📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ২.২ গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা

📄 ২.২ গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা


জাহিলী ধ্যান-ধারণাপুষ্ট কিছু লোকের মধ্যে নিজেদের সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য মন গড়া কিছু হাদীছ রচনা করার প্রবণতা দেখা গেছে। এসব হাদীছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিশেষ বিশেষ গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা। আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেও এমন অনেক হাদীছ বানানোর প্রমাণ আছে। এগুলো আসলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত তাঁর মুখ নিসৃত কোন হাদীছ নয়। এগুলো আসলে অন্যদের রচিত, যা তারা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্য বলেই চালিয়ে দিয়েছে। জাতি ও গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে রচিত জাল হাদীছের উদাহরণ হচ্ছে-
خير الناس العرب وخير العرب قريش وخير قريش بنو هاشم وخير العجم فارس...
"উত্তম মানুষ হচ্ছে আরবরা, উত্তম আরব হচ্ছে কুরায়িশরা, উত্তম কুরায়িশ হচ্ছে বানু হাশীম আর উত্তম অনারব হচ্ছে পারস্যবাসীরা।"৯

টিকাঃ
৯. আশ-শাওকানী, আল-ফাওয়ায়িদুল মাজমুআ'তু ফীল-আহাদিছিল মাওদু'আহ, বায়রূত, ২৪০৭ হিঃ, ১খ., ৪১৪ পৃঃ

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ২.৩ ‘আকীদাহ বিশ্বাস ও ফিকহী মাসআলায় মতানৈক্য

📄 ২.৩ ‘আকীদাহ বিশ্বাস ও ফিকহী মাসআলায় মতানৈক্য


গ্রীক ও রোমান দর্শনের বিষবাষ্প দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অথবা ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্রে পড়ে কিছু পথভ্রষ্ট ব্যক্তি আল-কুরআন সুন্নাহর সঠিক 'আকীদাহ বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়। তারা তাদের এ ভ্রান্ত মতামত প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেরাই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে হাদীছ বানিয়ে তা নিজেদের ভ্রান্তমতকে প্রতিষ্ঠা করার প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করত। এর সাথে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দূরতম কোন সম্পর্কও ছিল না। শুধু যিনদিকরাই ১৪ হাজার হাদীছ রচনা করে। এর চেয়ে আরো ভয়াবহ হচ্ছে, আহমাদ ইবন আবদুল্লাহ আল জুবিয়ারী, মুহাম্মাদ বিন আকালাহ আল কিরমানী ও মুহাম্মাদ ইবন তামীমূল ফারয়ারী, এ তিনজন মিলে ১০ হাজার জাল হাদীছ রচনা করে।১০ অনেকেই ফিকহ মাসআলা অনুসরণের ক্ষেত্রেও সঠিক পথ থেকে বিচ্যূত হয়। ফিকহ শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু আলিমের এরূপ জাল হাদীছ রচনার ন্যাক্কারজনক ভূমিকাও লক্ষ্যণীয়। উদাহরণ স্বরূপ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে-
عن أنس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم " يكون في أمتى رجل يقال له محمد بن إدريس أضر على أمتى من إبليس .
'আনাস রাদি আল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস নামের এক ব্যক্তি ইবলিসের চেয়েও আমার উম্মাতের জন্য বেশি ক্ষতি কারক হবে।”১১ এটি যে শাফি'ঈ মাযহাবের বিরোধীদের দ্বারা রচিত, তা সহজেই অনুমেয়। আরো বর্ণিত হয়েছে যে-
عن أنس رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم " من رفع يديه في الركوع فلا صلاة له."
'আনাস রাদি আল্লাহু 'আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে তার দু'হাত রুকু'র সময় উচু করবে, তার ছালাত আদায় হবে না।'১২ হাত উঁচু করার বিপক্ষীয়দের পক্ষ থেকে বানানো এটি একটি জাল হাদীছ। যারা রামাদান মাসে বিশ রাক'আত ছালাতুত তারাবীহ আদায় করাকেই অত্যাবশ্যকীয় করে নিয়েছে তাদের রচিত একটি জাল হাদীছ হচ্ছে-
হাদীছ ইব্‌ন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন: আন্‌ নাবিয়্যু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কান ইউসল্লী ফী শাহরি রমাদান 'ইশরীনা রিক্'আতান.
'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাদান মাসে বিশ রাক'আত ছালাত আদায় করতেন।'১৩ এটি মূলত একটি ছাহীহ হাদীছের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং হাদীছটি যে জাল তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছাহীহ হাদীছটি হচ্ছে-
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ كَيْفَ كَانَتْ صَلَاةُ رَسُولِ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - فِي رَمَضَانَ قَالَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم - يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلَا فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً.
'আবূ সালামা ইবনু 'আবদির রহমান রাদিআল্লাহু 'আনহু 'আয়িশা রাদিআল্লাহু 'আনহাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, রমাদানে 'রাসূলূল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদান ও এ ব্যতীত অন্য মাসেও এগারো রাকা'আতের বেশি ছালাত আদায় করতেন না। '১৪ হাদীছ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে-
القرآن كلام الله تعالى غير مخلوق، فمن قال مخلوق فهو كافر بالله.
'আল্লাহর বাণী আল-কুরআন সৃষ্ট নয়, যে বলে এটি সৃষ্ট সে আল্লাহর সাথে কুফরী করে।'১৫ আসলে এটি হাদীছ নয়, এটি মূলত আহলুস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আতের কিছু আলিমদের বক্তব্য। আল-কুরআন সৃষ্ট, না সৃষ্ট নয়, এ নিয়ে যখন আকীদাহগত মতভেদ তুঙ্গে, তখন আহলুস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আতের কিছু অতি উৎসাহী লোক তাদের পক্ষের দলীলকে অকাট্য প্রমাণের জন্য যে এটিকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীছ বলে চালিয়ে দিয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। 'আকীদাহ সংক্রান্ত মতানৈক্য যে হাদীছ জাল করাকে উৎসাহিত করেছে এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

টিকাঃ
১০. প্রাগুক্ত, ১খ. ৯পৃঃ
১১. প্রাগুক্ত, ১খ. ৪৩ পৃঃ
১২. প্রাগুক্ত
১৩. আত-তাবারানী, আল-মু'জামূল আওসাত, কায়রো, ১৪১৪হিঃ ৫খ., ৩২৪ পৃঃ আল- আলবানী হাদীছটিকে জাল বলেছেন। ইরওয়াউল গালীল ফি তাখরীজি আহাদীছু মানারিস সাবীল, ১৪০৫ হিঃ, বায়রূত, ২খ. ১৯১ পৃঃ
১৪. ছাহীহ আল-বুখারী, ১খ. ৩৮৫ পৃঃ, হাহীহ মুসলিম, আছ-ছাহীহ, তাবি., ২খ., ১৬৬ পৃঃ
১৫. আছ-ছাগানী, আল-মাওদূ'আত, তাবি, ১খ. ৪ পৃঃ

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ২.৪ উৎসাহ প্রদানে অতিরঞ্জন

📄 ২.৪ উৎসাহ প্রদানে অতিরঞ্জন


কোন কাজের ফদিলত বা মর্যাদা বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও হাদীছ জাল করার অপকর্ম বেশ লক্ষ্যণীয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের নমনীয়তা, অসতর্কতা ও অদূরদর্শিতা, ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে বাড়াবাড়ি করতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। কোন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রমাণ, কোন আয়াতের বিশেষ গুরুত্ব দান ও কোন সূরার বিশেষ ফদিলত বর্ণনা করতে গিয়ে তারা যে, নিজেরাই অসংখ্য হাদীছ রচনা করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে চালিয়ে দিয়েছে, তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ হচ্ছে, ফাদাইলের গ্রন্থসমূহ। তাফসীরে বায়দাভী ও তাফসীরে খাযিনের মত গুরুত্বপূর্ণ তাফসীর গ্রন্থে আবু আছমাহ নূহ ইবন আবী মারইয়াম হতে ভিন্ন ভিন্ন সূরা তিলাওয়াতের যে ফদিলত বিষয়ক হাদীছ বর্ণনা করা হয়েছে, তা এখানে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায়। এর অধিকাংশ সনদই আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন বলে বলা হলেও, এর সাথে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। এ বিষয় প্রমাণের জন্য একটি ঘটনাই যথেষ্ট। বর্ণিত হয়েছে যে-
قيل لأبي عصمة نوح بن أبي مريم المروزى من أين لك عن عكرمة عن بن عباس في فضائل القرآن سورة سورة وليس عند أصحاب عكرمة هذا ! فقال: إنى رأيت الناس أعرضوا عن القرآن واشتغلوا بفقه أبى حنيفة ومغازي ابن إسحاق فوضعت هذا الحديث
'আবূ 'ইছমাহ নূহুবনু আবী মারয়ামিল মারূযী কে বলা হয়েছিল: আল-কুরআনের প্রতিটি সূরার ফাদীলাত সম্পর্কে আপনি 'ইকরামাহ সূত্রে ইবন 'আব্বাস রাদি আল্লাহু 'আনহুমা সূত্রে যা বর্ণনা করেছেন, তা কোথেকে বর্ণনা করেছেন? 'ইকরামার সাথীদের নিকট তো এগুলো নেই। তিনি বললেন- 'আমি দেখলাম মানুষ আল-কুরআনবিমুখ হয়ে আবূ হানীফার ফিকহ ও ইবন আবী ইসহাকের মাগাযী নিয়ে মাশগুল হয়ে পড়েছে, তখন আমি এই হাদীছগুলো বানিয়ে ফেললাম।'১৬ আরো বর্ণিত হয়েছে-
عن ابن مهدي قال قلت الميسرة بن عبد ربه من أين جئت بهذه الأحاديث من قرأ كذا فله كذا؟ قال وضعتها أرغب الناس فيها.
'ইবন মাহদী বলেন, আমি মায়সারাহ ইবন 'আবদি রাব্বিহকে বললাম, যে এটি পাঠ করবে তার জন্য এটি; আপনি কোথা হতে এ হাদীছগুলো বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, আমি লোকদেরকে এদিকে উৎসাহী করার জন্য এগুলো বানিয়েছি, সুতরাং ভাল কাজে উৎসাহ প্রদানের ক্ষেত্রেও অসংখ্য জাল হাদীছ রচনা হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই।১৭

টিকাঃ
১৬. প্রাগুক্ত, ১খ. ৪১ পৃঃ
১৭. ইবনুল-জাওযী, ১খ. ৪০ পৃঃ

📘 হাদিস নিয়ে বিভ্রান্তি > 📄 ২.৫ রাজা বাদশাদের আনুকূল্য অর্জন

📄 ২.৫ রাজা বাদশাদের আনুকূল্য অর্জন


অনেকেই তদানিন্তন রাজা বাদশাদের আনুকূল্য লাভের আশায় তাদের খুশি করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে জন্য তারা এমন কিছু হাদীছ নিজে রচনা করেছিল যা রাজাদের নৈকট্য লাভে সহায়ক হয়। যেমন আব্বাসী খালীফাহ হারুনুর রাশীদ কবুতর উড়াতে খুবই ভালবাসতেন। তাঁকে খুশি করার জন্য আবুল বুখতারী একটি জাল হাদীছ রচনা করে। তার বর্ণনা হচ্ছে-
حدثني هشام بن عروة عن أبيه عن عائشة: " أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يطير الحمام.
'হিশাম ইবন 'উরওয়াহ সূত্রে বর্ণিত, তার পিতা 'আয়িশাহ রাদিআল্লাহু 'আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ হাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবুতর উড়াতেন।'১৮

টিকাঃ
১৮. প্রাগুক্ত, ১খ. ১২ পৃঃ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00