📄 আল্লাহ্ কুরআনকে সহজ করেছেন
কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বলেছেন :
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ.
“আর আমি উপদেশ গ্রহণের জন্য কুরআনকে সহজ করেছি।
সুতরাং আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী?”২২১
এ আয়াত পেশ করে হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, আল্লাহ যেহেতু কুরআনকে সহজ করেছেন সুতরাং কুরআন বোঝার জন্য কারো কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, এ কথা বলে তারা মূলত ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে না; বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা বা হাদীসকে অস্বীকার করে নিজেদের মনমতো ব্যাখ্যা করতে চায়।
উপরন্তু তাদের এ দাবি নানা কারণে সঠিক নয়। আল্লাহ এ আয়াতে বলেছেন, তিনি কুরআনকে সহজ করেছেন। কিন্তু এখানে ব্যাপক ও সাধারণ অর্থে সমগ্র কুরআন উদ্দেশ্য নয়। কেননা কুরআন অন্যত্র সুস্পষ্ট করে বলেছে, কুরআনের একটি বড় অংশের মর্ম আল্লাহ ছাড়া কেউ বুঝবে না। মহান আল্লাহ বলেন:
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُوْنَ فِي الْعِلْمِ يَقُوْلُوْنَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ .
“তিনি আপনার নিকট কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত সুস্পষ্ট, এগুলোই কিতাবের মূল অংশ। আর অন্যগুলো দ্ব্যর্থবোধক। যাদের অন্তরে বক্রতা আছে তারা ফিতনা ও অপব্যাখ্যার মানসে দ্ব্যর্থবোধক বিষয়ের পিছনে পড়ে। তবে সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা সুগভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী তারা বলে, আমরা তার প্রতি ঈমান আনলাম। সবকিছু আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। কেবল বোধের অধিকারীগণই উপদেশ গ্রহণ করে।”২২২
তাছাড়া আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, তিনি কুরআনকে সহজ করেছেন। কিন্তু এ কথা বলা হয়নি যে, তার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। এটা তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা। তাদের এ ব্যাখ্যা মূলত কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য।
এ গ্রন্থের শুরুর দিকের আলোচনায় আমরা দেখেছি, আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াতে কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এবং সে ব্যাখ্যার দায়িত্ব যে আল্লাহর রাসূলের উপর তাও সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। এ আয়াতের সাথে ওই আয়াতগুলোর কোনো বিরোধও নেই। প্রথমত, এ আয়াতে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, আয়াতটিতে প্রযুক্ত (الذَّكْرِ) ‘উপদেশ’ শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দুটি বিষয় লক্ষ করুন।
১. আল কুরআনের আলোচ্য বিষয় মোটা দাগে দুইভাগে বিভক্ত। এক, উপদেশমূলক বিষয়াদি; দ্বিতীয়ত, বিধিবিধান ও আইন-আহকাম জাতীয় বিষয়। আয়াতে কারীমায় الذَّكْرِ বা ‘উপদেশ’ শব্দ উল্লেখ করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সহজতার বিষয়টি মূলত উপদেশমূলক বিষয়াদির সাথে সম্পৃক্ত। তাছাড়া আইনগত জটিল বিষয়াদির সাথে সহজতার বিষয়টি সাধারণভাবে প্রযোজ্য নয়।
২. এ আয়াতে মহান আল্লাহ الذَّكْرِ বা ‘উপদেশ’ শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, ‘আমি الذَّكْرِ বা উপদেশ গ্রহণের জন্য কুরআনকে সহজ করেছি’। ঠিক একই শব্দ উল্লেখ করে অন্য আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেছেন, আপনি এই الذَّكْرِ বা ‘উপদেশগ্রন্থ’কে মানুষের জন্য ব্যাখ্যা করবেন। ইরশাদ হয়েছে:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ.
“আমি আপনার নিকট الذَّكْرِ বা ‘উপদেশগ্রন্থ’ নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করেন, যা তাদের নিকট নাযিল করা হয়েছে; এবং যাতে তারা চিন্তা-ফিকির করতে পারে।”২২৩
প্রথম আয়াতে যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, الذّكْرِ বা উপদেশের জন্য আমি কুরআনকে সহজ করেছি, তেমনি এ আয়াতে বলেছেন الذِّكْرِ বা উপদেশেরও নববি ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এরপর তিনি বলেছেন, 'যাতে তারা চিন্তা-ফিকির করতে পারে'। অর্থাৎ পরবর্তীদের কুরআন নিয়ে চিন্তা-ফিকির হতে হবে নববি ব্যাখ্যার আলোকে—আইন-আহকামের বিষয়াদিতে তো বটেই; এমনকি উপদেশ বা নসীহাহ-মূলক বিষয়েও।
কোনো বিষয় সহজ হলেই যে তার আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না, এ কথা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয়। সহজ বিষয়েরও যে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় তা আমরা গ্রন্থটির শুরুতে 'কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা' শিরোনামে আলোচনা করেছি।
শব্দের সর্বজনমান্য ও জ্ঞাত নিজস্ব কোনো স্থির অর্থ নেই। মূলত বক্তার অভিপ্রায়ই সব। বক্তার অভিপ্রায় নিখুঁতভাবে বুঝবার জন্য দরকার বক্তা ও শ্রোতার অভিজ্ঞতার সমতা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে থাকে অভিজ্ঞতার ভিন্নতা। তাই দেখা যায়, সারা জীবনের সঙ্গী-সহচররাও পরস্পরের সব কথা বুঝতে পারে না। যদিও সে তাদের মাঝে নিত্যদিন ব্যবহৃত আটপৌরে শব্দেই কথা বলে থাকে। একে অন্যের বক্তব্য শোনার সময় বারবার প্রশ্ন করে বুঝে নিতে হয়।
মহান আল্লাহ অনাদি অনন্ত অসীম। আর আমরা সকল দিক থেকেই সীমায় আবদ্ধ। সুতরাং আমরা যেমন তাঁর সকল সহজ কথাও অতিসহজেই বুঝতে পারব না, তেমনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে বুঝে নিতেও পারব না। তাহলে আমাদের কী হবে? আমাদের তো আল্লাহর বাণী নিখুঁতভাবে বোঝা এবং তার উপর আমল করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই!
আমাদের এই অসহায়ত্বের উপর মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকট একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদেরকে... কিতাব এবং হিকমত শিক্ষা দেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ ইলম ও হিকমতের মাধ্যমে আমাদেরকে আল্লাহর বাণীর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।
টিকাঃ
২২১. সূরা [৫৪] কামার, আয়াত: ১৭, ২২, ৩২ ও ৪০।
২২২. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ০৭।
২২৩. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৪৪।
📄 কুরআন ব্যাখ্যায় কুরআনই যথেষ্ট
তারা এ কথাও বলেন যে, কুরআনের কোনো আয়াত যদি উদ্দিষ্ট বিষয়ে অসম্পূর্ণ বা অস্পষ্টও হয়ে থাকে তবে সংশ্লিষ্ট সকল আয়াত একত্র করলে পুরো বিষয়টি পুরোপুরি পরিস্ফুট হয়ে যাবে, কোনো অস্পষ্টতা ও অসম্পূর্ণতা থাকবে না। তাই কুরআন ব্যাখ্যার জন্য কুরআনই যথেষ্ট, হাদীস বা অন্য কিছুর কোনো প্রয়োজন নেই।
কুরআন বুঝতে হাদীসের প্রয়োজন নেই, তাদের এ দাবি কুরআন-বিরোধী, পূর্বের আলোচনায় আমরা তা দেখে এসেছি। তাছাড়া কুরআনের এক অংশ অপর অংশের যে ব্যাখ্যা করে তা বুঝতেও উম্মাত নববি দিকনির্দেশনা থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী নয়। কুরআন নাযিলের যুগে সাহাবিদেরকেও এক্ষেত্রে নববি নির্দেশনার সাহায্য নিতে হয়েছে। আমরা একটি দৃষ্টান্ত দেখি।
মহান আল্লাহ সূরা আনআমের ৮২ নং আয়াতে বলেন:
ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَلَمْ يَلْبِسُوٓا۟ إِيمَـٰنَهُم بِظُلْمٍ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
“যারা ঈমান আনল আর নিজেদের ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশ্রিত করল না, তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা; আর তারাই সুপথপ্রাপ্ত।"
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, এ আয়াতটি যখন নাযিল হলো, এর বিষয়বস্তু সাহাবিদের নিকট অত্যন্ত কঠিন বলে অনুভূত হলো এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তাঁরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্যে কে আর এমন আছে যে ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশ্রিত করেনি! তখন নবীজি বলেন:
لَيْسَ ذَٰلِكَ [ٱلَّذِى تَعْنُونَ] إِنَّمَا هُوَ ٱلشِّرْكُ أَلَمْ تَسْمَعُوا۟ مَا قَالَ لُقْمَـٰنُ لِٱبْنِهِۦ وَهُوَ يَعِظُهُۥ يَـٰبُنَىَّ لَا تُشْرِكْ بِٱللَّهِ إِنَّ ٱلشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
তোমরা যেমন বুঝছ বিষয়টি তা নয়। এখানে জুলুম হচ্ছে শিরক। তোমরা কি আল কুরআনের ওই বক্তব্য শোনোনি, লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে যা বলেছিলেন, হে বৎস, তুমি আল্লাহর সাথে শিরক করবে না। নিশ্চয় শিরক ভয়ংকর জুলুম। ২২৪
ভাষা পরিবর্তনশীল। একই ভাষার পাঁচশত বছর বা হাজার বছর আগের রূপ আর পরের রূপ এক হয় না। তাই কোনো ভাষায় কথন বা লেখনের মাধ্যমে প্রদত্ত কোনো বক্তব্য সমকালের মানুষের জন্য বোঝা যতটা সহজ, শত বছর বা হাজার বছর পরের মানুষের জন্য ততটা সহজ নয়। বরং দূর অতীতের বক্তব্য বোঝার জন্য সাধারণতই বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দেয়।
যদিও কুরআন-হাদীসের অনুশাসনের কারণে আরবি ভাষার পরিবর্তনের গতি শ্লথ, তবুও একেবারে অপরিবর্তনীয় নয়। কুরআন নাযিলের যুগের আরবি ভাষা আর আজকের আরবি ভাষা হুবহু এক নয়। তাহলে কুরআন নাযিলের যুগের মানুষদের জন্যই যখন কুরআন দ্বারা যতটুকু কুরআনের ব্যাখ্যা হয় তা বুঝতেও নববি নির্দেশনার প্রয়োজন হয়েছে, এ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা মানতে বাধ্য হই যে, এ যুগের আনারব তো বটেই, আরবরাও কুরআন বুঝতে নববি ব্যাখ্যার অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। তাদের এই মুখাপেক্ষিতা সে যুগের আরবদের থেকে অনেক বেশি।
টিকাঃ
২২৪. সূরা [৩১] লুকমান, আয়াত: ১৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৩৫৮৯; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৩৪২৯, ৪৭৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৪; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩০৬৭。
📄 আল্লাহ্ই একমাত্র বিধানদাতা
আমরা আল্লাহর বান্দা। কেবল মহান আল্লাহরই অধিকার আছে আমাদের উপর বিধান দেওয়ার এবং আমরাও একমাত্র তাঁরই বিধান মানতে বাধ্য। অন্য কেউ আমাদের উপর বিধান দিতে পারে না এবং আমরা অন্য কারো বিধান মানতেও পারি না। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلهِ.
“বিধান শুধুই আল্লাহর।”২২৫
মহান আল্লাহ আমাদের জন্য ওহির মাধ্যমে বিধান দিয়েছেন। তা আল কুরআনে সংকলিত রয়েছে। আল কুরআনে সকল কিছুর বিধান বর্ণিত হয়েছে সুস্পষ্টভাবে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ .
“আমি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছি, যা সকল বিষয় সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে।”২২৬
তিনি আরো বলেছেন:
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ .
"আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বর্ণনা করতে বাদ রাখিনি।"২২৭
এর ভিত্তিতে হাদীস অস্বীকারকারীরা বলেন, সুতরাং কুরআন ছাড়া আমরা আর কিছুই মানতে পারি না। আর তার প্রয়োজনও নেই। কেননা কুরআন পরিপূর্ণ ও যথেষ্ট। এখন কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর দিকে হাত বাড়ানোর অর্থই হচ্ছে, কুরআনের পরিপূর্ণতাকে অস্বীকার করা এবং মহান আল্লাহ ছাড়াও অন্য কেউ বিধানদাতা আছে বলে স্বীকার করা।
প্রিয় পাঠক, আপনারা পূর্বের আলোচনায় দেখেছেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীআত ও আখিরাত সম্পর্কে যা-কিছু বলেছেন সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির মাধ্যমে বলেছেন। তা কুরআনে সংকলিত হোক বা না হোক। নিজের মনগড়া কিছুই বলেননি। আল কুরআনে মহান আল্লাহ নিজেই এ কথা সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى.
“এবং তিনি প্রেরিত ওহি ছাড়া প্রবৃত্তি থেকে কথা বলেন না।”২২৮
হাদীস শরীফে এসেছে, তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় কিছু মানুষকে খেজুরের পরাগায়ন করতে দেখে বলেন, আমার মনে হয় না এতে কোনো উপকার হবে। লোকেরা এ কথা জানতে পেরে পরাগায়ন ছেড়ে দেয়। ফলে খেজুরের ফলন কমে যায়। তিনি এ বিষয়টি জানতে পেরে বলেন:
إِنْ كَانَ يَنْفَعُهُمْ ذُلِكَ فَلْيَصْنَعُوْهُ فَإِنِّي إِنَّمَا ظَنَنْتُ ظَنَّا فَلَا تُؤَاخِذُوْنِي بِالظَّنَّ وَلَكِنْ إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنِ اللَّهِ شَيْئًا فَخُذُوا بِهِ فَإِنِّي لَنْ أَكْذِبَ عَلَى اللهِ.
যদি এ কর্মে তাদের উপকার হয় তবে তারা তা করবে। আমি তো ধারণা ব্যক্ত করেছি মাত্র। তোমরা আমার ধারণা গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলব তা গ্রহণ করবে। কেননা আমি আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করি না। ২২৯
হাদীসটির অন্য বর্ণনায় রয়েছে, নবীজি বলেন :
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ دِينِكُمْ فَخُذُوْا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْنِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ.
আমি একজন মানুষ মাত্র। যখন আমি তোমাদের দীনের কোনো বিষয়ে আদেশ করি তোমরা তা গ্রহণ করবে। আর যদি আমার কোনো ধারণা ব্যক্ত করি তবে আমি তো একজন মানুষ মাত্র। ২৩০
আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় হাদীসটিতে নবীজি বলেন :
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِمَا يَصْلُحُكُمْ فِي دُنْيَاكُمْ فَأَمَّا أَمْرُ أُخِرَتِكُمْ فَإِلَيَّ.
দুনিয়াবি কল্যাণকর বিষয়ে তোমরা অধিক জ্ঞাত। তবে তোমাদের আখিরাতের বিষয় আমার উপরেই ন্যস্ত থাকবে। ২৩১
যেহেতু প্রমাণিত হচ্ছে, আল্লাহর দীন সম্পর্কে, শরীআত ও আখিরাত সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মনগড়া কিছুই বলেননি; বরং যা বলেছেন ওহির মাধ্যমেই বলেছেন। সুতরাং এ কথা কিছুতেই বলা যায় না যে, হাদীস মান্য করা মানে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো বিধান মানা; বরং হাদীসও যেহেতু অবতীর্ণ ওহি সুতরাং হাদীস মানা মানে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করা এবং রাসূলের আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর নেওয়া পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া।
টিকাঃ
২২৫. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৫৭; সূরা [১২] ইউসুফ, আয়াত: ৪০ ও ৬৭。
২২৬. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৮৯。
২২৭. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ৩৮。
২২৮. সূরা [৫৩] নাজম, আয়াত: ৩ ও ৪。
২২৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৬১。
২৩০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৬২。
২৩১. মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ৬৯৯২。
📄 আল কুরআনে সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা
আর মহান আল্লাহ যে আল কুরআনে কোনো কিছুই বাদ রাখেননি, সকল কিছুই সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন, এখানে 'সকল কিছু' যে সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত নয়; বরং বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত তা সাধারণ দৃষ্টিতেই বোধগম্য হয়। কেননা আমরা খোলা চোখেই দেখতে পাই, আল কুরআনে দীন-দুনিয়ার 'সকল কিছু'র বর্ণনা নেই, সুস্পষ্ট বিস্তারিত তো দূরের কথা, সংক্ষিপ্ত অস্পষ্ট বর্ণনাও নেই।
যে বিশেষ অর্থে আয়াতে কারীমায় 'সকল কিছু' (كُلِّ شَيْءٍ) শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে এই অর্থও প্রবিষ্ট রয়েছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস মান্য করতে হবে। কেননা পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, কুরআনের ব্যাখ্যা হিসাবে এবং কুরআনের অতিরিক্ত বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর নবীর কাছে ওহি নাযিল করেছেন এবং সে ওহি মান্য করার সুস্পষ্ট নির্দেশনাও কুরআন কারীমে রয়েছে। অর্থাৎ 'সকল বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা'র মধ্যে হাদীস মান্য করার নির্দেশ-সংবলিত সুস্পষ্ট বর্ণনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারি (রাহ.) [৫৩৮ হি.] বলেন:
الْمَعْنَى أَنَّهُ بَيَّنَ كُلَّ شَيْءٍ مِنْ أُمُورِ الدِّيْنِ حَيْثُ كَانَ نَضًا عَلَى بَعْضِهَا وَإِحَالَةٌ عَلَى السُّنَّةِ حَيْثُ أَمَرَ فِيْهِ بِاتِّبَاعِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَطَاعَتِهِ وَقِيلَ: وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى. وَحَقًّا عَلَى الْإِجْمَاعِ فِي قَوْلِهِ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ وَقَدْ رَضِيَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأُمَّتِهِ اتَّبَاعَ أَصْحَابِهِ وَالْاِقْتِدَاءَ بِآثَارِهِمْ فِي قَوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَصْحَابِي كَالنُّجُوْمِ بِأَيِّهِمِ اقْتَدَيْتُمْ اهْتَدَيْتُمْ وَقَدِ اجْتَهَدُوْا وَقَاسُوا وَوَطَنُوْا طُرُقَ الْقِيَاسِ وَالْاِجْتِهَادِ فَكَانَتِ السُّنَّةُ وَالْإِجْمَاعُ وَالْقِيَاسُ وَالْاِجْتِهَادُ مُسْتَنِدَةً إِلَى تِبْيَانِ الْكِتَابِ فَمِنْ ثَمَّ كَانَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ.
আল কুরআন সকল কিছুর বর্ণনা-এ কথার অর্থ হচ্ছে, কুরআন দীনি বিষয়ে সকল কিছু বর্ণনা করেছে। তা এভাবে যে, কিছু বিষয় সুস্পষ্ট করে সরাসরি বর্ণনা করেছে আর কিছু কিছু বিষয় হাদীসের উপর হাওলা করে
এই বলে আদেশ করেছে যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ-অনুকরণ করো, আর বলেছে, 'তিনি নিজ প্রবৃত্তি থেকে কিছুই বলেন না'। আর কুরআন এই বলে ইজমা'র প্রতি উৎসাহিত করেছে যে, 'যে ব্যক্তি মুমিনদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অবলম্বন করে....' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কথা বলে উম্মাতকে তাঁর সাহাবিদের পথ-পন্থার অনুসরণ-অনুকরণ করতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যে, 'আমার সাহাবিগণ নক্ষত্রতুল্য। তোমরা তাদের যে কাউকে অনুসরণ করবে সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে। '২৩২ সাহাবিগণ ইজতিহাদ ও কিয়াস করেছেন এবং কিয়াস ও ইজতিহাদের বিভিন্ন পথ সুগম করেছেন। সুতরাং হাদীস, ইজমা', কিয়াস ও ইজতিহাদ কুরআনের বর্ণনার সাথেই সম্পৃক্ত। আর এ পদ্ধতিতেই কুরআন সকল কিছু সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে। ২৩৩
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন আলী শাওকানি (রাহ.) [১২৫০ হি.] বলেন:
وَمَعْنَى كَوْنِهِ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ أَنَّ فِيْهِ الْبَيَانَ لِكَثِيرٍ مِّنَ الْأَحْكَامِ وَالْإِحَالَةُ فِيْمَا بَقِيَ مِنْهَا عَلَى السُّنَّةِ وَأَمَرَهُمْ بِاتِّبَاعِ رَسُوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا يَأْتِي بِهِ مِنَ الْأَحْكَامِ وَطَاعَتِهِ كَمَا فِي الْآيَاتِ الْقُرْآنِيَّةِ الدَّالَّةِ عَلَى ذَلِكَ وَقَدْ صَحَ عَنْهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنِّي أُوْتِيْتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ.
কুরআন সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা-এ কথার অর্থ হচ্ছে, তাতে অনেক বিধিবিধানের বর্ণনা রয়েছে। আর অবশিষ্ট বিধানের জন্য হাদীসের হাওলা করেছে। এবং রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তার আনুগত্য ও অনুকরণ-অনুসরণের আদেশ করেছে। যেমনটি আল কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আর বিশুদ্ধ সনদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বক্তব্যও বর্ণিত হয়েছে যে, আমাকে কুরআন ও তার সমপরিমাণ ওহি দান করা হয়েছে। ২৩৪
আমরা এখানে সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে শুধু দুইজন সর্বসম্মত কুরআন বিশারদের বক্তব্য উল্লেখ করলাম। অন্যথায় এই আয়াত নিয়ে যুগ যুগ ধরে গ্রহণযোগ্য সকল কুরআন বিশারদের বক্তব্য এমনই।
একবার এক তালিবুল ইলমকে দেখে এক লোক ডেকে বলে, তোমরা তো বলো যে, কুরআনে সকল সমস্যার সমাধান আছে। ছেলেটি বলে, অবশ্যই বলি, পরিপূর্ণ বিশ্বাস থেকেই বলি। তখন পাশ দিয়ে ঝুড়ি মাথায় এক লোক যাচ্ছিল। লোকটি বলল, কুরআন থেকে জবাব দাও তো ওই লোকটির ঝুড়িতে কী আছে? ছেলেটি ঝুড়িওয়ালাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়ে বলে, ওর মাথার ঝুড়িতে আম আছে। লোকটি বলল, এ কেমন কথা! তোমাকে তো কুরআন থেকে জবাব দিতে বললাম। ছেলেটি বলল, জি, আমি কুরআন থেকেই বলেছি, কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে বলেছি। আল কুরআনে আছে, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْكُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ.
"তোমাদের যদি জানা না থাকে তবে যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে নাও।”২৩৫
সালাত, যাকাত, হজ্জ, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদত যেমন কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের আলোকে ফরয, তেমনি কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের আলোকেই হাদীস মান্য করাও ফরয। আমরা পূর্বের আলোচনায় দেখেছি, আল কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াত দ্বারা বিষয়টি সাব্যস্ত।
টিকাঃ
২৩২. হাদীসটির সনদ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এ বিষয়ের সমর্থক দলীল হিসাবে কুরআন-হাদীসে অসংখ্য বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।
২৩৩. যামাখশারি, আল কাশশাফ: ২/৬২৮。
২৩৪. শাওকানি, ফাতহুল কাদীর: ৩/২২৪。
২৩৫. সূরা [১৬] নাহল, আয়াত: ৪৩; সূরা [২১] আম্বিয়া, আয়াত: ০৭।