📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক

📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক


বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানে পরীক্ষিত-প্রমাণিত পদ্ধতি—যা দেশ, জাতি, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হাদীসশাস্ত্রের এই গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলামের ভেতরে এবং বাইরে হাদীসশাস্ত্রের মতো আরেকটি শাস্ত্রের উদাহরণ নেই। অতীত বা সমসাময়িক কালের কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের সত্যতা নির্ণয়ে হাদীসশাস্ত্রীয় পদ্ধতি অনুসরণের উদাহরণ পশ্চিমা বিশ্ব তো দূরের কথা মুসলিম বিশ্বেও নেই।
হাদীস সত্যায়িত হয় বর্ণনাকারীদের সত্যায়নের মাধ্যমে। কিন্তু বর্ণনাকারীদের সততা ও সত্যবাদিতার ভিত্তিতে কোনো সংবাদ সত্যায়নের এ পদ্ধতি পৃথিবীতে নজিরবিহীন। তাছাড়া কোনো ব্যক্তির জন্য অন্য কোনো ব্যক্তির সততা ও সত্যবাদিতার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া কি সম্ভব, সে ব্যক্তি যতই নিকটতম হোক? উপরন্তু সেই ব্যক্তি যদি হয় শত বছর বা হাজার বছর আগের ভিন্ন দেশ, জাতি, ভাষা, সভ্যতার মানুষ? হাদীসশাস্ত্রের ইমামদের এই কাজটিই করতে হয়। তারা শত শত বছর আগের বর্ণনাকারীদের চারিত্রিক সনদ দেন এবং তার ভিত্তিতে হাদীসের মান নির্ধারণ করেন। যেমন ইমাম বুখারি (রাহ.) তাঁর তারীখ গ্রন্থে হাজার হাজার হাদীস বর্ণনাকারী রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন। এটি একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব বিষয়।
উপরন্তু হাদীসশাস্ত্রের ইমাম হিসাবে খ্যাত এইসব ব্যক্তিবর্গ কেউ আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক অনুমোদিত নন। তাহলে তাদের প্রত্যয়নপত্রের কী মূল্য আছে? কোনো কোনো হাদীস অস্বীকারকারী এসব দাবি করে থাকেন।
কোনো শাস্ত্রকে বৈজ্ঞানিক হতে হলে সর্বজন গ্রহণযোগ্য হতে হবে—এ দাবিটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান। বিজ্ঞান নিজ উপযুক্ততায় বিজ্ঞান। কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। তবে হাদীসশাস্ত্র অবশ্যই পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত। অল্প কিছু অজ্ঞ বিভ্রান্ত লোক ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সকল পণ্ডিত গবেষক, এমনকি অমুসলিম পণ্ডিত পর্যন্ত এ শাস্ত্রের অনন্যতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার গবেষকের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলাম সমালোচক প্রাচ্যবিদ স্প্রেঙ্গার বলেছেন:
‘There is no nation nor has there been any which like them (Muslims) has during twelve centuries, recorded the life of every man of letters. If the biographical records of Mussalman were collected we should probably have accounts, of a half million distinguished persons, and it would be found that there is not a decennium of their history, nor a place of importance which has not its representatives.'
(মুসলিমদের মহাকীর্তি তাদের এই জীবনীশাস্ত্র)। অতীতে ও বর্তমানে এমন কোনো সম্প্রদায় নেই যারা মুসলিমদের মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমদের রচিত জীবনচরিত গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতীপুরুষের জীবনী লাভ করব। এবং দেখা যাবে এমন একটা দশকও নেই, এমন একটা স্থানও নেই যা নিজের কৃতীপুরুষের জন্ম দেয়নি। ২৫৬
হাদীসশাস্ত্র মানব সভ্যতায় অনন্য ও বে-নজির বিষয়। অনন্য, অপূর্ব, অনুপম, অতুলনীয়, অদ্বিতীয়—এ শব্দগুলো পৃথিবীর সকল ভাষায় ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একে যে নেতিবাচকভাবে দেখে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। হাদীসশাস্ত্রের মতো পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত অদ্বিতীয় একটি শাস্ত্র মুসলিমদের হাতে গড়ে উঠেছে, এটা ইসলাম সংরক্ষণে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনার অংশ, মুসলিম জাতির জন্য গর্ব ও শুকরিয়ার বিষয়। মুসলিম নামধারী কেউ যদি এমনতর বিষয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন অন্যরা তাকে 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' ভাবতেই পারেন।
ইসলামপূর্ব ধর্মগুলো ছিল নির্দিষ্ট দেশকালের জন্য। মহান আল্লাহ তাই সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব নেননি। কিন্তু ইসলাম সর্বশেষ দীন। মহান আল্লাহ একে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এ কাজে যথাযথ পার্থিব ম্যাকানিজমও ব্যবহার করেছেন। যা অপূর্ব অভাবনীয়। মানব সভ্যতার আর কোনো অংশ সংরক্ষণের জন্য এর ধারেকাছের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। হাদীসশাস্ত্রীয় মূলনীতি প্রয়োগ করে যদি বিশ্ব-ইতিহাসের অন্য কোনো পর্বের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়, লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে।
আধুনিক ইতিহাসতত্ত্ব অবশ্য হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনেকখানি গ্রহণ করেছে। ২৫৭ কিন্তু পুরোপুরি নিতে পারেনি। নেওয়া সম্ভব নয়। কেননা ইতিহাস তো ষোলো আনা সতর্কতার সাথে সংরক্ষণই করা হয়নি। এখন হাদীসশাস্ত্রীয় নীতিমালায় সত্যায়ন করতে গেলে তার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এবং এজন্যই ইতিহাস কখনো হাদীসের মানে উত্তীর্ণ হতে পারবে না।
পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর জন্যও তাদের ইতিহাস ও দলনেতার বক্তব্য হাদীসশাস্ত্রের নমুনায় পরিপূর্ণ সংরক্ষণ ও নিখুঁতভাবে সত্যায়ন করা সম্ভব নয়। আর সেটা প্রয়োজনীয়ও নয়। কেননা মহান আল্লাহ ইসলাম সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর কুদরতি তত্ত্বাবধানে হাদীস সংরক্ষিত হয়েছে। এর জন্য সকল ব্যবস্থা তিনি কুদরতি ইশারায় করেছেন। প্রত্যেক প্রজন্মের অসংখ্য মরদে কামিল এর জন্য জান কুরবান করেছে। এর নজির মানব সভ্যতার জন্য আনয়ন করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে!
আমাদের নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না। পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর নেতা, তিনি যত প্রভাবশালী আর গ্রহণীয়ই হোন না কেন, পরবর্তীদের জন্য তার জীবনাদর্শ ও কথাকর্ম মেনে চলা আবশ্যক নয়। তাই তার অনুসারীদের জন্য তার সকল কথাকর্ম সংরক্ষণ করা আবশ্যক নয়, উপকারীও নয়; বরং পণ্ডশ্রম। তাই আর কারো আদর্শ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের জন্য হাদীসশাস্ত্রীয় কঠোর সূক্ষ্ম মূলনীতি মেনে প্রাণান্ত মেহনত করা হবে না। হাদীসশাস্ত্র তাই কিয়ামত পর্যন্ত অনন্য, অনুপম, অতুলনীয় ও অদ্বিতীয় হয়ে থাকবে।
বর্ণনাকারীর মূল্যায়নের মাধ্যমে সংবাদ গ্রহণ-বর্জন নজিরবিহীন নয়, বরং মানব সমাজের Common চর্চা। ধরুন, আপনারা পাঁচজন বন্ধু বসে আছেন। আপনাদের ষষ্ঠ বন্ধু এল। যার চরিত্র নড়বড়ে, বানিয়ে কথা বলে, সত্য-মিথ্যার পরোয়া করে না। সে এসে একটি সংবাদ দিল। নিশ্চয় আপনারা তার সংবাদ বিশ্বাস করবেন না। তা নিয়ে হাসাহাসি করবেন, বলবেন, 'দূর, ও কী বলে না বলে!' কিছুক্ষণ পর আপনাদের সপ্তম বন্ধু এল। মজবুত চরিত্রের অধিকারী। সততা ও সত্যবাদিতায় আপনাদের সকলের মাঝে প্রসিদ্ধ। আপনারা কখনোই তাকে মিথ্যা বলতে শোনেননি। তার দেওয়া সংবাদ নিয়ে কি হাসাহাসি করবেন? 'দূর, ও কী বলে না বলে' বলে কি উড়িয়ে দেবেন? না, তা করবেন না। জি, এটাই মানব সভ্যতার চিরন্তন প্রবণতা। ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার উপর ভিত্তি করেই তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإِ فَتَبَيَّnُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ.
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে না অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে কষ্ট দিয়ে ফেলো; তাতে নিজেদের কর্ম নিয়ে তোমরা লজ্জিত হবে।”২৫৮
এ আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সংবাদ গ্রহণ ও বর্জনের মূল ভিত্তি সংবাদদাতার অবস্থা। সংবাদদাতা ফাসিক হলে তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণ করা যাবে না। অন্য মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। আর সংবাদদাতা ফাসিক না হলে তার সংবাদ গৃহীত হবে।
কুরআনে বর্ণিত এ মূলনীতির ভিত্তিতেই প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিস আলিমগণ স্বীয় যুগের হাদীস বর্ণনাকারী রাবিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেছেন এবং পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন- যেমন তারা হাদীস সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও হাদীস বর্ণনাকারীর অবস্থা একই সাথে একইভাবে পরবর্তীদের নিকট ট্রান্সফার হয়েছে। সংকলক ইমামগণ নতুন করে গবেষণা করে এ সকল তথ্য উদ্ধার করেছেন তা নয়। এ ধারণা ভুল যে, শত শত বছর পর হাদীস যখন সংকলিত হলো এবং তারপর তা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিল তখন মুহাদ্দিস ইমামগণ বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত অবস্থা অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন, কিন্তু তত দিনে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, শত শত বছর আগের তথ্যাবলি কালের সাথে সাথে কালের হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, সুতরাং এখন যা বলা হবে সবই ধারণা-অনুমান।
বরং বাস্তবতা হলো, সংকলক ইমামগণ হাদীসের মতো বর্ণনাকারীদের জীবনীও সূত্রের মাধ্যমে পেয়েছেন। ইমাম বুখারি (রাহ.)-ও তাঁর তারীখের কিতাবে যে সকল রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের সম্পর্কে যে চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন তা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্যই এ কালে বসে সে কালের ব্যক্তি সম্পর্কে আন্দাজে ঢিল ছোড়া মনগড়া মন্তব্য নয়। তিনি নিজেই বলেছেন :
إِنَّمَا رَوَيْنَا ذَلِكَ رِوَايَةً لَمْ نَقُلْهُ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِنَا.
এ সম্পর্কে আমি পূর্বসূরিদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি মাত্র। নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলিনি। ২৫৯
উল্লিখিত আয়াতের আলোকে এ কথাও সাব্যস্ত যে, সংবাদদাতা সম্পর্কে যিনি ওয়াকিবহাল তিনি তার সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে পারবেন। এ কথা জ্ঞানচর্চার জগতে সর্বজনস্বীকৃত। যা কিছু মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির গম্য সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে কোনো ঊর্ধ্বপক্ষের স্পেসিফিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। বরং নির্দিষ্ট শাস্ত্রে স্বীকৃত পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত পারদর্শিতা অর্জন করতে হয় এবং সত্যই পারদর্শিতা অর্জিত হয়েছে কি না সে বিষয়ে উক্ত শাস্ত্রের স্বীকৃত ব্যক্তিবর্গের স্বীকৃতি পেতে হয়।
যে গ্রন্থটিকে আমরা আল্লাহর কিতাব আল কুরআন বলে জেনেছি ও মেনেছি, জন্মের পর থেকে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে জেনেছি যে, এটা আল কুরআন। কিন্তু তারা কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স্পেসিফিক অনুমোদিত নয়। তাছাড়া আমি আমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে যে নিশ্চিত হয়েছি, কিন্তু আমি বা আমার জ্ঞানবুদ্ধিই কি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক স্পেসিফিক অনুমোদিত? তাই বলে কি আমাদের এই সিদ্ধান্ত অবাস্তব অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক? কিছুতেই নয়—যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই জেনে এসেছে।

টিকাঃ
২৫৬. [Sprenger, A Biographical Dictionary of Persons Who knew Muhammad, vol. 1, p.1.]
২৫৭. বিস্তারিত দেখুন: আসাদ রুস্তম, মুস্তালাহুত তারীখ。
২৫৮. সূরা [৪৯] হুজুরাত, আয়াত: ০৬。
২৫৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', ১/৭৯ ও ১০/১০৪。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক

📄 হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক


হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক। কেননা হাদীস সত্যায়ন করা হয় বর্ণনাকারীদের সত্যায়ন করার মাধ্যমে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির জন্যই তার সর্বাধিক নিকটতম ব্যক্তির সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যেমন নয়, তেমনি যে কারো সম্পর্কে সুধারণা রাখার নির্দেশনা থাকলেও কারো বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেওয়াও কুরআন-সুন্নাহসম্মত নয়। মহান আল্লাহ বলেন :
وَمِمَّnْ حَوْلَكُمْ مِنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُوْنَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ سَنُعَذِّبُهُمْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ.
“আর তোমাদের আশপাশের বেদুইনদের মাঝে মুনাফিক আছে এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও; তারা কপটতায় এতটাই সিদ্ধ যে, তোমরা তাদেরকে জানো না, তবে আমি তাদেরকে জানি। অবশ্যই আমি তাদেরকে দুবার শাস্তি দেব। অতঃপর তাদেরকে এক ভয়ংকর শাস্তির দিকে তাড়িত করা হবে।”২৬০
হাদীস শরীফে এসেছে, মুহাজির সাহাবি উসমান ইবন মাযউন (রা.) আনসারি সাহাবিয়া উম্মুল আলা'র বাড়িতে জায়গির থাকতেন। এই উসমান (রা.)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর জায়গিরদার উম্মুল আলা' (রা.) বলেন, তাঁর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। তাঁর সম্বন্ধে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কীভাবে জানলে যে, আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তা না হলে আল্লাহ আর কাকে সম্মানিত করবেন? নবীজি বললেন:
أَمَّا هُوَ فَقَدْ جَاءَهُ الْيَقِينُ وَاللهِ إِنِّي لَأَرْجُوْ لَهُ الْخَيْرَ وَاللَّهِ مَا أَدْرِي وَأَنَا رَسُوْلُ اللَّهِ مَا يُفْعَلُ بِي.
তাঁর ব্যাপার তো এই যে, তাঁর নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই তাঁর জন্য কল্যাণের আশা করি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না, আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে।
ওই নারী সাহাবি বলেন, আল্লাহর কসম, এরপর আমি আর কোনো দিন কারো সম্বন্ধে পবিত্র বলে মন্তব্য করব না। ২৬১
সূরা তাওবাহর উল্লিখিত ১০১ নং আয়াত থেকে আমরা দেখছি যে, সাহাবিগণও তাঁদের সমাজের মুনাফিকদের চিনতেন না। সুতরাং তাঁদের জন্যও সম্ভব ছিল না তাঁদের সামাজের কারো কপটতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে বলা। তেমনি হাদীস শরীফ থেকে আমরা দেখলাম, একই ছাদের নিচে বসবাসকারী ব্যক্তির ব্যাপারেও সুনিশ্চিত করে কিছু বলার অনুমতি নেই।
তাহলে মুহাদ্দিসগণ স্বীয় যুগের এবং নিকট, দূর বা সুদূর অতীতের বর্ণনাকারীদের প্রত্যয়ন করছেন এবং তার ভিত্তিতে তাদের দেওয়া সংবাদের মান নির্ণয় করছেন-এটা কীভাবে বৈধ ও অনুমোদিত হতে পারে?
তাছাড়া মুহাদ্দিসগণ হাদীস সত্যায়নের নামে লক্ষ লক্ষ মুসলিম রাবির চরিত্র হনন করেছেন। তাদেরকে মিথ্যুক, প্রতারক, বক্তব্য জালকারী ইত্যাদি নানান নেতিবাচক বিশেষণে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। অথচ কুরআন-হাদীসের অসংখ্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা মোতাবেক কোনো মানুষের সম্মানহানি, নিন্দা, গীবত ভয়ংকর কবীরাহ গোনাহ এবং এর পরিণাম চিরস্থায়ী জাহান্নাম। মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেছেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّnِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّnِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّsُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ.
“হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক ধারণা থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না। এবং একে অপরের দোষচর্চা কোরো না। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো এটা ঘৃণাই করে থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। ২৬২
হাদীস অস্বীকারকারীদের এইসব দাবি অবাস্তব, অজ্ঞতা, ভুল ও স্থূল চিন্তার ফসল। সূরা তাওবাহর ১০১ নং আয়াতে শ্রোতাপক্ষের ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এ আয়াতে প্রধানত সাহাবিগণ উদ্দেশ্য। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ মুনাফিকদের চিনতেন না এবং তাদের পরিণতি জানতেন না-এ কথা সত্য। তবে পরে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে মুনাফিক সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যেমন সূরা শূরার ৫২ নং আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে বলেছেন, 'আপনি জানতেন না কিতাব কী আর ঈমান কী?' এর অর্থ এ নয় যে, নবীজি কখনোই কিতাব ও ঈমান সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেননি।
তেমনি প্রথম দিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিক না চিনলেও পরবর্তী সময় সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাঁকে জ্ঞানদান করেছিলেন। কারো কারো বিষয়ে সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন এবং অন্যদের চেনার জন্য আলামত বলে দিয়েছিলেন। আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াত এবং অনেক হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের চিনতেন। এমনকি কারা মুনাফিক এ বিষয়টি সাহাবিদের নিকটও সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন :
أَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ أَنْ لَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ أَضْغَانَهُمْ ، وَلَوْ نَشَاءُ لَا رَيْنَا كَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُمْ بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ.
“যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাদের বিদ্বেষ ভাব প্রকাশ করে দেবেন না? আমি চাইলে, অবশ্যই আপনাকে তাদের সম্পর্কে জানিয়ে দেব। ফলে তাদের ভাবভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন। তবে কথার ভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ তাদের কর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত।”২৬৩
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُوْلُوْا تَsْمَعُ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُbٌ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُوْنَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرُهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ.
“আপনি যদি তাদেরকে দেখেন তাদের দেহকাঠামো আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর যদি তারা কথা বলে আপনি তাদের কথা শুনতে চাইবেন। যেন তারা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া কাঠখণ্ড। তারা ধারণা করে সকল আওয়াজ বুঝি তাদের বিরুদ্ধে। এরা শত্রু। এদের থেকে দূরে থাকুন। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে!"২৬৪
উপরের আয়াতে মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছেন, কথার ভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি মুনাফিকদেরকে চিনতে পারবেন। আর এ আয়াতে মুনাফিকদের কিছু আলামত উল্লেখ করে বললেন, এরা শত্রু। এদের থেকে দূরে থাকুন। সূরা তাওবাহর ৭৩ নং আয়াত এবং সূরা তাহরীমের ৯ নং আয়াতে তিনি নবীজিকে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং কঠোরতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং সূরা তাওবাহর ৮৪ নং আয়াতে মুনাফিকদের জানাযা না পড়তে এবং তাদের কবরের পাশে না দাঁড়াতে নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ সকল আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিক গোষ্ঠীকে পুরোপুরি চিনতেন। তা না হলে তিনি কীভাবে তাদের থেকে দূরে থাকা, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও কঠোরতা অবলম্বন করা এবং তাদের জানাযা না পড়ানো ও কবরের পাশে না দাঁড়ানোর এ সকল কুরআনি নির্দেশ পালন করবেন?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো কোনো সাহাবিকে বিষয়টি অবগত করেছিলেন। ফলে সাহাবিদের সমাজে মুনাফিকরা সকলের কাছে চিহ্নিত ছিল। কা'ব ইবন মালিক (রা.) তাবুক যুদ্ধে শরিক হননি। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন:
كُنْتُ إِذَا خَرَجْتُ فِي النَّاسِ بَعْدَ خُرُوجِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطُفْتُ فِيهِمْ أَحْزَنَنِي أَنِّي لَا أَرَى إِلَّا رَجُلًا مَغْمُوْصًا عَلَيْهِ النَّفَاقُ.
তাবুক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বের হয়ে যাওয়ার পর আমি যখন মানুষের মাঝে বের হয়ে ঘুরতে লাগলাম, একটি বিষয় আমাকে পীড়া দিতে লাগল, আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, শুধু মুনাফিকিতে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছাড়া।২৬৫
অর্থাৎ সাহাবিদের সমাজের মুনাফিক গোষ্ঠী সকলের কাছে সুস্পষ্ট ছিল। কে সাহাবি আর কে মুনাফিক তা অস্পষ্ট ছিল না। আর সাহাবিগণ সকলেই ন্যায়পরায়ণ বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য। সুখের কথা হচ্ছে, সাহাবিদের সমাজের মুনাফিক হিসাবে চিহ্নিত কোনো একজন ব্যক্তি থেকেও একটি হাদীসও বর্ণিত হয়নি। সুতরাং সে সমাজে মুনাফিকের উপস্থিতির কারণে হাদীসের ভান্ডারে সন্দেহ তৈরি হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আর উম্মুল আলা' (রা.) বর্ণিত উসমান ইবন মাযউন (রা.)-এর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনায় পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহ কাকে কোন পজিশনে রেখেছেন সে সম্পর্কে সুনিশ্চিত মন্তব্য করতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। এর সাথে দুনিয়ার জীবনে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই।
এ প্রসঙ্গে উপরে উল্লেখিত সূরা হুজুরাতের ০৬ নং আয়াতটি আবার স্মরণীয়। আয়াতটিতে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে'। এ আয়াত থেকে প্রথমত বোঝা যায় যে, সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবাদদাতার চারিত্রিক অবস্থা দ্রষ্টব্য। মুমিনগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আদিষ্ট যে, তারা সংবাদদাতার চারিত্রিক অবস্থা বিবেচনায় সংবাদ গ্রহণ বা বর্জন করবেন। কিন্তু তারা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যদি এতটুকু প্রত্যয়ন করতে না পারেন, যার ভিত্তিতে তারা উক্ত ব্যক্তির আনীত বা প্রদত্ত সংবাদ গ্রহণ বা বর্জন করতে পারবেন, তাহলে তারা কীভাবে এই কুরআনি নির্দেশ পালন করবেন? সুতরাং হাদীস অস্বীকারকারীদের উত্থাপিত দলীলের দাবি কিছুতেই এ নয় যে, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এতটুকু প্রত্যয়নও করা যাবে না যার ভিত্তিতে তার সংবাদ গ্রহণ-বর্জন করা যায়। তবে কারো সম্পর্কে চূড়ান্ত ফায়সালা করা এবং আখিরাতের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে বলা তো শুধু মহান আল্লাহরই কর্ম।
এ আয়াত থেকে এ কথাও বোঝা যায় যে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসে, যা গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন ওঠে, তার ব্যক্তিগত অবস্থা সংবাদপ্রাপকের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে, জানা থাকতে হবে সংবাদদাতা ফাসিক নাকি আদিল। সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী। সুতরাং হাদীসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যাদের মাধ্যমে বর্ণিত হবে সেসব বর্ণনাকারীর অবস্থা উম্মাতের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে। এ কারণেই মুহাদ্দিস ইমামগণ কর্তৃক রাবিদের সামগ্রিক অবস্থা আলোচিত হওয়া একটি জরুরি বিষয়। আর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কারো নেতিবাচক বিশেষণ উল্লেখ করাও নিষিদ্ধ বা নিন্দনীয় গীবত নয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ প্রদর্শিত অনুমোদিত কর্ম। আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মহান আল্লাহ মূসা (আ.)-কে ফিরআউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন :
اِذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى.
"তুমি ফিরআউনের কাছে যাও। সে সীমালঙ্ঘন করেছে।”২৬৬
হাদীস শরীফে এসেছে, ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.)-কে তাঁর স্বামী আবু আমর তালাক দেন। ইদ্দত পালন শেষে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, মুআবিয়াহ ও আবু জাহম আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। তখন নবীজি বলেন:
أَمَّا أَبُوْ جَهْمٍ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوْكَ لَا مَالَ لَهُ انْكِحِيْ أُsَامَةَ بْنَ زَيْدٍ.
আবু জাহম তো চরম মারকুটে লোক, সে তো কাঁধ থেকে লাঠি নামায়ই না। আর মুআবিয়াহ কপর্দকহীন নিঃসম্বল মানুষ। তুমি বরং উসামাকে বিয়ে করো। ২৬৭
সুতরাং হাদীস সত্যায়নের জন্য বর্ণনাকারীর চরিত্রের পোস্টমর্টেম করা এবং তার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য বলে রায় প্রদান করা কুরআন-হাদীস নিষিদ্ধ অনৈসলামিক কর্ম নয়। বরং সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার যে কুরআনি নির্দেশ তার প্রতিপালন। মুহাদ্দিসদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার ছিল। তারা হাদীস বর্ণনাকারীর প্রয়োজনীয় সমালোচনাকে নিন্দনীয় গীবত হিসাবে গণ্য করতেন না। এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের সর্বজনস্বীকৃত বক্তব্য হচ্ছে :
وَالْكَلَامُ فِي الرِّجَالِ جَرْحًا وَتَعْدِيْلًا ثَابِتٌ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ عَنْ كَثِيرٍ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ فَمَنْ بَعْدَهُمْ وَجُوِّزَ ذَلِكَ تَوَرُّعًا وَصَوْنًا لِلشَّرِيعَةِ لَا طَعْنَا فِي النَّاسِ.
বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত তথ্য আলোচনা-পর্যালোচনা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বিপুল সংখ্যক সাহাবি, তাবিয়ি এবং পরবর্তী শাস্ত্রবিদ থেকে প্রমাণিত। এর বৈধতা দেওয়ার কারণ শরীআতকে খাদ থেকে নির্ভেজাল রাখা, ব্যক্তি-আক্রমণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য নয়। ২৬৮
ইমাম বুখারি (রাহ.) বারবার বলেছেন, আখিরাতে আমার কোনো প্রতিপক্ষ থাকবে না। যখন থেকে আমি জেনেছি যে, গীবত গীবতকারীরই ক্ষতির কারণ হয় তখন থেকে কখনো কারো গীবত করিনি। আমি আশা করি, যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াব কারো গীবত করেছি এমন কোনো হিসাব তিনি পাবেন না। মুহাম্মাদ ইবন আবু হাতিম বলেন, আমি তাঁকে বললাম, কিছু মানুষ আপনার তারীখ গ্রন্থের ব্যাপারে আপত্তি করেন। তারা বলেন, সেখানে আপনি অনেক মানুষের গীবত করেছেন। তখন ইমাম বুখারি (রাহ.) বলেন:
إِنَّمَا رَوَيْنَا ذُلِكَ رِوَايَةً لَمْ نَقُلْهُ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِنَا.
এ সম্পর্কে আমি পূর্বসূরিদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি মাত্র। নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলিনি। ২৬৯
এরপর তিনি আয়িশা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করেন। হাদীসটি তিনি তাঁর সহীহ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। আয়িশা (রা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে আসার অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি বলেন:
ائْذَنُوْا لَهُ فَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيْرَةِ أَوْ بِئْسَ أَخُو الْعَشِيْرَةِ.
তাকে অনুমতি দাও। সে তো বংশের নিকৃষ্ট সন্তান বা ভাই। ২৭০
এ হাদীসে আমরা দেখছি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেন, এ কথা তিনি বলেছেন, অন্যের প্রতি নসীহাহ বা কল্যাণ কামনা স্বরূপ। যেন অন্যরা তার অকল্যাণ থেকে সতর্ক হতে পারে। এ আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কারো সম্পর্কে বাস্তব সত্য নেতিবাচক মন্তব্য করা কুরআন-হাদীস বিরোধী অনৈসলামিক কর্ম নয়। সুতরাং হাদীসের মতো অতি প্রয়োজনীয় সংবাদ যাদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য উল্লেখ ও সংরক্ষণ করা কিছুতেই অনৈসলামিক কর্ম বলে গণ্য নয়।
যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত হাদীস মান্য করা আবশ্যক থাকবে সেহেতু সে পর্যন্ত হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের প্রশ্নও থাকবে। এবং এ কারণেই হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হওয়া ছিল অতিশয় জরুরি। মুহাদ্দিস ইমামগণ এই অতিপ্রয়োজনীয় কর্মটিই জীবন ক্ষয় করে আনজাম দিয়েছেন। তাই তারা উম্মাহর পক্ষ থেকে বেহদ কৃতজ্ঞতা, পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার হকদার।

টিকাঃ
২৬০. সূরা [৯] তাওবাহ, আয়াত: ১০১。
২৬১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৭৪৫৭; সহীহ বুখারি, হাদীস: ২৬৮৭。
২৬২. সূরা [৪৯] হুজুরাত, আয়াত: ১২。
২৬৩. সূরা [৪৭] মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৯-৩০。
২৬৪. সূরা [৬৩] মুনাফিকূন, আয়াত: ০৪。
২৬৫. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৫৭৮৯; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৪৪১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৬৯。
২৬৬. সূরা [২০] তা-হা, আয়াত: ২৪ ও ৪৩; সূরা [৭৯] নাযিআত, আয়াত: ১৭。
২৬৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৮০; মুআত্তা মালিক, হাদীস ১৬৬৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ২৭৩২৭; সুনান নাসায়ি, হাদীস : ৩২৪৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ২২৮৪。
২৬৮. হাজ্জি খলীফা, কাশফুল যুনূন, ১/৫৭২; সিদ্দীক হাসান খান, আবজাদুল উলূম, পৃ. ৩৫৭; আল হিত্তাহ, পৃ. ৮৩。
২৬৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', ১/৭৯ ও ১০/১০৩-১০৪。
২৭০. সহীহ বুখারি, হাদীস : ৬০৫৪ ও ৬১৩১。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 সহীহ সনদে জাল হাদীস

📄 সহীহ সনদে জাল হাদীস


হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে এ কথা হাদীস মান্যকারী ও অমান্যকারী সকলেই জানেন ও মানেন। আর সনদ যাচাইয়ের মাধ্যমে হাদীস সত্যায়ন করা সম্ভব নয়। কেননা জালিয়াত তো জাল হাদীসের জন্য বিশুদ্ধ সনদ ব্যবহার করতে পারেন। এমতাবস্থায় কীভাবে সনদ পরীক্ষা করে হাদীসের সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব হবে?
তাছাড়া হাদীসের নামে জালিয়াতি হওয়ার কথা যদি আমরা স্বীকার করি তবে হাদীসের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। কেননা যার একটা জাল ধরা পড়ে তার বাকি কথাও প্রামাণ্যতা হারায়। যেমন কোনো আদালতে কেউ একটা মিথ্যা বলেছে প্রমাণ হলে বা একটা ফেইক ডকুমেন্ট উত্থাপন করলে তার বাকি নয়শত নিরানব্বইটা সত্য আদালত গ্রহণ করে না।
জাল কথার জন্য সহীহ সনদ ব্যবহার করলে তা মুহাদ্দিসদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহীহর কাতারে উতরে যেতে পারবে—এ কথা শুনে হাদীসশাস্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত বিস্ময়ে হাসতে ভুলে যাবে। কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এমন অজ্ঞতাপ্রসূত ও পাগলামিপূর্ণ বাক্যালাপ করতে পারে! কোনো শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পর্যন্ত অর্জন না করে তা সম্পর্কে মুখ খোলা যায়! এসব প্রলাপের জবাব দিতে যাওয়াও সময় নষ্ট করা, এক প্রকার বাতুলতা এবং বাক্যের অপচয়। কবি তাই পরামর্শ দিয়েছেন:
إِذَا نَطَقَ السَّفِيهُ فَلَا تُجِبْهُ فَخَيْرٌ مِنْ إِجَابَتِهِ السُّكُوْتُ فَإِنْ جَاوَبْتَهُ فَرَجْتَ عَنْهُ وَإِنْ خَلَيْتَهُ كَمَدًا يَمُوْتُ.
উত্তর দিতে যেয়ো না যখন নির্বোধ বলে কথা, তার সে কথার জবাবের চেয়ে উত্তম নীরবতা। প্রত্যুত্তর করলে তো তার করে দিলে স্থান, আর জেনে রেখো, উপেক্ষাতেই হয়ে থাকে প্রস্থান।
কবি যথার্থই বলেছেন। আমাদেরও এসব প্রলাপের জবাব দিতে রুচি হয় না। এ বিষয়ে ড. মুস্তফা আযমির কিছু সহজ-সরল বক্তব্য তুলে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, কারো কারো মনে সন্দেহ আসতে পারে যে, পরবর্তী যুগে কোনো কোনো মিথ্যাবাদী তো একেবারে উচ্চশ্রেণির বর্ণনাসূত্র-সহই একটি হাদীস বানিয়ে ফেলতে পারে। মুহাদ্দিসগণ হয়তো সনদ দেখেই সেই বানোয়াট বর্ণনাটি গ্রহণ করে নিলেন। আসলে এই আশঙ্কা অমূলক। কারণ এ কথা স্পষ্ট যে, মুহাদ্দিসগণ শুধু সনদ দেখেই ক্ষান্ত হন না। এ বর্ণনাকারীর অবস্থাও যাচাই করা হয়। পাশাপাশি দেখা হয় তার সতীর্থ কেউ সেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কি না। ২৭১
কোনো যুগেই জাল কথার সহীহ সনদ তৈরি করে মুহাদ্দিসদেরকে প্রতারিত করে উতরে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
এখানে দ্বিতীয় যে কথাটি তারা বলেছেন, হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে বলে হাদীস গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে-এটাও তাদের নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কথা। উদোর পিণ্ডি তারা বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।
এটা তো সত্যি যে, যে ব্যক্তি জীবনে একবার মিথ্যা বলেছে তার বিশ্বস্ততা হারিয়ে যাবে। কিন্তু যার নামে মিথ্যা বলা হলো তার বিশ্বস্ততাও হারিয়ে যাবে, এটা কেমন বিচার? আপনি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি, কিন্তু কেউ একজন আপনার নামে মিথ্যা বলেছে, তাই আপনি আর বিশ্বাসযোগ্য থাকবেন না? কিছু মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা হাদীস তৈরি করেছে বলে নবীজির সকল হাদীস গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে? এটা কি কোনো যুক্তির কথা?
জি, যে ব্যক্তি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেছে বলে প্রমাণিত সে বিশ্বস্ততা হারিয়েছে। হাদীসশাস্ত্রেও তার কথা আর গ্রহণ করা হয় না। আদালতে যেমন কেউ একটা মিথ্যা বলেছে প্রমাণ হলে বা একটা ফেইক ডকুমেন্ট উত্থাপন করলে তার সত্যমিথ্যা কোনো কিছুতেই আদালত ভ্রুক্ষেপ করে না। বরং ব্যক্তিকেই বাতিল করে দেয়। কিন্তু ওই মামলাটি যদি অন্যান্য সত্য সাক্ষী ও ডকুমেন্টের দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যায় আদালত সেভাবেই রায় প্রদান করে। কোনো সাক্ষীর মিথ্যাচারের কারণে তার সাক্ষ্য বাতিল হয়, মামলাটি বাতিল করা হয় না।
এখান থেকে এ সংশয়ও তৈরি হতে পারে যে, কোনো বর্ণনাকারীর একটা মিথ্যা প্রমাণিত হলে যখন তার সমস্ত বর্ণনা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে তখন তার কিছু ভুল ও জাল বর্ণনার পাশাপাশি অনেক বিশুদ্ধ হাদীসও বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে তো নবীজির অনেক হাদীস বাতিল ও অগ্রহণযোগ্যতার তালিকায় গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে কি এ কথা বলা যায় না যে, তাঁর সমগ্র হাদীস সংরক্ষিত হতে পারেনি?
এ সংশয়টিও অমূলক। যদিও প্রমাণিত মিথ্যাবাদীর জাল-সহীহ সকল বর্ণনা বাতিল হয়ে যাচ্ছে, তবে এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো হাদীস হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না। কেননা এমন তো হতে পারে না যে, নবীজির কোনো সহীহ হাদীস শুধু ওই মিথ্যাবাদীই জানতেন আর কেউ জানতেন না, মিথ্যাবাদীর জানা সহীহ হাদীসগুলো উস্তাদের কাছ থেকে শুধু তিনিই শিখেছিলেন, এই মিথ্যাবাদী ছাড়া ওই উস্তাদের আর কোনো ছাত্র ছিল না।
বরং কোনো মিথ্যাবাদীর চেয়ে ন্যায়পরায়ণ নিষ্ঠাবান রাসূল-প্রেমিক মুসলিমের হাদীস শেখার আগ্রহ অনেক বেশি ছিল। সুতরাং কোনো নির্ভরযোগ্য উস্তাদের কাছ থেকে কোনো মিথ্যাবাদী যদি একটা বিশুদ্ধ হাদীস শিখে থাকেন তবে অন্য অনেক ন্যায়পরায়ণ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিও ওই উস্তাদের কাছ থেকে সেই হাদীসটি শিখে থাকবে। সুতরাং ওই মিথ্যাবাদীর সূত্রে ওই বর্ণনাটি বাতিল হলেও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে সেটি বর্ণিত ও সংরক্ষিত হয়ে যাবে। অতএব মিথ্যাবাদীর বর্ণনা বাতিল করে দেওয়ার কারণে কোনো বিশুদ্ধ হাদীস হারিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

টিকাঃ
২৭১. মুস্তফা আযমি, হাদিস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ১২৯।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 প্রবীণ সাহাবিদের বর্ণিত হাদীস সংখ্যা কম

📄 প্রবীণ সাহাবিদের বর্ণিত হাদীস সংখ্যা কম


অনেকে এ কথা বলে হাদীসের উপর সংশয় তৈরি করতে চায় যে, আবু বাকর (রা.) ও উমার (রা.)-এর মতো প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিড়য়ারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নববি জীবনের সমগ্র সময়ের সান্নিধ্যে ধন্যড়তাঁরা আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো শেষকালে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের তুলনায় নবীজির কথা ও কর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। এ কারণে তাঁদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো শেষের দিকে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের থেকে অনেক অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন হাজার হাজার হাদীস। আর এর বিপরীতে আবু বাকর (রা.) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা শত শতও নয়।
কোনো পড়াশোনা নয়, এ প্রশ্ন উঠানোর আগে যদি শুধু নিজের মস্তিষ্ককেও কাজে লাগানো হতো, তবুও এ ধরনের বালসুলভ কথা উচ্চারণ করা থেকে জবানকে সংযত করা হতো। কে নিজেকে হাসির পাত্র বানাতে চায়! বোঝা যায়, এ বক্তব্যের প্রচারক হাদীস সংরক্ষণের দুর্বলতা ও অযৌক্তিকতা প্রমাণের উসকানিতে খুবই ত্বরা প্রবণতার শিকার হয়েছেন।
প্রধানত দুটি কারণে আবু বাকর (রা.)-এর মতো প্রবীণ সাহাবিদের বিপরীতে আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো নবীন সাহাবিদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা বেশি। ১. সাহাবিদের কাছ থেকে হাদীস শিখেছেন তাবিয়িগণ। তাঁদের কাছ থেকে তাবি'-তাবিয়িগণ। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্য দিয়ে সংকলক মুহাদ্দিসদের হাতে হাদীস সংকলিত হয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের অল্প দিনের মধ্যে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রবীণ সাহাবিগণও ইন্তিকাল করেন। যেমন আবু বাকর (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর মাত্র দু-বছর বেঁচে ছিলেন। আর নবীজির শেষ-জীবনে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিগণ বেঁচে ছিলেন দীর্ঘকাল। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবু হুরাইরা (রা.) নবীজির ইন্তিকালের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল বেঁচে ছিলেন। নবীজির ইন্তিকালের পরপর ইসলাম গ্রহণকারী প্রবীণ তাবিয়িগণ তো সকল জীবিত সাহাবির কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তবে প্রবীণ সাহাবিগণ, যারা আগে আগে ইন্তিকাল করে গেছেন, তাঁদের অল্প দিনের সান্নিধ্যের কারণে তাঁদের কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ কম পেয়েছেন। আর দীর্ঘদিন যারা বেঁচে ছিলেন, সে সকল সাহাবির দীর্ঘ সান্নিধ্যের কারণে তাঁদের কাছ থেকে হাদীস শেখার সুযোগ বেশি পেয়েছেন।
পক্ষান্তরে যে সকল তাবিয়ি সাহাবি-যুগের শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা তো প্রবীণ সাহাবিদের সাক্ষাৎ না পাওয়ার কারণে তাঁদের কাছ থেকে কোনো হাদীস শেখার সুযোগ পাননি। তাঁরা শুধু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ জীবনে ইসলাম গ্রহণকারী অল্প বয়েসি সাহাবিদের থেকেই হাদীস শেখার সুযোগ পেয়েছেন।
তাছাড়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিদের প্রথম যুগটি ছিল মূলত সাহাবি-প্রধান যুগ। তখন অল্প কিছু তাবিয়ি মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সাহাবিরা তো সকলেই নবীজির কাছ থেকে ইসলাম শিখেছেন। আর সে সময়ে ইসলাম গ্রহণকারী তাবিয়িগণ প্রবীণ-নবীন সকল সাহাবি থেকেই ইসলাম শিখেছেন। আর সাহাবিদের শেষ যুগটি ছিল তাবিয়ি-প্রধান যুগ। প্রবীণ সাহাবিরা ইন্তিকাল করেছেন। একের পর এক বিভিন্ন দেশ ইসলামের হাতে বিজিত হয়েছে। দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা ওই সময়ে জীবিত সাহাবিদের থেকেই ইসলাম শিখেছেন।
এ কারণে স্বভাবিকভাবেই তাবিয়ি প্রজন্মে প্রবীণ সাহাবিদের তুলনায় নবীন সাহাবিদের ছাত্র-শিষ্যের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি আর তারা নবীন সাহাবিদের থেকে হাদীসও শিখেছেন বেশি। সুতরাং এটাও স্বাভাবিক যে, এই সকল তাবিয়িদের দ্বারা যখন তাবি'-তাবিয়িদের কাছে হাদীস বর্ণিত হবে নবীন সাহাবিদের সূত্রই বেশি উল্লেখিত হবে। এর অর্থ কিছুতেই এ নয় যে, প্রবীণ সাহাবিগণ হাদীস কম জানতেন বা হাদীসকে কম মূল্যায়ন করতেন।
২. আবু বাকর (রা.) ও উমার (রা.)-এর মূল ব্যস্ততা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা। আর আবু হুরাইরা (রা.)-এর মূল ব্যস্ততা ছিল শিক্ষাদান। ধরুন, আপনারা দুজন সহপাঠী একজন উস্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ জ্ঞান অর্জন করলেন। তবে আপনি সে উস্তাদের সারা জীবনের সান্নিধ্যধন্য আর আপনার সহপাঠী উস্তাদের শেষ-জীবনের ছাত্র। উস্তাদের মৃত্যুর পর প্রচুর লোক আসতে লাগল আপনাদের আশ্রমে ওই বিশেষ জ্ঞান শেখার জন্য। তারা সেখানে থাকে আর জ্ঞান অর্জন করে। তবে আপনার উপর দায়িত্ব পড়ল এসব লোকজনের থাকা-খাওয়া ইত্যাদি বিষয় দেখভালের আর আপনার সহপাঠীর দায়িত্ব পড়ল তাদের শিক্ষাদানের। আপনার সহপাঠী তাদের শিক্ষাদান করেন। কোথাও আটকে গেলে আপনার শরণাপন্ন হন। আপনি সে বিষয়ে উস্তাদের কোনো বাণী জানলে তাকে বলে দেন। না হয় দুজন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত বের করেন। তবে তা তাদের গিয়ে শেখান আপনার এই সহপাঠীই। আপনি হয়তো কাজের ফাঁকে কখনো-সখনো একটু সময় পেলে তাদের সময় দেন। কথার ফাঁকে উস্তাদের দুয়েকটা কথা তাদের বলেন।
দেখুন, আপনিই উস্তাদের কথা বেশি জানতেন এবং আপনার সহপাঠী এই আগত জ্ঞান-অনুসন্ধানীদের যা-কিছু শিখিয়েছেন তার একটা বড় অংশ আপনার কাছ থেকে জেনেই শিখিয়েছেন। তবে এই ছাত্ররা যখন পরবর্তী প্রজন্মকে আপনাদের উস্তাদের জ্ঞান শিক্ষা দেবেন তখন আপনার সূত্রে হয়তো দুয়েকটি কথা বলবেন, আর অধিকাংশই বলবেন আপনার সহপাঠীর সূত্রে।
এসব কারণেই আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো নবীন সাহাবিদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা বেশি। শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণের কারণে ইসলামের অনেক কিছুই তাঁদেরকে শিখতে হয়েছে আবু বাকর (রা.)-এর মতো প্রবীণ সাহাবিদের কাছ থেকে এবং সেসব কিছুও তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এটা ওহির দ্বিতীয় প্রকার অর্থাৎ হাদীস সংরক্ষণে মহান আল্লাহর কুদরতি ব্যবস্থা যে, তিনি আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো অল্প বয়স্ক মেধাবী তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী তরুণকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষকালে ঈমানের নিআমত দান করেছেন এবং তাঁকে নবীজির ইন্তিকালের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল বাঁচিয়ে রেখে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইলম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অতি অল্প বয়সের আয়িশা সিদ্দীকা (রা.)-এর বিবাহও ইলম সংরক্ষণে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনারই অংশ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00