📄 পঞ্চম বিভ্রান্তি : জাল হাদীছের ছড়াছড়ি
বিভ্রান্তি: তাদের ভাষায়, জাল হাদীছের এত বেশি প্রচলন হয়েছে যে, আসল হাদীছ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর, সেজন্য ছাহীহ হাদীছের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে হাদীছ অনুসরণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অপনোদন : তাদের এ দাবী মোটেও সঠিক নয়। হ্যাঁ, বিপুল সংখ্যক জাল হাদীছ সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ নেই। তবে ইসলামের বিদগ্ধ মুহাদ্দিছিন রাহিমাহুমুল্লাহ বিজ্ঞানসম্মত ও সূক্ষ্ম মানদণ্ড নির্ধারণ পূর্বক তার আলোকে যাচাই বাছাই করে সকল ছাহীহ হাদীছকে জাল হাদীছ থেকে পৃথক করেছেন। তাঁদের সংকলিত এ ছাহীহ হাদীছসমূহের গ্রন্থরাজিও আমাদের মাঝে বিরাজমান। এমনকি দুর্বল সনদের হাদীছগুলোও চিহ্নিত হয়েছে, জাল হাদীছ দ্বারা যাতে কেউ বিভ্রান্ত না হয় সে জন্য জাল হাদীছ সমূহকে বিভিন্ন গ্রন্থে একত্রিতও করা হয়েছে। এর পরেও জাল হাদীছের বাহানা উত্থাপন করে আসল হাদীছকে বর্জন করা একেবারেই অযৌক্তিক।
📄 ষষ্ঠ বিভ্রান্তি : হাদীছের বর্ণনা শব্দভিত্তিক না হয়ে অর্থভিত্তিক হওয়ার অনুমোদন
বিভ্রান্তি : কুরআনের ভাষা পরিবর্তন অবৈধ। পক্ষান্তরে হাদীছের বর্ণনা অর্থ ভিত্তিক (روایة بالمعنی) হলেও তা অনুমোদিত। সেজন্য অনেক সময় হাদীছ বর্ণনাকারী সঠিক শব্দ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় হাদীছের ভাবার্থ পরিবর্তন হয়ে ভুল অর্থ প্রকাশ হওয়ার যথেষ্ট আশংকা থাকে, এতে হাদীছের বিশুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে হাদীছ অনুসরণের অপরিহার্যতা অযৌক্তিক।
অপনোদন: ইসলামের বিদগ্ধ মনীষীগণ হাদীছকে হুবহু শব্দ অপরিবর্তিত রেখে বর্ণনা করাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে সীমিত পর্যায়ে শর্ত সাপেক্ষে বিশেষ বিশেষ নিয়মনীতি অনুসৃত হলে, অর্থভিত্তিক বর্ণিত হাদীছ বর্ণনাকেও অনুমোদন করেছেন। সেক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর জন্য যে সমস্ত শর্ত অপরিহার্য করা হয়েছে, তাতে হাদীছ অর্থভিত্তিক বর্ণিত হলেও মূল অর্থ পরিবর্তিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। হাদীছ অর্থ ভিত্তিক বর্ণনার জন্য অনিবার্য শর্ত হচ্ছে, বর্ণনাকারীকে বিশুদ্ধ আরবী ভাষার শব্দার্থ, শব্দচয়ন পদ্ধতি, সমার্থবোধক শব্দজ্ঞান, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শব্দার্থ পরিবর্তনের নিয়মনীতি, শব্দালংকার, বাক্য বিন্যাস, প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। উল্লেখ্য যে, এ শর্ত পূর্ণ না হলে কোন বর্ণনাকারীর জন্য অর্থের আলোকে হাদীছ বর্ণনা বৈধ নয়। এ শর্ত পূরণ হলে হাদীছের অর্থ বিকৃত হওয়ার আশংকা একেবারেই থাকে না। এ প্রসংগে আয়িশা রাদিআল্লাহু 'আনহা এর বর্ণনা উল্লেখ করা যায়। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
عن هشام بن عروة عن أبيه قال قالت لي عائشة رضي الله عنها يا بني أنه يبلغنى أنك تكتب عنى الحديث تعود فتكتبه فقلت لها أسمعه منك على شيء ثم أعود فأسمعه على غيره فقالت هل تسمع في المعنى خلافا؟ قلت لا، قالت لا بأس بذلك.
'হিশাম ইবন 'উরওয়াহ তাঁর পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আয়িশা রাদিআল্লাহু 'আনহা 'উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর রাদিআল্লাহু 'আনহুকে বললেন যে, হে বৎস, আমাকে জানানো হয়েছে যে, তুমি আমার থেকে হাদীছ শুনে তা লিখে থাক; পরবর্তীতে এই একই হাদীছ পুনরায়ও লিখ? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি আপনার থেকে হাদীছ শুনি এবং পরে তা আপনার থেকে অন্য শব্দেও শুনে থাকি। আয়িশা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন- তুমি কি এ দুইয়ের অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখ? তিনি বললেন, না। তখন আয়িশা রাদিআল্লাহু আনহা বললেন, তাহলে কোন ক্ষতি নেই।'১০০ সুতরাং হাদীছের হুবহু শব্দ বর্ণনা না করে, অর্থ বর্ণনা করলে হাদীছের মূল অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে এ অভিযোগ যথাযথ নয়। সে জন্য এ ভ্রান্ত অভিযোগের উপর ভিত্তি করে হাদীছ অস্বীকার করা একেবারেই অযৌক্তিক।
আসলে হাদীছ অস্বীকার করার কুমন্ত্রনা ইসলামী শারী'আহকে ধ্বংস করার জঘন্য ষড়যন্তকারী ইসলাম বিদ্বেষীদের সৃষ্টি। যারা ঈমান বিধ্বংসী এ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে, অযৌক্তিক ও বাস্তবতা বর্জিত কিছু দলীল প্রমাণাদি উপস্থাপন করে, এর পক্ষে সাফাই গাইতে ব্যস্ত তারা মূলত বিভ্রান্তিতেই নিপতিত রয়েছে। মোটকথা, তাদের এ চিন্তা চেতনার কোন ভিত্তি নেই, তারা মূলত কুরআন, হাদীছ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর সতর্ক থাকা অপরিহার্য।
টিকাঃ
১০০. আল-খাতীব আল-বুগদাদী, আল-কিফায়াতু ফি 'ইলমির রিওয়ায়াহ, মদীনাহ মুনাওয়ারাহ, তাবি., ১খ. ২০৫ পৃঃ