📄 ৩.১.৬ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীও ওহী
ওহী হচ্ছে সন্দেহাতীত জ্ঞানের উৎস। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী তাঁর মনগড়া কোন কিছু নয়। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত বাণীরই অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى. وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'তোমাদের সাথী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে এগড়া কথাও বলে না। এ তো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। '৩৫ এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ বলেন-
إنما يقول ما أمر به، يبلغه إلى الناس كاملا موفرًا من غير زيادة ولا نقصان.
'তিনি অবশ্যই এটি তাঁকে যেমনটি নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা পরিপূর্ণ ভাবেই কম বেশি না করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।'৩৬ সুতরাং একথা দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন বাণী মনগড়া নয়। বরং তা ওহীরই অন্তর্ভুক্ত। মূলত ওহী সাধারণত দীন সম্পর্কিত বিষয়েই হয়ে থাকে। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করাও শোভনীয় নয়। বরং তিনি যদি ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করতেন, তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শক্ত হাতে তা প্রতিহত করার ব্যবস্থা নিবেন বলেও হুশিয়ারী দিয়েছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন-
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ . لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ . فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ.
'সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, আমি অবশ্যই তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, এবং তার জীবন ধমনী কেটে দিতাম, এরপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তাকে রক্ষা করতে পারত।'৩৭ সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য। তাঁর বাণী সকল সন্দেহ ও সংশয়ের উর্দ্ধে। আল-কুরআনে এত স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপনের পরেও কি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ উপেক্ষা করা অথবা অস্বীকার করার সুযোগ কোন মুসলিমের জন্য রয়েছে?
টিকাঃ
৩৫. সূরাহ আন-নাজম: ২-৪
৩৬. ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম, ১৪২০ হি., মদীনাহ, ৭খ. ৪৪৩ পৃঃ
৩৭. সূরাহ আল হাক্কাহ: ৪৪-৪৭
📄 ৩.১.৭ আমর বিল মা’রূফ, নাহি আনিল মুনকার ও হালাল হারাম নির্ণয়ের দায়িত্বে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
সফলকাম ব্যক্তিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎকার্যের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা প্রদান ও কোন কিছুকে হালাল ও হারাম নির্ণয় করার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম কার্যক্রম ছিল, সে প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন স্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেছে। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন-
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ. وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ
'যারা এ উম্মী নবী রাসূলের অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজিলে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করে, তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং তাদের উপর বিদ্যমান গুরুভার ও শৃঙ্খল থেকে তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার প্রতি অবতীর্ণ নূর (কুরআন) কে অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।'৩৮
ইসলামে সৎকাজ ও অসৎকাজ এবং হালাল ও হারাম বিষয়টি খুবই ব্যাপক। সুতরাং এ আয়াতের শিক্ষাই হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু কুরআনে বর্ণিত সৎকার্যের নির্দেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং কুরআনে বর্ণিত হালাল হারামকেই ঘোষণা দিয়ে ক্ষ্যান্ত হননি, তার বাইরে বিদ্যমান অনেক সৎকাজের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন ও অসৎকাজকে নিষেধ করেছেন এবং এর বাইরেরও অনেক কিছুকে হালাল ও হারাম হওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে হাদীছ না মানলে ইসলামের অনেক আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার এবং হালাল ও হারাম আমাদের অগোচরেই থেকে যাবে। যারা তাঁর হাদীছ মানতে অস্বীকার করে তারা তাঁর এ সব হালাল - হারাম ও মা'রূফ মুনকারও অলক্ষ্যে অস্বীকার করে। আল-কুরআনের দ্বারাই অত্যাবশ্যকীয় করা ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেও কি কারো মুসলিম থাকার সুযোগ থাকে!
টিকাঃ
৩৮. সূরাহ আল-'আরাফ: ১৫৭
📄 ৩.১.৮ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন হিকমাত শিক্ষা দানের দায়িত্ব প্রাপ্ত
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানব জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মানুষকে আল-কুরআন শিক্ষাদানের মহান শিক্ষক হিসাবে তাঁকে যেমন প্রেরণ করেছেন, একই সাথে হিকমাতের মত অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষাদানের দায়িত্বও তাঁকে অর্পণ করেছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যাহ ওয়া জাল্লা ইরশাদ করেন-
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ .
'আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য হতে তাদের নিকট এই রাসূল প্রেরণ করেছেন, যে তার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল।'৩৯
এ আয়াতের অনিবার্য শিক্ষা হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের পাশাপাশি তাঁর উম্মাতকে হিকমাতও শিক্ষা দিতেন। এখানে আল-কুরআনও শিক্ষা দিতেন এবং হিকমাতও শিক্ষা দিতেন; এ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হিকমাত আল-কুরআনের বাইরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর বাস্তবতার আলোকে আল-কুরআনের সাথে অতিরিক্ত আর যা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন তা মূলত তাঁরই দিক নির্দেশনা যা পরবর্তীতে হাদীছ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এ জন্য অনেক মুফাচ্ছির এ আয়াতে 'হিকমাত' বলতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাত তথা হাদীছকেই চিহ্নিত করেছেন।৪০ সুতরাং কুরআনের বাইরে যে সকল বিষয় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, তা একজন মুসলিমের পক্ষে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। বরং এ হিকমাত তথা হাদীছ পালনও আল-কুরআনের আলোকে তার জন্য অপরিহার্য পালনীয়। যারা এ অপরিহার্য বিষয়কে বর্জন করে যতই তারা শুধু আল-কুরআনেরই অনুসরণের দাবী করুক না কেন তারা মূলত আল-কুরআনকেই বর্জন করে।
টিকাঃ
৩৯. সূরাহ আলে-ইমরান: ১৬৪
৪০. আস-সুয়ূতী জালাল উদ্দীন ওয়াল মাহাল্লী, জালাল উদ্দীন, তাফসীরুল জালালায়িন, কায়রো, তাবি, ১খ. ৯০পৃ:
📄 ৩.১.৯ বিবাদ-বিসম্বাদে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত
মানুষের মধ্যে কোন তর্ক-বিতর্ক, মতানৈক্য ও বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দিলে, সে ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমাধানের মানদণ্ড হিসেবে মেনে নেয়া প্রত্যেক মু'মিনের জন্য অত্যাবশ্যক। কোন বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাধান দিয়ে গেছেন তা নিঃশর্তভাবে মেনে নিলেই শুধু কোন ব্যক্তি মু'মিন থাকার সুযোগ পান। আর তা মেনে না নিলে, তার মু'মিন বলে পরিচয় দেয়ার অধিকার থাকে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এ বিষয়ে ইরশাদ করেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
'কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ। তারা মু'মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর অর্পণ করে; এরপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।৪১ সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিচার ফায়সালা মনে প্রাণে মেনে নেয়া না নেয়াই হচ্ছে ঈমানের মানদণ্ড। তাঁর অসংখ্য হাদীছে তাঁর এ বিচার ফায়সালার বর্ণনা এসেছে। যারা তাঁর হাদীছ অস্বীকার করে তারা তাঁর এ বিচার ফায়সালাকেও অস্বীকার করে। আর যারা এটা অস্বীকার করে তারা কক্ষনো মু'মিন থাকার দাবী করতে পারে না।
টিকাঃ
৪১. সূরাহ আন-নিসা: ৬৫