📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.৬ ‘আকল ও রিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে হাদীছ বর্জন ও গ্রহণে বিভ্রান্তি ওও তার অপনোদন

📄 ৪.৬ ‘আকল ও রিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে হাদীছ বর্জন ও গ্রহণে বিভ্রান্তি ওও তার অপনোদন


কেউ কেউ হাদীছ অনুসরণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে নিজের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধিকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। কোন হাদীছকে তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করে, তাহলে তারা সেই হাদীছ গ্রহণ করেন এবং সেই অনুযায়ী আমলও করে থাকেন। পক্ষান্তরে কোন ছাহীহ হাদীছকেও যদি তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য মনে করে, তাহলে তারা তা কক্ষনো মেনে নেন না। এরাও মূলত জাহামিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মতই। 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে বিশ্লেষণ করে জাহামিয়্যাহ সম্প্রদায় 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি গ্রহণযোগ্য মনে করে না বিধায় অসংখ্য ছাহীহ হাদীছের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ সব হাদীছকে তারা অস্বীকার করে। খারিজি ও মু'তাযিলা সম্প্রদায়ও কবরের আযাব বর্ণিত হয়েছে, এমন সব হাদীছ ২২০ এমনকি কবরের প্রশান্তি, কবরে প্রশ্নোত্তর, কবরে শারীরিক শাস্তি প্রদান ও সশরীরে পুনরুত্থানকেও 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি গ্রহণযোগ্য মনে করে নি বলে অস্বীকার করেছে। ২২১ তারা মূলত এ সব বিষয়গুলোকে তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মাপকাঠিতে অযৌক্তিক মনে করেছে; সেই কারণেই তারা এ সব হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পক্ষান্তরে এ সব বিষয় স্পষ্ট ছাহীহ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত। উদাহরণ স্বরূপ-
১. কবর 'আযাব: আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থে "কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা" শিরোনামে একটি অধ্যায় উল্লেখ করেছেন। ২২২ তিনি এ প্রসঙ্গে সেখানে ছাহীহ হাদীছও বর্ণনা করেছেন। যেমন-
عن موسى بن عقبة قال سمعت أم خالد بنت خالد قال ولم أسمع أحدا سمع من النبي صلى الله عليه وسلم غيرها قالت: سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يتعوذ من عذاب القبر.
মূসা ইবন 'উকবাহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে এটি তিনি ব্যতীত অন্য কেউ রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেন নি। উম্মু খালিদ বিনত খালিদ রাদি আল্লাহু 'আনহা বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবর আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে শুনেছি।' ২২৩ এ বিষয়ে ছাহীহ হাদীছে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
... إن هذه الأمة تبتلى في قبورها فلولا أن لا تدافنوا لدعوت الله أن يسمعكم من عذاب القبر الذي أسمع منه....
'...নিশ্চয় এ উম্মাতকে তার কবরের ভেতর পরীক্ষা করা হবে। যদি তোমরা দাফন করবে না এ আশঙ্কা না হত, তাহলে অবশ্যই আমি আল্লাহর নিকট এমন দু'আ করতাম যে, আমি যেমন কবরের আযাব শুনতে পাচ্ছি, তোমাদেরকেও যেন তিনি তেমনটি শুনিয়ে দেন।...' ২২৪ এমনিভাবে বুখারী শরীফে ১২ টি, মুসলিম শরীফে ১১ টি, মুসতাদরাক 'আলাছ ছাহীহাইনে ১৩টি, ছাহীহ ইবন হিব্বানে ২৫টি ও ছাহীহ ইবন খুযাইমাহতে ৫টি ছাড়াও অনেক হাদীছ গ্রন্থে ছাহীহ হাদীছে বিভিন্নভাবে কবর আযাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনেও কবর আযাবের প্রসংগে আল্লাহ মদীনার মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন-
سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّوْنَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ.
"আমি তাদেরকে দু'বার শাস্তি দেব ও পরে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে মহাশাস্তির দিকে। ২২৫
এরপরেও 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য নয় মনে করে এ সব হাদীছকে অবমূল্যায়ন করার কোন সুযোগ আছে কি?
২. কবরে শারীরিক শাস্তি প্রদান: মারা যাওয়ার পর শরীর পঁচে গলে ধ্বংস হয়ে যায় বিধায় কবরে ফেরেশতাদের পক্ষ হতে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা ও শারীরিক শাস্তি দেয়াকেও 'আকল যুক্তি সঙ্গত মনে করে না। এ যুক্তিতে তাদের অনেকেই এ সম্পর্কের হাদীছগুলোকেও অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে এ প্রসংঙ্গে বিশুদ্ধ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عن أنس رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: العبد إذا وضع في قبره وتولي وذهب أصحابه حتى إنه ليسمع قرع نعالهم أتاه ملكان فأقعداه فيقولان له ما كنت تقول في هذا الرجل محمد صلى الله عليه وسلم؟ فاما المؤمن فيقول أشهد أنه عبد الله ورسوله فيقال انظر إلى مقعدك من النار أبدلك الله به مقعدا من الجنة قال النبي صلى الله عليه وسلم فيراهما جميعا وأما الكافر أو المنافق فيقول لا أدري كنت أقول ما يقول الناس فيقال لا دريت ولا تليت ثم يضرب بمطرقة من حديد فيصيح صيحة يسمعها من يليه إلا الثقلين.
আনাস রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোন বান্দাহকে তার কবরে রেখে তার সাথীসঙ্গীরা চলে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার শব্দ পর্যন্তও শুনতে পায়, এ অবস্থায় দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে বলে, এ মুহাম্মাদ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি? সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার জন্য নির্ধারিত ঐ স্থানকে দেখো, যে স্থানকে আল্লাহ তোমার জন্য জান্নাতের স্থানে পরিবর্তন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সে তখন দুটি জায়গাকেই দেখবে। আর যদি সে কাফির অথবা মুনাফিক হয়, তা হলে সে বলবে, লোকে যা বলত আমিও তাই বলতাম; আমি তাঁর (রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাকে বলা হবে, তুমি জানার চেষ্টাও কর নি, (কুরআন) তিলাওআতও কর নি। এরপর লৌহার হাতুড়ী দিয়ে তাকে পেটানো হবে, সে জোরে চিৎকার করতে থাকবে, যা শুধু মানুষ ও জিন ছাড়া সকলেই শুনতে পাবে।' ২২৬ এখানে দুই ফেরেশতা কবরবাসীকে যে বসাবেন বলে উল্লেখ হল, এদ্বারা স্পষ্টত সশরীরে বসানোই বুঝা যায়। সুতরাং ছাহীহ হাদীছ দ্বারাই সশরীরে কবর আযাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত।
৩. কবরে নিয়ামাত দান: একই কারণে অর্থাৎ 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তারা কবরে প্রশান্তি ও নিয়ামত দানের হাদীছকেও অস্বীকার করেছে, পক্ষান্তরে এ বিষয়টিও বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে। যেমন অন্য বর্ণনায় উপরোক্ত হাদীছের শেষাংশে বলা হয়েছে-
قال عليه السلام : أنه يفسح له في قبره سبعون ذراعا ويملأ عليه خضرا إلى يوم يبعثون.
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তার কবরকে সত্তর গজ প্রশস্ত করে তা পুনরুত্থান পর্যন্ত সবুজে (নি'আমতে) পরিপূর্ণ করে দেয়া হবে।' ২২৭
৪. সশরীরে পুনরুত্থান: 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার দোহাই দিয়ে তারা সশরীরে পুনরুত্থানকেও অস্বীকার করেছে, পক্ষান্তরে এর বিপরীতে ছাহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ما بين النفختين أربعون ... قال ثم ينزل الله من السماء ماء فينبتون كما ينبت البقل ليس من الإنسان شيء إلا يبلى إلا عظما واحدا وهو عجب الذنب ومنه يركب الخلق يوم القيامة.
আবূ হুরাইরাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'দুই ফুৎকারের মধ্যে চল্লিশের ব্যবধান হবে... এরপর আসমান থেকে বৃষ্টি শুরু হলে, যেমন তৃণলতা অঙ্কুরিত হয়, তেমনি তারাও অঙ্কুরিত হবে; একটি হাড় ব্যতীত মানুষের সকল হাড়ই ধ্বংস হয়ে যাবে, সেটি হচ্ছে, মেরুদন্ডের নিচের সর্বশেষ অংশ, যা দ্বারা কিয়ামাতের দিন মানুষকে পুনর্গঠন করা হবে।' ২২৮ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم- قال كل ابن آدم يأكله التراب إلا عجب الذنب منه خلق وفيه يركب.
আবূ হুরাইরাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বনূ আদমকে মাটি ভক্ষণ করবে, শুধু তার মেরুদন্ডের সর্বশেষ অংশ ব্যতীত। যা থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা থেকে তাকে আবার পুনর্গঠন করা হবে।' ২২৯ বর্ণিত হচ্ছে-
عن بن عباس رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إنكم محشورون حفاة عراة غرلا.
ইবন 'আব্বাস রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু "আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে খালি পায়ে, উলঙ্গ ও খাতনা বিহীন অবস্থায়।' ২৩০ উল্লেখিত হাদীছগুলো সবই ছাহীহ।
এরূপ বহু বিশুদ্ধ হাদীছ সশরীরে পুনরুত্থানের পক্ষে জ্বলন্ত প্রমাণ থাকার পরেও শুধু 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তি গ্রহণ করে না, এ অজুহাতে তারা এগুলোকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। আসলে সশরীরে পুনরুত্থানের পক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনেও অনেক আয়াত রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন-
وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ . قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ
'এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন সেটি পঁচে গলে যাবে? বল, এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনি, যিনি তোমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। '২৩১ সুতরাং আল-কুরআনের আলোকেও তো যে কোন মুসলিমের জন্য সশরীরে পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। এটি মূলত গায়িবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেক বুদ্ধি দ্বারা কস্মিনকালেও বুঝা সম্ভব নয়।
৫. রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মি'রাজ: 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি সমর্থন না করায় তারা এক রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সশরীরে মাক্কা মুকারমার মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিস হয়ে উর্দ্ধলোকে ভ্রমণকে অস্বীকার করে থাকে। তাদের ভাষায় মানুষকে যে প্রকৃতি ও শক্তি সামর্থ্য দেয়া হয়েছে, তাতে এত অল্প সময়ে কারো পক্ষে সশরীরে মাক্কা মুকাররমার মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিস হয়ে উর্দ্ধলোকে ভ্রমণ করাকে কোন ক্রমেই 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি সমর্থন করে না। বরং বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের এ দেহ এত দ্রুতগামি হলে তাতে আগুন লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। একইভাবে মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে অতিক্রম করার মত কোন যান আবিষ্কার না হওয়ায় মি'রাজ সশরীরে সংঘটিত হওয়া 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক। সে জন্য মি'রাজের হাদীছকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ২০২
আসলে তাদের এ বক্তব্যের বিপক্ষে অত্যন্ত জোরালো হাদীছ রয়েছে। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
عن مالك بن صعصعة رضي الله عنهما أن نبي الله صلى الله عليه وسلم حدثهم ... أتيت بدابة دون البغل وفوق الحمار أبيض فقال له الجارود هو البراق فحملت عليه فانطلق بي جبريل حتى أتى السماء الدنيا فاستفتح فقيل من هذا قال جبريل قيل ومن معك قال محمد قيل وقد أرسل إليه قال نعم قيل مرحبا به فنعم المجيء جاء ففتح
মালিক ইবন হা'আছা'আহ রাদিআল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বলেছেন, '... খচ্চর ও গাধার মাঝামাঝি একটা সাদা প্রাণী আনা হলো। 'আল-জারূদ বলেন, ওটা ছিল বুরাক। যাঁ আমাকে বহন করে চলছিল। আমার সাথে জিবরাঈল 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও ছিলেন। আমরা দুনিয়ার আসমানে উপনীত হলাম। এটা খুলে দেয়ার আবেদন করলে বলা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বলা হলো, যাঁকে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, তিনি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হলো, তাঁকে সাদর সম্ভাষণ। কত উত্তম আগন্তুকই না এসেছেন! এরপর তা খুলে দেয়া হলো।..." এমনি ভাবে এ ঘটনার সমস্ত বর্ণনা তিনি উল্লেখ করলেন। ২০৩
এ ধরনের বহুসংখ্যক ছাহীহ হাদীছে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তারা এ ধরনের হাহীহ হাদীছগুলোকে 'আকলের মাপকাঠিতে অগ্রহণযোগ্য বলে অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে এ ঘটনা তো কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলেও উল্লেখ হয়েছে। তারা নিজেদেরকে শুধু কুরআনের পৃষ্ঠপোষক দাবী করলেও বাস্তবে সেটিকেও তারা অস্বীকার করে। এটাই হচ্ছে বিশুদ্ধ হাদীছের চেয়ে 'আকল ও বিবেক বুদ্ধিকে বেশি বেশি প্রাধান্য দেয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ, যা একজন মুসলিমের জন্যে মোটেও শোভনীয় নয়। এটি মূলত একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি, যা ছাহীহ হাদীছের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের স্পষ্ট লংঘন।
কোন হাদীছ 'আকলের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এভাবে হাদীছকে বর্জন করা কোন ক্রমেই যুক্তি সঙ্গত নয়। কেননা মানুষের জ্ঞানের রয়েছে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা, সে যতটুকু জানে তার চেয়ে তার অজ্ঞতাই বেশি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ মূলত ওহী গায়ির মাতলু, অর্থাৎ এর ভাব হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আর ভাষা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। এ সত্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে আল্লাহর বাণীতে-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى.
"এবং সে মনগড়া কথাও বলে না বরং এটা তো ওহী ছাড়া আর কিছু নয়।"২৩৪ সুতরাং মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ওহীকে সীমাবদ্ধ 'আকল অনুমোদন না দেয়ায় 'আকলকে প্রাধান্য দিয়ে ওহীকে বর্জন করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। মানুষের বিবেক বুদ্ধি যে অসংখ্য ভুল করে তার ভুরি ভুরি প্রমাণও রয়েছে। মানুষের 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি আজ যে বিষয়কে নির্ভুল বলে মনে করছে, কালের ব্যবধানে তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে মানুষ যে বানরের থেকে উদ্ভূত জাতি তা বেশ কিছু দিন বিজ্ঞানের জগতে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করলেও আজ তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে জীনের আবিষ্কারের ফলে পরিস্কার ভাবে জানা গেছে যে, মানুষের জীন ও বানরের জীন কোন ভাবেই এক নয়, বরং তা একেবারেই ভিন্ন। সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবে আজ প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ কক্ষনো বানরের বংশোদ্ভূত নয়। 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে মানুষ যে বানরের থেকে উদ্ভূত জাতি, এ দর্শন যে একেবারেই ভুল ছিল, তা আজ সর্বজন বিদিত। একই ভাবে 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক'দিন আগেও হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন থেমে গেলেই প্রাণীকে মৃত বলে ঘোষণা দেয়া হত। পক্ষান্তরে আজকাল এ থিউরী পরিবর্তিত হয়েছে। এখন সেই একই চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। মস্তিষ্কের কোষের নিষ্ক্রিয়তাই এখন মৃত্যুর চিহ্ন। হয়ত সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যে দিন এ থিউরিও পরিবর্তিত হবে। সুতরাং 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত কোন জ্ঞান শাশ্বত সত্য ও নির্ভুল হতে পারে না। সে জন্য হাদীছের চেয়ে 'আকল বা বিবেক বুদ্ধিকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনার কোন সুযোগ নেই। 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য কি না তা বিবেচনায় না এনে শর্তহীন ভাবে আল্লাহর আনুগত্যের মতই রাসূলুল্লাহ ছাল্লালাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য তথা তাঁর হাদীছ পরিপালনকে আল-কুরআনের ভাষায় মু'মিন হওয়ার জন্য অনিবার্য শর্ত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا.
'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোন মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে, সে তো স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে।' ২০৫ আল্লাহ আরো বলেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
"কিন্তু না, তোমার রাব্বের শপথ, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসস্বাদের বিচার ভার তোমার উপর অর্পণ না করে; অতপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।"২৩৬
সুতরাং মু'মিন থাকতে হলে বিশুদ্ধ হাদীছ প্রত্যাখ্যানের কোন সুযোগ নেই।
কেউ কেউ মতামত দিয়ে থাকেন যে, কয়েক লক্ষাধিক হাদীছ হতে অনেক হাদীছকে বাদ দিয়ে ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ হাহীহুল বুখারী সংকলন করে থাকলে, তিনি তো অনেক হাদীছই প্রত্যাখ্যান করেছেন, আমরা যদি বুখারীরও কিছু হাদীছ প্রত্যাখ্যান করি, তাহলে দোষের কি? এটিও মূলত বিশুদ্ধ হাদীছের বিরুদ্ধে এক জঘন্য ষড়যন্ত্র, এটি একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি। ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ একটি সংকলন তৈরির জন্য প্রথমে একটি মানদণ্ড স্থির করে নেন। সে মানদন্ডে উত্তীর্ণ হাদীছগুলোকে তাঁর সে সংকলনে সংকলিত করেন। ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ যে হাদীছগুলো বাদ রেখেছেন, তা তাঁর নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তির্ণ না হওয়ার কারণেই করেছেন। কিন্তু তিনি বলেন নি যে, এ সংকলিত হাদীছগুলোর বাইরে যা রয়েছে, সেই গুলো প্রত্যাখ্যাত। অপরদিকে অধিকাংশ মুহাদ্দিছের মত হচ্ছে, যে কোন মানদণ্ডে বুখারীর হাদীছগুলো ছাহীহ। সুতরাং বুখারীর কোন হাদীছ প্রত্যাখ্যান মূলত ছাহীহ প্রমাণিত হাদীছ প্রত্যাখ্যানেরই শামিল, যা মূলত পূর্বোল্লেখিত কুরআনের আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী ঈমানেরই পরিপন্থী।

টিকাঃ
২২০. আল-আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়ীন, ১খ. ১০৬ পৃঃ
২২১. 'আফিফী আব্দুর রাজ্জাক, শুবহাতু হাওলাস্সুন্নাহ, সৌদী আরব, ১৪২৫ হিঃ, ১খ. ১৮ পৃঃ
২২২. ছাহীহ আল-বুখারী, ৫খ., ২৩৪১ পৃঃ
২২৩. প্রাগুক্ত
২২৪. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ৩১৯৯ পৃঃ
২২৫. সূরা আত্-তাওবাহ: ১০১
২২৬. ছাহীহ আল-বুখারী, ১খ., ৪৪৮ পৃঃ
২২৭. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ., ২২০০ পৃঃ উল্লেখ্য যে নবীদের শরীর মাটি ভক্ষন করতে পারবে না।
২২৮. ছাহীহ আল-বুখারী, ৪খ. ১৮৮১ পৃঃ
২২৯. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ২২৭০পৃঃ; মালিক ১খ.২৩৯ পৃঃ
২৩০. ছাহীহ আল বুখারী ৩খ. ১২২২ পৃঃ ও ৩খ.১২৭১ পৃঃ; ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ২১৯৪ পৃঃ
২৩১. সূরাহ ইয়াসিন ৭৮-৭৯
২০২. 'আফিফী আব্দুর রাজ্জাক, ১৮ হতে পরবর্তী পৃঃ
২০৩. ছাহীহ আল-বুখারী, ৩খ. ১৪১০ পৃঃ ও আত-তিরমিযী, ৫খ. ৩১৬ পৃঃ
২৩৪. সূরাহ আন-নাজম: ০৩-০৪
২৩৫. সূরাহ আল-আহযাব: ৩৬
২৩৬. সূরাহ আন-নিসা: ৬৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00