📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 কুরআন ব্যাখ্যায় কুরআনই যথেষ্ট

📄 কুরআন ব্যাখ্যায় কুরআনই যথেষ্ট


তারা এ কথাও বলেন যে, কুরআনের কোনো আয়াত যদি উদ্দিষ্ট বিষয়ে অসম্পূর্ণ বা অস্পষ্টও হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট সকল আয়াত একত্র করলে পুরো বিষয়টি পুরোপুরি পরিস্ফুট হয়ে যাবে, কোনো অস্পষ্টতা ও অসম্পূর্ণতা থাকবে না। তাই কুরআন ব্যাখ্যার জন্য কুরআনই যথেষ্ট, হাদীস বা অন্য কিছুর কোনো প্রয়োজন নেই।
কুরআন বুঝতে হাদীসের প্রয়োজন নেই, তাদের এ দাবি কুরআন-বিরোধী, পূর্বের আলোচনায় আমরা তা দেখে এসেছি। তাছাড়া কুরআনের এক অংশ অপর অংশের যে ব্যাখ্যা করে তা বুঝতেও উম্মাত নববি দিকনির্দেশনা থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী নয়। কুরআন নাযিলের যুগে সাহাবিদেরকেও এক্ষেত্রে নববি নির্দেশনার সাহায্য নিতে হয়েছে। আমরা একটি দৃষ্টান্ত দেখি।
মহান আল্লাহ সূরা আনআমের ৮২ নং আয়াতে বলেন:
ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَلَمْ يَلْبِسُوٓا۟ إِيمَـٰنَهُم بِظُلْمٍ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
“যারা ঈমান আনল আর নিজেদের ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশ্রিত করল না, তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা; আর তারাই সুপথপ্রাপ্ত।"
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, এ আয়াতটি যখন নাযিল হলো, এর বিষয়বস্তু সাহাবিদের নিকট অত্যন্ত কঠিন বলে অনুভূত হলো এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তাঁরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্যে কে আর এমন আছে যে ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশ্রিত করেনি! তখন নবীজি বলেন:
لَيْسَ ذَٰلِكَ [ٱلَّذِى تَعْنُونَ] إِنَّمَا هُوَ ٱلشِّرْكُ أَلَمْ تَسْمَعُوا۟ مَا قَالَ لُقْمَـٰنُ لِٱبْنِهِۦ وَهُوَ يَعِظُهُۥ يَـٰبُنَىَّ لَا تُشْرِكْ بِٱللَّهِ إِنَّ ٱلشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
তোমরা যেমন বুঝছ বিষয়টি তা নয়। এখানে জুলুম হচ্ছে শিরক। তোমরা কি আল কুরআনের ওই বক্তব্য শোনোনি, লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে যা বলেছিলেন, হে বৎস, তুমি আল্লাহর সাথে শিরক করবে না। নিশ্চয় শিরক ভয়ংকর জুলুম। ২২৪
ভাষা পরিবর্তনশীল। একই ভাষার পাঁচশত বছর বা হাজার বছর আগের রূপ আর পরের রূপ এক হয় না। তাই কোনো ভাষায় কথন বা লেখনের মাধ্যমে প্রদত্ত কোনো বক্তব্য সমকালের মানুষের জন্য বোঝা যতটা সহজ, শত বছর বা হাজার বছর পরের মানুষের জন্য ততটা সহজ নয়। বরং দূর অতীতের বক্তব্য বোঝার জন্য সাধারণতই বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয়।
যদিও কুরআন-হাদীসের অনুশাসনের কারণে আরবি ভাষার পরিবর্তনের গতি শ্লথ, তবুও একেবারে অপরিবর্তনীয় নয়। কুরআন নাযিলের যুগের আরবি ভাষা আর আজকের আরবি ভাষা হুবহু এক নয়। তাহলে কুরআন নাযিলের যুগের মানুষদের জন্যই যখন কুরআন দ্বারা যতটুকু কুরআনের ব্যাখ্যা হয় তা বুঝতেও নববি নির্দেশনার প্রয়োজন হয়েছে, এ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা মানতে বাধ্য হই যে, এ যুগের আনারব তো বটেই, আরবরাও কুরআন বুঝতে নববি ব্যাখ্যার অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। তাদের এই মুখাপেক্ষিতা সে যুগের আরবদের থেকে অনেক বেশি।

টিকাঃ
২২৪. সূরা [৩১] লুকমান, আয়াত: ১৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৩৫৮৯; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৩৪২৯, ৪৭৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৪; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩০৬৭。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 আল্লাহ্ই একমাত্র বিধানদাতা

📄 আল্লাহ্ই একমাত্র বিধানদাতা


আমরা আল্লাহর বান্দা। কেবল মহান আল্লাহরই অধিকার আছে আমাদের উপর বিধান দেওয়ার এবং আমরাও একমাত্র তাঁরই বিধান মানতে বাধ্য। অন্য কেউ আমাদের উপর বিধান দিতে পারে না এবং আমরা অন্য কারো বিধান মানতেও পারি না। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلهِ.
“বিধান শুধুই আল্লাহর।”২২৫
মহান আল্লাহ আমাদের জন্য ওহির মাধ্যমে বিধান দিয়েছেন। তা আল কুরআনে সংকলিত রয়েছে। আল কুরআনে সকল কিছুর বিধান বর্ণিত হয়েছে সুস্পষ্টভাবে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ .
“আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি, যা সকল বিষয় সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে।”২২৬
তিনি আরো বলেছেন:
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ .
"আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বর্ণনা করতে বাদ রাখিনি।"২২৭
এর ভিত্তিতে হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, সুতরাং কুরআন ছাড়া আমরা আর কিছুই মানতে পারি না। আর তার প্রয়োজনও নেই। কেননা কুরআন পরিপূর্ণ ও যথেষ্ট। এখন কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর দিকে হাত বাড়ানোর অর্থই হচ্ছে, কুরআনের পরিপূর্ণতাকে অস্বীকার করা এবং মহান আল্লাহ ছাড়াও অন্য কেউ বিধানদাতা আছে বলে স্বীকার করা।
প্রিয় পাঠক, আপনারা পূর্বের আলোচনায় দেখেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীআত ও আখিরাত সম্পর্কে যা-কিছু বলেছেন সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির মাধ্যমে বলেছেন। তা কুরআনে সংকলিত হোক বা না হোক। নিজের মনগড়া কিছুই বলেননি। আল কুরআনে মহান আল্লাহ নিজেই এ কথা সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى.
“এবং তিনি প্রেরিত ওহি ছাড়া প্রবৃত্তি থেকে কথা বলেন না।”২২৮
হাদীস শরীফে এসেছে, তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় কিছু মানুষকে খেজুরের পরাগায়ন করতে দেখে বলেন, আমার মনে হয় না এতে কোনো উপকার হবে। লোকেরা এ কথা জানতে পেরে পরাগায়ন ছেড়ে দেয়। ফলে খেজুরের ফলন কমে যায়। তিনি এ বিষয়টি জানতে পেরে বলেন:
إِنْ كَانَ يَنْفَعُهُمْ ذُلِكَ فَلْيَصْنَعُوْهُ فَإِنِّي إِنَّمَا ظَنَنْتُ ظَنَّا فَلَا تُؤَاخِذُوْنِي بِالظَّنَّ وَلَكِنْ إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنِ اللَّهِ شَيْئًا فَخُذُوا بِهِ فَإِنِّي لَنْ أَكْذِبَ عَلَى اللهِ.
যদি এ কর্মে তাদের উপকার হয় তবে তারা তা করবে। আমি তো ধারণা ব্যক্ত করেছি মাত্র। তোমরা আমার ধারণা গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলব তা গ্রহণ করবে। কেননা আমি আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করি না। ২২৯
হাদীসটির অন্য বর্ণনায় রয়েছে, নবীজি বলেন :
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ دِينِكُمْ فَخُذُوْا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْنِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ.
আমি একজন মানুষ মাত্র। যখন আমি তোমাদের দীনের কোনো বিষয়ে আদেশ করি তোমরা তা গ্রহণ করবে। আর যদি আমার কোনো ধারণা ব্যক্ত করি তবে আমি তো একজন মানুষ মাত্র। ২৩০
আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় হাদীসটিতে নবীজি বলেন :
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِمَا يَصْلُحُكُمْ فِي دُنْيَاكُمْ فَأَمَّا أَمْرُ أُخِرَتِكُمْ فَإِلَيَّ.
দুনিয়াবি কল্যাণকর বিষয়ে তোমরা অধিক জ্ঞাত। তবে তোমাদের আখিরাতের বিষয় আমার উপরেই ন্যস্ত থাকবে। ২৩১
যেহেতু প্রমাণিত হচ্ছে, আল্লাহর দীন সম্পর্কে, শরীআত ও আখিরাত সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মনগড়া কিছুই বলেননি; বরং যা বলেছেন ওহির মাধ্যমেই বলেছেন। সুতরাং এ কথা কিছুতেই বলা যায় না যে, হাদীস মান্য করা মানে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো বিধান মানা; বরং হাদীসও যেহেতু অবতীর্ণ ওহি সুতরাং হাদীস মানা মানে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করা এবং রাসূলের আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর নেওয়া পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া।

টিকাঃ
২২৫. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৫৭; সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ৪০ ও ৬৭。
২২৬. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৮৯。
২২৭. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৩৮。
২২৮. সূরা [৫৩] নাজম, আয়াত: ৩ ও ৪。
২২৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৬১。
২৩০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৬২。
২৩১. মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ৬৯৯২。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 আল কুরআনে সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা

📄 আল কুরআনে সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা


আর মহান আল্লাহ যে আল কুরআনে কোনো কিছুই বাদ রাখেননি, সকল কিছুই সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন, এখানে 'সকল কিছু' যে সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত নয়; বরং বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত তা সাধারণ দৃষ্টিতেই বোধগম্য হয়। কেননা আমরা খোলা চোখেই দেখতে পাই, আল কুরআনে দীন-দুনিয়ার 'সকল কিছু'র বর্ণনা নেই, সুস্পষ্ট বিস্তারিত তো দূরের কথা, সংক্ষিপ্ত অস্পষ্ট বর্ণনাও নেই।
যে বিশেষ অর্থে আয়াতে কারীমায় 'সকল কিছু' (كُلِّ شَيْءٍ) শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে এই অর্থও প্রবিষ্ট রয়েছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস মান্য করতে হবে। কেননা পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে এবং কুরআনের অতিরিক্ত বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর নবীর কাছে ওহি নাযিল করেছেন এবং সে ওহি মান্য করার সুস্পষ্ট নির্দেশনাও কুরআন কারীমে রয়েছে। অর্থাৎ 'সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা'র মধ্যে হাদীস মান্য করার নির্দেশ-সংবলিত সুস্পষ্ট বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারি (রাহ.) [৫৩৮ হি.] বলেন:
الْمَعْنَى أَنَّهُ بَيَّنَ كُلَّ شَيْءٍ مِنْ أُمُورِ الدِّيْنِ حَيْثُ كَانَ نَضًا عَلَى بَعْضِهَا وَإِحَالَةٌ عَلَى السُّنَّةِ حَيْثُ أَمَرَ فِيْهِ بِاتِّبَاعِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَطَاعَتِهِ وَقِيلَ: وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى. وَحَقًّا عَلَى الْإِجْمَاعِ فِي قَوْلِهِ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ وَقَدْ رَضِيَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأُمَّتِهِ اتَّبَاعَ أَصْحَابِهِ وَالْاِقْتِدَاءَ بِآثَارِهِمْ فِي قَوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَصْحَابِي كَالنُّجُوْمِ بِأَيِّهِمِ اقْتَدَيْتُمْ اهْتَدَيْتُمْ وَقَدِ اجْتَهَدُوْا وَقَاسُوا وَوَطَنُوْا طُرُقَ الْقِيَاسِ وَالْاِجْتِهَادِ فَكَانَتِ السُّنَّةُ وَالْإِجْمَاعُ وَالْقِيَاسُ وَالْاِجْتِهَادُ مُسْتَنِدَةً إِلَى تِبْيَانِ الْكِتَابِ فَمِنْ ثَمَّ كَانَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ.
আল কুরআন সকল কিছুর বর্ণনা-এ কথার অর্থ হচ্ছে, কুরআন দীনি বিষয়ে সকল কিছু বর্ণনা করেছে। তা এভাবে যে, কিছু বিষয় সুস্পষ্ট করে সরাসরি বর্ণনা করেছে আর কিছু কিছু বিষয় হাদীসের উপর হাওলা করে
এই বলে আদেশ করেছে যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণ করো, আর বলেছে, 'তিনি নিজ প্রবৃত্তি থেকে কিছুই বলেন না'। আর কুরআন এই বলে ইজমা'র প্রতি উৎসাহিত করেছে যে, 'যে ব্যক্তি মুমিনদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অবলম্বন করে....' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কথা বলে উম্মাতকে তাঁর সাহাবিদের পথ-পন্থার অনুসরণ-অনুকরণ করতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যে, 'আমার সাহাবিগণ নক্ষত্রতুল্য। তোমরা তাদের যে কাউকে অনুসরণ করবে সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে। '২৩২ সাহাবিগণ ইজতিহাদ ও কিয়াস করেছেন এবং কিয়াস ও ইজতিহাদের বিভিন্ন পথ সুগম করেছেন। সুতরাং হাদীস, ইজমা', কিয়াস ও ইজতিহাদ কুরআনের বর্ণনার সাথেই সম্পৃক্ত। আর এ পদ্ধতিতেই কুরআন সকল কিছু সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে। ২৩৩
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন আলী শাওকানি (রাহ.) [১২৫০ হি.] বলেন:
وَمَعْنَى كَوْنِهِ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ أَنَّ فِيْهِ الْبَيَانَ لِكَثِيرٍ مِّنَ الْأَحْكَامِ وَالْإِحَالَةُ فِيْمَا بَقِيَ مِنْهَا عَلَى السُّنَّةِ وَأَمَرَهُمْ بِاتِّبَاعِ رَسُوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا يَأْتِي بِهِ مِنَ الْأَحْكَامِ وَطَاعَتِهِ كَمَا فِي الْآيَاتِ الْقُرْآنِيَّةِ الدَّالَّةِ عَلَى ذَلِكَ وَقَدْ صَحَ عَنْهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنِّي أُوْتِيْتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ.
কুরআন সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা-এ কথার অর্থ হচ্ছে, তাতে অনেক বিধিবিধানের বর্ণনা রয়েছে। আর অবশিষ্ট বিধানের জন্য হাদীসের হাওলা করেছে। এবং রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তার আনুগত্য ও অনুকরণ-অনুসরণের আদেশ করেছে। যেমনটি আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আর বিশুদ্ধ সনদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বক্তব্যও বর্ণিত হয়েছে যে, আমাকে কুরআন ও তার সমপরিমাণ ওহি দান করা হয়েছে। ২৩৪
আমরা এখানে সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে শুধু দুইজন সর্বসম্মত কুরআন বিশারদের বক্তব্য উল্লেখ করলাম। অন্যথায় এই আয়াত নিয়ে যুগ যুগ ধরে গ্রহণযোগ্য সকল কুরআন বিশারদের বক্তব্য এমনই।
একবার এক তালিবুল ইলমকে দেখে এক লোক ডেকে বলে, তোমরা তো বলো যে, কুরআনে সকল সমস্যার সমাধান আছে। ছেলেটি বলে, অবশ্যই বলি, পরিপূর্ণ বিশ্বাস থেকেই বলি। তখন পাশ দিয়ে ঝুড়ি মাথায় এক লোক যাচ্ছিল। লোকটি বলল, কুরআন থেকে জবাব দাও তো ওই লোকটির ঝুড়িতে কী আছে? ছেলেটি ঝুড়িওয়ালাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়ে বলে, ওর মাথার ঝুড়িতে আম আছে। লোকটি বলল, এ কেমন কথা! তোমাকে তো কুরআন থেকে জবাব দিতে বললাম। ছেলেটি বলল, জি, আমি কুরআন থেকেই বলেছি, কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে বলেছি। আল কুরআনে আছে, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْكُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ.
"তোমাদের যদি জানা না থাকে তবে যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে নাও।”২৩৫
সালাত, যাকাত, হজ্জ, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদত যেমন কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের আলোকে ফরয, তেমনি কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের আলোকেই হাদীস মান্য করাও ফরয। আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াত দ্বারা বিষয়টি সাব্যস্ত।

টিকাঃ
২৩২. হাদীসটির সনদ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এ বিষয়ের সমর্থক দলীল হিসাবে কুরআন-হাদীসে অসংখ্য বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।
২৩৩. যামাখশারি, আল কাশশাফ: ২/৬২৮。
২৩৪. শাওকানি, ফাতহুল কাদীর: ৩/২২৪。
২৩৫. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৪৩; সূরা [২১] আম্বিয়া, আয়াত: ০৭।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস মানা কুরআনের পরিপূর্ণতাকে অস্বীকার করা

📄 হাদীস মানা কুরআনের পরিপূর্ণতাকে অস্বীকার করা


এ দাবিটিও সঠিক নয়। হাদীস মান্য করা বরং আল কুরআনের সম্পূর্ণতার পরিচায়ক। কেননা হাদীস মান্য করা হয় আল কুরআনেরই নির্দেশের আলোকে। যেমন ধরুন, কোনো কওমের নেতা তার কোনো নিকটতম ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করে রেখে মাস খানেকের জন্য বাইরের গেলেন। এবং এ প্রতিনিধিকে প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা দিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে জাতির উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি এ এক মাসে তাদের করণীয় বলে গেলেন। তিনি তার সে বক্তব্যে এ কথাও বললেন যে, আমার অবর্তমানে তোমরা সকল কর্ম করবে এ ব্যক্তির নেতৃত্বে ও নির্দেশনায়। আমি তাকে প্রয়োজনীয় সকল নির্দেশনা দিয়ে গেলাম। এই প্রতিনিধি যদি নেতার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে জাতিকে পরিচালনা করেন তবে নিশ্চয় তার নির্দেশনা মেনে চলা জাতির জন্য নেতাকে অমান্য করা বা তার বক্তব্যকে অসম্পূর্ণ আখ্যায়িত করা বলে গণ্য হবে না। বরং তাকে মান্য না করাই নেতা ও তার বক্তব্যকে অমান্য করা বলে গণ্য হবে।
হাদীস অস্বীকারকারীরা তো অবশ্যই কুরআনের অনুবাদ প্রচার করেন এবং তা পড়তে সর্বসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন। কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে এবং কুরআনের অতিরিক্ত কোনো বক্তব্য হাদীস হিসাবে মানা যাবে না বলে প্রচার করেন। তাদের এ দাবি কুরআনেই আছে বলে দাবি করে কুরআনের কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে এ সকল আয়াত দ্বারা কীভাবে তাদের দাবি প্রমাণ হয় তা বোঝানোর জন্য আয়াতগুলোর লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী তো তাদের এ সকল কর্মও কুরআনকে কার্যত অসম্পূর্ণ দাবি করার শামিল।
মহান আল্লাহ আল কুরআনে বারবার বলেছেন যে, তিনি আরবি কুরআন নাযিল করেছেন। এবং তার কারণ হিসাবে বলেছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُوْنَ.
“নিশ্চয় আমি কিতাবকে আরবি কুরআনরূপে নাযিল করেছি; যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।”২৩৬
এই আয়াতের তো সরল মর্ম এই যে, কুরআন আরবি আর কুরআন এভাবে এজন্য অবতীর্ণ যে, যেন মানুষ তা বুঝতে পারে। এবং এই কুরআনই বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত বা পথনির্দেশ। সুতরাং কুরআনের অনুবাদ করা, তা প্রচার ও পড়তে উদ্বুদ্ধ করা, কুরআনই যথেষ্ট, এর বাইরে কিছু মানা যাবে না-কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে তা দ্বারা এই দাবি প্রমাণের জন্য লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা প্রদান করা, এসব কি কুরআনের অনুধাবনযোগ্য, সম্পূর্ণ ও সুস্পষ্ট হওয়াকে অস্বীকার করা বলে গণ্য হবে না? হাদীস মানলে যদি এগুলোকে অস্বীকার করা হয়, তবে তাদের কর্মের ব্যাপারে কেন একই বক্তব্য প্রযোজ্য হবে না?

টিকাঃ
২৩৬. সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ০২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00