📄 হাদীস মানা কুরআনের পরিপূর্ণতাকে অস্বীকার করা
এ দাবিটিও সঠিক নয়। হাদীস মান্য করা বরং আল কুরআনের সম্পূর্ণতার পরিচায়ক। কেননা হাদীস মান্য করা হয় আল কুরআনেরই নির্দেশের আলোকে। যেমন ধরুন, কোনো কওমের নেতা তার কোনো নিকটতম ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করে রেখে মাস খানেকের জন্য বাইরের গেলেন। এবং এ প্রতিনিধিকে প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা দিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে জাতির উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি এ এক মাসে তাদের করণীয় বলে গেলেন। তিনি তার সে বক্তব্যে এ কথাও বললেন যে, আমার অবর্তমানে তোমরা সকল কর্ম করবে এ ব্যক্তির নেতৃত্বে ও নির্দেশনায়। আমি তাকে প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা দিয়ে গেলাম। এই প্রতিনিধি যদি নেতার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে জাতিকে পরিচালনা করেন তবে নিশ্চয় তার নির্দেশনা মেনে চলা জাতির জন্য নেতাকে অমান্য করা বা তার বক্তব্যকে অসম্পূর্ণ আখ্যায়িত করা বলে গণ্য হবে না। বরং তাকে মান্য না করাই নেতা ও তার বক্তব্যকে অমান্য করা বলে গণ্য হবে।
হাদীস অস্বীকারকারীরা তো অবশ্যই কুরআনের অনুবাদ প্রচার করেন এবং তা পড়তে সর্বসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন। কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে এবং কুরআনের অতিরিক্ত কোনো বক্তব্য হাদীস হিসাবে মানা যাবে না বলে প্রচার করেন। তাদের এ দাবি কুরআনেই আছে বলে দাবি করে কুরআনের কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে এ সকল আয়াত দ্বারা কীভাবে তাদের দাবি প্রমাণ হয় তা বোঝানোর জন্য আয়াতগুলোর লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী তো তাদের এ সকল কর্মও কুরআনকে কার্যত অসম্পূর্ণ দাবি করার শামিল।
মহান আল্লাহ আল কুরআনে বারবার বলেছেন যে, তিনি আরবি কুরআন নাযিল করেছেন। এবং তার কারণ হিসাবে বলেছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُوْنَ.
“নিশ্চয় আমি কিতাবকে আরবি কুরআনরূপে নাযিল করেছি; যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।”২৩৬
এই আয়াতের তো সরল মর্ম এই যে, কুরআন আরবি আর কুরআন এভাবে এজন্য অবতীর্ণ যে, যেন মানুষ তা বুঝতে পারে। এবং এই কুরআনই বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত বা পথনির্দেশ। সুতরাং কুরআনের অনুবাদ করা, তা প্রচার ও পড়তে উদ্বুদ্ধ করা, কুরআনই যথেষ্ট, এর বাইরে কিছু মানা যাবে না-কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে তা দ্বারা এই দাবি প্রমাণের জন্য লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা প্রদান করা, এসব কি কুরআনের অনুধাবনযোগ্য, সম্পূর্ণ ও সুস্পষ্ট হওয়াকে অস্বীকার করা বলে গণ্য হবে না? হাদীস মানলে যদি এগুলোকে অস্বীকার করা হয়, তবে তাদের কর্মের ব্যাপারে কেন একই বক্তব্য প্রযোজ্য হবে না?
টিকাঃ
২৩৬. সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ০২।
📄 সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে আল কুরআন
সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে আল কুরআন—বহুল উচ্চারিত ও জনপ্রিয় একটি বাক্য। সব সমস্যার সমাধান যদি কুরআনই দিতে পারে তাহলে আর হাদীস মানতে হবে কেন? উপরে আমরা এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে এসেছি। এখানে আমরা এ বাক্যটিকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় আনতে চাই।
জুমহুর উম্মাহ যদিও হাদীসকে ওহি হিসাবে বিশ্বাস করে এবং শরয়ি বিধিবিধান প্রমাণের অন্যতম দলীল হিসাবে মান্য করে, কিন্তু মুসলিম দাবিদার কিছু মানুষ নানাভাবে হাদীস অস্বীকার করে থাকে। এই মতভিন্নতাকে আমরা একটি সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করে সব সমস্যার সমাধানকারী মহাগ্রন্থ আল কুরআনের কাছে সমাধান চেয়ে দেখতে পারি, কী সমাধান দেয়।
আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, আল কুরআন তার বহুসংখ্যক আয়াতে সমাধান জানিয়েছে যে, আল কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে এবং কুরআনের অতিরিক্ত বিধান-সংবলিত অনেক ওহি মহান আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং তা মান্য করা মানব জাতির উপর আবশ্যক করে দিয়েছেন।
📄 আহসানাল হাদীস : লাহওয়াল হাদীস
হাদীস শব্দের অর্থ কথা, বর্ণনা, আলোচনা, কথোপকথন, কাহিনি, সংবাদ, নতুন, আধুনিক ইত্যাদি। আল কুরআনে শব্দটি বিশেরও অধিক স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:
اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ كِتَابًا مُتَشَابِهَا مَّثَانِي.
“আল্লাহ উত্তম কথা তথা বারবার পঠিত সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্রন্থ নাযিল করেছেন।”২৩৭
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهُوَ الْحَدِيْثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ.
"একশ্রেণির লোক আছে যারা অনর্থক কথাবার্তা ক্রয় করে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য।"২৩৮
আয়াত দুটিতে 'হাদীস' শব্দের উল্লেখ আছে। এদিকে ইঙ্গিত করে হাদীস অস্বীকারকারী কোনো কোনো ব্যক্তি বলেন, আমরা কুরআনে দুই ধরনের হাদীসের কথা পাই। একটা (أَحْسَنَ الْحَدِيثِ) আহসানাল হাদীস, আরেকটি (لَهْوَ الْحَدِيثِ) লাহওয়াল হাদীস। আহসানাল হাদীস বা উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন, আর লাহওয়াল হাদীস বা অনর্থক কথা হচ্ছে বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য ইমাম কর্তৃক সংকলিত হাদীস।
এ ধরনের কথা শুধু ওই ব্যক্তির মুখ থেকেই বের হতে পারে, অনূদিত আর হরকত সংযুক্ত কুরআন পড়তে পারাই যার গবেষণার একমাত্র যোগ্যতা। এইসব ব্যক্তিবর্গের হয়তো জানা নেই যে, আল কুরআনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকেও হাদীস বলা হয়েছে। নবীজি উম্মাত-জননী হাফসা (রা.)-কে একটি গোপন কথা জানিয়ে গোপন রাখতে বলেন। কিন্তু তিনি অন্যকে বলে ফেলেন। বিষয়টি আল কুরআনে আলোচিত হয়েছে এবং সেখানে নবীজির কথাকে হাদীস শব্দে ব্যক্ত করে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذْ أَسَنَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا.
"নবী যখন তাঁর জনৈক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বললেন।”২৩৯
পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, সূরা আল ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের উপর তাঁর একটি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে তিনি তাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে শোনান, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। অর্থাৎ উম্মাতকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাসূল প্রেরণ করা আল্লাহর একটি অনুগ্রহ। অন্য আয়াতে তিনি রাসূলকে তাঁর অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সে আয়াতে তিনি 'হাদীস' শব্দের ধাতুমূল থেকে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে বলেছেন:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثُ.
"আর আপনি আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বর্ণনা করুন। "২৪০
আমরা আগেই জেনেছি, কথা, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিতাব ও হিকমতের যে শিক্ষা তাঁর উম্মাতকে দান করেছেন ইসলামের পরিভাষায় তাকেই হাদীস বা সুন্নাহ বলে। আল কুরআনের ভাষায় এটা মুমিনদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ। আমরা দেখতে পেলাম, নবীজি কর্তৃক এই অনুগ্রহের বর্ণনাকেও কুরআন মাজীদ হাদীস শব্দেই উল্লেখ করেছে।
কোনো মুমিনের কি এই দুঃসাহস হতে পারে যে, সে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে লাহওয়াল হাদীস বা অনর্থক কথা বলবে, বিশেষ করে যখন তা দীন-শরীআত সম্পর্কে হয়, যখন তা মহান আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র ওহিরই একটি প্রকার?
যদি বলা হয়, কুরআন কারীমে কুরআন ও হাদীস উভয়কেই যদি হাদীস বলা হয়ে থাকে তবে আমরা শুধু হাদীসকেই কেন হাদীস বলে থাকি? এটা এত স্বাভাবিক বিষয় যে, এ নিয়ে আসলে কোনো প্রশ্ন হয় না। একটি শব্দের যদি আভিধানিক বা রূপকভাবে একাধিক অর্থে ব্যবহার থাকে, তবে তার ভেতর থেকে কোনো একটি বিশেষ অর্থে প্রসিদ্ধ হয়ে যাওয়া বা কোনো বিশেষ শাস্ত্রে কোনো বিশেষ অর্থে পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া, যখন ওই শব্দটি সাধারণভাবে উচ্চারিত হলে মানুষ সাধারণত ওই বিশেষ অর্থটিই বুঝবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।
যেমন 'সালাত' )صَلَاةَ( শব্দটি আল কুরআনে দরূদ, দুআ, ইস্তিগফার, রহমত, উপাসনালয়, বান্দার প্রশংসা, কুরআন পাঠ, বিশেষ ইবাদত ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ২৪১ কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় বিশেষ ইবাদত নামায অর্থে শব্দটি এমন প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, এখন সালাত উচ্চারণমাত্রই আমরা নামাযকেই বুঝি। জ্ঞানচর্চার অঙ্গনে এটা খুবই স্বভাবিক ও সুপরিজ্ঞাত বিষয়। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠানো অবান্তর।
টিকাঃ
২৩৭. সূরা [৩৯] যুমার, আয়াত : ২৩。
২৩৮. সূরা [৩১] লুকমান, আয়াত: ০৬。
২৩৯. সূরা [৬৬] তাহরীম, আয়াত: ০৩。
২৪০. সূরা (৯৩) দুহা, আয়াত: ১১。
২৪১. সূরা বাকারাহ, ৪৩, ১৫৩ ও ১৫৭; তাওবাহ, ১০৩; ইসরা', ১১০; হাজ্জ, ৪০; আহযাব, ৪৩ ও ৫৬; তাফসীর ইবন কাসীর, ৬/৪৩৬。
📄 হাদীসের নামে অশ্লীল কিচ্ছা-কাহিনি
হাদীসের কিতাবে হাদীস নামে সংকলিত, এমনকি মুহাদ্দিসদের নিকট সহীহ হিসাবে স্বীকৃত অনেক বর্ণনা অশ্লীলতায় ভরপুর। এমন অশ্লীল কিচ্ছা-কাহিনি ওহি তো দূরের কথা, নবীজির নিজের বাণীও হতে পারে না—এ দাবি হাদীস অস্বীকারকারী অনেকের।
নারীদেহ ও নারী-পুরুষের যৌন ক্রিয়াকলাপের উন্মুক্ত প্রদর্শন ও রগরগে বিবরণকে অশ্লীলতা বলা হয়। তবে মানুষ মানেই যেমন নারী আর পুরুষ, তেমনি মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য নারী-পুরুষের অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার বন্ধ করা এবং বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত যৌনক্রিয়া অপরিহার্য। তাই নারীদেহ ও নারী-পুরুষের যৌনক্রিয়ার অবাধ প্রদর্শন ও রগরগে বর্ণনা যেমন বন্ধ করা দরকার তেমনি এ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় আলোচনা শালীনভাবে জারি রাখাও অতিশয় দরকারি। এ কথা মানুষ মাত্রেই বোঝে, এজন্য যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই।
শুধু হাদীস শরীফ কেন, এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রিত আলোচনা স্বয়ং আল কুরআনেই বিদ্যমান। বেহেশতি হুরদের দেহকাঠমোর বর্ণনা, ঋতুমতী নারীর বিধানসহ এ বিষয়ক অনেক কথা আল কুরআনে আলোচিত হয়েছে।