📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 প্রথম বিভ্রান্তি : আল-কুরআনেই সবকিছু বিদ্যমান

📄 প্রথম বিভ্রান্তি : আল-কুরআনেই সবকিছু বিদ্যমান


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ
'আমি প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ কিতাব তোমার উপর অবতীর্ণ করলাম। '৯৭ সুতরাং তাদের ভাষায় স্পষ্টত ব্যাখ্যাস্বরূপ আল-কুরআন অবশিষ্ট থাকার পর, হাদীছ একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। তিনি অন্যত্র আরো ইরশাদ করেছেন:
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
'আমি কিতাবে কোন কিছুই বাদ দেইনি।'৯৮ কুরআনে যেহেতু কোন কিছুই বাদ দেয়া হয়নি, তাদের ভাষায় সেহেতু আমাদের চলার জন্য কুরআনই যথেষ্ট, হাদীছ একেবারেই নিষ্প্রয়োজন।
প্রথম বিভ্রান্তির অপনোদন: এখানে তারা দুইটি আয়াতকে তাদের সমর্থনে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের বিভ্রান্তি উন্মোচনের জন্য আয়াত দুটির পৃথকভাবে আলোচনা হওয়া জরুরী।
প্রথম আয়াত সম্পর্কে ভ্রান্তি অপনোদন: ১. মূলত ইলম দুই প্রকার। একটি হচ্ছে, দীনী ইলম ও অপরটি দীন বহির্ভূত ইলম। দীন বহির্ভূত ইলম কুরআনে থাকার কথা নয়। সেখানে রয়েছে শুধু দীনী 'ইলম। দীনী ইলম আবার দুই প্রকার: মূল ইলম ও প্রশাখা ইলম। কুরআনে সব কিছুর বর্ণনা রয়েছে দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, দীনী ইলমের সকল মূল বিষয় এখানে উল্লেখ রয়েছে, তবে দীনের শাখা-প্রশাখা জানার জন্য অবশ্যই কুরআনের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন। আর সেই প্রয়োজনীয় বস্তুটিই হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ। সেই বাস্তবতার আলোকেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে-
عن المقدام بن معد يكرب عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال : ألا إني أوتيت الكتاب ومثله معه لا يوشك رجل شبعان على أريكته يقول عليكم بهذا القرآن فما وجدتم فيه من حلال فأحلوه وما وجدتم فيه من حرام فحرموه ألا لا يحل لكم لحم الحمار الأهلي ولا كل ذي ناب من السبع....
'সাবধান! আল-কুরআন ও তার মতই কিছু আমাকে দেয়া হয়েছে। নিকটতম সময়েই কোন পরিতৃপ্ত ব্যক্তি আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বলবে, এ আল-কুরআন পরিপালনই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। এর মধ্যে যা হালাল পাবে, তা হালাল বলে গণ্য করবে; এর মধ্যে যা হারাম পাবে, তা হারাম বলে গণ্য করবে। সাবধান! তারা গৃহপালিত গাধা, প্রতিটি নখর বিশিষ্ট হিংস্র প্রাণী... তোমাদের জন্য যেন হালাল না করে। '১০০ এখানে কুরআনের মতই যা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া হয়েছে, সেটিই হচ্ছে হাদীছ। যারা হাদীছের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুধু কুরআনকে অনুসরণ করে, তারা যে মারাত্মক বিভ্রান্তির ভেতরে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাও এখানে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। তিমি এখানে তাদের থেকে সাবধানতা অবলম্বনেরও নির্দেশ দিয়েছেন।
২. কুরআনেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করারও নির্দেশ এসেছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে, ওহী ব্যতীত কোন কিছু বলেন না, তাও সেখানে পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ হয়েছে; এ বক্তব্য মূলত হাদীছ যে শারী'আতের উৎস তার প্রমাণ বহন করে। কুরআনে জাহান্নামের শাস্তির অনিবার্যতা অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ হয়েছে- وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ 'এবং সে মু'মিনদের রাস্তা ব্যতীত অন্য রাস্তাকে অনুসরণ করে। ১০১ অর্থাৎ মু'মিনরা যে রাস্তায় একত্রিত হয় সে রাস্তাই সঠিক রাস্তা। এ আয়াত ইজমা' যে শারী'আতের দলীল, তার ইংগিত দেয়। একই ভাবে ইসলামী শারী'আতে ইজতিহাদও কুরআনের আলোকেই স্বীকৃত। সুতরাং কুরআনে সবকিছু বর্ণিত রয়েছে এর অর্থ হচ্ছে, হাদীছ, ইজমা ও ইজতিহাদকে কুরআনের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করলে কুরআনে আর কোন কিছু অস্পষ্ট থাকবে না। ১০২ ইসলামী শারী'আতে হাদীছ, ইজমা ও ইজতিহাদ আল-কুরআন দ্বারাই স্বীকৃত। আর হাদীছ, ইজমা ও ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে ইসলামী শারী'আতে যা কিছু স্থান পেয়েছে তা কুরআনের প্রত্যক্ষ ইংগিতেই স্থান পেয়েছে। সুতরাং তা কুরআনেই রয়েছে বলে ধর্তব্য। সে কারণে ইসলামী শারী'আতের সব কিছু আল-কুরআনে রয়েছে বলে উল্লেখ হওয়ার অর্থ এ নয় যে, এ আয়াত শুধু কুরআনকেই ইসলামী শারী'আতের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করে। যদি তাই হত, তাহলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করাকে আল-কুরআন এত গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিত না। কুরআনের এরূপ আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনায় আনা ঠিক নয়। সমগ্র কুরআনকে একত্রিত করে বুঝার চেষ্টা করলে কুরআনের আসল বক্তব্য অনুধাবন করা সম্ভব। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য, তাঁর দায়িত্ব, কুরআনের দৃষ্টিতেই তাঁর মূল্যায়ন প্রভৃতি আলোচনা যে সকল আয়াতে উল্লেখ হয়েছে যার কিছু আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি, তার সবগুলো একত্রিত করে অধ্যয়ন করলে হাদীছ বাদ দিয়ে শুধু আল-কুরআন মানার এ প্রবণতা যে একেবারেই ভ্রান্ত তা স্পষ্ট হয়ে উঠে। বরং এ সব আয়াত পরিষ্কার ভাষায় হাদীছ পরিপালনের অনিবার্যতাকে জোরালোভাবে তুলে ধরে। যেমন আল্লাহর বাণী-
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
'এবং আমি তোমার প্রতি আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যাতে তারা চিন্তা করে।'১০০ এ আয়াতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম দায়িত্বই হচ্ছে, কুরআনের ব্যাখ্যাদান। এখানে উল্লেখিত আয়াত দ্বারা যদি একথা বুঝানো হয়ে থাকে যে, কুরআনে সবকিছু স্পষ্ট রয়েছে বলে এর কোন ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই, তা হলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল-কুরআন বুঝানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, এ ধরণের আয়াতের কি প্রয়োজন ছিল? মনে রাখা উচিত যে, এ আয়াতটিও কুরআনের অংশ, যে তা অস্বীকার করবে, সে সরাসরি কুরআনের অংশকেই অস্বীকার করল। তাছাড়া কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্য থাকলেও তা আরো স্পষ্ট করার জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দায়িত্ব দেয়ায় অসুবিধা কোথায়? যাই হোক কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের ব্যাখ্যাদানকারী। সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাদীছ কুরআনের ব্যাখ্যা বিধায় কুরআনের এ আয়াতই তা মেনে চলার স্পষ্ট নির্দেশনা দান করে। সেই কারণে কুরআনের শুধু এ একটি আয়াতের দিকে তাকিয়ে কুরআনে সব কিছুর বর্ণনা আছে মনে করে, হাদীছ বর্জন করা স্পষ্ট বিভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়।
দ্বিতীয় আয়াত সম্পর্কে ভ্রান্তি অপনোদন: আল্লাহর বাণী 'আমি কিতাবে কোন কিছুই বাদ দেইনি।' এ দ্বারা আল-কুরআনে সবকিছু রয়েছে বিধায় হাদীছ নিষ্প্রয়োজন এ ধারণা অবান্তর। এখানে মূলত কিতাব বলতে লাওহি মাহফুজকে বুঝানো হয়েছে, কুরআনকে নয়। অর্থাৎ লাওহি মাহফুজে কোন কিছুই সন্নিবেশিত হতে বাদ নেই, এ আয়াতের বক্তব্য এটাই। সুতরাং এ আয়াত দ্বারা কুরআনে সবকিছুই আলোচিত হয়েছে বলে হাদীছ নিষ্প্রয়োজন, এ দাবী কোন ক্রমেও সঠিক নয়। উল্লেখ্য যে, এ আয়াতটি হিজরাতের পূর্বে মক্কাতেই অবতীর্ণ হওয়া সূরাহ আল-আন'আমেরই অন্তর্ভুক্ত। ইসলামের অধিকাংশ বিধি বিধান তো হিজরাতের পরে মদীনাতে অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে 'কিতাব' অর্থ যদি আল-কুরআন মনে করা হয়, তাহলে এ দ্বারা মদীনায় অবতীর্ণ কুরআনের অংশ ব্যতীতই মক্কায় অবতীর্ণ কুরআনেই সব কিছু রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। তাহলে মদীনায় অবতীর্ণ হওয়া কুরআনও তো তাদের দৃষ্টিতে হাদীছের মতই অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হওয়া দরকার ছিল; আর যদি তা-ই হত তাহলে আল-কুরআনের একটি অংশ অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য হত, আর তা হতো একেবারেই অযৌক্তিক। সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমাণিত যে, এখানে কিতাবে সবকিছুই রয়েছে বলে যে উল্লেখ হয়েছে, তা দ্বারা মূলত লাওহি মাহফুজকেই বুঝানো হয়েছে, কুরআনকে নয়। সেজন্য অধিকাংশ তাফসীরকারকই এখানে 'কিতাব' বলতে লাওহি মাহফুজকেই বুঝিয়েছেন।১০৪ সেই প্রেক্ষাপটে এ আয়াত দ্বারা কুরআনে সব কিছু রয়েছে বলে প্রমাণ উপস্থাপন করে হাদীছ অস্বীকার করার কোন যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অপরপক্ষে অগণিত আয়াতই তো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল কর্মকাণ্ড ও হাদীছ গ্রহণ ও অনুসরণ করাকে অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। একইভাবে এসব আয়াত তো হাদীছ অস্বীকার করাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কারও করেছে, যা আমরা ইতোপূর্বেই আলোচনা করেছি। সুতরাং যারা এসব অযৌক্তিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করে হাদীছকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখায় তারা বিভ্রান্ত, সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তারা এজন্যই ব্যর্থ হয়েছে যে একই বিষয়ে কুরআনের যত আয়াত এসেছে তা এক সাথে একত্রিত করে তারা তা অনুধাবনের চেষ্টা করে নি। আমাদের বিশ্বাস, যদি একই বিষয়ের সকল আয়াতকে সম্মুখে রেখেই হাদীছ অস্বীকারকারীরা আল-কুরআন বুঝার চেষ্টা করত, তাহলে তারা বিভ্রান্ত হতো না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এ পথভ্রষ্ট বিভ্রান্তরা কুরআনের অনুসারী বলে দাবী করলেও, তারা আসলে কুরআনকে অনুসরণ করা থেকেও যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। তাহলে দিবালোকের মত পরিষ্কার হলো যে, এখানে উল্লেখিত আয়াত দুটি কুরআনকে যথেষ্ট মনে করে হাদীছ বর্জন করার দলীল যথাযথ নয়।

টিকাঃ
৯৭. সূরাহ আন-নাহল: ৮৯
৯৮. সূরাহ আল-আন'আম: ৩৮
৯৯. আর-রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, ৯খ.,৪৪৯ পৃঃ (উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রঃ)
১০০. আবু দাউদ, ৪খ., ২০০ পৃঃ
১০১. সূরাহ আন-নিসা: ১১৫
১০২. আয-যামাখশায়ী, আল-কাশশাফ, তাবি., ১খ.৪৬৩ পৃ:, (উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্র:)
১০৩. সূরাহ আল- নাহল: ৪৪
১০৪. আস-সুয়ূতী, জালাল উদ্দীন, ওয়াল মাহাল্লী, সূরাহ আল-আন'আমের উক্ত ৩৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 দ্বিতীয় বিভ্রান্তি : রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনেও ভুলভ্রান্তি বিদ্যমান

📄 দ্বিতীয় বিভ্রান্তি : রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনেও ভুলভ্রান্তি বিদ্যমান


তাদের ভাষায়, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনেও ভুলভ্রান্তি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং হাদীছও ভুল হতে পারে। সেজন্য তা গ্রহণযোগ্য নয়। তারও যে ভুলভ্রান্তি রয়েছে তার প্রমাণ হচ্ছে-
ক. খেজুর বৃক্ষের নিষেককরণ (Fecundation) :
তাদের ভাষায়, কখনো কখনো তাঁর দৃষ্টিভংগি যে ভুল ছিল, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। যেমন তিনি খেজুর গাছের পুং কেশরকে স্ত্রী কেশরের সাথে মিলাতে নিষেধ করার কারণে ফলন কমে যাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, এটি তো আমি ধারণা করেই বলেছিলাম। আর ধারণা ভুলও হতে পারে, সঠিকও হতে পারে। যেমন এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
فإني إنما ظننت ظنا فلا تواخذوني بظنى
'এটি ছিল আমার একটি ধারণা, আমার কোন ধারণার ব্যাপারে আমাকে ধরো না।'১০৫
সুতরাং যেহেতু তিনি ভুল করেন, সেহেতু তাঁর থেকে উৎসারিত কোন হাদীছের অনুসরণ অপরিহার্য হওয়া বাস্তব নয়।
আসলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ কথার বাস্তব রূপ উপলব্ধি করতে হলে, এ হাদীছের বিস্তারিত বর্ণনা অনুধাবন করা জরুরী। বর্ণনাটি হচ্ছে-
عن موسى بن طلحة عن أبيه قال مررت مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بقوم على رءوس النخل فقال : ما يصنع هؤلاء. فقالوا يلقحونه يجعلون الذكر في الأنثى فيلقح. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أظن يغنى ذلك شيئا. قال فأخبروا بذلك فتركوه فأخبر رسول الله صلى الله عليه وسلم بذلك فقال: إن كان ينفعهم ذلك فليصنعوه فإنى إنما ظننت ظنا فلا تؤاخذوني بالظن ولكن إذا حدثتكم عن الله شيئا فخذوا به فإني لن أكذب على الله عز وجل.
'মূসা ইবন তালহা তাঁর পিতা রাদী আল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এ অবস্থায় যাচ্ছিলাম যে, একটি সম্প্রদায়ের লোকেরা খেজুর বৃক্ষের মাথায় কাজ করছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা কি করছে? তারা বলল- তারা তালকীহ্ তথা খেজুর গাছের পুং কেশর স্ত্রী কেশরের সাথে মিলিয়ে নিষেক (Fecundation), বা গর্ভাধান করছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আমি ধারণা করছি, এতে কোন লাভ নেই, তাদেরকে এ বিষয়ে জানিয়ে দাও। তারা (এ কথা শুনে) এ কাজ বর্জন করল। এ বিষয়ে তাকে সংবাদ দেয়া হলে, তিনি বললেন- এ দ্বারা যদি তারা লাভবান হয়, তাহলে তারা এটা করবে, কেননা আমি এটা ধারণা করেছি, আর ধারণার বিষয়ে আমাকে পাকড়াও করো না। পক্ষান্তরে আমি আল্লাহ সম্পর্কে যা বলি, সে বিষয়ে আমাকে পাকড়াও করতে পার, আর আমি আল্লাহ সম্পর্কে মূলত কোন মিথ্যা বলি না।'১০৬
ভ্রান্তি অপনোদন :
একটু চিন্তা করলে এ হাদীছের আলোকে এ কথাই স্পষ্ট হয় যে, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এখানে ঘোষণা দিয়েছেন, ওহীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি ধারণার বশীভূত হয়ে কোন কিছু বলেন না। এখানে নিষেকের ক্ষেত্রে তিনি যা বলেছেন, তা ধারণার উপর ভিত্তি করে বলার স্বতস্ফূর্ত স্বীকৃতিও তিনি দিয়েছেন। সুতরাং এ কথা হাদীছ অস্বীকারকারীদের পক্ষের প্রমাণ নয় বরং তাদের বিপক্ষীয়দেরই প্রমাণ হতে পারে। কেননা এখানেও স্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে, তিনি ধারণা করে কিছু বললে তা অনুসরণীয় না হলেও, ওহীর উপর ভিত্তি করে কিছু বললে তা অবশ্যই অনুসরণীয়। তাঁর হাদীছ যেহেতু কুরআনের দৃষ্টিতেই ওহী” সেহেতু তা অবশ্যই ভুল ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে। আর ভুল ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে হওয়ার কারণেই তাঁর হাদীছ অবশ্যই অনুসরণীয়। ধারণার উপর ভিত্তি করে বিশেষ একটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সিদ্ধান্ত দিলেন। তার এ সিদ্ধান্ত ওহী ভিত্তিক ছিল না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দেয়ার পরেও, এ ঘটনাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর জীবনের হাজার হাজার ওহী ভিত্তিক হাদীছকে অস্বীকার করা কস্মিন কালেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি স্পষ্টত একটি বিভ্রান্তি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামও ভুল করেন' এটা প্রমাণের জন্য তারা একটি হাদীছের উপরই নির্ভর করেছেন, যে হাদীছকেই তারা অস্বীকার করেন, এটা একটা হাস্যকর ও স্ববিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ দলীল দ্বারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ অস্বীকার করা একেবারেই অযৌক্তিক। বরং হাদীছও একদিকে যেমন ওহী ভিত্তিক তারও প্রমাণ অপরদিকে হাদীছও ওহী হওয়ার কারণে তা অবশ্যই অনুকরণীয় এ হাদীছ তারও জাজ্জ্বল্য প্রমাণ।
খ. বদর যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যের স্থান নির্ধারণ : রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য সমাবেশের জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করেন। পরবর্তীতে জনৈক ছাহাবী রাদি আল্লাহু 'আনহু তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ স্থান কি আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছে, না এটি আপনার নিজস্ব মত? তিনি বললেন- এটি আমার নিজস্ব মত। তখন উক্ত ছাহাবী রাদি আল্লাহু 'আনহু অন্য একটি স্থানকে যুদ্ধ কৌশলের জন্য আরো উত্তম বলে পরামর্শ দিলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা গ্রহণ করলেন। সে অনুযায়ী তিনি ছাহাবীর পরামর্শ দেয়া স্থানেই সৈন্য সমাবেশ করেন। এ ঘটনা তাদের ভাষায়, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন তার প্রমাণ। সুতরাং তাঁর হাদীছও নির্ভুল হবে না এটাই স্বাভাবিক।
ভ্রান্তি অপনোদন: এ ঘটনায় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করেই বললেন যে, এটি ওহী নয়, এটি আমার নিজস্ব মত। এ দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এটা ছিল একটা পার্থিব বিষয়, যা ওহী সংশ্লিষ্ট নয়। সুতরাং এটি ওহী ছিল না। তাঁর জীবনের পার্থিব বিষয়ের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের অসংখ্য হাদীছ যা ওহী, যা নির্ভুল বলে প্রমাণিত; তাকে অস্বীকার করা কোন ক্রমেও যৌক্তিক হতে পারে না। এ ঘটনা কুরআনে উল্লেখ হয়নি। যেহেতু ঐ পক্ষ আল-কুরআন ব্যতীত অন্য কিছুকে মানে না, সে জন্য এ ঘটনাকে তাদের পক্ষের দলীল হিসাবে উপস্থাপন করার কোন অধিকারও তাদের নেই। পার্থিব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য ছাহাবী রাদি আল্লাহু 'আনহুর পরামর্শ নিয়েছেন। নিজের মতের উপর দৃঢ় না থেকে, তাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করেছেন। এটি মূলত ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় যে পরামর্শকে অপরিসীম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তারই প্রমাণ বহন করে। নিজেই নিজস্ব মতের চেয়ে অন্যের মতকে উত্তম মনে করে গ্রহণ করার অর্থ এ নয় যে, তিনি ভুলের মধ্যে থাকার কারণেই অন্যের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সুতরাং ইহলৌকিক বিষয়ের এ ঘটনাকে খালিছ ওহী অর্থাৎ হাদীছ অস্বীকার করার দলীল হিসাবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
গ. বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাজা প্রদান:
রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদরের যুদ্ধবন্দিদের সাজা কি হবে, এ প্রসংগে ছাহাবীদের পরামর্শ আহবান করেন। 'উমার রাদি আল্লাহু 'আনহু এদেরকে হত্যা করার পরামর্শ দিলেন। আবু বাকর রাদি আল্লাহু 'আনহু অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করার পক্ষে মত দিলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বাকর রাদি আল্লাহু 'আনহু এর মত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে উমার রাদি আল্লাহু 'আনহু এর মতের পক্ষেই আল-কুরআন অবতীর্ণ হলো। তিনি সে ওহী অনুযায়ী তাদের সাজা বাস্তবায়ন করেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মতকে গ্রহণ করেছিলেন আল-কুরআন তার বিপরীত অবতীর্ণ হওয়ায় ১০৮ প্রমাণিত হয় যে, তাঁর মত সঠিক ছিল না। যেহেতু তাঁর মত সঠিক না হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেল, সেহেতু তাঁর হাদীছও সন্দেহমুক্ত নয়। সে কারণে তাঁর হাদীছ আমল করা অপরিহার্য নয়।
ভ্রান্তি অপনোদন:
আসলে পূর্ববর্তী ঘটনাটি তো হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত। এটা হাদীছ অস্বীকারকারীদের পক্ষে দলীলই হতে পারে না। তারপরেও গভীরভাবে অনুধাবন করলে পরিষ্কার হয় যে, এটি হাদীছ অনুসরণকে যারা অপরিহার্য মনে করেন, তাদের পক্ষেরই দলীল। রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দীনী বিষয়ে কোন কিছু ভুল করলে, আল্লাহ তাঁকে সাথে সাথে ওহীর মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা করেন, এ ঘটনা তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। সুতরাং কোন দীনী বিষয়ে ভুলের উপর তাঁর প্রতিষ্ঠিত থাকার কোন সুযোগই ছিল না। এমন কি দীনের অপরিহার্য অংশ নয়, এমন কোন ক্ষেত্রেও তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিলে, তাও ওহীর দ্বারা সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এ ঘটনা তারই দলীল। অন্য ঘটনা হচ্ছে তাঁর নিজের স্ত্রীকে খুশী করার জন্য একটি হালালকে নিজের জন্য হারাম করার শপথ নেয়ার ঘটনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاةَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
'হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন, তুমি তা নিষিদ্ধ করছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছো, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '১০৯ এ আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, তাঁর কোন ভুল অবশিষ্ট থাকার সুযোগ নেই। সেজন্য তাঁর হাদীছ যে সন্দেহমুক্ত তা সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমাণিত। সেই কারণেই হাদীছ অনিবার্য পালনীয়। একে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং বদরের যুদ্ধবন্দির ঘটনা বিপক্ষীয় দলের স্বপক্ষের দলীল হতে পারে না। পরিশেষে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনেও ভুলভ্রান্তি লক্ষ্যণীয় প্রমাণের মাধ্যমে যারা হাদীছ অস্বীকার করার যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, মূলত এ বিষয়ে তাদের স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণেই তা করেছে। এগুলো, আসলে তাদের বিপক্ষীয়দের দলীল। এগুলো বরং হাদীছ পরিপালন যে অপরিহার্য সেই বাস্তবতারই জ্বলন্ত প্রমাণ।

টিকাঃ
১০৫. আশ-শাশী, আবু সা'ঈদ আল-হায়ছাম, মুসনাদুশ শাশী, মাদীনাহ মুনাওয়ারাহ, ১৪১০হি, ১খ. ৬৯ পৃঃ
১০৬. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ১৮৩৫পৃঃ
১০৭. সূরাহ আন-নাজম: ৪৩
১০৮. সূরাহ আল-আনফাল: ৬৭-৬৯
১০৯. সূরাহ আত-তাহরীম: ০১ ও পরবর্তী আয়াতসমূহ

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 তৃতীয় বিভ্রান্তি : হাদীছ লেখা নিষিদ্ধ হওয়ায় দুর্বল ও জাল হাদীছের প্রচলন

📄 তৃতীয় বিভ্রান্তি : হাদীছ লেখা নিষিদ্ধ হওয়ায় দুর্বল ও জাল হাদীছের প্রচলন


এ প্রসংগে তারা যে দলীল উপস্থাপন করে তা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
عن أبي سعيد الخدري أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لا تكتبوا عني ومن كتب غير القرآن فليمحه....
'তোমরা আমার কোন কিছু লিখবে না, যে আল-কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখেছে তা মুছে ফেলবে...।' ১১০
তাদের ভাষায়, হাদীছ যদি শারী'আতের উৎসই হত তাহলে তাকেও গুরুত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখানোর ব্যবস্থা করতেন। যেহেতু তিনি তা না করে বরং তা লিখতে নিষেধ করলেন, সেহেতু হাদীছ অনুসরণ অপরিহার্য নয়। না লেখার কারণে অনেক দা'য়ীফ বা দুর্বল হাদীছ এমনকি জাল হাদীছও হাদীছের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেছে। যে কারণে হাদীছসমূহের অংশ বিশেষ সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়েছে। সে জন্য হাদীছ অনুসরণ অপরিহার্য হওয়ার বিষয়টি প্রশ্ন বিদ্ধ হওয়ায়, এখন আর হাদীছ অনুসরণ অপরিহার্য নয়।
ভ্রান্তি উন্মোচন: রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর আল-কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালে, সবার জন্য হাদীছ লেখাকে অনুমোদন দিলে হাদীছ ও কুরআনের সংমিশ্রণ হওয়ার আশংকা ছিল। এটি ছিল মূলত ইসলামী শারী'আতের মূল উৎস আল-কুরআনের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় আকারের ঝুঁকি। সে জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যৌক্তিক কারণেই হাদীছ লেখাকে সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করেননি।”১১১ আল-কুরআন লেখকের স্বল্পতা, লেখনী উপকরণের অপ্রতুলতাও প্রথম যুগে হাদীছ না লেখার কারণ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এখানে উল্লেখিত এ একটি হাদীছ ছাড়াও কিছু হাদীছ দ্বারা হাদীছ লেখা নিষিদ্ধ করার প্রমাণ পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে এমন অনেক হাদীছ রয়েছে, যা স্পষ্টত হাদীছ লেখা যে নিষিদ্ধ ছিল না, তার প্রমাণ বহন করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাদীছ হচ্ছে, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর রাদি আল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীছ লেখার ব্যাপারে জানতে চাইলে, তিনি বলেন-
اكتب فوالذي نفسي بيده ما خرج مني إلا حق.
'লেখ, যার হাতে আমার নাফস তাঁর শপথ, আমার মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া কিছুই বের হয় না। ১১২
ছাহাবাহ রাদি আল্লাহু আনহুমের মধ্যে কেউ কেউ যে হাদীছ লিখতেন, তারও প্রমাণ রয়েছে, যেমন বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن منبه يعني وهبا عن أخيه سمعت أبا هريرة يقول ليس أحد أكثر حديثا عن رسول الله صلى الله عليه وسلم مني إلا عبد الله بن عمرو فإنه كان يكتب وكنت لا أكتب.
'ওয়াহাব ইবন মুনাব্বাহ তাঁর ভাইয়ের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি আবূ হুরাইরা রাদি আল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছেন, আবদুল্লাহ ইবন 'আমর রাদি আল্লাহু আনহু ব্যতীত অন্য কেউ আমার চেয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীছ বেশি জানতেন না, কেননা, তিনি হাদীছ লিখতেন আর আমি লিখতাম না।১১৩ মাক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুতবাহ শ্রবণ করে ইয়ামানের এক ব্যক্তি এটা লিখে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুরোধ জানালেন। তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তা লিখে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اكتبوا لأبي شاه.
'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু শাহ এর জন্য এটি লিখে দাও। ১১৪
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হাদীছ লেখার নিষেধকৃত হাদীছের চেয়ে লেখার অনুমোদন দেয়ার হাদীছের সংখ্যাই বেশি। শুধু তাই নয় আবু সা'ঈদ আল-খুদরীর রাদি আল্লাহু 'আনহু পূর্বোল্লেখিত যে হাদীছ দ্বারা হাদীছ লেখা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ দেয়া হয়, তা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীছ নয় বলেও ইমাম আল বুখারী রাহিমাহুল্লাহ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। সে দৃষ্টিতে এটি কোন অকাট্য দলীল নয়।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ কুরআনের মত গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই এটাকে তিনি লিপিবদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন, এ অভিযোগ সত্য নয়।
হাদীছ না লেখার কারণেই হাদীছে দুর্বল হাদীছ ও জাল হাদীছের অনুপ্রবেশের যে অভিযোগ উঠেছে তাও ভিত্তিহীন, কেননা হাদীছ ব্যাপকভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার পূর্বে নয় বরং লিপিবদ্ধ হওয়ার যুগেই মূলত জাল হাদীছ রচনার দুঃখজনক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে বলে প্রমাণিত। আর এটি মূলত ইসলামের শত্রুদেরই ষড়যন্ত্রের ফসল। সুতরাং নির্ধারিত যুগে হাদীছ লিপিবদ্ধ হয়নি বলে, জাল হাদীছ ও দা'য়ীফ হাদীছের বেশি ছড়াছড়ি দেখা দেয়, এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। এ দ্বারা হাদীছকে কেন্দ্র করে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই।

টিকাঃ
১১০. ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ২২৯৮ পৃঃ
১১১. আল-'আসকালানী, ফাতহুল বারী, বায়রূত, ১৩৭৯ হি. ১খ. ২০৮ পৃ.
১১২. আহমাদ, ২খ. ১৬২ পৃ.
১১৩. প্রাগুক্ত, ২খ. ৪০৩ পৃ.
১১৪. ছাহীহ আল বুখারী, ২খ. ৮৫৭ পৃ.

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 চতুর্থ বিভ্রান্তি : ছাহাবীদের হাদীছ বিমুখতা ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণে অবহেলা

📄 চতুর্থ বিভ্রান্তি : ছাহাবীদের হাদীছ বিমুখতা ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণে অবহেলা


বিভ্রান্তি : তাদের ভাষায়, ইসলামে হাদীছ গুরুত্বহীন বলেই ছাহাবীগণ রাদি আল্লাহু আনহুম হাদীছ চর্চা থেকে বিরত ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণকেও গুরুত্ব দিতেন না। সুতরাং হাদীছ গুরুত্বহীন। একে তেমন গুরুত্ব না দিলেও চলে।
ভ্রান্তি অপনোদন ৪ এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা। বরং ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছকে মুখস্থ রাখা ও তা কার্যে পরিণত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন। তাঁর যে কোন কাজ ও কথাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নে তাঁরা ছিলেন খুবই তৎপর। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাদীছকে যে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতেন, প্রমাণ হিসাবে কিছু উদাহরণ এখানে উপস্থাপন করা হল-
ক. পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য লাভের কর্মসূচী গ্রহণ: নিজের অন্য দায়দায়িত্ব ও কর্মব্যস্ততার কারণে একজন ছাহাবী রাদি আল্লাহুর পক্ষে সকল সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য লাভ করা সম্ভবপর হত না। তাঁর সমগ্র কর্মকাণ্ডই ছিল ছাহাবীদের জন্য অনুকরণীয়। যাতে নিজেদের অনুপস্থিতির কারণে তাঁর কোন কাজকর্ম অগোচরে না থেকে যায়, সে জন্য ছাহাবীরা পালাক্রমে তাঁর সাহচর্য গ্রহণ করতেন। কেউ না কেউ তাঁর সাথে থাকার চেষ্টা করতেন। ইমাম আল বুখারী রাহিমাহুল্লাহ 'উমার ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহু 'আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন-
عن عمر قال : كنت أنا وجار لي من الأنصار في بني أمية بن زيد وهي من عوالي المدينة وكنا نتناوب الترول على رسول الله صلى الله عليه وسلم ينزل يوما وأنزل يوما فإذا نزلت جئته بخبر ذلك اليوم من الوحي وغيره وإذا نزل فعل مثل ذلك .
'মদীনার একপ্রান্তে অবস্থিত বানু উমাইয়্যাহ ইবন যায়িদ গোত্রের আমার এক আনসার প্রতিবেশী ও আমি পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যাওয়া আসা করতাম। আমি একদিন যেতাম, তিনি অন্যদিন যেতেন। আমি গেলে সেই দিনের ওহী ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল কাজ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করতাম। আর তিনি গেলে একই ভাবে তিনি সেই দিনের ওহী ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করতেন।'১১৫ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কার্যক্রম তথা হাদীছের কোন অংশ যাতে নিজেদের অগোচরে না থেকে যায়, সে বিষয়ে ছাহাবীগণ যে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন এ ঘটনা তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ। এরপরেও তাদের এ দাবীর কোন ভিত্তি রয়েছে কি?
খ. রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুকরণে জুতা বর্জন: বর্ণিত হয়েছে-
عن أبي سعيد الخدري إن رسول الله صلى الله عليه وسلم صلى فخلع نعليه فخلع الناس نعالهم فلما انصرف قال لم خلعتم نعالكم؟ فقالوا: يا رسول الله رأيناك خلعت فخلعنا قال إن جبريل أتاني فأخبرني أن بهما خبثا.
'আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী রাদি আল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথীদের নিয়ে ছালাত আদায় করছিলেন। হঠাৎ তিনি জুতা খুলে ফেললেন। তাঁকে দেখে ছাহাবী রাদি আল্লাহু আনহুমও তাঁদের জুতা খুলে ফেললেন। ছালাত শেষ হলে তিনি ছাহাবীদেরকে বললেন, কোন্ কারণ তোমাদেরকে জুতা খুলতে বাধ্য করল? তাঁরা বললেন, আপনাকে আমরা জুতা খুলে ফেলতে দেখেছি। তখন তিনি বললেন, জিবরাইল আমাকে আমার জুতায় ময়লা রয়েছে বলে সংবাদ দিয়েছিলেন। '১১৬ ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তথা তাঁর হাদীছ ও কাজকর্মকে অবমূল্যায়ন ও উপেক্ষা করেননি। বরং তাঁরা সন্দেহাতীত ভাবে তাঁর সকল কিছুকেই অনুকরণ করতেন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে, এ ঘটনা। এরপরেও কি হাদীছ বিদ্বেষীদের অভিযোগের কোন মূল্য রয়েছে?
গ. রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আংটি পরিধান ও বর্জন: বর্ণিত হয়েছে যে-
عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يلبس خاتما من ذهب فنبذه فقال لا ألبسه أبدا فنبذ الناس خواتيمهم.
'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বর্ণের আংটি পরিধান করা শুরু করলে, আছহাব রাদি আল্লাহু আনহুমও তাঁদের আংটি স্বর্ণ দ্বারা বানিয়ে পরিধান শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিক্ষেপ করলেন এবং যখন এ ঘোষণা দিলেন যে, আমি আর কখনো তা পরিধান করব না, তখন লোকেরাও তা নিক্ষেপ করলেন।১১৭ ছাহাবাহ রাদি আল্লাহু আনহুম হাদীছ বিমুখ ছিলেন ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণকে গুরুত্ব দিতেন না বলে যারা হাদীছের গুরুত্বকে ভূলুণ্ঠিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে তাদের দাবী একেবারেই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তার নির্ভেজাল অনুকরণ ও আনুগত্যের এ রূপ অসংখ্য সত্য ঘটনা ছাহাবা রাদি আল্লাহু আনহুম যে তাঁর যথার্থ অনুসারী ছিলেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ পেশ করে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছকেও যে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, এর আরো জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে-
১. রাত্রিতে মহিলাদের মাসজিদে আগমন বর্ণিত হয়েছে -
عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا تمنعوا النساء من الخروج إلى المساجد بالليل . فقال ابن لعبد الله بن عمر لا ندعهن يخرجن فيتخذنه دغلا. قال فزبره ابن عمر وقال أقول قال رسول الله - صلى الله عليه وسلم وتقول لا ندعهن
'ইবন 'উমার রাদিআল্লাহু আনহুমা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা রাত্রিতে মহিলাদেরকে মাসজিদে আসতে বাধা দেবে না। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের ছেলে (এ কথা শুনে) বললেন, আমরা তাদেরকে বাইর হতে দেব না। কেননা তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। তিনি তার মুখে থাপ্পড় দিয়ে বললেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ বলছি, আর তুমি বলছ, তাদেরকে আমরা বাইর হতে দেব না!'১১৮ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছের বিরোধিতা করার কারণে ইবন 'উমার তাঁর ছেলেকে যে শক্ত ভাষায় সতর্ক করেছিলেন, আর তিনিও যে একথা শ্রবণের পর টু শব্দটিও করলেন না, এটা ছাহাবীদের রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছের প্রতি আনুগত্যেরই জাজ্জ্বল্য প্রমাণ।
২. হাদীহুই ছালাতসমূহের রাক'আতের সংখ্যা নির্দেশক বর্ণিত হয়েছে -
عمران بن حصين جالس فذكروا عنده الشفاعة فقال رجل من القوم يا أبا نجيد لتحدثونا بأحاديث ما نجد لها أصلا في القرآن، فغضب عمران بن حصين وقال الرجل قرأت القرآن؟ قال: نعم. قال وجدت فيه صلاة المغرب ثلاثا وصلاة العشاء أربعا وصلاة الغداء ركعتين والأولى أربعا والعصر أربعا؟ قال: لا. قال فعمن أخذتم هذا الشأن ألستم وأخذناه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم؟
'ইমরান ইবন হুছাইন রাদিআল্লাহু আনহু বসা অবস্থায় ছিলেন। লোকেরা তাঁর নিকট শাফা'আতের প্রসংগ উল্লেখ করলেন। উপস্থিত জনগণ থেকে একজন বললেন, হে আবূ নুজায়ীদ, আপনি আমাদেরকে এ হাদীছ বলছেন, যার মূল আমরা কুরআনে পাই না। তখন 'ইমরান রাগান্বিত হয়ে ঐ ব্যক্তিকে বললেন, আপনি কি আল-কুরআন পাঠ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তখন 'ইমরান বললেন, আপনি কি সেখানে 'ইশার ছালাত চার, মাগরিবের ছালাত তিন, ফজরের ছালাত দুই, জোহরের ছালাত চার এবং আছরের ছালাত চার রাক'আত করে পেয়েছেন? তিনি বললেন, না। ইমরান বললেন, আপনি এটি কার নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন? আপনি কি এটা আমাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি, যা আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে গ্রহণ করেছি?'১১৯ সুতরাং আছহাব রাদি আল্লাহু আনহুমের সময় কুরআনকেই মূল্যায়ন করে হাদীছকে উপেক্ষা করা হত, এ দাবী সঠিক নয়।
৩. পাথর নিক্ষেপ নিষিদ্ধকরণ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن عبد الله بن مغفل أنه رأى رجلا يخذف فقال له : لا تخذف فإن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن الخذف أو كان يكره الخذف وقال إنه لا يصاد به صيد ولا ينكأ به عدو ولكنها قد تكسر السن وتفقأ العين ثم رآه بعد ذلك يخذف فقال له أحدثك عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه نهى عن الخذف أو كره الخذف وأنت تخذف ؟ لا أكلمك كذا وكذا !
""আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল রাদি আল্লাহু 'আনহু এক ব্যক্তিকে ছোট পাথর নিক্ষেপ করতে দেখে বললেল, তুমি পাথর নিক্ষেপ করনা, কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাথর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন, অথবা পাথর নিক্ষেপকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি বলেছেন, এ দ্বারা কোন কিছু শিকার করাও যায় না এবং শত্রুও হত্যা করা যায় না, তবে এটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলে এবং চক্ষু কানা করে দেয়। এর পরেও ঐ ব্যক্তি পাথর নিক্ষেপ করছিল। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ বলছি যে, তিনি এটাকে নিষেধ করেছেন অথবা তিনি এটাকে ঘৃণা করতেন, তারপরেও তুমি এটা করছ? আমি এরূপ কথা আর তোমাকে বলব না!'১২০ এ দ্বারা হাদীছ অবজ্ঞাকারীকে শক্ত ভাষায় সতর্ক করা হয়েছে। এ ঘটনাটি হাদীছকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আছাহাব রাদি আল্লাহু 'আনহুম যে শক্ত অবস্থানে ছিলেন তার প্রমাণ বহন করে।
আসল কথা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবীগণ রাদি আল্লাহু 'আনহুম হাদীছকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। হাদীছকে সম্মান করা, বাস্তবায়ন করা, সংরক্ষণ করা ও প্রচার করার ক্ষেত্রে তাদের একাগ্রতা ও আন্তরিকতার সামান্য ঘাটতি ছিল না। হাদীছের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল বিশিষ্ট কিছু ছাহাবী রাদি আল্লাহু 'আনহুমের বক্তব্যে তার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন-
১. আবূ বাকর আছ-ছিদ্দীক রাদি আল্লাহু 'আনহু তিনি বলেন-
" لست تاركاً شيئاً كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يعمل به ، إلا عملت به فإني أخشى إن تركت شيئاً من أمره أن أزيغ . "
'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা আমল করতেন, আমি তা থেকে কিছুই বর্জন করি না, বরং তা আমল করি। আমি ভয় করি যে, যদি আমি এ থেকে কিছু পরিহার করি, তাহলে আমি পথভ্রষ্ট হব।'১২১
২. উমার ইবনুল খাত্তাব রাদি আল্লাহু 'আনহু তিনি আল-হাজরুল আসওয়াদ চুম্বন করার সময় যে ঐতিহাসিক বাণীটি উচ্চারণ করেন তা মূলত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ ও সুন্নাহ পালনে তাঁর দৃঢ়তার কথা স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি বলেন-
إني أعلم أنك حجر لا تضر ولا تنفع ولولا أني رأيت النبي صلى الله عليه و سلم يقبلك ما قبلتك.
'আমি জানি তুমি একটি পাথর মাত্র, ভালমন্দ কিছুই করতে পারো না, আমি যদি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমিও তোমাকে চুম্বন করতাম না।''১২২
৩. 'আলী ইবন আবি তালিব রাদি আল্লাহু 'আনহু তিনি বলেন-
ألا إني لست بنبي ولا يوحى إلي ولكني أعمل بكتاب الله وسنة نبيه صلى الله عليه وسلم ما استطعت.
'সাবধান, আমি নবী নই। আমার নিকট ওহীও আসে না। তবে আমি আল্লাহর কিতাবকে এবং নবী ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহকে যথাসাধ্য আমল করার চেষ্টা করি। ১১২৩
উল্লেখ্য যে, শুধু আছহাব রাদি আল্লাহু 'আনহুই নন বরং আছহাব রাদি আল্লাহু 'আনহুমের একান্ত অনুগামী তাবি'ঈ রাহিমাহুল্লাহও হাদীছ পরিপালনে ছিলেন খুবই অগ্রসর। তাঁদের কিছু বক্তব্যও এখানে উপস্থাপন করা যায়-
১. কাতাদাহ ইবন দি'আমাহ রাহিমাহুল্লাহ (১১৭ হি.) তিনি বলেন-
والله ما رغب أحد عن سنة نبيه صلى الله عليه و سلم إلا هلك فعليكم بالسنة وإياكم والبدعة..
'আল্লাহর শপথ, কোন ব্যক্তি তার নবী আলাইহিস সালামের সুন্নাহ থেকে বিমুখ হলে সে অবশ্যই ধ্বংস হবে। তোমরা শক্তভাবে সুন্নাহকে ধারন করবে এবং বিদ'আতকে প্রত্যাখ্যান করবে। ১২৪
২. ইবন শিহাব আয-যুহরী রাহিমাহুল্লাহ (১২৪ হি.) বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن شهاب بلغنا عن رجال من أهل العلم أنهم كانوا يقولون الاعتصام بالسنة نجاة.
'ইবন শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিদ্বানদের কিছু ব্যক্তি হতে আমাদেরকে পৌছানো হয়েছে যে, 'তারা বলতেন, সুন্নাহকে শক্তভাবে ধারণ করার মধ্যে রয়েছে মুক্তি। '১২৫ আইম্মায়ি মুজতাহিদীনও হাদীছের মর্যাদার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। কেউ কস্মিনকালেও হাদীছের বিরুদ্ধে কোন কিছু সহ্য করেন নি। আবূ হানিফা (১৫০ হি.) রাহিমাহুল্লাহ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে-
كان الإمام أبو حنيفة يقول اياكم والقول في دين الله تعالى بالرأي عليكم باتباع السنة فمن خرج عنها ضل ودخل عليه مرة رجل من أهل الكوفة والحديث يقرأ عنده فقال الرجل دعونا من هذه الأحاديث فزجره أبو حنيفة أشد الزجر وقال له لولا السنة ما فهم احد منا كان يقول لم تزل الناس في صلاح ما دام فيهم من يطلب الحديث فإذا طلبوا العلم بلا حديث فسدوا.
'আল-ইমাম আবূ হানিফাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'দীনের প্রসঙ্গে মতামতের ভিত্তিতে কিছু বলা থেকে বিরত থাকুন। সুন্নাহর অনুসরণ আপনাদের উপর অত্যাবশ্যক।' এক সময় কুফা হতে এসে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এমন সময় প্রবেশ করল যে, তাঁর নিকট হাদীছ পঠিত হচ্ছিল। সেই ব্যক্তি বলল, এইসব হাদীছ থেকে আমাদেরকে মুক্ত করুন। তখন আবূ হানিফাহ রাহিমাহুল্লাহ প্রচন্ড আকারে ধমক দিলেন এবং বললেন, সুন্নাহ না থাকলে আমাদের কেউ আল-কুরআন বুঝবে না। তিনি বলতেন, 'মানুষ যতক্ষণ হাদীছ চর্চা করবে, ততক্ষণ তারা সফলতা লাভ করবে। যখন হাদীছ বাদ দিয়ে অন্য ইলম অন্বেষণ করবে, সঠিক ইসলামের দরজা তাদের থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। ১১২৬
আল-ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
ما من أحد إلا ومأخوذ من كلامه ومردود عليه إلا رسول الله صلى الله عليه و سلم
'যে কোন ব্যক্তির কথা গ্রহণ করলে তা প্রত্যাখ্যাত হতেও পারে, শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা ব্যতীত। '১২৭
আল-ইমাম শাফি' (২০৪ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
وليس ينبغي في سنة رسول الله صلى الله عليه و سلم إلا اتباعها بفرض الله عز و جل.
'আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার পক্ষ থেকে ফরজ হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ব্যতীত অন্য কিছু করনীয় নেই।'১২৮ তিনি আরো বলেন-
أجمع المسلمون على أن من استبان له سنة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يحل له أن يدعها لقول أحد.
'মুসলিমগণ এই বিষয়ের উপর ইজমা' করেছে যে, রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাত প্রকাশিত হওয়ার পর অন্য কারো জন্য তা প্রত্যাখ্যান করা হালাল হবে না।১২৯
আল-ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
من ردّ حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو على شفا هلكة.
'যে ব্যক্তি হাদীছ প্রত্যাখ্যান করে সে ধ্বংস হওয়ার কিনারায় অবস্থান করে। '১৩০ তিনি আরো বলেন-
لا تقلد في دينك أحداً من هؤلاء، ما جاء عن النبي صلى الله عليه وسلم وأصحابه فخذ به.
'দীনের ব্যাপারে ওদের অন্ধানুকরণ করো না। নবী আলায়হিস সালাম ও তার ছাহাবীগণ রাদি আল্লাহু 'আনহুম যা নিয়ে এসেছেন তাকে অনুসরণ কর।'১৩১ আল-হাসান ইবনু আলী আল বিহারী (৩২৯ মৃ.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন-
إذا سمعت الرجل يطعن على الآثار ولا يقبلها ، أو ينكر شيئاً من أخبار رسول الله صلى الله عليه وسلم فاتهمه على الإسلام ، فإنه رديء المذهب و القول القرآن أحوج إلى السنة من السنة إلى القرآن ....
'যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে দেখবে যে, সে আছারকে তিরস্কার করছে এবং সে তা গ্রহণ করছে না অথবা রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছকে অস্বীকার করছে সে মূলত ইসলামকেই অভিযুক্ত করছে। কেননা সে তার পন্থাগত দিক ও বক্তব্যগত দিক থেকে নিম্নমানের। হাদীছ হাদীছের যতটুকু মুখাপেক্ষী কুরআন তা থেকেও হাদীছের বেশি মুখাপেক্ষী। ১৩২
সুতরাং হাদীছ সংক্রান্ত বিষয়ে আছহাব রাদি আল্লাহু 'আনহুম তাবি'ঈ, আইম্মা ও সালাফি সালিহীনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁরা কক্ষনো হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেননি বরং সকল সময় হাদীছকে নিজেরাও অনুকরণ করতেন অন্যদেরকেও তা অনুকরণের উপদেশ দিতেন।
এমনি আরো অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যে, ছাহাবী রাদিআল্লাহু আনহুম ও অন্যান্য আলিমগণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ পরিপালনে ছিলেন বদ্ধপরিকর ও আপোসহীন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আছহাব রাদি আল্লাহু 'আনহুম তাঁর হাদীছ অনুসরণের ক্ষেত্রে অবহেলা করতেন এটা ডাহা মিথ্যাচার বই কিছু নয়। সুতরাং হাদীছ বিদ্বেষীদের দাবী, আছহাব রাদিআল্লাহু আনহুম হাদীছকে গুরুত্ব দিতেন না; এটা একেবারেই অসত্য।

টিকাঃ
১১৫. ছাহীহ আল-বুখারী, ১খ. ৪৬ পঃ.
১১৬. আহমাদ, ৩খ. ২০পৃ.; আল-হাকিম, ১খ. ১৩৫পৃ.
১১৭. ছাহীহ আল বুখারী, ৫খ. ২২০৩ পৃ.
১১৮. ছাহীহ মুসলিম, ১খ. ৩২৭পৃ.; আত-তিরমিযী, ২খ, ৪৫৯পৃ.
১১৯. আত-তাবারানী আল-মু'জামুল কাবীর, আল-মাওছিল, ১৪০৪ হি. ১৮খ. ২১৯পৃঃ
১২০. ছাহীহ আল বুখারী, ৫খ., ২০৮৮পৃ.:
১২১. হাহীহ আল বুখারী, ৩খ. ১১২৬ পৃঃ, আল-বাইহাকী, ৬খ. ৩০১ পৃঃ
১২২. ছাহীহ আল-বুখারী, ২খ. ৫৭৯ পৃঃ, ছাহীহ মুসলিম, ৪খ. ৪৪ পৃঃ, আহমাদ, ১খ. ২৫৭ পৃঃ
১২৩. আহমাদ, ২খ. ৪৬৯ পৃঃ, আল-হাকীম, ৩খ. ১৩২ পৃঃ
১২৪. আস-সুযুতি, মিফতাহুল জান্নাতি ফিল-ইহাতিজাজি বিসসুন্নাহ মাদুনাহ, ১৩৯৯ হিঃ ১খ. ৭০ পৃঃ
১২৫. আল-লালকায়ী, হিবাতুল্লাহ ইবনুল হাসান, শারহু উছুলুল ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামায়াহ, রিয়াদ ১৪০২ হি. ১খ. ৯৫ পৃঃ
১২৬. আল-ইরাকী আব্দুর রাহীম, আল-মুসতাখরাজ আলাল মুসতাদরাক, তাবি ১৫ পৃঃ
১২৭. আদ-দিহলভী, আহমাদ ইবন আব্দির রাহীম,, ইকদুজ জায়য়িদ ফি আহকামিল ইজতিহাদ ওয়াত- তাকলীদ কাহিরাহ ১৩৮৫ হি. ৩২ পৃঃ
১২৮. ইবন কাইয়্যিম, হাশিয়াতু আলা সুনানী আবী দাউদ, বায়রূত, ১৪১৫ হি. ১৩খ. ৪৫ পৃঃ
১২৯. যীনু, মুহাম্মদ ইবন জামীল, তাওজীহাতুন ইসলামিয়াতুন ফিল ইছলাহিল ফারকি ওয়াল মুজতামাহ, সাউদী আরব, ১৪১৮ হি. ১৪০ পৃঃ
১৩০. আলী ইবন নায়িফুস শাহুদ, মাওসু'আতুত দিফা আনির রাসূলুল্লাহ হ. ৪খ. ১৩৯ পৃঃ
১৩১. প্রাগুক্ত
১৩২. আল-বিহারী, হাসান ইবনু 'আলী, শারহিস কিতাবসি সুন্নাহ, দাম্মাম, ১৮০৭ হিঃ, ৩৫ পৃঃ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00