📄 হাদীস মানি, তবে
দ্বিতীয়ত, কুরআন সকল কিছু সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে, এ কথার অর্থ এই নয় যে, কুরআনের বাইরে হাদীসও মানা যাবে না; বরং হাদীস মানতে হবে এ কথাও কুরআন সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে। সুতরাং 'কুরআন সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা' এ কথার আলোকেই হাদীস মানা আবশ্যক। পাঠক, এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা আপনি কিছুক্ষণ আগে পড়ে এসেছেন। এ কারণে এখানে আমরা এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না।
তৃতীয়ত, তারা যে দাবি করেন, আমরা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা কুরআনের অতিরিক্ত নয় এ ধরনের হাদীস মান্য করি— এসব হাদীস তারা কোথায় পান? মুহাদ্দিসদের হাদীস সংরক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতিতে যদি তাদের আস্থা না থাকে; বরং যদি তারা মনে করেন, এভাবে মুহাদ্দিসরা সফল হননি, তবে তারা যে সকল হাদীস মান্য করেন তাদের কাছে তার সোর্স কী? তারা তো মুহাদ্দিসদের সংকলিত হাদীসের কিতাব থেকেই তাদের মতে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ হাদীস গ্রহণ করে থাকেন।
ধরুন, ইমাম বুখারি (রাহ.) শুধু সহীহ হাদীস সংকলন করবেন মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে মুহাদ্দিসদের নিকট হাদীস সহীহ হওয়ার যে সকল শর্ত রয়েছে তার আলোকে হাদীস সংকলন করলেন। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হলেন যে, এক্ষেত্রে ইমাম বুখারি (রাহ.) সফল। কিন্তু এখন যদি কোনো ব্যক্তি সহীহ বুখারির কিছু হাদীস গ্রহণ করেন আর বাকি হাদীসগুলো এ কথা বলে বাতিল করে দেন যে, সেগুলো কুরআনের অতিরিক্ত বা কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, বুখারি (রাহ.) যে শুধু নবীজির হাদীস সংকলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি, তাতে অন্যের কথাও ঢুকে পড়েছে—হয়তো তাঁর অসততার কারণে, না হয় তাঁর অবহেলা বা শর্ত ও প্রচেষ্টার দুর্বলতার কারণে।
এখন তারা এই সহীহ বুখারি থেকে যে হাদীসগুলো গ্রহণ করছেন তা যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই হাদীস তার প্রমাণ কী? তারা তো এ কথা মানছেন যে, ইমাম বুখারির অসততা হোক আর ব্যর্থতা হোক, সহীহ বুখারিতে নবীজির কথার বাইরেও অন্যদের কথা নবীর কথা নামে ঢুকে পড়েছে। হয়তো ইমাম বুখারি নিজেই জালিয়াতি করে অন্যের কথা নবীর নামে চালিয়ে দিয়েছেন, অথবা তাঁর অবহেলা ও শর্তের দুর্বলতার কারণে ঢুকে পড়তে পেরেছে।
তাহলে সহীহ বুখারির যে হাদীসগুলোকে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস হিসাবে গ্রহণ করলেন সেগুলোও যে ইমাম বুখারির জালিয়াতি নয় বা তাঁর শর্তের দুর্বলতার সুযোগে বুখারিতে ঢুকে পড়া অন্যের কথা নয়, তাদের কাছে এর প্রমাণ কী? তাদের কাছে এর প্রমাণ কি শুধু এই যে, এগুলো তাদের বুঝ অনুযায়ী কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ? যারা কুরআনের সাথে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য নবীর নামে হাদীসের কিতাবে ঢুকিয়ে দিতে পারে বা যাদের অসর্তকতার কারণে এ ধরনের বক্তব্য কিতাবে ঢুকে যেতে পারে তাদের অসততা বা অসতর্কতার কারণে কি সংগতিপূর্ণ মিথ্যা ও ভুল বক্তব্য ঢুকে যেতে পারে না? তাছাড়া এমনও তো নয় যে, কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ কথা কেবল নবীজিই বলতে পারেন আর কেউ বলতে পারে না। তাহলে তাদের গৃহীত হাদীসগুলো যে বিশুদ্ধ নবী-বাণী তার বিশ্বাসযোগ্যতা কী?
তারা যদি বলেন, হাদীস না হলেও অসুবিধা নেই। যেহেতু কুরআন-বিরোধী নয়, বরং কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ কথা, সুতরাং এ কথা মানলে তো ইসলাম-বিরোধী কিছু মানা তো হচ্ছে না, নাই-বা হলো হাদীস। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়— আপনাদের হাদীস মানার দাবির যথার্থতা কোথায়?
তাদের এক পণ্ডিত বলেছেন, 'হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে, বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতার মানদণ্ডে নয়'। অর্থাৎ যে কেউ কোনো একটা কথাকে হাদীস বলে দাবি করল, আর পণ্ডিত মহাশয়ের মনে হলো যে, এ কথা কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ, তাহলেই সেটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ বাণী, সহীহ হাদীস। এ-ই হচ্ছে তাদের কাছে 'কুরআনের মানদণ্ড'। পণ্ডিতির নামে এমন বিশুদ্ধ বিনোদনই তারা বিতরণ করে চলেছেন!
অর্থাৎ তাদের এই মূলনীতি গ্রহণ করলে পুরো হাদীসের ভান্ডারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং তাদের 'হাদীস মানি, তবে...' এই বক্তব্য মূলত হাদীস অস্বীকারেরই রকমফের। আর হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের গৃহীত রীতি-পদ্ধতিই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক। পাঠক, আপনি যদি এই বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝতে চান তবে যোগ্য শাস্ত্রজ্ঞ উস্তাদের তত্ত্বাবধানে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়নের আক্ষরিক অর্থেই কোনো বিকল্প নেই।
📄 হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে
হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে—এটা হাদীস অস্বীকারকারীদের কৌশলী বক্তব্য। এর অর্থ হচ্ছে, আমি প্রথমে নিজের মতো করে কুরআন বুঝব। তারপর আমার বুঝ মহান আল্লাহর নির্ধারিত ও নির্বাচিত ব্যাখ্যাকার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বুঝ, অর্থাৎ হাদীসের উপর প্রয়োগ করব। যদি আমার বুঝের সাথে হাদীসের বক্তব্য না মেলে তবে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত ধরে মহান আল্লাহর অনুমোদিত বুঝকে বাতিল করে দেব। ভেবে দেখুন তো, এর চেয়ে বড় আত্মপূজা, আল্লাহর অবাধ্যতা, রাসূল-অবমাননা, ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে? এদের ক্ষেত্রেই কি মহান আল্লাহর এ বাণী প্রযোজ্য নয়:
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ.
“তবে তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জেনে রাখুন, তারা নিজ প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে মাত্র। যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত ব্যতীত নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক বিপথগামী আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।”২৮৫
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ .
“আপনি কি ওই ব্যক্তির বিষয়টি খেয়াল করেছেন, যে নিজ প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করেছে? এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞানতই পথহারা করেছেন, তার কর্ণ ও কলবে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং চোখের উপরে পর্দা এঁটে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর পর কে আর তাকে পথ দেখাবে? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?২৮৬
এরা আবার নিজেদের মধ্যেও হাদীস গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে একমত হতে পারেন না। কেউ কোনো হাদীসকে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে গ্রহণ করেন তো অন্যে আবার সেটাকে অসংগতিপূর্ণ বলে বাতিল করে দেন। যেমন ধরুন, সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক হাদীস। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে সালাতের ওয়াক্ত পাঁচটি। কুরআনেও সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। তারা কেউ কেউ সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক হাদীসগুলোকে কুরআনের এ বিষয়ক আলোচনার বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হিসাবে সহীহ হাদীস বলে গ্রহণ করেন। আবার তাদের কারো কারো গবেষণায় কুরআনে দুই বা তিন ওয়াক্ত সালাতের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এদের মতে, কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এ বিষয়ক সকল হাদীস জাল ও বাতিল।
এদের এ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে আল কুরআন বারবার জানাচ্ছে, পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, উম্মাতকে কুরআন বুঝতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা তথা হাদীস অনুযায়ী। অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাদের আল্লাহর কালাম আল কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে এবং তাদেরকে সে ব্যাখ্যা নিতে হবে আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে।
হাদীস অস্বীকারকারীরা মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগ সরাসরি সকল হাদীস অস্বীকার করে। আরেক ভাগ দাবি করে, আমরা হাদীস মানি। তবে কুরআনের অতিরিক্ত ও কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্যকে হাদীস হিসাবে মানি না। এরা কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীসের প্রয়োজনীয়তার কথা মুখে স্বীকার করে। আমাদের এখনকার আলোচনা এই দ্বিতীয় দল নিয়ে। তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আপনারা তো কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীসের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন? তবে বলুন তো, কোনো বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির জন্য অন্যের ব্যাখ্যার কেন প্রয়োজন হয়? আংশিক বা পুরো বক্তব্য না বোঝা বা ভুল বুঝের সম্ভাবনার কারণেই তো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়! আপনারা যখন কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন তখন নিশ্চয় এ কথা স্বীকার করবেন যে, আপনাদের জন্যও না বোঝার বা ভুল বোঝার সম্ভাবনা বিদ্যমান। এখন বলুন, আপনি কুরআন পড়ে যা বুঝলেন তা যখন হাদীসের সাথে মিলল না তখন কী বলবেনড়নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল বুঝেছেন (নাউযু বিল্লাহ), বা হাদীসটাকে জাল বলে বাতিল করে দেবেন, শুধু এ কারণে যে তা আপনার বুঝের সাথে মিলল না, হাদীস সহীহ হওয়া না-হওয়ার নীতিমালার দিকে আর ভ্রুক্ষেপই করবেন না, নাকি নিজের বুঝটাকে পুনর্নিরীক্ষণ করবেন?
যেখানে আপনার বুঝ হাদীসের সাথে মিলে গেল সেখানে তো আপনি সঠিক বুঝলেন আর যেখানে মিলল না সেখানে আপনার বুঝকে চূড়ান্ত সঠিক ধরে হাদীসকে বাতিল করে দিলেন, তবে তো কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে সর্বত্রই আপনি আপনার বুঝকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেন কোথায়? 'হাদীস মানি, তবে বলে যে হাদীস মানার দাবি করেন, সেই হাদীসটা কোথায় মানেন, কীভাবে মানেন?
আমাদের এক বন্ধু রসিকতা করে বলেন, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মতামতের সমতা রক্ষার জন্য তিনি একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তা এই যে, যে ক্ষেত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একমত হন সে ক্ষেত্রে তিনি স্ত্রীর মতকে মেনে নেন। আর যে ক্ষেত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী একমত হতে পারেন না সে ক্ষেত্রে তিনি নিজের মতকে প্রাধান্য দেন। তাহলে দুজনের মতই মানা হলো, মূল্যায়ন করা হলো। আসলে ফলাফল কী? সব ক্ষেত্রেই নিজের মতই প্রতিষ্ঠা করা! আপনার হাদীস মানাও কি এমন হচ্ছে না?
কিন্তু সাহাবিগণ (রা.) কী করতেন? আসুন একটি দৃষ্টান্ত দেখি। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدْخُلُواْ بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ . فَإِن لَّمْ تَجِدُواْ فِيهَآ أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّىٰ يُؤْذَنَ لَكُمْ ۖ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ٱرْجِعُواْ فَٱرْجِعُواْ ۖ هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ.
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজ গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না অনুমতি গ্রহণ করো এবং তার বাসিন্দাদেরকে সালাম প্রদান করো। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। হয়তো তোমরা মেনে চলবে। যদি সেখানে কাউকে না পাও তবুও অনুমতি না মিললে প্রবেশ করবে না। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ফিরে যাও, তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটি তোমাদের জন্য পবিত্রতর। আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।”২৮৭
এ আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যের গৃহে প্রবেশের আগে বাইরে থেকে সালাম দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না মিললে প্রবেশ করবে না, ফিরে যেতে বললে ফিরে আসতে হবে।
সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, আবু মূসা আশআরি (রা.) উমার (রা.)-এর ডাকে তাঁর বাসায় যান। দরজায় গিয়ে তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। সম্ভবত উমার (রা.) ব্যস্ত ছিলেন। অনুমতি না পেয়ে আবু মূসা (রা.) যখন ফিরে আসতে উদ্যত হন উমার (রা.) বলেন, কেন ফিরে যাচ্ছেন, কে আপনাকে বাধা দিল? আবু মূসা (রা.) বলেন, আমি তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেছি। কিন্তু অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই ফিরে যাচ্ছি। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
إِذَا اسْتَأْذَنَ أَحَدُكُمْ ثَلَثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ فَلْيَرْجِعْ.
তোমাদের কেউ যখন তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেও অনুমতি পাবে না, সে তখন ফিরে যাবে।
এ বিষয়ক উল্লেখিত আয়াতে কারীমা উমার (রা.)-এর জানা ছিল, কিন্তু হাদীসটি জানা ছিল না। দেখুন, এ হাদীস আয়াতে উল্লেখিত কুরআনি নির্দেশনাকে বাহ্যত আংশিক পরিবর্তন করে দিচ্ছে। কুরআনে শুধু অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে আর হাদীসে 'তিনবার' অনুমতি চাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কুরআন বলছে, ফিরে যেতে বললে ফিরে যাবে আর হাদীস বলছে, অনুমতি না মিললে ফিরে যেতে না বললেও ফিরে যাবে। সম্ভবত এ কারণেই উমার (রা.)-এর খটকা লাগে। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চান— আবু মূসা (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ঠিক ঠিক শুনেছেন এবং সঠিক শব্দে বর্ণনা করতে পেরেছেন কি না। তাই তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَمَنْ يَعْلَمُ ذَلِكَ؟ لَئِنْ لَّمْ تَأْتِنِي بِمَنْ يَعْلَمُ ذُلِكَ لَأَفْعَلَنَّ بِكَ كَذَا وَكَذَا.
আপনি ছাড়া এ বিষয়টি আর কে জানে? কোনো সাক্ষী আমার কাছে না আনতে পারলে আপনাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
দেখুন, উমার (রা.) কিন্তু কুরআন-বিরোধী দাবি করে হাদীসকে বাতিল করে দেননি। বরং সত্যই এটা নবীর হাদীস কি না নিশ্চিত হতে চেয়েছেন। পরে যখন আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি নিশ্চিত হতে পেরেছেন যে, এটা সত্যই নবী-বাণী, তিনি কুরআনের ক্ষেত্রে নিজের বুঝকে ভুল হিসাবে পরিত্যাগ করে হাদীসের বক্তব্যকে কুরআনের সঠিক মর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন :
خَفِيَ عَلَيَّ هَذَا مِنْ أَمْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلْهَانِي عَنْهُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণিত এই নির্দেশনাটি আমার অজানা রয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা আমাকে অনবহিত রেখেছে। ২৮৮
জি, এভাবেই সাহাবায়ে কিরাম হাদীসের আলোকে কুরআন বুঝতেন। প্রমাণিত হাদীসের বিপরীতে কুরআন সংক্রান্ত নিজের বুঝ পরিত্যাগ করতেন। নিজের বুঝকে ভুল ভেবে ছেড়ে দিতেন এবং হাদীসের ব্যাখ্যাকে সঠিক মর্ম জেনে গ্রহণ করতেন। কুরআন নির্দেশিত সাহরির শেষ সময় বোঝার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, সাহাবিগণ হাদীসের বিপরীতে নিজেদের বুঝ পরিত্যাগ করেছেন।
তবে আমরা যে কিছু বর্ণনা পাই, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর এক সাহাবির বর্ণিত হাদীসের বিপরীতে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে অন্য সাহাবি তার বিরোধিতা করেছেন, এ সংক্রান্ত আলোচনা আমরা ইতঃপূর্বে ‘প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ’ শিরোনামে করেছি। পাঠক, সে অংশ পুনরায় দেখে নিতে পারেন।
প্রমাণিত হাদীস কখনোই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হয় না। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। তিনি কুরআনে এক কথা বলবেন আর তাঁর রাসূলকে ব্যাখ্যায় শিক্ষা দেবেন তার সাথে সাংঘর্ষিক কথা—এটা কখনোই হতে পারে না। এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকেও আল্লাহর শিক্ষা বদলে দেবার কল্পনা করা যায় না। মহান আল্লাহ বলেন :
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللَّهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَلِكِنْ كُوْنُوْا رَبَّانِتِينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُوْنَ.
“এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ কোনো মানুষকে কিতাব, হিকমত এবং নবুওয়াত দান করবেন, তারপর সে মানুষদেরকে বলবে যে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার বান্দা হয়ে যাও। বরং (সে তো এ কথাই বলবে যে) কিতাবের পঠন-পাঠনের ভিত্তিতে তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও।”২৮৯
সুতরাং কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বক্তব্য হাদীস হতে পারে না। তবে দুটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। যা আমাদের এতক্ষণের আলোচনায় উঠে এসেছে।
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে প্রচুর জাল কথা বানিয়ে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং ২. আপামর সকল পাঠকের জন্য অনেক স্থানে কুরআন যথাযথভাবে বুঝতে না পারার এবং ভুল বোঝার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং কোনো পাঠকের কুরআন বুঝের সাথে যদি হাদীস হিসাবে বর্ণিত কোনো বক্তব্যের অমিল হয় তখন ওই পাঠকের প্রথম কর্তব্য হাদীস হিসাবে বক্তব্যটি প্রমাণিত কি না তা যাচাই করা। অর্থাৎ শাস্ত্রজ্ঞ আলিমের কাছ থেকে জেনে নেওয়া। প্রমাণিত না হলে তো কথাই নেই। আর প্রমাণিত হলে নিজের বুঝকে হাদীসের অনুকূলে পরিশোধন করে নেওয়া। এর অন্যথা করে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত ধরে প্রমাণিত হাদীসকে বাতিল করে দিলে কী পরিণতি হয় তা আমরা 'নববি ভাষ্য ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যানের ফল' শিরোনামের আলোচনায় দেখেছি। খারিজি সম্প্রদায়ের ভয়ংকর পরিণতি এবং সমাজের জন্য তাদের ভয়ংকর হয়ে ওঠার কারণ এটিই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমীন!!
মনে রাখতে হবে, কুরআন বোঝা ও অনুধাবন করা এবং কুরআনের শিক্ষা ও বিধান আত্মস্থ করা এ যুগের নতুন বিষয় নয়। কুরআন নাযিলের যুগ থেকেই তা চলে আসছে। সাহাবিগণ শিখেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে। তারপর প্রজন্ম পরম্পরায় যোগ্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ট্রেডিশনে সর্বযুগে যে হাদীসটি কুরআনের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হিসাবে গৃহীত ও স্বীকৃত হয়ে এসেছে আজ তাকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেওয়ার আমি কোন তালেবর? নাকি এভাবে আমি কুরআনের বিশুদ্ধ মর্ম পরিত্যাগ করে প্রবৃত্তি-পূজারিতে পরিণত হচ্ছি! আমার রব যদি মহান আল্লাহ হন তবে কেন আমি তাঁর শেখানো ও তাঁর রাসূলের বাতলানো ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করছি? আমি কি তবে প্রবৃত্তির পূজা করছি না? এভাবে আমি যা মানছি তা তো আর কুরআন নয়। কেননা আমি কুরআনের বিশুদ্ধ মর্মকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আর নিজের ভুল বুঝের উপরে আমল করছি। তবে কি আমি কুরআন অস্বীকারকারী নই?
টিকাঃ
২৮৫. সূরা [২৮] কাসাস, আয়াত: ৫০。
২৮৬. সূরা [৪৫] জাসিয়াহ, আয়াত : ২৩。
২৮৭. সূরা [২৪] নূর, আয়াত: ২৭ ও ২৮。
২৮৮. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ২০৩০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১০২৯, ১৯৬১১; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৩৫৩, ৬২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৫৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৫১৮০-৫১৮৪; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল: ৬/৫৭৯。
২৮৯. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ৭৯。
📄 কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ
আমরা জেনে এসেছি, হাদীস ওহি। এ ওহি দুই প্রকার: ১. কুরআনে বর্ণিত বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সম্পূরক বর্ণনা এবং ২. কুরআনের অতিরিক্ত বিষয়-আশয়ের বর্ণনা। যারা এই দ্বিতীয় প্রকারের ওহি অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করেন তারা বলেন, কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ বৈধ নয়। স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই এ কথা বলেছেন। সুতরাং হাদীস নামে প্রচলিত কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় বিধৃত বর্ণনাগুলো হাদীস নয়। বরং নবীজির নামে জালকৃত বিষয়। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
مَنِ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ وَإِنِ اشْتَرَطَ مِائَةَ شَرْطٍ شَرْطُ اللَّهِ أَحَقُّ وَأَوْثَقُ.
যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল, যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে একশত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।
হাদীসটি ইমাম মালিক, আহমাদ ও কুতুবে সিত্তাহর সংকলকগণসহ অনেক মুহাদ্দিস ইমাম সংকলন করেছেন। এ হাদীসে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল কুরআনে ও অন্য হাদীসেও 'আল্লাহর কিতাব' আল্লাহর বিধান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'কুরআন-বহির্ভূত ওহির গুরুত্ব ও মর্যাদা' শিরোনামের আলোচনায় আমরা তা দেখেছি। এ হাদীসে যে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে হাদীসের পুরো ঘটনাটি পড়লেই আমরা তা বুঝতে পারব।
বারীরাহ (রা.) তাঁর মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করেন। এ মর্মে তিনি আয়িশা (রা.)-এর সাহায্য চান। আয়িশা (রা.) বলেন, হ্যাঁ, তোমার মনিব রাজি হলে আমি তোমার চুক্তির সমুদয় অর্থ এককালীন দিয়ে তোমাকে মুক্ত করে দিতে পারি। তবে সে ক্ষেত্রে তোমার সম্পদের উত্তরাধিকারী হব আমি। কিন্তু বারীরাহ (রা.)-এর মনিব পক্ষ উত্তরাধিকার ছাড়তে রাজি হন না। সব শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা (রা.)-কে বলেন, মনিব পক্ষ যত ইচ্ছা শর্ত দিক। তুমি তাঁকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দাও আর শুনে রাখো:
إِنَّمَا الْوَلَاءُ لِمَنْ أَعْتَقَ.
'মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর।'
এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, লোকদের কী হলো তারা এমন শর্ত আরোপ করে, যা আল্লাহর বিধানে নেই? যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।২৯০
মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর-এটা হাদীসে বর্ণিত বিধান। বারীরাহ (রা.)-এর মালিক পক্ষের দাবি হাদীসে বর্ণিত এ বিধানের বিরোধী হয়। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতিবাদে বলেন, 'যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা কিতাবুল্লাহ বা আল্লাহর বিধানে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে।' সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তো কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় সম্বলিত হাদীস কুরআনের অতিরিক্ত শর্ত হিসাবে বাতিল হয়ই না; বরং এ জাতীয় হাদীস আল্লাহরই বিধান এবং মান্য করা আবশ্যক বলে প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
২৯০. মুআত্তা মালিক, হাদীস : ২৭৪৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ২৫৭৮৬; সহীহ বুখারি, হাদীস : ২১৬৮, ২৫৬৩,; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫০৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৩৯২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস : ৪৬৫৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১২৫৬; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ২৫২১; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১/৫২০।
📄 এসব কথা কুরআনে নেই
এতক্ষণ আমরা হাদীসে নববির উপর মুনকিরীনে হাদীস বা হাদীস অস্বীকারকারী সম্প্রদায় কর্তৃক আরোপিত কিছু সংশয় বা আপত্তির পর্যালোচনা করলাম। এছাড়া তারা হাদীসের বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু সেসব এতটাই যুক্তিহীন, অর্থহীন ও পাগলামিপূর্ণ যে, তার জবাব দিতে যাওয়াটাও একপ্রকার পাগলামি, সময়, মেধা ও বাক্যের অপচয়। তাদের এসব পাগলামিপূর্ণ কথাবার্তা বলতে দ্বিধা না করার কারণ হয়তো এই যে, হাদীসশাস্ত্র তো বটেই, উলূমে ইসলামিয়্যার কোনো শাখার প্রাথমিক জানাশোনাও তাদের নেই। নইলে এসব হাস্যকর কথাবার্তা বলে তারা নিজেদেরকে জ্ঞানী মহলের কাছে খেলো করবে কেন? অথবা তাদের টার্গেট ওই সব সরল সাধারণ জনতাকে বিভ্রান্ত করে দলে ভেড়ানো, যাদের ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই এবং সাধারণ যুক্তি-তর্কও বোঝে না। বরং কথার ভংচং দিয়ে কেউ আকর্ষণীয়ভাবে কিছু উপস্থাপন করলেই গলে যায়।
তারা যে সকল ধাপ্পাবাজি করে সাধারণ মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করতে চান তার একটি হচ্ছে-এসব কথা কুরআনে নেই। প্রমাণিত স্বতঃসিদ্ধ কোনো কোনো বিষয় উত্থাপন করে তারা এ কথা বলেন। তারা বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন কুরআনে নেই মানে তার আর কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদের এ উপস্থাপন শুনে অনেক সাধারণ মুসলিম বিভ্রান্ত হয়-কুরআনে নেই তবে আমরা এতদিন মেনে এসেছি কেন?
ধরুন, আপনার পরিহিত পোশাকে দুটি পকেট আছে। আপনি উপস্থিতির সামনে বললেন, আমার পকেটে ৫০০ টাকা আছে। একজন কেউ আপনার একটি পকেটে হাত দিয়ে দেখল কোনো টাকা নেই। সে বলল, আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনার পকেটে তো কোনো টাকা নেই! তখন নিশ্চয় আপনি বলবেন, আমার আর একটি পকেট আছে। এই দেখুন টাকাটা এখানে আছে।
কিন্তু অনেক সাধারণ মুসলিম, যারা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে বিশ্বাস করে, তবে হাদীস অস্বীকারকারীদের ওই বাক্য শুনে তাদের আর মনে পড়ে না, তারা পাল্টা প্রশ্নও করতে পারে না, কুরআন নেই তো কী হয়েছে? হাদীসে তো আছে! শরীআত হওয়ার জন্য সব কথা কুরআনে থাকতে হবে কেন?
এই কথা যদি তাদের মনে পড়ত আর তাদেরকে তারা বলতে পারত, তখন যদি জবাবে হাদীস অস্বীকারকারী বলত, হাদীসে থাকলে কী হয়েছে? হাদীস তো বানোয়াট কথা! হাদীস কোনো দলীল নয়, তখন হয়তো এই সাধারণ মুসলিমেরও চেতনা জাগ্রত হত, তার হয়তো টনক নড়ত, এই লোক হয়তো বিভ্রান্ত অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী। কিন্তু তার আগেই যারা কথার ভংচংয়ে খেই হারিয়ে ফেলে এ ধরনের অতি সাধারণ লোকজনই হয়তো এইসব হাদীস অস্বীকারকারীর টার্গেট। নইলে এত কাঁচা কথা তারা কেন বলবেন?
আমরা এই গ্রন্থের বক্ষ-বিস্তৃত আলোচনায় দেখে এসেছি, হাদীস ওহি, ইসলামের অন্যতম ও স্বতন্ত্র দলীল। সুতরাং কোনো বিষয় কুরআনে না থাকলেই ইসলামে তা নেই হয়ে যায় না; বরং হাদীসে থাকলেও ইসলামে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে ওহির পূর্ণ মর্যাদায় বরিত। তাছাড়া তারা যে সকল বিষয় উল্লেখ করে বলেন যে, এসব বিষয় কুরআনে নেই, তার অনেক কিছুই কুরআনে আলোচিত। এর মধ্যে অন্যতম কবরের সাওয়াল-জবাব ও আযাব। তারা বলেন, এ বিষয়ে কুরআনে কোনো প্রমাণ নেই; বরং কুরআনের সাথে বিষয়টি সাংঘর্ষিক। অথচ আল কুরআনে বেশ কিছু আয়াতে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সূরা ইবরাহীমের ২৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ.
"যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ পার্থিব জীবন ও আখিরাতে তাদের দৃঢ়পদ রাখবেন সুপ্রতিষ্ঠিত বাক্য দ্বারা। আর জালিমদের পথচ্যুত করবেন। আল্লাহ যা চান তা-ই করেন।"
বারা' ইবন আযিব (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ আয়াতটি কবরের সাওয়াল-জবাব ও আযাব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। ২৯১
তারা হয়তো বলবেন, উদ্ধৃত আয়াতে তো 'কবরের আযাব' জাতীয় কোনো শব্দ নেই। আমরা তাদের জ্ঞাতার্থে বলব, সচেতন ভাষা ব্যবহারকারী মাত্রই খেয়াল করে থাকবেন, কথক কথা বলতে গিয়ে সব সময় প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন না; বরং কখনো কখনো পরিপার্শ্ব এমন থাকে যে, কথক প্রসঙ্গ উল্লেখ না করেই উদ্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। আর শ্রোতামাত্রই পরিপার্শ্ব বিবেচনায় বুঝতে পারেন, কোন বিষয়ে বক্তব্য প্রদত্ত হলো। অন্যত্র এই বক্তব্য উদ্ধৃত করবার সময় উপস্থিত শ্রোতা যখন বলেন, বক্তব্যটি অমুক বিষয়ে প্রদত্ত হয়েছে। তখন এই শ্রোতাকে উপস্থিত শ্রোতার কথা বিশ্বাস করে সে প্রসঙ্গ বিবেচনায় বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করতে হয়। নইলে কিছুতেই তার মর্ম ও নির্দেশনা উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
আল কুরআনের যে সকল আয়াত কোনো প্রেক্ষাপট কেন্দ্রিক নাযিল হয়েছে সে সকল আয়াতের সবগুলোতে প্রসঙ্গের উল্লেখ নেই। এর কোনো কোনোটি এমন যে, হাদীসে বর্ণিত প্রসঙ্গ সামনে না রাখলে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব হবে না যে, এ আয়াত কেন নাযিল হয়েছিল।
উম্মাত-জননী আয়িশা সিদ্দীকা (রা.)-এর উপর অপবাদ আরোপের প্রেক্ষাপটে সূরা নূরের ১১ থেকে ২০ আয়াত পর্যন্ত ১০টি আয়াত নাযিল হয় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণায়। কিন্তু এই আয়াতগুলোতে কোথাও আয়িশা (রা.)-এর নাম উল্লেখ নেই। কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, এগুলো ব্যক্তি-বিশেষের পবিত্রতা ঘোষণায় নাযিল হয়েছে। বরং ১২ নং আয়াতে أَنْفُ' শব্দের বহুবচন ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, এটি হয়তো মুসলিম জাতির জন্য সাধারণ নির্দেশনাবাচক কোনো আয়াত। কিন্তু আয়াতগুলো নাযিল হলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দেন:
يَا عَائِشَةُ أَمَّا اللَّهُ فَقَدْ بَرَّأَكِ.
হে আয়িশা, আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। ২৯২
তেমনি আমাদের উদ্ধৃত সূরা ইবরাহীমের ২৭ নং আয়াত মহান আল্লাহ কোন প্রসঙ্গে নাযিল করেছেন এটা তাঁর নবী, যাঁর উপর এ আয়াতে কারীমা নাযিল হয়েছে, তিনি যথার্থ জানেন। আমাদেরকে তাঁর বর্ণিত প্রসঙ্গ বিবেচনায় রেখে বুঝতে হবে। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, আয়াতটি কবরের আযাব এবং সাওয়াল-জবাব বিষয়ে নাযিল হয়েছে। আমরা কি বলতে পারি, যাঁর উপর আয়াত নাযিল হয়েছে তিনি জানেন না আয়াতটি কোন প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে?
আর কবরের আযাবের বিরুদ্ধে আল কুরআনের যে সকল আয়াত তারা পেশ করেন সবগুলোই তারা ভুল বুঝেছেন। আয়াতগুলোর সঠিক মর্ম বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। (এ সংক্রান্ত সকল আয়াত উদ্ধৃত করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখানোর অবকাশ এ সংক্ষিপ্ত পুস্তকে নেই)। হাদীসে নববি ও উম্মাতের তুরাসি (ধারাবাহিকভাবে যুগ যুগ ধরে চলমান) বুঝ প্রত্যাখ্যান করার কারণে কুরআনের সঠিক বুঝ থেকে তারা বহু দূরে অবস্থান করছেন। মহান আল্লাহ এই দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমীন!!
টিকাঃ
২৯১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১৩৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৭১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ৪২৬৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ২০৫৭; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ২/২০৩, ১১/১৭৬- ১৭৭。
২৯২. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪১৪১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৭০。