📄 ৩.১.৩ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানের প্রতি আহ্বান করার দায়িত্বপ্রাপ্ত
মুসলিম হওয়ার অনিবার্য শর্ত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনা ও ঐকান্তিক বিশ্বাস স্থাপন করা। একজন মুসলিমের জন্য এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে আহবান করার গুরুদায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তা'য়ালা তাঁরই হাবীব রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ন্যস্ত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا. لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
'আমি' তোমাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তাঁর রাসূলকে শক্তি যোগাও ও তাকে সম্মান কর এবং সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।'২৯ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দায়িত্ব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর মানুষ যাতে ঈমান আনে তারই ব্যবস্থা করা, এ আয়াতে সেই শাশ্বত সত্য কথাটিই ফুটে উঠেছে। সুতরাং আল-কুরআনের আলোকেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে মহা মূল্যবান ঈমান লাভ করার কোন পথ নেই। যারা হাদীছকে উপেক্ষা করে তারা মূলত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে যেহেতু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে ঈমান লাভের কোন সুযোগ নেই, সেহেতু হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেও ঈমান লাভের কোন পথ নেই। এটিও যে আল-কুরআনেরই বাণী শুধু আল-কুরআনের অনুসারীদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করা উচিত।
টিকাঃ
২৯. সূরাহ আল-ফাতহ: ০৮-০৯
📄 ৩.১.৪ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাঁর আনুগত্য
যে কোন রাসূল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে করে মানব জাতি তাঁর আনুগত্য করে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ
'আমি এ উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশেই তার আনুগত্য করা হবে।'৩০ সুতরাং, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করানোই হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ব্যতীত আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালার এ অভিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন কোন ক্রমেই সম্ভবপর নয়। সুতরাং যারা তাঁর হাদীছ মানতে অস্বীকার করল, তারা মূলত তাঁর আনুগত্যকেই অস্বীকার করল, আর যারা তাঁর আনুগত্য স্বীকারকে প্রত্যাখ্যান করল তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের যে সুমহান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা ধূলিস্যাত করে দিল। আর যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল তারা মূলত কুফরীই করল।
টিকাঃ
৩০. সূরাহ আন-নিসা: ৬৪
📄 ৩.১.৫ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য ও আল্লাহর আনুগত্য অবিচ্ছেদ্য
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে স্পষ্ট ভাষায় অভিন্ন ও অবিভাজ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে, তিনি যে খালিক ও ইলাহ সে হিসেবে; আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য হচ্ছে, তাঁরই রাসূল হিসেবে। রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আনুগত্য বলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই আল-কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
'কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।'৩১ কুরআনের দু'টি জায়গায় একই ভাষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩২ তিনি অন্যত্র আরো ইরশাদ করেন-
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
'আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩৩ ভাষার সামান্য কিছু ভিন্নতা থাকলেও মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের এতগুলো আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাথে কোন বিভাজন ও পার্থক্য না করেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এ দ্বারা মূলত উভয়েরই আনুগত্য যে অপরিহার্য, শুধু আল্লাহর আনুগত্য করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য বর্জন করার যে কোন সুযোগ নেই, সেই কথাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এমন কি একটি আয়াতে শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করারও নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
'তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা রহমত প্রাপ্ত হতে পার।৩৪
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের মূল আধার হাদীছকে বর্জন করার কোন সুযোগ আল-কুরআন কোন মুসলিমকে দেয় না। সুতরাং শুধু আল-কুরআন অনুসরণের প্রবক্তারা আল-কুরআনেরই এ নির্দেশ কি ভাবে উপেক্ষা করছে?
টিকাঃ
৩১. সূরাহ আল-নিসা: ৮০
৩২. সূরাহ আল-আনফাল : ০১. ২০, ৪৬, আল- মুজাদিলাহ : ১৩
৩৩. সূরাহ আন-নিসা: ৫৯, আন-নূর : ৫৪, মুহাম্মদ : ৩৩, আত-তাগাবুন : ১২
৩৪. সূরাহ আন-নূর: ৫৬
📄 ৩.১.৬ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীও ওহী
ওহী হচ্ছে সন্দেহাতীত জ্ঞানের উৎস। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী তাঁর মনগড়া কোন কিছু নয়। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীকৃত বাণীরই অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন-
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى. وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'তোমাদের সাথী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে এগড়া কথাও বলে না। এ তো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। '৩৫ এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ বলেন-
إنما يقول ما أمر به، يبلغه إلى الناس كاملا موفرًا من غير زيادة ولا نقصان.
'তিনি অবশ্যই এটি তাঁকে যেমনটি নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা পরিপূর্ণ ভাবেই কম বেশি না করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।'৩৬ সুতরাং একথা দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন বাণী মনগড়া নয়। বরং তা ওহীরই অন্তর্ভুক্ত। মূলত ওহী সাধারণত দীন সম্পর্কিত বিষয়েই হয়ে থাকে। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করাও শোভনীয় নয়। বরং তিনি যদি ওহী পরিবর্তনের চেষ্টা করতেন, তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শক্ত হাতে তা প্রতিহত করার ব্যবস্থা নিবেন বলেও হুশিয়ারী দিয়েছেন। এ প্রসংগে আল্লাহ 'আয্যা ওয়া জাল্লা বলেন-
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ . لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ . فَمَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ.
'সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, আমি অবশ্যই তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, এবং তার জীবন ধমনী কেটে দিতাম, এরপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তাকে রক্ষা করতে পারত।'৩৭ সুতরাং সন্দেহাতীত ভাবেই বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য। তাঁর বাণী সকল সন্দেহ ও সংশয়ের উর্দ্ধে। আল-কুরআনে এত স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপনের পরেও কি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ উপেক্ষা করা অথবা অস্বীকার করার সুযোগ কোন মুসলিমের জন্য রয়েছে?
টিকাঃ
৩৫. সূরাহ আন-নাজম: ২-৪
৩৬. ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম, ১৪২০ হি., মদীনাহ, ৭খ. ৪৪৩ পৃঃ
৩৭. সূরাহ আল হাক্কাহ: ৪৪-৪৭