📄 সহীহ সনদে জাল হাদীস
হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে এ কথা হাদীস মান্যকারী ও অমান্যকারী সকলেই জানেন ও মানেন। আর সনদ যাচাইয়ের মাধ্যমে হাদীস সত্যায়ন করা সম্ভব নয়। কেননা জালিয়াত তো জাল হাদীসের জন্য বিশুদ্ধ সনদ ব্যবহার করতে পারেন। এমতাবস্থায় কীভাবে সনদ পরীক্ষা করে হাদীসের সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব হবে?
তাছাড়া হাদীসের নামে জালিয়াতি হওয়ার কথা যদি আমরা স্বীকার করি তবে হাদীসের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। কেননা যার একটা জাল ধরা পড়ে তার বাকি কথাও প্রামাণ্যতা হারায়। যেমন কোনো আদালতে কেউ একটা মিথ্যা বলেছে প্রমাণ হলে বা একটা ফেইক ডকুমেন্ট উত্থাপন করলে তার বাকি নয়শত নিরানব্বইটা সত্য আদালত গ্রহণ করে না।
জাল কথার জন্য সহীহ সনদ ব্যবহার করলে তা মুহাদ্দিসদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহীহর কাতারে উতরে যেতে পারবে—এ কথা শুনে হাদীসশাস্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত বিস্ময়ে হাসতে ভুলে যাবে। কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এমন অজ্ঞতাপ্রসূত ও পাগলামিপূর্ণ বাক্যালাপ করতে পারে! কোনো শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পর্যন্ত অর্জন না করে তা সম্পর্কে মুখ খোলা যায়! এসব প্রলাপের জবাব দিতে যাওয়াও সময় নষ্ট করা, এক প্রকার বাতুলতা এবং বাক্যের অপচয়। কবি তাই পরামর্শ দিয়েছেন:
إِذَا نَطَقَ السَّفِيهُ فَلَا تُجِبْهُ فَخَيْرٌ مِنْ إِجَابَتِهِ السُّكُوْتُ فَإِنْ جَاوَبْتَهُ فَرَجْتَ عَنْهُ وَإِنْ خَلَيْتَهُ كَمَدًا يَمُوْتُ.
উত্তর দিতে যেয়ো না যখন নির্বোধ বলে কথা, তার সে কথার জবাবের চেয়ে উত্তম নীরবতা। প্রত্যুত্তর করলে তো তার করে দিলে স্থান, আর জেনে রেখো, উপেক্ষাতেই হয়ে থাকে প্রস্থান।
কবি যথার্থই বলেছেন। আমাদেরও এসব প্রলাপের জবাব দিতে রুচি হয় না। এ বিষয়ে ড. মুস্তফা আযমির কিছু সহজ-সরল বক্তব্য তুলে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, কারো কারো মনে সন্দেহ আসতে পারে যে, পরবর্তী যুগে কোনো কোনো মিথ্যাবাদী তো একেবারে উচ্চশ্রেণির বর্ণনাসূত্র-সহই একটি হাদীস বানিয়ে ফেলতে পারে। মুহাদ্দিসগণ হয়তো সনদ দেখেই সেই বানোয়াট বর্ণনাটি গ্রহণ করে নিলেন। আসলে এই আশঙ্কা অমূলক। কারণ এ কথা স্পষ্ট যে, মুহাদ্দিসগণ শুধু সনদ দেখেই ক্ষান্ত হন না। এ বর্ণনাকারীর অবস্থাও যাচাই করা হয়। পাশাপাশি দেখা হয় তার সতীর্থ কেউ সেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কি না। ২৭১
কোনো যুগেই জাল কথার সহীহ সনদ তৈরি করে মুহাদ্দিসদেরকে প্রতারিত করে উতরে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
এখানে দ্বিতীয় যে কথাটি তারা বলেছেন, হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে বলে হাদীস গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে-এটাও তাদের নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কথা। উদোর পিণ্ডি তারা বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।
এটা তো সত্যি যে, যে ব্যক্তি জীবনে একবার মিথ্যা বলেছে তার বিশ্বস্ততা হারিয়ে যাবে। কিন্তু যার নামে মিথ্যা বলা হলো তার বিশ্বস্ততাও হারিয়ে যাবে, এটা কেমন বিচার? আপনি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি, কিন্তু কেউ একজন আপনার নামে মিথ্যা বলেছে, তাই আপনি আর বিশ্বাসযোগ্য থাকবেন না? কিছু মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা হাদীস তৈরি করেছে বলে নবীজির সকল হাদীস গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে? এটা কি কোনো যুক্তির কথা?
জি, যে ব্যক্তি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেছে বলে প্রমাণিত সে বিশ্বস্ততা হারিয়েছে। হাদীসশাস্ত্রেও তার কথা আর গ্রহণ করা হয় না। আদালতে যেমন কেউ একটা মিথ্যা বলেছে প্রমাণ হলে বা একটা ফেইক ডকুমেন্ট উত্থাপন করলে তার সত্যমিথ্যা কোনো কিছুতেই আদালত ভ্রুক্ষেপ করে না। বরং ব্যক্তিকেই বাতিল করে দেয়। কিন্তু ওই মামলাটি যদি অন্যান্য সত্য সাক্ষী ও ডকুমেন্টের দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যায় আদালত সেভাবেই রায় প্রদান করে। কোনো সাক্ষীর মিথ্যাচারের কারণে তার সাক্ষ্য বাতিল হয়, মামলাটি বাতিল করা হয় না।
এখান থেকে এ সংশয়ও তৈরি হতে পারে যে, কোনো বর্ণনাকারীর একটা মিথ্যা প্রমাণিত হলে যখন তার সমস্ত বর্ণনা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে তখন তার কিছু ভুল ও জাল বর্ণনার পাশাপাশি অনেক বিশুদ্ধ হাদীসও বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে তো নবীজির অনেক হাদীস বাতিল ও অগ্রহণযোগ্যতার তালিকায় গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে কি এ কথা বলা যায় না যে, তাঁর সমগ্র হাদীস সংরক্ষিত হতে পারেনি?
এ সংশয়টিও অমূলক। যদিও প্রমাণিত মিথ্যাবাদীর জাল-সহীহ সকল বর্ণনা বাতিল হয়ে যাচ্ছে, তবে এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো হাদীস হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না। কেননা এমন তো হতে পারে না যে, নবীজির কোনো সহীহ হাদীস শুধু ওই মিথ্যাবাদীই জানতেন আর কেউ জানতেন না, মিথ্যাবাদীর জানা সহীহ হাদীসগুলো উস্তাদের কাছ থেকে শুধু তিনিই শিখেছিলেন, এই মিথ্যাবাদী ছাড়া ওই উস্তাদের আর কোনো ছাত্র ছিল না।
বরং কোনো মিথ্যাবাদীর চেয়ে ন্যায়পরায়ণ নিষ্ঠাবান রাসূল-প্রেমিক মুসলিমের হাদীস শেখার আগ্রহ অনেক বেশি ছিল। সুতরাং কোনো নির্ভরযোগ্য উস্তাদের কাছ থেকে কোনো মিথ্যাবাদী যদি একটা বিশুদ্ধ হাদীস শিখে থাকেন তবে অন্য অনেক ন্যায়পরায়ণ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিও ওই উস্তাদের কাছ থেকে সেই হাদীসটি শিখে থাকবে। সুতরাং ওই মিথ্যাবাদীর সূত্রে ওই বর্ণনাটি বাতিল হলেও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে সেটি বর্ণিত ও সংরক্ষিত হয়ে যাবে। অতএব মিথ্যাবাদীর বর্ণনা বাতিল করে দেওয়ার কারণে কোনো বিশুদ্ধ হাদীস হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
টিকাঃ
২৭১. মুস্তফা আযমি, হাদিস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ১২৯।
📄 প্রবীণ সাহাবিদের বর্ণিত হাদীস সংখ্যা কম
অনেকে এ কথা বলে হাদীসের উপর সংশয় তৈরি করতে চায় যে, আবু বাকর (রা.) ও উমার (রা.)-এর মতো প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিড়য়ারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নববি জীবনের সমগ্র সময়ের সান্নিধ্যে ধন্যড়তাঁরা আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো শেষকালে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের তুলনায় নবীজির কথা ও কর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। এ কারণে তাঁদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো শেষের দিকে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের থেকে অনেক অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন হাজার হাজার হাদীস। আর এর বিপরীতে আবু বাকর (রা.) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা শত শতও নয়।
কোনো পড়াশোনা নয়, এ প্রশ্ন উঠানোর আগে যদি শুধু নিজের মস্তিষ্ককেও কাজে লাগানো হতো, তবুও এ ধরনের বালসুলভ কথা উচ্চারণ করা থেকে জবানকে সংযত করা হতো। কে নিজেকে হাসির পাত্র বানাতে চায়! বোঝা যায়, এ বক্তব্যের প্রচারক হাদীস সংরক্ষণের দুর্বলতা ও অযৌক্তিকতা প্রমাণের উসকানিতে খুবই ত্বরা প্রবণতার শিকার হয়েছেন।
প্রধানত দুটি কারণে আবু বাকর (রা.)-এর মতো প্রবীণ সাহাবিদের বিপরীতে আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো নবীন সাহাবিদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা বেশি। ১. সাহাবিদের কাছ থেকে হাদীস শিখেছেন তাবিয়িগণ। তাঁদের কাছ থেকে তাবি'-তাবিয়িগণ। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্য দিয়ে সংকলক মুহাদ্দিসদের হাতে হাদীস সংকলিত হয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের অল্প দিনের মধ্যে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রবীণ সাহাবিগণও ইন্তিকাল করেন। যেমন আবু বাকর (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর মাত্র দু-বছর বেঁচে ছিলেন। আর নবীজির শেষ-জীবনে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন দীর্ঘকাল। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবু হুরাইরা (রা.) নবীজির ইন্তিকালের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল বেঁচে ছিলেন। নবীজির ইন্তিকালের পরপর ইসলাম গ্রহণকারী প্রবীণ তাবিয়িগণ তো সকল জীবিত সাহাবির কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তবে প্রবীণ সাহাবিগণ, যারা আগে আগে ইন্তিকাল করে গেছেন, তাঁদের অল্প দিনের সান্নিধ্যের কারণে তাঁদের কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ কম পেয়েছেন। আর দীর্ঘদিন যারা বেঁচে ছিলেন, সে সকল সাহাবির দীর্ঘ সান্নিধ্যের কারণে তাঁদের কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ বেশি পেয়েছেন।
পক্ষান্তরে যে সকল তাবিয়ি সাহাবি-যুগের শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা তো প্রবীণ সাহাবিদের সাক্ষাৎ না পাওয়ার কারণে তাঁদের কাছ থেকে কোনো হাদীস শেখার সুযোগ পাননি। তাঁরা শুধু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ জীবনে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের থেকেই হাদীস শেখার সুযোগ পেয়েছেন।
তাছাড়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিদের প্রথম যুগটি ছিল মূলত সাহাবি-প্রধান যুগ। তখন অল্প কিছু তাবিয়ি মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সাহাবিরা তো সকলেই নবীজির কাছ থেকে ইসলাম শিখেছেন। আর সে সময়ে ইসলাম গ্রহণকারী তাবিয়িগণ প্রবীণ-নবীন সকল সাহাবি থেকেই ইসলাম শিখেছেন। আর সাহাবিদের শেষ যুগটি ছিল তাবিয়ি-প্রধান যুগ। প্রবীণ সাহাবিরা ইন্তিকাল করেছেন। একের পর এক বিভিন্ন দেশ ইসলামের হাতে বিজিত হয়েছে। দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা ওই সময়ে জীবিত সাহাবিদের থেকেই ইসলাম শিখেছেন।
এ কারণে স্বভাবিকভাবেই তাবিয়ি প্রজন্মে প্রবীণ সাহাবিদের তুলনায় নবীন সাহাবিদের ছাত্র-শিষ্যের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি আর তারা নবীন সাহাবিদের থেকে হাদীসও শিখেছেন বেশি। সুতরাং এটাও স্বাভাবিক যে, এই সকল তাবিয়িদের দ্বারা যখন তাবি'-তাবিয়িদের কাছে হাদীস বর্ণিত হবে নবীন সাহাবিদের সূত্রই বেশি উল্লেখিত হবে। এর অর্থ কিছুতেই এ নয় যে, প্রবীণ সাহাবিগণ হাদীস কম জানতেন বা হাদীসকে কম মূল্যায়ন করতেন।
২. আবু বাকর (রা.) ও উমার (রা.)-এর মূল ব্যস্ততা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা। আর আবু হুরাইরা (রা.)-এর মূল ব্যস্ততা ছিল শিক্ষাদান। ধরুন, আপনারা দুজন সহপাঠী একজন উস্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ জ্ঞান অর্জন করলেন। তবে আপনি সে উস্তাদের সারা জীবনের সান্নিধ্যধন্য আর আপনার সহপাঠী উস্তাদের শেষ-জীবনের ছাত্র। উস্তাদের মৃত্যুর পর প্রচুর লোক আসতে লাগল আপনাদের আশ্রমে ওই বিশেষ জ্ঞান শেখার জন্য। তারা সেখানে থাকে আর জ্ঞান অর্জন করে। তবে আপনার উপর দায়িত্ব পড়ল এসব লোকজনের থাকা-খাওয়া ইত্যাদি বিষয় দেখভালের আর আপনার সহপাঠীর দায়িত্ব পড়ল তাদের শিক্ষাদানের। আপনার সহপাঠী তাদের শিক্ষাদান করেন। কোথাও আটকে গেলে আপনার শরণাপন্ন হন। আপনি সে বিষয়ে উস্তাদের কোনো বাণী জানলে তাকে বলে দেন। না হয় দুজন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত বের করেন। তবে তা তাদের গিয়ে শেখান আপনার এই সহপাঠীই। আপনি হয়তো কাজের ফাঁকে কখনো-সখনো একটু সময় পেলে তাদের সময় দেন। কথার ফাঁকে উস্তাদের দুয়েকটা কথা তাদের বলেন।
দেখুন, আপনিই উস্তাদের কথা বেশি জানতেন এবং আপনার সহপাঠী এই আগত জ্ঞান-অনুসন্ধানীদের যা-কিছু শিখিয়েছেন তার একটা বড় অংশ আপনার কাছ থেকে জেনেই শিখিয়েছেন। তবে এই ছাত্ররা যখন পরবর্তী প্রজন্মকে আপনাদের উস্তাদের জ্ঞান শিক্ষা দেবেন তখন আপনার সূত্রে হয়তো দুয়েকটি কথা বলবেন, আর অধিকাংশই বলবেন আপনার সহপাঠীর সূত্রে।
এসব কারণেই আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো নবীন সাহাবিদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা বেশি। শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণের কারণে ইসলামের অনেক কিছুই তাঁদেরকে শিখতে হয়েছে আবু বাকর (রা.)-এর মতো প্রবীণ সাহাবিদের কাছ থেকে এবং সেসব কিছুও তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এটা ওহির দ্বিতীয় প্রকার অর্থাৎ হাদীস সংরক্ষণে মহান আল্লাহর কুদরতি ব্যবস্থা যে, তিনি আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো অল্প বয়স্ক মেধাবী তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী তরুণকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষকালে ঈমানের নিআমত দান করেছেন এবং তাঁকে নবীজির ইন্তিকালের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল বাঁচিয়ে রেখে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইলম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অতি অল্প বয়সের আয়িশা সিদ্দীকা (রা.)-এর বিবাহও ইলম সংরক্ষণে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনারই অংশ।
📄 হাদীসের বহুত্ব, কুরআনের একত্ব
আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, হাদীসের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য আল কুরআনের সঠিক অর্থ সংরক্ষণ করা। অথচ কারো কারো ধারণা, এমনকি একজন জনপ্রিয় বক্তাকে পর্যন্ত এ কথা বলতে শোনা গেছে যে, ‘হাদীসের বহুপথ, কুরআনের একপথ, কুরআন ধরো’। ভয়ংকর কথা! এ কথার তো অনিবার্য দাবি, 'সুতরাং হাদীস ছাড়ো'। হাদীস বাদ দিয়ে কুরআন বুঝতে গেলে কুরআনের কত পথ হবে সেটা হয়তো তিনি ভেবে দেখতে পারেননি। আহলে কুরআন পণ্ডিতদের বইপুস্তক তিনি পড়ে দেখতে পারেন। এক একটা বিষয়ের ব্যাখ্যায় তারা নিজেদের মধ্যে কত কত মতপার্থক্য করেছে, কত পথ সৃষ্টি করেছে!
অনেকের ধারণা, হাদীস মানতে গিয়েই বুঝি মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে। আর তারা হয়তো সকল মতপার্থক্যকেই নিন্দনীয় ভাবেন।
তাদের জ্ঞাতার্থে আমরা প্রথমেই বলে নিই, সকল ইখতিলাফ নিন্দনীয় নয়। বরং কুরআন-হাদীস সমর্থিত ইখতিলাফ প্রশংসনীয় ও কাঙ্ক্ষিত। শুধু কুরআনের দিকে তাকালেও আমরা দেখব, ইখতিলাফ না করে উপায় থাকবে না। আমরা একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মহান আল্লাহ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়ে বলেন :
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ.
“তালাকপ্রাপ্তা নারীগণ তিন 'কুরউ' (কুরুউন) সময় পরিমাণ নিজেদের বিরত রাখবে।”২৭২
আরবি ভাষায় 'কুরুউন' শব্দের দুটি অর্থ: হায়েয এবং দুই হায়েযের মধ্যবর্তী পবিত্রতা। কেউ যদি হায়েয অর্থ গ্রহণ করে আর অন্য কেউ যদি পবিত্রতা অর্থ গ্রহণ করে তাহলে তো অনিবার্যভাবে দুটি পথ হয়ে গেল। কুরআন দিয়ে এই দুটি পথ বন্ধ করবেন কীভাবে?
হাদীস মানলে ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা বৈধতার সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে। আর হাদীস বাদ দিয়ে কুরআন বুঝতে গেলে মতভিন্নতা অবৈধতার সীমায় ঢুকে পড়বে এবং সে ইখতিলাফ হবে অন্তহীন। একেকজন এসে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা করে একেকটা মত দাঁড় করাবে।
টিকাঃ
২৭২. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২২৮。
📄 কুরআন ও হাদীসের সংঘর্ষ
কেউ কেউ এ কথা বলেন যে, মহান আল্লাহ আল কুরআনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যকার হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাই আমরা কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীস মানি। তবে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক ও কুরআনের অতিরিক্ত কোনো বক্তব্যকে হাদীস বলে মানি না। আর তা হাদীস নামে প্রচলিত থাকলেও মূলত নবীজির হাদীস নয়। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। তাছাড়া কুরআন ও হাদীস উভয়ই মহান আল্লাহর ওহি। আল্লাহ তাআলার মতো মহান বিধায়ক দুই ধরনের ওহিতে পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। আর নবীজি কুরআনের অতিরিক্ত বক্তব্যও দিতে পারেন না। কেননা কুরআন পরিপূর্ণ অনন্য এক মহাগ্রন্থ।
এই বক্তব্যটি পরস্পর সাংঘর্ষিক ও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাদের এই বক্তব্য মেনে নিলে তারা যে বলেন, 'আমরা হাদীস মানি, তবে...' তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়। বিষয়টি আমরা কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করছি।
প্রথমত, এ কথা ষোলো আনা যথার্থ যে, বিশুদ্ধ হাদীসের বক্তব্যের সাথে কুরআনের বক্তব্যের কোনো সংঘর্ষ নেই। যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তা হাদীসে নববি হতে পারে না। কুরআন ও হাদীস উভয়ই একটিমাত্র সোর্স থেকে এসেছে। উভয়ই আল্লাহ প্রেরিত ওহি। মহান আল্লাহ কখনো পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য বান্দার নিকট নাযিল করতে পারেন না।
কিন্তু হাদীসের কোনো বক্তব্যকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে বাদ দিতে হলে প্রথমে কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য যথাযথভাবে বুঝতে হবে।
যেকোনো ব্যক্তির মনে হলো যে, এই হাদীস কুরআনের অমুক আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক, আর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন যে, এই হাদীস জাল, তবে তো তা হবে নিছক পাগলামিকে জ্ঞানশাস্ত্র বলে অভিহিত করা।
আমরা কীভাবে বুঝব যে, কুরআনের কোনো বক্তব্যের সাথে কোনো হাদীসের বক্তব্য সাংঘর্ষিক হচ্ছে? আমরা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনের যে আলোচনার সাথে হাদীসের যে সংঘর্ষ দেখতে পাচ্ছি তা তো এ কারণে হতে পারে যে, আমরা কুরআনের ওই আয়াতটি অথবা ওই হাদীসটির মর্ম ভুল বুঝেছি। অথবা কুরআন-হাদীস উভয়েরই উদ্দিষ্ট অংশের মর্ম ভুল বুঝেছি। আমাদের ওই ভুল বুঝের কারণেই কুরআন-হাদীসের সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংঘর্ষ কুরআন-হাদীসের নয়, আমাদের ভুল বোঝার!
একটি উদাহরণ দেখুন। যে সকল মুমিন কোনো পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত ইত্যাদির মাধ্যমে জান্নাতে আসবে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস রয়েছে। একটি হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِّنَ النَّارِ بَعْدَ مَا مَسَّهُمْ مِنْهَا سَفْعُ فَيَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ فَيُسَمِّيْهِمْ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَهَنَّمِيِّينَ.
আগুনে ঝলসে যাবার পর একদল লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে। তারপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতিরা তাদেরকে ‘জাহান্নামিয়্যীন’ বলে আখ্যায়িত করবে।২৭৩
একদল লোক এ বিষয়ক হাদীসগুলোকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেয়। অথচ তাদের উদ্ধৃত আয়াতগুলোর সাথে হাদীসগুলোর কোনো বিরোধ تو নেই-ই, বরং হাদীসগুলো অন্য একাধিক আয়াতের বিশুদ্ধ নববি ভাষ্য।
সালিহ ইবন আবী তারীফ (রাহ.) আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সূরা হিজরের ২ নং আয়াতের কোনো ব্যাখ্যা শুনেছেন? আবু সাঈদ (রা.) বলেন, হ্যাঁ, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, পর্যাপ্ত শাস্তির পর আল্লাহ অনেক মুমিনকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। আল্লাহ যখন এইসব মুমিনকে মুশরিকদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন তখন মুশরিকরা তাদেরকে বলবে, তোমরা না দুনিয়াতে দাবি করতে যে, তোমরা আল্লাহর বন্ধু! তাহলে এখন আমাদের সাথে জাহান্নামে কেন? আল্লাহ তাদের এ কথা শুনে শাফাআতের অনুমতি দান করবেন। তাদের জন্য শাফাআত করবেন ফেরেশতামণ্ডলী ও নবীগণ (আ.)। তখন তারা আল্লাহর অনুমতিতে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যাবে। এভাবে যখন তাদের বের করা হবে তখন মুশরিকরা বলবে, হায়, আমরা যদি এদের মতো হতাম, তাহলে শাফাআতের উপযুক্ত হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে পারতাম! সূরা হিজরের দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ এ কথাই বলেছেন :
رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمَيْنَ.
“এক সময় কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে, হায়, তারা যদি মুসলিম হতো!”২৭৪
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পর্বে পাপের কারণে জাহান্নামে যাওয়া মুমিনদের জন্য সুপারিশ করবেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন এবং তাঁর সুপারিশ কবুল করবেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি গোনাহগার মুমিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী যার উপর জাহান্নাম স্থায়ীভাবে নির্ধারিত সে ছাড়া সবাইকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا .
"সত্বর আপনার প্রতিপালক আপনাকে 'প্রশংসিত অবস্থানে' উন্নীত করবেন।”২৭৫
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটিই হচ্ছে মাকামে মাহমূদ বা প্রশংসিত অবস্থান, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের নবীকে দেওয়া হয়েছে, যার কথা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। ২৭৬
ইয়াযীদ ইবন সুহাইব (রাহ.) বলেন, খারেজিদের একটি মত আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। একবার আমরা একটি দলের সাথে বের হই। উদ্দেশ্য ছিল হজ্জ করা। তারপর মানুষের সাথে যোগাযোগ করা। আমরা মদীনা দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) একটি খুঁটির পাশে বসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করছেন। তিনি 'জাহান্নামিয়্যীন'দের বিষয়ে হাদীস বলছিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবি, আপনি এ কী কথা বলছেন? অথচ আল্লাহ বলেছেন:
رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ.
“হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করালেন তাকে লাঞ্ছিত করলেন।”২৭৭
অন্য আয়াতে তিনি বলেছেন:
كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا أُعِيدُوا فِيهَا.
"যখনই তারা তা থেকে বের হতে চাইবে তাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”২৭৮
তাহলে আপনারা এসব কী বলেন? জাবির (রা.) বলেন, তুমি কি কুরআন পড়ো? আমি বললাম, জি। তখন তিনি বললেন, (তাহলে তুমি এর আগের অংশ পড়ে দেখো। এসব তো কাফিরদের ব্যাপারে বলা হয়েছে।২৭৯) তুমি কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'মাকামে মাহমূদ' সম্পর্কে শুনেছ, আল কুরআনে মহান আল্লাহ যা তাঁকে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? বললাম, জি। তিনি বললেন, এই হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই 'মাকামে মাহমূদ', যা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন।...
ইয়াযীদ ইবন সুহাইব (রাহ.) বলেন, এরপর আমরা আমাদের এলাকায় ফিরে এলাম এবং সকলকে বললাম, ধ্বংস হোক তোমাদের, তোমরা কি মনে করো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৃদ্ধ এই সাহাবি তাঁর নামে মিথ্যা বলছে? তারপর একজন ব্যতীত আমরা সকলেই ওই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে ফিরে আসি। ২৮০
উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম, একদল লোক 'জাহান্নামিয়্যীন' বিষয়ক হাদীসগুলোকে যে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সাব্যস্ত করেছিল বাস্তবতা কিছুতেই তেমন নয়। তাদের উদ্ধৃত আয়াতগুলোর সাথে এ সকল হাদীসের কোনো বিরোধ تو নেই-ই, উপরন্তু এ হাদীসগুলো অন্য একাধিক আয়াতের বিশুদ্ধ নববি ভাষ্য।
ইয়া'লা ইবন হাকীম (রাহ.) বলেন, সাহাবি সাঈদ ইবন যুবাইর (রা.) একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন এক ব্যক্তি বলেন:
فِي كِتَابِ اللهِ مَا يُخَالِفُ هَذَا.
আল্লাহর কিতাবে এর বিপরীত বক্তব্য রয়েছে।
তখন সাঈদ ইবন যুবাইর (রা.) বলেন:
أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتُعَرِّضُ فِيْهِ بِكِتَابِ اللَّهِ كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْلَمَ بِكِتَابِ اللهِ تَعَالَى مِنْكَ.
আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বলছি আর তুমি তাতে আল্লাহর কিতাবের সাথে বৈপরীত্যের কথা বলছ? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কিতাবের বিষয়ে তোমার থেকে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। ২৮১
সুতরাং আমাদের উচিত কুরআন-হাদীসের সংঘর্ষ আবিষ্কার না করে নিজের বুঝকে পরখ করা। কেননা কুরআন নাযিল হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর। তিনি কুরআন বুঝতেন পরিপূর্ণরূপে। এবং মানতেনও পরিপূর্ণভাবে। যেমনটি হাদীস শরীফে এসেছে, সা'দ ইবন হিশাম (রাহ.) বলেন, আমি আয়িশা (রা.)-কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক কেমন ছিল? জবাবে তিনি বললেন :
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ أَمَا تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَوْلَ اللهِ: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ.
তাঁর আখলাক ছিল কুরআন। তুমি কি কুরআন কারীমে মহান আল্লাহর এই বাণী পড়োনি, 'নিশ্চয় আপনি আছেন সুমহান আখলাকের উপর?। '২৮২
উপরন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে করেছেন কুরআন পাকের বাহক, ব্যাখ্যাকার ও নমুনা। সুতরাং তাঁর বুঝকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলতে আমাদের বুক কেঁপে উঠা উচিত।
এ আলোচনার পরও যদি এ কথা বলা হয় যে, আমরা তাঁর বুঝকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলছি না; বরং হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁর নামে সংকলিত যেসব কথা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে তাঁর হাদীস বলেই মানছি না। কেননা আমরাও এ কথা বিশ্বাস করি যে, তাঁর কথা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। সুতরাং সাংঘর্ষিক কথাগুলো হাদীস নয়।
তাদের এ কথা মূলত হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনে এবং মিথ্যা ও ভুল কথা থেকে যাচাই-বাছাই করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে নির্ভেজাল বিশুদ্ধরূপে সংরক্ষণে মুসলিম উম্মাহর কর্মপদ্ধতি ও এক্ষেত্রে তাদের সফলতার বিষয়ে অজ্ঞতার ফল এবং নিজের বুঝকে চূড়ান্তরূপে গ্রহণ করা থেকে উৎসারিত। অর্থাৎ তারা নিজের বুঝকে এমন চূড়ান্ত বিশুদ্ধ ও সঠিকতার মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করেছে যে, তার বিপরীতে তারা চৌদ্দশত বছরের উম্মাহর হাজার হাজার মনীষীর অক্লান্ত পরিশ্রমলব্ধ সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দেবে, কিন্তু নিজের বুঝ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করা ও তা নতুন করে পরখ করে দেখার গরজ বোধ করবে না। এমন আত্মমুগ্ধতার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনো সঠিক পথের দিশা পেতে পারে না। এরা হবে পথহারা, দুনিয়া-আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالًا . الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا.
"বলুন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না, কর্মের দিক থেকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কারা? যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনেই ব্যর্থ হয়ে গেছে। অথচ নিজেদের ধারণায় তারা খুবই উত্তম কর্ম সম্পাদন করে চলেছে।”২৮৩
মনে রাখতে হবে, মুহাদ্দিস ইমামগণ হাদীস যাচাই-বাছাই ও সত্যাসত্য নিরুপণে কেবল বর্ণনাসূত্রই নিরীক্ষা করেননি, হাদীসের বক্তব্যও নিরীক্ষা করেছেন, তা বাস্তবতা ও কুরআনের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক কি না পরীক্ষা করেছেন। যেগুলো প্রকৃতপক্ষে বিরোধী হয়েছে সেগুলোকে শায, মুনকার, বাতিল, ওয়াহি ইত্যাদি বলে প্রমাণিত হাদীসের কাতার থেকে বের করে দিয়েছেন। এভাবেই যোগ্যতা, সততা, সত্যবাদিতা ও খোদাভীরুতায় প্রবাদতুল্য হাজার হাজার মনীষীর গবেষণার একটা চূড়ান্ত ফলাফল আমাদের সামনে রয়েছে। হাদীসশাস্ত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত এই যে, তা পরিপক্বতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। اقد نضجت واحترقت
উম্মাতের মূলধারার এই জ্ঞান-গবেষণাকে অস্বীকার করে নিজের বুঝমতো চলতে গিয়ে যে ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে তার ব্যাপারে সতর্কতা ও কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى ضَلَالَةٍ وَيَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَدَّ شَدَّ إِلَى النَّارِ.
নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মাতকে ভ্রান্তির উপর একত্র করবেন না। আল্লাহর হাত ঐক্যবদ্ধতার উপর। আর যে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ২৮৪
টিকাঃ
২৭৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৫৫৯; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১২৩৭৫。
২৭৪. সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৭৪৩২; তাবারানি, আল মু'জামুল আওসাত, হাদীস: ৮১১০। ইবন হিব্বান, আলবানি, শুআইব আরনাউত প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন。
২৭৫. সূরা [১৭] ইসরা', আয়াত: ৭৯。
২৭৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৪৪০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৩৫৬২。
২৭৭. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ১৯২。
২৭৮. সূরা [৩২] সাজদাহ, আয়াত: ২০। আরো দেখুন: সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২২。
২৭৯. ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১০/৪৮৮。
২৮০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯১; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদীস: ৩১০。
২৮১. সুনান দারিমি, হাদীস ৬১০। আজুররি, আশ শারীআহ, হাদীস: ৯৯; ইবন বাত্তাহ, আল ইবানাহ, হাদীস: ৮১। হুসাইন দারানি বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ。
২৮২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৪৬০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৪৬。
২৮৩. সূরা [১৮] কাহাফ, আয়াত: ১০৩-১০৪。
২৮৪. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২১৬৭; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩৯২-৩৯৭। হাদীসটিকে ইমাম হাকিম, জিয়া মাকদিসি, সাখাবি প্রমুখ মুহাদ্দিস প্রমাণিত বলেছেন。