📄 ৪.১.১ হাদীছ অস্বীকারের পটভূমি
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালাত অস্বীকার করার সূত্রপাত তাঁর রিসালাত প্রাপ্তির পরপরই হয়েছে। মক্কার কাফিররা ছিল এ ক্ষেত্রে অগ্রদূত। আসলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ অস্বীকার তাঁর রিসালাতকে অস্বীকার করারই নামান্তর। তিনি আল্লাহর রাসূল নন, তিনি আল্লাহর নবী নন, এ বলে তাঁর রিসালাত ও নাবুওয়াতকে অস্বীকার করা আর তাঁর বিশুদ্ধ হাদীছ অস্বীকার করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা তাঁকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে মেনে নেয়ার পরে, তাঁর হাদীছ অস্বীকার করার সুযোগই থাকে না। তাঁর রিসালাত অস্বীকার করার প্রবণতাই মূলতঃ তাঁর হাদীছ অস্বীকার করার পথ তৈরি করে। তিনি আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এ বিশ্বাস যদি কারো থাকে, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালনের প্রামাণ্য দলীল হওয়ায় সে তা কক্ষনো অস্বীকার করতে পারে না। এ মানদন্ডে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালাত অস্বীকারকারীরাই তাঁর হাদীছ অস্বীকারকারী। অন্য কথায় তাঁর হাদীছ অস্বীকারকারীরাই তাঁর রিসালাত অস্বীকারকারী। সুতরাং হাদীছ অস্বীকারের সূত্রপাত মক্কার কাফিরদের থেকেই শুরু হয়েছে। তবে মুসলিম হওয়ার দাবিদার হয়েও কে বা কারা সর্বপ্রথম হাদীছ অস্বীকার করেছে, কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাজ ও কথার বিরুদ্ধে সর্ব প্রথম অবস্থান নিয়েছে, তা আলোচনা করতে হলে বিষয়টি গভীরে প্রবেশ বিশেষ জরুরী।
এক সময় 'যুবায়ির ইবনুল 'আওআম রাদি আল্লাহু 'আনহু ও একজন আনছারী ছাহাবী রাদি আল্লাহু 'আনহুর মধ্যে কৃষি ক্ষেত্রে পানি সরবরাহ নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। তাঁরা এ সমস্যার নিষ্পত্তির জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বলে সমাধান দেন যে-
ثم أرسل الماء إلى جارك اسق يا زبير
'হে যুবায়ির, তুমি সর্বপ্রথম তোমার কৃষিক্ষেতে, তারপর তোমার প্রতিবেশীর ক্ষেতে পানি সরবরাহ করবে।'৬৬
তখন উক্ত ব্যক্তি রাগান্বিত হয়ে বললেন, সে আপনার ফুফাত ভাই বলে কি এ সুযোগ পেল? তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা রাগে লালবর্ণ হয়ে গেল। তখন অবতীর্ণ হল: ৬৭
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
'কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ। তারা মু'মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে; এরপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।'৬৮ আসলে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এ ঘটনা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে একজন মুসলিমের প্রথম বিরোধিতা হলেও উক্ত ছাহাবী পরে নিজের ভুল উপলব্ধি করে তাওবাহ করার কারণে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ অস্বীকারের সূত্রপাত এখান থেকে হয়েছে বলে প্রমাণ হয় না। অন্য বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে -
أن أبا سعيد الخدري رضي الله عنه قال: بينما نحن عند رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو يقسم قسما أتاه ذو الخويصرة وهو رجل من بني تميم فقال: يا رسول الله اعدل فقال ويلك ومن يعدل إذا لم أعدل قد خبت وخسرت إن لم أكن أعدل فقال عمر يا رسول الله ائذن لي فيه فأضرب عنقه فقال d دعه....
আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি হুনাইনের যুদ্ধে প্রাপ্ত গাণীমাতের মাল বন্টন করছিলেন। এ সময় বানু তামীম-এর মূল খুওয়ায়ছিরাহ নামক এক ব্যক্তি এসে বলল- হে আল্লাহর রাসূল, বন্টনে ইনসাফ করুন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন "তুমি ধ্বংস হও, আমি ইনসাফ না করলে আর কে ইনসাফ করবে? আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে আমি তো ধ্বংস হবো এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবো। উমার রাদি আল্লাহু 'আনহু বললেন "আমাকে অনুমতি দিন। আমি তার ঘাড় বিচ্ছিন্ন করে দিই।" রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তাকে ছেড়ে দাও...।"৬৯ এ হাদীছ স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, মূল খুওয়ায়হিরাহ ছিল প্রথম ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ অমান্যকারী। পরবর্তী কালে ইসলামী 'আকীদাহ বিশ্বাসের চিরশত্রু শি'আহ, রাফিদী ও খারিজীরাই হাদীস অস্বীকার করার দৃষ্টা দেখায়। তবে এ সম্প্রদায়গুলোর হাদীছ অস্বীকার করার ধরণ ও প্রকৃতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
টিকাঃ
৬৬. আন-নাবাভী, শারহু মুসলিম, বায়রূত, ১৩৯২ হিঃ, ১৫খ. ১০৭পৃঃ
৬৭. ছাহীহ আল-বুখারী, ২খ., ৮৩২ পৃঃ
৬৮. সূরাহ আন-নিসা: ৬৫
৬৯. ছাহীহ আল-বুখারী, ৩খ. ১৩২১ পৃঃ