📄 ৩.১.২ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথনির্দেশ অলংঘনীয়
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার বাস্তব রূপকার হচ্ছেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি উত্তম কাজের পথ নির্দেশ দিয়েছেন, যেমনি খারাপ কাজ থেকেও নিষেধ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাঁর বান্দাদেরকে এ নির্দেশ মত কাজ করতে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এ বিষয়ে বলেছেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ .
'রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছে, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছে, তা থেকে বিরত থাক। এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।'২৭
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের এ আয়াতের স্পষ্ট শিক্ষা হচ্ছে, কোন মুসলিমের জন্য রাসূলুল্লাহ ছال্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ ও নিষেধ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁর নির্দেশ ও নিষেধ উপেক্ষা করাই হচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশ অবমাননা করা। আর আল্লাহর নির্দেশ অবমাননা করলে মুসলিম থাকার কোন সুযোগ থাকে না। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের নির্দেশও যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা, বিশুদ্ধ হাদীছেও তা বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوتَشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللَّهِ فَبَلَغَ ذَلِكَ امْرَأَةً مِنْ بَنِي أَسَدٍ يُقَالُ لَهَا أُمُّ يَعْقُوبَ فَجَاءَتْ فَقَالَتْ إِنَّهُ بَلَغَنِي عَنْكَ أَنَّكَ لَعَنْتَ كَيْتَ وَكَيْتَ فَقَالَ وَمَا لِي أَلْعَنُ مَنْ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ هُوَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَقَالَتْ لَقَدْ قَرَأْتُ مَا بَيْنَ اللُّوْحَيْنِ فَمَا وَجَدْتُ فِيهِ مَا تَقُولُ قَالَ لَئِنْ كُنْتِ قَرَأْتِيهِ لَقَدْ وَجَدْتِيهِ أَمَا قَرَأْتِ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا قَالَتْ بَلَى قَالَ فَإِنَّهُ قَدْ نَهَى عَنْهُ قَالَتْ فَإِنِّي أَرَى أَهْلَكَ يَفْعَلُونَهُ قَالَ فَاذْهَبِي فَانْظُرِي فَذَهَبَتْ فَنَظَرَتْ فَلَمْ تَرَ مِنْ حَاجَتِهَا شَيًْا فَقَالَ لَوْ كَانَتْ كَذَلِكَ مَا جَامَعَتُهَا.
আবদুল্লাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহ লানত করেছেন ঐসব নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকন করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকন করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রূরুর চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। এসব নারী আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃতি সাধন করেছে।
এর পর বানু আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকুব নাম্নীয় এক মহিলার কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে সে এসে বলল, আমি জানতে পারলাম, আপনি এ ধরণের মহিলাদের প্রতি লানত করেছেন। তিনি বললেন- আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার প্রতি লানত করেছেন, আল্লাহর কিতাবে যার প্রতি লানত করা হয়েছে, আমি তার প্রতি লানত করব না? তখন মহিলা বলল, আমি দুই ফলকের মাঝখানে যা আছে (পূর্ণ কুরআন) পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলেছেন, তা তো পাইনি? আবদুল্লাহ বললেন, যদি তুমি আল-কুরআন পড়তে তাহলে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি? "রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।" মহিলা বলল- হ্যাঁ নিশ্চয়ই পড়েছি। আবদুল্লাহ রাদি আল্লাহু 'আনহু বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। মহিলা বলল- আমার মনে হয় আপনার পরিবারও এ কাজ করে। তিনি বললেন- যাও এবং ভালভাবে দেখে এস। তারপর মহিলা গেল এবং ভালভাবে দেখে এল। কিন্তু তার প্রয়োজনের কিছুই দেখতে পেলোনা। তখন তিনি বললেন, যদি আমার স্ত্রী এমনটি করত, তবে সে আমার সঙ্গে একত্রে থাকতে পারত না।২৮
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ ও নিষেধ পূর্ণভাবে পালন করা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন দ্বারাই প্রমাণিত। সুতরাং যারা শুধু আল-কুরআন পালন করার পক্ষে সেই আল-কুরআনই তো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথনির্দেশ তথা হাদীছকে অলংঘনীয় বলে উল্লেখ করেছে।
টিকাঃ
২৭. সূরাহ আল-হাশর:০৭
২৮. ছাহীহ আল-বুখারী, ৪খ. ১৮৫৩ পৃঃ
📄 ৩.১.৩ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানের প্রতি আহ্বান করার দায়িত্বপ্রাপ্ত
মুসলিম হওয়ার অনিবার্য শর্ত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনা ও ঐকান্তিক বিশ্বাস স্থাপন করা। একজন মুসলিমের জন্য এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে আহবান করার গুরুদায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তা'য়ালা তাঁরই হাবীব রাসূল ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ন্যস্ত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا. لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
'আমি' তোমাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তাঁর রাসূলকে শক্তি যোগাও ও তাকে সম্মান কর এবং সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।'২৯ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দায়িত্ব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর মানুষ যাতে ঈমান আনে তারই ব্যবস্থা করা, এ আয়াতে সেই শাশ্বত সত্য কথাটিই ফুটে উঠেছে। সুতরাং আল-কুরআনের আলোকেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে মহা মূল্যবান ঈমান লাভ করার কোন পথ নেই। যারা হাদীছকে উপেক্ষা করে তারা মূলত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে যেহেতু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপেক্ষা করে ঈমান লাভের কোন সুযোগ নেই, সেহেতু হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেও ঈমান লাভের কোন পথ নেই। এটিও যে আল-কুরআনেরই বাণী শুধু আল-কুরআনের অনুসারীদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করা উচিত।
টিকাঃ
২৯. সূরাহ আল-ফাতহ: ০৮-০৯
📄 ৩.১.৪ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাঁর আনুগত্য
যে কোন রাসূল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে করে মানব জাতি তাঁর আনুগত্য করে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ
'আমি এ উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশেই তার আনুগত্য করা হবে।'৩০ সুতরাং, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করানোই হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করা ব্যতীত আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালার এ অভিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়ন কোন ক্রমেই সম্ভবপর নয়। সুতরাং যারা তাঁর হাদীছ মানতে অস্বীকার করল, তারা মূলত তাঁর আনুগত্যকেই অস্বীকার করল, আর যারা তাঁর আনুগত্য স্বীকারকে প্রত্যাখ্যান করল তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের যে সুমহান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা ধূলিস্যাত করে দিল। আর যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল তারা মূলত কুফরীই করল।
টিকাঃ
৩০. সূরাহ আন-নিসা: ৬৪
📄 ৩.১.৫ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য ও আল্লাহর আনুগত্য অবিচ্ছেদ্য
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে স্পষ্ট ভাষায় অভিন্ন ও অবিভাজ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে, তিনি যে খালিক ও ইলাহ সে হিসেবে; আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য হচ্ছে, তাঁরই রাসূল হিসেবে। রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আনুগত্য বলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই আল-কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
'কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।'৩১ কুরআনের দু'টি জায়গায় একই ভাষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩২ তিনি অন্যত্র আরো ইরশাদ করেন-
أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
'আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।'৩৩ ভাষার সামান্য কিছু ভিন্নতা থাকলেও মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের এতগুলো আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাথে কোন বিভাজন ও পার্থক্য না করেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এ দ্বারা মূলত উভয়েরই আনুগত্য যে অপরিহার্য, শুধু আল্লাহর আনুগত্য করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য বর্জন করার যে কোন সুযোগ নেই, সেই কথাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এমন কি একটি আয়াতে শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করারও নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
'তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা রহমত প্রাপ্ত হতে পার।৩৪
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যের মূল আধার হাদীছকে বর্জন করার কোন সুযোগ আল-কুরআন কোন মুসলিমকে দেয় না। সুতরাং শুধু আল-কুরআন অনুসরণের প্রবক্তারা আল-কুরআনেরই এ নির্দেশ কি ভাবে উপেক্ষা করছে?
টিকাঃ
৩১. সূরাহ আল-নিসা: ৮০
৩২. সূরাহ আল-আনফাল : ০১. ২০, ৪৬, আল- মুজাদিলাহ : ১৩
৩৩. সূরাহ আন-নিসা: ৫৯, আন-নূর : ৫৪, মুহাম্মদ : ৩৩, আত-তাগাবুন : ১২
৩৪. সূরাহ আন-নূর: ৫৬