📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.৫ হাদীছ পরিপালনে গোঁড়ামীর বিভ্রান্তি ও তার অপনোদন

📄 ৪.৫ হাদীছ পরিপালনে গোঁড়ামীর বিভ্রান্তি ও তার অপনোদন


ইতোপূর্বের আলোচনায় আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যে, হাদীছ পরিপালনে পক্ষপাতিত্ব, গোঁড়ামী ও অন্ধ অনুকরণ হাদীছের নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের পরিপন্থী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমরা অনেকেই এ দোষে দুষ্ট। নিজের মতের বিপক্ষের হাহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীছ পাওয়া গেলে, সেটাকে কটাক্ষ, উপেক্ষা ও অহেতুক সমালোচনা না করে, বরঞ্চ কখনো কখনো সেটার আমল করে, আমরা যে ছাহীহ হাদীছের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যশীল, তা প্রমাণ করা উচিত। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ দুই একটি বিষয় এখানে উপস্থাপন করা যায়। এ সব বিষয়ে সকল পক্ষকে সমর্থন দেয়ার বিশুদ্ধ হাদীছও পাওয়া গেছে। সে ক্ষেত্রে কোন পক্ষের হাদীছকে কটাক্ষ না করে, এ সব হাদীছের আলোকে আমরা সকল পদ্ধতিই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমল করতে পারি। যেমন-
১. ছালাতুল বিতরের রাক'আত: ছালাতুল বিতর কত রাক'আত এ নিয়ে আমাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আমরা যারা যে মতকে অনুকরণ করি সেটাকেই নির্ভুল মনে করে, তার পক্ষের হাদীছগুলোকে দলীল হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চালাই। একইভাবে বিপক্ষের উপস্থাপিত হাদীছগুলোকে আমলে আনার সামান্য সদিচ্ছা তো পোষণ করিই না, বরং সেগুলোর বিরোধিতা করাকে যথার্থ কাজই মনে করি। এমনকি নিজের মতই যে সঠিক, তা প্রমাণের জন্য আদাজল খেয়ে লেগে যাই। যার অনিবার্য পরিণতিতে একপক্ষ অন্য পক্ষের হাদীছকে যা ইচ্ছা তাই বলে সমালোচনা করতেও পিছপা হই না। এ কাজটি মূলত ছাহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীছের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ারই নামান্তর। ঈমানের অনিবার্য দাবী হচ্ছে, ছাহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীছের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ। যাই হোক, ছালাতুল বিতরের রাকা'আত নিয়ে যে হাদীছগুলো বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাদীছগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:
ক. বিতর এক রাক'আত: বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن عمر عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال: صلاة الليل مثنى مثنى فإذا أردت أن تنصرف فاركع واحدة توتر لك.
ইবন 'উমার রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'রাত্রির ছালাত (তাহাজ্জুদ) দুই রাক'আত করে করে, যখন তুমি এ থেকে ফিরে যেতে (এটা পূর্ণ করতে) চাও, তখন এক রাক'আত আদায় করবে, যা তোমার ছালাতকে বেজোড় বানিয়ে দেবে।'১৯১ অন্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي مجلز قال سمعت ابن عمر يحدث عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : الوتر ركعة من آخر الليل.
আবূ মাজলায় সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবন 'উমার রাদি আল্লাহু 'আনহুমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেন, "বিতর হচ্ছে শেষ রাত্রিতে এক রাক'আত। '১৯২
عن ابن عمر أن رجلا سأل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن صلاة الليل، صلاة الليل مثنى مثنى فإذا خشي فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أحدكم الصبح صلى ركعة واحدة توتر له ما قد صلى.
ইবন 'উমার রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাতের ছালাত সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন; তিনি বললেন, 'রাতের ছালাত হচ্ছে, দুই রাক'আত দুই রাক'আত করে, যখন তোমাদের কেউ সকাল হওয়ার আশঙ্কা করে, এক রাক'আত ছালাত আদায় করবে যা তার আদায় করা ছালাতকে বেজোড় বানিয়ে দেবে। ১৯০ এখানে বর্ণিত হাদীছগুলো বিভিন্নভাবে বর্ণিত হলেও বর্ণনাকারী একই, এগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, ছালাতুল বিতর এক রাক'আত।
খ. বিতর এক রাক'আত হতে পাঁচ রাক'আত: যেমন বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي أيوب الأنصاري أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال: الوتر حق، فمن شاء فليوتر بخمس ، ومن شاء فليوتر بثلاث ، ومن شاء فليوتر بواحدة
আবূ আইয়ূব আল-আনসারী রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আল-বিতর হচ্ছে অপরিহার্য, যে চায় পাঁচ রাক'আত দ্বারা, যে চায় তিন রাক'আত দ্বারা, যে চায় এক রাক'আত দ্বারা বিতর করবে। '১৯৪
আল-আলবানীর মতে হাদীছটি ছাহীহ।১৯৫
গ. বিতর পাঁচ রাক'আত ও সাত রাক'আত: বর্ণিত হয়েছে-
عن أم سلمة قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر بخمس وبسبع لا يفصل بينهن بسلام ولا بكلام.
উম্মু সালামাহ রাদি আল্লাহু 'আনহা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঁচ ও সাত রাক'আত বিতর আদায় করতেন, সালাম এবং কোন কথার দ্বারা এ গুলোর মধ্যে কোন বিভাজন করতেন না। '১৯৬
ঘ. বিতর তিন রাক'আত বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن عباس قال : كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يوتر بثلاث يقرأ في الأولى بـ (سبح اسم ربك الأعلى) وفي الثانية بـ (قل يا أيها الكافرون) وفي الثالثة بـ (قل هو الله أحد).
ইবন 'আব্বাস রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন রাক'আত বিতর আদায় করতেন, প্রথম রাক'আতে سبح اسم ربك الأعلى পড়তেন, দ্বিতীয় রাক'আতে قل يا أيها الكافرون পড়তেন এবং তৃতীয় রাক'আতে قل هو الله أحد পড়তেন। ১৯৭ আল-আলবানী এ হাদীছটি ছাহীহ বলেছেন।১৯৮ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن عبد الله بن عباس أنه رقد عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فاستيقظ فتسوك وتوضأ وهو يقول (إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ) فقرأ هؤلاء الآيات حتى ختم السورة ثم قام فصلى ركعتين فأطال فيهما القيام والركوع والسجود ثم انصرف فنام حتى نفخ ثم فعل ذلك ثلاث مرات ست ركعات كل ذلك يستاك ويتوضأ ويقرأ هؤلاء الآيات ثم أوتر بثلاث.
'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ঘুমালেন, এরপর তিনি (রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুম থেকে জাগলেন, মিছওয়াক করে অজু করলেন, এরপর পড়লেন إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ করে তিনি দাঁড়ালেন, এরপর লম্বা কিয়াম ও সিজদাহ সহকারে দুই রাক'আত ছালাত আদায় করলেন, এরপর তিনি ফিরে গিয়ে নাক ডেকে ঘুমালেন। এমনিভাবে মিছওয়াক, ওজু এবং ঐ সব আয়াত তিলাওয়াত শেষে তিনি তিন বারে ছয় রাক'আত ছালাত আদায় করলেন, এরপর তিন রাক'আত বিতর আদায় করলেন। ১৯৯ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن عمر بن الخطاب أنه أوتر بثلاث ركعات لم يفصل بينهن بسلام.
'উমার ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন রাক'আত বিতর আদায় করতেন, ছালাম দ্বারা তন্মধ্যে কোন ভাগ করতেন না।'২০০ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن عائشة رضي الله عنها قالت : كان نبي الله صلى الله عليه و سلم لا يسلم في ركعتي الوتر.
'আয়িশাহ রাদি আল্লাহু 'আনহা সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছালাতুল বিতরের দুই রাক'আতে ছালাম ফিরাতেন না।'২০১ আল হাকিম বলেন আল-বুখারী ও মুসলিমের দেয়া শর্তানুযায়ী হাদীছটি ছাহীহ। ইমাম আয যাহাবী তাঁর সাথে একাত্বতা ঘোষণা করেছেন।
উল্লেখ্য যে ছালাতুল বিতরের রাক'আত সম্পর্কে আরো অনেক বর্ণিত হাদীছ রয়েছে। যাই হোক পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এ সকল হাদীছ ছালাতুল বিতরের রাক'আত সংখ্যা প্রসংগে চারটি বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। এক: ছালাতুল বিতর এক রাক'আত, দুই: তিন রাক'আত, তিন: পাঁচ রাক'আত, চার: সাত রাক'আত। এখানে এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, বিতর এক রাক'আত হওয়া, তিন রাক'আত হওয়া বা ততোধিক হওয়া গ্রহণযোগ্য হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত। এ চারটি বর্ণনা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাজ অথবা বক্তব্য। তিনি কখনো বা এক রাক'আত, কখনো তিন রাক'আত, কখনো বা এর চেয়ে বেশি রাক'আত ছালাতুল বিতর আদায় করেছেন। সুতরাং এ চারটির যে কোন একটি আমল করাই হাদীছ দ্বারা অনুমোদিত। যিনি এক রাক'আত ছালাতুল বিতর আদায় করেন, তার পক্ষে তিন বা ততোধিক রাক'আতকে অস্বীকার করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি যিনি তিন রাক'আত ছালাতুল বিতর আদায় করেন, তাঁর পক্ষে এক বা তিনের অধিক রাক'আত ছালাতুল বিতরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া কোন ভাবেই ঠিক নয়। যেহেতু এ সকল অবস্থাই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত, সেজন্য সত্যিকারের হাদীছ পালনকারীর জন্য উচিত, এখানে উল্লিখিত সকল প্রকারের হাদীছের উপরই আমল করা অর্থাৎ কখনো এক, কখনো তিন, কখনো বা ততোধিক রাক'আত ছালাতুল বিতর আদায় করা। এ প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাভী রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্যও অনেকটা এমনই। তিনি একই বিষয়ে একাধিক মতের পক্ষে গ্রহণযোগ্য ছাহীহ হাদীছ পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন-
الحق عندي في مثل ذلك أن الكل سنة ونظيره الوتر بركعة واحدة أو بثلاث
'এ সব বিষয়ে সঠিক হচ্ছে এটাই যে, প্রত্যেকটিই সুন্নাহ। ছালাতুল বিতরের এক রাক'আত অথবা তিন রাক'আত এর উদাহরণ। '২০২ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাভী রাহিমাহুল্লাহর মত নিরপেক্ষভাবে গ্রহণযোগ্য হাদীছ পরিপালনে এমন উদার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সকলের জন্যই অপরিহার্য।
২. ইমামের পেছনে সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ করা:
ইমামের পেছনে যারা ছালাত আদায় করেন, তাদেরকে মুক্তাদী বলা হয়। ইমাম সাধারণত সূরাতুল-ফাতিহাহ ছাড়া কুরআনের অন্য অংশও পড়ে থাকেন। মুক্তাদী অন্য অংশ পড়া না পড়া নিয়ে, কোন মতভেদ না থাকলেও, মুক্তাদী সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়বেন কিনা এ নিয়ে ফকীহদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীছগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাদীছ হচ্ছে-
ক. ইমামের পিছনে সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ নিষ্প্রয়োজন
কিরাআত উচ্চস্বরে পড়ার ছালাত হোক অথবা চুপি চুপি পড়ার ছালাত হোক, উভয় অবস্থাতে মুক্তাদীর সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ করা নিষ্প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে,
عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من صلى ركعة لم يقرأ فيها بأم القرآن فلم يصل إلا وراء الإمام.
'রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইমামের পেছনে নয় এমন এক রাক'আত ছালাত আদায় করলে যদি কেউ সূরাতুল-ফাতিহাহ না পড়ে, তাহলে সে ছালাতই আদায় করেনি।'২০৩ (তিরমিযী এ হাদীছটিকে ছাহীহ বলে মন্তব্য করেছেন) অর্থাৎ নিজে ছালাত আদায় করলে, অবশ্যই সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়তে হবে। তবে ইমামের পেছনে আদায় করলে না পড়লেও চলবে। এ হাদীছ অনুযায়ী উচ্চস্বরে কিরাআত পাঠের ছালাত হোক অথবা মনে মনে কিরাআত পাঠের ছালাতই হোক; উভয় অবস্থাতেই ইমামের পেছনে মুক্তাদীর সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়া নিষ্প্রয়োজন। আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن عبد الله بن شداد قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من كان له إمام فإن قراءة الإمام له قراءة.
'আবদুল্লাহ ইবন শাদ্দাদ রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যার ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাআতই হচ্ছে তার জন্য কিরাআত।' ২০৪ আল-আলবানী হাদীছটিকে ছাহীহ বলেছেন।
এ হাদীছটি যেহেতু ইমামের যে কোন কিছুকে পড়াকে মুক্তাদীর জন্য পড়া হিসাবে গণ্য করাকে সমর্থন দেয়, সেহেতু এই আলোকে ইমাম সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়লে, ইমাম কিরাআত উচ্চ স্বরে পড়ুন অথবা নিচু স্বরে পড়ুন, উভয় অবস্থাতেই মুক্তাদীর জন্য তা পড়ার প্রয়োজন হবে না।
খ. ইমামের পিছনে সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ অত্যাবশ্যকীয় এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে-
قال عبادة بن الصامت صلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم بعض الصلوات التي يجهر فيها بالقراءة ، فالتبست عليه القراءة ، فلما انصرف أقبل علينا بوجهه فقال : هل تقرءون إذا جهرت بالقراءة؟ ». فقال بعضنا : إنا نصنع ذلك. قال : فلا، وأنا أقول ما لى أنازع القرآن ، فلا تقرءوا بشيء من القرآن إذا جهرت إلا بأم القرآن.
'উবাদাহ ইবনুছ ছামিত রাদিআল্লাহু 'আনহু বলেন, প্রকাশ্যে কিরাআত আদায় করতে হয় এমন ছালাতে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদের ইমামতি করেন। (তাঁর) কিরাআত তালগোল পাকিয়ে গেল। যখন তিনি সালাম ফিরালেন তখন আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আমি যখন আল-কুরআন প্রকাশ্যভাবে পড়ি তখন কি তোমরাও কুরআন পড়? আমাদের কেউ কেউ বললেন হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন না, আমি বলছি (কি ব্যাপার) আমার সাথে কুরআন নিয়ে ধাক্কাধাক্কি করা হচ্ছে! যখন আমি উচ্চস্বরে কিরাআত পড়ব তখন শুধু সূরাতুল-ফাতিহাহ ব্যতীত অন্য কিছু তোমরা পড়বে না।'২০৫
আবুল হাসান আদ-দারা কুতনী বলেন, এই হাদীছের সনদ হাসান, এর বর্ণনাকারীগণ আস্থাযোগ্য (ثقات)।২০৬
এ হাদীছ রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমামের পেছনে সূরা আল ফাতিহাহ পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন তার প্রমাণ পেশ করে। এ বিষয়ে আরো বর্ণিত হয়েছে -
عن أبي هريرة عن النبي -صلى الله عليه وسلم - قال : من صلى صلاة لم يقرأ فيها بأم القرآن فهي خداج - ثلاثا - غير تمام.
আবু হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু 'আনহু বলেন, "রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন তিনবার বলেছেন, যে সূরাতুল ফাতিহাহ ব্যতীত ছালাত আদায় করে সেটি অপরিপূর্ণ।" ২০৭
এ হাদীছ প্রতিটি ছালাতে সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ যে অত্যাবশ্যক, তারই স্পষ্ট দলীল।
গ. উচ্চস্বরের কিরাআত বিশিষ্ট ছালাতে ইমামের পিছনে সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ নিষ্প্রয়োজন
এমন গ্রহণযোগ্য হাদীছ পাওয়া যায়, যা স্পষ্টত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, ইমাম যে ছালাতে প্রকাশ্যে কিরাআত পাঠ করবেন, সে ছালাতে যেহেতু সূরাতুন ফাতিহাহ মুক্তাদীও শুনে থাকেন, সে জন্য তাঁর সূরাতুল-ফাতিহাহ পাঠ করার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي هريرة : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم انصرف من صلاة جهر فيها بالقراءة فقال هل قرأ معي أحد منكم آنفا ؟ فقال رجل نعم يا رسول الله قال إني أقول مالي أنازع القرآن!
আবু হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, "ছালাতে উচ্চস্বরে কিরাআত পড়া হয়েছে এমন ছালাত থেকে ফিরে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদের কেউ কি একটু পূর্বে আমার (কুরআন) পাঠের সাথে সাথে কোন কিছু পাঠ করছিলে? একজন বলল, জ্বি হ্যাঁ, হে রাসূলাল্লাহ। তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি বলছি, আমার সাথে কুরআন নিয়ে ধাক্কাধাক্কি করা হচ্ছে!”২০৮ অর্থাৎ আমি অহেতুক কুরআন পড়তে থাকব, আর তা শ্রবণ করা হবে না, এটি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আল-আলবানী হাদীছটিকে ছাহীহ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে আরো বার্ণত হয়েছে-
عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: إنما جعل الإمام ليؤتم به . فإذا كبر فكبروا . وإذا قرأ فأنصتوا.
আবূ হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইমাম বানানো হয়েছে তাকে অনুসরণ করার জন্য, সুতরাং সে যখন তাকবীর দেবে তোমরাও তাকবীর দেবে আর সে যখন (কোন কিছু) পড়বে তোমরা চুপ থাকবে।' ২০৯ এখানের وإذا قرأ فأنصتوا বাক্য ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ ছাহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। ২১০
এ হাদীছে ইমাম যখন কোন কিছু তিলাওয়াত করবে, তখন চুপ থাকতে বলা হয়েছে। এ দ্বারা শ্রবণের উদ্দেশ্যেই চুপ থাকা প্রমাণিত হয়। সুতরাং যে ছালাতে ইমাম উচ্চ স্বরে কিরাআত পাঠ করবেন, সে ছালাতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের কোন অংশ না পড়ে চুপ থাকারই যে নির্দেশ দিয়েছেন, এ হাদীছ সেই কথারই প্রমাণ বহন করে। তাহলে ইমাম উচ্চস্বরে কিরাআত পাঠ করলে মুক্তাদীর সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়ার প্রয়োজন নেই।
এখানে ইমাম সাহেবের পেছনে মুক্তাদীর সূরাতুল-ফাতিহাহ পড়া, না পড়া নিয়ে তিন ধরনের হাদীছ পাওয়া গেল। হাদীছবেত্তাদের মানদন্ড অনুযায়ী এখানে উল্লেখিত কোন হাদীছ এ অবস্থায় নেই যা দা'য়ীফ (দুর্বল) বা অন্য কোন কারণে একেবারেই উপেক্ষা যোগ্য। সুতরাং নিঃশর্ত ভাবে যাঁরা হাদীছ পরিপালন করতে চান, তাঁদের ছালাত আদায়ের সময় এ তিন শ্রেণীর হাদীছই বিবেচনায় আনা জরুরী। কোন এক শ্রেণীকে অগ্রহণযোগ্য বলা তাঁদের জন্য উচিত হবে না। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, কেউ যদি এ তিন শ্রেণীর সব হাদীছের উপর আমল করতে পারেন, তা হলে ভাল। অন্যথায় যে কোন এক শ্রেণীর উপর আমল করলেই যথেষ্ট। তবে অন্য দুই শ্রেণীকে বিভিন্ন অজুহাতে সমালোচনা করে, এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করা, কোন ভাবেই ঠিক হবে না।
৩. মোজার উপর মাসাহ করা
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা মূলত বাস্তব সম্মত, যা পালন করা কষ্টকর তো নয়ই, বরং তা সহজেই পালনযোগ্য। অজু করার সময় বারবার মোজা খুলে পা ধোয়া বেশ কষ্টসাধ্য। সে জন্য পা থেকে মোজা না খুলে, তার উপর মাসাহ করাকে ইসলামী শারী'আহ অনুমোদন দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে এ বিষয়ে স্পষ্ট হাদীছও বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাদীছ হচ্ছে-
عن عروة بن المغيرة بن شعبة ، عن أبيه قال : قلت : يا رسول الله ، أتمسح على خفيك ؟ قال : نعم ، إني أدخلتهما وهما طاهرتان.
'উরওয়াতুবনুল মুগীরাতুবনি শূ'বাহ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আপনি কি আপনার মোজার উপর মাসাহ করলেন? তিনি বললেন, "হ্যাঁ, আমি পবিত্র অবস্থায় পা দুটিকে তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়ে ছিলাম।" ২১১ অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে-
عن همام بن الحارث قال : رأيت جرير بن عبد الله بال ثم توضأ ومسح على خفيه ثم قام فصلى فسئل فقال رأيت النبي صلى الله عليه و سلم صنع مثل هذا.
'হাম্মাম ইবনুল হারিছ বলেন, আমি জারির ইবন আবদুল্লাহ রাদি আল্লাহু 'আনহুকে পেশাব করে অজু করার সময় তাঁর দুই মোজার উপর মাসাহ করে ছালাত আদায় করতে দেখলাম। তাঁকে (এ বিষয়ে) প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ভাবেই করতে দেখেছি। ২১২ আরো বর্ণিত হয়েছে -
عن صفوان بن عسال قال : كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يأمرنا إذا كنا على سفر أن لا ننزع خفافنا ثلاثة أيام ولياليهن إلا من جنابة ولكن من غائط وبول ونوم .
'ছাফওয়ান ইবন আসসাল বলেন, আমরা সফর অবস্থায় থাকলে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিতেন, যাতে আমরা জানাবাত অবস্থা (যা গোসলকে অনিবার্য করে) ব্যতীত পায়খানা, পেশাব ও ঘুমের জন্যও তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত মোজা না খুলি।' (তিরমিযী হাদীছটিকে ছাহীহ বলেছেন।) ২১৩
অন্য হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عن خزيمة بن ثابت عن النبي صلى الله عليه و سلم إنه قال : في المسح على الخفين يوم وليلة للمقيم وثلاثة أيام ولياليهن للمسافر.
'খুযাইমা ইবন ছাবিত রাদি আল্লাহু 'আনহু মোজার উপর মাসাহ সম্পর্কে বলেন, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুসাফির অবস্থায় তিন দিন ও মুকিম (মুসাফির নয় এ) অবস্থায় একদিন ও একরাত।' ২১৪
عن أبي هريرة قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا أدخل أحدكم رجليه في خفيه وهما طاهرتان فليمسح عليهما ثلاث للمسافر ويوم للمقيم .
আবূ হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের কেউ পবিত্র অবস্থায় তার দুই পা দুই মোজায় প্রবেশ করালে, সে তার উপর মুসাফির অবস্থায় তিন দিন ও মুকীম অবস্থায় একদিন মাসাহ করতে পারবে।'২১৫ আল-আলবানী এ হাদীছটিকে ছাহীহ বলেছেন।
অনেকেই মনে করেন আমরা যে মোজা ব্যবহার করি তা ও এখানে হাদীছে বর্ণিত (الخف) এক নয়। আসলে এ ধারণাটি ঠিক নয়। মোজাকেই আরবিতে الخف বলে। অভিধানে বলা হয়েছে-
الخفّ بالفارسية موزه
ফারসি ভাষায় الخفّ হচ্ছে মোজা। ২১৬ বাংলা ভাষাতেও ফার্সি ভাষার অনেক শব্দের মতই ফার্সি 'মোজা' শব্দটিও ব্যবহার হয়। সুতরাং বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত মোজা ও হাদীছগুলোতে বর্ণিত খৃষ্ণ যে একই, তা সন্দেহাতিতভাবেই প্রমাণিত। অতএব খুল্ফ সম্পর্কিত সকল হাদীছই মোজার ব্যাপারে প্রযোজ্য।
মূলত এ প্রসংগে বর্ণিত হাদীছগুলো একত্রিত করলে স্পষ্ট যে কথাটি বুঝা যায় তা হচ্ছে, অজু অবস্থায় কেউ মোজা পরিধান করলে তার উপর গোসল ফারদ হওয়ার মত কোন কিছু না ঘটলে, সে ব্যক্তি মুকীম হলে একদিন এক রাত, আর মুসাফির হলে তিন দিন তিন রাত, মোজা না খুলে তার উপর মাসাহ করে পবিত্রতা অর্জন করতে পারবে। এ পর্যায়ে মোজা কি দ্বারা তৈরি, তা কতটুকু শক্ত, এ দ্বারা কত পথ অতিক্রম করা সম্ভব ইত্যাদি কোন শর্ত আমরা হাদীছে দেখতে পাই না।
আমাদের পূর্ববর্তী অনেক বিচক্ষণ আলিমও কিন্তু একই বিষয়ে একাধিক মতের পক্ষে গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন ছাহীহ হাহীসে পাওয়া গেলে তার উপর আমলের আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছালাতুল ফাজরে কুনূত পড়ার বৈধতার হাদীছ বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বলেন-
ومن هذا أيضا جهر الإمام بالتأمين وهذا من الاختلاف المباح الذي لا يعنف فيه من فعله ولا من تركه وهذا كرفع اليدين في الصلاة وتركه وكالخلاف في أنواع التشهدات وأنواع الأذان والإقامة وأنواع النسك من الإفراد والقرآن والتمتع وليس مقصودنا إلا ذكر هديه صلى الله عليه وسلم الذي كان يفعله هو.
'উচ্চস্বরে ইমামের আমীন বলাও এইরূপ। এটি ঐ ধরনের মুবাহ বিষয়ক মতভেদ, যা করা অথবা বর্জন করা সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করা যাবে না। এটি ছালাতের মধ্যে হাত উঠানো না উঠানো, বিভিন্ন প্রকার তাশাহ্হুদ পাঠ, আযান দেয়া, ইকামত দেয়া, ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু' হাজ্জে কুরবানী দেয়ার ভিন্নতার মতই। আমাদের উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথ যা তিনি করতেন তা স্মরণ করিয়ে দেয়া। ২১২১৭ অর্থাৎ যে কোন একটিকে 'আমল করলেই চলবে, কোন একটির উপর শক্ত অবস্থান ঠিক নয়। তিনি কাফিরদের সন্তানদের জান্নাতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে, বিভিন্ন পক্ষের দলীল উপস্থাপনের এক পর্যায়ে আরো বলেছেন যে-
أن عادتنا في مسائل الدين كلها دقها وجلها أن نقول بموجبها ولا نضرب بعضها ببعض ولا نتعصب لطائفة على طائفة بل نوافق كل طائفة على ما معها من الحق وتخالفها فيما معها من خلاف الحق.
'দীনের ছোট বড় সকল মাসআলার বিষয়ে আমাদের নীতি হচ্ছে, এর দাবী অনুযায়ী কথা বলা, একে অপরকে ঘায়েল করব না এবং এক দলকে বাদ দিয়ে অন্য দলের প্রতি গোঁড়ামীও করব না। বরং যে দলের পক্ষে সত্য রয়েছে, আমরা তার সাথে একাত্ম হবো আর যাদের সাথে সত্য পরিপন্থী কিছু থাকবে আমরা তার বিরোধী হবো।'২১৮ সুতরাং আমাদেরও এ সব মনীষীদের মতই প্রতিটি বিষয়ে গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে দলীলকে বিবেচনায় আনা ও বিরোধী পক্ষের প্রতি উদার হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আমরা অনেক সময় হাদীছের অনুমোদিত অনেক বিষয়কে সতর্কতা অবলম্বনের অজুহাতে বর্জন করে থাকি। ইবন কায়য়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
والاحتياط حسن ما لم يفض بصاحبه إلى مخالفة السنة، فإذا أفضى إلى ذلك فالاحتياط ترك هذا الاحتياط.
'সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম, যদি তা সতর্কতা অবলম্বনকারীকে হাদীছের বিরুদ্ধে না নিয়ে যায়। যদি হাদীছের বিরুদ্ধে নিয়ে যায়, তা হলে উক্ত সতর্কতাকে বর্জন করাই সতর্কতা।'২১৯ সুতরাং সতর্কতা অবলম্বন করার ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে হাদীছের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

টিকাঃ
১৯১. ইবুন হিব্বان,, ৬ খ. ৩৫৪ পৃ.
১৯২. মুসলিম, খ.১ পৃ.৫।৮
১৯৩. প্রাগুক্ত, খ.১ পৃ.৫১৬
১৯৪. ইবন হিব্বান, ৬ খ.১৭০পৃঃ; ইবন মাযাহ; ১ খ. ৩৭৬ পৃ., হাকিম, ১ খ. ৪৪৪ পৃঃ
১৯৫. আল- আলবানী, ছাহীহু ওয়া দায়ীফু ইবন মাযাহ, ৩খ., ১৯০ পৃঃ
১৯৬. আন-নাসাঈ, ১খ. ৪৪১ পৃ.
১৯৭. আহমাদ, ১ খ. ২৯৯ পৃঃ, আন- নাসাঈ, ১খ. ৪৭৭ পৃ.
১৯৮. আল-আলবানী কিতাবু ছালতুত তারাবীহ, ১ খ. ১১০পৃঃ
১৯৯. মুসলিম, ১ খ. ৫৩০ পৃঃ
২০০. ইবন আবী শায়বাহ, ৩ খ. ৯০ পৃঃ
২০১. আত-তাহাবী, শারহি মা'আনিল আছার, ১খ., ৪৮১ পৃঃ
২০২. দিহলাভী, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২খ., ১০ পৃ
২০৩. মালিক, ১ খ. ৮৪ পৃ, আত-তিরমিযী, ২ খ. ১২২ পৃ.
২০৪. আল-বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ২ খ..১৬০ পৃঃ আদ-দারা কুতনী ১ খ. ৪০২ পৃঃ
২০৫. আল-হাকিম ১ খ.,৩৬৪ পৃঃ, আল-বায়হাকী, ২ খ. ১৬৬ পৃঃ
২০৬. আল বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা, তাবি- খ. ২, পৃ. ১৬৫।
২০৭. আহমাদ ৬ খ. ২৭৫ পৃঃ, ইবন মাযাহ ১ খ., ২৭৪ পৃঃ, ছাহীহ মুসলিম. ১ খ ২৯৬ পৃঃ.
২০৮. আত-তিরমিযী, ২ খ., ১১৯ পৃঃ, ইবন হিব্বান, ৫খ., ১৫১ পৃঃ আবু দাউদ ১ খ., ২১৮ পৃঃ, ইবন মাজাহ ১ খ., ২৭৬ পৃঃ
২০৯. আহমাদ, ২ খ., ৩৭৬ পৃঃ, ইবন মাজাহ ১ খ. ২৭৬ পৃঃ
২১০. ছাহীহ মুসলিম, ১ খ., ৩০৪ পৃঃ
২১১. হাহীহ আল বুখারী ১ খ., ৮৫ পৃঃ, ইবন খুযায়মাহ, ১ খ.,, ৯৫ পৃঃ,, ইবন হিব্বان ৪ খ., ১৫, পৃঃ, সালিক,১ খ., ৩৩ পৃঃ
২১২. হাহীহ আল-বুখারী, ১ খ., ১৫১ পৃঃ
২১৩. আত-তিরমিযী, ১ খ., ১৫৯ পৃঃ
২১৪. ইবন হিব্বান, ৪ খ. ১৫৮পৃ., আহমাদ, ৫ খ. ২১৫পৃঃ
২১৫. ইবন আবী শায়বাহ, ১ খ. ১৬৭ পৃঃ
২১৬. ইবন দুরাইদ, জামহারাতুল লুগাহ, তাবি., ২খ. ২৫৮ পৃঃ
২১৭. আল-জাওযী, ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মা'আদ, কুয়িত, ১৪০৭ হিঃ, ১খ., ২৫৬ পৃঃ
২১৮. আল-জাওযী, ইবনুল কায়্যিম, তরীকুল হিজরাতায়িন ওয়া বাবুস সা'আদাতায়িন, আদ-দাম্মাম, ১৪১৪ হিঃ ১খ. ১২৫পৃঃ
২১৯. ইগাছাতিল লুহফান, বায়রূত, ১৩৯৫ হিঃ, ১খ. ১৬৩ পৃঃ

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.৬ ‘আকল ও রিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে হাদীছ বর্জন ও গ্রহণে বিভ্রান্তি ওও তার অপনোদন

📄 ৪.৬ ‘আকল ও রিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে হাদীছ বর্জন ও গ্রহণে বিভ্রান্তি ওও তার অপনোদন


কেউ কেউ হাদীছ অনুসরণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে নিজের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধিকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। কোন হাদীছকে তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করে, তাহলে তারা সেই হাদীছ গ্রহণ করেন এবং সেই অনুযায়ী আমলও করে থাকেন। পক্ষান্তরে কোন ছাহীহ হাদীছকেও যদি তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য মনে করে, তাহলে তারা তা কক্ষনো মেনে নেন না। এরাও মূলত জাহামিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মতই। 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে বিশ্লেষণ করে জাহামিয়্যাহ সম্প্রদায় 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি গ্রহণযোগ্য মনে করে না বিধায় অসংখ্য ছাহীহ হাদীছের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ সব হাদীছকে তারা অস্বীকার করে। খারিজি ও মু'তাযিলা সম্প্রদায়ও কবরের আযাব বর্ণিত হয়েছে, এমন সব হাদীছ ২২০ এমনকি কবরের প্রশান্তি, কবরে প্রশ্নোত্তর, কবরে শারীরিক শাস্তি প্রদান ও সশরীরে পুনরুত্থানকেও 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি গ্রহণযোগ্য মনে করে নি বলে অস্বীকার করেছে। ২২১ তারা মূলত এ সব বিষয়গুলোকে তাদের 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মাপকাঠিতে অযৌক্তিক মনে করেছে; সেই কারণেই তারা এ সব হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পক্ষান্তরে এ সব বিষয় স্পষ্ট ছাহীহ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত। উদাহরণ স্বরূপ-
১. কবর 'আযাব: আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থে "কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা" শিরোনামে একটি অধ্যায় উল্লেখ করেছেন। ২২২ তিনি এ প্রসঙ্গে সেখানে ছাহীহ হাদীছও বর্ণনা করেছেন। যেমন-
عن موسى بن عقبة قال سمعت أم خالد بنت خالد قال ولم أسمع أحدا سمع من النبي صلى الله عليه وسلم غيرها قالت: سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يتعوذ من عذاب القبر.
মূসা ইবন 'উকবাহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে এটি তিনি ব্যতীত অন্য কেউ রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেন নি। উম্মু খালিদ বিনত খালিদ রাদি আল্লাহু 'আনহা বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবর আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে শুনেছি।' ২২৩ এ বিষয়ে ছাহীহ হাদীছে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
... إن هذه الأمة تبتلى في قبورها فلولا أن لا تدافنوا لدعوت الله أن يسمعكم من عذاب القبر الذي أسمع منه....
'...নিশ্চয় এ উম্মাতকে তার কবরের ভেতর পরীক্ষা করা হবে। যদি তোমরা দাফন করবে না এ আশঙ্কা না হত, তাহলে অবশ্যই আমি আল্লাহর নিকট এমন দু'আ করতাম যে, আমি যেমন কবরের আযাব শুনতে পাচ্ছি, তোমাদেরকেও যেন তিনি তেমনটি শুনিয়ে দেন।...' ২২৪ এমনিভাবে বুখারী শরীফে ১২ টি, মুসলিম শরীফে ১১ টি, মুসতাদরাক 'আলাছ ছাহীহাইনে ১৩টি, ছাহীহ ইবন হিব্বানে ২৫টি ও ছাহীহ ইবন খুযাইমাহতে ৫টি ছাড়াও অনেক হাদীছ গ্রন্থে ছাহীহ হাদীছে বিভিন্নভাবে কবর আযাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়েছে।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনেও কবর আযাবের প্রসংগে আল্লাহ মদীনার মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন-
سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّوْنَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ.
"আমি তাদেরকে দু'বার শাস্তি দেব ও পরে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে মহাশাস্তির দিকে। ২২৫
এরপরেও 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য নয় মনে করে এ সব হাদীছকে অবমূল্যায়ন করার কোন সুযোগ আছে কি?
২. কবরে শারীরিক শাস্তি প্রদান: মারা যাওয়ার পর শরীর পঁচে গলে ধ্বংস হয়ে যায় বিধায় কবরে ফেরেশতাদের পক্ষ হতে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা ও শারীরিক শাস্তি দেয়াকেও 'আকল যুক্তি সঙ্গত মনে করে না। এ যুক্তিতে তাদের অনেকেই এ সম্পর্কের হাদীছগুলোকেও অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে এ প্রসংঙ্গে বিশুদ্ধ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عن أنس رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: العبد إذا وضع في قبره وتولي وذهب أصحابه حتى إنه ليسمع قرع نعالهم أتاه ملكان فأقعداه فيقولان له ما كنت تقول في هذا الرجل محمد صلى الله عليه وسلم؟ فاما المؤمن فيقول أشهد أنه عبد الله ورسوله فيقال انظر إلى مقعدك من النار أبدلك الله به مقعدا من الجنة قال النبي صلى الله عليه وسلم فيراهما جميعا وأما الكافر أو المنافق فيقول لا أدري كنت أقول ما يقول الناس فيقال لا دريت ولا تليت ثم يضرب بمطرقة من حديد فيصيح صيحة يسمعها من يليه إلا الثقلين.
আনাস রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোন বান্দাহকে তার কবরে রেখে তার সাথীসঙ্গীরা চলে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার শব্দ পর্যন্তও শুনতে পায়, এ অবস্থায় দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে বলে, এ মুহাম্মাদ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি? সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার জন্য নির্ধারিত ঐ স্থানকে দেখো, যে স্থানকে আল্লাহ তোমার জন্য জান্নাতের স্থানে পরিবর্তন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সে তখন দুটি জায়গাকেই দেখবে। আর যদি সে কাফির অথবা মুনাফিক হয়, তা হলে সে বলবে, লোকে যা বলত আমিও তাই বলতাম; আমি তাঁর (রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাকে বলা হবে, তুমি জানার চেষ্টাও কর নি, (কুরআন) তিলাওআতও কর নি। এরপর লৌহার হাতুড়ী দিয়ে তাকে পেটানো হবে, সে জোরে চিৎকার করতে থাকবে, যা শুধু মানুষ ও জিন ছাড়া সকলেই শুনতে পাবে।' ২২৬ এখানে দুই ফেরেশতা কবরবাসীকে যে বসাবেন বলে উল্লেখ হল, এদ্বারা স্পষ্টত সশরীরে বসানোই বুঝা যায়। সুতরাং ছাহীহ হাদীছ দ্বারাই সশরীরে কবর আযাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত।
৩. কবরে নিয়ামাত দান: একই কারণে অর্থাৎ 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তারা কবরে প্রশান্তি ও নিয়ামত দানের হাদীছকেও অস্বীকার করেছে, পক্ষান্তরে এ বিষয়টিও বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে। যেমন অন্য বর্ণনায় উপরোক্ত হাদীছের শেষাংশে বলা হয়েছে-
قال عليه السلام : أنه يفسح له في قبره سبعون ذراعا ويملأ عليه خضرا إلى يوم يبعثون.
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তার কবরকে সত্তর গজ প্রশস্ত করে তা পুনরুত্থান পর্যন্ত সবুজে (নি'আমতে) পরিপূর্ণ করে দেয়া হবে।' ২২৭
৪. সশরীরে পুনরুত্থান: 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার দোহাই দিয়ে তারা সশরীরে পুনরুত্থানকেও অস্বীকার করেছে, পক্ষান্তরে এর বিপরীতে ছাহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ما بين النفختين أربعون ... قال ثم ينزل الله من السماء ماء فينبتون كما ينبت البقل ليس من الإنسان شيء إلا يبلى إلا عظما واحدا وهو عجب الذنب ومنه يركب الخلق يوم القيامة.
আবূ হুরাইরাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'দুই ফুৎকারের মধ্যে চল্লিশের ব্যবধান হবে... এরপর আসমান থেকে বৃষ্টি শুরু হলে, যেমন তৃণলতা অঙ্কুরিত হয়, তেমনি তারাও অঙ্কুরিত হবে; একটি হাড় ব্যতীত মানুষের সকল হাড়ই ধ্বংস হয়ে যাবে, সেটি হচ্ছে, মেরুদন্ডের নিচের সর্বশেষ অংশ, যা দ্বারা কিয়ামাতের দিন মানুষকে পুনর্গঠন করা হবে।' ২২৮ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم- قال كل ابن آدم يأكله التراب إلا عجب الذنب منه خلق وفيه يركب.
আবূ হুরাইরাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বনূ আদমকে মাটি ভক্ষণ করবে, শুধু তার মেরুদন্ডের সর্বশেষ অংশ ব্যতীত। যা থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা থেকে তাকে আবার পুনর্গঠন করা হবে।' ২২৯ বর্ণিত হচ্ছে-
عن بن عباس رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إنكم محشورون حفاة عراة غرلا.
ইবন 'আব্বাস রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু "আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে খালি পায়ে, উলঙ্গ ও খাতনা বিহীন অবস্থায়।' ২৩০ উল্লেখিত হাদীছগুলো সবই ছাহীহ।
এরূপ বহু বিশুদ্ধ হাদীছ সশরীরে পুনরুত্থানের পক্ষে জ্বলন্ত প্রমাণ থাকার পরেও শুধু 'আকল, বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তি গ্রহণ করে না, এ অজুহাতে তারা এগুলোকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। আসলে সশরীরে পুনরুত্থানের পক্ষে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনেও অনেক আয়াত রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন-
وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ . قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ
'এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন সেটি পঁচে গলে যাবে? বল, এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনি, যিনি তোমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। '২৩১ সুতরাং আল-কুরআনের আলোকেও তো যে কোন মুসলিমের জন্য সশরীরে পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। এটি মূলত গায়িবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেক বুদ্ধি দ্বারা কস্মিনকালেও বুঝা সম্ভব নয়।
৫. রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মি'রাজ: 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি সমর্থন না করায় তারা এক রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সশরীরে মাক্কা মুকারমার মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিস হয়ে উর্দ্ধলোকে ভ্রমণকে অস্বীকার করে থাকে। তাদের ভাষায় মানুষকে যে প্রকৃতি ও শক্তি সামর্থ্য দেয়া হয়েছে, তাতে এত অল্প সময়ে কারো পক্ষে সশরীরে মাক্কা মুকাররমার মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মাকদিস হয়ে উর্দ্ধলোকে ভ্রমণ করাকে কোন ক্রমেই 'আকল ও বিবেক বুদ্ধি সমর্থন করে না। বরং বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের এ দেহ এত দ্রুতগামি হলে তাতে আগুন লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। একইভাবে মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে অতিক্রম করার মত কোন যান আবিষ্কার না হওয়ায় মি'রাজ সশরীরে সংঘটিত হওয়া 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক। সে জন্য মি'রাজের হাদীছকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ২০২
আসলে তাদের এ বক্তব্যের বিপক্ষে অত্যন্ত জোরালো হাদীছ রয়েছে। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
عن مالك بن صعصعة رضي الله عنهما أن نبي الله صلى الله عليه وسلم حدثهم ... أتيت بدابة دون البغل وفوق الحمار أبيض فقال له الجارود هو البراق فحملت عليه فانطلق بي جبريل حتى أتى السماء الدنيا فاستفتح فقيل من هذا قال جبريل قيل ومن معك قال محمد قيل وقد أرسل إليه قال نعم قيل مرحبا به فنعم المجيء جاء ففتح
মালিক ইবন হা'আছা'আহ রাদিআল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বলেছেন, '... খচ্চর ও গাধার মাঝামাঝি একটা সাদা প্রাণী আনা হলো। 'আল-জারূদ বলেন, ওটা ছিল বুরাক। যাঁ আমাকে বহন করে চলছিল। আমার সাথে জিবরাঈল 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও ছিলেন। আমরা দুনিয়ার আসমানে উপনীত হলাম। এটা খুলে দেয়ার আবেদন করলে বলা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বলা হলো, যাঁকে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, তিনি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হলো, তাঁকে সাদর সম্ভাষণ। কত উত্তম আগন্তুকই না এসেছেন! এরপর তা খুলে দেয়া হলো।..." এমনি ভাবে এ ঘটনার সমস্ত বর্ণনা তিনি উল্লেখ করলেন। ২০৩
এ ধরনের বহুসংখ্যক ছাহীহ হাদীছে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তারা এ ধরনের হাহীহ হাদীছগুলোকে 'আকলের মাপকাঠিতে অগ্রহণযোগ্য বলে অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে এ ঘটনা তো কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলেও উল্লেখ হয়েছে। তারা নিজেদেরকে শুধু কুরআনের পৃষ্ঠপোষক দাবী করলেও বাস্তবে সেটিকেও তারা অস্বীকার করে। এটাই হচ্ছে বিশুদ্ধ হাদীছের চেয়ে 'আকল ও বিবেক বুদ্ধিকে বেশি বেশি প্রাধান্য দেয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ, যা একজন মুসলিমের জন্যে মোটেও শোভনীয় নয়। এটি মূলত একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি, যা ছাহীহ হাদীছের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের স্পষ্ট লংঘন।
কোন হাদীছ 'আকলের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এভাবে হাদীছকে বর্জন করা কোন ক্রমেই যুক্তি সঙ্গত নয়। কেননা মানুষের জ্ঞানের রয়েছে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা, সে যতটুকু জানে তার চেয়ে তার অজ্ঞতাই বেশি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ মূলত ওহী গায়ির মাতলু, অর্থাৎ এর ভাব হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আর ভাষা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর। এ সত্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে আল্লাহর বাণীতে-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى.
"এবং সে মনগড়া কথাও বলে না বরং এটা তো ওহী ছাড়া আর কিছু নয়।"২৩৪ সুতরাং মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ওহীকে সীমাবদ্ধ 'আকল অনুমোদন না দেয়ায় 'আকলকে প্রাধান্য দিয়ে ওহীকে বর্জন করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। মানুষের বিবেক বুদ্ধি যে অসংখ্য ভুল করে তার ভুরি ভুরি প্রমাণও রয়েছে। মানুষের 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি আজ যে বিষয়কে নির্ভুল বলে মনে করছে, কালের ব্যবধানে তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে মানুষ যে বানরের থেকে উদ্ভূত জাতি তা বেশ কিছু দিন বিজ্ঞানের জগতে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করলেও আজ তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে জীনের আবিষ্কারের ফলে পরিস্কার ভাবে জানা গেছে যে, মানুষের জীন ও বানরের জীন কোন ভাবেই এক নয়, বরং তা একেবারেই ভিন্ন। সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবে আজ প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ কক্ষনো বানরের বংশোদ্ভূত নয়। 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে মানুষ যে বানরের থেকে উদ্ভূত জাতি, এ দর্শন যে একেবারেই ভুল ছিল, তা আজ সর্বজন বিদিত। একই ভাবে 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক'দিন আগেও হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন থেমে গেলেই প্রাণীকে মৃত বলে ঘোষণা দেয়া হত। পক্ষান্তরে আজকাল এ থিউরী পরিবর্তিত হয়েছে। এখন সেই একই চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। মস্তিষ্কের কোষের নিষ্ক্রিয়তাই এখন মৃত্যুর চিহ্ন। হয়ত সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যে দিন এ থিউরিও পরিবর্তিত হবে। সুতরাং 'আকল বা বিবেক বুদ্ধি দ্বারা উদ্ভাবিত কোন জ্ঞান শাশ্বত সত্য ও নির্ভুল হতে পারে না। সে জন্য হাদীছের চেয়ে 'আকল বা বিবেক বুদ্ধিকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনার কোন সুযোগ নেই। 'আকল ও বিবেক বুদ্ধির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য কি না তা বিবেচনায় না এনে শর্তহীন ভাবে আল্লাহর আনুগত্যের মতই রাসূলুল্লাহ ছাল্লালাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য তথা তাঁর হাদীছ পরিপালনকে আল-কুরআনের ভাষায় মু'মিন হওয়ার জন্য অনিবার্য শর্ত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا.
'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোন মু'মিন পুরুষ কিংবা মু'মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে, সে তো স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে।' ২০৫ আল্লাহ আরো বলেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
"কিন্তু না, তোমার রাব্বের শপথ, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসস্বাদের বিচার ভার তোমার উপর অর্পণ না করে; অতপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।"২৩৬
সুতরাং মু'মিন থাকতে হলে বিশুদ্ধ হাদীছ প্রত্যাখ্যানের কোন সুযোগ নেই।
কেউ কেউ মতামত দিয়ে থাকেন যে, কয়েক লক্ষাধিক হাদীছ হতে অনেক হাদীছকে বাদ দিয়ে ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ হাহীহুল বুখারী সংকলন করে থাকলে, তিনি তো অনেক হাদীছই প্রত্যাখ্যান করেছেন, আমরা যদি বুখারীরও কিছু হাদীছ প্রত্যাখ্যান করি, তাহলে দোষের কি? এটিও মূলত বিশুদ্ধ হাদীছের বিরুদ্ধে এক জঘন্য ষড়যন্ত্র, এটি একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি। ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ একটি সংকলন তৈরির জন্য প্রথমে একটি মানদণ্ড স্থির করে নেন। সে মানদন্ডে উত্তীর্ণ হাদীছগুলোকে তাঁর সে সংকলনে সংকলিত করেন। ইমাম আল-বুখারী রাহিমাহুল্লাহ যে হাদীছগুলো বাদ রেখেছেন, তা তাঁর নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তির্ণ না হওয়ার কারণেই করেছেন। কিন্তু তিনি বলেন নি যে, এ সংকলিত হাদীছগুলোর বাইরে যা রয়েছে, সেই গুলো প্রত্যাখ্যাত। অপরদিকে অধিকাংশ মুহাদ্দিছের মত হচ্ছে, যে কোন মানদণ্ডে বুখারীর হাদীছগুলো ছাহীহ। সুতরাং বুখারীর কোন হাদীছ প্রত্যাখ্যান মূলত ছাহীহ প্রমাণিত হাদীছ প্রত্যাখ্যানেরই শামিল, যা মূলত পূর্বোল্লেখিত কুরআনের আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী ঈমানেরই পরিপন্থী।

টিকাঃ
২২০. আল-আশ'আরী, মাকালাতুল ইসলামিয়ীন, ১খ. ১০৬ পৃঃ
২২১. 'আফিফী আব্দুর রাজ্জাক, শুবহাতু হাওলাস্সুন্নাহ, সৌদী আরব, ১৪২৫ হিঃ, ১খ. ১৮ পৃঃ
২২২. ছাহীহ আল-বুখারী, ৫খ., ২৩৪১ পৃঃ
২২৩. প্রাগুক্ত
২২৪. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ৩১৯৯ পৃঃ
২২৫. সূরা আত্-তাওবাহ: ১০১
২২৬. ছাহীহ আল-বুখারী, ১খ., ৪৪৮ পৃঃ
২২৭. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ., ২২০০ পৃঃ উল্লেখ্য যে নবীদের শরীর মাটি ভক্ষন করতে পারবে না।
২২৮. ছাহীহ আল-বুখারী, ৪খ. ১৮৮১ পৃঃ
২২৯. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ২২৭০পৃঃ; মালিক ১খ.২৩৯ পৃঃ
২৩০. ছাহীহ আল বুখারী ৩খ. ১২২২ পৃঃ ও ৩খ.১২৭১ পৃঃ; ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ২১৯৪ পৃঃ
২৩১. সূরাহ ইয়াসিন ৭৮-৭৯
২০২. 'আফিফী আব্দুর রাজ্জাক, ১৮ হতে পরবর্তী পৃঃ
২০৩. ছাহীহ আল-বুখারী, ৩খ. ১৪১০ পৃঃ ও আত-তিরমিযী, ৫খ. ৩১৬ পৃঃ
২৩৪. সূরাহ আন-নাজম: ০৩-০৪
২৩৫. সূরাহ আল-আহযাব: ৩৬
২৩৬. সূরাহ আন-নিসা: ৬৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00