📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণ ও প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপি
প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে সংকলিত। এবং এ সকল গ্রন্থে সংকলিত হাদীসের শুরুতে যে সকল বর্ণনাসূত্র আছে সে বর্ণনাসূত্রের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত حَدَّثَنَا (আমাদেরকে হাদীস বলেছেন), أَخْبَرَنَا، أَنْبَأَنَا (আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন), سَمِعْتُ (আমি শুনেছি) ইত্যাদি শ্রুতিবাচক শব্দে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য হাদীসশাস্ত্র না জানা অনেকে ধারণা করতে পারেন এবং হাদীস-বিরোধীরা অপপ্রচার করেন যে, সাহাবি, তাবিয়ি ও তাবি-তাবিয়ি যুগে হাদীস শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণের নিয়ম ছিল না। বরং মৌখিকভাবে বর্ণনা করা ও মুখস্থ করে নেওয়াই ছিল এক্ষেত্রে একমাত্র রীতি।
কিন্তু বিষয়টি কখনোই তা নয়। হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগভীর ভাসাভাসা জ্ঞান এ বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে এবং ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের মানসেই এ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। বস্তুত হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সূক্ষ্মতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তারা মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন। হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সনদ বর্ণনায় সর্বদা মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির পাশাপাশি লেখন ও পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করা হতো।
সাহাবিগণ সাধারণত হাদীস মুখস্থ করতেন এবং কখনো কখনো লিখেও রাখতেন। মূলত সাহাবিদের জন্য হাদীস লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। কেননা অধিকাংশ সাহাবি থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র ২০/৩০টি বা তার চেয়ে কম। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। তবে সনদের বিভিন্নতা বাদ দিয়ে শুধু মূল হাদীসের সংখ্যা হিসাব করলে তা হবে মাত্র হাজারের কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি থেকে ২০/৩০টি, ১০০টি, এমনকি হাজারটি ঘটনা বা কথা বর্ণনা করার জন্য লিখে রাখার প্রয়োজন ছিল না।
কেননা এছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোনো বড় বিষয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতি আলোচনা, তাঁর নির্দেশাবলি হুবহু পালন, অনুকরণ ও তাঁর কথা মানুষদের শোনানোই ছিল তাঁদের জীবনের প্রধানতম কাজ। অন্য কোনো জাগতিক ব্যস্ততা তাঁদের মন-মগজকে ব্যস্ত করতে পারত না। আর যে স্মৃতি ও কথা সর্বদা মনে জাগরূক এবং কর্মে বিদ্যমান তা তো আর পৃথক কাগজে লিখে রাখার দরকার হয় না। তা সত্ত্বেও অনেক সাহাবি তাঁদের মুখস্থ হাদীস লিখে রাখতেন। আবু হুরাইরা (রা.)-ও পরবর্তীকালে তাঁর হাদীসগুলো লিখে রেখেছিলেন। এমনকি নবীজি নিজেও তাঁর অনেক হাদীস লিখিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিগণ (রা.) কর্তৃক লিখিত হাদীসের পরিমাণ একেবারেই কিঞ্চিন্মাত্র নয়। এ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা একত্র করলে দেখা যায় তার পরিমাণ অনেক।
সাহাবিদের ছাত্র তাবিয়িদের যুগ থেকেই হাদীস শিক্ষা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল লিখন পদ্ধতি। অধিকাংশ তাবিয়ি ও পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ উস্তাদের কাছে হাদীস শুনতেন, লিখতেন ও মুখস্থ করতেন। উস্তাদগণ নিজ নিজ পাণ্ডুলিপি থেকে ছাত্রদেরকে হাদীস শোনাতেন আর ছাত্ররা শোনার সাথে সাথে তা নিজেদের পাণ্ডুলিপিতে লিখতেন এবং শিক্ষকের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন। এ বিষয়ক অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীস বিষয়ক গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ আছে। মাত্র দুয়েকটি উদাহরণ উদ্ধৃত করছি।
আবু হুরাইরা (রা.)-এর হাদীসের ছাত্র তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (৯১ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَكْتُبُ مَا أَسْمَعُ مِنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَلَمَّا أَرَدْتُ أَنْ أُفَارِقَهُ أَتَيْتُهُ بِكِتَابِهِ فَقَرَأْتُهُ عَلَيْهِ وَقُلْتُ لَهُ: هَذَا سَمِعْتُ مِنْكَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
আমি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শুনতাম তা লিখে রাখতাম। বিদায়ের কালে সে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম, তাঁকে তা পড়ে শোনালাম এবং বললাম, এগুলোই তো আমি আপনার কাছ থেকে শুনেছি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক আছে। ২০৮
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (রাহ.) আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন সব তিনি লিখে রেখেছিলেন এবং সে পাণ্ডুলিপি আবু হুরাইরা (রা.)-এর কাছে পেশ করে সম্পাদনা করে নিয়েছিলেন।
তাবিয়ি সাঈদ ইবন জুবাইর (৯৫ হি.) বলেন :
كُنْتُ أَكْتُبُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ فَإِذَا امْتَلَاتِ الصَّحِيفَةُ أَخَذْتُ نَعْلِي فَكَتَبْتُ فِيْهَا حَتَّى تَمْتَلِيُّ.
আমি সাহাবি ইবন আব্বাস (রা.)-এর কাছে হাদীস লিখতাম। লিখতে লিখতে যখন পৃষ্ঠা ভরে যেত তখন আমার স্যান্ডেল নিয়ে তাতে লিখতাম। লিখতে লিখতে তাও ভরে যেত। ২০৯
তাবিয়ি আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আকীল (১৪০ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَذْهَبُ أَنَا وَأَبُوْ جَعْفَرٍ إِلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَمَعَنَا أَلْوَاحُ صِغَارُ نَكْتُبُ فِيهَا الْحَدِيثَ.
আমি এবং আবু জা'ফর সাহাবি জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.)-এর নিকট যেতাম। আমাদের সাথে ছোট ছোট বোর্ড থাকত। তাতে আমরা হাদীস লিখতাম। ২১০
এ সময় থেকে পাণ্ডুলিপি থেকে হাদীস শিক্ষা দেওয়া এবং হাদীস শোনার সাথে সাথে তা লিখে নেওয়া হাদীস শিখন পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ব্যতিক্রম কিছু মুহাদ্দিস, যারা শুধু স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন, মুহাদ্দিসদের নিকট তারা সাধারণত দুর্বল রাবি হিসাবে পরিগণিত হতেন। পাণ্ডুলিপি থেকে শিক্ষাদানকারী শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসাবে গণ্য করা হতো। শুধু স্মৃতি থেকে মুখস্থ হাদীসের মৌখিক বর্ণনা ছাত্ররা গ্রহণ করতে চাইতেন না।
দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন রাবি আব্দুল আযীয ইবনু ইমরান ইবন আব্দুল আযীয (১৭০ হি.)। তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী ও সাহাবি আব্দুর রাহমান ইবন আওফের বংশধর। মুহাদ্দিসগণ তাকে হাদীস বর্ণনায় দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কারণ তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ভুলভ্রান্তি ব্যাপক। আর এ ভুলভ্রান্তির কারণ হলো পাণ্ডুলিপি ব্যতিরেকে মুখস্থ বর্ণনা করা। তৃতীয় হিজরি শতকের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক উমার ইবন শাব্বাহ (২৬২ হি.) তার সম্পর্কে বলেন:
كَانَ كَثِيرَ الْغَلَطِ فِي حَدِيثِهِ لِأَنَّهُ احْتَرَقَتْ كُتُبُهُ فَكَانَ يُحَدِّثُ مِنْ حِفْظِهِ.
তিনি হাদীস বর্ণনায় প্রচুর ভুল করতেন। কারণ তার পাণ্ডুলিপি পুড়ে গিয়েছিল। আর এ কারণে তিনি স্মৃতির উপর নির্ভর করে মুখস্থ হাদীস বর্ণনা করতেন। ২১১
তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিস আলী ইবনুল মাদীনি (২৩৪ হি.) বলেন:
لَيْسَ فِي أَصْحَابِنَا أَحْفَظُ مِنْ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ إِنَّهُ لَا يُحَدِّثُ إِلَّا مِنْ كِتَابِهِ وَلَنَا فِيْهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ.
আমাদের মাঝে আহমাদ ইবন হাম্বাল ছিলেন সর্বাধিক মুখস্থশক্তির অধিকারী। তা সত্ত্বেও তিনি পাণ্ডুলিপি সামনে না রেখে হাদীস বর্ণনা করতেন না। তার মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। ২১২
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বালের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন :
قَالَ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ: قَالَ لِي عَبْدُ الرَّزَّاقِ: اكْتُبْ عَنِّي وَلَوْ حَدِيثًا وَاحِدًا مِّنْ غَيْرِ كِتَابٍ فَقُلْتُ: لَا وَلَا حَرْفًا.
ইয়াহইয়া ইবন মাঈন বলেন, ইমাম আব্দুর রাযযাক সানআনি আমাকে বলেন, তুমি অন্তত একটি হাদীস পাণ্ডুলিপি ছাড়া আমার কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করো। আমি তাকে বললাম, না, পাণ্ডুলিপির প্রমাণ ব্যতীত একটি হরফও আমি লিখতে পারব না। ২১৩
এরূপ অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীসশাস্ত্রীয় কিতাবাদিতে বিদ্যমান। এ সকল বর্ণনার আলোকে প্রমাণিত যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ সাহাবিদের যুগ থেকেই হাদীস লিখে সংরক্ষণ করা হতো। মুহাদ্দিসগণ লিখিত পাণ্ডুলিপি দেখে হাদীস বর্ণনা করতেন, নিরীক্ষা করতেন, বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন এবং প্রত্যেক ছাত্র তার শ্রুত হাদীস লিখে রাখতেন। ছাত্র শুনতেন উস্তাদের পাণ্ডুলিপির পাঠ। তারপর তা নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখে উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন।
এ আলোচনা থেকে দুটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। ১. হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই যখন হাদীস শিখনের ক্ষেত্রে লিখন পদ্ধতি চালু হয়ে যায় এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠগ্রহণ অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় তখন হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দেই কেন হাদীস বর্ণনা করেছেন? কেন তারা এখনকার দিনে গ্রন্থের রেফারেন্স দেওয়ার মতো লিখিত পাণ্ডুলিপির রেফারেন্স দেননি?
২. সে সময় থেকেই যদি সকল ছাত্র তার উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতেন তবে তো হাদীস সংকলিত হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি থাকার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি সংরক্ষিত হাদীস সংকলনের অধিকাংশ গ্রন্থ তৃতীয়, চতুর্থ বা তার পরবর্তী শতাব্দীর। তাহলে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি কোথায় গেল? উম্মাতের অবহেলায় কি সেসব হারিয়ে গেছে? তবে কি এ উম্মাতের সালাফ হাদীস সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন না?
প্রথম সংশয় নিরসন : আমরা আগেই বলেছি, মূলত মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ নবীজির হাদীসের সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতা রক্ষায় অতি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা মুখস্থ থেকে মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন।
আমরা জানি, সেকালে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তখনকার পাণ্ডুলিপি মানেই হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি। প্রাচীন হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধারের বিষয়ে যার মোটামুটি ধারণা আছে তিনি জানেন, স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনা করতে গেলে যেমন মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধার করতে গেলে তারও অধিক ভুলের সম্ভাবনা থাকে। পাঠোদ্ধারকারী লেখকের হস্তলিপি বুঝতে ভুল করে এক শব্দকে ভিন্ন শব্দ ধারণা করতে পারেন। আর যদি তিনি মূল লেখকের পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপি হাতে পান, তাহলে তার নিজের পাঠোদ্ধারে ভুলের সম্ভাবনার পাশাপাশি অনুলিপিকারের ভুলের সম্ভাবনা অতিরিক্ত যুক্ত হবে। তাছাড়া অনুলিপিকার যদি মূলপাঠের অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক কোনো শব্দ লিখে রাখেন বা টীকা সংযুক্ত করেন, পাঠোদ্ধারকারী সেগুলোকেও মূলপাঠ মনে করে ভুল করতে পারেন।
ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেল গবেষক পণ্ডিতগণ বলছেন, বাইবেলের মূলপাঠেই অগণিত ভুল, বিকৃতি ও পাঠের ভিন্নতা বিদ্যমান। তারা বলেন, এই ভুলের অন্যতম কারণ তাদের এইসব ধর্মগ্রন্থ অনুলিপি করা হয়েছে শুধু পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করে। যিনি যা বুঝেছেন তা-ই লিখেছেন। অনুলিপিকারের ব্যাখ্যামূলক শব্দ ও টাকাও পরবর্তী অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপিতে মূলপাঠে ঢুকে পড়েছে।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ব্যবহার করেছেন অতিশয় সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কোনো মুহাদ্দিস তার উস্তাদের নিকট হাদীসের পাঠগ্রহণের সময় পাণ্ডুলিপি থেকে উস্তাদের পাঠ শুনেছেন, মুখস্থ করেছেন, নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। এবার তিনি যখন তার ছাত্রদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন স্মৃতি ও পাণ্ডুলিপি উভয় পদ্ধতিকে যুগপৎভাবে ব্যবহার করেছেন। স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনার ভুলের সম্ভাবনা পাণ্ডুলিপি রোধ করেছে আর পাণ্ডুলিপি পাঠের ভুলের সম্ভাবনা স্মৃতি রোধ করেছেন।
হাদীসের পাণ্ডুলিপি তো বাজারে পাওয়া যায়। আপনি সে পাণ্ডুলিপি বাজার থেকে সংগ্রহ করে হাদীস শিখে বর্ণনা করছেন নাকি উস্তাদের কাছ থেকে এর বিশুদ্ধ পাঠও শিখে নিয়েছেন-এটা হচ্ছে বড় ব্যাপার। এই বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য সকলেই শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দে হাদীস বর্ণনা করতেন। অর্থাৎ মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় শ্রুতিবাচক শব্দ 'حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا বা অমুক আমাদেরকে বলেছেন' কথার অর্থ হচ্ছে, তার কিতাবটি তার নিজের কাছে বা তার অমুক ছাত্রের কাছে, যিনি তার কাছে পঠিত শুনছেন, আমি তার কাছে পড়ে নিজ কানে শুনে শুনে তা থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করছি। কেউ কেউ 'আমি তাকে পড়তে শুনেছি' বা 'আমি পড়েছি' এরূপ শব্দে বললেও সাধারণত 'তিনি আমাদেরকে বলেছেন' বলেই এক বাক্যে তারা যুগপৎভাবে উভয় বিষয় বোঝাতেন।
ইমাম মালিক (রাহ.) সংকলিত 'মুআত্তা' কিতাবটি এখন ছাপা হয়ে যেমন আমাদের কাছে রয়েছে, তেমনি এর পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রাহ.)-এর যুগেও ছিল। তাঁরা ইমাম মালিকের ছাত্রদের কাছে এ কিতাবের পাঠ গ্রহণ করেছেন। এ কিতাবের হাদীস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে তাঁরা সংকলনও করেছেন। কিন্তু এ কিতাবের হাদীস উদ্ধৃত করতে গিয়েও তাঁরা শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁদের এই শ্রুতিবাচক শব্দ ব্যবহারের কারণে কি মুআত্তা মালিকের বিদ্যমানতা অস্বীকার করা যায়?
এমন আরো অনেক মুহাদ্দিসের লিখিত পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিমের কাছে ছিল। তারা ওই কিতাবগুলো লেখকের ছাত্র বা ছাত্রের ছাত্রদের কাছ থেকে শুনেছেন এবং সেখান থেকে নির্বাচন করে অনেক হাদীস তাদের সহীহ কিতাবে শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন। ২১৪
দ্বিতীয় সংশয় নিরসন: বাস্তবতা এটাই, হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকেও হাদীসের শত শত সংকলন বিদ্যমান ছিল। এবং মুসলিম উম্মাহর সালাফগণ ছিলেন হাদীস সংরক্ষণে খুবই যত্নবান। সে যুগে হাদীসের প্রায় সকল ছাত্রই পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। তবে তাদের পাণ্ডুলিপিতে হাদীস বিশেষ কোনো ধারাক্রমে সাধারণত বিন্যস্ত হতো না। বরং হাদীস শেখার ধারাক্রমেই তারা পাণ্ডুলিপিতে লিখে রাখতেন। যেটি আগে শিখেছেন সেটি আগে আর যেটি তারপরে শিখেছেন সেটি পরে লিখতেন।
তাছাড়া একজন ছাত্র শুধু একজন উস্তাদের কাছে হাদীস শিখতেন না। বরং সাধ্যানুযায়ী অনেক উস্তাদের কাছ থেকে শিখতেন। এক উস্তাদের কাছে শেখা শেষ হলে অন্য উস্তাদের কাছে যেতেন। এভাবে তার হাদীস সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এবং ক্রমেই সনদে রাবির সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এভাবে ছাত্রের পাণ্ডুলিপির কলেবর উস্তাদের পাণ্ডুলিপির কলেবর থেকে বৃদ্ধি পেত। এভাবে একাধিক উস্তাদের পাণ্ডুলিপি একজন ছাত্রের পাণ্ডুলিপির ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে।
এভাবে দিনে দিনে হাদীসের পাণ্ডুলিপির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। উস্তাদের থেকে ছাত্রের পাণ্ডুলিপি বৃহৎ থেকে বৃহৎ হয়েছে। এবং তার পরে ছাত্ররা তাদের বিভিন্ন উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসগুলো তাদের পাণ্ডুলিপিতে বিশেষ বিন্যাসে গ্রন্থনা করেছেন। বিভিন্ন উস্তাদের পাণ্ডুলিপি স্বতন্ত্রভাবে রাখেননি। ছাত্রদের এই বৃহৎ ও বিন্যস্ত পাণ্ডুলিপির মধ্যে শিক্ষকদের পাণ্ডুলিপি একাকার হয়ে গেছে। পুরোটাই একীভূত হয়েছে বটে; তবে স্বতন্ত্র চেহারায় নয়। তাই বলা যায়, পূর্বের পাণ্ডুলিপি ও পুস্তিকাগুলো ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখন আমাদের হাতে থাকা বৃহদাকার ও বিন্যস্ত পুস্তকগুলোর মাঝে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন করে একাকার হয়ে আছে। আর উস্তাদদের হাতে তৈরি পাণ্ডুলিপির প্রয়োজন না থাকায় তা দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে। ২১৫
তবে দ্বিতীয় শতকের হাদীসের অনেক পাণ্ডুলিপি এখনো বিদ্যমান আছে। অনেকগুলো তো মুদ্রিত হয়েছে এবং অনেক প্রসিদ্ধিও পেয়েছে। ইমাম আবু হানীফার (১৫০ হি.) 'কিতাবুল আসার', ইমাম মালিকের (১৭৯ হি.) 'মুআত্তা', ইমাম মা'মার ইবন রাশিদের (১৫৩ হি.) 'জামি', আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের (১৮১ হি.) মুসনাদ ও যুহদ, ইবন ওয়াহাব (১৯৭ হি.), ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ (১৯৭ হি.) ও মুআফা বিন ইমরানের (১৮৫ হি.) যুহুদ, ইমাম আব্দুর রাযযাকের (২১১ হি.) 'মুসান্নাফ' তার অন্যতম।
তাছাড়া প্রথম শতকের কোনো কোনো পাণ্ডুলিপি অধুনা আবিষ্কৃত হয়েছে। পরবর্তী যুগের কিতাবাদির সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে, কীভাবে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি এ সকল গ্রন্থের মাঝে একীভূত হয়ে আছে। যেমন: সহীফাতু হাম্মام ইবন মুনাব্বিহ, নুসখাতু সুহাইল ইবন আবি সালিহ, আহাদিসি ইয়াযীদ ইবন আবি হাবীব ইত্যাদি।
টিকাঃ
২০৮. সুনান দারিমি, হাদীস: ৫১১。
২০৯. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭১。
২১০. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭০。
২১১. আসকালানি, তাহযীবুত তাহযীব, ৬/৩৫১; সাখাবি, আত তুহফাতুল লাতীফাহ, ২/১৮৫。
২১২. আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/১৬৫。
২১৩. মুসনাদ আহমাদ, ২২/৭৬; যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৫/৩৭৪。
২১৪. বিস্তারিত দেখুন: আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি: পৃ. ৩৬৯。
২১৫. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল; আজ্জাজ খাতীব, আস সুন্নাতু কাবলাত তাদবীন; আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি; আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি; মুস্তফা আযমি, হাদিস সংকলনের ইহিতাস।
📄 হাদীস সংরক্ষণ পরিপূর্ণ ও সুসম্পাদিত
একজন প্রভাবশালী সাধারণ বা রাজনৈতিক নেতা, যার অনেক ভক্ত, অনুরক্ত, অনুচর ও অনুসারী আছে। যারা তার সকল নির্দেশনা ও কর্মসূচি সর্বসাধ্য দিয়ে পালন ও বাস্তবায়ন করে। নেতার কোনো বিষয় ভালো লাগলে তারা কেউ কেউ ব্যক্তিজীবনেও তা প্রতিপালন করে। তার মৃত্যুর অনেক পরে, যখন প্রবীণ ভক্তরাও অনেকেই মারা গেছে, তখন হয়তো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বা জিজ্ঞাসিত হয়ে কোনো কিছু বলতে ভক্তকে পেছনের জীবন হাতড়ে ফিরতে হবে। তখন এটাই স্বাভাবিক যে, এই ভক্তের স্মৃতি থেকে অনেক কিছু মুছে গেছে। আবার অনেক কিছু সে ভুলভালও বর্ণনা করতে পারে—এটাই বাস্তবতা। সুতরাং এমতাবস্থায় নেতার সকল বিষয় আর কিছুতেই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন সাধারণ নেতার মতো এবং সাহাবিদেরকে তাদের অনুসারীর মতো মনে করেন, তারা দাবি করেন যে, নবীজির সকল হাদীস কিছুতেই সংরক্ষিত হওয়া সম্ভব নয়। হাদীস নামে যা সংরক্ষিত হয়েছে তা অসম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত। এ দাবির পক্ষে তারা প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন প্রবীণ সাহাবিদের নামে খুব কমসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হওয়া এবং তাদের দৃষ্টিতে হিকমতপূর্ণ অনেক কিছু হাদীসের কিতাবে অনুপস্থিত থাকা।
আল্লাহর শরীআত প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরামের জামাআত কেমন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তা আমরা জানি। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানব জাতির জন্য শরীআত প্রতিপালনে মহান আল্লাহ নির্ধারিত একমাত্র নমুনা। এজন্য সাহাবিগণ (রা.) নবীজির কথাকর্ম ও জীবনাচারকে নিজেদের জীবনাচারে পরিণত করেছিলেন। এ কথাটি একক বা একদল সাহাবির ক্ষেত্রে কেবল প্রযোজ্য ছিল না; বরং পুরো সাহাবি-সমাজের জন্য প্রযোজ্য। যে নববি বিষয়টি ছিল নবুওয়াতের প্রথম দিকের, শেষ যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির জন্যও সেটি পালনীয় ছিল। এমন নয় যে, যে সাহাবি নবীজির কোনো একটি কর্ম দেখলেন বা কথা শুনলেন শুধু তার জন্যই তা পালন ও সংরক্ষণ করা জরুরি।
যে ব্যক্তি কোনো বিষয় জানল তার দায়িত্ব যে জানে না তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর যে জানে না তার দায়িত্ব যে জানে তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া। সাহাবিগণ এ দায়িত্ব পালনকেই জীবনের প্রধানতম কর্তব্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। নবীন প্রবীণের কাছ থেকে জেনেছেন, এমনকি প্রবীণ নবীনের কাছ থেকেও। প্রবীণ যা জানবেন নবীন তা জানবেন না বা পালন করবেন না, ইসলামে এর অনুমতি তো নেই। তাই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা নবীজির পুরো জীবনাচারকে সমাজে মূর্তিমান করে উপস্থিত রেখেছেন। তাঁদের সমাজের দিকে তাকালে যে দৃশ্য দেখা যেত এবং কান পাতলে যে আওয়াজ শোনা যেত তা-ই তো হাদীস বা সুন্নাহ। এ বিষয়ক আলোচনা আমরা পূর্বে দেখে এসেছি।
নবীন-প্রবীণ সাহাবিদের নিয়ে যে সাহাবি-সমাজ, এই সমাজে চর্চিত ইসলাম পূর্ণাঙ্গ সুন্নাহ বা নববি জীবনাচার। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতদিন হায়াতে ছিলেন প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করেছেন—সংশোধন করেছেন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। সাহাবিগণ কারো মধ্যস্থতায় নবীজির কোনো কথাকর্ম জানতে পারলে, আর তাতে তাঁদের খটকা লাগলে, স্বয়ং নবীজির কাছে সরাসরি এসে যাচাই করে নিতেন। অর্থাৎ সাহাবিদের সমাজে বিদ্যমান সুন্নাহ ছিল পরিপূর্ণ এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সম্পাদিত।
কোনো একজন সাহাবির হয়তো নবীজির কোনো হাদীস শুনতে, বুঝতে ও বর্ণনা করতে ভুল হতে পারে। কিন্তু পুরো জামাআতের তো ভুল হতে পারে না। যদি আমরা বলি যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের পুরো জামাআতেরই ভুল হতে পারে, তবে তার অর্থ তো এই যে, ইসলামকেই বুদ্ধির অগম্য ও পালনের অযোগ্য দাবি করা হচ্ছে। কেননা সাহাবিরা যে ক্ষেত্রে ভুলের শিকার হয়েছেন পরবর্তীদের জন্য সেক্ষেত্রে নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিরা যখন পরস্পরের মধ্যে হাদীসের চর্চা করতেন তখন কারো কোনো ধরনের ভুল হলে অন্যেরা সংশোধন করে দিতেন। যেমন মাকহুল (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
السُّؤْمُ فِي ثَلَاثَةٍ فِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ.
'তিনটি বস্তুতে কুলক্ষণ রয়েছে: ঘর, নারী ও ঘোড়া।' এ কথা আয়িশা (রা.)-কে বলা হলে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা সঠিকভাবে জানেন না। কেননা তিনি নবীজির কথার মাঝখানে এসেছিলেন। তাই পুরোটা শুনতে পাননি। শেষের অংশ শুনেছিলেন, প্রথম অংশ শোনেননি। নবীজি মূলত বলেছিলেন :
قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ يَقُوْلُوْنَ إِنَّ الشُّؤْمَ فِي ثَلَاثَةِ : فِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ.
আল্লাহ ইয়াহুদিদেরকে ধ্বংস করুন। কেননা তারা বলে, 'তিনটি বস্তুতে কুলক্ষণ রয়েছে: ঘর, নারী ও ঘোড়া'। ২১৬
তাছাড়া কোনো সাহাবি বর্ণিত হাদীস কারো মধ্যস্থতায় অন্য সাহাবির নিকট পৌঁছলে এবং এতে তাঁর কোনো রকম খটকা লাগলে এই সাহাবি মূল বর্ণনাকারী সাহাবির কাছে গিয়ে যাচাই করতেন। যেমন জনৈক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণিত বেচাকেনায় সুদ সংক্রান্ত একটি হাদীস আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.)-এর নিকট পৌঁছে। তখন তিনি আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর নিকট গিয়ে যাচাই করেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন:
يَا أَبَا سَعِيدٍ مَا هَذَا الَّذِي تُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟
হে আবু সাঈদ, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই যে হাদীস বর্ণনা করছেন, এর বিষয়টি কী? তখন তিনি বলেন, আমি এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি। ২১৭
এ বিষয়ক আরো কিছু আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে নবীজির সকল হাদীস বা সুন্নাহ নির্ভুল ও নিখুঁতরূপে সমাজে বিরাজমান ছিল। এই পূর্ণাঙ্গ ও সুসম্পাদিত সুন্নাহই পরবর্তী প্রজন্ম, অর্থাৎ তাবিয়িগণ সাহাবিদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন- সাহাবিদের সমাজ দেখে এবং তাঁদের মৌখিক বর্ণনা থেকে। তারপর তাঁদের কাছ থেকে পরবর্তী প্রজন্ম। এভাবে প্রজন্ম পরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম নবীজির সুন্নাহ শিখে আসছে। পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের যথাযোগ্য ব্যক্তিবর্গের নিকট পূর্ণ সতর্কতার সাথে পৌঁছে দিচ্ছেন।
মনে রাখতে হবে, হাদীস বা সুন্নাহ অর্থাৎ ইসলাম কেবল মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি। বরং আমালে মুতাওয়ারাস বা কর্ম পরম্পরাই ইসলাম সংরক্ষণের সব থেকে বিশ্বস্ত মাধ্যম। মহান আল্লাহ প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এমন বিশাল জামাআত সৃষ্টি করেছেন যারা পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে প্র্যাক্টিক্যালি ইসলাম পালনের নববি নমুনা শিখেছেন। কোনো যুগেই কেবল লিখিত বা মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে ইসলাম শেখার প্রচলন ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا يَزَالُ اللهُ يَغْرِسُ فِي هَذَا الدِّيْنِ غَرْسًا يَسْتَعْمِلُهُمْ فِي طَاعَتِهِ.
মহান আল্লাহ সর্বদা এই দীনের মধ্যে এমন বৃক্ষ রোপণ করতে থাকেন, অর্থাৎ ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি করেন যাদেরকে তিনি তাঁর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখেন। ২১৮
সুতরাং কেবল লিখিত বা মৌখিক বর্ণনার দ্বারা সুন্নাহ সংরক্ষিত হওয়া না-হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা ইসলাম সংরক্ষণের ইতিহাস ও ইসলাম প্রতিপালনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, প্রবীণ সাহাবিদের নামে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে তাঁদের জানা অনেক হাদীস হারিয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা তাঁদের জানা হাদীস নবীনদেরও জানা ছিল। এবং তাঁরা কখনো প্রবীণদের নাম উক্ত করে, কখনো উহ্য রেখে সেসব হাদীস বর্ণনা করেছে। হাদীসশাস্ত্রের ছাত্রমাত্রই এ সকল তথ্য অবগত।
আর হিকমত বিষয়ক তাদের দাবিটিও অবান্তর। কারো কাছে মনে হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিকমতের ভেতরে এটাও থাকার দরকার, কিন্তু হাদীসের কিতাবে যেহেতু এ বিষয়ক কোনো বর্ণনা নেই সুতরাং হাদীস ভান্ডার, যাকে নবীর হিকমত বা প্রজ্ঞা বলা হয়, অসম্পূর্ণ। এ রকম দাবি মূলত নিজের বিবেচনাকে ইসলামের মানদণ্ড বানানোর নামান্তর। পাশ্চাত্য দর্শনের কাছে মগজ বেচে দেওয়া কেউ কেউ মনে করেন, কেবল জাগতিক লাভ-ক্ষতি ও উন্নতি-অবনতির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিচাতুর্যই হিকমত। আর আন্তরিক প্রশান্তি, রবের সন্তুষ্টি এবং পরকালীন মুক্তি, উন্নতি ও সফলতা লাভের দুআ-যিকির ও আমল-ইবাদত কোনো হিকমত নয়।
টিকাঃ
২১৬. মুসনাদ তায়ালিসি, হাদীস: ১৬৪১; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৬০৩৪。
২১৭. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১৭৭২; সহীহ বুখারি, হাদীস: ২৩৭৬; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১/৫৪৬。
২১৮. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৭৭৮৭; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ০৮; সহীহ ইবন হিব্বان, হাদীস: ৩২৬।
📄 হাদীস সংরক্ষণে বিশ্বাস ঈমানের দাবি
আল কুরআনে বারংবার নির্দেশ এসেছে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণ করো। আল্লাহ তাঁর রাসূলের নিকট কিতাব ও হিকমত পাঠিয়েছেন, তাঁকে কিতাবের ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন এবং তাঁর উপর অতিরিক্ত ওহিও নাযিল করেছেন। এবং রাসূলেকে দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁর কাছে যা কিছু নাযিল হয়েছে তা মানব জাতির কাছে পৌঁছে দিতে এবং তাদেরকে তার ব্যাখ্যা শিক্ষা দিতে।
অর্থাৎ ইসলামি শরীআত হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, তাঁদের উভয়ের আনুগত্য করা এবং রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণ করা। এ শরীআত কিয়ামত পর্যন্ত সকলের জন্য মান্য করা আবশ্যক। সর্বকালেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যেমন ঈমান আনতে হবে, তাঁদের আনুগত্য করতে হবে তেমনি রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণ করতে, তাঁর অনুসরণ-অনুকরণের পরীক্ষা দিতে হবে কুরআনের অতিরিক্ত ওহির বিধান মান্য করার মাধ্যমে এবং শরীআতের সকল বিধান প্রতিপালন করতে হবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নমুনা বানিয়ে। তবেই তার আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের দাবি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا.
“তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম নমুনা আল্লাহর রাসূলের মধ্যে— যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিবসে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করে।”২১৯
এই আয়াতে শরীআত প্রতিপালনে যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নমুনা বানানো হয়েছে, এটাকে কোনো দেশকালের সীমায় সীমাবদ্ধ করা হয়নি; বরং আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সুতরাং সকল দেশকালের বিশ্বাসী মুমিনকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নমুনায় শরীআত প্রতিপালন করতে হবে।
আমরা যদি মেনেও নিই যে, আল কুরআনে ইসলামি শরীআতের সকল বিধিবিধান পরিপূর্ণরূপে বর্ণিত হয়েছে তবুও আমাদের মানতেই হবে যে, বিধান থাকলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে তা পালন করতেন সেই নমুনা আল কুরআনে নেই। তা আছে কেবল হাদীসে, সুন্নাহয় বা হিকমাতে, অথবা অন্য যে নামেই আমরা তাকে আখ্যায়িত করি না কেন।
এখন কীভাবে যুগযুগান্তের মানুষ রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণ করবেন, কীভাবে তাঁর নমুনায় শরীআত পালন করবেন, যদি না তাঁর কথা-কর্ম-অনুমোদন সংরক্ষিত থাকে? আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য যা পালন করা আবশ্যক করেছেন তা সংরক্ষণ করবেন না? যদি সংরক্ষিত না থাকে তবে তো তিনি এমন বিষয়ের আদেশ দিচ্ছেন যা পালন করা সম্ভবই নয়। মহান আল্লাহ কি তাঁর বান্দার উপর এমন দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে পারেন? তিনি তো পরিষ্কার বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।”২২০
সুতরাং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দাবি হচ্ছে, পরিপূর্ণরূপে এই বিশ্বাসও রাখা যে, তিনি হাদীস ও সুন্নাহ যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। যা তিনি মানতে বাধ্য করেছেন তা তিনি সংরক্ষণ করবেন না—আল্লাহর প্রতি এই অবধারণা করে কেউ নিজেকে মুমিন দাবি করতে পারে না।
টিকাঃ
২১৯. সূরা [৩৩] আহযাব, আয়াত: ২১。
২২০. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬। আরো দেখুন: সূরা বাকারাহ, ২৩৩; সূরা আনআম, ১৫২; সূরা আ'রাফ, ৪২; সূরা মু'মিনূন, ৬২。