📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.১.৪.১ স্যার সাইয়িদ আহমাদ

📄 ৪.১.৪.১ স্যার সাইয়িদ আহমাদ


(মৃত্যু ২৭, মার্চ, ১৮৯৮ খৃঃ)
পাশ্চাত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত স্যার সাইয়িদ আহমাদ খান ইবন আহমাদ মির আল-মুত্তাকী ইবন 'ইমাদুদ্দীন আল-হুসায়নী ১৮১৭ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, তিনি ছিলেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন ইংরেজদের বড় দালাল, তাদের স্বার্থ সংরক্ষনে খুবই তৎপর। ইসলাম, কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী 'আকীদাহ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁকে ইংরেজরা এমনভাবে ব্যবহার করে যে, তিনি ইসলামের ছদ্মাবরণে ইসলামের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছেন। তিনি কুরআনের অপব্যাখ্যা করেছেন। জিন, ফেরেস্তা, শয়তানের মত অদৃশ্য বিষয়কে তিনি অস্বীকার করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে, আল্লাহ শুধু কুরআনের অর্থকেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন, ভাষাকে নয়। সেই অর্থকে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ভাষায় রূপদান করেছেন। সুতরাং কুরআনের ভাষা আল্লাহর ভাষা নয়। হাদীছের ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য হচেছ, হাদীছ দীর্ঘদিন লিপিবদ্ধ না হওয়ায় সেখানে অনেক কিছু সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন সংঘটিত হয়েছে। এমনকি অনেকেই জাল হাদীছ রচনা করার কারণে, হাদীছ সন্দেহ ও সংশয় মুক্ত নয়। সে জন্য নির্ভেজাল কুরআনই ইসলামী জীবন বিধানের একমাত্র উৎস। কোন ক্রমে ইসলামের গ্রহণযোগ্য উৎস হওয়ার যোগ্যতা হাদীছের নেই। পবিত্র হাদীছের প্রতি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সন্দেহ, সংশয় ও বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি হাদীছ গ্রহণের এমন কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করেন, যার মানদণ্ডে কোন হাদীছই যাতে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ লাভ না করে। হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করার পাকা পোক্ত ব্যবস্থা করতে তিনি নিরলস চেষ্টা চালিয়েছেন। বুদ্ধিবৃত্তির ছত্রছায়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তিনি হাদীছের বিরুদ্ধে এ জঘন্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে হাদীছ গ্রহণযোগ্য হওয়ার তিনটি শর্ত হচ্ছে-
১. হাদীছ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায়ই বর্ণিত হতে হবে এবং তা সন্দেহাতীত ভাবে বিশুদ্ধ প্রমাণিত হতে হবে।
২. বর্ণনাকারীর ভাষায় হাদীছের অর্থ বর্ণিত হলে, তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩. কোন হাদীছের ব্যাখ্যায় ইসলামের বিদগ্ধ পণ্ডিতগণের মধ্যে দ্বিমত সৃষ্টি হলে, সে হাদীছও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
আসলে এ তিনটি শর্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ছিহাহ সিত্তাহ এমনকি ছাহীহ আল-বুখারী ও ছাহীহ মুসলিম শরীফের মত হাদীছ গ্রন্থের একটি হাদীছও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। উল্লেখ্য যে, কোন মুতাওয়াতির হাদীছও তাঁর এ শর্ত পরিপূর্ণ করে গ্রহণযোগ্য হাদীছ হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে না। সুতরাং তাঁর এ শর্তাবলীতে উত্তীর্ণ হাদীছ গ্রহণযোগ্য বিবেচনার অর্থই হচ্ছে, এ মানদণ্ডের কোন হাদীছ যেহেতু নেই, সেহেতু কোন একটি হাদীছও অনুসরণ যোগ্য নয়। অন্য কথায়, তাঁর এ দর্শনই হচ্ছে, সমগ্র হাদীছকে অস্বীকার করারই বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্র। তিনি মূলত সমগ্র হাদীছ অস্বীকারকারী। পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে হাদীছ অস্বীকার করার যে, জঘন্য প্রবণতা শুরু হয়, তিনি তারই মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। কুরআনের প্রতি অতিশয় আস্থা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ছদ্মাবরণে তাঁর এ হাদীছ বিদ্বেষী অবস্থান, এ ভূখন্ডের মুসলিম উম্মাহকে যে দ্বিধা বিভক্ত হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছিল, তা থেকে ইংরেজরাই মূলত লাভবান হয়েছে।

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.১.৪.২ ‘আবদুল্লাহ জিকরালবী

📄 ৪.১.৪.২ ‘আবদুল্লাহ জিকরালবী


পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে হাদীছ বর্জন আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হচ্ছেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেেেশর জিকরালাহ শহরে জন্মগ্রহণকারী 'আবদুল্লাহ ইবন আব্দুল্লাহ জিকরালবী। ইংরেজ ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত এ ব্যক্তি মূলত হাদীছ অস্বীকার করার বিষয়ে স্যার সাইয়িদ আহমাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি সমগ্র হাদীছকে অস্বীকার করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'আহলুয যিকর ওয়াল-কুরআন' নামে একটি পথভ্রষ্ট সংগঠনের ছত্রছায়ায় তিনি ও তাঁর সহযোগীরা জোরালোভাবে হাদীছ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করতেন। তাঁর এ আন্দোলনের প্রতিপক্ষ হিসেবে সেই সময় ইসলামের প্রসিদ্ধ আলিমগণ কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তাঁরা 'ইশা'আতে সুন্নাত, নামে একটি নিয়মিত পত্রিকার মাধ্যমে আবদুল্লাহ জিকরালবীর বিভ্রান্তিমসূহকে মুসলিম উম্মাহর নিকট তুলে ধরেন। তাঁরা তাকে কাফির বলে ফাতওয়া দেন। এ পথভ্রষ্ট ইংরেজদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই মৃত্যুবরণ করেন। হাদীছকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে সন্দেহ ও সংশয়ের বীজ বপন করেন, তা ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামের দুশমনদের শক্ত আঘাত হানার পথকেই উন্মুক্ত করেছে।

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.১.৪.৩ খাজা আহমাদ উদ্দীন অমৃতসরী

📄 ৪.১.৪.৩ খাজা আহমাদ উদ্দীন অমৃতসরী


খাজা আহমাদ উদ্দীন ইবন খাজা মিয়া মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবরাহীম ছিলেন ভারতের অমৃতসরে জন্মগ্রহণকারী। তিনি পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশের হাদীছ অস্বীকারকারী পূর্ববর্তী দুই নেতা স্যার সাইয়িদ আহমাদ ও আবদুল্লাহ জিকরালবীর চিন্তা চেতনা দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন। তিনি আব্দুল্লাহর সাথে প্রায়ই সাক্ষাত করতেন। উম্মাতে মুসলিমাহ নামক একটি দল গঠন করে তিনি তাঁর এ হাদীছ বিরোধী তৎপরতা জোরদারের ব্যবস্থা করেন।

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ৪.১.৪.৪ গোলাম আহমাদ পারভেজ

📄 ৪.১.৪.৪ গোলাম আহমাদ পারভেজ


গোলাম আহমাদ পারভেজ ইবনে ফাদলে দীন ইবন রাহীম বাখশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাদীছ অস্বীকারকারী হিসাবে এমন বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন যে, হাদীছ বিরোধীগণই তাঁর দিকে সম্বোধিত হয়ে 'পারভেজিয়ীন' নামে পরিচিতি লাভ করেন। 'তুলু'ই ইসলাম' নামে তিনি একটি নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ করে তার মাধ্যমে হাদীছ বিরোধী এ চিন্তা চেতনার সম্প্রসারণ ঘটানোর প্রচেষ্টা চালান। পরবর্তীতে 'নাদী তুলুই ইসলাম' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যা হাদীছ বিরোধী আন্দোলনে খুবই সোচ্চার ছিল। হাদীছ বিরোধী আন্দোলনের পূর্ববর্তী প্রবক্তারা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সব কিছুই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে থাকার কারণে কুরআনকেই ইসলামের একমাত্র উৎস মনে করে হাদীছকে অস্বীকার করার দাবী করেন। পক্ষান্তরে গোলাম আহমাদ পারভেজ তদানিন্তন শাসক গোষ্ঠির আনুকূল্য লাভের জন্য, হাদীছ অস্বীকার করার সাথে সাথে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রজাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য শাসক গোষ্ঠির একচ্ছত্র কর্তৃত্বের বৈধতা দানের ব্যবস্থা করেন। অর্থাৎ তিনি কুরআনের ব্যাখ্যা দেয়ার যোগ্যতা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেই বলেই একদিকে হাদীছ অস্বীকার করতেন, অপর দিকে স্বয়ং নিজেই কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা দিতেন, যা মূলত রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরকে খুশী করত। তাদের পক্ষ থেকে প্রজাদেরকে শায়েস্তা করাকে বৈধতা দিতেও তিনি কার্পণ্য করতেন না।
যাই হোক, তিনি ও তাঁর অনুসারীদের এ জঘন্য দর্শনের বিরুদ্ধে ইসলামের তদানিন্তন প্রসিদ্ধ আলিমগণ জোরালো ভূমিকা পালন করেন। আল্লামা মাওদূদী রাহিমাহু আল্লাহ এর মত প্রথিতযশা মনীষীও এ বাতিল সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। বিশ্বের সেই সময়ের ইসলামী মনীষীগণ পারভেজের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ফাতওয়া দেন। তাঁরা ঘোষণা করেন যে, তিনি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, তিনি মূলত কাফির, তাঁর অনুসারীও কাফির।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00