📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ

📄 কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ


আমরা জেনে এসেছি, হাদীস ওহি। এ ওহি দুই প্রকার: ১. কুরআনে বর্ণিত বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সম্পূরক বর্ণনা এবং ২. কুরআনের অতিরিক্ত বিষয়-আশয়ের বর্ণনা। যারা এই দ্বিতীয় প্রকারের ওহি অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করেন তারা বলেন, কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ বৈধ নয়। স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই এ কথা বলেছেন। সুতরাং হাদীস নামে প্রচলিত কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় বিধৃত বর্ণনাগুলো হাদীস নয়। বরং নবীজির নামে জালকৃত বিষয়। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
مَنِ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ وَإِنِ اشْتَرَطَ مِائَةَ شَرْطٍ شَرْطُ اللَّهِ أَحَقُّ وَأَوْثَقُ.
যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল, যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে একশত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।
হাদীসটি ইমাম মালিক, আহমাদ ও কুতুবে সিত্তাহর সংকলকগণসহ অনেক মুহাদ্দিস ইমাম সংকলন করেছেন। এ হাদীসে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল কুরআনে ও অন্য হাদীসেও 'আল্লাহর কিতাব' আল্লাহর বিধান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'কুরআন-বহির্ভূত ওহির গুরুত্ব ও মর্যাদা' শিরোনামের আলোচনায় আমরা তা দেখেছি। এ হাদীসে যে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে হাদীসের পুরো ঘটনাটি পড়লেই আমরা তা বুঝতে পারব।
বারীরাহ (রা.) তাঁর মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করেন। এ মর্মে তিনি আয়িশা (রা.)-এর সাহায্য চান। আয়িশা (রা.) বলেন, হ্যাঁ, তোমার মনিব রাজি হলে আমি তোমার চুক্তির সমুদয় অর্থ এককালীন দিয়ে তোমাকে মুক্ত করে দিতে পারি। তবে সে ক্ষেত্রে তোমার সম্পদের উত্তরাধিকারী হব আমি। কিন্তু বারীরাহ (রা.)-এর মনিব পক্ষ উত্তরাধিকার ছাড়তে রাজি হন না। সব শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা (রা.)-কে বলেন, মনিব পক্ষ যত ইচ্ছা শর্ত দিক। তুমি তাঁকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দাও আর শুনে রাখো:
إِنَّمَا الْوَلَاءُ لِمَنْ أَعْتَقَ.
'মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর।'
এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, লোকদের কী হলো তারা এমন শর্ত আরোপ করে, যা আল্লাহর বিধানে নেই? যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।২৯০
মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর-এটা হাদীসে বর্ণিত বিধান। বারীরাহ (রা.)-এর মালিক পক্ষের দাবি হাদীসে বর্ণিত এ বিধানের বিরোধী হয়। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতিবাদে বলেন, 'যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা কিতাবুল্লাহ বা আল্লাহর বিধানে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে।' সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তো কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় সম্বলিত হাদীস কুরআনের অতিরিক্ত শর্ত হিসাবে বাতিল হয়ই না; বরং এ জাতীয় হাদীস আল্লাহরই বিধান এবং মান্য করা আবশ্যক বলে প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
২৯০. মুআত্তা মালিক, হাদীস : ২৭৪৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ২৫৭৮৬; সহীহ বুখারি, হাদীস : ২১৬৮, ২৫৬৩,; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫০৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৩৯২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস : ৪৬৫৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১২৫৬; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ২৫২১; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১/৫২০।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 এসব কথা কুরআনে নেই

📄 এসব কথা কুরআনে নেই


এতক্ষণ আমরা হাদীসে নববির উপর মুনকিরীনে হাদীস বা হাদীস অস্বীকারকারী সম্প্রদায় কর্তৃক আরোপিত কিছু সংশয় বা আপত্তির পর্যালোচনা করলাম। এছাড়া তারা হাদীসের বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু সেসব এতটাই যুক্তিহীন, অর্থহীন ও পাগলামিপূর্ণ যে, তার জবাব দিতে যাওয়াটাও একপ্রকার পাগলামি, সময়, মেধা ও বাক্যের অপচয়। তাদের এসব পাগলামিপূর্ণ কথাবার্তা বলতে দ্বিধা না করার কারণ হয়তো এই যে, হাদীসশাস্ত্র তো বটেই, উলূমে ইসলামিয়্যার কোনো শাখার প্রাথমিক জানাশোনাও তাদের নেই। নইলে এসব হাস্যকর কথাবার্তা বলে তারা নিজেদেরকে জ্ঞানী মহলের কাছে খেলো করবে কেন? অথবা তাদের টার্গেট ওই সব সরল সাধারণ জনতাকে বিভ্রান্ত করে দলে ভেড়ানো, যাদের ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই এবং সাধারণ যুক্তি-তর্কও বোঝে না। বরং কথার ভংচং দিয়ে কেউ আকর্ষণীয়ভাবে কিছু উপস্থাপন করলেই গলে যায়।
তারা যে সকল ধাপ্পাবাজি করে সাধারণ মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান তার একটি হচ্ছে-এসব কথা কুরআনে নেই। প্রমাণিত স্বতঃসিদ্ধ কোনো কোনো বিষয় উত্থাপন করে তারা এ কথা বলেন। তারা বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন কুরআনে নেই মানে তার আর কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদের এ উপস্থাপন শুনে অনেক সাধারণ মুসলিম বিভ্রান্ত হয়-কুরআনে নেই তবে আমরা এতদিন মেনে এসেছি কেন?
ধরুন, আপনার পরিহিত পোশাকে দুটি পকেট আছে। আপনি উপস্থিতির সামনে বললেন, আমার পকেটে ৫০০ টাকা আছে। একজন কেউ আপনার একটি পকেটে হাত দিয়ে দেখল কোনো টাকা নেই। সে বলল, আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনার পকেটে তো কোনো টাকা নেই! তখন নিশ্চয় আপনি বলবেন, আমার আর একটি পকেট আছে। এই দেখুন টাকাটা এখানে আছে।
কিন্তু অনেক সাধারণ মুসলিম, যারা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে বিশ্বাস করে, তবে হাদীস অস্বীকারকারীদের ওই বাক্য শুনে তাদের আর মনে পড়ে না, তারা পাল্টা প্রশ্নও করতে পারে না, কুরআন নেই তো কী হয়েছে? হাদীসে তো আছে! শরীআত হওয়ার জন্য সব কথা কুরআনে থাকতে হবে কেন?
এই কথা যদি তাদের মনে পড়ত আর তাদেরকে তারা বলতে পারত, তখন যদি জবাবে হাদীস অস্বীকারকারী বলত, হাদীসে থাকলে কী হয়েছে? হাদীস তো বানোয়াট কথা! হাদীস কোনো দলীল নয়, তখন হয়তো এই সাধারণ মুসলিমেরও চেতনা জাগ্রত হত, তার হয়তো টনক নড়ত, এই লোক হয়তো বিভ্রান্ত অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী। কিন্তু তার আগেই যারা কথার ভংচংয়ে খেই হারিয়ে ফেলে এ ধরনের অতি সাধারণ লোকজনই হয়তো এইসব হাদীস অস্বীকারকারীর টার্গেট। নইলে এত কাঁচা কথা তারা কেন বলবেন?
আমরা এই গ্রন্থের বক্ষ-বিস্তৃত আলোচনায় দেখে এসেছি, হাদীস ওহি, ইসলামের অন্যতম ও স্বতন্ত্র দলীল। সুতরাং কোনো বিষয় কুরআনে না থাকলেই ইসলামে তা নেই হয়ে যায় না; বরং হাদীসে থাকলেও ইসলামে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে ওহির পূর্ণ মর্যাদায় বরিত। তাছাড়া তারা যে সকল বিষয় উল্লেখ করে বলেন যে, এসব বিষয় কুরআনে নেই, তার অনেক কিছুই কুরআনে আলোচিত। এর মধ্যে অন্যতম কবরের সাওয়াল-জবাব ও আযাব। তারা বলেন, এ বিষয়ে কুরআনে কোনো প্রমাণ নেই; বরং কুরআনের সাথে বিষয়টি সাংঘর্ষিক। অথচ আল কুরআনে বেশ কিছু আয়াতে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সূরা ইবরাহীমের ২৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ.
"যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ পার্থিব জীবন ও আখিরাতে তাদের দৃঢ়পদ রাখবেন সুপ্রতিষ্ঠিত বাক্য দ্বারা। আর জালিমদের পথচ্যুত করবেন। আল্লাহ যা চান তা-ই করেন।"
বারা' ইবন আযিব (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ আয়াতটি কবরের সাওয়াল-জবাব ও আযাব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। ২৯১
তারা হয়তো বলবেন, উদ্ধৃত আয়াতে তো 'কবরের আযাব' জাতীয় কোনো শব্দ নেই। আমরা তাদের জ্ঞাতার্থে বলব, সচেতন ভাষা ব্যবহারকারী মাত্রই খেয়াল করে থাকবেন, কথক কথা বলতে গিয়ে সব সময় প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন না; বরং কখনো কখনো পরিপার্শ্ব এমন থাকে যে, কথক প্রসঙ্গ উল্লেখ না করেই উদ্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। আর শ্রোতামাত্রই পরিপার্শ্ব বিবেচনায় বুঝতে পারেন, কোন বিষয়ে বক্তব্য প্রদত্ত হলো। অন্যত্র এই বক্তব্য উদ্ধৃত করবার সময় উপস্থিত শ্রোতা যখন বলেন, বক্তব্যটি অমুক বিষয়ে প্রদত্ত হয়েছে। তখন এই শ্রোতাকে উপস্থিত শ্রোতার কথা বিশ্বাস করে সে প্রসঙ্গ বিবেচনায় বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করতে হয়। নইলে কিছুতেই তার মর্ম ও নির্দেশনা উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
আল কুরআনের যে সকল আয়াত কোনো প্রেক্ষাপট কেন্দ্রিক নাযিল হয়েছে সে সকল আয়াতের সবগুলোতে প্রসঙ্গের উল্লেখ নেই। এর কোনো কোনোটি এমন যে, হাদীসে বর্ণিত প্রসঙ্গ সামনে না রাখলে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব হবে না যে, এ আয়াত কেন নাযিল হয়েছিল।
উম্মাত-জননী আয়িশা সিদ্দীকা (রা.)-এর উপর অপবাদ আরোপের প্রেক্ষাপটে সূরা নূরের ১১ থেকে ২০ আয়াত পর্যন্ত ১০টি আয়াত নাযিল হয় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণায়। কিন্তু এই আয়াতগুলোতে কোথাও আয়িশা (রা.)-এর নাম উল্লেখ নেই। কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, এগুলো ব্যক্তি-বিশেষের পবিত্রতা ঘোষণায় নাযিল হয়েছে। বরং ১২ নং আয়াতে أَنْفُ' শব্দের বহুবচন ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, এটি হয়তো মুসলিম জাতির জন্য সাধারণ নির্দেশনাবাচক কোনো আয়াত। কিন্তু আয়াতগুলো নাযিল হলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দেন:
يَا عَائِشَةُ أَمَّا اللَّهُ فَقَدْ بَرَّأَكِ.
হে আয়িশা, আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। ২৯২
তেমনি আমাদের উদ্ধৃত সূরা ইবরাহীমের ২৭ নং আয়াত মহান আল্লাহ কোন প্রসঙ্গে নাযিল করেছেন এটা তাঁর নবী, যাঁর উপর এ আয়াতে কারীমা নাযিল হয়েছে, তিনি যথার্থ জানেন। আমাদেরকে তাঁর বর্ণিত প্রসঙ্গ বিবেচনায় রেখে বুঝতে হবে। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, আয়াতটি কবরের আযাব এবং সাওয়াল-জবাব বিষয়ে নাযিল হয়েছে। আমরা কি বলতে পারি, যাঁর উপর আয়াত নাযিল হয়েছে তিনি জানেন না আয়াতটি কোন প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে?
আর কবরের আযাবের বিরুদ্ধে আল কুরআনের যে সকল আয়াত তারা পেশ করেন সবগুলোই তারা ভুল বুঝেছেন। আয়াতগুলোর সঠিক মর্ম বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। (এ সংক্রান্ত সকল আয়াত উদ্ধৃত করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখানোর অবকাশ এ সংক্ষিপ্ত পুস্তকে নেই)। হাদীসে নববি ও উম্মাতের তুরাসি (ধারাবাহিকভাবে যুগ যুগ ধরে চলমান) বুঝ প্রত্যাখ্যান করার কারণে কুরআনের সঠিক বুঝ থেকে তারা বহু দূরে অবস্থান করছেন। মহান আল্লাহ এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমীন!!

টিকাঃ
২৯১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১৩৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৭১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ৪২৬৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ২০৫৭; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ২/২০৩, ১১/১৭৬- ১৭৭。
২৯২. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪১৪১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৭০。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00