📄 ৪.১.৪.২ ‘আবদুল্লাহ জিকরালবী
পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে হাদীছ বর্জন আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হচ্ছেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেেেশর জিকরালাহ শহরে জন্মগ্রহণকারী 'আবদুল্লাহ ইবন আব্দুল্লাহ জিকরালবী। ইংরেজ ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত এ ব্যক্তি মূলত হাদীছ অস্বীকার করার বিষয়ে স্যার সাইয়িদ আহমাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি সমগ্র হাদীছকে অস্বীকার করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'আহলুয যিকর ওয়াল-কুরআন' নামে একটি পথভ্রষ্ট সংগঠনের ছত্রছায়ায় তিনি ও তাঁর সহযোগীরা জোরালোভাবে হাদীছ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করতেন। তাঁর এ আন্দোলনের প্রতিপক্ষ হিসেবে সেই সময় ইসলামের প্রসিদ্ধ আলিমগণ কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁরা 'ইশা'আতে সুন্নাত, নামে একটি নিয়মিত পত্রিকার মাধ্যমে আবদুল্লাহ জিকরালবীর বিভ্রান্তিমসূহকে মুসলিম উম্মাহর নিকট তুলে ধরেন। তাঁরা তাকে কাফির বলে ফাতওয়া দেন। এ পথভ্রষ্ট ইংরেজদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই মৃত্যুবরণ করেন। হাদীছকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে সন্দেহ ও সংশয়ের বীজ বপন করেন, তা ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামের দুশমনদের শক্ত আঘাত হানার পথকেই উন্মুক্ত করেছে।
📄 ৪.১.৪.৩ খাজা আহমাদ উদ্দীন অমৃতসরী
খাজা আহমাদ উদ্দীন ইবন খাজা মিয়া মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবরাহীম ছিলেন ভারতের অমৃতসরে জন্মগ্রহণকারী। তিনি পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশের হাদীছ অস্বীকারকারী পূর্ববর্তী দুই নেতা স্যার সাইয়িদ আহমাদ ও আবদুল্লাহ জিকরালবীর চিন্তা চেতনা দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন। তিনি আব্দুল্লাহর সাথে প্রায়ই সাক্ষাত করতেন। উম্মাতে মুসলিমাহ নামক একটি দল গঠন করে তিনি তাঁর এ হাদীছ বিরোধী তৎপরতা জোরদারের ব্যবস্থা করেন।
📄 ৪.১.৪.৪ গোলাম আহমাদ পারভেজ
গোলাম আহমাদ পারভেজ ইবনে ফাদলে দীন ইবন রাহীম বাখশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাদীছ অস্বীকারকারী হিসাবে এমন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন যে, হাদীছ বিরোধীগণই তাঁর দিকে সম্বোধিত হয়ে 'পারভেজিয়ীন' নামে পরিচিতি লাভ করেন। 'তুলু'ই ইসলাম' নামে তিনি একটি নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ করে তার মাধ্যমে হাদীছ বিরোধী এ চিন্তা চেতনার সম্প্রসারণ ঘটানোর প্রচেষ্টা চালান। পরবর্তীতে 'নাদী তুলুই ইসলাম' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা হাদীছ বিরোধী আন্দোলনে খুবই সোচ্চার ছিল। হাদীছ বিরোধী আন্দোলনের পূর্ববর্তী প্রবক্তারা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সব কিছুই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে থাকার কারণে কুরআনকেই ইসলামের একমাত্র উৎস মনে করে হাদীছকে অস্বীকার করার দাবী করেন। পক্ষান্তরে গোলাম আহমাদ পারভেজ তদানিন্তন শাসক গোষ্ঠির আনুকূল্য লাভের জন্য, হাদীছ অস্বীকার করার সাথে সাথে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রজাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য শাসক গোষ্ঠির একচ্ছত্র কর্তৃত্বের বৈধতা দানের ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ তিনি কুরআনের ব্যাখ্যা দেয়ার যোগ্যতা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেই বলেই একদিকে হাদীছ অস্বীকার করতেন, অপর দিকে স্বয়ং নিজেই কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা দিতেন, যা মূলত রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরকে খুশী করত। তাদের পক্ষ থেকে প্রজাদেরকে শায়েস্তা করাকে বৈধতা দিতেও তিনি কার্পণ্য করতেন না।
যাই হোক, তিনি ও তাঁর অনুসারীদের এ জঘন্য দর্শনের বিরুদ্ধে ইসলামের তদানিন্তন প্রসিদ্ধ আলিমগণ জোরালো ভূমিকা পালন করেন। আল্লামা মাওদূদী রাহিমাহু আল্লাহ এর মত প্রথিতযশা মনীষীও এ বাতিল সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। বিশ্বের সেই সময়ের ইসলামী মনীষীগণ পারভেজের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ফাতওয়া দেন। তাঁরা ঘোষণা করেন যে, তিনি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, তিনি মূলত কাফির, তাঁর অনুসারীও কাফির।
📄 ৪.১.৪.৫ আবদুল খালিক মালওদাহ
হাদীছ অস্বীকারকারীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন, আব্দুল খালিক মালওদাহ। তাঁর কর্মকাণ্ড দ্বারা স্পষ্টই বুঝা যায় যে, তিনি গোলাম আহমাদ পারভেজ দ্বারা প্রভাবিত। তবে তিনি হাদীছ অস্বীকারকারীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা না করে 'তাহরীকে তা'মিরে ইনসানিয়াত' নামে নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পৃথক ভাবে এটি কেন করলেন, তার সঠিক কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হওয়ায় অঢেল অর্থ খরচের বিনিময়ে নিজের পরিচিতি বিস্তৃতির জন্য একই উদ্দেশ্যে একটি ভিন্ন নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বলে মনে করা হয়। তাঁর এ সংগঠন পূর্ববর্তী সংগঠনের মত তেমন ব্যাপকতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি।
যাই হোক, পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে পবিত্র হাদীছ অস্বীকারকারীদের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত কিছু ইসলাম বিরোধীদের কর্মতৎপরতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে উপস্থাপন করা হল। উল্লেখ্য যে, হাদীছ ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদ্বেষী এ সব ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশের তদানিন্তন ইসলামের বড় বড় পণ্ডিতদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের কারণে তাদের এ হাদীছ বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়। দুঃখের বিষয় হল, তাদের এ তৎপরতা তেমন ব্যাপকতা লাভ না করলেও তাদের বেশ কিছু অনুসারী এ ভূখণ্ডে আজও সক্রিয় রয়েছে। তারা তাদের এ মতামতকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপতৎপরতা আজও চালিয়ে যাচ্ছে। কুরআনের খুব একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করে তারা মূলত: ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজেই নিয়োজিত রয়েছে। এরা ইসলামের শত্রুদের হাতের পুতুল। এরাও ইসলামের শত্রু, রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শত্রু, হাদীছ বিদ্বেষী।
এখানে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের অনুসারীরা খারিজী সম্প্রদায়ের মতই সমগ্র হাদীছকেই অস্বীকার করেছেন। বর্তমান যুগেও আমাদের দেশে কিছু লোকজন দেখা যায়, যারা হাদীছকে তেমন গুরুত্ব দেন না। তারা কিছু কিছু হাদীছকে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অস্বীকার করার ধৃষ্টতাও দেখান। হাদীছকে নতুন ভাবে যাচাই বাছাই করার আহবান জানাতেও তারা দ্বিধা করেন না। আসলে সানদ ও মাতন গবেষণা করে হাদীছ যাচাই বাছাই করার সুযোগ এখনো সবার জন্য অবারিত রয়েছে। তাই বলে, বস্তুনিষ্ঠ ভাবে হাদীছ যাচাই বাছাই না করে বিভিন্ন অজুহাতে কিছু কিছু হাদীছ বর্জনের জন্য পুনর্বিবেচনার দাবী সত্যই রহস্য জনক। আসলে তাদের এ ভূমিকা ইসলামের জন্য সুখকর নয়। ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দ্বিতীয় উৎস অতি গুরুত্বপূর্ণ এ হাদীছ নিয়ে টালবাহানা, ইসলামের দুশমনদের পাতানো ফাঁদে পা দেয়ার নামান্তর কি না, তাও গভীর ভাবে অনুধাবন করা জরুরী।