📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে

📄 হাদীস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে


যখন প্রমাণিত হলো যে, হাদীসও মহান আল্লাহর প্রেরিত ওহি, আর ওহি মানতে যেহেতু আমরা বাধ্য, সুতরাং হাদীস মানতেও বাধ্য, তখন তারা হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতার উপর বিভিন্ন আপত্তি উঠিয়ে তারা বলতে চায় যে, হাদীস ওহি, এ কারণে আমরা তা মানতে যদিও বাধ্য, তবে নানান ঐতিহাসিক ও পারিপার্শ্বিক জটিলতার কারণে যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল হাদীস সংরক্ষিত হতে পারেনি, তেমনি হাদীসের সাথে অন্য কথাও এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেসব থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণী বের করে আনা দুরূহ ব্যাপার-বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য। আর আল্লাহ তো কারো উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না। তাহলে সর্বসাধারণের জন্য হাদীস মান্য করা কীভাবে আবশ্যক হতে পারে? আল কুরআনের ইরশাদ :
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।”২৪৫
তাদের এ দাবি মূলত দুটি গলত বুঝ থেকে উদ্গিরিত। প্রথমত, আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস যথার্থ নয়। কেননা কোনো মুমিন এ বিশ্বাস করতে পারে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত যে বিধান মান্য করা আবশ্যক করেছেন তা পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত হয়ে তাদের মানার উপযুক্ত ভাবে পৃথিবীতে থাকবে না; বরং হারিয়ে যাবে বা এমন জটিল হয়ে যাবে যে, মানুষের জন্য তা মান্য করা অসম্ভব হয়ে যাবে। বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মৌলিক দাবি তো এই যে, তিনি যে ওহি মান্য করা আবশ্যক করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা। এটা তো উপরে উল্লেখিত আয়াতটি থেকেই বোঝা যায়।
তবে এ কথা সত্য যে, হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন কুরআন সংকলনের চেয়ে জটিল ও কঠিন ছিল। এবং এ কথাও সত্য যে, হাদীসের নামে সমাজে অনেক ভুল ও মিথ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিস আলিমগণ হাদীস সংগ্রহে এমন কষ্ট-মুজাহাদা ও চেষ্টা-তদবীর করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে প্রচারিত মিথ্যা ও ভুল কথা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসকে পৃথক করার জন্য এমন যৌক্তিক, প্রায়োগিক, বৈজ্ঞানিক ও সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন যে, তাতে তারা তাঁর সকল হাদীস সংগ্রহ করতে এবং সত্যকে মিথ্যা থেকে বের করে এনে উম্মাতের সামনে নির্ভেজালরূপে পেশ করতে পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছেন। এ কাজে তাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থা ও কর্মপদ্ধতি এমন সফল, একক ও অনন্য যে, পৃথিবীর ইতিহাস অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী থেকে এর কোনো দ্বিতীয় নজির আনতে সক্ষম হয়নি।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহ.)-কে বলা হলো, নবীজির নামে কত জাল মিথ্যা হাদীস ছড়িয়ে পড়েছে! এগুলো কীভাবে চিহ্নিত হবে? তিনি জবাবে বললেন, প্রত্যেক যুগেই এই হাদীসগুলো চিহ্নিত করার জন্য প্রাজ্ঞ হাদীস বিশারদ থাকবেন। ২৪৬
একবার হারুনুর রশীদ এক যিন্দিককে পাকড়াও করে হত্যার আদেশ দিলেন। তখন ওই যিন্দিক বলল, আমাকে কেন হত্যার আদেশ দিলেন? তিনি বললেন, তোমার অনিষ্ট থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য। তখন সে বলল, আমি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে হাজার হাজার জাল হাদীস ছড়িয়ে দিয়েছি সেগুলো থেকে কীভাবে মানুষকে মুক্তি দেবেন? হারুনুর রশীদ বললেন, আল্লাহর দুশমন, তোমার কি আবু ইসহাক ফাযারি আর আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের কথা জানা নেই? তারা দুইজনে তোমার বানানো প্রত্যেকটা জাল হাদীস একটা একটা করে চিহ্নিত করবেন। ২৪৭
ইবন মায়ীন (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাটলিতে বহন করা হয়। মানুষ বলতে থাকে, এই সেই মহান ব্যক্তি যিনি সারা জীবন নবীজির নামে বানানো সকল জাল ও মিথ্যা কথার অপনোদন করেছেন। ২৪৮
ইবন খুযাইমা (রাহ.) বলেছেন, আবু হামিদ শারকি যতদিন জীবিত আছেন ততদিন কারো পক্ষে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে পার পাওয়া সম্ভব হবে না।
ইরাকে যখন অনেক জাল হাদীস ছড়িয়ে পড়ল তখন দারাকুতনি (রাহ.) বললেন, হে বাগদাদবাসী, আপনারা এই ধারণা করবেন না, আমি জীবত থাকতে কেউ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে ধরা পড়বে না। ২৪৯
খতীব বাগদাদি (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তাকে দাফনের জন্য যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন একদল মানুষ চিৎকার বলছিল, এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বানানো জাল হাদীস চিহ্নিত করতেন। এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজির হাদীস সংরক্ষণ করতেন। ২৫০
তবে সাধারণের জন্য হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের এই কাজটি কেবল কঠিন বা দুরূহই নয়; বরং অসম্ভবই বলতে হবে। কিন্তু এ দুরূহ দায়িত্ব তো আল্লাহ তাদের দেননি; বরং তিনি তাঁর দীনের সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য প্রত্যেক কালপর্বে দক্ষ যোগ্য আলিম পাঠান। তারা দীনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, দীনের ভেতরে ঢুকে যাওয়া ভুলভ্রান্তির সংস্কার করেন এবং দীনকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় সমাজে তুলে ধরেন। এসব জটিল ক্ষেত্রে সাধারণের কর্তব্য হলো, যোগ্য নির্ভরযোগ্য আলিমের শরণাপন্ন হওয়া।
হাদীস শরীফে এসেছে :
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا.
আল্লাহ এই উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে সংস্কারক পাঠান। যিনি তাদের জন্য দীনকে সংস্কার করেন। ২৫১
কুরআন-হাদীসে এ বিষয়ে আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে।
তবে হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মান্য করার সম্ভাব্যতা নিয়ে হাদীস অস্বীকারকারীদের এ সকল প্রশ্ন উঠানোর মূল উদ্দীপক হচ্ছে, মুহাদ্দিসদের হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও নির্ভেজালভাবে তা সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা ও এক্ষেত্রে তাদের সফলতা অনুধাবনে ব্যর্থতা। শরীআত প্রতিপালনের মূলনীতি সম্পর্কেও তাদের অজ্ঞতা সুস্পষ্ট। এ সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা আমরা উপরে করে এসেছি। পাঠক, তবে বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে এ শাস্ত্রের কিতাবাদি শাস্ত্রজ্ঞ আলিমের তত্ত্বাবধানে যথারীতি অধ্যয়ন করতে হবে।

টিকাঃ
২৪৫. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬। আরো দেখুন: সূরা বাকারাহ, ২৩৩; সূরা আনআম, ১৫২; সূরা আ'রাফ, ৪২; সূরা মু'মিনূন, ৬২。
২৪৬. ইবন আদি, আল কামিল: ১/১০৩。
২৪৭. তারীখ দিমাশক: ৭/১২৭。
২৪৮. ইবন হিব্বান, সিকাত: ৯/২৬৩。
২৪৯. ইবনুল জাওযি, মাওযূআত: ১/৪৫-৪৬
২৫০. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/২৮৬。
২৫১. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৯১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৮৫৯২; বাইহাকি, মা'রিফাতুস সুনান : ১/২০৮। হাদীসটিকে আল্লামা ইরাকি (ফায়যুল খাতির: ২/২৮২) ইবন হাজার (তাওয়ালিত তা'সীস, পৃ. ৪৯), সাখাবি (আল মাকাসিদুল হাসানাহ : ২৩৮), ইবনুদ দাইবা' রহ. (তাময়ীযুত তয়্যিব, পৃ. ৩৮)-সহ আরো অনেকে প্রমাণিত বলেছেন。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 সত্যের সাথে যখন মিথ্যা মিশে যায়

📄 সত্যের সাথে যখন মিথ্যা মিশে যায়


হাদীসের নামে অনেক ভুল ও মিথ্যা কথা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। তা যেমন মানুষের মুখে আছে, তেমনই কিতাবের পাতায়ও সংকলিত হয়েছে এবং এই মিশ্রণ থেকে ভুল ও সঠিক যাচাই-বাছাইয়ে অনেক ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মধ্যেও মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টিকে অনেকে হাদীস অগ্রহণযোগ্য হওয়ার যুক্তি ও দলীল হিসাবে পেশ করেন। তারা এ কথাও বলেন যে, সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে যখন ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে যায় তখন আর তা বিশ্বাস ও প্রমাণের যোগ্য থাকে না। এ কথা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হিসাবেও বর্ণিত রয়েছে। যেমন বাইবেল ও আহলে কিতাবের বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন :
إِذَا حَدَّثَكُمْ أَهْلُ الْكِتَابِ فَلَا تُصَدِّقُوْهُمْ وَلَا تُكَذِّبُوْهُمْ وَقُوْلُوْا: آمَنَّا بِاللَّهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ فَإِنْ كَانَ حَقًّا لَمْ تُكَذِّبُوْهُمْ وَإِنْ كَانَ بَاطِلًا لَمْ تُصَدِّقُوْهُمْ.
আহলে কিতাব তোমাদের কাছে কিছু বর্ণনা করলে তোমরা তাদেরকে সত্যায়নও করবে না মিথ্যাও বলবে না; বরং বলবে, আমরা আল্লাহ, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছি। এতে তাদের বক্তব্য সঠিক হয়ে থাকলে তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হলো না, আবার মিথ্যা হয়ে থাকলে সত্যায়নও করা হলো না। ২৫২
আমরা বলি, এই বিষয়টিই বরং হাদীস শরীআতের দলীল হওয়ার অন্যতম প্রমাণ। হাদীস যদি শরীআতের দলীলই না হতো এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থায় তা কোনো গুরুত্বই বহন না করত, তাহলে হাদীস জাল করে লাভ কী? যার কোনো মূল্য নেই, গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নেই তা কি কেউ নকল করে? আজকে আমাদের এই কালে কেবল নয়; বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের কিছুকাল পর থেকেই বিভিন্ন বিভ্রান্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাদের মত ও মতাদর্শ প্রমাণের জন্য জাল হাদীস তৈরি করা শুরু করে।
খারিজি মতবাদের এক প্রবক্তা, যিনি তাওবা করে হক পথে ফিরে আসেন, তার থেকে আব্দুল্লাহ ইবন লাহীআহ বর্ণনা করেছেন, সত্যে ফিরে আসার পর তিনি বলতেন:
إِنَّ هَذِهِ الْأَحَادِيثَ دِينُ فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُوْنَ دِينَكُمْ فَإِنَّا كُنَّا إِذَا هَوِيْنَا أَمْرًا صَيَّرْنَاهُ حَدِيثًا.
নবীজির এই সকল হাদীস দীন। সুতরাং কার কাছ থেকে তোমরা দীন গ্রহণ করছ তা যাচাই করবে। কেননা কোনো বিষয় যখন আমাদের মনঃপূত হতো আমরা সে বিষয়ে হাদীস বানিয়ে নিতাম। ২৫৩
এ ব্যক্তির বক্তব্যে পরিষ্কার বিবৃত হয়েছে, বিভ্রান্ত ব্যক্তি-গোষ্ঠীও হাদীসকে দীনের দলীল মনে করত এবং এ দলীল দ্বারা নিজেদের মত ও মতাদর্শ প্রমাণ করার জন্যই তারা হাদীস বানাত। আর সমাজেও হাদীস শরীআতের দলীল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ছিল। নইলে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার জন্য তারা হাদীস জাল করত না। (আর তাদের জালিয়াতি থেকে বাঁচার উপায় তিনি বলেছেন, হাদীসের সনদ যাচাই করা। দুর্নীতিকারী নিশ্চয় সম্যকরূপে জানে তার দুর্নীতি ধরার রাস্তা কী? সুতরাং এ থেকেও বোঝা যায়, হাদীস সত্যায়নে সনদ যাচাইকে অযৌক্তিক বলা পুরোটাই অযৌক্তিক। এ বিষয়ক আলোচনা পরে আসছে, ইনশাআল্লাহ)।
উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো, ইসলামের সূচনাকাল থেকেই মুসলিম উম্মাহর নিকট হাদীসে রাসূলের আইনগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এবং এটাও প্রমাণিত হয় যে, হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতে অস্বীকার করা একটি বিচ্ছিন্ন মত-যা সম্মিলিত মুসলিম উম্মাহর গৃহীত পথের বিপরীত পথ। আর যারা মুমিনদের সম্মিলিত পথ পরিত্যাগ করে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে তাদেরকে সতর্ক করে এবং কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُ الْهُدًى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
“যে ব্যক্তি তার নিকট হিদায়াত স্পষ্ট হওয়ার পরও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিনদের গৃহীত পথ ভিন্ন অন্য পথ অবলম্বন করবে তাকে আমি তার অবলম্বিত পথেই ছেড়ে দেব, আর তাকে নিক্ষেপ করব জাহান্নামে; তা কতই-না নিকৃষ্ট গন্তব্য!”২৫৪
আর তাদের এ দাবিও সঠিক নয় যে, সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে হাদীসের ভান্ডার ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি, মুহাদ্দিস ইমামগণ কী অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকল হাদীস সংগ্রহ করেছেন এবং যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণীকে পৃথক ও পরিশুদ্ধ করেছেন। আর এক্ষেত্রে সাধারণের কর্তব্য কী তাও আমরা আলোচনা করেছি।
মুহাদ্দিসদের এই কর্মযোগ-হাদীস সংগ্রহ, সংকলন, প্রচলিত জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণীকে পৃথক্করণে প্রাণান্ত পরিশ্রম-ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই চলমান। এ বিষয়টিও তাই এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামের সূচনাকাল থেকে মুসলিম উম্মাহর আলিমদের নিকটও হাদীসে রাসূলের আইনগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ কারণেই তো তারা ভুল, মিথ্যা ও জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণী পৃথক করতে প্রাণান্ত মেহনত করেছেন। যদিও মানবিক দুর্বলতার কারণে (অন্যান্য শাস্ত্রের মতো) কিছু বিষয়ে তারা মত-পার্থক্যের শিকার হয়েছেন। নইলে অপ্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে যাক আর তার সাথে ভুলভাল মিশে ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে যাক, তার পেছনে পণ্ডশ্রম করে কেন তারা জীবন ক্ষয় করবেন? সুতরাং এক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মতভেদও হাদীস শরীআতের দলীল হওয়ার অন্যতম প্রমাণ।
যারা ইসরায়ীলিয়্যাত বা বাইবেল সংকলন-সংরক্ষণের ইতিহাস এবং হাদীস সংকলন-সংরক্ষণের ইতিহাস পাঠ করেছেন তারা জানেন, উভয় বিষয়ের ঐতিহাসিক মর্যাদার মাঝে কী আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাইবেল নামে সংকলিত পুস্তকগুলোর যেমন কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তেমনি তার মাঝে সংকলিত বাণী-সমষ্টির কোন অংশ সঠিক আর কোন অংশ বাতিল তা নির্ণয়ের কোনো যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা নেই। শত শত বছর পর তারা সমাজে প্রচলিত কথা-কাহিনির সমাহারকে নির্বিচারে সংকলন করেছেন আর নিজেদের রুচি-পছন্দ অনুযায়ী ভুল-সঠিক বলে রায় দিয়েছেন। পক্ষান্তরে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনে যেমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মানা হয়েছে তেমনি তাকে মিশে যাওয়া খাদ থেকে মুক্ত করার জন্য অতি সূক্ষ্ম বিচারিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। যা পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীর সকল দেশ-কালের জন্য অতিশয় বিস্ময়। বাস্তববোধসম্পন্ন জ্ঞানীমাত্রই এমনকি কোনো কোনো অমুসলিম পণ্ডিতও মুক্তকণ্ঠে যে পদ্ধতির সফলতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২৫৫

টিকাঃ
২৫২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৭২২৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৬২৫৭; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস: ১০১৬০。
২৫৩. ইবন আদি, আল কামিল: ১/১৫১; ইবনুল জাওযি, আল মাওযূআত, ১/৩৯; খতীব বাগদাদি, আল জামি' লি-আখলাকির রাবি, ১/১৩৭; আল কিফায়াহ, পৃ. ১২৩। বিস্তারিত জানতে দেখুন: ড. ইবরাহীম ইবন সালিহ আল আজলান, আল মুহাদ্দিসূনা ওয়াস সিয়াসা, পৃ. ২৯২-৩০০。
২৫৪. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৫。
২৫৫. বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবি রচিত 'ইযহারুল হক', ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত 'পবিত্র বাইবেল: পরিচিতি ও পর্যালোচনা' এবং মুফতি তাকি উসমানি রচিত 'খৃষ্টধর্মের স্বরূপ'।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক

📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক


বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানে পরীক্ষিত-প্রমাণিত পদ্ধতি—যা দেশ, জাতি, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হাদীসশাস্ত্রের এই গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলামের ভেতরে এবং বাইরে হাদীসশাস্ত্রের মতো আরেকটি শাস্ত্রের উদাহরণ নেই। অতীত বা সমসাময়িক কালের কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের সত্যতা নির্ণয়ে হাদীসশাস্ত্রীয় পদ্ধতি অনুসরণের উদাহরণ পশ্চিমা বিশ্ব তো দূরের কথা মুসলিম বিশ্বেও নেই।
হাদীস সত্যায়িত হয় বর্ণনাকারীদের সত্যায়নের মাধ্যমে। কিন্তু বর্ণনাকারীদের সততা ও সত্যবাদিতার ভিত্তিতে কোনো সংবাদ সত্যায়নের এ পদ্ধতি পৃথিবীতে নজিরবিহীন। তাছাড়া কোনো ব্যক্তির জন্য অন্য কোনো ব্যক্তির সততা ও সত্যবাদিতার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া কি সম্ভব, সে ব্যক্তি যতই নিকটতম হোক? উপরন্তু সেই ব্যক্তি যদি হয় শত বছর বা হাজার বছর আগের ভিন্ন দেশ, জাতি, ভাষা, সভ্যতার মানুষ? হাদীসশাস্ত্রের ইমামদের এই কাজটিই করতে হয়। তারা শত শত বছর আগের বর্ণনাকারীদের চারিত্রিক সনদ দেন এবং তার ভিত্তিতে হাদীসের মান নির্ধারণ করেন। যেমন ইমাম বুখারি (রাহ.) তাঁর তারীখ গ্রন্থে হাজার হাজার হাদীস বর্ণনাকারী রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন। এটি একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব বিষয়।
উপরন্তু হাদীসশাস্ত্রের ইমাম হিসাবে খ্যাত এইসব ব্যক্তিবর্গ কেউ আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক অনুমোদিত নন। তাহলে তাদের প্রত্যয়নপত্রের কী মূল্য আছে? কোনো কোনো হাদীস অস্বীকারকারী এসব দাবি করে থাকেন।
কোনো শাস্ত্রকে বৈজ্ঞানিক হতে হলে সর্বজন গ্রহণযোগ্য হতে হবে—এ দাবিটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান। বিজ্ঞান নিজ উপযুক্ততায় বিজ্ঞান। কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। তবে হাদীসশাস্ত্র অবশ্যই পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত। অল্প কিছু অজ্ঞ বিভ্রান্ত লোক ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সকল পণ্ডিত গবেষক, এমনকি অমুসলিম পণ্ডিত পর্যন্ত এ শাস্ত্রের অনন্যতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার গবেষকের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলাম সমালোচক প্রাচ্যবিদ স্প্রেঙ্গার বলেছেন:
‘There is no nation nor has there been any which like them (Muslims) has during twelve centuries, recorded the life of every man of letters. If the biographical records of Mussalman were collected we should probably have accounts, of a half million distinguished persons, and it would be found that there is not a decennium of their history, nor a place of importance which has not its representatives.'
(মুসলিমদের মহাকীর্তি তাদের এই জীবনীশাস্ত্র)। অতীতে ও বর্তমানে এমন কোনো সম্প্রদায় নেই যারা মুসলিমদের মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমদের রচিত জীবনচরিত গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতীপুরুষের জীবনী লাভ করব। এবং দেখা যাবে এমন একটা দশকও নেই, এমন একটা স্থানও নেই যা নিজের কৃতীপুরুষের জন্ম দেয়নি। ২৫৬
হাদীসশাস্ত্র মানব সভ্যতায় অনন্য ও বে-নজির বিষয়। অনন্য, অপূর্ব, অনুপম, অতুলনীয়, অদ্বিতীয়—এ শব্দগুলো পৃথিবীর সকল ভাষায় ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একে যে নেতিবাচকভাবে দেখে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। হাদীসশাস্ত্রের মতো পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত অদ্বিতীয় একটি শাস্ত্র মুসলিমদের হাতে গড়ে উঠেছে, এটা ইসলাম সংরক্ষণে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনার অংশ, মুসলিম জাতির জন্য গর্ব ও শুকরিয়ার বিষয়। মুসলিম নামধারী কেউ যদি এমনতর বিষয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন অন্যরা তাকে 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' ভাবতেই পারেন।
ইসলামপূর্ব ধর্মগুলো ছিল নির্দিষ্ট দেশকালের জন্য। মহান আল্লাহ তাই সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব নেননি। কিন্তু ইসলাম সর্বশেষ দীন। মহান আল্লাহ একে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এ কাজে যথাযথ পার্থিব ম্যাকানিজমও ব্যবহার করেছেন। যা অপূর্ব অভাবনীয়। মানব সভ্যতার আর কোনো অংশ সংরক্ষণের জন্য এর ধারেকাছের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। হাদীসশাস্ত্রীয় মূলনীতি প্রয়োগ করে যদি বিশ্ব-ইতিহাসের অন্য কোনো পর্বের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়, লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে।
আধুনিক ইতিহাসতত্ত্ব অবশ্য হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনেকখানি গ্রহণ করেছে। ২৫৭ কিন্তু পুরোপুরি নিতে পারেনি। নেওয়া সম্ভব নয়। কেননা ইতিহাস তো ষোলো আনা সতর্কতার সাথে সংরক্ষণই করা হয়নি। এখন হাদীসশাস্ত্রীয় নীতিমালায় সত্যায়ন করতে গেলে তার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এবং এজন্যই ইতিহাস কখনো হাদীসের মানে উত্তীর্ণ হতে পারবে না।
পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর জন্যও তাদের ইতিহাস ও দলনেতার বক্তব্য হাদীসশাস্ত্রের নমুনায় পরিপূর্ণ সংরক্ষণ ও নিখুঁতভাবে সত্যায়ন করা সম্ভব নয়। আর সেটা প্রয়োজনীয়ও নয়। কেননা মহান আল্লাহ ইসলাম সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর কুদরতি তত্ত্বাবধানে হাদীস সংরক্ষিত হয়েছে। এর জন্য সকল ব্যবস্থা তিনি কুদরতি ইশারায় করেছেন। প্রত্যেক প্রজন্মের অসংখ্য মরদে কামিল এর জন্য জান কুরবান করেছে। এর নজির মানব সভ্যতার জন্য আনয়ন করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে!
আমাদের নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না। পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর নেতা, তিনি যত প্রভাবশালী আর গ্রহণীয়ই হোন না কেন, পরবর্তীদের জন্য তার জীবনাদর্শ ও কথাকর্ম মেনে চলা আবশ্যক নয়। তাই তার অনুসারীদের জন্য তার সকল কথাকর্ম সংরক্ষণ করা আবশ্যক নয়, উপকারীও নয়; বরং পণ্ডশ্রম। তাই আর কারো আদর্শ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের জন্য হাদীসশাস্ত্রীয় কঠোর সূক্ষ্ম মূলনীতি মেনে প্রাণান্ত মেহনত করা হবে না। হাদীসশাস্ত্র তাই কিয়ামত পর্যন্ত অনন্য, অনুপম, অতুলনীয় ও অদ্বিতীয় হয়ে থাকবে।
বর্ণনাকারীর মূল্যায়নের মাধ্যমে সংবাদ গ্রহণ-বর্জন নজিরবিহীন নয়, বরং মানব সমাজের Common চর্চা। ধরুন, আপনারা পাঁচজন বন্ধু বসে আছেন। আপনাদের ষষ্ঠ বন্ধু এল। যার চরিত্র নড়বড়ে, বানিয়ে কথা বলে, সত্য-মিথ্যার পরোয়া করে না। সে এসে একটি সংবাদ দিল। নিশ্চয় আপনারা তার সংবাদ বিশ্বাস করবেন না। তা নিয়ে হাসাহাসি করবেন, বলবেন, 'দূর, ও কী বলে না বলে!' কিছুক্ষণ পর আপনাদের সপ্তম বন্ধু এল। মজবুত চরিত্রের অধিকারী। সততা ও সত্যবাদিতায় আপনাদের সকলের মাঝে প্রসিদ্ধ। আপনারা কখনোই তাকে মিথ্যা বলতে শোনেননি। তার দেওয়া সংবাদ নিয়ে কি হাসাহাসি করবেন? 'দূর, ও কী বলে না বলে' বলে কি উড়িয়ে দেবেন? না, তা করবেন না। জি, এটাই মানব সভ্যতার চিরন্তন প্রবণতা। ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার উপর ভিত্তি করেই তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإِ فَتَبَيَّnُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ.
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে না অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে কষ্ট দিয়ে ফেলো; তাতে নিজেদের কর্ম নিয়ে তোমরা লজ্জিত হবে।”২৫৮
এ আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সংবাদ গ্রহণ ও বর্জনের মূল ভিত্তি সংবাদদাতার অবস্থা। সংবাদদাতা ফাসিক হলে তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণ করা যাবে না। অন্য মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। আর সংবাদদাতা ফাসিক না হলে তার সংবাদ গৃহীত হবে।
কুরআনে বর্ণিত এ মূলনীতির ভিত্তিতেই প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিস আলিমগণ স্বীয় যুগের হাদীস বর্ণনাকারী রাবিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেছেন এবং পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন- যেমন তারা হাদীস সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও হাদীস বর্ণনাকারীর অবস্থা একই সাথে একইভাবে পরবর্তীদের নিকট ট্রান্সফার হয়েছে। সংকলক ইমামগণ নতুন করে গবেষণা করে এ সকল তথ্য উদ্ধার করেছেন তা নয়। এ ধারণা ভুল যে, শত শত বছর পর হাদীস যখন সংকলিত হলো এবং তারপর তা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিল তখন মুহাদ্দিস ইমামগণ বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত অবস্থা অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন, কিন্তু তত দিনে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, শত শত বছর আগের তথ্যাবলি কালের সাথে সাথে কালের হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, সুতরাং এখন যা বলা হবে সবই ধারণা-অনুমান।
বরং বাস্তবতা হলো, সংকলক ইমামগণ হাদীসের মতো বর্ণনাকারীদের জীবনীও সূত্রের মাধ্যমে পেয়েছেন। ইমাম বুখারি (রাহ.)-ও তাঁর তারীখের কিতাবে যে সকল রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের সম্পর্কে যে চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন তা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্যই এ কালে বসে সে কালের ব্যক্তি সম্পর্কে আন্দাজে ঢিল ছোড়া মনগড়া মন্তব্য নয়। তিনি নিজেই বলেছেন :
إِنَّمَا رَوَيْنَا ذَلِكَ رِوَايَةً لَمْ نَقُلْهُ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِنَا.
এ সম্পর্কে আমি পূর্বসূরিদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি মাত্র। নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলিনি। ২৫৯
উল্লিখিত আয়াতের আলোকে এ কথাও সাব্যস্ত যে, সংবাদদাতা সম্পর্কে যিনি ওয়াকিবহাল তিনি তার সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে পারবেন। এ কথা জ্ঞানচর্চার জগতে সর্বজনস্বীকৃত। যা কিছু মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির গম্য সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে কোনো ঊর্ধ্বপক্ষের স্পেসিফিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। বরং নির্দিষ্ট শাস্ত্রে স্বীকৃত পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত পারদর্শিতা অর্জন করতে হয় এবং সত্যই পারদর্শিতা অর্জিত হয়েছে কি না সে বিষয়ে উক্ত শাস্ত্রের স্বীকৃত ব্যক্তিবর্গের স্বীকৃতি পেতে হয়।
যে গ্রন্থটিকে আমরা আল্লাহর কিতাব আল কুরআন বলে জেনেছি ও মেনেছি, জন্মের পর থেকে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে জেনেছি যে, এটা আল কুরআন। কিন্তু তারা কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স্পেসিফিক অনুমোদিত নয়। তাছাড়া আমি আমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে যে নিশ্চিত হয়েছি, কিন্তু আমি বা আমার জ্ঞানবুদ্ধিই কি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক স্পেসিফিক অনুমোদিত? তাই বলে কি আমাদের এই সিদ্ধান্ত অবাস্তব অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক? কিছুতেই নয়—যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই জেনে এসেছে।

টিকাঃ
২৫৬. [Sprenger, A Biographical Dictionary of Persons Who knew Muhammad, vol. 1, p.1.]
২৫৭. বিস্তারিত দেখুন: আসাদ রুস্তম, মুস্তালাহুত তারীখ。
২৫৮. সূরা [৪৯] হুজুরাত, আয়াত: ০৬。
২৫৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', ১/৭৯ ও ১০/১০৪。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক

📄 হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক


হাদীস সত্যায়ন প্রক্রিয়া অনৈসলামিক। কেননা হাদীস সত্যায়ন করা হয় বর্ণনাকারীদের সত্যায়ন করার মাধ্যমে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির জন্যই তার সর্বাধিক নিকটতম ব্যক্তির সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যেমন নয়, তেমনি যে কারো সম্পর্কে সুধারণা রাখার নির্দেশনা থাকলেও কারো বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেওয়াও কুরআন-সুন্নাহসম্মত নয়। মহান আল্লাহ বলেন :
وَمِمَّnْ حَوْلَكُمْ مِنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُوْنَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ سَنُعَذِّبُهُمْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ.
“আর তোমাদের আশপাশের বেদুইনদের মাঝে মুনাফিক আছে এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও; তারা কপটতায় এতটাই সিদ্ধ যে, তোমরা তাদেরকে জানো না, তবে আমি তাদেরকে জানি। অবশ্যই আমি তাদেরকে দুবার শাস্তি দেব। অতঃপর তাদেরকে এক ভয়ংকর শাস্তির দিকে তাড়িত করা হবে।”২৬০
হাদীস শরীফে এসেছে, মুহাজির সাহাবি উসমান ইবন মাযউন (রা.) আনসারি সাহাবিয়া উম্মুল আলা'র বাড়িতে জায়গির থাকতেন। এই উসমান (রা.)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর জায়গিরদার উম্মুল আলা' (রা.) বলেন, তাঁর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। তাঁর সম্বন্ধে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কীভাবে জানলে যে, আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তা না হলে আল্লাহ আর কাকে সম্মানিত করবেন? নবীজি বললেন:
أَمَّا هُوَ فَقَدْ جَاءَهُ الْيَقِينُ وَاللهِ إِنِّي لَأَرْجُوْ لَهُ الْخَيْرَ وَاللَّهِ مَا أَدْرِي وَأَنَا رَسُوْلُ اللَّهِ مَا يُفْعَلُ بِي.
তাঁর ব্যাপার তো এই যে, তাঁর নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই তাঁর জন্য কল্যাণের আশা করি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না, আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে।
ওই নারী সাহাবি বলেন, আল্লাহর কসম, এরপর আমি আর কোনো দিন কারো সম্বন্ধে পবিত্র বলে মন্তব্য করব না। ২৬১
সূরা তাওবাহর উল্লিখিত ১০১ নং আয়াত থেকে আমরা দেখছি যে, সাহাবিগণও তাঁদের সমাজের মুনাফিকদের চিনতেন না। সুতরাং তাঁদের জন্যও সম্ভব ছিল না তাঁদের সামাজের কারো কপটতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে বলা। তেমনি হাদীস শরীফ থেকে আমরা দেখলাম, একই ছাদের নিচে বসবাসকারী ব্যক্তির ব্যাপারেও সুনিশ্চিত করে কিছু বলার অনুমতি নেই।
তাহলে মুহাদ্দিসগণ স্বীয় যুগের এবং নিকট, দূর বা সুদূর অতীতের বর্ণনাকারীদের প্রত্যয়ন করছেন এবং তার ভিত্তিতে তাদের দেওয়া সংবাদের মান নির্ণয় করছেন-এটা কীভাবে বৈধ ও অনুমোদিত হতে পারে?
তাছাড়া মুহাদ্দিসগণ হাদীস সত্যায়নের নামে লক্ষ লক্ষ মুসলিম রাবির চরিত্র হনন করেছেন। তাদেরকে মিথ্যুক, প্রতারক, বক্তব্য জালকারী ইত্যাদি নানান নেতিবাচক বিশেষণে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। অথচ কুরআন-হাদীসের অসংখ্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা মোতাবেক কোনো মানুষের সম্মানহানি, নিন্দা, গীবত ভয়ংকর কবীরাহ গোনাহ এবং এর পরিণাম চিরস্থায়ী জাহান্নাম। মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেছেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّnِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّnِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّsُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ.
“হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক ধারণা থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না। এবং একে অপরের দোষচর্চা কোরো না। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো এটা ঘৃণাই করে থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। ২৬২
হাদীস অস্বীকারকারীদের এইসব দাবি অবাস্তব, অজ্ঞতা, ভুল ও স্থূল চিন্তার ফসল। সূরা তাওবাহর ১০১ নং আয়াতে শ্রোতাপক্ষের ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এ আয়াতে প্রধানত সাহাবিগণ উদ্দেশ্য। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ মুনাফিকদের চিনতেন না এবং তাদের পরিণতি জানতেন না-এ কথা সত্য। তবে পরে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে মুনাফিক সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। যেমন সূরা শূরার ৫২ নং আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে বলেছেন, 'আপনি জানতেন না কিতাব কী আর ঈমান কী?' এর অর্থ এ নয় যে, নবীজি কখনোই কিতাব ও ঈমান সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেননি।
তেমনি প্রথম দিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিক না চিনলেও পরবর্তী সময় সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাঁকে জ্ঞানদান করেছিলেন। কারো কারো বিষয়ে সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন এবং অন্যদের চেনার জন্য আলামত বলে দিয়েছিলেন। আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াত এবং অনেক হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের চিনতেন। এমনকি কারা মুনাফিক এ বিষয়টি সাহাবিদের নিকটও সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন :
أَمْ حَسِبَ الَّذِيْنَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ أَنْ لَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ أَضْغَانَهُمْ ، وَلَوْ نَشَاءُ لَا رَيْنَا كَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُمْ بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ.
“যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাদের বিদ্বেষ ভাব প্রকাশ করে দেবেন না? আমি চাইলে, অবশ্যই আপনাকে তাদের সম্পর্কে জানিয়ে দেব। ফলে তাদের ভাবভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন। তবে কথার ভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ তাদের কর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত।”২৬৩
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُوْلُوْا تَsْمَعُ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُbٌ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُوْنَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرُهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ.
“আপনি যদি তাদেরকে দেখেন তাদের দেহকাঠামো আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর যদি তারা কথা বলে আপনি তাদের কথা শুনতে চাইবেন। যেন তারা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া কাঠখণ্ড। তারা ধারণা করে সকল আওয়াজ বুঝি তাদের বিরুদ্ধে। এরা শত্রু। এদের থেকে দূরে থাকুন। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলেছে!"২৬৪
উপরের আয়াতে মহান আল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছেন, কথার ভঙ্গিতে অবশ্যই আপনি মুনাফিকদেরকে চিনতে পারবেন। আর এ আয়াতে মুনাফিকদের কিছু আলামত উল্লেখ করে বললেন, এরা শত্রু। এদের থেকে দূরে থাকুন। সূরা তাওবাহর ৭৩ নং আয়াত এবং সূরা তাহরীমের ৯ নং আয়াতে তিনি নবীজিকে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং কঠোরতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং সূরা তাওবাহর ৮৪ নং আয়াতে মুনাফিকদের জানাযা না পড়তে এবং তাদের কবরের পাশে না দাঁড়াতে নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ সকল আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিক গোষ্ঠীকে পুরোপুরি চিনতেন। তা না হলে তিনি কীভাবে তাদের থেকে দূরে থাকা, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও কঠোরতা অবলম্বন করা এবং তাদের জানাযা না পড়ানো ও কবরের পাশে না দাঁড়ানোর এ সকল কুরআনি নির্দেশ পালন করবেন?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো কোনো সাহাবিকে বিষয়টি অবগত করেছিলেন। ফলে সাহাবিদের সমাজে মুনাফিকরা সকলের কাছে চিহ্নিত ছিল। কা'ব ইবন মালিক (রা.) তাবুক যুদ্ধে শরিক হননি। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন:
كُنْتُ إِذَا خَرَجْتُ فِي النَّاسِ بَعْدَ خُرُوجِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطُفْتُ فِيهِمْ أَحْزَنَنِي أَنِّي لَا أَرَى إِلَّا رَجُلًا مَغْمُوْصًا عَلَيْهِ النَّفَاقُ.
তাবুক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বের হয়ে যাওয়ার পর আমি যখন মানুষের মাঝে বের হয়ে ঘুরতে লাগলাম, একটি বিষয় আমাকে পীড়া দিতে লাগল, আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, শুধু মুনাফিকিতে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছাড়া।২৬৫
অর্থাৎ সাহাবিদের সমাজের মুনাফিক গোষ্ঠী সকলের কাছে সুস্পষ্ট ছিল। কে সাহাবি আর কে মুনাফিক তা অস্পষ্ট ছিল না। আর সাহাবিগণ সকলেই ন্যায়পরায়ণ বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য। সুখের কথা হচ্ছে, সাহাবিদের সমাজের মুনাফিক হিসাবে চিহ্নিত কোনো একজন ব্যক্তি থেকেও একটি হাদীসও বর্ণিত হয়নি। সুতরাং সে সমাজে মুনাফিকের উপস্থিতির কারণে হাদীসের ভান্ডারে সন্দেহ তৈরি হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আর উম্মুল আলা' (রা.) বর্ণিত উসমান ইবন মাযউন (রা.)-এর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনায় পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহ কাকে কোন পজিশনে রেখেছেন সে সম্পর্কে সুনিশ্চিত মন্তব্য করতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। এর সাথে দুনিয়ার জীবনে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই।
এ প্রসঙ্গে উপরে উল্লেখিত সূরা হুজুরাতের ০৬ নং আয়াতটি আবার স্মরণীয়। আয়াতটিতে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে'। এ আয়াত থেকে প্রথমত বোঝা যায় যে, সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবাদদাতার চারিত্রিক অবস্থা দ্রষ্টব্য। মুমিনগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আদিষ্ট যে, তারা সংবাদদাতার চারিত্রিক অবস্থা বিবেচনায় সংবাদ গ্রহণ বা বর্জন করবেন। কিন্তু তারা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যদি এতটুকু প্রত্যয়ন করতে না পারেন, যার ভিত্তিতে তারা উক্ত ব্যক্তির আনীত বা প্রদত্ত সংবাদ গ্রহণ বা বর্জন করতে পারবেন, তাহলে তারা কীভাবে এই কুরআনি নির্দেশ পালন করবেন? সুতরাং হাদীস অস্বীকারকারীদের উত্থাপিত দলীলের দাবি কিছুতেই এ নয় যে, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এতটুকু প্রত্যয়নও করা যাবে না যার ভিত্তিতে তার সংবাদ গ্রহণ-বর্জন করা যায়। তবে কারো সম্পর্কে চূড়ান্ত ফায়সালা করা এবং আখিরাতের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে বলা তো শুধু মহান আল্লাহরই কর্ম।
এ আয়াত থেকে এ কথাও বোঝা যায় যে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে আসে, যা গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন ওঠে, তার ব্যক্তিগত অবস্থা সংবাদপ্রাপকের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে, জানা থাকতে হবে সংবাদদাতা ফাসিক নাকি আদিল। সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী। সুতরাং হাদীসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যাদের মাধ্যমে বর্ণিত হবে সেসব বর্ণনাকারীর অবস্থা উম্মাতের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে। এ কারণেই মুহাদ্দিস ইমামগণ কর্তৃক রাবিদের সামগ্রিক অবস্থা আলোচিত হওয়া একটি জরুরি বিষয়। আর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কারো নেতিবাচক বিশেষণ উল্লেখ করাও নিষিদ্ধ বা নিন্দনীয় গীবত নয়। বরং কুরআন-সুন্নাহ প্রদর্শিত অনুমোদিত কর্ম। আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মহান আল্লাহ মূসা (আ.)-কে ফিরআউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন :
اِذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى.
"তুমি ফিরআউনের কাছে যাও। সে সীমালঙ্ঘন করেছে।”২৬৬
হাদীস শরীফে এসেছে, ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.)-কে তাঁর স্বামী আবু আমর তালাক দেন। ইদ্দত পালন শেষে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, মুআবিয়াহ ও আবু জাহম আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। তখন নবীজি বলেন:
أَمَّا أَبُوْ جَهْمٍ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوْكَ لَا مَالَ لَهُ انْكِحِيْ أُsَامَةَ بْنَ زَيْدٍ.
আবু জাহম তো চরম মারকুটে লোক, সে তো কাঁধ থেকে লাঠি নামায়ই না। আর মুআবিয়াহ কপর্দকহীন নিঃসম্বল মানুষ। তুমি বরং উসামাকে বিয়ে করো। ২৬৭
সুতরাং হাদীস সত্যায়নের জন্য বর্ণনাকারীর চরিত্রের পোস্টমর্টেম করা এবং তার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য বলে রায় প্রদান করা কুরআন-হাদীস নিষিদ্ধ অনৈসলামিক কর্ম নয়। বরং সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার যে কুরআনি নির্দেশ তার প্রতিপালন। মুহাদ্দিসদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার ছিল। তারা হাদীস বর্ণনাকারীর প্রয়োজনীয় সমালোচনাকে নিন্দনীয় গীবত হিসাবে গণ্য করতেন না। এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের সর্বজনস্বীকৃত বক্তব্য হচ্ছে :
وَالْكَلَامُ فِي الرِّجَالِ جَرْحًا وَتَعْدِيْلًا ثَابِتٌ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ عَنْ كَثِيرٍ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ فَمَنْ بَعْدَهُمْ وَجُوِّزَ ذَلِكَ تَوَرُّعًا وَصَوْنًا لِلشَّرِيعَةِ لَا طَعْنَا فِي النَّاسِ.
বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত তথ্য আলোচনা-পর্যালোচনা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বিপুল সংখ্যক সাহাবি, তাবিয়ি এবং পরবর্তী শাস্ত্রবিদ থেকে প্রমাণিত। এর বৈধতা দেওয়ার কারণ শরীআতকে খাদ থেকে নির্ভেজাল রাখা, ব্যক্তি-আক্রমণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য নয়। ২৬৮
ইমাম বুখারি (রাহ.) বারবার বলেছেন, আখিরাতে আমার কোনো প্রতিপক্ষ থাকবে না। যখন থেকে আমি জেনেছি যে, গীবত গীবতকারীরই ক্ষতির কারণ হয় তখন থেকে কখনো কারো গীবত করিনি। আমি আশা করি, যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াব কারো গীবত করেছি এমন কোনো হিসাব তিনি পাবেন না। মুহাম্মাদ ইবন আবু হাতিম বলেন, আমি তাঁকে বললাম, কিছু মানুষ আপনার তারীখ গ্রন্থের ব্যাপারে আপত্তি করেন। তারা বলেন, সেখানে আপনি অনেক মানুষের গীবত করেছেন। তখন ইমাম বুখারি (রাহ.) বলেন:
إِنَّمَا رَوَيْنَا ذُلِكَ رِوَايَةً لَمْ نَقُلْهُ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِنَا.
এ সম্পর্কে আমি পূর্বসূরিদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি মাত্র। নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলিনি। ২৬৯
এরপর তিনি আয়িশা (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করেন। হাদীসটি তিনি তাঁর সহীহ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। আয়িশা (রা.) বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে আসার অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি বলেন:
ائْذَنُوْا لَهُ فَبِئْسَ ابْنُ الْعَشِيْرَةِ أَوْ بِئْسَ أَخُو الْعَشِيْرَةِ.
তাকে অনুমতি দাও। সে তো বংশের নিকৃষ্ট সন্তান বা ভাই। ২৭০
এ হাদীসে আমরা দেখছি, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেন, এ কথা তিনি বলেছেন, অন্যের প্রতি নসীহাহ বা কল্যাণ কামনা স্বরূপ। যেন অন্যরা তার অকল্যাণ থেকে সতর্ক হতে পারে। এ আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কারো সম্পর্কে বাস্তব সত্য নেতিবাচক মন্তব্য করা কুরআন-হাদীস বিরোধী অনৈসলামিক কর্ম নয়। সুতরাং হাদীসের মতো অতি প্রয়োজনীয় সংবাদ যাদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য উল্লেখ ও সংরক্ষণ করা কিছুতেই অনৈসলামিক কর্ম বলে গণ্য নয়।
যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত হাদীস মান্য করা আবশ্যক থাকবে সেহেতু সে পর্যন্ত হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের প্রশ্নও থাকবে। এবং এ কারণেই হাদীস বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হওয়া ছিল অতিশয় জরুরি। মুহাদ্দিস ইমামগণ এই অতিপ্রয়োজনীয় কর্মটিই জীবন ক্ষয় করে আনজাম দিয়েছেন। তাই তারা উম্মাহর পক্ষ থেকে বেহদ কৃতজ্ঞতা, পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার হকদার।

টিকাঃ
২৬০. সূরা [৯] তাওবাহ, আয়াত: ১০১。
২৬১. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৭৪৫৭; সহীহ বুখারি, হাদীস: ২৬৮৭。
২৬২. সূরা [৪৯] হুজুরাত, আয়াত: ১২。
২৬৩. সূরা [৪৭] মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৯-৩০。
২৬৪. সূরা [৬৩] মুনাফিকূন, আয়াত: ০৪。
২৬৫. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৫৭৮৯; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৪৪১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৬৯。
২৬৬. সূরা [২০] তা-হা, আয়াত: ২৪ ও ৪৩; সূরা [৭৯] নাযিআত, আয়াত: ১৭。
২৬৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৮০; মুআত্তা মালিক, হাদীস ১৬৬৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ২৭৩২৭; সুনান নাসায়ি, হাদীস : ৩২৪৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ২২৮৪。
২৬৮. হাজ্জি খলীফা, কাশফুল যুনূন, ১/৫৭২; সিদ্দীক হাসান খান, আবজাদুল উলূম, পৃ. ৩৫৭; আল হিত্তাহ, পৃ. ৮৩。
২৬৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', ১/৭৯ ও ১০/১০৩-১০৪。
২৭০. সহীহ বুখারি, হাদীস : ৬০৫৪ ও ৬১৩১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00