📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ

📄 প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ


প্রবীণ সাহাবিদের কর্ম ও বক্তব্যকে প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করে সংশয় তৈরি করা হয় যে, তাঁরা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতেন না; কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন।
প্রথমত বলা হয়, তাঁরা নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কুরআন ছাড়া আর কোনো কিছু প্রয়োজনীয় মনে করেননি। এ কারণেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাদীস তাঁরা বর্ণনা করেননি এবং লিখিত আকারে হাদীস সংকলনের উদ্যোগও নেননি।
তাঁদের নামে হাদীসের কিতাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাদীস সংকলিত হয়নি এবং তাঁরা হাদীস সংকলনে পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেননি সত্য। তবে তা থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যে, তাঁরা হাদীসকে প্রয়োজনীয় মনে করতেন না—এ কথা সর্বৈব ভুল ও অবাস্তব। কেন তাঁরা হাদীস লিখিত আকারে সংকলনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেননি, কেন তাঁদের নামে সংকলিত হাদীসের সংখ্যা কম, তাঁদের নামে বর্ণিত না হলেও যে তাঁদের জানা হাদীস পরবর্তী উম্মাতের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে, কীভাবে তা হয়েছে—এসব বিষয় আমরা এ বইয়ে অন্যত্র আলোচনা করেছি। বইটি পুরো পড়া হলে এ সংক্রান্ত সংশয় আর থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত, এছাড়া প্রধান সাহাবিদের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করেও দাবি করা হয় যে, তাঁরা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতেন না; কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন।
(ক) ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেলে তিনি বলেন, 'তোমরা আমার কাছে লেখার কিছু নিয়ে এসো। তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখে দেব যাতে পরবর্তীকালে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।' তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَلَبَهُ الْوَجَعُ وَعِنْدَنَا كِتَابُ اللَّهِ حَسْبُنَا.
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবল রোগযন্ত্রণার মধ্যে আছেন। আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব আছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট। ১৬০
(খ) আবু জুহাইফা (রা.) বলেন, আমি আলী (রা.)-কে বললাম, আপনাদের কাছে কি কিছু লিখিত আছে? তিনি বললেন:
لَا إِلَّا كِتَابُ اللَّهِ أَوْ فَهُمُ أُعْطِيَهُ رَجُلٌ مُسْلِمُ أَوْ مَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ.
'না, শুধু আল্লাহর কিতাব এবং মুসলিমকে দান করা হয়েছে এমন কিছু উপলব্ধি আর যা আছে এই সহীফাতে।' আবু জুহাইফা (রা.) বলেন, আমি বললাম, এই সহীফাতে কী আছে? তিনি বললেন, 'ক্ষতিপূরণ ও বন্দিমুক্তির বিধান এবং এ বিধানটিও রয়েছে যে, কাফিরের বিনিময়ে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। ১৬১
(গ) ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, উমার (রা.) ছুরিকাঘাতে আহত হলে সুহাইব (রা.) 'হে ভাই, হে বন্ধু' বলে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করে। তখন উমার (রা.) বলেন, হে সুহাইব, তুমি আমার জন্য কাঁদছ? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذِّبُ بِبَعْضِ بُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
মৃত ব্যক্তিকে তার জন্য তার পরিজনদের কোনো কোনো কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।
উমার (রা.)-এর ইন্তিকালের পর ইবন আব্বাস (রা.) এ কথা আয়িশা (রা.)-কে বললে তিনি বলেন, আল্লাহ উমারকে রহম করুন। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেননি যে:
إِنَّ اللَّهَ لَيُعَذِّبُ الْمُؤْمِنَ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
'আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে তার পরিজনদের কান্নার কারণে শাস্তি দেন।' বরং তিনি বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيَزِيدُ الْكَافِرَ عَذَابًا بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
'নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরের শাস্তি বৃদ্ধি করেন তার পরিজনদের কান্নার কারণে।' তোমাদের জন্য কুরআনের এই আয়াতই যথেষ্ট :
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى.
“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”১৬২
এ ধরনের আরো কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয় যে, প্রধান ও প্রবীণ সাহাবিগণ (রা.) কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন, শরয়ি বিধানের উৎস হিসাবে হাদীসের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতেন না। এ পুস্তকের ক্ষুদ্র পরিসরে তাদের সকল বক্তব্য উদ্ধৃত করে খণ্ডন ও পর্যালোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে শুধু দেখার চেষ্টা করব যে, ঘটনার অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে তারা যে সিদ্ধান্তে এসেছে তা যথার্থ নয়। এমনকি তাদের চিন্তন দক্ষতা এ কাজের যোগ্য ও উপযুক্তও নয়।
কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত কোনো বক্তব্যকে সব সময় সাধারণ ও সর্বজনীনভাবে ব্যবহার করা যায় না। বরং বক্তার কর্ম ও অন্যান্য বক্তব্যকে সামনে রেখে বিবেচনা করতে হয়। নইলে মারাত্মক অর্থ বিভ্রাট ঘটতে পারে। সূরা তাওবাহর ৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন :
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْ تُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
“অতঃপর সম্মানিত মাসসমূহ অতিবাহিত হয়ে গেলে মুশরিকদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে পাকড়াও করবে, অবরোধ করবে এবং তাদেরকে ধরার জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওত পেতে বসে থাকবে। তবে তারা যদি তাওবা করে, সালাত কায়িম করে এবং যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।”
মহান আল্লাহর বিধান এ নয় যে, সম্মানিত মাস ছাড়া অন্যান্য মাসে যেকোনো ধরনের মুশরিককে ধরার জন্য ওত পেতে থাকতে হবে এবং যেখানেই তাদের কাউকে পাওয়া যাবে হত্যা করতে হবে। কিন্তু প্রসঙ্গ ছাড়া আয়াতটি উল্লেখ করলে এমনটিই বোঝা যায়।
উল্লিখিত বর্ণনাগুলোতে বিশেষ প্রেক্ষাপটে সাহাবির বক্তব্য প্রদত্ত হয়েছে। যা সাধারণ ও সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নয়। আমরা তাঁদের সারা জীবনের কর্মপদ্ধতি ও অন্যান্য বক্তব্য সামনে রেখে বিবেচনা করলেই বুঝতে পারব।
উমার (রা.) কেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম উপদেশ লিখতে বাধা দিয়েছেন, তা ওই বর্ণনার মাঝেই উল্লেখ আছে। একে তো নবীজি রোগযন্ত্রণায় ক্লিষ্ট। উমার (রা.) চাননি, এই মুহূর্তে নবীজিকে কষ্ট দেওয়া হোক। তাছাড়া নবীজি তখন শরীআত সম্পর্কে নতুন কোনো বিধান বর্ণনা করতে চাননি। বরং কিছু হিতোপদেশ দিতে চেয়েছেন, যা তাঁর উম্মাতকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করবে। উমার (রা.) বুঝেছেন, আমাদেরকে ভ্রান্তি থেকে বাঁচিয়ে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য কুরআন তো রয়েছেই। সুতরাং এই ক্লিষ্ট মুহূর্তে নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার কী দরকার!
তিনি যে বলেছেন, দিশা দেওয়ার জন্য, ভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর জন্য কুরআনই যথেষ্ট, সেই কুরআনই তো আমাদেরকে নির্দেশনা দিচ্ছে, কুরআনকে নবীজির হাদীসের আলোকে বুঝে মান্য করতে হবে। কুরআনের এই নির্দেশনা অমান্য করে কুরআন বুঝতে গেলে আমরা বিভ্রান্ত হব। সুতরাং উমার (রা.)-এর এ কথার উদ্দেশ্য কিছুতেই এ নয় যে, হাদীস মানতে হবে না। বরং তাঁর সারা জীবনের কর্মপন্থা প্রমাণ করে, তিনি কুরআন বুঝতেন হাদীসের আলোকে আর হাদীসকে মানতেন শরয়ি বিধানের অন্যতম উৎস হিসাবে। প্রমাণ হিসাবে আমরা দুটি বর্ণনা উল্লেখ করছি।
উমার (রা.) তাঁর নিযুক্ত কুফার বিচারক কাযি শুরাইহকে নির্দেশ দিয়ে লেখেন:
اقْضِ بِمَا فِي كِتَابِ اللهِ فَإِنْ لَّمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَبِسُنَّةِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
তুমি আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফায়সালা করবে। যদি আল্লাহর কিতাবে না থাকে তবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসারে ফায়সালা করবে। ১৬৩
তাবিয়ি উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রাহ.) বলেন:
أَنَّ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ نَشَدَ النَّاسَ : مَنْ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي السِّقْطِ ؟ فَقَالَ الْمُغِيرَةُ: أَنَا سَمِعْتُهُ قَضَى فِيْهِ بِغُرَّةٍ عَبْدٍ أَوْ أَمَةٍ قَالَ: ائْتِ مَنْ يَشْهَدُ مَعَكَ عَلَى هُذَا. فَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ : أَنَا أَشْهَدُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمِثْلِ هَذَا.
উমার (রা.) মানুষদের কাছে জানতে চান, আঘাতের ফলে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হলে তার বিচারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে রায় দিয়েছেন তা কেউ শুনেছেন কি না। তখন মুগীরাহ বলেন, আমি তাঁকে এ বিষয়ে একজন দাস বা দাসী প্রদানের বিধান দিতে শুনেছি। উমার (রা.) বলেন, আপনার সাথে এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কাউকে আনয়ন করুন। তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ বিধান দিয়েছেন। ১৬৪
অন্য বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন:
أَنَّ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ نَشَدَ النَّاسَ قَضَاءَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْجَنِيْنِ فَقَامَ حَمَلُ بْنُ مَالِكِ بْنِ النَّابِغَةِ فَقَالَ: كُنْتُ بَيْنَ امْرَأَتَيْنِ فَضَرَبَتْ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى بِمِسْطَحٍ فَقَضَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جَنِينِهَا بِغُرَّةٍ وَأَنْ تُقْتَلَ بِهَا.
গর্ভস্থ সন্তানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফায়সালা জানতে চান উমার (রা.) লোকদের কাছে। তখন হামাল ইবন মালিক ইবন নাবিগাহ দাঁড়িয়ে বলেন, আমি দুজন নারীর মাঝে ছিলাম। তাদের একজন অপরজনকে দণ্ড দ্বারা আঘাত করে। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের বিষয়ে ক্রীতদাস প্রদানের এবং ওই নারীর বদলে তাকে হত্যার ফায়সালা প্রদান করেন। ১৬৫
এ বর্ণনা থেকে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। ১. উমার (রা.) হাদীসকে শরয়ি বিধানের দলীল হিসাবে মানতেন। এজন্য ফায়সালা দেবার ক্ষেত্রে যে বিষয়ে তিনি নবীজির হাদীস জানেন না অন্যদের কাছে শুনে জেনে নিচ্ছেন। ২. তাঁর কাছে হাদীস এত গুরুত্বপূর্ণ যে, অন্যের কাছে শুনে গ্রহণ করার আগে সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই করে নিচ্ছেন। গুরুত্বহীন জিনিস কেউ গ্রহণ করার জন্য যাচাই-বাছাই করে না। এবং ৩. সাহাবিগণ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একে অপরের কাছ থেকে হাদীস শিখতেন।
আলী (রা.)-এর বক্তব্য এক বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদত্ত হয়েছিল। যে কারণে এ কথাটি তাঁকে বারবার বলতে হয়েছে। হাদীস অস্বীকারের জন্য তিনি এ কথা বলেননি। শীআ সম্প্রদায় তাদের মতলব হাসিলের মানসে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আহলে বাইত, বিশেষ করে আলী (রা.)-এর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কিছু ইলম রেখে গেছেন, যা অন্যদের জানা নেই। আলী (রা.) এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হচ্ছিলেন। কখনো তিনি জিজ্ঞাসাকারীকে, আবার কখনো পুরো জাতিকে জানানোর জন্য মিম্বারে এ বিষয়ক বক্তব্য প্রদান করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে: আমার কাছে লিখিত বস্তু, যা পাঠ করা যায়, এমন বিষয় শুধু আল্লাহর কিতাব এবং এই পুস্তিকায় সংকলিত বিধিবিধান বিষয়ক কিছু বাণী আর আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ উপলব্ধিই রয়েছে। এছাড়া অন্য সাহাবিদের থেকে অতিরিক্ত আমার কিছুই জানা নেই।
এখন বলুন, এর সাথে হাদীস অস্বীকারের কী সম্পর্ক? তিনি তো শীআদের এই দাবি খণ্ডন করছেন যে, তাঁর কাছে নবীজি ওহির কিছু বিশেষ জ্ঞান অতিরিক্ত রেখে গেছেন। তিনি যে বলছেন, আমার কাছে আল্লাহর কিতাব এবং এই সহীফায় লিখিত কিছু বাণী ছাড়া কিছুই নেই, এর অর্থ কি এই যে, তাঁর কাছে হাদীস অপরিহার্য বিষয় ছিল না, তাই তিনি হাদীস সংরক্ষণ করেননি? না, বরং তিনি বলছেন, শীআদের দাবি মতো তাঁর কাছে কিছু নেই বা কুরআন ও এই বাণীগুলো ছাড়া তার কাছে লিখিত, যা পাঠ করা যায় (مِنْ كِتَابٍ يُقْرَأُ وَفِي رِوَايَةٍ كِتَابٌ نَقْرَأَهُ), এমন কিছু নেই। এ বিষয়ক সকল বর্ণনা সামনে রাখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ১৬৬
মনে রাখতে হবে, লিখে রাখা সাহাবিদের কাছে হাদীস সংরক্ষণের মূল মাধ্যম ছিল না। বরং মূল মাধ্যম ছিল ব্যক্তি ও সমাজের আমল, স্মৃতিতে সংরক্ষণ এবং আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে নিত্যনৈমিত্তিক চর্চা। সুতরাং এ কথা মনে করা যে, যেহেতু অনেক কিছু লিখিত ছিল না সেহেতু সংরক্ষিত ছিল না এবং তিনি এর গুরুত্বও দিতেন না—এ কথা হাদীস সংরক্ষণ বিষয়ে সাহাবিদের কর্মপন্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
আলী (রা.) উমার (রা.)-এর মতোই হাদীসকে শরীআতের উৎস মনে করতেন এবং বড় সতর্কতার সাথে বর্ণনা ও গ্রহণ করতেন।
আসমা ইবন হাকাম ফাযারি (রাহ.) বলেন, আমি আলী (রা.)-কে বলতে শুনেছি :
إِنِّي كُنْتُ رَجُلًا إِذَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثًا نَفَعَنِي اللهُ مِنْهُ بِمَا شَاءَ أَنْ يَنْفَعَنِي وَإِذَا حَدَّثَنِي رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِهِ اسْتَحْلَفْتُهُ (أَنَّهُ سَمِعَهُ مِنْهُ) فَإِذَا حَلَفَ لِي صَدَّقْتُهُ.
আমি এমন প্রকৃতির লোক ছিলাম যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি কোনো হাদীস শুনলে আল্লাহর ইচ্ছায় তা দ্বারা প্রভূত উপকৃত হতাম। আর তাঁর অন্য কোনো সাহাবি আমাকে হাদীস বললে তাঁকে এই মর্মে শপথ করতে বলতাম যে, সত্যই তিনি তাঁর থেকে শুনেছেন। শপথ করলে তাঁর বর্ণনা সত্য বলে গ্রহণ করে নিতাম।... এরপর তিনি আবু বাকর (রা.)-এর সূত্রে ইস্তিগফার বিষয়ক একটি হাদীস বর্ণনা করেন। ১৬৭
সুওয়াইদ ইবন গাফালাহ (রাহ.) বলেন, আলী (রা.) বলেছেন:
إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَأَنْ أَخِرَّ مِنَ السَّمَاءِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَكْذِبَ عَلَيْهِ وَإِذَا حَدَّثْتُكُمْ فِيْمَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ فَإِنَّ الْحَرْبَ خَدْعَةٌ.
আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করি তখন তাঁর নামে মিথ্যা বলার চেয়ে আকাশ থেকে ভূপাতিত হওয়া আমার কাছে প্রিয়। আর আমাদের পারস্পরিক আলোচনার বিষয় তো এই যে, যুদ্ধমাত্রই কৌশল। ১৬৮
হাদীস সংরক্ষণের জন্যও তিনি বিশেষ তাকিদ দিতেন। নিয়মিত হাদীস চর্চার নির্দেশ দিয়ে ছাত্রদের বলতেন :
تَزَاوَرُوا وَتَذَاكَرُوا الْحَدِيثَ فَإِنَّكُمْ إِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا يَدْرُسُ.
তোমরা পরস্পর সাক্ষাৎ করে হাদীসের চর্চা ও আলোচনা করতে থাকো। তোমরা এটা না করলে হাদীস বিলীন হয়ে যাবে। ১৬৯
'জীবিতদের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তির শাস্তি হয়' উমার (রা.)-এর এ বিষয়ক বর্ণনার বিপরীতে আয়িশা (রা.) যে বলেছেন, 'তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট' এ কথা কি তিনি হাদীসের বিরুদ্ধে বলেছেন? কখনোই নয়। তিনি বরং হাদীসের পাঠ বিশুদ্ধ করতে চেয়েছেন। উপরোক্ত বর্ণনাতেই এ কথা সুস্পষ্ট রয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, উমার (রা.)- এর বর্ণনার বিপরীতে তাঁর বর্ণনাই সঠিক। এ কথা বুঝতে তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। এ বিষয়ক ইবন উমার (রা.)-এর বর্ণনার বিপরীতে তিনি বলেন:
وَهَلْ تَعْنِي ابْنَ عُمَرَ إِنَّمَا مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرٍ فَقَالَ : إِنَّ صَاحِبَ هَذَا لَيُعَذِّبُ وَأَهْلُهُ يَبْكُوْنَ عَلَيْهِ.
ইবন উমার ভুল করেছেন। বাস্তবতা এই যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন বলেন, এই কবরের বাসিন্দাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ তার পরিজনরা তার জন্য কাঁদছে।... এ বলে তিনি সূরা আনআমের ১৬৪ নং আয়াতটি পাঠ করেন। ১৭০
উপরের আলোচনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, হাদীসের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের জন্য তিনি এ কথা বলেননি। বরং হাদীসের বিশুদ্ধ পাঠ নিরূপণের জন্য বলেছেন। এবং নিজের বর্ণনার সমর্থক হিসাবে আয়াত উল্লেখ করেছেন। তিনি যদি হাদীসের প্রয়োজনীয়তাই অস্বীকার করবেন, তবে তার পাঠ বিশুদ্ধতার জন্য চেষ্টা কেন করবেন? এ কথাই তো বলে দেবেন যে, তোমরা নবীজি কী বলেছেন তা বাদ দাও, কুরআনের এই আয়াতের দিকে তাকাও। কিন্তু তা তিনি বলেননি।
তাঁর ব্যাপারে এ কথা কীভাবে বলা যায় যে, তিনি হাদীসের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতেন না! অথচ তিনি সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবিদের অন্যতম। হাদীস সংরক্ষণ, হাদীসের পাঠ ও মর্ম বিশুদ্ধকরণ, পরবর্তীদেরকে হাদীস শিক্ষাদান ও হাদীস প্রতিপালনে জীবন উৎসর্গকারী! তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মকে শরয়ি বিধানের দলীল হিসাবে পেশ করতেন, অন্যদেরকে হাদীস শিখতে উৎসাহিত করতেন।
সাহাবিদের মধ্যে গোসল ফরয হওয়ার কারণ বিষয়ে মতভেদ হয়। তখন আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নবীজির কর্মকে দলীল হিসাবে উল্লেখ করে বলেন :
إِذَا جَاوَزَ الْخِتَانُ الْخِتَانَ وَجَبَ الْغُسْلُ فَعَلْتُهُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاغْتَسَلْنَا.
পুরুষের যৌনাঙ্গের খতনার স্থান নারীর খতনার স্থান অতিক্রম করলে গোসল আবশ্যক হয়ে যাবে। আমি এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করেছি। এরপর আমরা গোসল করেছি। ১৭১
উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রাহ.) বলেন, আমার খালা আয়িশা (রা.) আমাকে বলেন:
يَا ابْنَ أُخْتِيْ بَلَغَنِي أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو مَارُّ بِنَا إِلَى الْحَجِّ فَالْقَهُ فَسَائِلْهُ فَإِنَّهُ قَدْ حَمَلَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِلْمًا كَثِيرًا.
'হে ভাগিনা, শুনলাম আব্দুল্লাহ ইবন আমর আমাদের এলাকা দিয়ে হজ্জে যাচ্ছেন। তুমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করে ইলম শিখে নাও। কেননা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রচুর ইলম অর্জন করেছেন।' তখন আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করি। তিনি সেসব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেন। আমি সেসব হাদীস আমার খালা আয়িশা (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করি। তার মধ্যে একটা হাদীসে তাঁর খটকা লাগে। তিনি তাতে আপত্তি করেন। এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাকে আবার জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি তোমাকে বলেছেন যে, এটি তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি শুনেছেন?
পরের বছর খালা আমাকে বলেন, ইবন আমর এসেছেন। তুমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে ওই হাদীসটি সম্পর্কে আবার জিজ্ঞাসা করবে। উরওয়া বলেন, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি ওই হাদীসটি প্রথমবার আমাকে যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই বর্ণনা করেন। আমি যখন খালাকে বিষয়টি বলি, তিনি বলেন:
مَا أَحْسَبُهُ إِلَّا قَدْ صَدَقَ أَرَاهُ لَمْ يَزِدْ فِيْهِ شَيْئًا وَلَمْ يَنْقُصْ.
আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি ঠিকই বলেছেন। দেখছি তো, তিনি একটু বাড়িয়েও বলেননি, কমিয়েও বলেননি। ১৭২
এই বর্ণনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, আয়িশা (রা.)-এর খটকা লাগলে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, সত্যই এটা নবীর হাদীস কি না এবং নিশ্চিত হওয়ার পর নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছেন, কোনো অজুহাতেই বাতিল করার চেষ্টা করছেন না। সকল সাহাবির এটাই ছিল রীতি। এমনকি তাঁরা কোনো বর্ণনাকে নবীর হাদীস বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাতে কুরআনের সাথে কাল্পনিক সংঘর্ষ আবিষ্কারেরও চেষ্টা করতেন না। পূর্বের বুঝের সাথে অমিল হলে হাদীস অনুযায়ী নিজের বুঝ মেরামত করে নিতেন।
ইসলামের প্রথম খলীফা প্রধানতম সাহাবি সিদ্দীকে আকবার আবু বাকর (রা.)-ও হাদীসকে শরীআতের অন্যতম উৎস হিসাবে মান্য করতেন। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) ও ইবন আব্বাস (রা.) বলেন:
لَمَّا قُبِضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخْتَلَفُوْا فِي دَفْنِهِ فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ : سَمِعْتُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا مَا نَسِيْتُهُ قَالَ: مَا قَبَضَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا فِي الْمَوْضِعِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُدْفَنَ فِيْهِ ادْفِنُوهُ فِي مَوْضِعِ فِرَاشِهِ.
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল করেন সাহাবিদের মধ্যে তাঁর দাফন সংক্রান্ত বিষয়ে মতানৈক্য হয়। তখন আবু বাকর (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি, যা আজও ভুলিনি, তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ কোনো নবী (আ.)-এর জান সে স্থানেই কবয করেন যেখানে তাঁর দাফন হওয়া তিনি পছন্দ করেন।' সুতরাং তোমরা নবীজিকে তাঁর মৃত্যুর বিছানার স্থানেই দাফন করো। ১৭৩
এ বর্ণনার আলোকে আমরা দেখছি, আবু বাকর সিদ্দীক (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর প্রথম সিদ্ধান্তই দিয়েছেন হাদীসের আলোকে। এভাবেই তিনি সারা জীবন সকল কাজে নবীজির সুন্নাহকে সামনে রেখেছেন। খিলাফাতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তিনি একটি ভাষণ দেন। সে মূল্যবান ভাষণে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান বর্ণনার পর তিনি বলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ وَلِيْتُ أَمْرَكُمْ وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ وَلَكِنْ نَزَلَ الْقُرْآنُ وَسَنَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم السُّنَنَ فَعَلَّمَنَا فَعَلِمْنَا ... أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَنَا مُتَّبِعُ وَلَسْتُ بِمُبْتَدِعٍ فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِيْنُوْنِيْ وَإِنْ زُعْتُ فَقَوَّمُوْنِي.
হে লোকসকল, আমি তোমাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। আমি তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। তবে কুরআন নাযিল হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ প্রবর্তন করেছেন—তিনি শিক্ষা দিয়েছেন আর আমরা শিখে নিয়েছি।... হে লোকসকল, আমি কেবল অনুসারী; উদ্ভাবক নই। সঠিক পথে থাকলে আমাকে সাহায্য করবে আর বিচ্যুত হলে সোজা করে দেবে। ১৭৪
আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, ফাতিমা (রা.) এবং আব্বাস (রা.) আবু বাকর (রা.)-এর কাছে নবীজির মিরাস দাবি করেন। এ প্রসঙ্গে আবু বাকর (রা.) বলেন:
وَإِنِّي وَاللَّهِ لَا أَدَعُ أَمْرًا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُهُ فِيْهِ إِلَّا صَنَعْتُهُ.
এক্ষেত্রে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যা কিছু করতে দেখেছি তার কিছুই ছাড়ব না, সবকিছুই কার্যে পরিণত করব।১৭৫
কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু বলেছেন আবু বাকর সিদ্দীক (রা.) তাকে মহান আল্লাহপ্রদত্ত আবশ্যক বিধান বলে গণ্য ও মান্য করতেন। আনাস (রা.)-কে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে প্রেরণকালে যাকাতের বিস্তারিত বিধান সংক্রান্ত যে লিখিত দস্তাবেজ তাঁর কাছে দিয়ে দেন তাঁর শুরুতে তিনি লেখেন:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ هَذِهِ فَرِيضَةُ الصَّدَقَةِ الَّتِي فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ وَالَّتِي أَمَرَ اللَّهُ بِهَا رَسُوْلَهُ.
পরম দয়ালু চিরদয়াময় আল্লাহর নামে। এটা যাকাত নির্ধারণ বিষয়ক দস্তাবেজ-যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের উপর আবশ্যক করেছেন এবং আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যার আদেশ করেছেন।১৭৬
সাহাবি কাবীসাহ ইবন যুআইব (রা.) বলেন, এক দাদি এসে আবু বাকর (রা.)-এর কাছে মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার দাবি করে। তখন তিনি বলেন:
مَا لَكِ فِي كِتَابِ اللهِ تَعَالَى شَيْءٍ وَمَا عَلِمْتُ لَكِ فِي سُنَّةِ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا فَارْجِعِي حَتَّى أَسْأَلَ النَّاسَ.
'আল্লাহ তাআলার কিতাবে আপনার জন্য (দাদির উত্তরাধিকার বিষয়ে) কোনো আলোচনা নেই। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা আছে কি না আমার জানা নেই। আপনি ফিরে যান। আমি মানুষদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখি।'
এরপর তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। মুগীরাহ ইবন শু'বাহ (রা.) বলেন, আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাদিকে এক-ষষ্ঠাংশ দান করেন। আবু বাকর (রা.) বলেন, আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছেন? তখন অন্য সাহাবি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা.) দাঁড়ান এবং মুগীরাহ (রা.)-এর অনুরূপ বলেন। তখন আবু বাকর (রা.) সে অনুযায়ী নির্দেশ প্রদান করেন। ১৭৭
মাইমুন ইবন মিহরান (রা.) বলেন:
كَانَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا وَرَدَ عَلَيْهِ الْخَصْمُ نَظَرَ فِي كِتَابِ اللهِ فَإِنْ وَجَدَ فِيْهِ مَا يَقْضِي بَيْنَهُمْ قَضَى بِهِ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي الْكِتَابِ وَعَلِمَ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ الْأَمْرِ سُنَّةً قَضَى بِهِ فَإِنْ أَعْيَاهُ خَرَجَ فَسَأَلَ الْمُسْلِمِينَ وَقَالَ: أَتَانِي كَذَا وَكَذَا فَهَلْ عَلِمْتُمْ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي ذُلِكَ بِقَضَاءِ؟ فَرُبَّمَا اجْتَمَعَ إِلَيْهِ النَّفَرُ كُلُّهُمْ يَذْكُرُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْهِ قَضَاءً. فَيَقُوْلُ أَبُو بَكْرٍ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي جَعَلَ فِيْنَا مَنْ يَحْفَظُ عَلَى نَبِيِّنَا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আবু বাকর (রা.)-এর কাছে কোনো বিচার এলে তিনি আল্লাহর কিতাব দেখতেন। সেখানে তাদের বিষয়ে কোনো ফায়সালা পেলে সে অনুযায়ী বিচার করে দিতেন। আর আল্লাহর কিতাবে না থাকলে, সে বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সুন্নাহ তাঁর জানা থাকলে সে অনুযায়ী তিনি ফায়সালা করতেন। আর যদি সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো ফায়সালা তাঁর জানা না থাকত, তিনি বের হয়ে মুসলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন, আমার কাছে এ-জাতীয় বিচার এসেছে। তোমাদের কি এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ফায়সালা জানা আছে? প্রায়শ তাঁর পাশে কিছু লোক একত্র হয়ে যেত। তাঁরা সে বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ফায়সালা শোনাতেন। তখন আবু বাকর (রা.) বলতেন, প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত। তিনি আমাদের মাঝে এমন লোক রেখেছেন যিনি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিষয় সংরক্ষণ করেছেন। ১৭৮
প্রধান সাহাবি সকলেরই আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ ইলম ছিল। কিন্তু কুরআনের পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাদীস শেখা সত্ত্বেও কোনো কোনো হাদীস অজানা থাকা সংগত কারণেই অসম্ভব নয়। তাই নবীজির ইন্তিকালের পরপর প্রথম দিকে কিছু ঘটনা এমন ঘটেছে যে, কোনো সাহাবি একটি হাদীস বলেছেন, কিন্তু কোনো প্রধান সাহাবি সে হাদীসটি জানেন না। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে, এটি সত্যই নবীর হাদীস কি না। প্রথমত তিনি তাঁর জানা ইলম অনুযায়ী এর উপর সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন। কখনো হয়তো সন্দেহের কারণ হিসাবে কুরআনের কোনো আয়াত পেশ করেছেন এবং হাদীসের পক্ষে পর্যাপ্ত দলীল পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি কুরআন দিয়ে হাদীস বাতিল করে দিচ্ছেন। বরং হাদীসটি তাঁর জানা ইলমের থেকে ভিন্ন হওয়ায় তিনি জানা ইলমের আলোকে এই অজানা ইলমের প্রতি প্রথমত সন্দেহ আরোপ করে এটি সত্যই নবী-বাণী কি না তা নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে সুন্নাহর বিপরীতে সুন্নাহ হলেও একই পন্থা তাঁরা অবলম্বন করতেন। যেমন মহিলা সাহাবি ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) যখন বলেন যে, তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেন, তিনি ইদ্দতকালীন আবাসন ও ভরণপোষণের খরচ পাবেন না। এ কথা শুনে উমার (রা.) বলেন:
إِنْ جِئْتِ بِشَاهِدَيْنِ يَشْهَدَانِ أَنَّهُمَا سَمِعَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... لَا نَتْرُكُ كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّنَا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْلِ امْرَأَةٍ لَا نَدْرِي لَعَلَّهَا حَفِظَتْ أَوْ نَسِيَتْ.
আপনি কি দুজন সাক্ষী আনতে পারবেন যারা সাক্ষ্য দেবে যে, তারা এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন?... এছাড়া তো আমরা একটি নারীর কথায় আল্লাহর কিতাব ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। আমরা জানি না, তিনি ঠিক ঠিক স্মরণ রাখতে পেরেছেন, নাকি ভুলে গেছেন। ১৭৯
তিনটি বিষয় লক্ষণীয়, ১. উমার (রা.) তাঁর বক্তব্যের পেছনে সূরা তালাকের ১ নং আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। ২. তিনি ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.)-কে তাঁর হাদীসের পক্ষে দুজন সাক্ষী আনয়নের কথা বলেছেন। বোঝা যাচ্ছে, উমার (রা.) সরাসরি এ হাদীসকে বাতিল করে দিচ্ছেন না। সাক্ষী পেয়ে নবীজির হাদীস বলে নিশ্চিত হতে পারলে গ্রহণ করবেন এবং ৩. তিনি বলেছেন, '...আল্লাহর কিতাব ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না'। অর্থাৎ তিনি শুধু কুরআনের বিপরীতে হাদীসের ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। বরং তাঁর জানা হাদীসের বিপরীতে হাদীস হলেও একই কথা প্রযোজ্য।
অনুমতি প্রার্থনা বিষয়ক হাদীস, যা বাহ্যত কুরআনি বিধানকে আংশিক পরিবর্তন করে দেয়, আবু মূসা আশআরি (রা.) যখন হাদীসটি উমার (রা.)-কে বলেন, উমার (রা.) তাঁকে সাক্ষী আনতে বলেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সাক্ষ্য দিলে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, এটা সত্যই নবী- বাণী। তখন তিনি হাদীসটি গ্রহণ করেন এবং স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন:
خَفِيَ عَلَيَّ هَذَا مِنْ أَمْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلْهَانِي عَنْهُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ... إِنِّي لَمْ أَتَّهِمْكَ وَلَكِنَّ الْحَدِيثَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَدِيدٌ... وَلَكِنْ خَشِيْتُ أَنْ يَتَقَوَّلَ النَّاسُ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম বিষয়ক এই নির্দেশনাটি আমার অজানা রয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা আমাকে অনবহিত রেখেছে। আমি আপনাকে সন্দেহ করিনি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করা তো অনেক বড় ব্যাপার! আমার আশঙ্কা হয়, মানুষ তাঁর নামে বানিয়ে কথা বলে কি না!১৮০
উমার (রা.) আবু মূসা আশআরি (রা.)-কে তাঁর বর্ণিত হাদীসের পক্ষে সাক্ষী আনতে বলেন। এ থেকে যদি আমরা বুঝে থাকি যে, কুরআনের বিপরীত হওয়ায় তিনি এ হাদীস মানছেন না তবে সেটা আমাদের বোঝার ভুল। তিনি পরে সুস্পষ্ট করেই বলেছেন, আবু মূসা আশআরি (রা.)-কে তিনি সন্দেহ করেননি। তবে তিনি চেয়েছেন, নবীজির নামে হাদীস বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেন যে কেউ যাচ্ছেতাই বলতে না পারে। তাই তিনি হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে এ কঠোর পন্থা অবলম্বন করেছেন। অন্যান্য সাহাবি থেকে বর্ণিত এ ধরনের অন্য ঘটনাগুলোও এর আলোকে ব্যাখ্যেয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হাদীসে নববি ইসলামি শরীআতের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ার কারণে সকল যুগেই হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে। আর সাহাবিদের মতো প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিসগণও হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে এ ধরনের কঠোর নিরীক্ষণের পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। তাই হাদীস জাল করা কোনো যুগেই এমন ডালভাত ছিল না যে, যে কেউ যাচ্ছেতাই বলছে আর উম্মাত তা গ্রহণ করে নিচ্ছে। বরং কোনো জালিয়াতের কথায় সাধারণ মানুষ সাময়িকভাবে প্রতারিত হলেও মুহাদ্দিসদের নিরীক্ষায় তা ধরা পড়ে যেত। প্রত্যেক যুগের জাল বর্ণনা সমসাময়িক মুহাদ্দিসদের দ্বারাই চিহ্নিত হয়ে গেছে। এমন নয় যে, দীর্ঘকাল ধরে ভুলশুদ্ধ একত্র হয়ে ধোঁয়াশা হয়ে গেছে আর পরবর্তীকালে প্রয়োজন অনুভূত হলে তা থেকে ধুলোর আস্তর সরিয়ে বিশুদ্ধ নবী-বাণী বের করে আনা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

টিকাঃ
১৬০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৪。
১৬১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১৪১২。
১৬২. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ১৬৪; সহীহ বুখারি, হাদীস : ১২৮৭, ১২৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯২৭, ৯২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ১৮৫৮。
১৬৩. সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৫৩৯৯; সুনান দারিমি, হাদীস: ১৬৯। শায়খ আলবানি বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ।
১৬৪. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৯০৭。
১৬৫. সুনান দারিমি, হাদীস: ২৪২৬。
১৬৬. কাসতাল্লানি, ইরশাদুস সারি, ১০/৩১৪; আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১/২০৪。
১৬৭. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩০০৬; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫২১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ১৩৯৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২; মুসনাদ তায়ালিসি, হাদীস: ১ ও ২。
১৬৮. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৩৬১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৬。
১৬৯. মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস: ২৬১৩৪; সুনান দারিমি, হাদীস : ৬৫০; মুস্তাদরাক হাকিম: ৩২৪। এই বর্ণনাটিকে হুসাইন দারানি সহীহ বলেছেন।
১৭০. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩১২৯; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৫৬৮১。
১৭১. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১০৮; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৭/২৬৮。
১৭২. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৭৩; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৮/৩৩。
১৭৩. মুআত্তা মালিক: ১/২৩১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১০১৮; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১৬২৮; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ২২; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, হাদীস: ৩৮৩২。
১৭৪. আবু উবাইদ, আলখুতাবু ওয়াল মাওয়ায়িয, হাদীস: ১১৯; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৩৬। বর্ণনাটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য।
১৭৫. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৯ ও ৫৮; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৬৭২৫-৬৭২৬。
১৭৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১৪৫৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ২২৬১; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫৬৭; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১৮০০。
১৭৭. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ৩০৩৮; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২৮৯৪; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২১০১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ২৭২৪; মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস: ৩১২৭২; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৭৯৭৮। ইমাম তিরমিযি, হাকিম, যাহাবি, মুহাম্মাদ আওয়ামা, ইসলাম মানসুর প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১৭৮. সুনান দারিমি, হাদীস: ১৬৩; বাইহাকি, আসসুনানুল কুবরা, হাদীস : ২০৩৪১। নাদরাতুন নাঈম, ২/৩৮। বর্ণনাটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য।
১৭৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪৮০; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৩৫৪৯; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২ ২৯১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১১৮০。
১৮০. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ২০৩০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১০২৯, ১৯৬১১; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৩৫৩, ৬২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৫৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৫১৮০- ৫১৮৪; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল: ৬/৫৭৯。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবূ হুরাইরা (রা.)

📄 সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী আবূ হুরাইরা (রা.)


আবু হুরাইরা (রা.) সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি। হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁর নামে বর্ণিত হাদীস সর্বাধিক। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। ১৮১ অথচ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন সপ্তম হিজরিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিন বছরের কিছু বেশি কাল। এ বিষয়ে হাদীসশাস্ত্র না জানা সাধারণ মানুষের কৌতূহল এবং হাদীস অস্বীকারকারীদের আপত্তি—তিনি এত হাদীস কোথায় পেলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সারা জীবনের সাহচর্যধন্য সাহাবিদের তুলনায় তাঁর হাদীস বেশি হলো কীভাবে?
তাছাড়া আবু হুরাইরা (রা.) যেহেতু সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী, তাঁকে বিতর্কিত করতে পারলেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাদীসের ব্যাপারে সংশয় তৈরি করা যাবে, তাই হাদীস অস্বীকারকারী ইসলামের শত্রুরা তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের জন্য বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছে। কিন্তু তাদের উত্থাপিত সে সকল অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও অনৈতিহাসিক। সেসব প্রলাপের প্রত্যুত্তর করে আমরা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তকের কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। কোনো সাধারণ মুসলিমও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহধন্য এ মহান সাহাবি সম্পর্কে সেসব নোংরা কথা বিশ্বাস করবে না। তিনি কীভাবে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবির মর্যাদায় উত্তীর্ণ হলেন—আমরা কেবল সংক্ষেপে এ বিষয়ক ঐতিহাসিক পর্যালোচনার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই।
আবু হুরাইরা (রা.) ইসলাম গ্রহণ ও ইলম অর্জনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন, আবাসে-প্রবাসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য অবধারিত করে নিয়েছেন, নবীজির ইন্তিকালের পর যখনই তিনি জানতে পেরেছেন কোনো সাহাবির কাছে এমন হাদীস আছে যা তিনি জানেন না, তাঁর দরজায় ছুটে গেছেন, অর্জিত হাদীস সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে দেওয়াকে জীবনের একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
তিনি যে হাদীসের প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন এ স্বীকৃতি নবীজি নিজেই দিয়েছেন। সাঈদ মাকবুরি বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের অধিক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে হবে? তখন নবীজি বলেন:
لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لَّا يَسْأَلُنِي عَنْ هُذَا الْحَدِيْثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ.
হে আবু হুরাইরা, আমি জানতাম, তোমার আগে এ হাদীস সম্পর্কে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞাসা করবে না। কেননা আমি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। ১৮২
অন্য সাহাবিগণও ইলমের প্রতি সর্বাধিক আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁদের পারিবারিক ব্যস্ততাও ছিল। আর আবু হুরাইরা (রা.) শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকে হাদীস চর্চায় নিরত থেকেছেন। এজন্য তাঁর হাদীসের ভান্ডার ছিল সর্বাধিক সমৃদ্ধ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন তিনি পরবর্তীদেরকে হাদীস শিক্ষা দেওয়ার ব্রত গ্রহণ করলেন, দেখা গেল তাঁর হাদীসের ভান্ডার ব্যাপক সমৃদ্ধ এবং অনেক এমন হাদীসও তিনি বর্ণনা করছেন যা অন্য অনেক সাহাবি জানেন না। এ বিষয়টি সাহাবিদেরকেও বিস্মিত করেছিল। সমাজে বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনাও হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) নিজেও সে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং বাস্তবতা খোলাসা করেছেন। সাহাবিগণও নিশ্চিত হয়েছেন এবং খোলামেলা সাক্ষ্য প্রদান করেছেন—তাঁর জন্য সর্বাধিক হাদীস জানা এবং অন্যদের না-জানা অনেক কিছু জানা একেবারেই স্বাভাবিক।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব এবং আবু সালামা ইবন আব্দুর রহমান (রাহ.) বলেছেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন:
إِنَّكُمْ تَقُوْلُوْنَ: إِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ يُكْثِرُ الْحَدِيثَ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتَقُوْلُوْنَ مَا بَالُ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ لَا يُحَدِّثُوْنَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمِثْلِ حَدِيْثِ أَبِي هُرَيْرَةَ وَإِنَّ إِخْوَتِي مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمْ صَفْقُ بِالْأَسْوَاقِ وَكُنْتُ أَلْزَمُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى مِلْءِ بَطْنِي فَأَشْهَدُ إِذَا غَابُوْا وَأَحْفَظُ إِذَا نَسُوْا وَكَانَ يَشْغَلُ إِخْوَتِي مِنَ الْأَنْصَارِ عَمَلُ أَمْوَالِهِمْ ( عَمَلُ أَرَضِيهِمْ) وَكُنْتُ امْرَأَ مِسْكِينًا مِّنْ مَسَاكِينِ الصُّفَةِ أَعِي حِيْنَ يَنْسَوْنَ.
তোমরা বলছ যে, আবু হুরাইরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি বেশি হাদীস বর্ণনা করেন। তোমরা এটাও বলছ যে, মুহাজির-আনসাররা কেন আবু হুরাইরার মতো হাদীস বর্ণনা করেন না? শোনো, বাস্তবতা এই যে, আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট পড়ে থাকতাম। তাই তাঁরা যখন থাকতেন না আমি তখনও থাকতাম। তাঁরা যা ভুলে যেতেন আমি তা মুখস্থ করতাম। আর আমার আনসার ভাইয়েরা নিজেদের খেত-খামারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি ছিলাম সুফফার অধিবাসী সর্বত্যাগী এক মিসকীন। যা তারা ভুলে যেতেন, আমি তা স্মরণ রাখতাম। ১৮৩
একজন আরব হিসাবে সে সময়ের আরব জাতির যে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল, আবু হুরাইরা (রা.) স্বভাবিকভাবেই সে প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু হাদীস সংরক্ষণের অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে তিনি নবীজির কাছে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য দুআ চেয়েছেন। নবীজিও তাঁর স্মৃতিশক্তির জন্য দুআ করেছেন। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
إِنَّهُ لَنْ يَبْسُطُ أَحَدٌ ثَوْبَهُ حَتَّى أَقْضِيَ مَقَالَتِيْ هَذِهِ ثُمَّ يَجْمَعَ إِلَيْهِ ثَوْبَهُ إِلَّا وَعَى مَا أَقُوْلُ فَبَسَطْتُ نَمِرَةً عَلَيَّ حَتَّى إِذَا قَضَى رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَقَالَتَهُ جَمَعْتُهَا إِلَى صَدْرِي فَمَا نَسِيْتُ مِنْ مَقَالَةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِلْكَ مِنْ شَيْءٍ.
আমার এই কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে কেউ তার কাপড় বিছিয়ে রাখবে, তারপর নিজের শরীরের সাথে জড়িয়ে নেবে, সে আমি যা বলছি স্মরণ রাখতে পারবে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, তখন আমি আমার গায়ের কাপড়খানা তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিছিয়ে রাখলাম। তারপর বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেইসব কথা আজও কিছুই ভুলিনি। ১৮৪
সাঈদ মাকবুরি (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আমি বললাম:
يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَسْمَعُ مِنْكَ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنْسَاهُ قَالَ: ابْسُطُ رِدَاءَكَ فَبَسَطْتُهُ قَالَ: فَغَرَفَ بِيَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ: ضُمَّهُ فَضَمَمْتُهُ فَمَا نَسِيْتُ شَيْئًا بَعْدَهُ.
হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার কাছ থেকে শোনা অনেক হাদীস ভুলে যাই। তিনি বললেন, তোমার চাদর মেলে ধরো। আমি মেলে ধরলাম। তিনি দুই হাত অঞ্জলিবদ্ধ করে বললেন, এবার বুকের সাথে লাগাও। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি।১৮৫
সাঈদ ইবন আবী হিন্দের সূত্রে আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত :
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ أَلَا تَسْأَلُنِي مِنْ هَذِهِ الْغَنَائِمِ الَّتِي يَسْأَلُنِي أَصْحَابُكَ؟ فَقُلْتُ أَسْأَلُكَ أَنْ تُعَلَّمَنِي مِمَّا عَلَّمَكَ اللهُ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, তোমার সঙ্গী-সাথিদের মতো তুমি কি আমার কাছে এই গনীমতের অংশ চাইবে না? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি চাই, আপনি আমাকে সেই ইলম শিক্ষা দেবেন যে ইলম আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন।১৮৬
এক ব্যক্তি যাইদ ইবন সাবিত (রা.)-এর নিকট এসে তাঁকে একটি বিষয় জিজ্ঞাসা করল। যাইদ (রা.) তাকে বললেন, তুমি গিয়ে আবু হুরাইরা (রা.)-কে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করো। কারণ একদিনের ঘটনা এই যে, আমি, আবু হুরাইরা (রা.) এবং অন্য এক ব্যক্তি মসজিদে দুআ ও যিকির করছিলাম। এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এসে বসলে আমরা চুপ হয়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা যে দুআ করছিলে তা করতে থাকো'। যাইদ (রা.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.)-এর আগে আমরা দুজন দুআ করলাম। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দুআয় 'আমীন' বললেন। তারপর আবু হুরাইরা (রা.) দুআ করলেন। দুআয় তিনি বললেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِثْلَ مَا سَأَلَكَ صَاحِبَايَ هَذَانِ وَأَسْأَلُكَ عِلْمًا لَا يُنْسَى.
হে আল্লাহ, আমার এই দুই সাথি তোমার কাছে যেমন প্রার্থনা করেছে আমিও তেমন প্রার্থনা করছি এবং আরো প্রার্থনা করছি এমন ইলম যা কখনো ভুলে যাব না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমীন'। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরাও এমন ইলম চাই যা ভুলে যাব না। তিনি বললেন, এক্ষেত্রে এই দাওসি গোলাম আবু হুরাইরা তোমাদের থেকে অগ্রগামী। ১৮৭
আবু হুরাইরা (রা.)-এর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করার পর তিনি আর কিছুই বিস্মৃত হননি। সাঈদ মাকবুরি (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন:
يَقُولُ النَّاسُ : أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَلَقِيْتُ رَجُلًا فَقُلْتُ: بِمَا قَرَأَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَارِحَةَ فِي الْعَتَمَةِ؟ فَقَالَ: لَا أَدْرِي فَقُلْتُ: لَمْ تَشْهَدْهَا؟ قَالَ: بَلَى قُلْتُ: لَكِنْ أَنَا أَدْرِي قَرَأَ سُوْرَةَ كَذَا وَكَذَا.
লোকে বলাবলি করত, আবু হুরাইরা বেশি বেশি বর্ণনা করছে। সে সময় আমি এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, বলো তো গতরাতে ইশার সালাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সূরা পাঠ করেছেন? সে বলল, জানি না। আমি বললাম, ওই সালাতে কি তুমি উপস্থিত ছিলে না? সে বলল, হ্যাঁ, ছিলাম। আমি বললাম, কিন্তু আমি জানি। তিনি অমুক অমুক সূরা পাঠ করেছেন। ১৮৮
মদীনার গভর্নর মারওয়ান একবার আবু হুরাইরা (রা.)-এর স্মরণশক্তি পরীক্ষা করেন। মারওয়ানের সচিব আবু যুআইযাআহ বলেন, মারওয়ান আবু হুরাইরা (রা.)-কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে হাদীস বর্ণনা করতে আবেদন করেন। আর আমাকে পর্দার আড়ালে বসিয়ে রাখেন তাঁর বর্ণিত হাদীস লিখে রাখার জন্য। পরবর্তী বছর তিনি আবার তাঁকে ডেকে পাঠান এবং পূর্বে বর্ণিত হাদীস বর্ণনা করতে আবেদন করেন। আর আমাকে নিরীক্ষণ করতে বলেন। আমি দেখলাম, তিনি গত বছরের হাদীস হুবহু বর্ণনা করলেন; একটি হরফও পরিবর্তন করলেন না। ১৮৯
এভাবে যিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শেখার জন্য তাঁর সান্নিধ্যকে আবশ্যক করে নিয়েছিলেন তাঁর জন্য কি তিন বছরেরও অধিককালে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি হাদীস অবগত হওয়া আশ্চর্যের কিছু? উপরন্তু যে সকল হাদীস তিনি সরাসরি নবীজির কাছ থেকে শোনার সুযোগ পাননি সে সকল হাদীসও যারা জানেন তাঁদের কাছ থেকে শিখে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।
ওয়ালিদ ইবন রাবাহ বলেন, আমি শুনেছি, আবু হুরাইরা (রা.) মারওয়ানকে বলছেন:
نَعَمْ قَدِمْتُ وَرَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِخَيْبَرَ سَنَةَ سَبْعِ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ قَدْ زِدْتُ عَلَى الثَّلَاثِينَ سَنَةً سَنَوَاتٍ وَأَقَمْتُ مَعَهُ حَتَّى تُوُفِّيَ أَدُوْرُ مَعَهُ فِي بُيُوتِ نِسَائِهِ وَأَخْدِمُهُ وَأَنَا وَاللَّهِ يَوْمَئِذٍ مُقِل وَأُصَلِّي خَلْفَهُ وَأَحُجُّ وَأَغْزُوْ مَعَهُ فَكُنْتُ وَاللَّهِ أَعْلَمَ النَّاسِ بِحَدِيثِهِ قَدْ وَاللهِ سَبَقَنِي قَوْمٌ بِصُحْبَتِهِ وَالْهِجْرَةِ إِلَيْهِ مِنْ قُرَيْشٍ وَالْأَنْصَارِ وَكَانُوا يَعْرِفُوْنَ لُزُوْمِي لَهُ فَيَسْأَلُوْنِي عَنْ حَدِيثِهِ مِنْهُمْ عُمَرُ وَعُثْمَانُ وَعَلِيٌّ وَطَلْحَةُ وَالزُّبَيْرُ فَلَا وَاللَّهِ مَا يَخْفَى عَلَيَّ كُلُّ حَدِيثٍ كَانَ بِالْمَدِينَةِ وَكُلُّ مَنْ أَحبَّ اللَّهَ وَرَسُوْلَهُ وَكُلُّ مَنْ كَانَتْ لَهُ عِنْدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْزِلَةٌ وَكُلُّ صَاحِبِ لَهُ.
হ্যাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সপ্তম হিজরিতে খাইবারের যুদ্ধকালেই এসেছিলাম। তখন আমার বয়স ত্রিশের কিছু বেশি। আর সে সময় থেকে তাঁর ইন্তিকাল পর্যন্ত সর্বদা আমি তাঁর সাথেই থেকেছি। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রীদের বাসায় গেছি। তাঁর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম, তখন আমি ছিলাম সর্বহারা নিঃস্ব। তাঁর পেছনে সালাত আদায় করতাম। তাঁর সাথে হজ্জে ও যুদ্ধে যেতাম। সুতরাং আল্লাহর কসম, আমি তাঁর হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তি। আল্লাহর কসম, কুরাইশ ও আনসাদের অনেকেই তাঁর সান্নিধ্য ও তাঁর নিকট হিজরতে আমার অগ্রগামী। কিন্তু সর্বদা তাঁর নিকট আমার অবস্থানের বিষয়টি তাঁরা জানেন। তাই তাঁরা অনেকেই আমার কাছে তাঁর হাদীস জানতে চান। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর (রা.)। আল্লাহর কসম, মদীনার কোনো হাদীসই আমার অজ্ঞাত নয়। আমি জানি, কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। তাঁর কাছে কার বিশেষ মর্যাদা ছিল এবং কারা তাঁর সোহবতধন্য। ১৯০
এভাবে আবু হুরাইরা (রা.) সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস সংগ্রহ করেন। অতঃপর তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি সত্ত্বেও হাদীস যথাযথ স্মরণ রাখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতেন। তিনি বলেছেন :
إِنِّي أُجَرِّئُ اللَّيْلَ ثَلَاثَةَ أَجْزَاءٍ فَجُزْءٌ لِقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَجُزْءٌ أَنَامُ فِيهِ وَجُزْءٌ أَتَذَكَّرُ فِيْهِ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আমি রাতকে তিন ভাগে ভাগ করি। একভাগ কুরআন পাঠের জন্য, একভাগে ঘুম যাই, আর একভাগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুশীলন করি। ১৯১
তবে নবীজির যুগে তিনি লিখিত আকারে নয়, বরং স্মৃতিতেই হাদীস সংরক্ষণ করতেন। আর আমরা জেনে এসেছি যে, নবীজির দু'আয় তিনি ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। একবার হাদীস শুনলে আর ভুলতেন না। তিনি বলেছেন :
مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيثًا عَنْهُ مِنِّي إِلَّا مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلَا أَكْتُبُ.
কোনো সাহাবি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস আমার থেকে বেশি জানতেন না। তবে আব্দুল্লাহ ইবন আমর লিখে রাখতেন আর আমি লিখতাম না। ১৯২
তবে পরবর্তীকালে তিনি তাঁর সংগৃহীত হাদীস লিখেও নিয়েছিলেন। তাঁর ছাত্র হাসান ইবন আমর (রাহ.) বলেন, একবার আবু হুরাইরা (রা.)-এর নিকট আমি একটি হাদীস বললাম। তিনি বললেন, তুমি যদি এই হাদীসটি আমার থেকে শুনে থাকো তবে তা আমার কাছে লিখিত আছে। তারপর তিনি হাত ধরে আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস লিখিত অনেক পাণ্ডুলিপি দেখালেন এবং বললেন:
قَدْ أَخْبَرْتُكَ أَنِّي إِنْ كُنْتُ قَدْ حَدَّثْتُكَ بِهِ فَهُوَ مَكْتُوْبُ عِنْدِي.
আমি তো তোমাকে বলেছি, আমি যদি তোমাকে হাদীসটি শুনিয়ে থাকি তবে অবশ্যই আমার কাছে তা লিখিত থাকবে। ১৯৩
হাদীস শিক্ষাগ্রহণের মতো হাদীস শিক্ষাদানটাও সাহাবিদের কারো ছিল প্রধানতম কাজ, কারো ছিল অন্যতম কাজ। আর আবু হুরাইরা (রা.)-এর ছিল একমাত্র কাজ। তিনি হাদীস সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যেমন সর্বোচ্চ সচেষ্ট ব্যক্তি ছিলেন, তেমনি পরবর্তীদের নিকট হাদীস পৌঁছে দেওয়াকেও অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ছাত্র আ'রাজ (রাহ.) বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন :
إِنَّ النَّاسَ يَقُوْلُوْنَ أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَلَوْلَا آيَتَانِ فِي كِتَابِ اللهِ مَا حَدَّثْتُ حَدِيثًا ثُمَّ يَتْلُوْ {إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُوْنَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ البَيِّنَاتِ وَالْهُدَى إِلى قَوْلِهِ الرَّحِيمُ} إِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ وَإِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْأَنْصَارِ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الْعَمَلُ فِي أَمْوَالِهِمْ وَإِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَلْزَمُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشِبَعِ بَطْنِهِ وَيَحْضُرُ مَا لَا يَحْضُرُوْنَ وَيَحْفَظُ مَا لَا يَحْفَظُوْنَ.
লোকেরা বলাবলি করছে, আবু হুরাইরা বেশি বেশি বর্ণনা করছে। যদি আল্লাহর কিতাবে দুটি আয়াত না থাকত, আমি একটি হাদীসও বর্ণনা করতাম না। তারপর তিনি সূরা বাকারাহর ১৫৯ ও ১৬০ নং আয়াত দুটি তিলাওয়াত করেন। ১৯৪
এবং অন্য সাহাবিদের তুলনায় তাঁর হাদীস ভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার কারণ হিসাবে বলেন, আমাদের মুহাজির ভাইয়েরা ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে মশগুল থাকতেন, আনসার ভাইয়েরা অন্যান্য কাজে মশগুল থাকতেন আর আবু হুরাইরা শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপর তুষ্ট থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে পড়ে থাকত। তাঁরা যখন অনুপস্থিত থাকতেন সে তখনো উপস্থিত থাকত, তাঁরা যা মুখস্থ করতে পারতেন না সে তাও মুখস্থ করত। ১৯৫
এ কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর সাহাবিদের সমাজেই আবু হুরাইরা (রা.) হাদীসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে পরিগণিত হন। দলে দলে তাবিয়ি প্রজন্ম তাঁর নিকট হাদীস শিখতে আসেন। এমনকি প্রধান সাহাবিরাও তাঁকে হাদীস জিজ্ঞাসা করেন। যদিও তাঁর হাদীসের সংখ্যা দেখে প্রথমে তাঁরা হতচকিত হয়েছেন। তবে পরে বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাঁরা খোলাখুলি স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, আবু হুরাইরার জন্য সর্ববৃহৎ হাদীসের ভান্ডার হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাঁর হাদীসের ছাত্র, যাদের বর্ণিত হাদীস হাদীসের কিতাবে সংকলিত হয়েছে, তাদের সংখ্যা আট শতাধিক।
ওয়ালিদ ইবন আব্দুর রাহমান বলেন, আবু হুরাইরা (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন:
مَنْ شَهِدَ جَنَازَةً فَلَهُ قِيرَاطٌ .
যে ব্যক্তি জানাযায় উপস্থিত হবে তার জন্য এক কীরাত সাওয়াব।
তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) বলেন, হে আবু হুরাইরা, একটু ভেবে দেখুন, আপনি কী হাদীস বর্ণনা করছেন! আপনি তো নবীজি থেকে বেশি বেশি হাদীস বর্ণনা করে থাকেন! তখন আবু হুরাইরা (রা.) তাঁর হাত ধরে আয়িশা (রা.)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। এবং তাঁকে বললেন, আপনি একে বলে দিন, এই হাদীসটি আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেমন শুনেছেন। আয়িশা (রা.) আবু হুরাইরা (রা.)- এর বর্ণনা সত্যায়ন করেন। তখন আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, হে আবু আব্দুর রাহমান, আল্লাহর কসম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে উপস্থিত থাকা ব্যতীত গাছের একটি চারা লাগানো বা বাজার- ঘাটের কোনো কাজ আমার ছিল না। তখন ইবন উমার (রা.) বলেন:
أَنْتَ أَعْلَمُنَا يَا أَبَا هُرَيْرَةَ بِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَحْفَظُنَا لِحَدِيثِهِ.
হে আবু হুরাইরা, আপনি আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ব্যক্তি এবং আমাদের মধ্যে আপনিই তাঁর হাদীস সর্বাধিক মুখস্থকারী।১৯৬
অন্য বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.) আবু হুরাইরা (রা.)-কে বলেছেন:
يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْتَ كُنْتَ أَلْزَمَنَا لِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَحْفَظَنَا لِحَدِيثِهِ.
হে আবু হুরাইরা, আপনি আমাদের মধ্যে অধিক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য অলম্বনকারী এবং তাঁর হাদীস সর্বাধিক সংরক্ষণকারী। ১৯৭
আবু সালিহ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরাইরা (রা.) বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمُ الرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الصُّبْحِ فَلْيَضْطَجِعْ عَلَى يَمِينِهِ.
যখন তোমাদের কেউ ফজরের পূর্বের দুই রাকআত পড়বে তখন ডান কাতে শয়ন করবে।
তখন মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁকে বলল, ডান কাতে শুয়ে বিশ্রামের সময়টুকুতে কেউ যদি মসজিদে রওয়ানা করে তবে কি যথেষ্ট হবে না? আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, না।
এ কথা ইবন উমার (রা.)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা নিজের উপর বেশি করছে। তখন ইবন উমারকে বলা হলো, আবু হুরাইরা (রা.)-এর কোনো কথা কি আপনি অস্বীকার করছেন? তিনি বললেন, না। তবে আবু হুরাইরা সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন আর আমরা নমনীয়তা গ্রহণ করছি। এ কথা আবু হুরাইরা (রা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বলেন:
فَمَا ذَنْبِي إِنْ كُنْتُ حَفِظْتُ وَنَسَوْا.
এতে আমার কী দোষ, যদি তাঁরা ভুলে যায় আর আমি স্মরণ রাখি?১৯৮
মালিক ইবন আবী আমির (রাহ.) বলেন, এক ব্যক্তি সাহাবি তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.)-এর নিকট এসে বলল, হে আবু মুহাম্মাদ, ওই ইয়ামানি লোক, অর্থাৎ আবু হুরাইরা, সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? সে কি আপনাদের থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সম্পর্কে বেশি জ্ঞাত—তাঁর কাছে এমন অনেক কথা শুনতে পাই যা আপনাদের কাছে শুনি না? নাকি সে এমন কথাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বলে যা তিনি বলেননি? তখন তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা.) বলেন :
وَاللَّهِ مَا نَشُكُ أَنَّهُ قَدْ سَمِعَ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ نَسْمَعْ وَعَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ إِنَّا كُنَّا أَقْوَامًا أَغْنِيَاءَ وَلَنَا بُيُؤْتَاتُ وَأَهْلُوْنَ وَكُنَّا نَأْتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي طَرَفَيِ النَّهَارِ وَكَانَ مِسْكِيْنًا لَا مَالَ لَهُ وَلَا أَهْلَ إِنَّمَا كَانَتْ يَدُهُ مَعَ يَدِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ يَدُورُ مَعَهُ حَيْثُ مَا دَارَ وَلَا نَشُكُ أَنَّهُ قَدْ عَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ وَسَمِعَ مَا لَمْ نَسْمَعُ ... وَلَمْ يَتَّهِمْهُ أَحَدٌ مِنَّا أَنَّهُ تَقَوَّلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ.
আল্লাহর কসম, আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন অনেক কথা শুনেছেন যা আমরা শুনিনি, এমন অনেক কিছু জানেন যা আমরা জানি না। কেননা আমরা সম্পদের অধিকারী ছিলাম। আমাদের বাড়িঘর, পরিবার-পরিজন ছিল। আমরা দিনের দুই প্রান্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসতাম। আর তিনি ছিলেন রিক্তহস্ত ও পরিবার-পরিজনহীন মিসকীন।
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরেই নির্ভরশীল ছিলেন। নবীজি যেখানে যেতেন তিনিও সেখানে যেতেন। তাই আমরা নিঃসন্দেহ যে, তিনি এমন অনেক কিছু জানেন যা আমরা জানি না এবং এমন অনেক কিছু শুনেছেন যা আমরা শুনিনি। আমাদের মধ্যে কেউ তাঁর ব্যাপারে এই সন্দেহ করেনি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বানোয়াট কথা বলেন। ১৯৯
উপরে উত্থাপিত তথ্যের আলোকে আমরা জানতে পারছি, আবু হুরাইরা (রা.) তিন বছরের অধিক সময় শুধুই হাদীস অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে আবাসে-প্রবাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। তারপর মদীনায় অবস্থানরত সকল সাহাবির হাদীস তিনি সংগ্রহ করেছেন।
আমরা এ বিষয়টিও জেনেছি যে, সাহাবিগণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো হাদীস শুনলে পরস্পরের মাঝে আলোচনা করতেন। এভাবে একটি হাদীস শুধু একজনই জানতেন না। বরং বহুজনের মাঝে ছড়িয়ে যেত। সুতরাং যারা মদীনার বাইরে চলে গিয়েছিলেন তাঁদের জানা হাদীসগুলো যে শুধু তাঁরাই জানতেন এমন নয়। বরং মদীনায় অবস্থানরত কোনো না কোনো সাহাবি হয়তো সেটি জানতেন। সুতরাং মদীনার সকল হাদীস সংগ্রহ করা মানে হাদীসের প্রায় পুরো ভান্ডারটাই আত্মস্থ করা।
এভাবে হাদীসের প্রায় পুরো ভান্ডার আত্মস্থ করার পর আবু হুরাইরা (রা.) প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল যাবৎ পরবর্তীদের নিকট নিরবচ্ছিন্নভাবে হাদীস বর্ণনা করে গেছেন। সুতরাং তাঁর নামে সর্বাধিক হাদীস, যার সংখ্যা পাঁচ হাজারের কিছু বেশি, বর্ণিত হওয়া মোটেও আশ্চর্যের বা অসম্ভব বিষয় নয়। তিনি বারবার বলেছেন এবং অন্য সাহাবিগণও মুক্তকণ্ঠে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সাহাবিদের মাঝে তিনিই ছিলেন সর্বাধিক হাদীস জানা ব্যক্তি।
যে সকল হাদীস তিনি সাহাবিদের কাছ থেকে শিখেছেন বর্ণনার ক্ষেত্রে কখনো তিনি উস্তাদ সাহাবির নাম বলেছেন কখনো বলেননি। আর কোনো সাহাবির জন্য উস্তাদ সাহাবির নাম উহ্য রেখে হাদীস বর্ণনা করা শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দোষের কিছু নয়। একটি হাদীস বর্ণনার পর জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি বলেন:
سَمِعْتُ ذَلِكَ مِنَ الْفَضْلِ وَلَمْ أَسْمَعْهُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
এটি আমি ফযল ইবন আব্বাস (রা.) থেকে শুনেছি। সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনিনি। ২০০
অন্য সাহাবিগণও এমনটি করতেন। এ বিষয়ক কিছু আলোচনা আমরা 'হাদীস সংরক্ষণ ও সম্প্রচারে সাহাবিগণ' শিরোনামের অধীনে দেখেছি।
হুমাইদ (রাহ.) বলেন, আনাস ইবন মালিক (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন, আপনি এ হাদীসটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন? এ প্রশ্নে আনাস (রা.) প্রচণ্ড রেগে যান এবং বলেন:
وَاللهِ مَا كُلُّ مَا تُحَدِّثُكُمْ بِهِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ كَانَ يُحَدِّثُ بَعْضُنَا بَعْضًا وَلَا يَتَّهِمُ بَعْضُنَا بَعْضًا.
আল্লাহর কসম, আমরা যে সকল হাদীস বর্ণনা করি সব হাদীসই আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি শুনিনি। বরং আমরা নবীজির কাছ থেকে শোনা হাদীস একে অপরকে বর্ণনা করতাম। আর আমাদের একে অপরকে সন্দেহ করত না। ২০১
হাদীসশাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম আল্লামা উসমান ইবন আব্দুর রাহমান ইবনুস সালাহ (রাহ.) [৬৪৩ হি.] বলেন :
إِنَّا لَمْ نَعُدَّ فِي أَنْوَاعِ الْمُرْسَلِ وَنَحْوِهِ مَا يُسَمًّى فِي أُصُولِ الْفِقْهِ مُرْسَلَ الصَّحَابِي مِثْلَمَا يَرْوِيْهِ ابْنُ عَبَّاسٍ وَغَيْرُهُ مِنْ أَحْدَاثِ الصَّحَابَةِ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يَسْمَعُوْهُ مِنْهُ لِأَنَّ ذَلِكَ في حُكْمِ الْمَوْصُوْلِ الْمُسْنَدِ لِأَنَّ رِوَايَتَهُمْ عَنِ الصَّحَابَةِ وَالْجَهَالَةَ بِالصَّحَابِي غَيْرُ قَادِحَةٍ لِأَنَّ الصَّحَابَةَ كُلَّهُمْ عُدُوْلٌ.
ইবন আব্বাস প্রমুখ নবীন সাহাবি যে সকল হাদীস সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শোনেননি, বরং কোনো সাহাবি থেকে শুনে সরাসরি নবীজির নামে বর্ণনা করেছেন, ফিকহশাস্ত্রে তাকে 'সাহাবির মুরসাল' বলা হলেও আমরা তাকে সূত্র-বিচ্ছিন্ন মুরসাল গোত্রীয় বলে গণ্য করি না। এ ধরনের বর্ণনা অবিচ্ছিন্ন সনদের বর্ণনা বলে গণ্য। কেননা নাম উহ্য রেখে সাহাবি কর্তৃক সাহাবির বর্ণনা দূষণীয় নয়। কারণ সাহাবিগণ সকলেই আদিল তথা সৎ ও নির্ভরযোগ্য। ২০২

টিকাঃ
১৮১. কোনো কোনো গবেষকের মতে আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মূলত ১২৩৬ টি। এই ১২৩৬ টি হাদীসই পাঁচ হাজারের অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই জন্যই বলা হয়, আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত হাদীস পাঁচ হাজারের বেশি। বিস্তারিত জানতে দেখুন: الاتجاه العقلي وعلوم الحديث للدكتور خالد أبي الخيل، دفاع عن أبي هريرة للدكتور عبد المنعم صالح.
১৮২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৮৮৫৮; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৯৯。
১৮৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ২০৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৪৯৩。
১৮৪. সহীহ বুখারি, হাদীস: ২০৪৭。
১৮৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৯; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৮৩৫。
১৮৬. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৯; আবু নুআইম, হিলয়াতুল আউলিয়া: ১/৩৮১। হাদীসটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য। দেখুন: আল ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ: ৭/৩৫৬。
১৮৭. নাসায়ি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৫৮৩৯; তাবারানি, আল মু'জামুল আওসাত, হাদীস : ১২২৮; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৫৮。
১৮৮. সহীহ বুখারি, হাদীস : ১২২৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১০৭২২。
১৮৯. ইবন হাজার, আল ইসাবাহ, ৭/৩৫৩。
১৯০. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৬; ইবন সা'দ, আত তাবাকাত ১/৩৫৯; ইবন আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৬৭/৩৫৫。
১৯১. ইবন কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮/১১৮; সুনান দারিমি, হাদীস : ২৭২。
১৯২. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৩; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৮。
১৯৩. ইবন আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, হাদীস: ৪২২; আসকালানি, ফাতহুল বারি ১/২০৭ ও ১/২১৫。
১৯৪. আয়াত দুটির অনুবাদ: 'নিশ্চয় যারা আমার নাযিলকৃত উজ্জ্বল নিদর্শনাবলি ও হিদায়াত গোপন করে মানুষের জন্য কিতাবে আমি তা বর্ণনা করার পর তাদেরকে আল্লাহ অভিশাপ করেন এবং অভিশাপকারীগণ অভিশাপ করেন। তবে যারা বিরত হয়, সংশোধন করে নেয় এবং বর্ণনা করে দেয় আমি তাদের তাওবা কবুল করে থাকি। আর আমি তো তাওবা কবুলকারী দয়ালু।' এর দ্বারা বোঝা যায়, আবু হুরাইরা (রা.)-ও হাদীসকে অবতীর্ণ ওহি হিসাবে বিশ্বাস করতেন। কেননা অবতীর্ণ ওহি গোপনের দায় থেকে বাঁচার জন্যই হাদীস বর্ণনা করেন বলে এ হাদীসে তিনি জানাচ্ছেন。
১৯৫. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৮。
১৯৬. ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ২/২৭৭; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৬৭; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৪৪৫৩; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদীস: ৬২৭০。
১৯৭. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩৮৩৬。
১৯৮. সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ১২৬১; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ১১২০; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৪৮৮৭。
১৯৯. মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৬৩৬; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬১৭২; সুনান তিরমিজি, হাদীস: ৩৮৩৭; মাকদিসি, আল আহাদীসুল মুখতারাহ, হাদীস: ৮১৪。
২০০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১০৯; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৭৯৯৬。
২০১. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬৪৫৮; তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর, হাদীস: ৬৯৯。
২০২. মুকাদ্দামাহ ইবনুস সালাহ, পৃ. ৫৬。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 উম্মাহর নিকট হাদীস সংরক্ষণের গুরুত্ব

📄 উম্মাহর নিকট হাদীস সংরক্ষণের গুরুত্ব


হাদীস সংরক্ষণ, সম্প্রচার ও মান্য করার ক্ষেত্রে সাহাবিদের গুরুত্ব ও আগ্রহ আমরা দেখলাম। পরবর্তীদের গুরুত্ব ও আগ্রহও এমনই ছিল। হাদীসের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে উম্মাতের যে বিশ্বাস তা হাদীস শিক্ষাগ্রহণ ও দানে উম্মাতকে এমন প্রেষণা দান করেছে মানব-সভ্যতার ইতিহাসে ইতিহাসের কোনো পর্ব বা অধ্যায় সংরক্ষণে মানব জাতির কোনো প্রজন্ম এর ধারেকাছের আগ্রহও অনুভব করেনি।
ইতিহাসের সর্বসাক্ষ্য হাজির করলে আমরা দেখতে পাব, মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে কুরআনের পরেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ও সর্বপ্রযত্নে সংরক্ষিত হয়েছে হাদীসে নববি। কুদরতে ইলাহি মনুষ্য প্রজাতির যে অংশ দ্বারা হাদীস সংরক্ষণের খেদমত নিয়েছে তাদেরকে এ কাজে এত নিবিষ্টতা দান করেছে এবং তাদেরকে দিয়ে এমন সব ম্যাকানিজম ব্যবহার করিয়েছে যে, হাদীস পরিপূর্ণভাবে এবং অবিকলরূপে সংরক্ষিত হতে পেরেছে। কুরআন নাযিলের সাথে সাথে লিখিত হয়েছে, কিন্তু হাদীস তা হয়নি। এজন্য হাদীস যতদিন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রন্থাবদ্ধ না হয়েছে উচ্চ মনোবল ও মেধাসম্পন্ন বিরাট একটা গোষ্ঠী এ কাজে পরিপূর্ণরূপে নিবেশিত থেকেছে। তারা হাদীস সংরক্ষণকে কুরআন সংরক্ষণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করেছে এবং নিজেদের সর্বসাধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছে। আমরা ইতিহাসের কিছু সাক্ষ্য হাজির করছি।
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলতেন:
تَذَاكَرُوْا هُذَا الْحَدِيثَ لَا يَنْفَلِتْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ لَيْسَ مِثْلَ الْقُرْآنِ مجْمُوعٌ مَحْفُوظٌ وَإِنَّكُمْ إِنْ لَّمْ تَذَاكَرُوْا هُذَا الْحَدِيثَ يَنْفَلِتْ مِنْكُمْ وَلَا يَقُوْلَنَّ أَحَدُكُمْ حَدَّثْتُ أَمْسِ فَلَا أُحَدِّثُ الْيَوْمَ بَلْ حَدَّثْ أَمْسِ وَلْتُحَدِّثِ الْيَوْمَ وَلْتُحَدِّثْ غَدًا.
তোমরা নিয়মিত হাদীস চর্চা ও আলোচনা করতে থাকবে, তাহলে তোমাদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হতে পারবে না। হাদীস তো কুরআনের মতো এখনো একত্র সংকলিত নয়। তাই তোমরা যদি নিয়মিত হাদীসের চর্চা-আলোচনা জারি না রাখো তোমাদের কাছ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তোমরা কেউ কোনোভাবেই বলবে না যে, গতকাল হাদীস আলোচনা করেছি, আজ আর করব না। বরং গতকাল, আজ এবং আগামীকাল—এভাবে প্রতিদিন হাদীস চর্চা জারি রাখবে।২০৩
ইবন আব্বাস (রা.)-এর এ বক্তব্য থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হাদীস যেহেতু কুরআনের মতো লিপিবদ্ধ ছিল না তাই তাঁরা হাদীস সংরক্ষণে আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।
তাবিয়ি ইসমাঈল ইবন উবাইদুল্লাহ (রাহ.) [১৩২ হি.] বলতেন :
يَنْبَغِي لَنَا أَنْ نَحْفَظَ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا يُحْفَظُ الْقُرْآنُ لِأَنَّ اللَّهَ يَقُوْلُ: وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوهُ.
আমাদের কর্তব্য কুরআনের মতোই গুরুত্ব দিয়ে হাদীস মুখস্থ ও সংরক্ষণ করা। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তোমরা তা গ্রহণ করো। ২০৪
তাবিয়ি ইসরাঈল ইবন ইউনুস (রাহ.) [১৬০ হি.] বলেন :
كُنْتُ أَحْفَظُ حَدِيثَ أَبِي إِسْحَاقَ كَمَا أَحْفَظُ السُّوْرَةَ مِنَ القُرْآنِ.
আমি আবু ইসহাক বর্ণিত হাদীসগুলো এমনভাবে মুখস্থ করেছি যেভাবে কুরআনের সূরা মুখস্থ করি। ২০৫
তাবিয়ি কাতাদাহ (রাহ.) সাঈদ ইবন আবী আরূবাহকে সূরা বাকরাহ মুখস্থ শোনালেন। একটি হরফেও কোনো ভুল হলো না। তারপর তিনি বললেন:
لَأَنَا لِصَحِيفَةِ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَحْفَظُ مِنِّي لِسُوْرَةِ الْبَقَرَةِ.
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) সংকলিত হাদীসের পুস্তিকা সূরা বাকারাহ থেকে আমার বেশি মুখস্থ। ২০৬
তাবিয়ি শাহর ইবন হাওশাব (রাহ.) [১১২ হি.] এর ছাত্র আব্দুল হামীদ ইবন বাহরাম সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল (রাহ.) বলেন, তার কাছে শাহর ইবন হাওশাবের পাণ্ডুলিপি ছিল :
كَانَ يَحْفَظُهَا كَأَنَّهُ يَقْرَأُ سُوْرَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ.
তিনি তার হাদীস এমনভাবে মুখস্থ করতেন যেন কুরআনের সূরা পাঠ করছেন। ২০৭
এ ধরনের প্রচুর বর্ণনা ইতিহাস ও হাদীস বিষয়ক গ্রন্থাদিতে বিদ্যমান আছে। মুসলিম উম্মাহ এভাবেই কুরআনের মতো গুরুত্ব দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সংরক্ষণ করেছে।

টিকাঃ
২০৩. সুনান দারিমি, হাদীস: ৬২৪。
২০৪. খতীব বাগদাদি, আল কিফায়াহ: ১৭; ইবন আসাকির, তারীখ দিমাশ্ক, ৮/৪৩৬; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ৩/১৪。
২০৫. যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ১০/৭৮; খতীব বাগদাদি, তারীখ বাগদাদ, ৭/৪৭৬。
২০৬. বুখারি, আত তারীখুল কাবীর, ৭/১৮৬; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৭/১৭১。
২০৭. ইবন আসাকির, তারীখ দিমাশ্ক, ২৩/২২৪; মিয্যি, তাহযীবুল কামাল, ১৬/৪১১。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণ ও প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপি

📄 হাদীস লিপিবদ্ধকরণ ও প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপি


প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর অধিকাংশই তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে সংকলিত। এবং এ সকল গ্রন্থে সংকলিত হাদীসের শুরুতে যে সকল বর্ণনাসূত্র আছে সে বর্ণনাসূত্রের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত حَدَّثَنَا (আমাদেরকে হাদীস বলেছেন), أَخْبَرَنَا، أَنْبَأَنَا (আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন), سَمِعْتُ (আমি শুনেছি) ইত্যাদি শ্রুতিবাচক শব্দে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য হাদীসশাস্ত্র না জানা অনেকে ধারণা করতে পারেন এবং হাদীস-বিরোধীরা অপপ্রচার করেন যে, সাহাবি, তাবিয়ি ও তাবি-তাবিয়ি যুগে হাদীস শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধকরণের নিয়ম ছিল না। বরং মৌখিকভাবে বর্ণনা করা ও মুখস্থ করে নেওয়াই ছিল এক্ষেত্রে একমাত্র রীতি।
কিন্তু বিষয়টি কখনোই তা নয়। হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগভীর ভাসাভাসা জ্ঞান এ বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে এবং ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের মানসেই এ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। বস্তুত হাদীস বর্ণনা ও সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সূক্ষ্মতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তারা মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন। হাদীস শিক্ষা, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সনদ বর্ণনায় সর্বদা মৌখিক বর্ণনা ও শ্রুতির পাশাপাশি লেখন ও পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করা হতো।
সাহাবিগণ সাধারণত হাদীস মুখস্থ করতেন এবং কখনো কখনো লিখেও রাখতেন। মূলত সাহাবিদের জন্য হাদীস লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। কেননা অধিকাংশ সাহাবি থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র ২০/৩০টি বা তার চেয়ে কম। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। তবে সনদের বিভিন্নতা বাদ দিয়ে শুধু মূল হাদীসের সংখ্যা হিসাব করলে তা হবে মাত্র হাজারের কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি থেকে ২০/৩০টি, ১০০টি, এমনকি হাজারটি ঘটনা বা কথা বর্ণনা করার জন্য লিখে রাখার প্রয়োজন ছিল না।
কেননা এছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোনো বড় বিষয় ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতি আলোচনা, তাঁর নির্দেশাবলি হুবহু পালন, অনুকরণ ও তাঁর কথা মানুষদের শোনানোই ছিল তাঁদের জীবনের প্রধানতম কাজ। অন্য কোনো জাগতিক ব্যস্ততা তাঁদের মন-মগজকে ব্যস্ত করতে পারত না। আর যে স্মৃতি ও কথা সর্বদা মনে জাগরূক এবং কর্মে বিদ্যমান তা তো আর পৃথক কাগজে লিখে রাখার দরকার হয় না। তা সত্ত্বেও অনেক সাহাবি তাঁদের মুখস্থ হাদীস লিখে রাখতেন। আবু হুরাইরা (রা.)-ও পরবর্তীকালে তাঁর হাদীসগুলো লিখে রেখেছিলেন। এমনকি নবীজি নিজেও তাঁর অনেক হাদীস লিখিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিগণ (রা.) কর্তৃক লিখিত হাদীসের পরিমাণ একেবারেই কিঞ্চিন্মাত্র নয়। এ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা একত্র করলে দেখা যায় তার পরিমাণ অনেক।
সাহাবিদের ছাত্র তাবিয়িদের যুগ থেকেই হাদীস শিক্ষা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল লিখন পদ্ধতি। অধিকাংশ তাবিয়ি ও পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিসগণ উস্তাদের কাছে হাদীস শুনতেন, লিখতেন ও মুখস্থ করতেন। উস্তাদগণ নিজ নিজ পাণ্ডুলিপি থেকে ছাত্রদেরকে হাদীস শোনাতেন আর ছাত্ররা শোনার সাথে সাথে তা নিজেদের পাণ্ডুলিপিতে লিখতেন এবং শিক্ষকের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন। এ বিষয়ক অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীস বিষয়ক গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ আছে। মাত্র দুয়েকটি উদাহরণ উদ্ধৃত করছি।
আবু হুরাইরা (রা.)-এর হাদীসের ছাত্র তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (৯১ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَكْتُبُ مَا أَسْمَعُ مِنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فَلَمَّا أَرَدْتُ أَنْ أُفَارِقَهُ أَتَيْتُهُ بِكِتَابِهِ فَقَرَأْتُهُ عَلَيْهِ وَقُلْتُ لَهُ: هَذَا سَمِعْتُ مِنْكَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
আমি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শুনতাম তা লিখে রাখতাম। বিদায়ের কালে সে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম, তাঁকে তা পড়ে শোনালাম এবং বললাম, এগুলোই তো আমি আপনার কাছ থেকে শুনেছি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক আছে। ২০৮
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তাবিয়ি বাশীর ইবন নাহীক (রাহ.) আবু হুরাইরা (রা.) থেকে যে সকল হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন সব তিনি লিখে রেখেছিলেন এবং সে পাণ্ডুলিপি আবু হুরাইরা (রা.)-এর কাছে পেশ করে সম্পাদনা করে নিয়েছিলেন।
তাবিয়ি সাঈদ ইবন জুবাইর (৯৫ হি.) বলেন :
كُنْتُ أَكْتُبُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ فَإِذَا امْتَلَاتِ الصَّحِيفَةُ أَخَذْتُ نَعْلِي فَكَتَبْتُ فِيْهَا حَتَّى تَمْتَلِيُّ.
আমি সাহাবি ইবন আব্বাস (রা.)-এর কাছে হাদীস লিখতাম। লিখতে লিখতে যখন পৃষ্ঠা ভরে যেত তখন আমার স্যান্ডেল নিয়ে তাতে লিখতাম। লিখতে লিখতে তাও ভরে যেত। ২০৯
তাবিয়ি আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আকীল (১৪০ হি.) বলেন:
كُنْتُ أَذْهَبُ أَنَا وَأَبُوْ جَعْفَرٍ إِلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَمَعَنَا أَلْوَاحُ صِغَارُ نَكْتُبُ فِيهَا الْحَدِيثَ.
আমি এবং আবু জা'ফর সাহাবি জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.)-এর নিকট যেতাম। আমাদের সাথে ছোট ছোট বোর্ড থাকত। তাতে আমরা হাদীস লিখতাম। ২১০
এ সময় থেকে পাণ্ডুলিপি থেকে হাদীস শিক্ষা দেওয়া এবং হাদীস শোনার সাথে সাথে তা লিখে নেওয়া হাদীস শিখন পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ব্যতিক্রম কিছু মুহাদ্দিস, যারা শুধু স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন, মুহাদ্দিসদের নিকট তারা সাধারণত দুর্বল রাবি হিসাবে পরিগণিত হতেন। পাণ্ডুলিপি থেকে শিক্ষাদানকারী শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসাবে গণ্য করা হতো। শুধু স্মৃতি থেকে মুখস্থ হাদীসের মৌখিক বর্ণনা ছাত্ররা গ্রহণ করতে চাইতেন না।
দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন রাবি আব্দুল আযীয ইবনু ইমরান ইবন আব্দুল আযীয (১৭০ হি.)। তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী ও সাহাবি আব্দুর রাহমান ইবন আওফের বংশধর। মুহাদ্দিসগণ তাকে হাদীস বর্ণনায় দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। কারণ তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ভুলভ্রান্তি ব্যাপক। আর এ ভুলভ্রান্তির কারণ হলো পাণ্ডুলিপি ব্যতিরেকে মুখস্থ বর্ণনা করা। তৃতীয় হিজরি শতকের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক উমার ইবন শাব্বাহ (২৬২ হি.) তার সম্পর্কে বলেন:
كَانَ كَثِيرَ الْغَلَطِ فِي حَدِيثِهِ لِأَنَّهُ احْتَرَقَتْ كُتُبُهُ فَكَانَ يُحَدِّثُ مِنْ حِفْظِهِ.
তিনি হাদীস বর্ণনায় প্রচুর ভুল করতেন। কারণ তার পাণ্ডুলিপি পুড়ে গিয়েছিল। আর এ কারণে তিনি স্মৃতির উপর নির্ভর করে মুখস্থ হাদীস বর্ণনা করতেন। ২১১
তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিস আলী ইবনুল মাদীনি (২৩৪ হি.) বলেন:
لَيْسَ فِي أَصْحَابِنَا أَحْفَظُ مِنْ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ إِنَّهُ لَا يُحَدِّثُ إِلَّا مِنْ كِتَابِهِ وَلَنَا فِيْهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ.
আমাদের মাঝে আহমাদ ইবন হাম্বাল ছিলেন সর্বাধিক মুখস্থশক্তির অধিকারী। তা সত্ত্বেও তিনি পাণ্ডুলিপি সামনে না রেখে হাদীস বর্ণনা করতেন না। তার মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। ২১২
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বালের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন :
قَالَ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ: قَالَ لِي عَبْدُ الرَّزَّاقِ: اكْتُبْ عَنِّي وَلَوْ حَدِيثًا وَاحِدًا مِّنْ غَيْرِ كِتَابٍ فَقُلْتُ: لَا وَلَا حَرْفًا.
ইয়াহইয়া ইবন মাঈন বলেন, ইমাম আব্দুর রাযযাক সানআনি আমাকে বলেন, তুমি অন্তত একটি হাদীস পাণ্ডুলিপি ছাড়া আমার কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করো। আমি তাকে বললাম, না, পাণ্ডুলিপির প্রমাণ ব্যতীত একটি হরফও আমি লিখতে পারব না। ২১৩
এরূপ অগণিত বিবরণ ইতিহাস ও হাদীসশাস্ত্রীয় কিতাবাদিতে বিদ্যমান। এ সকল বর্ণনার আলোকে প্রমাণিত যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ সাহাবিদের যুগ থেকেই হাদীস লিখে সংরক্ষণ করা হতো। মুহাদ্দিসগণ লিখিত পাণ্ডুলিপি দেখে হাদীস বর্ণনা করতেন, নিরীক্ষা করতেন, বিশুদ্ধতা যাচাই করতেন এবং প্রত্যেক ছাত্র তার শ্রুত হাদীস লিখে রাখতেন। ছাত্র শুনতেন উস্তাদের পাণ্ডুলিপির পাঠ। তারপর তা নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখে উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিতেন।
এ আলোচনা থেকে দুটি প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। ১. হিজরি প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই যখন হাদীস শিখনের ক্ষেত্রে লিখন পদ্ধতি চালু হয়ে যায় এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠগ্রহণ অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় তখন হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দেই কেন হাদীস বর্ণনা করেছেন? কেন তারা এখনকার দিনে গ্রন্থের রেফারেন্স দেওয়ার মতো লিখিত পাণ্ডুলিপির রেফারেন্স দেননি?
২. সে সময় থেকেই যদি সকল ছাত্র তার উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতেন তবে তো হাদীস সংকলিত হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি থাকার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি সংরক্ষিত হাদীস সংকলনের অধিকাংশ গ্রন্থ তৃতীয়, চতুর্থ বা তার পরবর্তী শতাব্দীর। তাহলে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি কোথায় গেল? উম্মাতের অবহেলায় কি সেসব হারিয়ে গেছে? তবে কি এ উম্মাতের সালাফ হাদীস সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন না?
প্রথম সংশয় নিরসন : আমরা আগেই বলেছি, মূলত মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ নবীজির হাদীসের সংরক্ষণ ও বিশুদ্ধতা রক্ষায় অতি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা মুখস্থ থেকে মৌখিক বর্ণনা ও লিখিত পাণ্ডুলিপির সমন্বয়ের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনায় ভুলভ্রান্তি অনুপ্রবেশের পথ রোধ করেছেন।
আমরা জানি, সেকালে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তখনকার পাণ্ডুলিপি মানেই হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি। প্রাচীন হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধারের বিষয়ে যার মোটামুটি ধারণা আছে তিনি জানেন, স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনা করতে গেলে যেমন মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধার করতে গেলে তারও অধিক ভুলের সম্ভাবনা থাকে। পাঠোদ্ধারকারী লেখকের হস্তলিপি বুঝতে ভুল করে এক শব্দকে ভিন্ন শব্দ ধারণা করতে পারেন। আর যদি তিনি মূল লেখকের পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপি হাতে পান, তাহলে তার নিজের পাঠোদ্ধারে ভুলের সম্ভাবনার পাশাপাশি অনুলিপিকারের ভুলের সম্ভাবনা অতিরিক্ত যুক্ত হবে। তাছাড়া অনুলিপিকার যদি মূলপাঠের অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক কোনো শব্দ লিখে রাখেন বা টীকা সংযুক্ত করেন, পাঠোদ্ধারকারী সেগুলোকেও মূলপাঠ মনে করে ভুল করতে পারেন।
ইয়াহুদি-খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেল গবেষক পণ্ডিতগণ বলছেন, বাইবেলের মূলপাঠেই অগণিত ভুল, বিকৃতি ও পাঠের ভিন্নতা বিদ্যমান। তারা বলেন, এই ভুলের অন্যতম কারণ তাদের এইসব ধর্মগ্রন্থ অনুলিপি করা হয়েছে শুধু পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করে। যিনি যা বুঝেছেন তা-ই লিখেছেন। অনুলিপিকারের ব্যাখ্যামূলক শব্দ ও টাকাও পরবর্তী অনুলিপিকারের পাণ্ডুলিপিতে মূলপাঠে ঢুকে পড়েছে।
কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ব্যবহার করেছেন অতিশয় সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কোনো মুহাদ্দিস তার উস্তাদের নিকট হাদীসের পাঠগ্রহণের সময় পাণ্ডুলিপি থেকে উস্তাদের পাঠ শুনেছেন, মুখস্থ করেছেন, নিজের পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন এবং উস্তাদের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। এবার তিনি যখন তার ছাত্রদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন স্মৃতি ও পাণ্ডুলিপি উভয় পদ্ধতিকে যুগপৎভাবে ব্যবহার করেছেন। স্মৃতি থেকে মুখস্থ বর্ণনার ভুলের সম্ভাবনা পাণ্ডুলিপি রোধ করেছে আর পাণ্ডুলিপি পাঠের ভুলের সম্ভাবনা স্মৃতি রোধ করেছেন।
হাদীসের পাণ্ডুলিপি তো বাজারে পাওয়া যায়। আপনি সে পাণ্ডুলিপি বাজার থেকে সংগ্রহ করে হাদীস শিখে বর্ণনা করছেন নাকি উস্তাদের কাছ থেকে এর বিশুদ্ধ পাঠও শিখে নিয়েছেন-এটা হচ্ছে বড় ব্যাপার। এই বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য সকলেই শ্রুতিবাচক (حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا : আমাদেরকে বলেছেন) শব্দে হাদীস বর্ণনা করতেন। অর্থাৎ মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় শ্রুতিবাচক শব্দ 'حَدَّثَنَا أَنْبَأَنَا أَخْبَرَنَا বা অমুক আমাদেরকে বলেছেন' কথার অর্থ হচ্ছে, তার কিতাবটি তার নিজের কাছে বা তার অমুক ছাত্রের কাছে, যিনি তার কাছে পঠিত শুনছেন, আমি তার কাছে পড়ে নিজ কানে শুনে শুনে তা থেকে হাদীসটি উদ্ধৃত করছি। কেউ কেউ 'আমি তাকে পড়তে শুনেছি' বা 'আমি পড়েছি' এরূপ শব্দে বললেও সাধারণত 'তিনি আমাদেরকে বলেছেন' বলেই এক বাক্যে তারা যুগপৎভাবে উভয় বিষয় বোঝাতেন।
ইমাম মালিক (রাহ.) সংকলিত 'মুআত্তা' কিতাবটি এখন ছাপা হয়ে যেমন আমাদের কাছে রয়েছে, তেমনি এর পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রাহ.)-এর যুগেও ছিল। তাঁরা ইমাম মালিকের ছাত্রদের কাছে এ কিতাবের পাঠ গ্রহণ করেছেন। এ কিতাবের হাদীস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে তাঁরা সংকলনও করেছেন। কিন্তু এ কিতাবের হাদীস উদ্ধৃত করতে গিয়েও তাঁরা শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁদের এই শ্রুতিবাচক শব্দ ব্যবহারের কারণে কি মুআত্তা মালিকের বিদ্যমানতা অস্বীকার করা যায়?
এমন আরো অনেক মুহাদ্দিসের লিখিত পাণ্ডুলিপি ইমাম বুখারি ও মুসলিমের কাছে ছিল। তারা ওই কিতাবগুলো লেখকের ছাত্র বা ছাত্রের ছাত্রদের কাছ থেকে শুনেছেন এবং সেখান থেকে নির্বাচন করে অনেক হাদীস তাদের সহীহ কিতাবে শ্রুতিবাচক )حَدَّثَنَا : আমাদেরকে বলেছেন ইত্যাদি) শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন। ২১৪
দ্বিতীয় সংশয় নিরসন: বাস্তবতা এটাই, হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকেও হাদীসের শত শত সংকলন বিদ্যমান ছিল। এবং মুসলিম উম্মাহর সালাফগণ ছিলেন হাদীস সংরক্ষণে খুবই যত্নবান। সে যুগে হাদীসের প্রায় সকল ছাত্রই পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। তবে তাদের পাণ্ডুলিপিতে হাদীস বিশেষ কোনো ধারাক্রমে সাধারণত বিন্যস্ত হতো না। বরং হাদীস শেখার ধারাক্রমেই তারা পাণ্ডুলিপিতে লিখে রাখতেন। যেটি আগে শিখেছেন সেটি আগে আর যেটি তারপরে শিখেছেন সেটি পরে লিখতেন।
তাছাড়া একজন ছাত্র শুধু একজন উস্তাদের কাছে হাদীস শিখতেন না। বরং সাধ্যানুযায়ী অনেক উস্তাদের কাছ থেকে শিখতেন। এক উস্তাদের কাছে শেখা শেষ হলে অন্য উস্তাদের কাছে যেতেন। এভাবে তার হাদীস সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এবং ক্রমেই সনদে রাবির সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। এভাবে ছাত্রের পাণ্ডুলিপির কলেবর উস্তাদের পাণ্ডুলিপির কলেবর থেকে বৃদ্ধি পেত। এভাবে একাধিক উস্তাদের পাণ্ডুলিপি একজন ছাত্রের পাণ্ডুলিপির ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে।
এভাবে দিনে দিনে হাদীসের পাণ্ডুলিপির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। উস্তাদের থেকে ছাত্রের পাণ্ডুলিপি বৃহৎ থেকে বৃহৎ হয়েছে। এবং তার পরে ছাত্ররা তাদের বিভিন্ন উস্তাদের কাছ থেকে শেখা হাদীসগুলো তাদের পাণ্ডুলিপিতে বিশেষ বিন্যাসে গ্রন্থনা করেছেন। বিভিন্ন উস্তাদের পাণ্ডুলিপি স্বতন্ত্রভাবে রাখেননি। ছাত্রদের এই বৃহৎ ও বিন্যস্ত পাণ্ডুলিপির মধ্যে শিক্ষকদের পাণ্ডুলিপি একাকার হয়ে গেছে। পুরোটাই একীভূত হয়েছে বটে; তবে স্বতন্ত্র চেহারায় নয়। তাই বলা যায়, পূর্বের পাণ্ডুলিপি ও পুস্তিকাগুলো ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখন আমাদের হাতে থাকা বৃহদাকার ও বিন্যস্ত পুস্তকগুলোর মাঝে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন করে একাকার হয়ে আছে। আর উস্তাদদের হাতে তৈরি পাণ্ডুলিপির প্রয়োজন না থাকায় তা দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে। ২১৫
তবে দ্বিতীয় শতকের হাদীসের অনেক পাণ্ডুলিপি এখনো বিদ্যমান আছে। অনেকগুলো তো মুদ্রিত হয়েছে এবং অনেক প্রসিদ্ধিও পেয়েছে। ইমাম আবু হানীফার (১৫০ হি.) 'কিতাবুল আসার', ইমাম মালিকের (১৭৯ হি.) 'মুআত্তা', ইমাম মা'মার ইবন রাশিদের (১৫৩ হি.) 'জামি', আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের (১৮১ হি.) মুসনাদ ও যুহদ, ইবন ওয়াহাব (১৯৭ হি.), ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ (১৯৭ হি.) ও মুআফা বিন ইমরানের (১৮৫ হি.) যুহুদ, ইমাম আব্দুর রাযযাকের (২১১ হি.) 'মুসান্নাফ' তার অন্যতম।
তাছাড়া প্রথম শতকের কোনো কোনো পাণ্ডুলিপি অধুনা আবিষ্কৃত হয়েছে। পরবর্তী যুগের কিতাবাদির সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে, কীভাবে প্রাচীন সে সকল পাণ্ডুলিপি এ সকল গ্রন্থের মাঝে একীভূত হয়ে আছে। যেমন: সহীফাতু হাম্মام ইবন মুনাব্বিহ, নুসখাতু সুহাইল ইবন আবি সালিহ, আহাদিসি ইয়াযীদ ইবন আবি হাবীব ইত্যাদি।

টিকাঃ
২০৮. সুনান দারিমি, হাদীস: ৫১১。
২০৯. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭১。
২১০. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ. ৩৭০。
২১১. আসকালানি, তাহযীবুত তাহযীব, ৬/৩৫১; সাখাবি, আত তুহফাতুল লাতীফাহ, ২/১৮৫。
২১২. আবু নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/১৬৫。
২১৩. মুসনাদ আহমাদ, ২২/৭৬; যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ৫/৩৭৪。
২১৪. বিস্তারিত দেখুন: আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি: পৃ. ৩৬৯。
২১৫. ইবন খাল্লাদ, আল মুহাদ্দিসুল ফাসিল; আজ্জাজ খাতীব, আস সুন্নাতু কাবলাত তাদবীন; আহমাদ সানুবার, মিনান নাবিয়্যি ইলাল বুখারি; আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি; মুস্তফা আযমি, হাদিস সংকলনের ইহিতাস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00