📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৩ : হাদীছ আল্লাহর অহী নয়

📄 সংশয়-৩ : হাদীছ আল্লাহর অহী নয়


মুনকিরে হাদীছ আব্দুল্লাহ চড়কালভী বলেন, আমরা অহী ব্যতীত অন্য কিছু মানতে আদিষ্ট হইনি। যদি তর্কসাপেক্ষে ধরে নেই যে, কিছু হাদীছ সুনিশ্চিতভাবে রাসূল (ছা.) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে, তবুও তার অনুসরণ করা অপরিহার্য নয়। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত অহী নয়। অনুরূপভাবে গোলাম আহমাদ পারভেয বলেন, 'অহী দুই ভাগে বিভক্ত' এই বিশ্বাস ইহুদীদের নিকট থেকে ধার করা। তারাও একই বিশ্বাস করে যে অহী দুই প্রকার। পঠিত অহী (Shaktab) এবং অপঠিত অহী (Shab-alfa)। এই ধারণার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

পর্যালোচনা:

ক. কুরআনে সূরা আন-নাজমের ৩-৪ আয়াত এবং সূরা আল-হাক্কাহ্র ৪৪-৪৭ আয়াতে স্পষ্টভাবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, রাসূল (ছা.) দ্বীনের বিষয়ে যা কিছু বলেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলেন এবং তা আল্লাহর অহি। এর ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, আল-কুরআন যেমন রাসূল (ছা.)-এর নিকট অহী সূত্রে প্রেরিত হয়েছে, তেমনিভাবে তিনি সুন্নাহ্ও অহী সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছেন। উভয় প্রকার অহির মধ্যে পার্থক্য কেবল এই যে, আল-কুরআন শব্দগতভাবে নাযিল হয়েছে এবং তা ছালাতে তেলাওয়াত করা হয়। সেই সাথে আল্লাহ তা শব্দগতভাবেও কোন প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষণ করেছেন।

কিন্তু হাদীছের ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। তা জিব্রীলের মাধ্যমে সরাসরি শব্দাকারে নাযিল হয়নি, বরং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে অর্থগতভাবে প্রেরিত হয়েছে।

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابِ 'কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, অহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত প্রেরণ ব্যতিরিকে।' অর্থাৎ রাসূল (ছা.) কুরআন ছাড়াও আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ইলহাম সূত্রে প্রাপ্ত অহির মাধ্যমে মানুষের দ্বীনী বিষয়ের সমাধান দিতেন। পবিত্র কুরআনে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন-

(১) সূরা আত-তাহরীমের ৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنْبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর যখন সে (স্ত্রী) অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবীর) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন তখন নবী কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করলেন আর কিছু এড়িয়ে গেলেন। যখন তিনি তাকে বিষয়টি জানাল তখন সে (স্ত্রী) বলল, 'আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?' সে বলল, 'মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন।'

এই আয়াতে স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (ছা.) তাঁর কোন স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেছিলেন, যা তিনি অসুবিধা নেই ভেবে অন্যদের নিকট ফাঁস করে দিয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.)- কে তাঁর স্ত্রীর এই কর্মটি জানিয়ে দিলেন এবং রাসূল (ছা.) স্ত্রীকে বিষয়টি স্বল্পাকারে উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন স্ত্রী বিস্মিত হয়ে এই তথ্যের উৎস রাসূল (ছা.)-এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমাকে জানিয়েছেন আল্লাহ।' এই ঘটনায় রাসূল (ছা.) তাঁর স্ত্রীকে কী বলেছিলেন, আর তাঁর স্ত্রী অন্যদের নিকট কী ফাঁস করেছিলেন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এখন প্রশ্ন হ'ল, এই অনুল্লেখিত বিষয়গুলো কি পরবর্তীতে কুরআন থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, নাকি রাসূল (ছা.)-কে আল্লাহ ভিন্ন প্রকার অহী (গায়র মাতলু)-এর মাধ্যমে জানিয়েছিলেন? যদি বলা হয় কুরআন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেটা অসম্ভব। সুতরাং এটা অপরিহার্য হয়ে যায় যে, রাসূল (ছা.) অপঠিত অহির দ্বারা সংবাদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

(২) সূরা আল-বাক্বারাহ্ ১৪৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا فَوَلٌ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ‘আকাশের দিকে তোমার মুখ বার বার ফিরানো আমি অবশ্যই দেখছি। অতএব আমি অবশ্যই তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফেরাব, যা তুমি পছন্দ কর। সুতরাং তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও..।'

এই আয়াতে মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে পরিবর্তিত হয়ে কা'বা ঘরের দিকে নির্ধারণের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন হ'ল, আয়াতের বর্ণনামতে দ্বিতীয় ক্বিবলা নির্ধারণের পূর্বে প্রথম ক্বিবলা হিসাবে আল্লাহ বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সেই নির্ধারণের কোন দলীল কি কুরআনে রয়েছে? যদি না থাকে, তার অর্থ হ'ল আল্লাহ প্রথম ক্বিবলা সম্পর্কে রাসূল (ছা.)-কে অহী গায়র মাতলু (হাদীছ) দ্বারা অবগত করিয়েছিলেন।

সুতরাং নিঃসন্দেহে হাদীছও আল্লাহর অহী যা ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। আর এ কারণেই ছাহাবীগণ রাসূল (ছা.)-এর সকল আদেশ-নিষেধ শিরোধার্য মনে করে পালন করতেন, যদিও তা কুরআনে না থাকত। তাঁর মৃত্যুর পরও যখনই রাসূল (ছা.)-এর কোন সুন্নাহ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তৎক্ষণাৎ তার প্রতি চুড়ান্ত আনুগত্যের মস্তক অবনত করেছেন, যদিও সে বিষয়ে কুরআনে কোন স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

রশীদ রিযা (১৯৩৫খ্রি.) বলেন, রাসূল (ছা.) হ'তে দ্বীনের ব্যাপারে যে সকল হাদীছ ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যাপকার্থে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত বিধানে মধ্যেই শামিল। কেননা আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর অনুগত্য করা ও তাঁর অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে মানুষের নিকট দ্বীনের বাণী প্রচারক হিসাবে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। যেমন তাঁকে বলা হয়েছে, 'আমরা আপনার নিকট 'যিকর' নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের ব্যাখ্যা করে দেন, যা তাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন, والجمهور على أن الأحكام الشرعية الواردة في السنة موحى بها، وأن الوحي ليس محصورا في القرآن 'জুমহুর বিদ্বানদের মতে সুন্নাতে বর্ণিত শরী'আতের আহকামসমূহ আল্লাহর অহী। আর অহী কেবল কুরআনের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

খ. হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণা- পঠিত এবং অপঠিত অহির ধারণা ইহুদীদের নিকট থেকে ধার করা হয়েছে। এর স্বপক্ষে নিছক কষ্টকল্পনা ব্যতীত কোন প্রকার দলীল তারা দেয়নি। কে কখন কিভাবে এই ধারণা ইহুদীদের নিকট থেকে ইসলামে প্রবেশ করিয়েছে, তারও কোন প্রমাণ দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর কোন মুসলিম, অমুসলিম বিদ্বান বা ঐতিহাসিক এই অভিনব দাবী উত্থাপন করেন নি। সুতরাং তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অপরপক্ষে মুসলিম বিদ্বানগণের বক্তব্য সুস্পষ্ট দলীলভিত্তিক। আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى 'আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। আল্লাহ আরও وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلْمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا 'আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত (সুন্নাহ) এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। ' রাসূলুল্লাহ (ছা.) স্পষ্টভাবে ( أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ ، أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ) يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ কুরআন প্রাপ্ত হয়েছি ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু (হাদীছ)। সাবধান! এমন একটি সময় আসছে যখন বিলাসী মানুষ তার গদিতে বসে বলবে, তোমাদের জন্য এ কুরআনই যথেষ্ট। সেখানে যা হালাল পাবে, তাকেই হালাল জানবে এবং সেখানে যা হারাম পাবে, তাকেই হারাম জানবে। অথচ আল্লাহ্র রাসূল যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ কর্তৃক হারাম করার অনুরূপ। '


টিকাঃ
৩৭. খাদিম ইলাহী বখশ, আল-курআниун ওয়া শুবহাতুহুম, পৃ. ২১৩-২১৪।
৩৮. আল-курতুবী, আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৭শ খণ্ড, পৃ. ৮৫; ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪১১।
৩৯. সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৫১।
৪০. সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৪।
৪১. রশীদ রিযা, তাফসীরুল মানার, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৭৪।
৪২. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৪৩. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৩।
৪৪. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭১৭৪, সুনান আবী দাউদ, হা/৪৬০৪; সনদ ছহীহ।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৪ : আল্লাহ কুরআন সহজ করেছেন

📄 সংশয়-৪ : আল্লাহ কুরআন সহজ করেছেন


তাদের মতে, আল্লাহর বাণী- وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ ‘আমরা কুরআনকে সহজ করেছি উপদেশ লাভের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?’ এই আয়াত থেকে প্রমাণিয়ত হয় যে, কোরআন বোঝার জন্য হাদীছের প্রয়োজন নেই।

পর্যালোচনা:

এখানে কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ হ'ল, এতে বর্ণিত জীবন-বিধান সহজ-সরল ও বাস্তবায়নযোগ্য। যেমন ছালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, ছিয়াম রাখা, হজ্জ করর, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, অন্যায় ও অশ্লীলতা হ'তে দূরে থাকা ইত্যাদি। এগুলি যেকোন সাধারণ কুরআন পাঠক সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু কুরআন অনুধাবনের অর্থ তা নয়। যেমন আল্লাহ কিতাবٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ‘এই কিতাব যা আমরা আপনার নিকট নাযিল করেছি, তা বরকতমণ্ডিত। তা এজন্য নাযিল করেছি যাতে লোকেরা এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে এবং জ্ঞানীরা এ থেকে উপদেশ হাছিল করে।' তিনি জ্ঞানীদের তিরষ্কার করে বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا ‘কেন তারা কুরআন গবেষণা করে না? নাকি তাদের হৃদয়সমূহ তালাবদ্ধ? কুরআন গবেষণা ও তার মর্ম অনুধাবন ও তা থেকে বিধি-বিধান নির্ধারণ ও উপদেশ আহরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের ভাষা ও অলংকার সম্পর্কিত জ্ঞানে পরিপক্কতা অর্জন করা ও অন্যান্য যরূরী বিষয়ে দক্ষতা লাভ করা। বস্তুত, কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যাকারী হ'লেন রাসূলুল্লাহ (ছা.)। অতঃপর ছাহাবায়ে কেরাম, যাদের কাছে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করেছেন ও উপদেশ প্রদান করেছেন, যা লিপিবদ্ধ আছে ‘হাদীছ' ও ‘আছার' আকারে। অতএব কুরআন অনুধাবনের জন্য হাদীছের ব্যাখ্যা জানা অত্যাবশ্যক।

দ্বিতীয়ত, কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ যদি এটাই হয় যে, এর কোন ব্যাখ্যা বা তাফসীরের প্রয়োজন নেই, তবে রাসূল (ছা.)-এর আগমণের হেতু কী ছিল? মানুষের পক্ষে কি নিজেই সবকিছু বুঝে নেওয়া সম্ভব ছিল না? কেন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে কুরআনের ব্যাখ্যাকারী” হিসাবে প্রেরণ করলেন?


টিকাঃ
৪৫. সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ১৭, ২২, ৩২, ৪০।
৪৬. সূরা ছোয়াদ, আয়াত: ২৯।
৪৭. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৫ : আল্লাহর বিধান তথা কুরআনই চূড়ান্ত

📄 সংশয়-৫ : আল্লাহর বিধান তথা কুরআনই চূড়ান্ত


মুনকিরে হাদীছ খাজা আহমাদ দ্বীন বলেন, ‘মানুষ শিরককে জীবিত করার জন্য বহু পথ আবিষ্কার করেছে। তারা বলে যে, আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ হ'লেন মূল সত্তা, যিনি আনুগত্যের হক্বদার। তবে আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ হ'ল মূল সত্তার আনুগত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই ভ্রষ্ট দলীলের মাধ্যমে তারা যাবতীয় প্রকারের শিরকের বৈধতা দিয়ে থাকে। কোন অপরিচিত ব্যক্তি কি কোন বিবাহিত মহিলার স্বামী হয়ে যায়, যদি মহিলার স্বামী তাকে সেই অপরিচিত ব্যক্তির স্ত্রী বলে? সাবধান! আল্লাহ কখনই এমন নির্দেশ দেননি। কেননা আল্লাহর বাণী হ'ল, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। অর্থাৎ তাদের দৃষ্টিতে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্যে শিরক করা।

পর্যালোচনা:

এই আয়াত দ্বারা রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য নাকচ করা হয়নি, কিংবা রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করা শিরকও নয়। স্রেফ অজ্ঞতার কারণে এরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। দলীলসমূহ নিম্নরূপ:

ক. আয়াতটি পবিত্র কুরআনে মোট ৩টি স্থানে এসেছে। প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। যেমন প্রথমে সূরা আল-আন'আমে আয়াতটি বর্ণিত হয়েছে কাফেররা তাঁর নিকট কুরআনের আয়াত নাযিল করার জন্য চাপ প্রয়োগের প্রেক্ষিতে। এই আয়াত নাযিলের মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই দাবী পূরণ করা রাসূল (ছা.)-এর আয়ত্তাধীন নয়, বরং আল্লাহর আয়ত্তাধীন। এ ব্যাপারে আল্লাহ এক এবং একক। পরের দু'টি আয়াত এসেছে সূরা ইউসুফে। প্রথম স্থানে ইউসুফ (আ.) তাঁর জেলখানার সহবন্দী দু'জনকে শিরক পরিত্যাগের উপদেশ দিয়ে আয়াতটি পাঠ করেছিলেন এবং পরবর্তী স্থানে ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদেরকে রাজার দরবারে প্রবেশের আদব- কায়দা শেখানোর সময় তাদের ওপর কোন বিপদের আশংকা থেকে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতাসূচক আয়াতটি পাঠ করেছিলেন। প্রতিটি স্থানে মানুষের অক্ষমতা এবং আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার কথা উদ্ভাসিত হয়েছে, যার কোন শরীক নেই। কিন্তু এসকল আয়াতে সুন্নাহ অনুসরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাসূচক কিছু নেই। এতে শিরকের প্রসঙ্গ তো নেই-ই, বরং তাওহীদই প্রকাশিত হয়। কেননা আল্লাহ নিজেই তাঁর রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাঁর নির্দেশকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারোও নেই। আল্লাহ বলেন, এ وَهُوَ أَسْرَعُ الْحَاسِبِينَ الْحُكْمُ 'সাবধান! হুকুম প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুতরাং এই নির্দেশ মান্য করাই তাওহীদ এবং অমান্য করাই শিরক। কেননা এতে রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণের এলাহী নির্দেশকে উপেক্ষা করে শরী'আত প্রণয়ন ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব আল্লাহ্র রাসূল ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, যার অধিকার আল্লাহ কাউকে দেননি। সুতরাং আল্লাহর ব্যাপারে এই অনধিকার চর্চাই বরং শিরক হিসাবে পরিগণিত হবে। খ. রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ যদি শিরক হয়, তবে প্রশ্ন আসে যে, রাসূল (ছা.) তবে কিসের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন? তিনি কি শিরক প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন? তাঁর সুন্নাহসমূহ কি আল্লাহ্ বিধান প্রতিষ্ঠারই নিমিত্ত নয়? আল্লাহ বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا 'রবের কসম তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে বিচারক নির্ধারণ করে, আর আপনি যে ফায়ছালা দেবেন, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনরূপ দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। এই আয়াতে আল্লাহ নিজের কসম খাওয়ার পর রাসূল (ছা.)-এর ফয়ছালা অনুসরণের যে হুকুম প্রদান করলেন, তা কি শিরকের প্রতি আহ্বান? অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহই কি শিরকের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন? যদি তা অসম্ভব হয়, তবে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের মাঝেই বরং তাওহীদের দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়। কেননা এই আনুগত্য সরাসরি আল্লাহরই হুকুম। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে এই আনুগত্যের নির্দেশ এসেছে যা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে দেখেছি। সুতরাং নিঃসন্দেহে রাসূল (ছা.)-এর সুন্নাহর আনুগত্য করা অপরিহার্য এবং তা প্রকৃতপক্ষে তাওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ।


টিকাঃ
৪৮. সূরা নাহল, আয়াত: ৪৪।
৪৯. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৭; সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০, ৬৭।
৫০. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৬২।
৫১. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৬ : রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন

📄 সংশয়-৬ : রাসূল (ছা.) কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন


মুনকিরে হাদীছদের দাবী, রাসূল (ছা.) আল্লাহ্ পক্ষ থেকে কেবল কুরআনের প্রচারক ছিলেন। তিনি কোন বিধান প্রবর্তক ছিলেন না। তিনিও অন্যান্য মানুষের মত কুরআন অনুসরণের জন্য আদ্দিষ্ট ছিলেন। এর প্রমাণে অন্যান্য আয়াতের সাথে রাসূল (ছা.) বর্ণিত কিছু হাদীছও দলীল হিসাবে পেশ করা হয়। যেমন রাসূল (ছা.) ছহীহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদীছে মন্তব্য করেন, وَقَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابُ اللهِ 'আমি তোমাদের নিকট ছেড়ে যাচ্ছি এমন একটি বস্তু যা ধারণ করলে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। আর সেটি হ'ল আল্লাহ্ কিতাব। এছাড়া রাসূল (ছা.) তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় বললেন, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় লিখে দিতে চাই, যার পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না।' অতঃপর উমার (রা.) উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, রাসূল (ছা.) এখন তীব্র যন্ত্রণায় আক্রান্ত। তোমাদের নিকট কুরআন রয়েছে। আমাদের জন্য আল্লাহ্ কিতাবই যথেষ্ট। (وَعِنْدَكُمْ الْقُرْآنُ حَسْبُنَا كِتَابُ اللهِ) সুতরাং এসব থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ কুরআনের ভিত্তিতেই প্রযোজ্য। তিনি কুরআন প্রচারের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন, হাদীছ নয়।

পর্যালোচনা: ক. রাসূল (ছা.)-কে কেবল কুরআন প্রচারক হিসাবে আল্লাহ প্রেরণ করেননি; বরং মানবজাতির জন্য শিক্ষক হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সমাজের বুকে কুরআনের শিক্ষাসমূহ সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন, যা হাদীছ হিসাবে সংরক্ষিত হয়ে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। আল্লাহ বলেন, لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ 'উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াত সমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল (ছা.) কেবল কুরআন তেলাওয়াতকারী ছিলেন না, বরং মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে তিনি তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষাও প্রদান করেছেন। কেননা যদি শুধুমাত্র কুরআন পড়ে শুনানোই রাসূল (ছা.)-এর দায়িত্ব হ'ত তাহ'লে عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ ۦيَتْلُو বলাই যথেষ্ট হ'ত, পুনরায় وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ বলার প্রয়োজন ছিল না।

খ. আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ "আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। এই আয়াতে (النطق) বা কথা বলার অর্থ কুরআন তিলাওয়াত নয়, বরং নবীর নিজের মুখের ভাষা। আর দ্বীন সংক্রান্ত তাঁর যে কোন কথাই হাদীছ। এ বিষয়ে কুরআনে অসংখ্য প্রমাণ মওজুদ রয়েছে।

গ. উপস্থাপিত হাদীছসমূহে কুরআনকে উল্লেখ করা হয়েছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে (عَلَى وَجْهِ التَغْلِيْبِ), যেহেতু কুরআন শরী'আতের প্রধানতম উৎস। ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী (৮৫২হি.) বলেন, রাসূল (ছা.) তাঁর এই বক্তব্যে কেবল কুরআনকে উল্লেখ করেছেন এই জন্য যে, কুরআন হ'ল সর্বপ্রধান, বাকীগুলো তার অনুগামী। আর তাতে সকল কিছুর বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে, হয় সরাসরি নছের মাধ্যমে কিংবা ইস্তিম্বাত (অন্যান্য দলীলের ভিত্তিতে বিধি-বিধান নির্ণয় করা)-এর মাধ্যমে। মানুষ যখন কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে রাসূল (ছা.)-এর নির্দেশসমূহও অনুসরণ করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا "রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।

ঘ. কুরআনের অন্যান্য বহু আয়াতে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের নির্দেশ স্পষ্টতই সাক্ষ্য দেয় যে, এই আনুগত্য কেবল কুরআনের পাঠকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য নয়, বরং শরীআ'তের ব্যাখ্যাদানকারী হিসাবে তাঁর আনুগত্য। নতুবা তাঁর আনুগত্যের বিশেষ কোন মূল্য থাকত না এবং প্রকারান্তরে তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ অর্থহীন হয়ে যেত। কেননা এর ফলে কুরআনের পাঠককারী হিসাবে তিনি এবং সাধারণ পাঠকের মাঝে কোনই পার্থক্য থাকত না। যা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। অতএব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত মানবজাতির শিক্ষক হিসাবে রাসূল (ছা.)-এর শিক্ষা বা সুন্নাহ্ও কুরআনের মতই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্যভাবে অনুসরণীয়।


টিকাঃ
৫২. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮।
৫৩. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩৭।
৫৪. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪।
৫৫. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৫৬. সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৬১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00