📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস লিখতে নবীজির নিষেধাজ্ঞা

📄 হাদীস লিখতে নবীজির নিষেধাজ্ঞা


হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে দায়িত্ব ছিল, মানুষকে ধর্মীয় রীতিনীতি শিক্ষা দেওয়া সে শিক্ষা কুরআনেই আছে। কুরআনের বাইরের কোনো শিক্ষা যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতো তিনি নিজে সেসব লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতেন অথবা সে মর্মে নির্দেশ দিতেন। এর কোনোটাই তিনি করেননি। উল্টো হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন। আর বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি সুন্নাহ অনুসরণের যে কথা বলেছেন সেখানেও এর অর্থ কুরআন অনুসরণ। কেননা তখন কুরআন ছাড়া হাদীস বা সুন্নাহ নামে কিছুই সংকলিত হয়নি।
সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا تَكْتُبُوْا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوا عَنِّي وَلَا حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
তোমরা আমার থেকে লিখো না। যে আমার থেকে কুরআন ব্যতীত কিছু লিখেছে সে যেন তা মুছে ফেলে। তবে আমার থেকে মৌখিক বর্ণনা করবে, তাতে কোনো দোষ নেই। যে ব্যক্তি আমার নামে জেনেশুনে মিথ্যা বলবে সে যেন জাহান্নামে ঠিকানা খুঁজে নেয়। ২৪২
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় রীতিনীতি ও কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়া। সে শিক্ষা কুরআনেই আছে—এমন দাবি কি সুস্থ মাথা থেকে বের হওয়া সম্ভব? তবে কি কুরআনের সকল ব্যাখ্যা কুরআনেই আছে? নবীজির সকল কাজের বিবরণও কুরআনে আছে? তিনি কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সালাত আদায় করতেন। কিন্তু কীভাবে আদায় করতেন তার বিবরণ কুরআনের কোথায় আছে? শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বিভিন্নভাবে ছাত্রদেরকে টেক্সটবুক বুঝিয়ে থাকেন। শিক্ষকের সেই ব্যাখ্যা টেক্সটবুকেই আছে—এ দাবি কি কোনো পাগলেও করতে পারে?
কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআনেই আছে। এ ভিন্ন নবীজির ব্যাখ্যার আলাদা কোনো অস্তিত্ব বা প্রয়োজন নেই। তাহলে এখন আমাদেরকে ধর্মীয় সকল বিধিবিধান ও কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন থেকে শিখে নিতে হবে। নবীজির যুগে নবী শিখে নিয়েছেন কুরআন থেকে। আমার যুগে আমি শিখে নিচ্ছি কুরআন থেকে। তাহলে কুরআন যে তাঁকে কুরআন ব্যাখ্যা করার বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে, এ কথার অর্থ কী?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেননি বা নির্দেশ দেননি-এ কথাও সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অসত্য। তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে সর্বপ্রকারে সকল পদ্ধতিতে হাদীস সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার পুনঃপুন নির্দেশ প্রদান করেছেন। 'হাদীস সংরক্ষণে নবীজির নির্দেশনা' শিরোনামের অধীনে আমরা সে বিষয়ক আলোচনা দেখে এসেছি।
তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, জীবন্ত ইসলাম। সাহাবিগণ জীবন দিয়ে তাঁর সুন্নাহ সংরক্ষণ করেছেন। ইসলাম পৃথিবীতে আসার পর থেকে প্রত্যেক প্রজন্মেই প্রচুর সংখ্যক এমন মানুষ তৈরি হয়েছে যারা ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসাবে বিশ্বাস করেছেন, ইসলামে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন এবং পুরোটা জীবনে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রতিপালন করেছেন। আল কুরআনের বিমূর্ত বাণীর ইসলাম তাদের মানতে হয়েছে বিকল্পহীনভাবে মূর্তিমান ইসলাম নবী-জীবনের অনুসরণ-অনুকরণে। এটা প্রত্যেক প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিখে নিয়েছে। নবীর সুন্নাহ তাই অবিকৃত ও পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত ও ট্রান্সফার হয়ে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এ ধরনের ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার বিষয়টি নিতান্তই গৌণ মাধ্যম।
তাছাড়া তিনি লেখার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণেরও বিশেষভাবে নির্দেশ, নির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুমতি প্রদান করেছেন। এবং সাহাবিগণ অনেকেই লেখার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণ করতেন এ বিষয়টিও ঐতিহাসিক বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত। তবে আমরা এখানে উল্লেখিত হাদীসে লেখার নিষেধাজ্ঞা দেখতে পাচ্ছি। নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশ-অনুমোদন উভয়ই যখন প্রমাণিত তখন একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে বিনা প্রমাণে বাতিল করে দেওয়া যৌক্তিক নয়। বরং দুটি বর্ণনাই সত্য এবং ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে প্রযোজ্য।
হাদীস লিপিবদ্ধকরণে নিষেধাজ্ঞা কুরআন নাযিলের প্রথম দিকের বিষয় হতে পারে। এখনকার মতো তখন কাগজ এমন সহজলভ্য ছিল না যে, কুরআনের জন্য একটা খাতা খোলা হলো, যখনই জিবরীল (আ.) কোনো আয়াত নিয়ে আসবেন ওই খাতায় লিখে রাখা হবে। বরং পাথরের ফলক, খেজুরের ডাল, পশুর চামড়া ও হাড়, বাঁশের টুকরা ও গাছের পাতা ইত্যাদিতে পৃথক পৃথকভাবে লিখে রাখা হতো। এমতাবস্থায় হাদীসও লিখে রাখলে কুরআন-হাদীস মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত।
কুরআনের যদিও ব্যতিক্রমী নিজস্ব অতি উচ্চাঙ্গের ভাষাভঙ্গি আছে, কিন্তু তখন কুরআন নাযিলের প্রথম যুগ, তখনও পাঠকের কাছে তার ভাষাভঙ্গি সুস্পষ্ট হয়নি। ভাষা-সাহিত্যের প্রথম দিকের ছাত্র তার ভাষার সেরা কবি- সাহিত্যিকদের লেখাও নাম না দেখে আলাদা করতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের পাঠপরিক্রমায় তার এমন সূক্ষ্ম রুচি তৈরি হয় যে, যে কারো রচনা পাঠ করেই বলে দিতে পারে, এটি অমুকের রচনা।
এসব কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিকে হাদীস লিখতে নিষেধ করলেও পরবর্তীকালে অনুমতি ও নির্দেশ প্রদান করেন। ২৪৩
এমনকি তাঁর সরাসরি নির্দেশে হাদীসের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লিখিত হয়। এবং অনেক সাহাবি অনুমোদন পেয়ে নিজেদের মতো করে হাদীস লিখে রাখতেন। দুইশত-তিনশত বছর পরে এসে ইমাম বুখারি-মুসলিমদের হতে হাদীস লিখিত হয়েছে, তা নয়। সাহাবি, তাবিয়ি, তাবি'-তাবিয়ি থেকে শুরু করে প্রত্যেক প্রজন্মের মুহাদ্দিসগণ পর্যপ্ত পরিমাণ হাদীস লিখে রাখতেন। তাদের ছাত্ররা তাদের মৌখিক বর্ণনা ও পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে হাদীস গ্রহণ করতেন। তবে যুগ-বাস্তবতার কারণে তাদের সে সকল পাণ্ডুলিপি মুদ্রিত হয়নি। যারা মনে করেন, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে এসে হাদীস লিখিত হয়েছে তারা মূলত হাদীস সংকলনের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ।
হাদীস, যা মূলত জীবনের প্রতিপলে? কর্মগত চর্চার বিষয়, শুধু তত্ত্বীয় বা চিন্তাগত চর্চার বিষয় নয়, যা প্রত্যেক প্রজন্মের পর্যাপ্ত মানুষ জীবনের একমাত্র কর্ম মনে করে আমল, আলোচনা ও মুখস্থকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন, তার প্রত্যেকটি শব্দ লিখে রাখা কি সংরক্ষিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য?
আর এ দাবিও বড়ই হাস্যকর যে, তখন যেহেতু হাদীস লিখিত হয়নি, সুতরাং হাদীস-সুন্নাহ অস্তিত্বহীন, তাই তখন সুন্নাহর অনুসরণ করতে বলা মানে কুরআনের অনুসরণ করতে বলা। কারণ তখন সকল হাদীস যদিও লেখা হয়নি তবে হাদীস পূর্ণাঙ্গরূপে সাহাবিদের হৃদয়ে, মস্তিষ্কে ও সমাজে অঙ্কিত ছিল। তাঁদের হৃদয়, মস্তিষ্ক ও সমাজ তো ছিল হাদীসের আলোয় পরিপূর্ণ আলোকিত, বরং হাদীসের আলোকেই বিনির্মিত। তাঁদের সুন্নাহ অনুসরণের জন্য তা কাগজের পাতায় লিখিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং এটা তো তাঁদের নিকট দূষণীয় বলে গণ্য হওয়ার কথা।
যে হাদীসে নবীজি হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন সে হাদীসে কি তিনি হাদীস সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন? খেয়াল করে দেখুন, তিনি ওই হাদীসে বলেছেন, 'আমার হাদীস বর্ণনা করো, মিথ্যা মিশ্রিত কোরো না'। অর্থাৎ বিশেষ কারণে যদিও এখন হাদীস লেখা যাচ্ছে না। তবে তোমরা মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণের কথা ভুলে যেয়ো না। এবং মনে রাখবে, আমার হাদীস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করবে। তার সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত করবে না। কেননা আমার কথা অন্যের কথার মতো মামুলি নয়, তাই
إِنَّ كَذِبًا عَلَى لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ.
আমার নামে মিথ্যা বলা অন্যের নামে মিথ্যা বলার মতো নয়। ২৪৪

টিকাঃ
২৪২. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩০০৪。
২৪৩. মুস্তফা সিবায়ি, আস সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরীয়িল ইসলামি, পৃ. ৬১; তাকি উসমানি, হাদীসের প্রামাণ্যতা, পৃ. ১১১-১১২。
২৪৪. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৮১৪০; সহীহ বুখারি, হাদীস: ১২৯১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ০৪; মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ১২৭৬。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে

📄 হাদীস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে


যখন প্রমাণিত হলো যে, হাদীসও মহান আল্লাহর প্রেরিত ওহি, আর ওহি মানতে যেহেতু আমরা বাধ্য, সুতরাং হাদীস মানতেও বাধ্য, তখন তারা হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতার উপর বিভিন্ন আপত্তি উঠিয়ে তারা বলতে চায় যে, হাদীস ওহি, এ কারণে আমরা তা মানতে যদিও বাধ্য, তবে নানান ঐতিহাসিক ও পারিপার্শ্বিক জটিলতার কারণে যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল হাদীস সংরক্ষিত হতে পারেনি, তেমনি হাদীসের সাথে অন্য কথাও এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেসব থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণী বের করে আনা দুরূহ ব্যাপার-বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য। আর আল্লাহ তো কারো উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না। তাহলে সর্বসাধারণের জন্য হাদীস মান্য করা কীভাবে আবশ্যক হতে পারে? আল কুরআনের ইরশাদ :
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।”২৪৫
তাদের এ দাবি মূলত দুটি গলত বুঝ থেকে উদ্গিরিত। প্রথমত, আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস যথার্থ নয়। কেননা কোনো মুমিন এ বিশ্বাস করতে পারে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত যে বিধান মান্য করা আবশ্যক করেছেন তা পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত হয়ে তাদের মানার উপযুক্ত ভাবে পৃথিবীতে থাকবে না; বরং হারিয়ে যাবে বা এমন জটিল হয়ে যাবে যে, মানুষের জন্য তা মান্য করা অসম্ভব হয়ে যাবে। বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মৌলিক দাবি তো এই যে, তিনি যে ওহি মান্য করা আবশ্যক করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা। এটা তো উপরে উল্লেখিত আয়াতটি থেকেই বোঝা যায়।
তবে এ কথা সত্য যে, হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন কুরআন সংকলনের চেয়ে জটিল ও কঠিন ছিল। এবং এ কথাও সত্য যে, হাদীসের নামে সমাজে অনেক ভুল ও মিথ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিস আলিমগণ হাদীস সংগ্রহে এমন কষ্ট-মুজাহাদা ও চেষ্টা-তদবীর করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে প্রচারিত মিথ্যা ও ভুল কথা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসকে পৃথক করার জন্য এমন যৌক্তিক, প্রায়োগিক, বৈজ্ঞানিক ও সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন যে, তাতে তারা তাঁর সকল হাদীস সংগ্রহ করতে এবং সত্যকে মিথ্যা থেকে বের করে এনে উম্মাতের সামনে নির্ভেজালরূপে পেশ করতে পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছেন। এ কাজে তাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থা ও কর্মপদ্ধতি এমন সফল, একক ও অনন্য যে, পৃথিবীর ইতিহাস অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী থেকে এর কোনো দ্বিতীয় নজির আনতে সক্ষম হয়নি।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহ.)-কে বলা হলো, নবীজির নামে কত জাল মিথ্যা হাদীস ছড়িয়ে পড়েছে! এগুলো কীভাবে চিহ্নিত হবে? তিনি জবাবে বললেন, প্রত্যেক যুগেই এই হাদীসগুলো চিহ্নিত করার জন্য প্রাজ্ঞ হাদীস বিশারদ থাকবেন। ২৪৬
একবার হারুনুর রশীদ এক যিন্দিককে পাকড়াও করে হত্যার আদেশ দিলেন। তখন ওই যিন্দিক বলল, আমাকে কেন হত্যার আদেশ দিলেন? তিনি বললেন, তোমার অনিষ্ট থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য। তখন সে বলল, আমি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে হাজার হাজার জাল হাদীস ছড়িয়ে দিয়েছি সেগুলো থেকে কীভাবে মানুষকে মুক্তি দেবেন? হারুনুর রশীদ বললেন, আল্লাহর দুশমন, তোমার কি আবু ইসহাক ফাযারি আর আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের কথা জানা নেই? তারা দুইজনে তোমার বানানো প্রত্যেকটা জাল হাদীস একটা একটা করে চিহ্নিত করবেন। ২৪৭
ইবন মায়ীন (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাটলিতে বহন করা হয়। মানুষ বলতে থাকে, এই সেই মহান ব্যক্তি যিনি সারা জীবন নবীজির নামে বানানো সকল জাল ও মিথ্যা কথার অপনোদন করেছেন। ২৪৮
ইবন খুযাইমা (রাহ.) বলেছেন, আবু হামিদ শারকি যতদিন জীবিত আছেন ততদিন কারো পক্ষে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে পার পাওয়া সম্ভব হবে না।
ইরাকে যখন অনেক জাল হাদীস ছড়িয়ে পড়ল তখন দারাকুতনি (রাহ.) বললেন, হে বাগদাদবাসী, আপনারা এই ধারণা করবেন না, আমি জীবত থাকতে কেউ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে ধরা পড়বে না। ২৪৯
খতীব বাগদাদি (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তাকে দাফনের জন্য যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন একদল মানুষ চিৎকার বলছিল, এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বানানো জাল হাদীস চিহ্নিত করতেন। এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজির হাদীস সংরক্ষণ করতেন। ২৫০
তবে সাধারণের জন্য হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের এই কাজটি কেবল কঠিন বা দুরূহই নয়; বরং অসম্ভবই বলতে হবে। কিন্তু এ দুরূহ দায়িত্ব তো আল্লাহ তাদের দেননি; বরং তিনি তাঁর দীনের সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য প্রত্যেক কালপর্বে দক্ষ যোগ্য আলিম পাঠান। তারা দীনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, দীনের ভেতরে ঢুকে যাওয়া ভুলভ্রান্তির সংস্কার করেন এবং দীনকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় সমাজে তুলে ধরেন। এসব জটিল ক্ষেত্রে সাধারণের কর্তব্য হলো, যোগ্য নির্ভরযোগ্য আলিমের শরণাপন্ন হওয়া।
হাদীস শরীফে এসেছে :
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا.
আল্লাহ এই উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে সংস্কারক পাঠান। যিনি তাদের জন্য দীনকে সংস্কার করেন। ২৫১
কুরআন-হাদীসে এ বিষয়ে আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে।
তবে হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মান্য করার সম্ভাব্যতা নিয়ে হাদীস অস্বীকারকারীদের এ সকল প্রশ্ন উঠানোর মূল উদ্দীপক হচ্ছে, মুহাদ্দিসদের হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও নির্ভেজালভাবে তা সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা ও এক্ষেত্রে তাদের সফলতা অনুধাবনে ব্যর্থতা। শরীআত প্রতিপালনের মূলনীতি সম্পর্কেও তাদের অজ্ঞতা সুস্পষ্ট। এ সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা আমরা উপরে করে এসেছি। পাঠক, তবে বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে এ শাস্ত্রের কিতাবাদি শাস্ত্রজ্ঞ আলিমের তত্ত্বাবধানে যথারীতি অধ্যয়ন করতে হবে।

টিকাঃ
২৪৫. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬। আরো দেখুন: সূরা বাকারাহ, ২৩৩; সূরা আনআম, ১৫২; সূরা আ'রাফ, ৪২; সূরা মু'মিনূন, ৬২。
২৪৬. ইবন আদি, আল কামিল: ১/১০৩。
২৪৭. তারীখ দিমাশক: ৭/১২৭。
২৪৮. ইবন হিব্বান, সিকাত: ৯/২৬৩。
২৪৯. ইবনুল জাওযি, মাওযূআত: ১/৪৫-৪৬
২৫০. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/২৮৬。
২৫১. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৯১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৮৫৯২; বাইহাকি, মা'রিফাতুস সুনান : ১/২০৮। হাদীসটিকে আল্লামা ইরাকি (ফায়যুল খাতির: ২/২৮২) ইবন হাজার (তাওয়ালিত তা'সীস, পৃ. ৪৯), সাখাবি (আল মাকাসিদুল হাসানাহ : ২৩৮), ইবনুদ দাইবা' রহ. (তাময়ীযুত তয়্যিব, পৃ. ৩৮)-সহ আরো অনেকে প্রমাণিত বলেছেন。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 সত্যের সাথে যখন মিথ্যা মিশে যায়

📄 সত্যের সাথে যখন মিথ্যা মিশে যায়


হাদীসের নামে অনেক ভুল ও মিথ্যা কথা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। তা যেমন মানুষের মুখে আছে, তেমনই কিতাবের পাতায়ও সংকলিত হয়েছে এবং এই মিশ্রণ থেকে ভুল ও সঠিক যাচাই-বাছাইয়ে অনেক ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মধ্যেও মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টিকে অনেকে হাদীস অগ্রহণযোগ্য হওয়ার যুক্তি ও দলীল হিসাবে পেশ করেন। তারা এ কথাও বলেন যে, সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে যখন ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে যায় তখন আর তা বিশ্বাস ও প্রমাণের যোগ্য থাকে না। এ কথা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হিসাবেও বর্ণিত রয়েছে। যেমন বাইবেল ও আহলে কিতাবের বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন :
إِذَا حَدَّثَكُمْ أَهْلُ الْكِتَابِ فَلَا تُصَدِّقُوْهُمْ وَلَا تُكَذِّبُوْهُمْ وَقُوْلُوْا: آمَنَّا بِاللَّهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ فَإِنْ كَانَ حَقًّا لَمْ تُكَذِّبُوْهُمْ وَإِنْ كَانَ بَاطِلًا لَمْ تُصَدِّقُوْهُمْ.
আহলে কিতাব তোমাদের কাছে কিছু বর্ণনা করলে তোমরা তাদেরকে সত্যায়নও করবে না মিথ্যাও বলবে না; বরং বলবে, আমরা আল্লাহ, তাঁর কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছি। এতে তাদের বক্তব্য সঠিক হয়ে থাকলে তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হলো না, আবার মিথ্যা হয়ে থাকলে সত্যায়নও করা হলো না। ২৫২
আমরা বলি, এই বিষয়টিই বরং হাদীস শরীআতের দলীল হওয়ার অন্যতম প্রমাণ। হাদীস যদি শরীআতের দলীলই না হতো এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থায় তা কোনো গুরুত্বই বহন না করত, তাহলে হাদীস জাল করে লাভ কী? যার কোনো মূল্য নেই, গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নেই তা কি কেউ নকল করে? আজকে আমাদের এই কালে কেবল নয়; বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের কিছুকাল পর থেকেই বিভিন্ন বিভ্রান্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাদের মত ও মতাদর্শ প্রমাণের জন্য জাল হাদীস তৈরি করা শুরু করে।
খারিজি মতবাদের এক প্রবক্তা, যিনি তাওবা করে হক পথে ফিরে আসেন, তার থেকে আব্দুল্লাহ ইবন লাহীআহ বর্ণনা করেছেন, সত্যে ফিরে আসার পর তিনি বলতেন:
إِنَّ هَذِهِ الْأَحَادِيثَ دِينُ فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُوْنَ دِينَكُمْ فَإِنَّا كُنَّا إِذَا هَوِيْنَا أَمْرًا صَيَّرْنَاهُ حَدِيثًا.
নবীজির এই সকল হাদীস দীন। সুতরাং কার কাছ থেকে তোমরা দীন গ্রহণ করছ তা যাচাই করবে। কেননা কোনো বিষয় যখন আমাদের মনঃপূত হতো আমরা সে বিষয়ে হাদীস বানিয়ে নিতাম। ২৫৩
এ ব্যক্তির বক্তব্যে পরিষ্কার বিবৃত হয়েছে, বিভ্রান্ত ব্যক্তি-গোষ্ঠীও হাদীসকে দীনের দলীল মনে করত এবং এ দলীল দ্বারা নিজেদের মত ও মতাদর্শ প্রমাণ করার জন্যই তারা হাদীস বানাত। আর সমাজেও হাদীস শরীআতের দলীল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ছিল। নইলে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার জন্য তারা হাদীস জাল করত না। (আর তাদের জালিয়াতি থেকে বাঁচার উপায় তিনি বলেছেন, হাদীসের সনদ যাচাই করা। দুর্নীতিকারী নিশ্চয় সম্যকরূপে জানে তার দুর্নীতি ধরার রাস্তা কী? সুতরাং এ থেকেও বোঝা যায়, হাদীস সত্যায়নে সনদ যাচাইকে অযৌক্তিক বলা পুরোটাই অযৌক্তিক। এ বিষয়ক আলোচনা পরে আসছে, ইনশাআল্লাহ)।
উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো, ইসলামের সূচনাকাল থেকেই মুসলিম উম্মাহর নিকট হাদীসে রাসূলের আইনগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এবং এটাও প্রমাণিত হয় যে, হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতে অস্বীকার করা একটি বিচ্ছিন্ন মত-যা সম্মিলিত মুসলিম উম্মাহর গৃহীত পথের বিপরীত পথ। আর যারা মুমিনদের সম্মিলিত পথ পরিত্যাগ করে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে তাদেরকে সতর্ক করে এবং কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّnَ لَهُ الْهُدًى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
“যে ব্যক্তি তার নিকট হিদায়াত স্পষ্ট হওয়ার পরও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিনদের গৃহীত পথ ভিন্ন অন্য পথ অবলম্বন করবে তাকে আমি তার অবলম্বিত পথেই ছেড়ে দেব, আর তাকে নিক্ষেপ করব জাহান্নামে; তা কতই-না নিকৃষ্ট গন্তব্য!”২৫৪
আর তাদের এ দাবিও সঠিক নয় যে, সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত হয়ে হাদীসের ভান্ডার ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি, মুহাদ্দিস ইমামগণ কী অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকল হাদীস সংগ্রহ করেছেন এবং যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণীকে পৃথক ও পরিশুদ্ধ করেছেন। আর এক্ষেত্রে সাধারণের কর্তব্য কী তাও আমরা আলোচনা করেছি।
মুহাদ্দিসদের এই কর্মযোগ-হাদীস সংগ্রহ, সংকলন, প্রচলিত জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণীকে পৃথক্করণে প্রাণান্ত পরিশ্রম-ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই চলমান। এ বিষয়টিও তাই এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামের সূচনাকাল থেকে মুসলিম উম্মাহর আলিমদের নিকটও হাদীসে রাসূলের আইনগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ কারণেই তো তারা ভুল, মিথ্যা ও জাল কথা থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণী পৃথক করতে প্রাণান্ত মেহনত করেছেন। যদিও মানবিক দুর্বলতার কারণে (অন্যান্য শাস্ত্রের মতো) কিছু বিষয়ে তারা মত-পার্থক্যের শিকার হয়েছেন। নইলে অপ্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে যাক আর তার সাথে ভুলভাল মিশে ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে যাক, তার পেছনে পণ্ডশ্রম করে কেন তারা জীবন ক্ষয় করবেন? সুতরাং এক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মতভেদও হাদীস শরীআতের দলীল হওয়ার অন্যতম প্রমাণ।
যারা ইসরায়ীলিয়্যাত বা বাইবেল সংকলন-সংরক্ষণের ইতিহাস এবং হাদীস সংকলন-সংরক্ষণের ইতিহাস পাঠ করেছেন তারা জানেন, উভয় বিষয়ের ঐতিহাসিক মর্যাদার মাঝে কী আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাইবেল নামে সংকলিত পুস্তকগুলোর যেমন কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তেমনি তার মাঝে সংকলিত বাণী-সমষ্টির কোন অংশ সঠিক আর কোন অংশ বাতিল তা নির্ণয়ের কোনো যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা নেই। শত শত বছর পর তারা সমাজে প্রচলিত কথা-কাহিনির সমাহারকে নির্বিচারে সংকলন করেছেন আর নিজেদের রুচি-পছন্দ অনুযায়ী ভুল-সঠিক বলে রায় দিয়েছেন। পক্ষান্তরে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনে যেমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মানা হয়েছে তেমনি তাকে মিশে যাওয়া খাদ থেকে মুক্ত করার জন্য অতি সূক্ষ্ম বিচারিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। যা পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীর সকল দেশ-কালের জন্য অতিশয় বিস্ময়। বাস্তববোধসম্পন্ন জ্ঞানীমাত্রই এমনকি কোনো কোনো অমুসলিম পণ্ডিতও মুক্তকণ্ঠে যে পদ্ধতির সফলতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২৫৫

টিকাঃ
২৫২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৭২২৫; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৪৪; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৬২৫৭; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস: ১০১৬০。
২৫৩. ইবন আদি, আল কামিল: ১/১৫১; ইবনুল জাওযি, আল মাওযূআত, ১/৩৯; খতীব বাগদাদি, আল জামি' লি-আখলাকির রাবি, ১/১৩৭; আল কিফায়াহ, পৃ. ১২৩। বিস্তারিত জানতে দেখুন: ড. ইবরাহীম ইবন সালিহ আল আজলান, আল মুহাদ্দিসূনা ওয়াস সিয়াসা, পৃ. ২৯২-৩০০。
২৫৪. সূরা [৪] নিসা, আয়াত: ১১৫。
২৫৫. বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবি রচিত 'ইযহারুল হক', ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত 'পবিত্র বাইবেল: পরিচিতি ও পর্যালোচনা' এবং মুফতি তাকি উসমানি রচিত 'খৃষ্টধর্মের স্বরূপ'।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক

📄 হাদীসশাস্ত্র অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক


বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মানে পরীক্ষিত-প্রমাণিত পদ্ধতি—যা দেশ, জাতি, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হাদীসশাস্ত্রের এই গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসলামের ভেতরে এবং বাইরে হাদীসশাস্ত্রের মতো আরেকটি শাস্ত্রের উদাহরণ নেই। অতীত বা সমসাময়িক কালের কোনো ঘটনা বা বক্তব্যের সত্যতা নির্ণয়ে হাদীসশাস্ত্রীয় পদ্ধতি অনুসরণের উদাহরণ পশ্চিমা বিশ্ব তো দূরের কথা মুসলিম বিশ্বেও নেই।
হাদীস সত্যায়িত হয় বর্ণনাকারীদের সত্যায়নের মাধ্যমে। কিন্তু বর্ণনাকারীদের সততা ও সত্যবাদিতার ভিত্তিতে কোনো সংবাদ সত্যায়নের এ পদ্ধতি পৃথিবীতে নজিরবিহীন। তাছাড়া কোনো ব্যক্তির জন্য অন্য কোনো ব্যক্তির সততা ও সত্যবাদিতার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া কি সম্ভব, সে ব্যক্তি যতই নিকটতম হোক? উপরন্তু সেই ব্যক্তি যদি হয় শত বছর বা হাজার বছর আগের ভিন্ন দেশ, জাতি, ভাষা, সভ্যতার মানুষ? হাদীসশাস্ত্রের ইমামদের এই কাজটিই করতে হয়। তারা শত শত বছর আগের বর্ণনাকারীদের চারিত্রিক সনদ দেন এবং তার ভিত্তিতে হাদীসের মান নির্ধারণ করেন। যেমন ইমাম বুখারি (রাহ.) তাঁর তারীখ গ্রন্থে হাজার হাজার হাদীস বর্ণনাকারী রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন। এটি একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব বিষয়।
উপরন্তু হাদীসশাস্ত্রের ইমাম হিসাবে খ্যাত এইসব ব্যক্তিবর্গ কেউ আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক অনুমোদিত নন। তাহলে তাদের প্রত্যয়নপত্রের কী মূল্য আছে? কোনো কোনো হাদীস অস্বীকারকারী এসব দাবি করে থাকেন।
কোনো শাস্ত্রকে বৈজ্ঞানিক হতে হলে সর্বজন গ্রহণযোগ্য হতে হবে—এ দাবিটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান। বিজ্ঞান নিজ উপযুক্ততায় বিজ্ঞান। কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। তবে হাদীসশাস্ত্র অবশ্যই পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত। অল্প কিছু অজ্ঞ বিভ্রান্ত লোক ছাড়া মুসলিম বিশ্বের সকল পণ্ডিত গবেষক, এমনকি অমুসলিম পণ্ডিত পর্যন্ত এ শাস্ত্রের অনন্যতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার গবেষকের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলাম সমালোচক প্রাচ্যবিদ স্প্রেঙ্গার বলেছেন:
‘There is no nation nor has there been any which like them (Muslims) has during twelve centuries, recorded the life of every man of letters. If the biographical records of Mussalman were collected we should probably have accounts, of a half million distinguished persons, and it would be found that there is not a decennium of their history, nor a place of importance which has not its representatives.'
(মুসলিমদের মহাকীর্তি তাদের এই জীবনীশাস্ত্র)। অতীতে ও বর্তমানে এমন কোনো সম্প্রদায় নেই যারা মুসলিমদের মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমদের রচিত জীবনচরিত গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতীপুরুষের জীবনী লাভ করব। এবং দেখা যাবে এমন একটা দশকও নেই, এমন একটা স্থানও নেই যা নিজের কৃতীপুরুষের জন্ম দেয়নি। ২৫৬
হাদীসশাস্ত্র মানব সভ্যতায় অনন্য ও বে-নজির বিষয়। অনন্য, অপূর্ব, অনুপম, অতুলনীয়, অদ্বিতীয়—এ শব্দগুলো পৃথিবীর সকল ভাষায় ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একে যে নেতিবাচকভাবে দেখে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। হাদীসশাস্ত্রের মতো পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও স্বীকৃত অদ্বিতীয় একটি শাস্ত্র মুসলিমদের হাতে গড়ে উঠেছে, এটা ইসলাম সংরক্ষণে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনার অংশ, মুসলিম জাতির জন্য গর্ব ও শুকরিয়ার বিষয়। মুসলিম নামধারী কেউ যদি এমনতর বিষয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন অন্যরা তাকে 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' ভাবতেই পারেন।
ইসলামপূর্ব ধর্মগুলো ছিল নির্দিষ্ট দেশকালের জন্য। মহান আল্লাহ তাই সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব নেননি। কিন্তু ইসলাম সর্বশেষ দীন। মহান আল্লাহ একে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এ কাজে যথাযথ পার্থিব ম্যাকানিজমও ব্যবহার করেছেন। যা অপূর্ব অভাবনীয়। মানব সভ্যতার আর কোনো অংশ সংরক্ষণের জন্য এর ধারেকাছের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। হাদীসশাস্ত্রীয় মূলনীতি প্রয়োগ করে যদি বিশ্ব-ইতিহাসের অন্য কোনো পর্বের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়, লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে।
আধুনিক ইতিহাসতত্ত্ব অবশ্য হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনেকখানি গ্রহণ করেছে। ২৫৭ কিন্তু পুরোপুরি নিতে পারেনি। নেওয়া সম্ভব নয়। কেননা ইতিহাস তো ষোলো আনা সতর্কতার সাথে সংরক্ষণই করা হয়নি। এখন হাদীসশাস্ত্রীয় নীতিমালায় সত্যায়ন করতে গেলে তার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এবং এজন্যই ইতিহাস কখনো হাদীসের মানে উত্তীর্ণ হতে পারবে না।
পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর জন্যও তাদের ইতিহাস ও দলনেতার বক্তব্য হাদীসশাস্ত্রের নমুনায় পরিপূর্ণ সংরক্ষণ ও নিখুঁতভাবে সত্যায়ন করা সম্ভব নয়। আর সেটা প্রয়োজনীয়ও নয়। কেননা মহান আল্লাহ ইসলাম সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর কুদরতি তত্ত্বাবধানে হাদীস সংরক্ষিত হয়েছে। এর জন্য সকল ব্যবস্থা তিনি কুদরতি ইশারায় করেছেন। প্রত্যেক প্রজন্মের অসংখ্য মরদে কামিল এর জন্য জান কুরবান করেছে। এর নজির মানব সভ্যতার জন্য আনয়ন করা কীভাবে সম্ভব হতে পারে!
আমাদের নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না। পরবর্তী কোনো জাতিগোষ্ঠীর নেতা, তিনি যত প্রভাবশালী আর গ্রহণীয়ই হোন না কেন, পরবর্তীদের জন্য তার জীবনাদর্শ ও কথাকর্ম মেনে চলা আবশ্যক নয়। তাই তার অনুসারীদের জন্য তার সকল কথাকর্ম সংরক্ষণ করা আবশ্যক নয়, উপকারীও নয়; বরং পণ্ডশ্রম। তাই আর কারো আদর্শ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের জন্য হাদীসশাস্ত্রীয় কঠোর সূক্ষ্ম মূলনীতি মেনে প্রাণান্ত মেহনত করা হবে না। হাদীসশাস্ত্র তাই কিয়ামত পর্যন্ত অনন্য, অনুপম, অতুলনীয় ও অদ্বিতীয় হয়ে থাকবে।
বর্ণনাকারীর মূল্যায়নের মাধ্যমে সংবাদ গ্রহণ-বর্জন নজিরবিহীন নয়, বরং মানব সমাজের Common চর্চা। ধরুন, আপনারা পাঁচজন বন্ধু বসে আছেন। আপনাদের ষষ্ঠ বন্ধু এল। যার চরিত্র নড়বড়ে, বানিয়ে কথা বলে, সত্য-মিথ্যার পরোয়া করে না। সে এসে একটি সংবাদ দিল। নিশ্চয় আপনারা তার সংবাদ বিশ্বাস করবেন না। তা নিয়ে হাসাহাসি করবেন, বলবেন, 'দূর, ও কী বলে না বলে!' কিছুক্ষণ পর আপনাদের সপ্তম বন্ধু এল। মজবুত চরিত্রের অধিকারী। সততা ও সত্যবাদিতায় আপনাদের সকলের মাঝে প্রসিদ্ধ। আপনারা কখনোই তাকে মিথ্যা বলতে শোনেননি। তার দেওয়া সংবাদ নিয়ে কি হাসাহাসি করবেন? 'দূর, ও কী বলে না বলে' বলে কি উড়িয়ে দেবেন? না, তা করবেন না। জি, এটাই মানব সভ্যতার চিরন্তন প্রবণতা। ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতার উপর ভিত্তি করেই তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণযোগ্যতা পায়।
আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإِ فَتَبَيَّnُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ.
“হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে না অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে কষ্ট দিয়ে ফেলো; তাতে নিজেদের কর্ম নিয়ে তোমরা লজ্জিত হবে।”২৫৮
এ আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সংবাদ গ্রহণ ও বর্জনের মূল ভিত্তি সংবাদদাতার অবস্থা। সংবাদদাতা ফাসিক হলে তার দেওয়া সংবাদ গ্রহণ করা যাবে না। অন্য মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। আর সংবাদদাতা ফাসিক না হলে তার সংবাদ গৃহীত হবে।
কুরআনে বর্ণিত এ মূলনীতির ভিত্তিতেই প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিস আলিমগণ স্বীয় যুগের হাদীস বর্ণনাকারী রাবিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করেছেন এবং পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন- যেমন তারা হাদীস সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও হাদীস বর্ণনাকারীর অবস্থা একই সাথে একইভাবে পরবর্তীদের নিকট ট্রান্সফার হয়েছে। সংকলক ইমামগণ নতুন করে গবেষণা করে এ সকল তথ্য উদ্ধার করেছেন তা নয়। এ ধারণা ভুল যে, শত শত বছর পর হাদীস যখন সংকলিত হলো এবং তারপর তা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিল তখন মুহাদ্দিস ইমামগণ বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত অবস্থা অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন, কিন্তু তত দিনে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, শত শত বছর আগের তথ্যাবলি কালের সাথে সাথে কালের হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, সুতরাং এখন যা বলা হবে সবই ধারণা-অনুমান।
বরং বাস্তবতা হলো, সংকলক ইমামগণ হাদীসের মতো বর্ণনাকারীদের জীবনীও সূত্রের মাধ্যমে পেয়েছেন। ইমাম বুখারি (রাহ.)-ও তাঁর তারীখের কিতাবে যে সকল রাবির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং তাদের সম্পর্কে যে চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন তা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্যই এ কালে বসে সে কালের ব্যক্তি সম্পর্কে আন্দাজে ঢিল ছোড়া মনগড়া মন্তব্য নয়। তিনি নিজেই বলেছেন :
إِنَّمَا رَوَيْنَا ذَلِكَ رِوَايَةً لَمْ نَقُلْهُ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِنَا.
এ সম্পর্কে আমি পূর্বসূরিদের বক্তব্য উল্লেখ করেছি মাত্র। নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলিনি। ২৫৯
উল্লিখিত আয়াতের আলোকে এ কথাও সাব্যস্ত যে, সংবাদদাতা সম্পর্কে যিনি ওয়াকিবহাল তিনি তার সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে পারবেন। এ কথা জ্ঞানচর্চার জগতে সর্বজনস্বীকৃত। যা কিছু মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির গম্য সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে কোনো ঊর্ধ্বপক্ষের স্পেসিফিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। বরং নির্দিষ্ট শাস্ত্রে স্বীকৃত পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত পারদর্শিতা অর্জন করতে হয় এবং সত্যই পারদর্শিতা অর্জিত হয়েছে কি না সে বিষয়ে উক্ত শাস্ত্রের স্বীকৃত ব্যক্তিবর্গের স্বীকৃতি পেতে হয়।
যে গ্রন্থটিকে আমরা আল্লাহর কিতাব আল কুরআন বলে জেনেছি ও মেনেছি, জন্মের পর থেকে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে জেনেছি যে, এটা আল কুরআন। কিন্তু তারা কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের স্পেসিফিক অনুমোদিত নয়। তাছাড়া আমি আমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে যে নিশ্চিত হয়েছি, কিন্তু আমি বা আমার জ্ঞানবুদ্ধিই কি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক স্পেসিফিক অনুমোদিত? তাই বলে কি আমাদের এই সিদ্ধান্ত অবাস্তব অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক? কিছুতেই নয়—যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই জেনে এসেছে।

টিকাঃ
২৫৬. [Sprenger, A Biographical Dictionary of Persons Who knew Muhammad, vol. 1, p.1.]
২৫৭. বিস্তারিত দেখুন: আসাদ রুস্তম, মুস্তালাহুত তারীখ。
২৫৮. সূরা [৪৯] হুজুরাত, আয়াত: ০৬。
২৫৯. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা', ১/৭৯ ও ১০/১০৪。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00