📄 আহসানাল হাদীস : লাহওয়াল হাদীস
হাদীস শব্দের অর্থ কথা, বর্ণনা, আলোচনা, কথোপকথন, কাহিনি, সংবাদ, নতুন, আধুনিক ইত্যাদি। আল কুরআনে শব্দটি বিশেরও অধিক স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ كِتَابًا مُتَشَابِهَا مَّثَانِي.
“আল্লাহ উত্তম কথা তথা বারবার পঠিত সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্রন্থ নাযিল করেছেন।”২৩৭
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهُوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ.
"একশ্রেণির লোক আছে যারা অনর্থক কথাবার্তা ক্রয় করে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য।"২৩৮
আয়াত দুটিতে 'হাদীস' শব্দের উল্লেখ আছে। এদিকে ইঙ্গিত করে হাদীস অস্বীকারকারী কোনো কোনো ব্যক্তি বলেন, আমরা কুরআনে দুই ধরনের হাদীসের কথা পাই। একটা (أَحْسَنَ الْحَدِيثِ) আহসানাল হাদীস, আরেকটি (لَهْوَ الْحَدِيثِ) লাহওয়াল হাদীস। আহসানাল হাদীস বা উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন, আর লাহওয়াল হাদীস বা অনর্থক কথা হচ্ছে বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য ইমাম কর্তৃক সংকলিত হাদীস।
এ ধরনের কথা শুধু ওই ব্যক্তির মুখ থেকেই বের হতে পারে, অনূদিত আর হরকত সংযুক্ত কুরআন পড়তে পারাই যার গবেষণার একমাত্র যোগ্যতা। এইসব ব্যক্তিবর্গের হয়তো জানা নেই যে, আল কুরআনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকেও হাদীস বলা হয়েছে। নবীজি উম্মাত-জননী হাফসা (রা.)-কে একটি গোপন কথা জানিয়ে গোপন রাখতে বলেন। কিন্তু তিনি অন্যকে বলে ফেলেন। বিষয়টি আল কুরআনে আলোচিত হয়েছে এবং সেখানে নবীজির কথাকে হাদীস শব্দে ব্যক্ত করে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذْ أَسَنَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا.
"নবী যখন তাঁর জনৈক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বললেন।”২৩৯
পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, সূরা আল ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের উপর তাঁর একটি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে তিনি তাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শোনান, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। অর্থাৎ উম্মাতকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাসূল প্রেরণ করা আল্লাহর একটি অনুগ্রহ। অন্য আয়াতে তিনি রাসূলকে তাঁর অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সে আয়াতে তিনি 'হাদীস' শব্দের ধাতুমূল থেকে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে বলেছেন:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثُ.
"আর আপনি আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বর্ণনা করুন। "২৪০
আমরা আগেই জেনেছি, কথা, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিতাব ও হিকমতের যে শিক্ষা তাঁর উম্মাতকে দান করেছেন ইসলামের পরিভাষায় তাকেই হাদীস বা সুন্নাহ বলে। আল কুরআনের ভাষায় এটা মুমিনদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ। আমরা দেখতে পেলাম, নবীজি কর্তৃক এই অনুগ্রহের বর্ণনাকেও কুরআন মাজীদ হাদীস শব্দেই উল্লেখ করেছে।
কোনো মুমিনের কি এই দুঃসাহস হতে পারে যে, সে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে লাহওয়াল হাদীস বা অনর্থক কথা বলবে, বিশেষ করে যখন তা দীন-শরীআত সম্পর্কে হয়, যখন তা মহান আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র ওহিরই একটি প্রকার?
যদি বলা হয়, কুরআন কারীমে কুরআন ও হাদীস উভয়কেই যদি হাদীস বলা হয়ে থাকে তবে আমরা শুধু হাদীসকেই কেন হাদীস বলে থাকি? এটা এত স্বাভাবিক বিষয় যে, এ নিয়ে আসলে কোনো প্রশ্ন হয় না। একটি শব্দের যদি আভিধানিক বা রূপকভাবে একাধিক অর্থে ব্যবহার থাকে, তবে তার ভেতর থেকে কোনো একটি বিশেষ অর্থে প্রসিদ্ধ হয়ে যাওয়া বা কোনো বিশেষ শাস্ত্রে কোনো বিশেষ অর্থে পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া, যখন ওই শব্দটি সাধারণভাবে উচ্চারিত হলে মানুষ সাধারণত ওই বিশেষ অর্থটিই বুঝবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।
যেমন 'সালাত' )صَلَاةَ( শব্দটি আল কুরআনে দরূদ, দুআ, ইস্তিগফার, রহমত, উপাসনালয়, বান্দার প্রশংসা, কুরআন পাঠ, বিশেষ ইবাদত ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ২৪১ কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় বিশেষ ইবাদত নামায অর্থে শব্দটি এমন প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, এখন সালাত উচ্চারণমাত্রই আমরা নামাযকেই বুঝি। জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে এটা খুবই স্বভাবিক ও সুপরিজ্ঞাত বিষয়। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠানো অবান্তর।
টিকাঃ
২৩৭. সূরা [৩৯] যুমার, আয়াত : ২৩。
২৩৮. সূরা [৩১] লুকমান, আয়াত: ০৬。
২৩৯. সূরা [৬৬] তাহরীম, আয়াত: ০৩。
২৪০. সূরা (৯৩) দুহা, আয়াত: ১১。
২৪১. সূরা বাকারাহ, ৪৩, ১৫৩ ও ১৫৭; তাওবাহ, ১০৩; ইসরা', ১১০; হাজ্জ, ৪০; আহযাব, ৪৩ ও ৫৬; তাফসীর ইবন কাসীর, ৬/৪৩৬。
📄 হাদীসের নামে অশ্লীল কিচ্ছা-কাহিনি
হাদীসের কিতাবে হাদীস নামে সংকলিত, এমনকি মুহাদ্দিসদের নিকট সহীহ হিসাবে স্বীকৃত অনেক বর্ণনা অশ্লীলতায় ভরপুর। এমন অশ্লীল কিচ্ছা-কাহিনি ওহি তো দূরের কথা, নবীজির নিজের বাণীও হতে পারে না—এ দাবি হাদীস অস্বীকারকারী অনেকের।
নারীদেহ ও নারী-পুরুষের যৌন ক্রিয়াকলাপের উন্মুক্ত প্রদর্শন ও রগরগে বিবরণকে অশ্লীলতা বলা হয়। তবে মানুষ মানেই যেমন নারী আর পুরুষ, তেমনি মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য নারী-পুরুষের অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার বন্ধ করা এবং বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত যৌনক্রিয়া অপরিহার্য। তাই নারীদেহ ও নারী-পুরুষের যৌনক্রিয়ার অবাধ প্রদর্শন ও রগরগে বর্ণনা যেমন বন্ধ করা দরকার তেমনি এ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় আলোচনা শালীনভাবে জারি রাখাও অতিশয় দরকারি। এ কথা মানুষ মাত্রেই বোঝে, এজন্য যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই।
শুধু হাদীস শরীফ কেন, এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রিত আলোচনা স্বয়ং আল কুরআনেই বিদ্যমান। বেহেশতি হুরদের দেহকাঠমোর বর্ণনা, ঋতুমতী নারীর বিধানসহ এ বিষয়ক অনেক কথা আল কুরআনে আলোচিত হয়েছে।
📄 হাদীস লিখতে নবীজির নিষেধাজ্ঞা
হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে দায়িত্ব ছিল, মানুষকে ধর্মীয় রীতিনীতি শিক্ষা দেওয়া সে শিক্ষা কুরআনেই আছে। কুরআনের বাইরের কোনো শিক্ষা যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতো তিনি নিজে সেসব লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতেন অথবা সে মর্মে নির্দেশ দিতেন। এর কোনোটাই তিনি করেননি। উল্টো হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন। আর বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি সুন্নাহ অনুসরণের যে কথা বলেছেন সেখানেও এর অর্থ কুরআন অনুসরণ। কেননা তখন কুরআন ছাড়া হাদীস বা সুন্নাহ নামে কিছুই সংকলিত হয়নি।
সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا تَكْتُبُوْا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ وَحَدِّثُوا عَنِّي وَلَا حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
তোমরা আমার থেকে লিখো না। যে আমার থেকে কুরআন ব্যতীত কিছু লিখেছে সে যেন তা মুছে ফেলে। তবে আমার থেকে মৌখিক বর্ণনা করবে, তাতে কোনো দোষ নেই। যে ব্যক্তি আমার নামে জেনেশুনে মিথ্যা বলবে সে যেন জাহান্নামে ঠিকানা খুঁজে নেয়। ২৪২
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় রীতিনীতি ও কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়া। সে শিক্ষা কুরআনেই আছে—এমন দাবি কি সুস্থ মাথা থেকে বের হওয়া সম্ভব? তবে কি কুরআনের সকল ব্যাখ্যা কুরআনেই আছে? নবীজির সকল কাজের বিবরণও কুরআনে আছে? তিনি কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সালাত আদায় করতেন। কিন্তু কীভাবে আদায় করতেন তার বিবরণ কুরআনের কোথায় আছে? শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বিভিন্নভাবে ছাত্রদেরকে টেক্সটবুক বুঝিয়ে থাকেন। শিক্ষকের সেই ব্যাখ্যা টেক্সটবুকেই আছে—এ দাবি কি কোনো পাগলেও করতে পারে?
কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআনেই আছে। এ ভিন্ন নবীজির ব্যাখ্যার আলাদা কোনো অস্তিত্ব বা প্রয়োজন নেই। তাহলে এখন আমাদেরকে ধর্মীয় সকল বিধিবিধান ও কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন থেকে শিখে নিতে হবে। নবীজির যুগে নবী শিখে নিয়েছেন কুরআন থেকে। আমার যুগে আমি শিখে নিচ্ছি কুরআন থেকে। তাহলে কুরআন যে তাঁকে কুরআন ব্যাখ্যা করার বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে, এ কথার অর্থ কী?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেননি বা নির্দেশ দেননি-এ কথাও সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অসত্য। তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে সর্বপ্রকারে সকল পদ্ধতিতে হাদীস সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার পুনঃপুন নির্দেশ প্রদান করেছেন। 'হাদীস সংরক্ষণে নবীজির নির্দেশনা' শিরোনামের অধীনে আমরা সে বিষয়ক আলোচনা দেখে এসেছি।
তিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন, জীবন্ত ইসলাম। সাহাবিগণ জীবন দিয়ে তাঁর সুন্নাহ সংরক্ষণ করেছেন। ইসলাম পৃথিবীতে আসার পর থেকে প্রত্যেক প্রজন্মেই প্রচুর সংখ্যক এমন মানুষ তৈরি হয়েছে যারা ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসাবে বিশ্বাস করেছেন, ইসলামে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন এবং পুরোটা জীবনে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রতিপালন করেছেন। আল কুরআনের বিমূর্ত বাণীর ইসলাম তাদের মানতে হয়েছে বিকল্পহীনভাবে মূর্তিমান ইসলাম নবী-জীবনের অনুসরণ-অনুকরণে। এটা প্রত্যেক প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিখে নিয়েছে। নবীর সুন্নাহ তাই অবিকৃত ও পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত ও ট্রান্সফার হয়ে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এ ধরনের ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার বিষয়টি নিতান্তই গৌণ মাধ্যম।
তাছাড়া তিনি লেখার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণেরও বিশেষভাবে নির্দেশ, নির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুমতি প্রদান করেছেন। এবং সাহাবিগণ অনেকেই লেখার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণ করতেন এ বিষয়টিও ঐতিহাসিক বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত। তবে আমরা এখানে উল্লেখিত হাদীসে লেখার নিষেধাজ্ঞা দেখতে পাচ্ছি। নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশ-অনুমোদন উভয়ই যখন প্রমাণিত তখন একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে বিনা প্রমাণে বাতিল করে দেওয়া যৌক্তিক নয়। বরং দুটি বর্ণনাই সত্য এবং ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে প্রযোজ্য।
হাদীস লিপিবদ্ধকরণে নিষেধাজ্ঞা কুরআন নাযিলের প্রথম দিকের বিষয় হতে পারে। এখনকার মতো তখন কাগজ এমন সহজলভ্য ছিল না যে, কুরআনের জন্য একটা খাতা খোলা হলো, যখনই জিবরীল (আ.) কোনো আয়াত নিয়ে আসবেন ওই খাতায় লিখে রাখা হবে। বরং পাথরের ফলক, খেজুরের ডাল, পশুর চামড়া ও হাড়, বাঁশের টুকরা ও গাছের পাতা ইত্যাদিতে পৃথক পৃথকভাবে লিখে রাখা হতো। এমতাবস্থায় হাদীসও লিখে রাখলে কুরআন-হাদীস মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত।
কুরআনের যদিও ব্যতিক্রমী নিজস্ব অতি উচ্চাঙ্গের ভাষাভঙ্গি আছে, কিন্তু তখন কুরআন নাযিলের প্রথম যুগ, তখনও পাঠকের কাছে তার ভাষাভঙ্গি সুস্পষ্ট হয়নি। ভাষা-সাহিত্যের প্রথম দিকের ছাত্র তার ভাষার সেরা কবি- সাহিত্যিকদের লেখাও নাম না দেখে আলাদা করতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের পাঠপরিক্রমায় তার এমন সূক্ষ্ম রুচি তৈরি হয় যে, যে কারো রচনা পাঠ করেই বলে দিতে পারে, এটি অমুকের রচনা।
এসব কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিকে হাদীস লিখতে নিষেধ করলেও পরবর্তীকালে অনুমতি ও নির্দেশ প্রদান করেন। ২৪৩
এমনকি তাঁর সরাসরি নির্দেশে হাদীসের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লিখিত হয়। এবং অনেক সাহাবি অনুমোদন পেয়ে নিজেদের মতো করে হাদীস লিখে রাখতেন। দুইশত-তিনশত বছর পরে এসে ইমাম বুখারি-মুসলিমদের হতে হাদীস লিখিত হয়েছে, তা নয়। সাহাবি, তাবিয়ি, তাবি'-তাবিয়ি থেকে শুরু করে প্রত্যেক প্রজন্মের মুহাদ্দিসগণ পর্যপ্ত পরিমাণ হাদীস লিখে রাখতেন। তাদের ছাত্ররা তাদের মৌখিক বর্ণনা ও পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে হাদীস গ্রহণ করতেন। তবে যুগ-বাস্তবতার কারণে তাদের সে সকল পাণ্ডুলিপি মুদ্রিত হয়নি। যারা মনে করেন, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে এসে হাদীস লিখিত হয়েছে তারা মূলত হাদীস সংকলনের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ।
হাদীস, যা মূলত জীবনের প্রতিপলে? কর্মগত চর্চার বিষয়, শুধু তত্ত্বীয় বা চিন্তাগত চর্চার বিষয় নয়, যা প্রত্যেক প্রজন্মের পর্যাপ্ত মানুষ জীবনের একমাত্র কর্ম মনে করে আমল, আলোচনা ও মুখস্থকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন, তার প্রত্যেকটি শব্দ লিখে রাখা কি সংরক্ষিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য?
আর এ দাবিও বড়ই হাস্যকর যে, তখন যেহেতু হাদীস লিখিত হয়নি, সুতরাং হাদীস-সুন্নাহ অস্তিত্বহীন, তাই তখন সুন্নাহর অনুসরণ করতে বলা মানে কুরআনের অনুসরণ করতে বলা। কারণ তখন সকল হাদীস যদিও লেখা হয়নি তবে হাদীস পূর্ণাঙ্গরূপে সাহাবিদের হৃদয়ে, মস্তিষ্কে ও সমাজে অঙ্কিত ছিল। তাঁদের হৃদয়, মস্তিষ্ক ও সমাজ তো ছিল হাদীসের আলোয় পরিপূর্ণ আলোকিত, বরং হাদীসের আলোকেই বিনির্মিত। তাঁদের সুন্নাহ অনুসরণের জন্য তা কাগজের পাতায় লিখিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং এটা তো তাঁদের নিকট দূষণীয় বলে গণ্য হওয়ার কথা।
যে হাদীসে নবীজি হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন সে হাদীসে কি তিনি হাদীস সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন? খেয়াল করে দেখুন, তিনি ওই হাদীসে বলেছেন, 'আমার হাদীস বর্ণনা করো, মিথ্যা মিশ্রিত কোরো না'। অর্থাৎ বিশেষ কারণে যদিও এখন হাদীস লেখা যাচ্ছে না। তবে তোমরা মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে হাদীস সংরক্ষণের কথা ভুলে যেয়ো না। এবং মনে রাখবে, আমার হাদীস অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করবে। তার সাথে অন্য কিছু মিশ্রিত করবে না। কেননা আমার কথা অন্যের কথার মতো মামুলি নয়, তাই
إِنَّ كَذِبًا عَلَى لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلَى أَحَدٍ.
আমার নামে মিথ্যা বলা অন্যের নামে মিথ্যা বলার মতো নয়। ২৪৪
টিকাঃ
২৪২. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩০০৪。
২৪৩. মুস্তফা সিবায়ি, আস সুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা ফিত তাশরীয়িল ইসলামি, পৃ. ৬১; তাকি উসমানি, হাদীসের প্রামাণ্যতা, পৃ. ১১১-১১২。
২৪৪. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ১৮১৪০; সহীহ বুখারি, হাদীস: ১২৯১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ০৪; মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ১২৭৬。
📄 হাদীস কি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে
যখন প্রমাণিত হলো যে, হাদীসও মহান আল্লাহর প্রেরিত ওহি, আর ওহি মানতে যেহেতু আমরা বাধ্য, সুতরাং হাদীস মানতেও বাধ্য, তখন তারা হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। হাদীস সংরক্ষণের যথার্থতার উপর বিভিন্ন আপত্তি উঠিয়ে তারা বলতে চায় যে, হাদীস ওহি, এ কারণে আমরা তা মানতে যদিও বাধ্য, তবে নানান ঐতিহাসিক ও পারিপার্শ্বিক জটিলতার কারণে যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল হাদীস সংরক্ষিত হতে পারেনি, তেমনি হাদীসের সাথে অন্য কথাও এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেসব থেকে বিশুদ্ধ নবী-বাণী বের করে আনা দুরূহ ব্যাপার-বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য। আর আল্লাহ তো কারো উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না। তাহলে সর্বসাধারণের জন্য হাদীস মান্য করা কীভাবে আবশ্যক হতে পারে? আল কুরআনের ইরশাদ :
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।”২৪৫
তাদের এ দাবি মূলত দুটি গলত বুঝ থেকে উদ্গিরিত। প্রথমত, আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস যথার্থ নয়। কেননা কোনো মুমিন এ বিশ্বাস করতে পারে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত যে বিধান মান্য করা আবশ্যক করেছেন তা পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত হয়ে তাদের মানার উপযুক্ত ভাবে পৃথিবীতে থাকবে না; বরং হারিয়ে যাবে বা এমন জটিল হয়ে যাবে যে, মানুষের জন্য তা মান্য করা অসম্ভব হয়ে যাবে। বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মৌলিক দাবি তো এই যে, তিনি যে ওহি মান্য করা আবশ্যক করেছেন কিয়ামত পর্যন্ত তা যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা। এটা তো উপরে উল্লেখিত আয়াতটি থেকেই বোঝা যায়।
তবে এ কথা সত্য যে, হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন কুরআন সংকলনের চেয়ে জটিল ও কঠিন ছিল। এবং এ কথাও সত্য যে, হাদীসের নামে সমাজে অনেক ভুল ও মিথ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিস আলিমগণ হাদীস সংগ্রহে এমন কষ্ট-মুজাহাদা ও চেষ্টা-তদবীর করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে প্রচারিত মিথ্যা ও ভুল কথা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসকে পৃথক করার জন্য এমন যৌক্তিক, প্রায়োগিক, বৈজ্ঞানিক ও সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন যে, তাতে তারা তাঁর সকল হাদীস সংগ্রহ করতে এবং সত্যকে মিথ্যা থেকে বের করে এনে উম্মাতের সামনে নির্ভেজালরূপে পেশ করতে পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছেন। এ কাজে তাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থা ও কর্মপদ্ধতি এমন সফল, একক ও অনন্য যে, পৃথিবীর ইতিহাস অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী থেকে এর কোনো দ্বিতীয় নজির আনতে সক্ষম হয়নি।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহ.)-কে বলা হলো, নবীজির নামে কত জাল মিথ্যা হাদীস ছড়িয়ে পড়েছে! এগুলো কীভাবে চিহ্নিত হবে? তিনি জবাবে বললেন, প্রত্যেক যুগেই এই হাদীসগুলো চিহ্নিত করার জন্য প্রাজ্ঞ হাদীস বিশারদ থাকবেন। ২৪৬
একবার হারুনুর রশীদ এক যিন্দিককে পাকড়াও করে হত্যার আদেশ দিলেন। তখন ওই যিন্দিক বলল, আমাকে কেন হত্যার আদেশ দিলেন? তিনি বললেন, তোমার অনিষ্ট থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য। তখন সে বলল, আমি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে হাজার হাজার জাল হাদীস ছড়িয়ে দিয়েছি সেগুলো থেকে কীভাবে মানুষকে মুক্তি দেবেন? হারুনুর রশীদ বললেন, আল্লাহর দুশমন, তোমার কি আবু ইসহাক ফাযারি আর আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের কথা জানা নেই? তারা দুইজনে তোমার বানানো প্রত্যেকটা জাল হাদীস একটা একটা করে চিহ্নিত করবেন। ২৪৭
ইবন মায়ীন (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাটলিতে বহন করা হয়। মানুষ বলতে থাকে, এই সেই মহান ব্যক্তি যিনি সারা জীবন নবীজির নামে বানানো সকল জাল ও মিথ্যা কথার অপনোদন করেছেন। ২৪৮
ইবন খুযাইমা (রাহ.) বলেছেন, আবু হামিদ শারকি যতদিন জীবিত আছেন ততদিন কারো পক্ষে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে পার পাওয়া সম্ভব হবে না।
ইরাকে যখন অনেক জাল হাদীস ছড়িয়ে পড়ল তখন দারাকুতনি (রাহ.) বললেন, হে বাগদাদবাসী, আপনারা এই ধারণা করবেন না, আমি জীবত থাকতে কেউ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলে ধরা পড়বে না। ২৪৯
খতীব বাগদাদি (রাহ.) মারা যাওয়ার পর তাকে দাফনের জন্য যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন একদল মানুষ চিৎকার বলছিল, এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বানানো জাল হাদীস চিহ্নিত করতেন। এই সেই ব্যক্তি যিনি নবীজির হাদীস সংরক্ষণ করতেন। ২৫০
তবে সাধারণের জন্য হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের এই কাজটি কেবল কঠিন বা দুরূহই নয়; বরং অসম্ভবই বলতে হবে। কিন্তু এ দুরূহ দায়িত্ব তো আল্লাহ তাদের দেননি; বরং তিনি তাঁর দীনের সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য প্রত্যেক কালপর্বে দক্ষ যোগ্য আলিম পাঠান। তারা দীনকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন, দীনের ভেতরে ঢুকে যাওয়া ভুলভ্রান্তির সংস্কার করেন এবং দীনকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় সমাজে তুলে ধরেন। এসব জটিল ক্ষেত্রে সাধারণের কর্তব্য হলো, যোগ্য নির্ভরযোগ্য আলিমের শরণাপন্ন হওয়া।
হাদীস শরীফে এসেছে :
إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا.
আল্লাহ এই উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর প্রারম্ভে সংস্কারক পাঠান। যিনি তাদের জন্য দীনকে সংস্কার করেন। ২৫১
কুরআন-হাদীসে এ বিষয়ে আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে।
তবে হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মান্য করার সম্ভাব্যতা নিয়ে হাদীস অস্বীকারকারীদের এ সকল প্রশ্ন উঠানোর মূল উদ্দীপক হচ্ছে, মুহাদ্দিসদের হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও নির্ভেজালভাবে তা সংরক্ষণের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা ও এক্ষেত্রে তাদের সফলতা অনুধাবনে ব্যর্থতা। শরীআত প্রতিপালনের মূলনীতি সম্পর্কেও তাদের অজ্ঞতা সুস্পষ্ট। এ সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা আমরা উপরে করে এসেছি। পাঠক, তবে বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে এ শাস্ত্রের কিতাবাদি শাস্ত্রজ্ঞ আলিমের তত্ত্বাবধানে যথারীতি অধ্যয়ন করতে হবে।
টিকাঃ
২৪৫. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬। আরো দেখুন: সূরা বাকারাহ, ২৩৩; সূরা আনআম, ১৫২; সূরা আ'রাফ, ৪২; সূরা মু'মিনূন, ৬২。
২৪৬. ইবন আদি, আল কামিল: ১/১০৩。
২৪৭. তারীখ দিমাশক: ৭/১২৭。
২৪৮. ইবন হিব্বান, সিকাত: ৯/২৬৩。
২৪৯. ইবনুল জাওযি, মাওযূআত: ১/৪৫-৪৬
২৫০. যাহাবি, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/২৮৬。
২৫১. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪২৯১; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৮৫৯২; বাইহাকি, মা'রিফাতুস সুনান : ১/২০৮। হাদীসটিকে আল্লামা ইরাকি (ফায়যুল খাতির: ২/২৮২) ইবন হাজার (তাওয়ালিত তা'সীস, পৃ. ৪৯), সাখাবি (আল মাকাসিদুল হাসানাহ : ২৩৮), ইবনুদ দাইবা' রহ. (তাময়ীযুত তয়্যিব, পৃ. ৩৮)-সহ আরো অনেকে প্রমাণিত বলেছেন。