📄 ভূমিকা
হাদীছ হচ্ছে ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস, যার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইসলামী শারী'আতের গগনচুম্বি অট্টালিকা। হাদীছকে বাদ দিয়ে ইসলামের পরিপূর্ণ রূপ কল্পনাও করা যায় না। ইসলামের অস্তিত্বের সাথে ওৎ-প্রোতভাবে জড়িত এই হাদীছ সম্পর্কে আমাদের কিছু সংখ্যক লোকের স্বচ্ছ ধারণা নেই। সেই কারণেই তাদের মধ্যে হাদীছ কেন্দ্রিক কিছু বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হয়েছে। হাদীছ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণাদান ও এই সব বিভ্রান্তি অপনোদনই হচ্ছে এই লেখাটির প্রতিপাদ্য বিষয়।
হাদীছ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে, আমাদের সমাজের অনেকেই হাদীছকে যথাযথ মূল্যায়ন করে এর শিক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছেন না। অনেকের নিকট হাদীছ যেভাবে গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। হাদীছের গুরুত্ব যে ঈমান আকীদাহর সাথে সম্পর্কিত, মুসলিম থাকা না থাকার সাথে সম্পর্কিত; এই শাশ্বত সত্যটি প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। হাদীছকে গুরুত্ব দেওয়ার সাথে সাথে জাল, মিথ্যা ও দুর্বল হাদীছের ব্যাপারে যাতে আমরা সকলেই সতর্ক থাকি, সেই বিষয়টিও এখানে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্ট ও. সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী বর্জন করে নিরপেক্ষ ও উদার মন নিয়ে হাদীছ অধ্যয়নের দিকে এখানে উদাত্ত আহবান জানানো হয়েছে। হাদীছকে যথাযোগ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যাতে কেউ বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করতে পারে, সে বিষয়েও এখানে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। হাদীছ নিয়ে বিষোদগারকারীদের থেকে মুসলিম উম্মাহকে সাবধান থাকার পরামর্শও দেয়া হয়েছে এখানে। যে সব ক্ষেত্রে হাদীছ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে, তার সবটুকুও আলোচনা সম্ভব না হলেও, প্রসঙ্গটি স্পষ্ট করার লক্ষ্যে উদাহরণস্বরূপ দু'একটি বিষয় এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। চিন্তাশীল ও গবেষক পাঠকগণ এই লেখা থেকে আরো গবেষণা করার খোরাক পাবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। লেখাটিকে তথ্য নির্ভর করা ও একে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য যারা সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে আমাদেরকে ধন্য করেছেন, তাদের প্রতি আমরা চির কৃতজ্ঞ। উল্লেখ্য যে, এখানে উল্লিখিত তথ্যসূত্র আল- মাকতাবাতুশ শামিলার তৃতীয় সংস্করণ হতে সংগৃহিত হয়েছে। লেখাটি ছাপানোর দায়িত্ব নেয়ায় বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃপক্ষকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াসকে কবুল করুন। পাঠক সমাজকে এথেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!
ড. আ.হ.ম. তরীকুল ইসলাম
📄 ১. সূচনা
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীছ হচ্ছে এ জীবন ব্যবস্থার প্রধান উৎস। আল-কুরআন আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের পক্ষ হতে পাঠানো বিশ্ব মানবতার জন্য পথ নির্দেশিকা। অনুসরণ করার একমাত্র উপযোগী এ মহাগ্রন্থ মানব জাতির জন্য অতুলনীয় এক আলোক বর্তিকা। এরই পাশাপাশি রয়েছে, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশুদ্ধ হাদীছসমূহ। অসংখ্য হাদীছের নির্মল আলোক রশ্মিও ইসলামের দৃষ্টিতে নিখিল বিশ্বের মানুষের জন্য সঠিক পথ ও পাথেয় হিসেবে গণ্য।
নিঃসন্দেহে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নির্ভুল বাণী। কোন সন্দেহ-সংশয় থেকে এ গ্রন্থ একেবারেই মুক্ত। বিশুদ্ধ হওয়ার যে কোন মানদন্ডে এ গ্রন্থ পূর্ণ ভাবে উত্তীর্ণ। তথ্যের বিশুদ্ধতায়, ভাব, ভাষা, উপস্থাপনা মোটকথা সকল দিক থেকে এ গ্রন্থ অসাধারণ ও তুলনাহীন। এ আল-কুরআন যেই প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার বাণী, তাঁরই স্বীকৃত রাসূল হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁরই রেখে যাওয়া অসংখ্য বিশুদ্ধ হাদীছও বিশুদ্ধ পন্থায় সংরক্ষিত হয়েছে যুগ যুগ ধরে। বলা বাহুল্য, আল-কুরআন ও আল-হাদীছকে একত্রে অনুসরণ করা না করাকে নিয়ে অনেকের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, মহামহিম আল্লাহর বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআনই আমাদের পথ নির্দেশিকা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। শুধু এ গ্রন্থকে অনুসরণ করলেই চলবে। । অন্য কোন কিছু তো নয়ই এমনকি হাদীছ অনুসরণেরও প্রয়োজন নেই। অপর পক্ষ বলেছেন, না, হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করে, শুধু আল কুরআনকে অনুসরণ করা কোন ক্রমেও সম্ভব নয়। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও হাদীছ- ইসলামের এ দুই প্রধান উৎসই সম্মিলিত ভাবে ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ রূপ দান করেছে। এর একটিকে বাদ দিয়ে পরিপূর্ণ ইসলাম কল্পনাও করা যায় না। বরং শুধু আল-কুরআনকে মেনে চলা এবং হাদীছকে অস্বীকার করা ইসলামে জঘণ্যতম অপরাধ।
উল্লেখিত এ উভয় পক্ষই আল-কুরআন ও হাদীছের অনেকগুলো প্রমাণ তাদের মতামতকে সুদৃঢ় করার জন্য উপস্থাপন করেছেন। এখন এ উভয় পক্ষেরই অবস্থান ইসলামের আলোকে মূল্যায়ণ হওয়া অতীব প্রয়োজন। বিষয়টি অমীমাংসিত থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাবে মুসলিম উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে, তাও আজ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাদীছ ইসলামের এমন কোন নগণ্য উৎস কিনা, যা উপেক্ষা করে ইসলামী
📄 ৫. উপসংহার
আমাদের মাঝে বিশুদ্ধ হাদীছের যে ভান্ডার রয়েছে, তা মূলত ইসলামের এক অমূল্য সম্পদ। এটি হচ্ছে, ইসলামের দ্বিতীয় উৎস। এই উৎসের পূর্ণ হোক অথবা আংশিক হোক, বাদ দিয়ে ইসলামের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। ইসলামের পরিপূর্ণতার বহুলাংশ এই হাদীছসমূহের উপর নির্ভরশীল। ইসলামের উৎস থেকে সেগুলো বাদ দিলে ইসলাম শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, বরং ইসলামের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। বিশুদ্ধ হাদীছের প্রতি সন্দেহ সংশয় মূলত রিসালাত তথা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সন্দেহ সংশয়কে অনিবার্য করে। আর রিসালাত হচ্ছে ইসলামের অন্যতম অংশ, যার অনুপস্থিতি ইসলামকে অস্তিত্বহীন করারই নামান্তর।
অনেকেই আল-কুরআনের অতি উৎসাহী ভক্ত সেজে, কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করে, পরিপূর্ণ হাদীছের অথবা আংশিক হাদীছের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র উপলব্ধি না করেই, তাদের হাতে হাত মিলিয়ে হাদীছের অপ্রয়োজনীয়তার পক্ষে ওকালতি করেই চলেছে। আসলে তাদের এই হাদীছ বিরোধী তৎপরতা ইসলামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। তারা মূলত ইসলামকে ধবংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এটি অলক্ষ্যে তাদের ঈমানকেও ধ্বংস করে ফেলছে। পক্ষান্তরে বিশুদ্ধ হাদীছের প্রতি অকুন্ঠ আনুগত্য সাধন করে ইসলামকে ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচানোর ও এর মাধ্যমে নিজেদের দুর্লভ ঈমানকেও হিফাযত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ সকল মুসলিমকে বিশুদ্ধ হাদীছের খালিছ অনুসারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!