📄 ৪.১.৩.৫ আহমাদ আমীন (মৃত্যু : ১৯৫৪)
তিনিও হাদীছ অস্বীকারকারী ছিলেন। তাঁর মতে, হাদীছ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই জাল হওয়া শুরু হয়। তা না হলে, জাল হাদীছ রচনাকারীকে রাসূলুল্লাহ জাহান্নামের অধিবাসী হওয়ার কথা উল্লেখ করতেন না।১৩ ছাহাবীগণই বেশি বেশি হাদীছ জানতেন। তাঁদের মারা যাওয়ার কারণে হাদীছের সংখ্যা দিন দিন কম হওয়ার কথা ছিল; তা না হয়ে খুলাফায়ে রাশিদূনের আমলের চেয়ে উমাইয়া যুগে হাদীছ বেশি দেখা গেছে। একই ভাবে উমাইয়া যুগের চেয়ে আব্বাসীয়াহ যুগে হাদীছের সংখ্যা আরো বেড়ে গেছে।১৪ আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, মুহাদ্দিছদের নিরলস প্রচেষ্টা ও যুক্তিযুক্ত যথার্থ পদ্ধতি অবলম্বনের কারণে এখন সন্দেহমুক্ত হাদীছ একেবারেই পৃথক করা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং জাল হাদীছের সংখ্যাধিক্য বিশুদ্ধ হাদীছ পরিপালনের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধক হতে পারে না। সে জন্য জাল হাদীছের সংখ্যাধিক্যের অজুহাতে বিশুদ্ধ হাদীছকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোন সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন যে-
وفي الحق أن المحدثين عنوا عناية كبيرة بالنقد الخارجي ولم يعنوا هذه العناية بالنقد الداخلي، فقد بلغوا الغاية في نقد الحديث من ناحية رواته جرحا وتعديلا، فنقدوا رواة الحديث في أنهم ثقات أو غير ثقات، وبينوا مقدار درجتهم في الثقة وبحثوا هل تلاقى الراوي والمروي عنه أو لم يتلاقيا، وقسموا الحديث باعتبار ذلك ونحوه إلى حديث صحيح وحسن وضعيف، وإلى مرسل ومنقطع، وإلى شاذ وغريب وغير ذلك.
'এটি সত্য যে, মুহাদ্দিছগণ বাহ্যিক যাচাই বাছাইকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন যেমনটি তারা অভ্যন্তরিণ ক্ষেত্রে দেননি, তারা হাদীছকে তার বর্ণনাকরিীর জারহ ও তা'দীল বিষয়ে যাচাই এর ক্ষেত্রে শীর্ষে পৌছিয়েছিলেন। তারা হাদীছের বর্ণনাকারীর গ্রহণযোগ্যতা অথবা অগ্রহণযোগ্যতা এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতার স্তর নির্ণয় নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। বর্ণনাকারী যার থেকে বর্ণনা করেছেন, তার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা, উভয়ে কখনো মিলিত হয়েছিলেন কিনা; সে বিষয়ে তারা গবেষণা করেন। এই প্রেক্ষাপটে হাদীছকে তারা ছাহীহ, হাসান, দুর্বল, মুরসাল, মুনকাতি শায ও গারীব হিসেবে ভাগও করেছেন।"৯৫ এখানে তিনি স্পষ্টত: হাদীছের ভাষ্য বাস্তবতার সাথে কতটুকু সঙ্গতিশীল তা বিবেচনায় এনে হাদীছকে যাচাই বাছাই না করার জন্য মুহাদ্দিছগণকে দোষারূপ করেছেন। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হাদীছ শাস্ত্রকে বিতর্কিত করা।
আসলে তার এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। মুহাদ্দিছগণ যেমনটি সানদ নিয়ে পর্যালোচনা করে হাদীছের মান নির্ণয় করেছেন তেমনটি হাদীছের মাতন (মূল ভাষ্য) নিয়েও তারা পর্যালোচনা করেছেন। শাযকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। আশ-শায ফিস সানদ এবং আশ-שায ফিল মাতান। মুহাদ্দিছগণ হাদীছের মূল টেক্স (matn) নিয়ে মোটেও যাচাই বাছাই করেননি, এই অভিযোগ ঠিক নয়। তিনি মূলত এ দুটি বিষয় অবতারণার মাধ্যমে হাদীছের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টিরই অপচেষ্টা চালিয়েছেন, যা সঠিক তথ্য নির্ভর নয়।
টিকাঃ
১৩. ফাজরুল ইসলাম, কায়রো, ১৯৯২, ২৫৮ পৃঃ
১৪. দুহাল ইসলাম, মিশর, ১৯৬৪, ২খ. ১৩০ পৃ.
৯৫. ড. আহমাদ আমীন, দুহাল ইসলাম, মিশর, তাবি ২খ. ১৩০ পৃঃ
📄 ৪.১.৩.৬ মুহাম্মাদ আবূ ইয়াযীদ আল দামানহুরী
তাঁর দৃষ্টিতে হাদীছ হচ্ছে মুসলিমদের জন্য এবং ইসলামের জন্য একটি মুছিবত। তিনি এ বিপদ থেকে মুক্তির জন্য হাদীছগুলো পুড়িয়ে ফেলাই উত্তম বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মানুষদেরকে হাদীছের অনিষ্টতা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি প্রথমে আল বুখারী, তারপর মুসলিম তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য হাদীছ পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেন।১৬
এ বক্তব্য আবূ ইয়াযীদ আল দামানহুরীর ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। হাদীছ আসলে এ উম্মাহর জন্য এক বিশাল নিয়ামাত। হাদীছের অনুপস্থিতিতে এ উম্মাহ এক সেকেন্ডের জন্যও অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই। যারা এটাকে ইসলামের জন্য মুছিবত বলে পুড়িয়ে ধ্বংস করার পরামর্শ দেন তারা এ উম্মাহর শত্রু। উম্মাহকে বিপাকে ফেলে শত্রুদেরকে খুশী করাই তাদের উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
১৬. আল ফাতহ ম্যাগাজিন, ২খ. ৫০৪ পৃ.
📄 ৪.১.৩.৭ ড. আহমাদ সুবহী মানসূর
: (জন্ম ১৯৪৯) তিনি ১৯৪৯ সালের ১লা মার্চ মিশরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি আল-আযহারে প্রথমত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাদীছ অস্বীকার করার দায়ে তাকে সেখান থেকে বহিস্কার করা হয়। ১৯৭৭ সাল হতে তিনি আল-কুরআনই ইসলামের একমাত্র উৎস; এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হন। সেই সময় হতেই তিনি হাদীছ বিরোধী তৎপরতার সাথে জড়িত। বহুদিন ধরে বিভিন্নভাবে প্রবন্ধ, পুস্তক, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে এই জঘন্য চিন্তা চেতনা সম্প্রসারণের কাজে তিনি লিপ্ত রয়েছেন। তিনি কিছুদিন যাবৎ মিশরের ইবন খালদুন সেন্টারে কর্মরত ছিলেন। সরকার উক্ত সেন্টার বিলুপ্ত করার পর, তিনি বহিষ্কৃত হয়ে আমেরিকাতে পাড়ি জমান। ২০০৪ সাল থেকে তিনি ইন্টারনেটে তার এই হাদীছ বিরোধী লেখনি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যে হাদীছকে অস্বীকার করেছেন, তার আল-মুসলিমূল আছী গ্রন্থটি হচ্ছে এর প্রামাণ্য দলিল।
📄 ৪.১.৩.৮ নাসর হামীদ আবূ যায়িদ
: (জন্ম ১৯৪৩) ১৯৪৩ সালের ১০ই জুলাই তিনি মিশরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি মূলত: একজন ভাষা বিজ্ঞানী। প্রথমে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছিলেন। জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন ভাষাতত্ত্বেরও শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে তিনি হল্যান্ডের লিডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন এবং বিভিন্ন পুরস্কারেও পুরস্কৃত হয়েছেন।
১৯৯৫ সালে যখন তিনি অধ্যাপক হওয়ার জন্য তার গবেষণাকর্ম নির্ধারিত পর্ষদে পাঠান, তখন তাকে অধ্যাপক পদ দেয়া হয় ঠিকই; তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে, তাকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। মূলত: তার এই গবেষণাকর্ম ছিলো ইসলামের মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক। মিশরের খ্যাতনামা বিদ্বান যেমন আব্দুছ ছাবুর শাহীন, ড. মুহম্মদ বুলতাজী, ড. আহমাদ হায়কাল, ড. ইসমাঈল সালিম প্রমুখ ব্যক্তিত্বও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন লেখা লেখেন। মূলত: আবূ যায়িদের অধিকাংশ লেখনীতে ইসলামের চিন্তা চেতনাকে আক্রমণ করা হয়েছে। বিশেষ করে তিনি আল-কুরআনকে সমালোচনার ক্ষেত্রে ইসলামী বিদ্বেষী পাশ্চাত্য মনীষীদের দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে অনেক ইসলাম বিরোধী প্রতিষ্ঠান তাকে বিভিন্ন পদকে সম্মানিত করেছে। তিনি মূলত: কুরআনের মতই হাদীছকেও অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন।