📄 ২.৫ রাজা বাদশাদের আনুকূল্য অর্জন
অনেকেই তদানিন্তন রাজা বাদশাদের আনুকূল্য লাভের আশায় তাদের খুশি করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে জন্য তারা এমন কিছু হাদীছ নিজে রচনা করেছিল যা রাজাদের নৈকট্য লাভে সহায়ক হয়। যেমন আব্বাসী খালীফাহ হারুনুর রাশীদ কবুতর উড়াতে খুবই ভালবাসতেন। তাঁকে খুশি করার জন্য আবুল বুখতারী একটি জাল হাদীছ রচনা করে। তার বর্ণনা হচ্ছে-
حدثني هشام بن عروة عن أبيه عن عائشة: " أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يطير الحمام.
'হিশাম ইবন 'উরওয়াহ সূত্রে বর্ণিত, তার পিতা 'আয়িশাহ রাদিআল্লাহু 'আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবুতর উড়াতেন।'১৮
টিকাঃ
১৮. প্রাগুক্ত, ১খ. ১২ পৃঃ
📄 ২.৬ ওয়াজ নাছীহাতে বিস্ময়কর কিছু সংযোজন
কিছু ব্যক্তিবর্গ ছিলেন ওয়াজ- নাসীহাত নিয়ে ব্যস্ত। তাঁরা শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ, তাদেরকে বিস্মিত করা, তাদেরকে কাঁদানো, হাসানো প্রভৃতি লক্ষ্যকে সামনে রাখেন। তাঁরা আজগুবী বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী তৈরি করে, তা গ্রহণযোগ্য করার জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে চালিয়ে দিতেন। কোন কিছুকে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রশংসা করতে গিয়ে তা প্রমাণ করার লক্ষ্যে তাঁরা হাদীছ জাল করতেন। এর উদাহরণ হচ্ছে-
عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: " الديك الأبيض الأفرق حبيبي وحبيب حبيبي جبريل يحرس بيته وستة عشر بيتا من جيرته أربعة من اليمين وأربعة من الشمال وأربعة من قدام وأربعة من خلف.
'আনাস ইবন মালিক রাদিআল্লাহু 'আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ঝুঁটি ওয়ালা সাদা মোরগ আমার বন্ধু, আমার বন্ধুর বন্ধু, জিবরাঈল 'আলায়হিস সালাম তার ও তার পার্শ্বের ১৬ টি বাড়ি পাহারা দেন; তার ডানের চারটি, বামের চারটি, সামনের চারটি ও পেছনের চারটি।'১৯
حدثنا إبراهيم بن عبد الواحد الطبري قال سمعت جعفر بن محمد الطيالسي يقول صلى أحمد بن حنبل ويحيى بن معين في مسجد الرصافة فقام بين أيديهم قاص فقال حدثنا أحمد بن حنبل ويحيى بن معين قالا حدثنا عبد الرزاق عن معمر عن قتادة عن أنس قال قال رسول الله من قال لا إله إلا الله خلق الله من كل كلمة منها طيرا منقاره من ذهب وريشه من مرجان... فجعل أحمد بن حنبل ينظر إلى يحيى بن معين ويحيى ينظر إلى أحمد فقال له أنت حدثته بهذا فيقول والله ما سمعت بهذا إلا الساعة فلما فرغ من قصصه ... قال له يحيى بن من حدثك بهذا الحديث؟ فقال أحمد بن حنبل ويحيى بن معين فقال أنا يحيى بن معين وهذا أحمد بن حنبل ما سمعنا بهذا قط في حديث رسول الله فإن كان ولا بد من الكذب فعلى غيرنا فقال له أنت يحيى بن معين قال نعم قال لم أزل أسمع أن يحيى بن معين أحمق ما تحققته إلا الساعة فقال له يحيى كيف علمت أني أحمق قال كأن ليس في الدنيا يحيى بن معين وأحمد بن حنبل غيركما قد كتبت عن سبعة عشر أحمد بن حنبل ويحيى بن معين فوضع أحمد كمه على وجهه وقال دعه يقوم فقام كالمستهزئ بهما.
'ইবরাহীম ইবনু 'আবদুল ওয়াহিদিত তাবারী বলেন- আমি জা'ফার ইবন মুহাম্মাদুত তায়ালিসীকে বলতে শুনেছি, আহমাদ ইবন হাম্বল এবং ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন আররাছাফাহ মাসজিদে ছালাত আদায় করেন। এ সময় একজন গল্পকার বললেন, আমাদেরকে আহমাদ ইবন হাম্বল এবং য়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তারা বলেন, আমাদেরকে 'আবদুর রায্যাক ইবন মু'আম্মার কাতাদাহ সূত্রে আনাস রাদি আল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি لا إله إلا الله বলবে এর প্রত্যেকটি শব্দদ্বারা আল্লাহ একটি পাখি তৈরি করবেন, যার ঠোট হবে স্বর্ণের আর পালক হবে মারজানের।... এটি শুনে আহমাদ ইবন হাম্বল ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈনের দিকে আর ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন আহমাদ ইবন হাম্বলের দিকে তাকাত্মাকি শুরু করলেন। আহমাদ ইবন হাম্বল ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈনকে বললেন, আপনি কী এ কথা বলেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি এই মাত্র এটি শুনলাম। ঐ ব্যক্তি যখন তার গল্প বলা শেষ করলেন, তখন ইয়াহয়িযুবনু মা'ঈন বললেন, কে আপনাকে এ হাদীছ শুনিয়েছেন? তিনি বললেন, আহমাদ ইবন হাম্বল এবং ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন। তিনি বললেন, আমি ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন আর এ হলেন আহমাদ ইবন হাম্বল। আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছে কক্ষনো এ কথা শুনেনি। তাহলে এটা অবশ্যই মিথ্যা হবে। তবে আমরা ব্যতীত অন্য কেউ হতে পারে। তিনি বললেন, আপকি কী ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন? তিনি বললেন, হাঁ, তিনি বললেন, আমি শুনতাম ইয়াহয়িযুবনু মা'ঈন একজন আহমাক, এইমাত্র তা প্রমাণিত হলো। ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন তাকে বললেন, তুমি কিভাবে জানলে যে আমি একজন আহমাক? তিনি বললেন, দুনিয়ায় কি আর কোন আহমাদ ইবন হাম্বল এবং ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন নেই? আমি তো সতের জন আহমাদ ইবন হাম্বল এবং ইয়াহয়িয়ুবনু মা'ঈন থেকে (হাদীছ) লিখেছি। তখন আহমাদ ইবন হাম্বল তার হাতের পুট ঐ ব্যক্তির চেহারার উপর রাখলেন এবং বললেন, তাকে ছেড়ে দিন, সে দাঁড়াক, সে তাদের দু'জনের সাথে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে দাঁড়াল।'২০ একজন মিথ্যুক হাদীছ নিয়ে কত বড় জালিয়াতি করতে পারে তারই জাজ্জ্বল্য উদাহরণ হচ্ছে এই ঘটনা।
উল্লেখ্য যে, ওয়াহাব ইবন মুনাযারাহ বিভিন্ন আমলের ফাদীলাতের হাদীছ নিজেই বানাতেন।২১
টিকাঃ
১৯. প্রাগুক্ত, ৩খ. ৫পৃঃ
২০. আস-সুয়ূতী, আল-লাআলিল মাহনু'আহ ফিল আহাদিছুল মাহনু'আহ, বায়রূত, তাবি, ২খ. ৯১ পৃঃ
২১. প্রাগুক্ত, ১খ. ৮ পৃঃ
📄 ২.৭ মিথ্যা হাদীছ প্রণয়নের ভয়াবহতা সম্পর্কে অজ্ঞতা
ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবন বিধান। এখানে দুনিয়া বিরাগী হয়ে আধ্যাত্মিকতা অনুশীলন ও বৈরাগ্য সাধনের কোন সুযোগ নেই। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্য হচ্ছে-
لا رهبانية في الإسلام
'ইসলামে বৈরাগ্যবাদ নেই'।২২
এরপরেও অনেক দুনিয়াত্যাগী সুফী সাধক অজ্ঞতা বশতই এ জীবন যাপন শুরু করেন, যা ছিল তাঁদের দৃষ্টিতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায়। তাঁরা বনে জঙ্গলে, লোক চক্ষুর অন্তরালে ইবাদাত বন্দেগী, যিকর আযকারের অনুশীলন শুরু করেন। ইসলামে তার কোন অনুমোদন না থাকলেও তা দীনী কাজ হিসাবে মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা পেতে থাকে। তাঁরা তাঁদের এ কর্মকান্ডকে ইসলামী কর্মকান্ড বলে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সাধারণ জনগণকে এদিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে অনেক এমন মন গড়া হাদীছ বানিয়ে তা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ বলে চালিয়ে দিতেন। তাঁদের চিন্তা ছিল এই যে, দীনের স্বার্থে এ ধরনের মিথ্যা হাদীছ রচনা করা অপরাধের কিছু নয়। এরা মূলতঃ বিভ্রান্ত সূফী মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাঁদের অসতর্কতা ও অজ্ঞতাও মিথ্যা হাদীছ রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে। এইরূপ জাল হাদীছের জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে-
أفضل الزهد في الدنيا ذكر الموت 'দুনিয়ার সর্বোত্তম যুহৃদ হচ্ছে, মৃত্যুকে স্মরণ করা।'২৩ আরো উদাহরণ হচ্ছে-
الدنيا حرام على أهل الآخرة والآخرة حرام على أهل الدنيا والدنيا والآخرة حرام على أهل الله 'আখিরাতমুখী লোকদের জন্য দুনিয়াদার হওয়া হারাম, দুনিয়াদার লোকদের জন্য আখিরাত হারাম, আল্লাহ ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারাম।'২৪
এমনি অসংখ্য জাল হাদীছের প্রচলন লক্ষ্য করে 'ইলমুল হাদীছের বিদগ্ধ পণ্ডিতগণ বিশুদ্ধ হাদীছ সংরক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। উদ্ভব হয় রিজাল শাস্ত্রের। শুরু হয় সনদের যাচাই বাছাই। প্রয়োগ হতে থাকে আল জারহ ওয়াত-তা'দীল বা হাদীছ বর্ণনাকারীদের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা পদ্ধতি। করা হয় এক সনদে বর্ণিত হাদীছ অন্য সনদে বর্ণিত হাদীছের সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা। প্রণয়ন করা হয় হাদীছ গ্রহণযোগ্য হওয়ার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নীতিমালা। যার অনিবার্য পরিণতিতে জাল ও দুর্বল হাদীছ থেকে বিশুদ্ধ হাদীছ পৃথক করা খুবই সহজ হয়ে পড়ে। সন্দেহাতীত ভাবে হাদীছ গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুতরাং বর্তমানে জাল হাদীছ ও ছাহীহ হাদীছ স্পষ্টাকারে পার্থক্য হয়ে গেছে।২৫
টিকাঃ
২২. আস-সুয়ূতী ও অন্যান্যরা, শারহি সুনানু ইবন মাজাহ, করাচী, তাবি, ১খ. ২৮৯পৃঃ
২৩. আল-আলবানী, আল-সিলসিলাতুদ্দয়ীফাহ, রিয়াদ, তাবি, ৫খ. ৩১০ পৃঃ
২৪. প্রাগুক্ত, ১খ. ১০৫পৃঃ
২৫. আফীফ আত-তববারা, রূহুদ্দীনিল ইসলামী, তাবি, ৪৬৩-৪৬৫পৃঃ