📄 ৩.১.৪ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাঁর আনুগত্য
যে কোন রাসূল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে করে মানব জাতি তাঁর আনুগত্য করে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ
'আমি এ উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশেই তার আনুগত্য করা হবে।'৩০ সুতরাং, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করানোই হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ব্যতীত আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালার এ অভিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন কোন ক্রমেই সম্ভবপর নয়। সুতরাং যারা তাঁর হাদীছ মানতে অস্বীকার করল, তারা মূলত তাঁর আনুগত্যকেই অস্বীকার করল, আর যারা তাঁর আনুগত্য স্বীকারকে প্রত্যাখ্যান করল তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের যে সুমহান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা ধূলিস্যাত করে দিল। আর যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল তারা মূলত কুফরীই করল।
টিকাঃ
৩০. সূরাহ আন-নিসা: ৬৪
📄 ৩.১.৫ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য ও আল্লাহর আনুগত্য অবিচ্ছেদ্য
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে স্পষ্ট ভাষায় অভিন্ন ও অবিভাজ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে, তিনি যে খালিক ও ইলাহ সে হিসেবে; আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য হচ্ছে, তাঁরই রাসূল হিসেবে। রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আনুগত্য বলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই আল-কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
'কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।'৩১ কুরআনের দু'টি জায়গায় একই ভাষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩২ তিনি অন্যত্র আরো ইরশাদ করেন-
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
'আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩৩ ভাষার সামান্য কিছু ভিন্নতা থাকলেও মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের এতগুলো আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাথে কোন বিভাজন ও পার্থক্য না করেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এ দ্বারা মূলত উভয়েরই আনুগত্য যে অপরিহার্য, শুধু আল্লাহর আনুগত্য করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য বর্জন করার যে কোন সুযোগ নেই, সেই কথাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এমন কি একটি আয়াতে শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করারও নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
'তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা রহমত প্রাপ্ত হতে পার।৩৪
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের মূল আধার হাদীছকে বর্জন করার কোন সুযোগ আল-কুরআন কোন মুসলিমকে দেয় না। সুতরাং শুধু আল-কুরআন অনুসরণের প্রবক্তারা আল-কুরআনেরই এ নির্দেশ কি ভাবে উপেক্ষা করছে?
টিকাঃ
৩১. সূরাহ আল-নিসা: ৮০
৩২. সূরাহ আল-আনফাল : ০১. ২০, ৪৬, আল- মুজাদিলাহ : ১৩
৩৩. সূরাহ আন-নিসা: ৫৯, আন-নূর : ৫৪, মুহাম্মদ : ৩৩, আত-তাগাবুন : ১২
৩৪. সূরাহ আন-নূর: ৫৬
📄 ৩.১.৬ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীও ওহী
ওহী হচ্ছে সন্দেহাতীত জ্ঞানের উৎস। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী তাঁর মনগড়া কোন কিছু নয়। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত বাণীরই অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى. وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'তোমাদের সাথী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে এগড়া কথাও বলে না। এ তো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। '৩৫ এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ বলেন-
إنما يقول ما أمر به، يبلغه إلى الناس كاملا موفرًا من غير زيادة ولا نقصان.
'তিনি অবশ্যই এটি তাঁকে যেমনটি নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা পরিপূর্ণ ভাবেই কম বেশি না করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।'৩৬ সুতরাং একথা দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন বাণী মনগড়া নয়। বরং তা ওহীরই অন্তর্ভুক্ত। মূলত ওহী সাধারণত দীন সম্পর্কিত বিষয়েই হয়ে থাকে। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করাও শোভনীয় নয়। বরং তিনি যদি ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করতেন, তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শক্ত হাতে তা প্রতিহত করার ব্যবস্থা নিবেন বলেও হুশিয়ারী দিয়েছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন-
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ . لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ . فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ.
'সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, আমি অবশ্যই তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, এবং তার জীবন ধমনী কেটে দিতাম, এরপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তাকে রক্ষা করতে পারত।'৩৭ সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য। তাঁর বাণী সকল সন্দেহ ও সংশয়ের উর্দ্ধে। আল-কুরআনে এত স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপনের পরেও কি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ উপেক্ষা করা অথবা অস্বীকার করার সুযোগ কোন মুসলিমের জন্য রয়েছে?
টিকাঃ
৩৫. সূরাহ আন-নাজম: ২-৪
৩৬. ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম, ১৪২০ হি., মদীনাহ, ৭খ. ৪৪৩ পৃঃ
৩৭. সূরাহ আল হাক্কাহ: ৪৪-৪৭
📄 ৩.১.৭ আমর বিল মা’রূফ, নাহি আনিল মুনকার ও হালাল হারাম নির্ণয়ের দায়িত্বে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
সফলকাম ব্যক্তিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎকার্যের আদেশ ও অসৎ কাজের বাধা প্রদান ও কোন কিছুকে হালাল ও হারাম নির্ণয় করার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যতম কার্যক্রম ছিল, সে প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন স্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেছে। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন-
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ. وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ
'যারা এ উম্মী নবী রাসূলের অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজিলে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করে, তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং তাদের উপর বিদ্যমান গুরুভার ও শৃঙ্খল থেকে তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার প্রতি অবতীর্ণ নূর (কুরআন) কে অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।'৩৮
ইসলামে সৎকাজ ও অসৎকাজ এবং হালাল ও হারাম বিষয়টি খুবই ব্যাপক। সুতরাং এ আয়াতের শিক্ষাই হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু কুরআনে বর্ণিত সৎকার্যের নির্দেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং কুরআনে বর্ণিত হালাল হারামকেই ঘোষণা দিয়ে ক্ষ্যান্ত হননি, তার বাইরে বিদ্যমান অনেক সৎকাজের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন ও অসৎকাজকে নিষেধ করেছেন এবং এর বাইরেরও অনেক কিছুকে হালাল ও হারাম হওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে হাদীছ না মানলে ইসলামের অনেক আমর বিল মা'রূফ ও নাহী আনিল মুনকার এবং হালাল ও হারাম আমাদের অগোচরেই থেকে যাবে। যারা তাঁর হাদীছ মানতে অস্বীকার করে তারা তাঁর এ সব হালাল - হারাম ও মা'রূফ মুনকারও অলক্ষ্যে অস্বীকার করে। আল-কুরআনের দ্বারাই অত্যাবশ্যকীয় করা ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেও কি কারো মুসলিম থাকার সুযোগ থাকে!
টিকাঃ
৩৮. সূরাহ আল-'আরাফ: ১৫৭