📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবূ হুরাইরা (রা.)

📄 সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবূ হুরাইরা (রা.)


আবু হুরাইরা (রা.) সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি। হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁর নামে বর্ণিত হাদীস সর্বাধিক। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। ১৮১ অথচ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন সপ্তম হিজরিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিন বছরের কিছু বেশি কাল। এ বিষয়ে হাদীসশাস্ত্র না জানা সাধারণ মানুষের কৌতূহল এবং হাদীস অস্বীকারকারীদের আপত্তি—তিনি এত হাদীস কোথায় পেলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সারা জীবনের সাহচর্যধন্য সাহাবিদের তুলনায় তাঁর হাদীস বেশি হলো কীভাবে?
তাছাড়া আবু হুরাইরা (রা.) যেহেতু সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী, তাঁকে বিতর্কিত করতে পারলেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাদীসের ব্যাপারে সংশয় তৈরি করা যাবে, তাই হাদীস অস্বীকারকারী ইসলামের শত্রুরা তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের জন্য বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছে। কিন্তু তাদের উত্থাপিত সে সকল অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও অনৈতিহাসিক। সেসব প্রলাপের প্রত্যুত্তর করে আমরা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তকের কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। কোনো সাধারণ মুসলিমও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহধন্য এ মহান সাহাবি সম্পর্কে সেসব নোংরা কথা বিশ্বাস করবে না। তিনি কীভাবে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবির মর্যাদায় উত্তীর্ণ হলেন—আমরা কেবল সংক্ষেপে এ বিষয়ক ঐতিহাসিক পর্যালোচনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই।
আবু হুরাইরা (রা.) ইসলাম গ্রহণ ও ইলম অর্জনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন, আবাসে-প্রবাসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য অবধারিত করে নিয়েছেন, নবীজির ইন্তিকালের পর যখনই তিনি জানতে পেরেছেন কোনো সাহাবির কাছে এমন হাদীস আছে যা তিনি জানেন না, তাঁর দরজায় ছুটে গেছেন, অর্জিত হাদীস সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে দেওয়াকে জীবনের একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
তিনি যে হাদীসের প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন এ স্বীকৃতি নবীজি নিজেই দিয়েছেন। সাঈদ মাকবুরি বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের অধিক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে হবে? তখন নবীজি বলেন:
لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لَّا يَسْأَلُنِي عَنْ هُذَا الْحَدِيْثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ.
হে আবু হুরাইরা, আমি জানতাম, তোমার আগে এ হাদীস সম্পর্কে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞাসা করবে না। কেননা আমি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। ১৮২
অন্য সাহাবিগণও ইলমের প্রতি সর্বাধিক আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁদের পারিবারিক ব্যস্ততাও ছিল। আর আবু হুরাইরা (রা.) শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকে হাদীস চর্চায় নিরত থেকেছেন। এজন্য তাঁর হাদীসের ভান্ডার ছিল সর্বাধিক সমৃদ্ধ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন তিনি পরবর্তীদেরকে হাদীস শিক্ষা দেওয়ার ব্রত গ্রহণ করলেন, দেখা গেল তাঁর হাদীসের ভান্ডার ব্যাপক সমৃদ্ধ এবং অনেক এমন হাদীসও তিনি বর্ণনা করছেন যা অন্য অনেক সাহাবি জানেন না। এ বিষয়টি সাহাবিদেরকেও বিস্মিত করেছিল। সমাজে বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনাও হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) নিজেও সে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং বাস্তবতা খোলাসা করেছেন। সাহাবিগণও নিশ্চিত হয়েছেন এবং খোলামেলা সাক্ষ্য প্রদান করেছেন—তাঁর জন্য সর্বাধিক হাদীস জানা এবং অন্যদের না-জানা অনেক কিছু জানা একেবারেই স্বাভাবিক।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব এবং আবু সালামা ইবন আব্দুর রহমান (রাহ.) বলেছেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন:
إِنَّكُمْ تَقُوْلُوْنَ: إِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ يُكْثِرُ الْحَدِيثَ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتَقُوْلُوْنَ مَا بَالُ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ لَا يُحَدِّثُوْنَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمِثْلِ حَدِيْثِ أَبِي هُرَيْرَةَ وَإِنَّ إِخْوَتِي مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمْ صَفْقُ بِالْأَسْوَاقِ وَكُنْتُ أَلْزَمُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى مِلْءِ بَطْنِي فَأَشْهَدُ إِذَا غَابُوْا وَأَحْفَظُ إِذَا نَسُوْا وَكَانَ يَشْغَلُ إِخْوَتِي مِنَ الْأَنْصَارِ عَمَلُ أَمْوَالِهِمْ ( عَمَلُ أَرَضِيهِمْ) وَكُنْتُ امْرَأَ مِسْكِينًا مِّنْ مَسَاكِينِ الصُّفَةِ أَعِي حِيْنَ يَنْسَوْنَ.
তোমরা বলছ যে, আবু হুরাইরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি বেশি হাদীস বর্ণনা করেন। তোমরা এটাও বলছ যে, মুহাজির-আনসাররা কেন আবু হুরাইরার মতো হাদীস বর্ণনা করেন না? শোনো, বাস্তবতা এই যে, আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট পড়ে থাকতাম। তাই তাঁরা যখন থাকতেন না আমি তখনও থাকতাম। তাঁরা যা ভুলে যেতেন আমি তা মুখস্থ করতাম। আর আমার আনসার ভাইয়েরা নিজেদের খেত-খামারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি ছিলাম সুফফার অধিবাসী সর্বত্যাগী এক মিসকীন। যা তারা ভুলে যেতেন, আমি তা স্মরণ রাখতাম। ১৮৩
একজন আরব হিসাবে সে সময়ের আরব জাতির যে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল, আবু হুরাইরা (রা.) স্বভাবিকভাবেই সে প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু হাদীস সংরক্ষণের অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে তিনি নবীজির কাছে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য দুআ চেয়েছেন। নবীজিও তাঁর স্মৃতিশক্তির জন্য দুআ করেছেন। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
إِنَّهُ لَنْ يَبْسُطُ أَحَدٌ ثَوْبَهُ حَتَّى أَقْضِيَ مَقَالَتِيْ هَذِهِ ثُمَّ يَجْمَعَ إِلَيْهِ ثَوْبَهُ إِلَّا وَعَى مَا أَقُوْلُ فَبَسَطْتُ نَمِرَةً عَلَيَّ حَتَّى إِذَا قَضَى رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقَالَتَهُ جَمَعْتُهَا إِلَى صَدْرِي فَمَا نَسِيْتُ مِنْ مَقَالَةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِلْكَ مِنْ شَيْءٍ.
আমার এই কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে কেউ তার কাপড় বিছিয়ে রাখবে, তারপর নিজের শরীরের সাথে জড়িয়ে নেবে, সে আমি যা বলছি স্মরণ রাখতে পারবে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, তখন আমি আমার গায়ের কাপড়খানা তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিছিয়ে রাখলাম। তারপর বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেইসব কথা আজও কিছুই ভুলিনি। ১৮৪
সাঈদ মাকবুরি (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আমি বললাম:
يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَسْمَعُ مِنْكَ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنْسَاهُ قَالَ: ابْسُطُ رِدَاءَكَ فَبَسَطْتُهُ قَالَ: فَغَرَفَ بِيَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ: ضُمَّهُ فَضَمَمْتُهُ فَمَا نَسِيْتُ شَيْئًا بَعْدَهُ.
হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার কাছ থেকে শোনা অনেক হাদীস ভুলে যাই। তিনি বললেন, তোমার চাদর মেলে ধরো। আমি মেলে ধরলাম। তিনি দুই হাত অঞ্জলিবদ্ধ করে বললেন, এবার বুকের সাথে লাগাও। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি।১৮৫
সাঈদ ইবন আবী হিন্দের সূত্রে আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত :
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ أَلَا تَسْأَلُنِي مِنْ هَذِهِ الْغَنَائِمِ الَّتِي يَسْأَلُنِي أَصْحَابُكَ؟ فَقُلْتُ أَسْأَلُكَ أَنْ تُعَلَّمَنِي مِمَّا عَلَّمَكَ اللهُ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমার সঙ্গী-সাথিদের মতো তুমি কি আমার কাছে এই গনীমতের অংশ চাইবে না? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি চাই, আপনি আমাকে সেই ইলম শিক্ষা দেবেন যে ইলম আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন।১৮৬
এক ব্যক্তি যাইদ ইবন সাবিত (রা.)-এর নিকট এসে তাঁকে একটি বিষয় জিজ্ঞাসা করল। যাইদ (রা.) তাকে বললেন, তুমি গিয়ে আবু হুরাইরা (রা.)-কে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করো। কারণ একদিনের ঘটনা এই যে, আমি, আবু হুরাইরা (রা.) এবং অন্য এক ব্যক্তি মসজিদে দুআ ও যিকির করছিলাম। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এসে বসলে আমরা চুপ হয়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা যে দুআ করছিলে তা করতে থাকো'। যাইদ (রা.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.)-এর আগে আমরা দুজন দুআ করলাম। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দুআয় 'আমীন' বললেন। তারপর আবু হুরাইরা (রা.) দুআ করলেন। দুআয় তিনি বললেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِثْلَ مَا سَأَلَكَ صَاحِبَايَ هَذَانِ وَأَسْأَلُكَ عِلْمًا لَا يُنْسَى.
হে আল্লাহ, আমার এই দুই সাথি তোমার কাছে যেমন প্রার্থনা করেছে আমিও তেমন প্রার্থনা করছি এবং আরো প্রার্থনা করছি এমন ইলম যা কখনো ভুলে যাব না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমীন'। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরাও এমন ইলম চাই যা ভুলে যাব না। তিনি বললেন, এক্ষেত্রে এই দাওসি গোলাম আবু হুরাইরা তোমাদের থেকে অগ্রগামী। ১৮৭
আবু হুরাইরা (রা.)-এর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করার পর তিনি আর কিছুই বিস্মৃত হননি। সাঈদ মাকবুরি (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন:
يَقُولُ النَّاسُ : أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَلَقِيْتُ رَجُلًا فَقُلْتُ: بِمَا قَرَأَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَارِحَةَ فِي الْعَتَمَةِ؟ فَقَالَ: لَا أَدْرِي فَقُلْتُ: لَمْ تَشْهَدْهَا؟ قَالَ: بَلَى قُلْتُ: لَكِنْ أَنَا أَدْرِي قَرَأَ سُوْرَةَ كَذَا وَكَذَا.
লোকে বলাবলি করত, আবু হুরাইরা বেশি বেশি বর্ণনা করছে। সে সময় আমি এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, বলো তো গতরাতে ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সূরা পাঠ করেছেন? সে বলল, জানি না। আমি বললাম, ওই সালাতে কি তুমি উপস্থিত ছিলে না? সে বলল, হ্যাঁ, ছিলাম। আমি বললাম, কিন্তু আমি জানি। তিনি অমুক অমুক সূরা পাঠ করেছেন। ১৮৮
মদীনার গভর্নর মারওয়ান একবার আবু হুরাইরা (রা.)-এর স্মরণশক্তি পরীক্ষা করেন। মারওয়ানের সচিব আবু যুআইযাআহ বলেন, মারওয়ান আবু হুরাইরা (রা.)-কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে হাদীস বর্ণনা করতে আবেদন করেন। আর আমাকে পর্দার আড়ালে বসিয়ে রাখেন তাঁর বর্ণিত হাদীস লিখে রাখার জন্য। পরবর্তী বছর তিনি আবার তাঁকে ডেকে পাঠান এবং পূর্বে বর্ণিত হাদীস বর্ণনা করতে আবেদন করেন। আর আমাকে নিরীক্ষণ করতে বলেন। আমি দেখলাম, তিনি গত বছরের হাদীস হুবহু বর্ণনা করলেন; একটি হরফও পরিবর্তন করলেন না। ১৮৯
এভাবে যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শেখার জন্য তাঁর সান্নিধ্যকে আবশ্যক করে নিয়েছিলেন তাঁর জন্য কি তিন বছরেরও অধিককালে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি হাদীস অবগত হওয়া আশ্চর্যের কিছু? উপরন্তু যে সকল হাদীস তিনি সরাসরি নবীজির কাছ থেকে শোনার সুযোগ পাননি সে সকল হাদীসও যারা জানেন তাঁদের কাছ থেকে শিখে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।
ওয়ালিদ ইবন রাবাহ বলেন, আমি শুনেছি, আবু হুরাইরা (রা.) মারওয়ানকে বলছেন:
نَعَمْ قَدِمْتُ وَرَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِخَيْبَرَ سَنَةَ سَبْعِ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ قَدْ زِدْتُ عَلَى الثَّلَاثِينَ سَنَةً سَنَوَاتٍ وَأَقَمْتُ مَعَهُ حَتَّى تُوُفِّيَ أَدُوْرُ مَعَهُ فِي بُيُوتِ نِسَائِهِ وَأَخْدِمُهُ وَأَنَا وَاللَّهِ يَوْمَئِذٍ مُقِل وَأُصَلِّي خَلْفَهُ وَأَحُجُّ وَأَغْزُوْ مَعَهُ فَكُنْتُ وَاللَّهِ أَعْلَمَ النَّاسِ بِحَدِيثِهِ قَدْ وَاللهِ سَبَقَنِي قَوْمٌ بِصُحْبَتِهِ وَالْهِجْرَةِ إِلَيْهِ مِنْ قُرَيْشٍ وَالْأَنْصَارِ وَكَانُوا يَعْرِفُوْنَ لُزُوْمِي لَهُ فَيَسْأَلُوْنِي عَنْ حَدِيثِهِ مِنْهُمْ عُمَرُ وَعُثْمَانُ وَعَلِيٌّ وَطَلْحَةُ وَالزُّبَيْرُ فَلَا وَاللَّهِ مَا يَخْفَى عَلَيَّ كُلُّ حَدِيثٍ كَانَ بِالْمَدِينَةِ وَكُلُّ مَنْ أَحبَّ اللَّهَ وَرَسُوْلَهُ وَكُلُّ مَنْ كَانَتْ لَهُ عِنْدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْزِلَةٌ وَكُلُّ صَاحِبِ لَهُ.
হ্যাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সপ্তম হিজরিতে খাইবারের যুদ্ধকালেই এসেছিলাম। তখন আমার বয়স ত্রিশের কিছু বেশি। আর সে সময় থেকে তাঁর ইন্তিকাল পর্যন্ত সর্বদা আমি তাঁর সাথেই থেকেছি। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রীদের বাসায় গেছি। তাঁর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম, তখন আমি ছিলাম সর্বহারা নিঃস্ব। তাঁর পেছনে সালাত আদায় করতাম। তাঁর সাথে হজ্জে ও যুদ্ধে যেতাম। সুতরাং আল্লাহর কসম, আমি তাঁর হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তি। আল্লাহর কসম, কুরাইশ ও আনসাদের অনেকেই তাঁর সান্নিধ্য ও তাঁর নিকট হিজরতে আমার অগ্রগামী। কিন্তু সর্বদা তাঁর নিকট আমার অবস্থানের বিষয়টি তাঁরা জানেন। তাই তাঁরা অনেকেই আমার কাছে তাঁর হাদীস জানতে চান। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর (রা.)। আল্লাহর কসম, মদীনার কোনো হাদীসই আমার অজ্ঞাত নয়। আমি জানি, কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। তাঁর কাছে কার বিশেষ মর্যাদা ছিল এবং কারা তাঁর সোহবতধন্য। ১৯০
এভাবে আবু হুরাইরা (রা.) সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করেন। অতঃপর তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি সত্ত্বেও হাদীস যথাযথ স্মরণ রাখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতেন। তিনি বলেছেন :
إِنِّي أُجَرِّئُ اللَّيْلَ ثَلَاثَةَ أَجْزَاءٍ فَجُزْءٌ لِقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَجُزْءٌ أَنَامُ فِيهِ وَجُزْءٌ أَتَذَكَّرُ فِيْهِ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আমি রাতকে তিন ভাগে ভাগ করি। একভাগ কুরআন পাঠের জন্য, একভাগে ঘুম যাই, আর একভাগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুশীলন করি। ১৯১
তবে নবীজির যুগে তিনি লিখিত আকারে নয়, বরং স্মৃতিতেই হাদীস সংরক্ষণ করতেন। আর আমরা জেনে এসেছি যে, নবীজির দু'আয় তিনি ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। একবার হাদীস শুনলে আর ভুলতেন না। তিনি বলেছেন :
مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيثًا عَنْهُ مِنِّي إِلَّا مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلَا أَكْتُبُ.
কোনো সাহাবি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস আমার থেকে বেশি জানতেন না। তবে আব্দুল্লাহ ইবন আমর লিখে রাখতেন আর আমি লিখতাম না। ১৯২
তবে পরবর্তীকালে তিনি তাঁর সংগৃহীত হাদীস লিখেও নিয়েছিলেন। তাঁর ছাত্র হাসান ইবন আমর (রাহ.) বলেন, একবার আবু হুরাইরা (রা.)-এর নিকট আমি একটি হাদীস বললাম। তিনি বললেন, তুমি যদি এই হাদীসটি আমার থেকে শুনে থাকো তবে তা আমার কাছে লিখিত আছে। তারপর তিনি হাত ধরে আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস লিখিত অনেক পাণ্ডুলিপি দেখালেন এবং বললেন:
قَدْ أَخْبَرْتُكَ أَنِّي إِنْ كُنْتُ قَدْ حَدَّثْتُكَ بِهِ فَهُوَ مَكْتُوْبُ عِنْدِي.
আমি তো তোমাকে বলেছি, আমি যদি তোমাকে হাদীসটি শুনিয়ে থাকি তবে অবশ্যই আমার কাছে তা লিখিত থাকবে। ১৯৩
হাদীস শিক্ষাগ্রহণের মতো হাদীস শিক্ষাদানটাও সাহাবিদের কারো ছিল প্রধানতম কাজ, কারো ছিল অন্যতম কাজ। আর আবু হুরাইরা (রা.)-এর ছিল একমাত্র কাজ। তিনি হাদীস সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যেমন সর্বোচ্চ সচেষ্ট ব্যক্তি ছিলেন, তেমনি পরবর্তীদের নিকট হাদীস পৌঁছে দেওয়াকেও অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ছাত্র আ'রাজ (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন :
إِنَّ النَّاسَ يَقُوْلُوْنَ أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَلَوْلَا آيَتَانِ فِي كِتَابِ اللهِ مَا حَدَّثْتُ حَدِيثًا ثُمَّ يَتْلُوْ {إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ البَيِّنَاتِ وَالْهُدَى إِلى قَوْلِهِ الرَّحِيمُ} إِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ وَإِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْأَنْصَارِ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الْعَمَلُ فِي أَمْوَالِهِمْ وَإِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَلْزَمُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشِبَعِ بَطْنِهِ وَيَحْضُرُ مَا لَا يَحْضُرُوْنَ وَيَحْفَظُ مَا لَا يَحْفَظُوْنَ.
লোকেরা বলাবলি করছে, আবু হুরাইরা বেশি বেশি বর্ণনা করছে। যদি আল্লাহর কিতাবে দুটি আয়াত না থাকত, আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। তারপর তিনি সূরা বাকারাহর ১৫৯ ও ১৬০ নং আয়াত দুটি তিলাওয়াত করেন। ১৯৪
এবং অন্য সাহাবিদের তুলনায় তাঁর হাদীস ভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার কারণ হিসাবে বলেন, আমাদের মুহাজির ভাইয়েরা ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে মশগুল থাকতেন, আনসার ভাইয়েরা অন্যান্য কাজে মশগুল থাকতেন আর আবু হুরাইরা শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে পড়ে থাকত। তাঁরা যখন অনুপস্থিত থাকতেন সে তখনো উপস্থিত থাকত, তাঁরা যা মুখস্থ করতে পারতেন না সে তাও মুখস্থ করত। ১৯৫
এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিদের সমাজেই আবু হুরাইরা (রা.) হাদীসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে পরিগণিত হন। দলে দলে তাবিয়ি প্রজন্ম তাঁর নিকট হাদীস শিখতে আসেন। এমনকি প্রধান সাহাবিরাও তাঁকে হাদীস জিজ্ঞাসা করেন। যদিও তাঁর হাদীসের সংখ্যা দেখে প্রথমে তাঁরা হতচকিত হয়েছেন। তবে পরে বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাঁরা খোলাখুলি স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, আবু হুরাইরার জন্য সর্ববৃহৎ হাদীসের ভান্ডার হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাঁর হাদীসের ছাত্র, যাদের বর্ণিত হাদীস হাদীসের কিতাবে সংকলিত হয়েছে, তাদের সংখ্যা আট শতাধিক।
ওয়ালিদ ইবন আব্দুর রাহমান বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন:
مَنْ شَهِدَ جَنَازَةً فَلَهُ قِيرَاطٌ .
যে ব্যক্তি জানাযায় উপস্থিত হবে তার জন্য এক কীরাত সাওয়াব।
তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) বলেন, হে আবু হুরাইরা, একটু ভেবে দেখুন, আপনি কী হাদীস বর্ণনা করছেন! আপনি তো নবীজি থেকে বেশি বেশি হাদীস বর্ণনা করে থাকেন! তখন আবু হুরাইরা (রা.) তাঁর হাত ধরে আয়িশা (রা.)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। এবং তাঁকে বললেন, আপনি একে বলে দিন, এই হাদীসটি আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেমন শুনেছেন। আয়িশা (রা.) আবু হুরাইরা (রা.)- এর বর্ণনা সত্যায়ন করেন। তখন আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, হে আবু আব্দুর রাহমান, আল্লাহর কসম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে উপস্থিত থাকা ব্যতীত গাছের একটি চারা লাগানো বা বাজার- ঘাটের কোনো কাজ আমার ছিল না। তখন ইবন উমার (রা.) বলেন:
أَنْتَ أَعْلَمُنَا يَا أَبَا هُرَيْرَةَ بِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَحْفَظُنَا لِحَدِيثِهِ.
হে আবু হুরাইরা, আপনি আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তি এবং আমাদের মধ্যে আপনিই তাঁর হাদীস সর্বাধিক মুখস্থকারী।১৯৬
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) আবু হুরাইরা (রা.)-কে বলেছেন:
يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْتَ كُنْتَ أَلْزَمَنَا لِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَحْفَظَنَا لِحَدِيثِهِ.
হে আবু হুরাইরা, আপনি আমাদের মধ্যে অধিক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য অলম্বনকারী এবং তাঁর হাদীস সর্বাধিক সংরক্ষণকারী। ১৯৭
আবু সালিহ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরাইরা (রা.) বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمُ الرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الصُّبْحِ فَلْيَضْطَجِعْ عَلَى يَمِينِهِ.
যখন তোমাদের কেউ ফজরের পূর্বের দুই রাকআত পড়বে তখন ডান কাতে শয়ন করবে।
তখন মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁকে বলল, ডান কাতে শুয়ে বিশ্রামের সময়টুকুতে কেউ যদি মসজিদে রওয়ানা করে তবে কি যথেষ্ট হবে না? আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, না।
এ কথা ইবন উমার (রা.)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা নিজের উপর বেশি করছে। তখন ইবন উমারকে বলা হলো, আবু হুরাইরা (রা.)-এর কোনো কথা কি আপনি অস্বীকার করছেন? তিনি বললেন, না। তবে আবু হুরাইরা সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন আর আমরা নমনীয়তা গ্রহণ করছি। এ কথা আবু হুরাইরা (রা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বলেন:
فَمَا ذَنْبِي إِنْ كُنْتُ حَفِظْتُ وَنَسَوْا.
এতে আমার কী দোষ, যদি তাঁরা ভুলে যায় আর আমি স্মরণ রাখি?১৯৮
মালিক ইবন আবী আমির (রাহ.) বলেন, এক ব্যক্তি সাহাবি তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.)-এর নিকট এসে বলল, হে আবু মুহাম্মাদ, ওই ইয়ামানি লোক, অর্থাৎ আবু হুরাইরা, সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? সে কি আপনাদের থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সম্পর্কে বেশি জ্ঞাত—তাঁর কাছে এমন অনেক কথা শুনতে পাই যা আপনাদের কাছে শুনি না? নাকি সে এমন কথাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বলে যা তিনি বলেননি? তখন তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.) বলেন :
وَاللَّهِ مَا نَشُكُ أَنَّهُ قَدْ سَمِعَ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ نَسْمَعْ وَعَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ إِنَّا كُنَّا أَقْوَامًا أَغْنِيَاءَ وَلَنَا بُيُؤْتَاتُ وَأَهْلُوْنَ وَكُنَّا نَأْتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي طَرَفَيِ النَّهَارِ وَكَانَ مِسْكِيْنًا لَا مَالَ لَهُ وَلَا أَهْلَ إِنَّمَا كَانَتْ يَدُهُ مَعَ يَدِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ يَدُورُ مَعَهُ حَيْثُ مَا دَارَ وَلَا نَشُكُ أَنَّهُ قَدْ عَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ وَسَمِعَ مَا لَمْ نَسْمَعُ ... وَلَمْ يَتَّهِمْهُ أَحَدٌ مِنَّا أَنَّهُ تَقَوَّلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ.
আল্লাহর কসম, আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন অনেক কথা শুনেছেন যা আমরা শুনিনি, এমন অনেক কিছু জানেন যা আমরা জানি না। কেননা আমরা সম্পদের অধিকারী ছিলাম। আমাদের বাড়িঘর, পরিবার-পরিজন ছিল। আমরা দিনের দুই প্রান্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসতাম। আর তিনি ছিলেন রিক্তহস্ত ও পরিবার-পরিজনহীন মিসকীন।
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরেই নির্ভরশীল ছিলেন। নবীজি যেখানে যেতেন তিনিও সেখানে যেতেন। তাই আমরা নিঃসন্দেহ যে, তিনি এমন অনেক কিছু জানেন যা আমরা জানি না এবং এমন অনেক কিছু শুনেছেন যা আমরা শুনিনি। আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর ব্যাপারে এই সন্দেহ করেনি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বানোয়াট কথা বলেন। ১৯৯
উপরে উত্থাপিত তথ্যের আলোকে আমরা জানতে পারছি, আবু হুরাইরা (রা.) তিন বছরের অধিক সময় শুধুই হাদীস অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে আবাসে-প্রবাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। তারপর মদীনায় অবস্থানরত সকল সাহাবির হাদীস তিনি সংগ্রহ করেছেন।
আমরা এ বিষয়টিও জেনেছি যে, সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো হাদীস শুনলে পরস্পরের মাঝে আলোচনা করতেন। এভাবে একটি হাদীস শুধু একজনই জানতেন না। বরং বহুজনের মাঝে ছড়িয়ে যেত। সুতরাং যারা মদীনার বাইরে চলে গিয়েছিলেন তাঁদের জানা হাদীসগুলো যে শুধু তাঁরাই জানতেন এমন নয়। বরং মদীনায় অবস্থানরত কোনো না কোনো সাহাবি হয়তো সেটি জানতেন। সুতরাং মদীনার সকল হাদীস সংগ্রহ করা মানে হাদীসের প্রায় পুরো ভান্ডারটাই আত্মস্থ করা।
এভাবে হাদীসের প্রায় পুরো ভান্ডার আত্মস্থ করার পর আবু হুরাইরা (রা.) প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল যাবৎ পরবর্তীদের নিকট নিরবচ্ছিন্নভাবে হাদীস বর্ণনা করে গেছেন। সুতরাং তাঁর নামে সর্বাধিক হাদীস, যার সংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি, বর্ণিত হওয়া মোটেও আশ্চর্যের বা অসম্ভব বিষয় নয়। তিনি বারবার বলেছেন এবং অন্য সাহাবিগণও মুক্তকণ্ঠে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সাহাবিদের মাঝে তিনিই ছিলেন সর্বাধিক হাদীস জানা ব্যক্তি।
যে সকল হাদীস তিনি সাহাবিদের কাছ থেকে শিখেছেন বর্ণনার ক্ষেত্রে কখনো তিনি উস্তাদ সাহাবির নাম বলেছেন কখনো বলেননি। আর কোনো সাহাবির জন্য উস্তাদ সাহাবির নাম উহ্য রেখে হাদীস বর্ণনা করা শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দোষের কিছু নয়। একটি হাদীস বর্ণনার পর জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি বলেন:
سَمِعْتُ ذَلِكَ مِنَ الْفَضْلِ وَلَمْ أَسْمَعْهُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
এটি আমি ফযল ইবন আব্বাস (রা.) থেকে শুনেছি। সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনিনি। ২০০
অন্য সাহাবিগণও এমনটি করতেন। এ বিষয়ক কিছু আলোচনা আমরা 'হাদীস সংরক্ষণ ও সম্প্রচারে সাহাবিগণ' শিরোনামের অধীনে দেখেছি।
হুমাইদ (রাহ.) বলেন, আনাস ইবন মালিক (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন, আপনি এ হাদীসটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন? এ প্রশ্নে আনাস (রা.) প্রচণ্ড রেগে যান এবং বলেন:
وَاللهِ مَا كُلُّ مَا تُحَدِّثُكُمْ بِهِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ كَانَ يُحَدِّثُ بَعْضُنَا بَعْضًا وَلَا يَتَّهِمُ بَعْضُنَا بَعْضًا.
আল্লাহর কসম, আমরা যে সকল হাদীস বর্ণনা করি সব হাদীসই আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি শুনিনি। বরং আমরা নবীজির কাছ থেকে শোনা হাদীস একে অপরকে বর্ণনা করতাম। আর আমাদের একে অপরকে সন্দেহ করত না। ২০১
হাদীসশাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম আল্লামা উসমান ইবন আব্দুর রাহমান ইবনুস সালাহ (রাহ.) [৬৪৩ হি.] বলেন :
إِنَّا لَمْ نَعُدَّ فِي أَنْوَاعِ الْمُرْسَلِ وَنَحْوِهِ مَا يُسَمًّى فِي أُصُولِ الْفِقْهِ مُرْسَلَ الصَّحَابِي مِثْلَمَا يَرْوِيْهِ ابْنُ عَبَّاسٍ وَغَيْرُهُ مِنْ أَحْدَاثِ الصَّحَابَةِ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يَسْمَعُوْهُ مِنْهُ لِأَنَّ ذَلِكَ في حُكْمِ الْمَوْصُوْلِ الْمُسْنَدِ لِأَنَّ رِوَايَتَهُمْ عَنِ الصَّحَابَةِ وَالْجَهَالَةَ بِالصَّحَابِي غَيْرُ قَادِحَةٍ لِأَنَّ الصَّحَابَةَ كُلَّهُمْ عُدُوْلٌ.
ইবন আব্বাস প্রমুখ নবীন সাহাবি যে সকল হাদীস সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শোনেননি, বরং কোনো সাহাবি থেকে শুনে সরাসরি নবীজির নামে বর্ণনা করেছেন, ফিকহশাস্ত্রে তাকে 'সাহাবির মুরসাল' বলা হলেও আমরা তাকে সূত্র-বিচ্ছিন্ন মুরসাল গোত্রীয় বলে গণ্য করি না। এ ধরনের বর্ণনা অবিচ্ছিন্ন সনদের বর্ণনা বলে গণ্য। কেননা নাম উহ্য রেখে সাহাবি কর্তৃক সাহাবির বর্ণনা দূষণীয় নয়। কারণ সাহাবিগণ সকলেই আদিল তথা সৎ ও নির্ভরযোগ্য। ২০২

টিকাঃ
১৮১. কোনো কোনো গবেষকের মতে আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মূলত ১২৩৬ টি। এই ১২৩৬ টি হাদীসই পাঁচ হাজারের অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই জন্যই বলা হয়, আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত হাদীস পাঁচ হাজারের বেশি। বিস্তারিত জানতে দেখুন: الاتجاه العقلي وعلوم الحديث للدكتور خالد أبي الخيل، دفاع عن أبي هريرة للدكتور عبد المنعم صالح.
১৮২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৮৮৫৮; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৯৯。
১৮৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ২০৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৪৯৩。
১৮৪. সহীহ বুখারি, হাদীস: ২০৪৭。
১৮৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৯; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৮৩৫。
১৮৬. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৯; আবু নুআইম, হিলয়াতুল আউলিয়া: ১/৩৮১। হাদীসটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য। দেখুন: আল ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ: ৭/৩৫৬。
১৮৭. নাসায়ি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৫৮৩৯; তাবারানি, আল মু'জামুল আওসাত, হাদীস : ১২২৮; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৫৮。
১৮৮. সহীহ বুখারি, হাদীস : ১২২৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১০৭২২。
১৮৯. ইবন হাজার, আল ইসাবাহ, ৭/৩৫৩。
১৯০. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৬; ইবন সা'দ, আত তাবাকাত ১/৩৫৯; ইবন আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৬৭/৩৫৫。
১৯১. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৮; সুনান দারিমি, হাদীস : ২৭২。
১৯২. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৩; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৮。
১৯৩. ইবন আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, হাদীস: ৪২২; আসকালানি, ফাতহুল বারি ১/২০৭ ও ১/২১৫。
১৯৪. আয়াত দুটির অনুবাদ: 'নিশ্চয় যারা আমার নাযিলকৃত উজ্জ্বল নিদর্শনাবলি ও হিদায়াত গোপন করে মানুষের জন্য কিতাবে আমি তা বর্ণনা করার পর তাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ করেন এবং অভিশাপকারীগণ অভিশাপ করেন। তবে যারা বিরত হয়, সংশোধন করে নেয় এবং বর্ণনা করে দেয় আমি তাদের তাওবা কবুল করে থাকি। আর আমি তো তাওবা কবুলকারী দয়ালু।' এর দ্বারা বোঝা যায়, আবু হুরাইরা (রা.)-ও হাদীসকে অবতীর্ণ ওহি হিসাবে বিশ্বাস করতেন। কেননা অবতীর্ণ ওহি গোপনের দায় থেকে বাঁচার জন্যই হাদীস বর্ণনা করেন বলে এ হাদীসে তিনি জানাচ্ছেন。
১৯৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৮。
১৯৬. ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ২/২৭৭; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৬৭; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৪৪৫৩; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস: ৬২৭০。
১৯৭. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৮৩৬。
১৯৮. সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ১২৬১; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ১১২০; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৪৮৮৭。
১৯৯. মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৬৩৬; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৭২; সুনান তিরমিজি, হাদীস: ৩৮৩৭; মাকদিসি, আল আহাদীসুল মুখতারাহ, হাদীস: ৮১৪。
২০০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১০৯; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৭৯৯৬。
২০১. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬৪৫৮; তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর, হাদীস: ৬৯৯。
২০২. মুকাদ্দামাহ ইবনুস সালাহ, পৃ. ৫৬。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 উম্মাহর নিকট হাদীস সংরক্ষণের গুরুত্ব

📄 উম্মাহর নিকট হাদীস সংরক্ষণের গুরুত্ব


হাদীস সংরক্ষণ, সম্প্রচার ও মান্য করার ক্ষেত্রে সাহাবিদের গুরুত্ব ও আগ্রহ আমরা দেখলাম। পরবর্তীদের গুরুত্ব ও আগ্রহও এমনই ছিল। হাদীসের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে উম্মাতের যে বিশ্বাস তা হাদীস শিক্ষাগ্রহণ ও দানে উম্মাতকে এমন প্রেষণা দান করেছে মানব-সভ্যতার ইতিহাসে ইতিহাসের কোনো পর্ব বা অধ্যায় সংরক্ষণে মানব জাতির কোনো প্রজন্ম এর ধারেকাছের আগ্রহও অনুভব করেনি।
ইতিহাসের সর্বসাক্ষ্য হাজির করলে আমরা দেখতে পাব, মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে কুরআনের পরেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ও সর্বপ্রযত্নে সংরক্ষিত হয়েছে হাদীসে নববি। কুদরতে ইলাহি মনুষ্য প্রজাতির যে অংশ দ্বারা হাদীস সংরক্ষণের খেদমত নিয়েছে তাদেরকে এ কাজে এত নিবিষ্টতা দান করেছে এবং তাদেরকে দিয়ে এমন সব ম্যাকানিজম ব্যবহার করিয়েছে যে, হাদীস পরিপূর্ণভাবে এবং অবিকলরূপে সংরক্ষিত হতে পেরেছে। কুরআন নাযিলের সাথে সাথে লিখিত হয়েছে, কিন্তু হাদীস তা হয়নি। এজন্য হাদীস যতদিন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রন্থাবদ্ধ না হয়েছে উচ্চ মনোবল ও মেধাসম্পন্ন বিরাট একটা গোষ্ঠী এ কাজে পরিপূর্ণরূপে নিবেশিত থেকেছে। তারা হাদীস সংরক্ষণকে কুরআন সংরক্ষণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করেছে এবং নিজেদের সর্বসাধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছে। আমরা ইতিহাসের কিছু সাক্ষ্য হাজির করছি।
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলতেন:
تَذَاكَرُوْا هُذَا الْحَدِيثَ لَا يَنْفَلِتْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ لَيْسَ مِثْلَ الْقُرْآنِ مجْمُوعٌ مَحْفُوظٌ وَإِنَّكُمْ إِنْ لَّمْ تَذَاكَرُوْا هُذَا الْحَدِيثَ يَنْفَلِتْ مِنْكُمْ وَلَا يَقُوْلَنَّ أَحَدُكُمْ حَدَّثْتُ أَمْسِ فَلَا أُحَدِّثُ الْيَوْمَ بَلْ حَدَّثْ أَمْسِ وَلْتُحَدِّثِ الْيَوْمَ وَلْتُحَدِّثْ غَدًا.
তোমরা নিয়মিত হাদীস চর্চা ও আলোচনা করতে থাকবে, তাহলে তোমাদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হতে পারবে না। হাদীস তো কুরআনের মতো এখনো একত্র সংকলিত নয়। তাই তোমরা যদি নিয়মিত হাদীসের চর্চা-আলোচনা জারি না রাখো তোমাদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তোমরা কেউ কোনোভাবেই বলবে না যে, গতকাল হাদীস আলোচনা করেছি, আজ আর করব না। বরং গতকাল, আজ এবং আগামীকাল—এভাবে প্রতিদিন হাদীস চর্চা জারি রাখবে।২০৩
ইবন আব্বাস (রা.)-এর এ বক্তব্য থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হাদীস যেহেতু কুরআনের মতো লিপিবদ্ধ ছিল না তাই তাঁরা হাদীস সংরক্ষণে আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।
তাবিয়ি ইসমাঈল ইবন উবাইদুল্লাহ (রাহ.) [১৩২ হি.] বলতেন :
يَنْبَغِي لَنَا أَنْ نَحْفَظَ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحْفَظُ الْقُرْآنُ لِأَنَّ اللَّهَ يَقُوْلُ: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ.
আমাদের কর্তব্য কুরআনের মতোই গুরুত্ব দিয়ে হাদীস মুখস্থ ও সংরক্ষণ করা। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তোমরা তা গ্রহণ করো। ২০৪
তাবিয়ি ইসরাঈল ইবন ইউনুস (রাহ.) [১৬০ হি.] বলেন :
كُنْتُ أَحْفَظُ حَدِيثَ أَبِي إِسْحَاقَ كَمَا أَحْفَظُ السُّوْرَةَ مِنَ القُرْآنِ.
আমি আবু ইসহাক বর্ণিত হাদীসগুলো এমনভাবে মুখস্থ করেছি যেভাবে কুরআনের সূরা মুখস্থ করি। ২০৫
তাবিয়ি কাতাদাহ (রাহ.) সাঈদ ইবন আবী আরূবাহকে সূরা বাকরাহ মুখস্থ শোনালেন। একটি হরফেও কোনো ভুল হলো না। তারপর তিনি বললেন:
لَأَنَا لِصَحِيفَةِ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَحْفَظُ مِنِّي لِسُوْرَةِ الْبَقَرَةِ.
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) সংকলিত হাদীসের পুস্তিকা সূরা বাকারাহ থেকে আমার বেশি মুখস্থ। ২০৬
তাবিয়ি শাহর ইবন হাওশাব (রাহ.) [১১২ হি.] এর ছাত্র আব্দুল হামীদ ইবন বাহরাম সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল (রাহ.) বলেন, তার কাছে শাহর ইবন হাওশাবের পাণ্ডুলিপি ছিল :
كَانَ يَحْفَظُهَا كَأَنَّهُ يَقْرَأُ سُوْرَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ.
তিনি তার হাদীস এমনভাবে মুখস্থ করতেন যেন কুরআনের সূরা পাঠ করছেন। ২০৭
এ ধরনের প্রচুর বর্ণনা ইতিহাস ও হাদীস বিষয়ক গ্রন্থাদিতে বিদ্যমান আছে। মুসলিম উম্মাহ এভাবেই কুরআনের মতো গুরুত্ব দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সংরক্ষণ করেছে।

টিকাঃ
২০৩. সুনান দারিমি, হাদীস: ৬২৪。
২০৪. খতীব বাগদাদি, আল কিফায়াহ: ১৭; ইবন আসাকির, তারীখ দিমাশ্ক, ৮/৪৩৬; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ৩/১৪。
২০৫. যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ১০/৭৮; খতীব বাগদাদি, তারীখ বাগদাদ, ৭/৪৭৬。
২০৬. বুখারি, আত তারীখুল কাবীর, ৭/১৮৬; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৭/১৭১。
২০৭. ইবন আসাকির, তারীখ দিমাশ্ক, ২৩/২২৪; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ১৬/৪১১。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণ ও প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপি

📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণ ও প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপি


প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে সংকলিত। এবং এ সকল গ্রন্থে সংকলিত হাদীসের শুরুতে যে সকল বর্ণনাসূত্র আছে সে বর্ণনাসূত্রের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত حَدَّثَنَا (আমাদেরকে হাদীস বলেছেন), أَخْبَرَنَا، أَنْبَأَنَا (আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন), سَمِعْتُ (আমি শুনেছি) ইত্যাদি শ্রুতিবাচক শব্দে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য হাদীসশাস্ত্র না জানা অনেকে ধারণা করতে পারেন এবং হাদীস-বিরোধীরা অপপ্রচার করেন যে, সাহাবি, তাবিয়ি ও তাবি-তাবিয়ি যুগে হাদীস শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণের নিয়ম ছিল না। বরং মৌখিকভাবে বর্ণনা করা ও মুখস্থ করে নেওয়াই ছিল এক্ষেত্রে একমাত্র রীতি।
কিন্তু বিষয়টি কখনোই তা নয়। হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগভীর ভাসাভাসা জ্ঞান এ বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে এবং ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের মানসেই এ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। বস্তুত হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সূক্ষ্মতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তারা মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন। হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সনদ বর্ণনায় সর্বদা মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির পাশাপাশি লেখন ও পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করা হতো।
সাহাবিগণ সাধারণত হাদীস মুখস্থ করতেন এবং কখনো কখনো লিখেও রাখতেন। মূলত সাহাবিদের জন্য হাদীস লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। কেননা অধিকাংশ সাহাবি থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র ২০/৩০টি বা তার চেয়ে কম। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। তবে সনদের বিভিন্নতা বাদ দিয়ে শুধু মূল হাদীসের সংখ্যা হিসাব করলে তা হবে মাত্র হাজারের কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি থেকে ২০/৩০টি, ১০০টি, এমনকি হাজারটি ঘটনা বা কথা বর্ণনা করার জন্য লিখে রাখার প্রয়োজন ছিল না।
কেননা এছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোনো বড় বিষয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতি আলোচনা, তাঁর নির্দেশাবলি হুবহু পালন, অনুকরণ ও তাঁর কথা মানুষদের শোনানোই ছিল তাঁদের জীবনের প্রধানতম কাজ। অন্য কোনো জাগতিক ব্যস্ততা তাঁদের মন-মগজকে ব্যস্ত করতে পারত না। আর যে স্মৃতি ও কথা সর্বদা মনে জাগরূক এবং কর্মে বিদ্যমান তা তো আর পৃথক কাগজে লিখে রাখার দরকার হয় না। তা সত্ত্বেও অনেক সাহাবি তাঁদের মুখস্থ হাদীস লিখে রাখতেন। আবু হুরাইরা (রা.)-ও পরবর্তীকালে তাঁর হাদীসগুলো লিখে রেখেছিলেন। এমনকি নবীজি নিজেও তাঁর অনেক হাদীস লিখিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিগণ (রা.) কর্তৃক লিখিত হাদীসের পরিমাণ একেবারেই কিঞ্চিন্মাত্র নয়। এ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা একত্র করলে দেখা যায় তার পরিমাণ অনেক।
সাহাবিদের ছাত্র তাবিয়িদের যুগ থেকেই হাদীস শিক্ষা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল লিখন পদ্ধতি। অধিকাংশ তাবিয়ি ও পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ উস্তাদের কাছে হাদীস শুনতেন, লিখতেন ও মুখস্থ করতেন। উস্তাদগণ নিজ নিজ পাণ্ডুলিপি থেকে ছাত্রদেরকে হাদীস শোনাতেন আর ছাত্ররা শোনার সাথে সাথে তা নিজেদের পাণ্ডুলিপিতে লিখতেন এবং শিক্ষকের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন। এ বিষয়ক অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীস বিষয়ক গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ আছে। মাত্র দুয়েকটি উদাহরণ উদ্ধৃত করছি।
আবু হুরাইরা (রা.)-এর হাদীসের ছাত্র তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (৯১ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَكْتُبُ مَا أَسْمَعُ مِنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَلَمَّا أَرَدْتُ أَنْ أُفَارِقَهُ أَتَيْتُهُ بِكِتَابِهِ فَقَرَأْتُهُ عَلَيْهِ وَقُلْتُ لَهُ: هَذَا سَمِعْتُ مِنْكَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
আমি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শুনতাম তা লিখে রাখতাম। বিদায়ের কালে সে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম, তাঁকে তা পড়ে শোনালাম এবং বললাম, এগুলোই তো আমি আপনার কাছ থেকে শুনেছি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক আছে। ২০৮
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (রাহ.) আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন সব তিনি লিখে রেখেছিলেন এবং সে পাণ্ডুলিপি আবু হুরাইরা (রা.)-এর কাছে পেশ করে সম্পাদনা করে নিয়েছিলেন।
তাবিয়ি সাঈদ ইবন জুবাইর (৯৫ হি.) বলেন :
كُنْتُ أَكْتُبُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ فَإِذَا امْتَلَاتِ الصَّحِيفَةُ أَخَذْتُ نَعْلِي فَكَتَبْتُ فِيْهَا حَتَّى تَمْتَلِيُّ.
আমি সাহাবি ইবন আব্বাস (রা.)-এর কাছে হাদীস লিখতাম। লিখতে লিখতে যখন পৃষ্ঠা ভরে যেত তখন আমার স্যান্ডেল নিয়ে তাতে লিখতাম। লিখতে লিখতে তাও ভরে যেত। ২০৯
তাবিয়ি আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আকীল (১৪০ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَذْهَبُ أَنَا وَأَبُوْ جَعْفَرٍ إِلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَمَعَنَا أَلْوَاحُ صِغَارُ نَكْتُبُ فِيهَا الْحَدِيثَ.
আমি এবং আবু জা'ফর সাহাবি জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.)-এর নিকট যেতাম। আমাদের সাথে ছোট ছোট বোর্ড থাকত। তাতে আমরা হাদীস লিখতাম। ২১০
এ সময় থেকে পাণ্ডুলিপি থেকে হাদীস শিক্ষা দেওয়া এবং হাদীস শোনার সাথে সাথে তা লিখে নেওয়া হাদীস শিখন পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ব্যতিক্রম কিছু মুহাদ্দিস, যারা শুধু স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন, মুহাদ্দিসদের নিকট তারা সাধারণত দুর্বল রাবি হিসাবে পরিগণিত হতেন। পাণ্ডুলিপি থেকে শিক্ষাদানকারী শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসাবে গণ্য করা হতো। শুধু স্মৃতি থেকে মুখস্থ হাদীসের মৌখিক বর্ণনা ছাত্ররা গ্রহণ করতে চাইতেন না।
দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন রাবি আব্দুল আযীয ইবনু ইমরান ইবন আব্দুল আযীয (১৭০ হি.)। তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী ও সাহাবি আব্দুর রাহমান ইবন আওফের বংশধর। মুহাদ্দিসগণ তাকে হাদীস বর্ণনায় দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কারণ তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ভুলভ্রান্তি ব্যাপক। আর এ ভুলভ্রান্তির কারণ হলো পাণ্ডুলিপি ব্যতিরেকে মুখস্থ বর্ণনা করা। তৃতীয় হিজরি শতকের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক উমার ইবন শাব্বাহ (২৬২ হি.) তার সম্পর্কে বলেন:
كَانَ كَثِيرَ الْغَلَطِ فِي حَدِيثِهِ لِأَنَّهُ احْتَرَقَتْ كُتُبُهُ فَكَانَ يُحَدِّثُ مِنْ حِفْظِهِ.
তিনি হাদীস বর্ণনায় প্রচুর ভুল করতেন। কারণ তার পাণ্ডুলিপি পুড়ে গিয়েছিল। আর এ কারণে তিনি স্মৃতির উপর নির্ভর করে মুখস্থ হাদীস বর্ণনা করতেন। ২১১
তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিস আলী ইবনুল মাদীনি (২৩৪ হি.) বলেন:
لَيْسَ فِي أَصْحَابِنَا أَحْفَظُ مِنْ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ إِنَّهُ لَا يُحَدِّثُ إِلَّا مِنْ كِتَابِهِ وَلَنَا فِيْهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ.
আমাদের মাঝে আহমাদ ইবন হাম্বাল ছিলেন সর্বাধিক মুখস্থশক্তির অধিকারী। তা সত্ত্বেও তিনি পাণ্ডুলিপি সামনে না রেখে হাদীস বর্ণনা করতেন না। তার মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। ২১২
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বালের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন :
قَالَ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ: قَالَ لِي عَبْدُ الرَّزَّاقِ: اكْتُبْ عَنِّي وَلَوْ حَدِيثًا وَاحِدًا مِّنْ غَيْرِ كِتَابٍ فَقُلْتُ: لَا وَلَا حَرْفًا.
ইয়াহইয়া ইবন মাঈন বলেন, ইমাম আব্দুর রাযযাক সানআনি আমাকে বলেন, তুমি অন্তত একটি হাদীস পাণ্ডুলিপি ছাড়া আমার কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করো। আমি তাকে বললাম, না, পাণ্ডুলিপির প্রমাণ ব্যতীত একটি হরফও আমি লিখতে পারব না। ২১৩
এরূপ অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীসশাস্ত্রীয় কিতাবাদিতে বিদ্যমান। এ সকল বর্ণনার আলোকে প্রমাণিত যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ সাহাবিদের যুগ থেকেই হাদীস লিখে সংরক্ষণ করা হতো। মুহাদ্দিসগণ লিখিত পাণ্ডুলিপি দেখে হাদীস বর্ণনা করতেন, নিরীক্ষা করতেন, বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন এবং প্রত্যেক ছাত্র তার শ্রুত হাদীস লিখে রাখতেন। ছাত্র শুনতেন উস্তাদের পাণ্ডুলিপির পাঠ। তারপর তা নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখে উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন।
এ আলোচনা থেকে দুটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। ১. হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই যখন হাদীস শিখনের ক্ষেত্রে লিখন পদ্ধতি চালু হয়ে যায় এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠগ্রহণ অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় তখন হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দেই কেন হাদীস বর্ণনা করেছেন? কেন তারা এখনকার দিনে গ্রন্থের রেফারেন্স দেওয়ার মতো লিখিত পাণ্ডুলিপির রেফারেন্স দেননি?
২. সে সময় থেকেই যদি সকল ছাত্র তার উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতেন তবে তো হাদীস সংকলিত হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি থাকার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি সংরক্ষিত হাদীস সংকলনের অধিকাংশ গ্রন্থ তৃতীয়, চতুর্থ বা তার পরবর্তী শতাব্দীর। তাহলে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি কোথায় গেল? উম্মাতের অবহেলায় কি সেসব হারিয়ে গেছে? তবে কি এ উম্মাতের সালাফ হাদীস সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন না?
প্রথম সংশয় নিরসন : আমরা আগেই বলেছি, মূলত মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ নবীজির হাদীসের সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতা রক্ষায় অতি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা মুখস্থ থেকে মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন।
আমরা জানি, সেকালে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তখনকার পাণ্ডুলিপি মানেই হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি। প্রাচীন হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধারের বিষয়ে যার মোটামুটি ধারণা আছে তিনি জানেন, স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনা করতে গেলে যেমন মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধার করতে গেলে তারও অধিক ভুলের সম্ভাবনা থাকে। পাঠোদ্ধারকারী লেখকের হস্তলিপি বুঝতে ভুল করে এক শব্দকে ভিন্ন শব্দ ধারণা করতে পারেন। আর যদি তিনি মূল লেখকের পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপি হাতে পান, তাহলে তার নিজের পাঠোদ্ধারে ভুলের সম্ভাবনার পাশাপাশি অনুলিপিকারের ভুলের সম্ভাবনা অতিরিক্ত যুক্ত হবে। তাছাড়া অনুলিপিকার যদি মূলপাঠের অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক কোনো শব্দ লিখে রাখেন বা টীকা সংযুক্ত করেন, পাঠোদ্ধারকারী সেগুলোকেও মূলপাঠ মনে করে ভুল করতে পারেন।
ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেল গবেষক পণ্ডিতগণ বলছেন, বাইবেলের মূলপাঠেই অগণিত ভুল, বিকৃতি ও পাঠের ভিন্নতা বিদ্যমান। তারা বলেন, এই ভুলের অন্যতম কারণ তাদের এইসব ধর্মগ্রন্থ অনুলিপি করা হয়েছে শুধু পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করে। যিনি যা বুঝেছেন তা-ই লিখেছেন। অনুলিপিকারের ব্যাখ্যামূলক শব্দ ও টাকাও পরবর্তী অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপিতে মূলপাঠে ঢুকে পড়েছে।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ব্যবহার করেছেন অতিশয় সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কোনো মুহাদ্দিস তার উস্তাদের নিকট হাদীসের পাঠগ্রহণের সময় পাণ্ডুলিপি থেকে উস্তাদের পাঠ শুনেছেন, মুখস্থ করেছেন, নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। এবার তিনি যখন তার ছাত্রদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন স্মৃতি ও পাণ্ডুলিপি উভয় পদ্ধতিকে যুগপৎভাবে ব্যবহার করেছেন। স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনার ভুলের সম্ভাবনা পাণ্ডুলিপি রোধ করেছে আর পাণ্ডুলিপি পাঠের ভুলের সম্ভাবনা স্মৃতি রোধ করেছেন।
হাদীসের পাণ্ডুলিপি তো বাজারে পাওয়া যায়। আপনি সে পাণ্ডুলিপি বাজার থেকে সংগ্রহ করে হাদীস শিখে বর্ণনা করছেন নাকি উস্তাদের কাছ থেকে এর বিশুদ্ধ পাঠও শিখে নিয়েছেন-এটা হচ্ছে বড় ব্যাপার। এই বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য সকলেই শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দে হাদীস বর্ণনা করতেন। অর্থাৎ মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় শ্রুতিবাচক শব্দ 'حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا বা অমুক আমাদেরকে বলেছেন' কথার অর্থ হচ্ছে, তার কিতাবটি তার নিজের কাছে বা তার অমুক ছাত্রের কাছে, যিনি তার কাছে পঠিত শুনছেন, আমি তার কাছে পড়ে নিজ কানে শুনে শুনে তা থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করছি। কেউ কেউ 'আমি তাকে পড়তে শুনেছি' বা 'আমি পড়েছি' এরূপ শব্দে বললেও সাধারণত 'তিনি আমাদেরকে বলেছেন' বলেই এক বাক্যে তারা যুগপৎভাবে উভয় বিষয় বোঝাতেন।
ইমাম মালিক (রাহ.) সংকলিত 'মুআত্তা' কিতাবটি এখন ছাপা হয়ে যেমন আমাদের কাছে রয়েছে, তেমনি এর পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রাহ.)-এর যুগেও ছিল। তাঁরা ইমাম মালিকের ছাত্রদের কাছে এ কিতাবের পাঠ গ্রহণ করেছেন। এ কিতাবের হাদীস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে তাঁরা সংকলনও করেছেন। কিন্তু এ কিতাবের হাদীস উদ্ধৃত করতে গিয়েও তাঁরা শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁদের এই শ্রুতিবাচক শব্দ ব্যবহারের কারণে কি মুআত্তা মালিকের বিদ্যমানতা অস্বীকার করা যায়?
এমন আরো অনেক মুহাদ্দিসের লিখিত পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিমের কাছে ছিল। তারা ওই কিতাবগুলো লেখকের ছাত্র বা ছাত্রের ছাত্রদের কাছ থেকে শুনেছেন এবং সেখান থেকে নির্বাচন করে অনেক হাদীস তাদের সহীহ কিতাবে শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন। ২১৪
দ্বিতীয় সংশয় নিরসন: বাস্তবতা এটাই, হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকেও হাদীসের শত শত সংকলন বিদ্যমান ছিল। এবং মুসলিম উম্মাহর সালাফগণ ছিলেন হাদীস সংরক্ষণে খুবই যত্নবান। সে যুগে হাদীসের প্রায় সকল ছাত্রই পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। তবে তাদের পাণ্ডুলিপিতে হাদীস বিশেষ কোনো ধারাক্রমে সাধারণত বিন্যস্ত হতো না। বরং হাদীস শেখার ধারাক্রমেই তারা পাণ্ডুলিপিতে লিখে রাখতেন। যেটি আগে শিখেছেন সেটি আগে আর যেটি তারপরে শিখেছেন সেটি পরে লিখতেন।
তাছাড়া একজন ছাত্র শুধু একজন উস্তাদের কাছে হাদীস শিখতেন না। বরং সাধ্যানুযায়ী অনেক উস্তাদের কাছ থেকে শিখতেন। এক উস্তাদের কাছে শেখা শেষ হলে অন্য উস্তাদের কাছে যেতেন। এভাবে তার হাদীস সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এবং ক্রমেই সনদে রাবির সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এভাবে ছাত্রের পাণ্ডুলিপির কলেবর উস্তাদের পাণ্ডুলিপির কলেবর থেকে বৃদ্ধি পেত। এভাবে একাধিক উস্তাদের পাণ্ডুলিপি একজন ছাত্রের পাণ্ডুলিপির ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে।
এভাবে দিনে দিনে হাদীসের পাণ্ডুলিপির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। উস্তাদের থেকে ছাত্রের পাণ্ডুলিপি বৃহৎ থেকে বৃহৎ হয়েছে। এবং তার পরে ছাত্ররা তাদের বিভিন্ন উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসগুলো তাদের পাণ্ডুলিপিতে বিশেষ বিন্যাসে গ্রন্থনা করেছেন। বিভিন্ন উস্তাদের পাণ্ডুলিপি স্বতন্ত্রভাবে রাখেননি। ছাত্রদের এই বৃহৎ ও বিন্যস্ত পাণ্ডুলিপির মধ্যে শিক্ষকদের পাণ্ডুলিপি একাকার হয়ে গেছে। পুরোটাই একীভূত হয়েছে বটে; তবে স্বতন্ত্র চেহারায় নয়। তাই বলা যায়, পূর্বের পাণ্ডুলিপি ও পুস্তিকাগুলো ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখন আমাদের হাতে থাকা বৃহদাকার ও বিন্যস্ত পুস্তকগুলোর মাঝে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন করে একাকার হয়ে আছে। আর উস্তাদদের হাতে তৈরি পাণ্ডুলিপির প্রয়োজন না থাকায় তা দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে। ২১৫
তবে দ্বিতীয় শতকের হাদীসের অনেক পাণ্ডুলিপি এখনো বিদ্যমান আছে। অনেকগুলো তো মুদ্রিত হয়েছে এবং অনেক প্রসিদ্ধিও পেয়েছে। ইমাম আবু হানীফার (১৫০ হি.) 'কিতাবুল আসার', ইমাম মালিকের (১৭৯ হি.) 'মুআত্তা', ইমাম মা'মার ইবন রাশিদের (১৫৩ হি.) 'জামি', আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের (১৮১ হি.) মুসনাদ ও যুহদ, ইবন ওয়াহাব (১৯৭ হি.), ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ (১৯৭ হি.) ও মুআফা বিন ইমরানের (১৮৫ হি.) যুহুদ, ইমাম আব্দুর রাযযাকের (২১১ হি.) 'মুসান্নাফ' তার অন্যতম।
তাছাড়া প্রথম শতকের কোনো কোনো পাণ্ডুলিপি অধুনা আবিষ্কৃত হয়েছে। পরবর্তী যুগের কিতাবাদির সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে, কীভাবে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি এ সকল গ্রন্থের মাঝে একীভূত হয়ে আছে। যেমন: সহীফাতু হাম্মام ইবন মুনাব্বিহ, নুসখাতু সুহাইল ইবন আবি সালিহ, আহাদিসি ইয়াযীদ ইবন আবি হাবীব ইত্যাদি।

টিকাঃ
২০৮. সুনান দারিমি, হাদীস: ৫১১。
২০৯. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭১。
২১০. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭০。
২১১. আসকালানি, তাহযীবুত তাহযীব, ৬/৩৫১; সাখাবি, আত তুহফাতুল লাতীফাহ, ২/১৮৫。
২১২. আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/১৬৫。
২১৩. মুসনাদ আহমাদ, ২২/৭৬; যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৫/৩৭৪。
২১৪. বিস্তারিত দেখুন: আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি: পৃ. ৩৬৯。
২১৫. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল; আজ্জাজ খাতীব, আস সুন্নাতু কাবলাত তাদবীন; আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি; আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি; মুস্তফা আযমি, হাদিস সংকলনের ইহিতাস।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস সংরক্ষণ পরিপূর্ণ ও সুসম্পাদিত

📄 হাদীস সংরক্ষণ পরিপূর্ণ ও সুসম্পাদিত


একজন প্রভাবশালী সাধারণ বা রাজনৈতিক নেতা, যার অনেক ভক্ত, অনুরক্ত, অনুচর ও অনুসারী আছে। যারা তার সকল নির্দেশনা ও কর্মসূচি সর্বসাধ্য দিয়ে পালন ও বাস্তবায়ন করে। নেতার কোনো বিষয় ভালো লাগলে তারা কেউ কেউ ব্যক্তিজীবনেও তা প্রতিপালন করে। তার মৃত্যুর অনেক পরে, যখন প্রবীণ ভক্তরাও অনেকেই মারা গেছে, তখন হয়তো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বা জিজ্ঞাসিত হয়ে কোনো কিছু বলতে ভক্তকে পেছনের জীবন হাতড়ে ফিরতে হবে। তখন এটাই স্বাভাবিক যে, এই ভক্তের স্মৃতি থেকে অনেক কিছু মুছে গেছে। আবার অনেক কিছু সে ভুলভালও বর্ণনা করতে পারে—এটাই বাস্তবতা। সুতরাং এমতাবস্থায় নেতার সকল বিষয় আর কিছুতেই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন সাধারণ নেতার মতো এবং সাহাবিদেরকে তাদের অনুসারীর মতো মনে করেন, তারা দাবি করেন যে, নবীজির সকল হাদীস কিছুতেই সংরক্ষিত হওয়া সম্ভব নয়। হাদীস নামে যা সংরক্ষিত হয়েছে তা অসম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত। এ দাবির পক্ষে তারা প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন প্রবীণ সাহাবিদের নামে খুব কমসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হওয়া এবং তাদের দৃষ্টিতে হিকমতপূর্ণ অনেক কিছু হাদীসের কিতাবে অনুপস্থিত থাকা।
আল্লাহর শরীআত প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরামের জামাআত কেমন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তা আমরা জানি। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানব জাতির জন্য শরীআত প্রতিপালনে মহান আল্লাহ নির্ধারিত একমাত্র নমুনা। এজন্য সাহাবিগণ (রা.) নবীজির কথাকর্ম ও জীবনাচারকে নিজেদের জীবনাচারে পরিণত করেছিলেন। এ কথাটি একক বা একদল সাহাবির ক্ষেত্রে কেবল প্রযোজ্য ছিল না; বরং পুরো সাহাবি-সমাজের জন্য প্রযোজ্য। যে নববি বিষয়টি ছিল নবুওয়াতের প্রথম দিকের, শেষ যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবির জন্যও সেটি পালনীয় ছিল। এমন নয় যে, যে সাহাবি নবীজির কোনো একটি কর্ম দেখলেন বা কথা শুনলেন শুধু তার জন্যই তা পালন ও সংরক্ষণ করা জরুরি।
যে ব্যক্তি কোনো বিষয় জানল তার দায়িত্ব যে জানে না তার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর যে জানে না তার দায়িত্ব যে জানে তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া। সাহাবিগণ এ দায়িত্ব পালনকেই জীবনের প্রধানতম কর্তব্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। নবীন প্রবীণের কাছ থেকে জেনেছেন, এমনকি প্রবীণ নবীনের কাছ থেকেও। প্রবীণ যা জানবেন নবীন তা জানবেন না বা পালন করবেন না, ইসলামে এর অনুমতি তো নেই। তাই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা নবীজির পুরো জীবনাচারকে সমাজে মূর্তিমান করে উপস্থিত রেখেছেন। তাঁদের সমাজের দিকে তাকালে যে দৃশ্য দেখা যেত এবং কান পাতলে যে আওয়াজ শোনা যেত তা-ই তো হাদীস বা সুন্নাহ। এ বিষয়ক আলোচনা আমরা পূর্বে দেখে এসেছি।
নবীন-প্রবীণ সাহাবিদের নিয়ে যে সাহাবি-সমাজ, এই সমাজে চর্চিত ইসলাম পূর্ণাঙ্গ সুন্নাহ বা নববি জীবনাচার। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতদিন হায়াতে ছিলেন প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করেছেন—সংশোধন করেছেন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। সাহাবিগণ কারো মধ্যস্থতায় নবীজির কোনো কথাকর্ম জানতে পারলে, আর তাতে তাঁদের খটকা লাগলে, স্বয়ং নবীজির কাছে সরাসরি এসে যাচাই করে নিতেন। অর্থাৎ সাহাবিদের সমাজে বিদ্যমান সুন্নাহ ছিল পরিপূর্ণ এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সম্পাদিত।
কোনো একজন সাহাবির হয়তো নবীজির কোনো হাদীস শুনতে, বুঝতে ও বর্ণনা করতে ভুল হতে পারে। কিন্তু পুরো জামাআতের তো ভুল হতে পারে না। যদি আমরা বলি যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের পুরো জামাআতেরই ভুল হতে পারে, তবে তার অর্থ তো এই যে, ইসলামকেই বুদ্ধির অগম্য ও পালনের অযোগ্য দাবি করা হচ্ছে। কেননা সাহাবিরা যে ক্ষেত্রে ভুলের শিকার হয়েছেন পরবর্তীদের জন্য সেক্ষেত্রে নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিরা যখন পরস্পরের মধ্যে হাদীসের চর্চা করতেন তখন কারো কোনো ধরনের ভুল হলে অন্যেরা সংশোধন করে দিতেন। যেমন মাকহুল (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
السُّؤْمُ فِي ثَلَاثَةٍ فِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ.
'তিনটি বস্তুতে কুলক্ষণ রয়েছে: ঘর, নারী ও ঘোড়া।' এ কথা আয়িশা (রা.)-কে বলা হলে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা সঠিকভাবে জানেন না। কেননা তিনি নবীজির কথার মাঝখানে এসেছিলেন। তাই পুরোটা শুনতে পাননি। শেষের অংশ শুনেছিলেন, প্রথম অংশ শোনেননি। নবীজি মূলত বলেছিলেন :
قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ يَقُوْلُوْنَ إِنَّ الشُّؤْمَ فِي ثَلَاثَةِ : فِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ.
আল্লাহ ইয়াহুদিদেরকে ধ্বংস করুন। কেননা তারা বলে, 'তিনটি বস্তুতে কুলক্ষণ রয়েছে: ঘর, নারী ও ঘোড়া'। ২১৬
তাছাড়া কোনো সাহাবি বর্ণিত হাদীস কারো মধ্যস্থতায় অন্য সাহাবির নিকট পৌঁছলে এবং এতে তাঁর কোনো রকম খটকা লাগলে এই সাহাবি মূল বর্ণনাকারী সাহাবির কাছে গিয়ে যাচাই করতেন। যেমন জনৈক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণিত বেচাকেনায় সুদ সংক্রান্ত একটি হাদীস আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.)-এর নিকট পৌঁছে। তখন তিনি আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর নিকট গিয়ে যাচাই করেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন:
يَا أَبَا سَعِيدٍ مَا هَذَا الَّذِي تُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟
হে আবু সাঈদ, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই যে হাদীস বর্ণনা করছেন, এর বিষয়টি কী? তখন তিনি বলেন, আমি এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি। ২১৭
এ বিষয়ক আরো কিছু আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে বারবার সম্পাদনার মাধ্যমে নবীজির সকল হাদীস বা সুন্নাহ নির্ভুল ও নিখুঁতরূপে সমাজে বিরাজমান ছিল। এই পূর্ণাঙ্গ ও সুসম্পাদিত সুন্নাহই পরবর্তী প্রজন্ম, অর্থাৎ তাবিয়িগণ সাহাবিদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন- সাহাবিদের সমাজ দেখে এবং তাঁদের মৌখিক বর্ণনা থেকে। তারপর তাঁদের কাছ থেকে পরবর্তী প্রজন্ম। এভাবে প্রজন্ম পরম্পরায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম নবীজির সুন্নাহ শিখে আসছে। পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের যথাযোগ্য ব্যক্তিবর্গের নিকট পূর্ণ সতর্কতার সাথে পৌঁছে দিচ্ছেন।
মনে রাখতে হবে, হাদীস বা সুন্নাহ অর্থাৎ ইসলাম কেবল মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়নি। বরং আমালে মুতাওয়ারাস বা কর্ম পরম্পরাই ইসলাম সংরক্ষণের সব থেকে বিশ্বস্ত মাধ্যম। মহান আল্লাহ প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে এমন বিশাল জামাআত সৃষ্টি করেছেন যারা পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে প্র্যাক্টিক্যালি ইসলাম পালনের নববি নমুনা শিখেছেন। কোনো যুগেই কেবল লিখিত বা মৌখিক বর্ণনার মাধ্যমে ইসলাম শেখার প্রচলন ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا يَزَالُ اللهُ يَغْرِسُ فِي هَذَا الدِّيْنِ غَرْسًا يَسْتَعْمِلُهُمْ فِي طَاعَتِهِ.
মহান আল্লাহ সর্বদা এই দীনের মধ্যে এমন বৃক্ষ রোপণ করতে থাকেন, অর্থাৎ ব্যক্তিবর্গ সৃষ্টি করেন যাদেরকে তিনি তাঁর আনুগত্যে নিয়োজিত রাখেন। ২১৮
সুতরাং কেবল লিখিত বা মৌখিক বর্ণনার দ্বারা সুন্নাহ সংরক্ষিত হওয়া না-হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা ইসলাম সংরক্ষণের ইতিহাস ও ইসলাম প্রতিপালনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, প্রবীণ সাহাবিদের নামে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে তাঁদের জানা অনেক হাদীস হারিয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা তাঁদের জানা হাদীস নবীনদেরও জানা ছিল। এবং তাঁরা কখনো প্রবীণদের নাম উক্ত করে, কখনো উহ্য রেখে সেসব হাদীস বর্ণনা করেছে। হাদীসশাস্ত্রের ছাত্রমাত্রই এ সকল তথ্য অবগত।
আর হিকমত বিষয়ক তাদের দাবিটিও অবান্তর। কারো কাছে মনে হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিকমতের ভেতরে এটাও থাকার দরকার, কিন্তু হাদীসের কিতাবে যেহেতু এ বিষয়ক কোনো বর্ণনা নেই সুতরাং হাদীস ভান্ডার, যাকে নবীর হিকমত বা প্রজ্ঞা বলা হয়, অসম্পূর্ণ। এ রকম দাবি মূলত নিজের বিবেচনাকে ইসলামের মানদণ্ড বানানোর নামান্তর। পাশ্চাত্য দর্শনের কাছে মগজ বেচে দেওয়া কেউ কেউ মনে করেন, কেবল জাগতিক লাভ-ক্ষতি ও উন্নতি-অবনতির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিচাতুর্যই হিকমত। আর আন্তরিক প্রশান্তি, রবের সন্তুষ্টি এবং পরকালীন মুক্তি, উন্নতি ও সফলতা লাভের দুআ-যিকির ও আমল-ইবাদত কোনো হিকমত নয়।

টিকাঃ
২১৬. মুসনাদ তায়ালিসি, হাদীস: ১৬৪১; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৬০৩৪。
২১৭. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১৭৭২; সহীহ বুখারি, হাদীস: ২৩৭৬; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১/৫৪৬。
২১৮. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৭৭৮৭; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ০৮; সহীহ ইবন হিব্বان, হাদীস: ৩২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00