা.) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, হে উমার! আপনি রাসূল (ছা.)- এর ছাহাবীদের ওপর আযাব হয়ে দাঁড়াবেন না। তখন উমার (রা.) বলেন, سبحان الله إنما سمعت شيئا فأحببت أن أتثبت 'সুবহানাল্লাহ। আমি তো কেবল যে বিষয়টি শুনেছিলাম, তা পরখ করে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম' (প্রাগুক্ত, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৩০)।
৮৩. খত্বীব আল-বাগদাদী (৪৬৩হি.) বলেন, وفي تشديد عمر أيضا على الصحابة، وفي روايتهم حفظ لحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم، وترهيب لمن لم يكن من الصحابة أن يدخل في السنن ما ليس منها، لأنه إذا رأى الصحابي المقبول القول، المشهور بصحبة النبي صلى الله عليه وسلم، قد تشدد عليه في روايته، كان هو أجدر أن يكون للرواية أهيب، ولما يلقي الشيطان في النفس من تحسين الكذب أرهب খত্বীব আল-বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, পৃ. ৯১।
৮৪. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
৮৫. মুহতুফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফীল হাদীছ আন-নববী, পৃ. ৮০।
৮৬. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪২৩; আস-সিবাঈ, আস-সুন্নাতু ওয়া মাকানাতহা, প. ৫৮-৫৯।
৮৭. দ্র. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪০৭-৪০৯।
৮৮. দ্র. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজ্জিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৪০০-৪০১।
৮৯. ইবনু হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৪।
৯০. তদেব।
৯১. ড. হাম্মام আব্দুল হালীম সাঈদ, আল-ফিকরুল মানহাজী ইনদাল মুহাদ্দিছীন, পৃ. ৪০-৪১।