📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-১ : কুরআনই সকল বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যাারী

📄 সংশয়-১ : কুরআনই সকল বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যাারী


হাদীছ অস্বীকারকারীগণ দলীল পেশ করেন যে, (১) আল্লাহ বলেছেন, مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ‘আমরা কিতাবে কোন কিছু ছাড়িনি।” (২) অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ ‘আর আমরা আপনার উপরে কুরআন নাযিল করেছি (মানুষের প্রয়োজনীয়) সকল বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হিসাবে।” অর্থাৎ কুরআনে দ্বীনের প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি হুকুম-আহকাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অতএব কুরআন যেহেতু পরিপূর্ণ, সেহেতু সুন্নাহর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যাদানেরও কোন অবকাশ নেই। নতুবা কুরআনের আয়াত মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে, যা অসম্ভব। তারা এ প্রসঙ্গে আরও কিছু আয়াত উল্লেখ করে থাকেন। যেমন (৩) আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। অন্যত্র (৪) أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلا '(আপনি বলে দিন) তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ফায়ছালাদানকারী হিসাবে কামনা করব? অথচ তিনি তোমাদের প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন (আক্বীদা ও বিধানগত বিষয়ে) বিস্তারিত বর্ণনাসহ।'

পর্যালোচনা: উপরোক্ত আয়াতগুলি হাদীছ অস্বীকারের পক্ষে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই দলীল বহন করে না। বরং আয়াতগুলির মর্মার্থ অনুধাবনে তারা ভুল করেছেন, যা আমরা ৩টি দিক থেকে তুলে ধরব। যেমন:

(এক) অর্থগত ভুল: ক. প্রথম আয়াতে কিতাব শব্দের অর্থ কুরআন নয়, বরং লওহে মাহফুষ। যেখানে আল্লাহ মানবজাতিসহ সৃষ্টিজগতের সমস্ত ছোট-বড় বিষয়াদি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, কোন কিছুই ছাড়েননি বা লিখতে ভুলেননি।' এখানে এই অর্থ গ্রহণের দলীল হ'ল ঐ আয়াতের পূর্বাপর অংশসমূহ। পূর্ণ আয়াতটি হ'ল, مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ مَا فَرَّطْنَا فِي الكِتابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ এবং দু'ডানায় ভর করে আকাশে সন্তরণশীল সকল প্রাণী তোমাদেরই মত একেকটি সম্প্রদায়। কোন কিছুই আমরা এই কিতাবে বলতে ছাড়িনি। অতঃপর তাদের সকলকে তাদের প্রতিপালকের কাছে সমবেত করা হবে'। জগদ্বিখ্যাত মুফাস্স্সির হাফেয ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন, এর অর্থ হ'ল, সকল বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত। সে প্রাণী ভূমিতে বিচরণকারী হোক বা পানিতে বিচরণকারী, আল্লাহ তাদের কারও রিযিক প্রদান কিংবা তাদের প্রতিপালন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে ভোলেন না। সুতরাং এই আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, 'কিতাব' শব্দটি দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়নি। দ্বিতীয়ত, আরবী ভাষায় কিতাব শব্দটি যেমন কুরআন অর্থে আসে, তেমনি অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন, নির্দিষ্টতা, হুকুম, নির্ধারিত মেয়াদ ইত্যাদি। যেমন কুরআনে এসেছে, আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلًا 'আর কোন প্রাণী আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মৃত্যুবরণ করতে পারে না, সেজন্য একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে।” এখানে 'কিতাব' শব্দটি দ্বারা নির্ধারিত মেয়াদ বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে অপর আয়াতে إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত।” এখানে কিতাব শব্দ দ্বারা নির্দিষ্ট সময় বুঝানো হয়েছে। সুতরাং কিতাব শব্দটি এখানে কুরআন অর্থে নয়, বরং লওহে মাহফ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

খ. দ্বিতীয় আয়াতটিতে لِكُلِّ شَيْء আয়াতাংশ দ্বারা আমভাবে 'সমস্ত কিছু' উদ্দেশ্য করা হয়নি, বরং এটি কুরআনের একটি বাচনভঙ্গি, যার দ্বারা প্রয়োজনীয় সব মৌলিক বিষয় কিংবা অধিকাংশ বিষয় বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجِّ عَمِيقٍ 'আর তুমি মানুষের মাঝে হজ্জের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সকল প্রকার (পথশ্রান্ত) কৃশকায় উটের উপর সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্তের সকল অঞ্চল হ'তে।” এই আয়াতে کُلّ (সকল) শব্দ দ্বারা এই অর্থ নেয়া যরূরী নয় যে, পৃথিবীর সকল উট মক্কায় আসবে, কিংবা পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ মক্কায় উপস্থিত হবে। বরং যারা সেখানে উপস্থিত হবে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে।

অনুরূপই একটি আয়াত, আল্লাহ বলেন, أَوَلَمْ تُمَكِّنْ لَهُمْ حَرَمًا آمِنًا يُجْبَى إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِزْقًا مِنْ لَدُنَّا ‘আমি কি তাদের জন্য এক নিরাপদ ‘হারাম’ -এ বসবাস করাইনি? সেখানে সব ধরনের ফলমূল আমদানী করা হয়, আমার পক্ষ থেকে রিযিকস্বরূপ?” এই আয়াতে کُلّ শব্দটি দ্বারা এই অর্থ গ্রহণ করা যরূরী নয় যে, পৃথিবীর সকল প্রকার ফলমূল মক্কায় পাওয়া যাবে। সুতরাং এ সকল আয়াতের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হ'ল যে, কুরআনে সকল কিছুর বিবরণ রয়েছে তার অর্থ হ'ল মানুষের ধর্মীয় জীবনের মৌলিক ও বুনিয়াদী সকল কিছু বর্ণিত হয়েছে। এতে সকল খুঁটিনাটি বিধান পুংখানুপুংখভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া যরূরী নয়। সুতরাং কুরআনে বুনিয়াদী বিষয়াদি বর্ণিত হয়েছে আর অন্যান্য বিষয়াদি বিস্তারিতভাবে সুন্নাতে সংরক্ষিত রয়েছে।

(দুই) ব্যাখ্যাগত ভুল:

ক. প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা যদি লওহে মাহফুয না করা হয়, তবে কুরআনের আয়াতটি ভুল প্রমাণিত হবে। কেননা কুরআনে দুনিয়ার সকল বিষয়বস্তু উল্লেখিত হয়নি; বরং কেবল ইসলামের বুনিয়াদী বিষয়গুলিই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনকি ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি মুসলমানের মৌলিক ফরয বিষয়ের বিস্তারিত নিয়মাবলীও কুরআনে উল্লেখিত হয়নি, বরং হাদীছে এসেছে। দ্বিতীয়ত, আয়াতটি মক্কায় নাযিল হয়েছে। আর ইসলামের অধিকাংশ বিধান নাযিল হয়েছে মদীনাতে। এখানে কিতাব অর্থ কুরআন ধরে নিলে মদীনায় অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতসমূহ ব্যতীতই মক্কায় অবতীর্ণ কুরআনে সব কিছু রয়েছে প্রতীয়মান হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মদীনায় অবতীর্ণ আয়াতসমূহও তাদের নিকটে হাদীছের মত অপাঙক্তেয় গণ্য হওয়ার কথা, যা নিঃসন্দেহে তাদের দৃষ্টিতেও অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা কুরআন উদ্দেশ্য নয়, বরং লওহে মাহফ্য উদ্দেশ্য।

তৃতীয়ত, যদি কিতাবের অর্থ কুরআনই ধরে নেয়া হয়, তবে আয়াতের সাধারণ অর্থটি অপর আয়াত দ্বারা নির্দিষ্ট করতে হবে, যেখানে বলা হয়েছে, وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ 'আমরা তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি কেবল এজন্য যে, তুমি তাদেরকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দিবে যেসব বিষয়ে তারা মতভেদ করে।' অর্থাৎ রাসূল (ছা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ সকল দ্বীনী বিষয়াদির বর্ণনা সম্পন্ন করেছেন। কেননা কুরআনে বহু আয়াতে রাসূল (ছা.)-কে কুরআনের ব্যাখ্যাকার হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে কুরআনের বাইরেও অনেক খুঁটিনাটি বিষয় মুসলিম উম্মাহকে জানিয়েছেন। বস্তুত সকল নবীকেই আল্লাহ এই বর্ণনা ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولِ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُنِ لَهُمْ 'আমরা স্বজাতির ভাষাভাষী ব্যতীত কোন রাসূলকে পাঠাইনি, যাতে তারা তাদের কাছে (আমার দ্বীন) ব্যাখ্যা করে দিতে পারে।" সুতরাং তাঁদের প্রদত্ত সংবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁদের আদেশ-নিষেধ শ্রবণ করা মানুষের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।

খ. দ্বিতীয় আয়াতের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হ'ল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ২৩ বছরের দীর্ঘ নবুঅতী জীবনের কথা, কর্ম ও সম্মতিসমূহ, যা 'হাদীছ' হিসাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ নিজেই কুরআনে অসংখ্যবার তাঁর রাসূল (ছা.)-এর আদেশ ও নিষেধের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا করেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত হও। এখানে 'প্রদান করেন' অর্থ 'আদেশ করেন।' একদা আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হাদীছ বর্ণনা করেন, لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوتَشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ আল্লাহ লা'নত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকন করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকন করায়, যারা সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য ভ্রুর চুল উপড়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। যে সব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে।' একথা বনূ আসাদের জনৈকা মহিলা উম্মে ইয়াকুবের নিকট পৌঁছলে তিনি ইবনু মাসউদের নিকটে এসে বললেন, আপনি কি এরূপ কথা বলেছেন? ইবনু মাসউদ বললেন, আমি কেন তাকে লা'নত করব না, যাকে আল্লাহর রাসূল (ছা.) লা'নত করেছেন এবং যা আল্লাহর কিতাবে রয়েছে? তখন মহিলাটি বলল, আমার কাছে রক্ষিত কুরআনের কোথাও একথা পাইনি। জবাবে ইবনু মাসউদ বললেন, যদি তুমি কুরআন ভালভাবে পড়, তাহ'লে পাবে। তুমি কি দেখনি আল্লাহ বলেছেন, ...... آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ 'রাসূল তোমাদের যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ কর....... (আল-হাশর ৫৯/৭)। তখন মহিলাটি বলল, হ্যাঁ। ইবনু মাসউদ বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে উক্ত কাজে নিষেধ করেছেন'। তখন মহিলাটি বলল, আমার ধারণা আপনার পরিবারে এরূপ আছে। ইবনু মাসউদ বললেন, যাও দেখে আসো। মহিলাটি ভিতরে গিয়ে তেমন কিছু না পেয়ে ফিরে আসে। এল। তখন ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, যদি এরূপ থাকত, তাহ'লে তুমি আমাদের দু'জনকে (স্বামী-স্ত্রীকে) একত্রে পেতে না (অর্থাৎ তালাক হয়ে যেত)।

সুতরাং কুরআন সবকিছুর বিবরণ হওয়ার অর্থ হাদীছ অপ্রয়োজনীয় হওয়া নয়। কেননা শরী'আতের বিস্তারিত বিবরণ রাসূল (ছা.)-এর আদেশ ও নিষেধ আকারে হাদীছেই এসেছে।” আর রাসূল (ছা.)-এর আদেশ-নিষেধাবলী মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকেই নাযিলকৃত, যা অপর আয়াতে আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন-

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى

কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। সুতরাং সুন্নাহর মাধ্যমেই কুরআন تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ 'সকল বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা' হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কুরআন কখনও প্রত্যক্ষ نص তথা আয়াত নাযিলের মাধ্যমে এবং কখনও পরোক্ষ دلالة বা হাদীছের মাধ্যমে দ্বীনের সকল বিষয়ের বিবরণ দিয়েছে। যেমন ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

والبيان اسم جامع لمعاني مجتمعة الأصول، متشعبة الفروع

এমন সকল অর্থ একত্রিত করে, যা মূলনীতিগত দিক থেকে এক, তবে শাখা-শাখাগতভাবে বহুবিধ।' তিনি বলেন, আল্লাহ এই বিবরণ দিয়েছেন কয়েকভাবে- (১) যা আল্লাহ নছ নাযিল করার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। যেমন মানুষের জন্য ফরয করেছেন ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ প্রভৃতি, আবার হারাম করেছেন গোপন ও প্রকাশ্য পাপাচার, যিনা, মদ, মৃত ভক্ষণ, শূকরের গোশত ভক্ষণ প্রভৃতি বিষয়। (২) যা ফরয হওয়ার ব্যাপারে তাঁর কিতাবে নাযিল করেছেন, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন তাঁর রাসূল (ছা.)-এর মাধ্যমে। যেমন ছালাতের সংখ্যা, যাকাত আদায়ের সময় প্রভৃতি বিষয়। (৩) যা রাসূল (ছা.) বিধান হিসাবে চালু করেছেন, কিন্তু আল্লাহ সে ব্যাপারে কোন নছ নাযিল করেননি। আল্লাহ যেহেতু তাঁর কিতাবে রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য ফরয করেছেন এবং তাঁর হুকুম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, অতএব রাসূল (ছা.)-এর নিকট থেকে কোন বিধান গ্রহণ করা অর্থ তা স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেকই গ্রহণ করা।"

(তিন) যুক্তিগত ভুল: ক. যদি কুরআনই সমস্ত কিছুর বিস্তারিত বিবরণ হয় এবং কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন না হয়, তবে কুরআনের মর্মার্থ অনুধাবনের উপায় কী? নিঃসন্দেহে অভিধানে বর্ণিত শব্দার্থ দ্বারা কুরআন বুঝতে হবে। এখন প্রশ্ন আসে যে, সঠিক শব্দার্থটি জানার জন্য কোন অভিধানটি নির্ভরযোগ্য? কেননা অভিধান ভেদে শব্দার্থেও কখনও ভিন্নতা এসে থাকে। আবার কুরআনে একই শব্দ অনেক সময় বিভিন্ন অর্থ দেয়। সেক্ষেত্রে কিসের ভিত্তিতে সঠিক শব্দার্থটি নির্বাচন করতে হবে? কেউ কি এমন নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, শব্দার্থ দিয়ে কুরআন বুঝতে গিয়ে কেউ কুরআনের মর্মার্থই বিকৃত করে ফেলবে না? শুধু তাই নয়, অনারবদের জন্য কুরআন বুঝতে আরবী ভাষার ব্যাকরণ ও অলংকারশাস্ত্র জানা আবশ্যক। সুতরাং কুরআন বোঝার জন্য যদি অভিধান থেকে শব্দার্থ জানা এবং আরবী ব্যাকরণ জানা আবশ্যক হয়, তবে রাসূল (ছা.)-এর গৃহীত নীতি তথা সুন্নাহ সম্পর্কে জানা কি অধিকতর আবশ্যক নয়? কেননা কুরআনের বহু শব্দ আভিধানিক অর্থের পরিবর্তে রূপক অর্থ ধারণ করে। যেমন কুরআনের

الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ

'যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানের সাথে যুলুম (শিরক)-কে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে (জাহান্নাম থেকে) নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়াত প্রাপ্ত।' এ আয়াতে 'যুলুম' শব্দটির অর্থ কী? যদি শব্দার্থ অনুযায়ী 'অত্যাচার' অর্থ করা হয়, তবে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াবে যে, কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত নিজের ওপর কিংবা অন্যের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার করা মাত্রই তার ঈমান কলুষিত হয়ে যাবে এবং সে ঈমানহারা হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবতায় তা নয়। বরং আয়াতে 'যুলুম'-এর অর্থ শিরক, যা রাসূল (ছা.) তাঁর হাদীছের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সুতরাং সুন্নাহ ব্যতীত শুধু অভিধানের সাহায্যে কুরআন বোঝার চিন্তা একেবারেই অবান্তর ও অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনেই সকল কিছুর বিবরণ দিতে পারতেন, কিন্তু তাঁর অভিপ্রায় ভিন্ন। যেমন ছালাত হ'ল ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কুরআনের অন্তত ৭৩টি জায়গায় ছালাত আদায়ের জন্য নির্দেশ এসেছে। কিন্তু এত অধিকবার ছালাত আদায়ের নির্দেশ প্রদান করা সত্ত্বেও সমগ্র কুরআনে কোথাও ছালাত আদায়ের পূর্ণাঙ্গ নিয়মাবলী উল্লেখ করা হয়নি। যেমন রুকু, সিজদা, কিয়ামসহ প্রতিটি ছালাতের সময় এবং সংখ্যা কোন কিছুরই বিবরণ কুরআনে নেই। অনুরূপভাবে ইসলামের অন্যান্য মৌলিক ইবাদত যাকাত, ছিয়াম ও হজ্জ্ব সম্পর্কেও কুরআনে বিস্তারিত বিবরণ নেই। একমাত্র হাদীছ বা সুন্নাহ থেকেই এ সকল ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ নিয়মাবলী জানা যায়। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ কুরআনে দ্বীনের মৌলিক নীতিমালা উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে এর বিস্তারিত বিবরণের দায়িত্ব দিয়েছেন রাসূল (ছাঃ)-কে। সুতরাং হাদীছের মাধ্যমেই কুরআন সমস্ত কিছুর বিস্তারিত বিবরণ হয়েছে।

খ. যারা হাদীছকে শরী'আতের অংশ মনে করতে দ্বিধান্বিত হন এই যুক্তিতে যে, তাতে দ্বীনের মধ্যে বহিরাগত জিনিসের অনুপ্রবেশ ঘটবে, তাদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে ড. মুছত্বফা আ'যামী চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তির উদাহরণ হ'ল এমন ব্যক্তি, যাকে এমন একটি সুসজ্জিত প্রাসাদ দেয়া হ'ল, যার মধ্যে প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। অতঃপর সে প্রাসাদটিতে কোন আলোর ব্যবস্থা রাখল না। তার ধারণামতে প্রাসাদটি নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। সুতরাং এতে বাইরের কোন বস্তু প্রবেশ করানো যাবে না। নতুবা তা পরমুখাপেক্ষী হয়ে যাবে। কেননা বৈদ্যুতিক তারগুলি বাইরের কোন জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। সুতরাং সে রাতের অন্ধকারকেই আলো ধরে নিচ্ছে, যেহেতু সে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাসাদ দেখতে চায়।

মোটকথা নিঃসন্দেহে কুরআন تبیان এবং مفصل হিসাবে মানবজাতির জন্য মৌলিক সবকিছুই বর্ণনা করেছে; কিন্তু আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য কেবল কুরআন প্রেরণ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং মানুষের নিকট কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর রাসূল (ছা.)-এর মাধ্যমে প্রেরিত কুরআনের শিক্ষাসমূহ বাস্তবায়ন পদ্ধতির নামই হ'ল সুন্নাহ। সুতরাং সুন্নাহকে নিষ্প্রয়োজন মনে করার অর্থ রাসূল (ছা.)-এর আগমনকে অর্থহীন সাব্যস্ত করা এবং তাঁর রিসালাতের উদ্দেশ্য ও মর্যাদাকে অস্বীকার করা। আর এতে রাসূল (ছা.)-কে মান্য করার কুরআনী নির্দেশকে অমান্য করা হয়, যা স্বয়ং কুরআনই অমান্য করার শামিল।


টিকাঃ
২. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৩৮।
৩. সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮৯। এই আয়াতটি প্রাথমিক যুগের জনৈক হাদীছ অস্বীকারকারী ইমাম শাফেঈকে হাদীছ বর্জনের দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেছিল। বর্তমান যুগে ড. তাওফীক ছিদকী, আবু রাইয়াহ, মুহাম্মাদ নাজীব, মুস্তফা কামাল মাহদূভী, আহমাদ ছুবহী মানছুর, কাসিম আহমাদ, জামাল আল-বান্না, রাশাদ খলীফা প্রমুখ হাদীছ অস্বীকারকারীগণ সকলেই আয়াতটি তাদের পক্ষে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। দ্র. মুছত্বফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফীল হাদীছ আন-নাবাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১; ড. ঈমাদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯০-১৯১।
৪. সূরা আল-মায়িদা ৫/৩।
৫. সূরা আল-আন'আম ৬/১১৪।
৬. ড. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজ্জিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৩৮৪।
৭. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৩৮।
৮. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২২৬।
৯. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৫।
১০. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩।
১১. সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ২৭।
১২. সূরা আল-কাছাছ, আয়াত: ৫৭।
১৩. সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬৪।
১৪. সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪।
১৫. সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭।
১৬. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৯৭।
১৭. ছহীহুল বুখারী, হা/৪৮৮৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫।
১৮. দ্র. আশ-শাত্বিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮০।
১৯. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
২০. আশ-শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ২১-২২।
২১. সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৮২।
২২. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৩৬০, ৩৪২৮ প্রভৃতি; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৪।
২৩. মুছত্মফা আল-আ'যামী, দিরাসাতুন ফিল হাদীছ আন-নাবাবী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৬।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-২ : আল্লাহ কেবল কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন, হাদীছের নয়

📄 সংশয়-২ : আল্লাহ কেবল কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন, হাদীছের নয়


তাঁদের দলীল হ'ল, আল্লাহর বাণী- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 'আমরা যিক্র নাযিল করেছি এবং আমরাই এর হেফাযতকারী। এই আয়াতে 'যিক্র' শব্দের অর্থ হ'ল কুরআন। অর্থাৎ আল্লাহ কেবল কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, অন্য কিছু নয়। আয়াতে ' সর্বনামটি একবচন নির্দেশক, যা কেবল কুরআনের প্রতিই ইঙ্গিত করে, হাদীছের প্রতি নয়। ডা. তাওফীক ছিদকী, ইসমাঈল মানছুর, জামাল বান্না এবং উপমহাদেশের হাদীছ অস্বীকারকারীগণ প্রমুখ এই দলীল পেশ করেছেন।

পর্যালোচনা:

এখানে 'যিক্র' অর্থ শুধু 'কুরআন' নয়, বরং এর মধ্যে হাদীছও শামিল। কেননা পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শরী'আতের হেফাযতকারী হ'লেন আল্লাহ। আর হাদীছ ইসলামী শরী'আতের অপরিহার্য অংশ। সুতরাং হাদীছও আবশ্যিকভাবে 'যিকর'-এর অন্তর্ভুক্ত। দলীলসমূহ নিম্নরূপ:

ক. 'যিক্র' শব্দটি দ্বারা কেবল কুরআন উদ্দেশ্য নয়, বরং হাদীছও এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা 'যিকর' দ্বারা আল্লাহর প্রেরিত দ্বীন উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ বলেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ 'সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জেনে থাক। এই আয়াতে 'আহলুয যিক্র' বলতে 'আহলুল ইলম' বা দ্বীন বা শরী'আত বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

ইবনু হাযম (৪৫৬হি.) বলেন الذكر اسم واقع على كل ما أنزل الله على نبيه صلى الله عليه وسلم من قرآن أو من سنة وحي يبين بها القرآن 'যিকির বলতে কুরআন ও সুন্নাহ আকারে আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর যা কিছু নাযিল করেছেন, সবকিছুকেই বুঝায়। সুন্নাহর আকারে প্রেরিত অহী দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।' অতঃপর তিনি সূরা নাহলের ৪৪ নং আয়াতটি উল্লেখ করেন, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ 'আমরা আপনার নিকট 'যিকর' নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের ব্যাখ্যা করে দেন, যা তাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে।' তিনি বলেন, 'আয়াতটি দ্বারা রাসূল (ছা.) মানুষের নিকট কুরআনের ব্যাখ্যা করার জন্য আদিষ্ট হয়েছেন। কুরআনে অনেক 'মুজমাল' বা সংক্ষিপ্ত বিষয় রয়েছে যেমন ছালাত, যাকাত, হজ্জ প্রভৃতি। যেসব বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব শব্দে আমাদেরকে জানান নি; কিন্তু রাসূল (ছা.)-এর বিবরণে তা এসেছে। সুতরাং ঐ সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলিতে যদি রাসূল (ছা.)-এর বিবরণ সংরক্ষিত না থাকে এবং তা বহিরাগত বস্তুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত থাকার নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত না হয়, তবে কুরআনের মূল নির্দেশ (নস) দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ অকার্যকর হয়ে যায়। এতে আমাদের ওপর ফরযকৃত শরী'আতের অধিকাংশ বিধান বাতিল পরিগণিত হবে।'

তিনি বলেন, 'দ্বীনের ব্যাপারে রাসূল (ছা.)-এর প্রতিটি কথাই আল্লাহর প্রেরিত অহী। অভিধানবিদ ও শরী'আত বিশেষজ্ঞদের নিকট এ বিষয়ে কোন প্রকার মতভেদ বা সংশয় নেই যে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু অহী হিসাবে নাযিল হয়েছে তা-ই হ'ল 'যিকরে মুনাযযাল' বা 'প্রেরিত উপদেশবাণী'। সুতরাং সকল প্রকার অহীই সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ্র সংরক্ষণে সংরক্ষিত। আর আল্লাহ যার সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন তা কখনো বিনষ্ট হবার নয় এবং তাতে কোন প্রকার বিকৃতি ঘটার কোনই সম্ভাবনা নেই।' তিনি আরও বলেন, 'রাসূল (ছা.) দ্বীনের ব্যাপারে কোন কথা বলবেন আর তা হারিয়ে যাবে তা যেমন হ'তে পারে না, আবার তাতে কোন বহিরাগত বস্তু সংমিশ্রিত হবে, অথচ কেউ তা পৃথক করতে পারবে না, এরও কোন সুযোগ নেই। কেননা যদি এমন সুযোগ থাকত তবে 'যিকির' অসংরক্ষিত হয়ে পড়ত এবং তা হেফাযতের জন্য আল্লাহ্র দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও মিথ্যা প্রতীয়মান হ'ত।'

ইবনুল কাইয়িম (৭৫২হি.)-ও সূরা নাহলের ৪৪ নং আয়াতটির فعلم أن كلام رسول الله صلى الله عليه وسلم في الدين كله 19 ব্যাখ‍্যা বলেন, 547 وحي من عند الله، وكل وحي من عند الله فهو ذكر أنزله الله বোঝা গেল যে দ্বীনের ব্যাপারে রাসূল (ছা.)-এর সকল বক্তব্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অহি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সকল অহিই হ'ল আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত 'যিকর'।

খ. আল্লাহ বলেন, إِنْ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ - فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ - ثُمَّ إِنْ عَلَيْنَا بَيَانَهُ 'আপনি 'অহী' আয়ত্ব করার জন্য দ্রুত জিহ্বা সঞ্চালন করবেন না'। 'নিশ্চয়ই তা সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমাদের'। 'অতএব যখন আমরা (জিব্রীলের মাধ্যমে) তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন'। 'অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমাদেরই। এখানে 'বিশদ ব্যাখ্যা' অর্থ সম্পর্কে ইবনু কাছীর (৭৭৪হি.) বলেন, أي بعد حفظه وتلاوته Reformi نبينه لك ونوضحه ونلهمك معناه على ما أردنا وشرعنا সম্পন্নের পর আমরা কুরআনের অর্থ বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করব এবং অহী বা ইলহামের মাধ্যমে আমরা এর উদ্দেশ্য ও শারঈ বিধান জানিয়ে দেব। সুতরাং 'বিশদ ব্যাখ্যা' হ'ল 'হাদীছ', যা অহী ও ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রদান করেছেন। অতএব কুরআন ও হাদীছ দু'টিরই হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ্।

গ. আয়াতে ১ শব্দের সর্বনামটি 'সীমাবদ্ধতা' )حصر(-এর অর্থ দেওয়ার জন্য আসেনি, অর্থাৎ এর দ্বারা এককভাবে কেবল কুরআনকেই উদ্দেশ্য করা হয়নি। বরং এর ব্যাখ্যায় আব্দুল গনী আব্দুল খালিক (১৯৮৩খ্রি.) বলেন, আল্লাহ কুরআন ছাড়াও অনেক কিছুই সংরক্ষণ করেছেন। যেমন আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.)-কে যাবতীয় ষড়যন্ত্র এবং হত্যা প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি আরশ, আসমান-যমীন সংরক্ষণ করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত। সুতরাং সর্বনামটি সীমাবদ্ধতার অর্থ দেয় না এবং ব্যাকরণগতভাবে সর্বনামটির تقديم وتأخير হওয়ার উদ্দেশ্যও সীমাবদ্ধ অর্থ প্রদান করা নয়, বরং আয়াতের বিন্যাস অক্ষুণ্ণ রাখা। তিনি আরও বলেন যে, যদি সর্বনামটি দ্বারা সীমাবদ্ধতার অর্থও গ্রহণ করা হ'ত, তবুও সেই কারণে আয়াতের ব্যাপকার্থ থেকে সুন্নাহ বাদ পড়ত না। কেননা কুরআনের সংরক্ষণ সুন্নাহ্র সংরক্ষণের ওপর নির্ভরশীল এবং সুন্নাহর সংরক্ষণের মাঝেই কুরআনের সংরক্ষণ নিহিত। অতএব সুন্নাহ্ও এই আয়াতের মধ্যে ব্যাপকার্থে শামিল হবে এবং আল্লাহ সুন্নাহকেও তেমনিভাবে হেফাযত করেছেন, যেমনভাবে কুরআনকে হেফাযত করেছেন। ফলে সুন্নাহর কোন কিছুই হারিয়ে যায় নি, যদিও তা প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে এককভাবে রক্ষিত নেই।

ঘ. যুক্তিগতভাবেও প্রমাণিত হয় যে, 'যিক্র' দ্বারা আয়াতে কুরআনের সাথে হাদীছও উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কেননা কুরআনের সাথে কুরআনের ব্যাখ্যা হেফাযত করাও অপরিহার্য। যদি আল্লাহ শুধু কুরআন সংরক্ষণ করতেন এবং কুরআনের ব্যাখ্যা তথা হাদীছ সংরক্ষণ না করতেন, তবে অপব্যাখ্যাকারীদের হাতে অচিরেই স্বয়ং কুরআন বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের শিকার হ'ত এবং স্বার্থবাজ ব্যক্তিগণ যা খুশি তাই রচনা করে রাসূল (ছা.)-এর নামে চালিয়ে দিত। এতে ইসলাম ধর্মও ইহুদী-খৃষ্টান ধর্মের মত বিকৃত হয়ে পড়ত, যারা নিজ হাতে ধর্মগ্রন্থ রচনা করে বলেছিল যে, এটি আল্লাহর কিতাব, অথচ তা আল্লাহর কিতাব ছিল না। সুতরাং নিঃসন্দেহে আল্লাহ কুরআনকে যেমন সংরক্ষণ করেছেন, তেমনি তার ব্যাখ্যা হিসাবে হাদীছও সংরক্ষণ করেছেন। আর সংরক্ষণ করেছেন বলেই ইসলাম ধর্ম ইহুদী এবং খৃষ্টান ধর্মের মত বিকৃতি কিংবা বিলুপ্তির শিকার হয়নি। আল্লাহ যথার্থই বলেছেন فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ 'অতঃপর আল্লাহ নিজ অনুমতিতে মুমিনদেরকে হেদায়াত দিলেন যে বিষয়ে তারা (পথভ্রষ্ট আহলে কিতাবরা) মতবিরোধ করছিল।

ঙ. ঐতিহাসিকভাবে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এটি নিশ্চিতভাবে প্রতীয়মান হবে যে, রাসূল মুহাম্মাদ (ছা.)-এর সুন্নাহ তথা তাঁর জীবন ও কর্মের আলেখ্য মুসলমানদের নিকট যেরূপ গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়েছে তা সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোন রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তানায়ক, সেনানায়কের ভাগ্যে জোটেনি। ছাহাবী, তাবেঈ এবং তৎপরবর্তীকালের মুসলমানগণ অত্যন্ত আগ্রহ ও তৎপরতার সাথে রাসূল (ছা.)-এর প্রতিটি কথা, কর্ম ও অনুমোদন পুংখানুপুংখভাবে সংরক্ষণ করেছেন। শুধু তাই নয়, এ সকল বিবরণের বিশুদ্ধতা এবং প্রকৃত ব্যাখ্যা নির্ণয়ের জন্য নিয়োজিত হয়েছেন হাজারো বিদ্বান। পৃথিবীর আর কোন মানুষের জীবনী এত সূক্ষ্ম ও সুবিস্তৃতভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। সুতরাং এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যদি কোন কিছুর ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে, তা হ'ল এটাই যে, আল্লাহ মুসলিম উম্মাহ্র এই তৎপরতার মাধ্যমে তাঁর রাসূল (ছা.)-এর সমগ্র জীবনীই আয়নার মত হেফাযত করেছেন, যা 'সুন্নাহ' বা 'হাদীছ' হিসাবে ছাহাবীদের স্মৃতি ও লেখনীর মারফৎ কেয়ামত পর্যন্ত জন্য কুরআনের ন্যায় সংরক্ষিত হয়ে আছে।


টিকাঃ
২৪. সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯।
২৫. ড. ঈমাদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২০৩।
২৬. সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭।
২৭. আল-কুরতুবী, আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১০ম খণ্ড, পৃ. ১০৮।
২৮. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২২।
২৯. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উচ্ছ্বলিল আহকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২১-১২২।
৩০. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাছারুহ হাওয়াঈক আল-মুরসালাহ, পৃ. ৫৫৯।
৩১. সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ১৬-১৯।
৩২. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৯৭।
৩৩. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, পৃ. ৩৯০-৩৯১।
৩৪. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাছারুছ ছাওয়াঈক আল-মুরসালাহ, পৃ. ৫৭০।
৩৫. সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২১৩।
৩৬. ড. ঈমাদ আশ-শারবীনী, আস-সুন্নাহ আন-নাবাভিয়াহ ফী কিতাবাতি আ'দাইল ইসলাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৪-২১৫।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৩ : হাদীছ আল্লাহর অহী নয়

📄 সংশয়-৩ : হাদীছ আল্লাহর অহী নয়


মুনকিরে হাদীছ আব্দুল্লাহ চড়কালভী বলেন, আমরা অহী ব্যতীত অন্য কিছু মানতে আদিষ্ট হইনি। যদি তর্কসাপেক্ষে ধরে নেই যে, কিছু হাদীছ সুনিশ্চিতভাবে রাসূল (ছা.) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে, তবুও তার অনুসরণ করা অপরিহার্য নয়। কেননা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত অহী নয়। অনুরূপভাবে গোলাম আহমাদ পারভেয বলেন, 'অহী দুই ভাগে বিভক্ত' এই বিশ্বাস ইহুদীদের নিকট থেকে ধার করা। তারাও একই বিশ্বাস করে যে অহী দুই প্রকার। পঠিত অহী (Shaktab) এবং অপঠিত অহী (Shab-alfa)। এই ধারণার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

পর্যালোচনা:

ক. কুরআনে সূরা আন-নাজমের ৩-৪ আয়াত এবং সূরা আল-হাক্কাহ্র ৪৪-৪৭ আয়াতে স্পষ্টভাবে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, রাসূল (ছা.) দ্বীনের বিষয়ে যা কিছু বলেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলেন এবং তা আল্লাহর অহি। এর ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, আল-কুরআন যেমন রাসূল (ছা.)-এর নিকট অহী সূত্রে প্রেরিত হয়েছে, তেমনিভাবে তিনি সুন্নাহ্ও অহী সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছেন। উভয় প্রকার অহির মধ্যে পার্থক্য কেবল এই যে, আল-কুরআন শব্দগতভাবে নাযিল হয়েছে এবং তা ছালাতে তেলাওয়াত করা হয়। সেই সাথে আল্লাহ তা শব্দগতভাবেও কোন প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষণ করেছেন।

কিন্তু হাদীছের ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক। তা জিব্রীলের মাধ্যমে সরাসরি শব্দাকারে নাযিল হয়নি, বরং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ইলহামের মাধ্যমে অর্থগতভাবে প্রেরিত হয়েছে।

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابِ 'কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, অহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত প্রেরণ ব্যতিরিকে।' অর্থাৎ রাসূল (ছা.) কুরআন ছাড়াও আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ইলহাম সূত্রে প্রাপ্ত অহির মাধ্যমে মানুষের দ্বীনী বিষয়ের সমাধান দিতেন। পবিত্র কুরআনে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন-

(১) সূরা আত-তাহরীমের ৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنْبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর যখন সে (স্ত্রী) অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবীর) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন তখন নবী কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করলেন আর কিছু এড়িয়ে গেলেন। যখন তিনি তাকে বিষয়টি জানাল তখন সে (স্ত্রী) বলল, 'আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?' সে বলল, 'মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন।'

এই আয়াতে স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (ছা.) তাঁর কোন স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেছিলেন, যা তিনি অসুবিধা নেই ভেবে অন্যদের নিকট ফাঁস করে দিয়েছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.)- কে তাঁর স্ত্রীর এই কর্মটি জানিয়ে দিলেন এবং রাসূল (ছা.) স্ত্রীকে বিষয়টি স্বল্পাকারে উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন স্ত্রী বিস্মিত হয়ে এই তথ্যের উৎস রাসূল (ছা.)-এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমাকে জানিয়েছেন আল্লাহ।' এই ঘটনায় রাসূল (ছা.) তাঁর স্ত্রীকে কী বলেছিলেন, আর তাঁর স্ত্রী অন্যদের নিকট কী ফাঁস করেছিলেন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এখন প্রশ্ন হ'ল, এই অনুল্লেখিত বিষয়গুলো কি পরবর্তীতে কুরআন থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, নাকি রাসূল (ছা.)-কে আল্লাহ ভিন্ন প্রকার অহী (গায়র মাতলু)-এর মাধ্যমে জানিয়েছিলেন? যদি বলা হয় কুরআন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেটা অসম্ভব। সুতরাং এটা অপরিহার্য হয়ে যায় যে, রাসূল (ছা.) অপঠিত অহির দ্বারা সংবাদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

(২) সূরা আল-বাক্বারাহ্ ১৪৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন, قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا فَوَلٌ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ‘আকাশের দিকে তোমার মুখ বার বার ফিরানো আমি অবশ্যই দেখছি। অতএব আমি অবশ্যই তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফেরাব, যা তুমি পছন্দ কর। সুতরাং তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও..।'

এই আয়াতে মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে পরিবর্তিত হয়ে কা'বা ঘরের দিকে নির্ধারণের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন হ'ল, আয়াতের বর্ণনামতে দ্বিতীয় ক্বিবলা নির্ধারণের পূর্বে প্রথম ক্বিবলা হিসাবে আল্লাহ বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু সেই নির্ধারণের কোন দলীল কি কুরআনে রয়েছে? যদি না থাকে, তার অর্থ হ'ল আল্লাহ প্রথম ক্বিবলা সম্পর্কে রাসূল (ছা.)-কে অহী গায়র মাতলু (হাদীছ) দ্বারা অবগত করিয়েছিলেন।

সুতরাং নিঃসন্দেহে হাদীছও আল্লাহর অহী যা ইলহামের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছা.)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন। আর এ কারণেই ছাহাবীগণ রাসূল (ছা.)-এর সকল আদেশ-নিষেধ শিরোধার্য মনে করে পালন করতেন, যদিও তা কুরআনে না থাকত। তাঁর মৃত্যুর পরও যখনই রাসূল (ছা.)-এর কোন সুন্নাহ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, তৎক্ষণাৎ তার প্রতি চুড়ান্ত আনুগত্যের মস্তক অবনত করেছেন, যদিও সে বিষয়ে কুরআনে কোন স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

রশীদ রিযা (১৯৩৫খ্রি.) বলেন, রাসূল (ছা.) হ'তে দ্বীনের ব্যাপারে যে সকল হাদীছ ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যাপকার্থে আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত বিধানে মধ্যেই শামিল। কেননা আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (ছা.)-এর অনুগত্য করা ও তাঁর অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে মানুষের নিকট দ্বীনের বাণী প্রচারক হিসাবে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। যেমন তাঁকে বলা হয়েছে, 'আমরা আপনার নিকট 'যিকর' নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের ব্যাখ্যা করে দেন, যা তাদের জন্য নাযিল করা হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন, والجمهور على أن الأحكام الشرعية الواردة في السنة موحى بها، وأن الوحي ليس محصورا في القرآن 'জুমহুর বিদ্বানদের মতে সুন্নাতে বর্ণিত শরী'আতের আহকামসমূহ আল্লাহর অহী। আর অহী কেবল কুরআনের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

খ. হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণা- পঠিত এবং অপঠিত অহির ধারণা ইহুদীদের নিকট থেকে ধার করা হয়েছে। এর স্বপক্ষে নিছক কষ্টকল্পনা ব্যতীত কোন প্রকার দলীল তারা দেয়নি। কে কখন কিভাবে এই ধারণা ইহুদীদের নিকট থেকে ইসলামে প্রবেশ করিয়েছে, তারও কোন প্রমাণ দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর কোন মুসলিম, অমুসলিম বিদ্বান বা ঐতিহাসিক এই অভিনব দাবী উত্থাপন করেন নি। সুতরাং তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোন কারণ নেই। অপরপক্ষে মুসলিম বিদ্বানগণের বক্তব্য সুস্পষ্ট দলীলভিত্তিক। আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى 'আর সে মনগড়া কথা বলে না। বরং তা-ই বলে যা তার প্রতি অহীরূপে প্রেরণ করা হয়। আল্লাহ আরও وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلْمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا 'আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত (সুন্নাহ) এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। ' রাসূলুল্লাহ (ছা.) স্পষ্টভাবে ( أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ ، أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ) يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ কুরআন প্রাপ্ত হয়েছি ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু (হাদীছ)। সাবধান! এমন একটি সময় আসছে যখন বিলাসী মানুষ তার গদিতে বসে বলবে, তোমাদের জন্য এ কুরআনই যথেষ্ট। সেখানে যা হালাল পাবে, তাকেই হালাল জানবে এবং সেখানে যা হারাম পাবে, তাকেই হারাম জানবে। অথচ আল্লাহ্র রাসূল যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ কর্তৃক হারাম করার অনুরূপ। '


টিকাঃ
৩৭. খাদিম ইলাহী বখশ, আল-курআниун ওয়া শুবহাতুহুম, পৃ. ২১৩-২১৪।
৩৮. আল-курতুবী, আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৭শ খণ্ড, পৃ. ৮৫; ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪১১।
৩৯. সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৫১।
৪০. সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৪।
৪১. রশীদ রিযা, তাফসীরুল মানার, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৭৪।
৪২. সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪।
৪৩. সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৩।
৪৪. মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭১৭৪, সুনান আবী দাউদ, হা/৪৬০৪; সনদ ছহীহ।

📘 হাদীছ অস্বিকারকারীদের সংশয় নিরসন > 📄 সংশয়-৪ : আল্লাহ কুরআন সহজ করেছেন

📄 সংশয়-৪ : আল্লাহ কুরআন সহজ করেছেন


তাদের মতে, আল্লাহর বাণী- وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ ‘আমরা কুরআনকে সহজ করেছি উপদেশ লাভের জন্য। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?’ এই আয়াত থেকে প্রমাণিয়ত হয় যে, কোরআন বোঝার জন্য হাদীছের প্রয়োজন নেই।

পর্যালোচনা:

এখানে কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ হ'ল, এতে বর্ণিত জীবন-বিধান সহজ-সরল ও বাস্তবায়নযোগ্য। যেমন ছালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, ছিয়াম রাখা, হজ্জ করর, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, অন্যায় ও অশ্লীলতা হ'তে দূরে থাকা ইত্যাদি। এগুলি যেকোন সাধারণ কুরআন পাঠক সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু কুরআন অনুধাবনের অর্থ তা নয়। যেমন আল্লাহ কিতাবٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ‘এই কিতাব যা আমরা আপনার নিকট নাযিল করেছি, তা বরকতমণ্ডিত। তা এজন্য নাযিল করেছি যাতে লোকেরা এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে এবং জ্ঞানীরা এ থেকে উপদেশ হাছিল করে।' তিনি জ্ঞানীদের তিরষ্কার করে বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا ‘কেন তারা কুরআন গবেষণা করে না? নাকি তাদের হৃদয়সমূহ তালাবদ্ধ? কুরআন গবেষণা ও তার মর্ম অনুধাবন ও তা থেকে বিধি-বিধান নির্ধারণ ও উপদেশ আহরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের ভাষা ও অলংকার সম্পর্কিত জ্ঞানে পরিপক্কতা অর্জন করা ও অন্যান্য যরূরী বিষয়ে দক্ষতা লাভ করা। বস্তুত, কুরআনের প্রথম ব্যাখ্যাকারী হ'লেন রাসূলুল্লাহ (ছা.)। অতঃপর ছাহাবায়ে কেরাম, যাদের কাছে তিনি কুরআন বর্ণনা করেছেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করেছেন ও উপদেশ প্রদান করেছেন, যা লিপিবদ্ধ আছে ‘হাদীছ' ও ‘আছার' আকারে। অতএব কুরআন অনুধাবনের জন্য হাদীছের ব্যাখ্যা জানা অত্যাবশ্যক।

দ্বিতীয়ত, কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ যদি এটাই হয় যে, এর কোন ব্যাখ্যা বা তাফসীরের প্রয়োজন নেই, তবে রাসূল (ছা.)-এর আগমণের হেতু কী ছিল? মানুষের পক্ষে কি নিজেই সবকিছু বুঝে নেওয়া সম্ভব ছিল না? কেন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে কুরআনের ব্যাখ্যাকারী” হিসাবে প্রেরণ করলেন?


টিকাঃ
৪৫. সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ১৭, ২২, ৩২, ৪০।
৪৬. সূরা ছোয়াদ, আয়াত: ২৯।
৪৭. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00