📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস সংরক্ষণে নবীজির নির্দেশনা

📄 হাদীস সংরক্ষণে নবীজির নির্দেশনা


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত মূর্ত ইসলাম। মানব জাতি ইসলাম প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এই জীবন্ত ইসলামের অনুসরণ-অনুকরণে আদিষ্ট। কেবল সাহাবায়ে কিরাম নয়, পরবর্তী সকল যুগের সকল মানুষও এই বিধানের আওতাভুক্ত। সাহাবিগণ তো সরাসরি তাঁকে দেখে তাঁর অনুসরণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী মানব সমাজও যেন তাঁর জীবনাদর্শ তথা হাদীস-সুন্নাহ জানতে ও মানতে পারে এজন্য তিনি সাহাবিদেরকে তাঁর সুন্নাহ সংরক্ষণ ও পরবর্তীদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিভিন্নভাবে নির্দেশ, নির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করেছেন।

প্রথমত, কর্মের মাধ্যমে সংরক্ষণ। কোনো বিষয় প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিনিয়ত প্রতিপালন করলে তা ভুলে যাওয়ার বা তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না; বরং অবিকল সংরক্ষিত হয়ে থাকে। সাহাবিগণ (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাচার অনুপুঙ্খ প্রতিপালনে আদিষ্ট ছিলেন-একে তো শরয়ি নির্দেশনা, দ্বিতীয়ত ভালোবাসার দাবি। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ . قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ.
“(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। (আরো) বলে দিন, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করো। আর যদি বিমুখ হও, তবে (জেনে রাখো) আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে ভালোবাসেন না।”১২৬
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
مَنِ اسْتَنَّ بِي فَهُوَ مِنِّي وَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
যে ব্যক্তি আমার জীবনাচার প্রতিপালন করে সে আমার উম্মাত, আর যে আমার জীবনাচার থেকে বিমুখ থাকল তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ১২৭
তিনি আরো বলেছেন:
مَنْ أَحْيَا سُنَّتِي فَقَدْ أَحَبَّنِي وَمَنْ أَحَبَّنِي كَانَ مَعِي فِي الْجَنَّةِ.
যে ব্যক্তিজীবনে প্রতিপালনের মাধ্যমে আমার জীবনাচারকে জীবিত রাখল সে আমাকে ভালোবাসল, আর যে আমাকে ভালোবাসল সে আমার সাথে জান্নাতেথাকবে। ১২৮
দ্বিতীয়ত, মুখস্থকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ। সাহাবিদের নিকট নবীজির ব্যক্তিত্ব সাধারণ কোনো ব্যক্তিত্ব ছিল না। তাঁর প্রতি তাঁদের ভালোবাসা যেমন অতুলনীয় ছিল, তেমনিভাবে তাঁরা সমস্ত অন্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন যে, এই মহান ব্যক্তির অনুসরণ ও অনুকরণের মধ্যেই রয়েছে তাঁদের জীবনের একমাত্র সফলতা। তাই তাঁরা তাঁর সকল কর্ম যেমন গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করতেন, তেমনি তাঁর কথা গভীর মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন। এবং তা আত্মস্থ ও মুখস্থকরণে সবিশেষ প্রচেষ্টা নিবিষ্ট রাখতেন। উপরন্তু তাঁরা এ বিষয়ে আদিষ্ট ছিলেন।
নবীজির মজলিসে কখনো কখনো ইয়াহুদিরাও বসতো। তারা নবীজিকে লক্ষ করে বলত, 'রায়িনা'। এ শব্দের সাধারণ অর্থ 'আমাদের প্রতি লক্ষ করুন'। শব্দটির আরেকটি অর্থ 'আমাদের রাখাল' বা 'নির্বোধ ব্যক্তি'। বাহ্যিকভাবে তারা প্রথম অর্থ বোঝালেও, তাদের উদ্দিষ্ট ছিল দ্বিতীয় অর্থ। এভাবে তারা নবীজিকে নিয়ে উপহাস করত। সাহাবিদের কেউ কেউ সরলভাবে প্রথম অর্থে শব্দটি নবীজির উদ্দেশে প্রয়োগ করতেন। মহান আল্লাহ সাহাবিদের এই শব্দ ব্যবহার সংশোধন করে দিয়ে ‘রায়িনা’র পরিবর্তে ওই অর্থে ‘উনযুরনা’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেন এবং আরো নির্দেশ দেন, ‘وَاسْمَعُوا' এবং তোমরা শ্রবণ করো।
এখানে যদিও ‘শ্রবণ করো’ ক্রিয়ার কর্ম উল্লেখ নেই, তবুও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সুস্পষ্টই বোঝা যায়, এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা নবীর কথা শ্রবণ করো-এমনভাবে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো যেন পুনরায় জিজ্ঞাসা করা না লাগে।১২৯
অর্থাৎ আল কুরআনেই মহান আল্লাহ সাহাবিদেরকে বিশেষ মনোনিবেশ সহকারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনতে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যেন বোঝার জন্য দ্বিতীয়বার আর প্রশ্ন করা না লাগে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
نَضَّرَ اللهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ كَمَا سَمِعَهُ].
আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে প্রফুল্ল রাখুন, যে আমার কোনো হাদীস শুনল এবং মুখস্থ করল, অতঃপর যেমনটি শুনেছে হুবহু অপরের কাছে পৌঁছে দিল।১৩০
তৃতীয়ত, লেখার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা। লিখে রাখা কোনো কিছু সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখার মাধ্যমেও তাঁর হাদীস সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা.) বলেন, নবীজি তাঁর ঠোঁট দুটির দিকে ইশারা করে বলেন :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِمَّا بَيْنَهُمَا إِلَّا حَقٌّ فَاكْتُبْ.
যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম, আমার মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া কিছুই বের হয় না। সুতরাং তা লিখে রাখবে।১৩১
আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আনসারি এক ব্যক্তি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে বসে হাদীস শুনত। তা তার খুব ভালো লাগত। কিন্তু সে মনে রাখতে পারত না। একদিন সে নবীজিকে নিজের অবস্থা জানাল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের হাত দিয়ে লেখার ইঙ্গিত করে বললেন :
اسْتَعِنْ بِيَمِينِكَ عَلَى حِفْظِكَ.
তুমি সংরক্ষণের জন্য তোমার ডান হাতের সাহায্য নেবে। অর্থাৎ লিখে রাখবে। ১৩২
এ ধরনের আরো অনেক বর্ণনা হাদীসের কিতাবে বিদ্যমান। তাছাড়া বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু লিখে রাখার বা লিখে দেওয়ার বিশেষ নির্দেশও নবীজি দিতেন। যেমন ইয়ামানি এক ব্যক্তির জন্য মক্কা বিজয়ের সময় প্রদত্ত ভাষণ লিখে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে তিনি বলেন:
اكْتُبُوا لِأَبِي شَاءٍ.
(এ ভাষণটি) আবু শাহের জন্য লিখে দাও। ১৩৩
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, মৃত্যুশয্যায় যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগযন্ত্রণা তীব্র হয় তখন তিনি বলেন :
ائْتُونِي بِكِتَابٍ أَكْتُبْ لَكُمْ كِتَابًا لَّا تَضِلُّوا بَعْدَهُ.
আমার কাছে তোমরা লেখার কিছু নিয়ে এসো। তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখিয়ে দেব পরবর্তীকালে তোমরা পথহারা হবে না। ১৩৪
চতুর্থত, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা। কোনো বিষয় মানুষের নিত্যদিনের পারস্পরিক আলোচনায় পরিণত হলে তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এমনিভাবে কোনো বিষয় একক বা কতিপয় ব্যক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত হওয়ার চেয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের মাধ্যমে সংরক্ষিত হওয়ার শক্তি অনেক বেশি। এ বিষয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশনা ও উৎসাহ দিয়েছেন, যারা তাঁর কাছ থেকে কোনো কথা শুনবে তারা যেন যারা শোনেনি তাদের কাছে পৌঁছে দেয়। এভাবে সমাজের সকলের কাছে এটা পোঁছে যাবে এবং নিয়মিত তার আলোচনা হতে থাকবে। তিনি বলেছেন:
نَضَّرَ اللهُ عَبْدًا سَمِعَ مَقَالَتِيْ فَوَعَاهَا ثُمَّ أَذَاهَا إِلَى مَنْ لَّمْ يَسْمَعْهَا.
আল্লাহ ওই বান্দাকে প্রফুল্ল রাখুন, যে আমার বক্তব্য শুনল এবং স্মরণ রাখল। অতঃপর যে শোনেনি তার কাছে পৌঁছে দিল। ১৩৫
বিভিন্ন প্রসঙ্গে উপস্থিত সাহাবিদের মাঝে বক্তব্য দিয়ে তিনি তাঁদের নির্দেশ দিতেন অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দিতে, বলতেন:
أَلَا لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ.
শোনো, উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবে। ১৩৬
এর কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন:
فَإِنَّ الشَّاهِدَ عَسَى أَنْ يُبَلِّغَ مَنْ هُوَ أَوْعَى لَهُ مِنْهُ.
হয়তো উপস্থিত শ্রোতার চেয়ে যার কাছে সে পৌঁছে দেবে সে হবে অধিক স্মরণশক্তির অধিকারী সচেতন সংরক্ষণকারী। ১৩৭
এভাবে বারবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন উপায় ও পদ্ধতিতে হাদীস সংরক্ষণের নির্দেশ ও নির্দেশনা সাহাবিদেরকে দিয়েছেন। এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের কিতাবে বিদ্যমান। এ পুস্তকের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। তবে বাস্তবতা বোঝার জন্য আশা করি এতটুকু আলোচনাই যথেষ্ট হবে।

টিকাঃ
১২৬. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ৩১-৩২।।
১২৭. জামি' মা'মার ইবন রাশিদ, হাদীস: ২০৫৬৮ (মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, ১১/২৯১)। ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.) বলেন, হাদীসটির সনদ মুরসালরূপে সহীহ। এছাড়া বিভিন্ন সনদের আলোকে হাদীসটি মুত্তাসিল হিসাবেও গ্রহণযোগ্য। দেখুন: এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৫৯。
১২৮. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৭৮; তাবারানি, মু'জামুস সগীর, হাদীস: ৮৫৬。
১২৯. সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ১০৪; ইদরীস কান্ধলভি, মাআরিফুল কুরআন, ১/৩৫৩-৩৫৪。
১৩০. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৫৬; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৩৬৬০; সুনান দারিমি, হাদীস : ২৩৬; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৫২৯৬。
১৩১. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩৫৭; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৪৬; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৬৫১০。
১৩২. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৬; মুসনাদ বাযযার, হাদীস: ৮৯৮৯। হাদীসটির সনদ দুর্বল। তবে এর সমর্থক সহীহ বর্ণনা রয়েছে। দেখুন: ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ৮/২৫; সাখাবি, আল মাকাসিদুল হাসানাহ, পৃ. ১০৮-১১০; আলবানি, সিলসিলাহ যয়ীফাহ, ৬/২৮১-২৮২。
১৩৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ২৪৩৪, ৬৮৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩৫৫。
১৩৪. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস ১৯৩৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৬৩৭。
১৩৫. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৬৭৩৮; মুসনাদ দারিমি, হাদীস: ২৩৪; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৭৪১৩; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ২৯৪। ইমাম হাকিম, আলবানি, শুআইব আরনাউত প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন。
১৩৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৪৪০৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৭৯; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১২৭৮; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৭৮০৩; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৫৮১১。
১৩৭. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৭৯。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 পরবর্তীদের নিকট হাদীস পৌঁছানোর নির্দেশ

📄 পরবর্তীদের নিকট হাদীস পৌঁছানোর নির্দেশ


উপরের আলোচনায় আমরা দেখেছি, নবীজি হাদীস সংরক্ষণের জন্য বিভিন্নভাবে বারবার তাকিদ দিয়েছেন। এ বিষয়ে উদ্ধৃত একাধিক হাদীসে পরবর্তীদের নিকট হাদীস পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে। এ মর্মে আরো অনেক হাদীস বিদ্যমান। একটি হাদীসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنِّي لَأُحَدِّثُكُمُ الْحَدِيثَ فَلْيُحَدِّثِ الْحَاضِرُ مِنْكُمُ الْغَائِبَ.
আমি তোমাদেরকে হাদীস শিক্ষা দিচ্ছি। এভাবে তোমরা উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট হাদীস বর্ণনা করবে। ১৩৮
অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন:
بَلِّغُوْا عَنِّي وَلَوْ آيَةً.
আমার পক্ষ থেকে যা জানো পৌঁছে দাও, এমনকি যদি শুধু একটি বাণীও হয়। ১৩৯
হাদীস কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে যাবে সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে তিনি সাহাবিদেরকে বলেন:
تَسْمَعُوْنَ وَيُسْمَعُ مِنْكُمْ وَيُسْمَعُ مِمَّنْ يَسْمَعُ مِنْكُمْ.
তোমরা শুনবে এবং তোমাদের কাছ থেকেও শোনা হবে। এরপর তাদের কাছ থেকে শোনা হবে। ১৪০
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বারবার বিভিন্নভাবে এই নির্দেশ দেওয়া থেকে আমরা বুঝতে পারছি, হাদীস সংরক্ষণ করা, প্রজন্ম পরম্পরায় উম্মাতের নিকট পৌঁছে দেওয়া এবং সর্বযুগের সকল উম্মাতের জন্য হাদীস মান্য করা তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

টিকাঃ
১৩৮. বুখারি, খলকু আফআলিল ইবাদ, পৃ. ৯১; মাকদিসি, আল আহাদীসুল মুখতারাহ, হাদীস: ৪০৬। হাইসামি বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। দেখুন: মাজমাউয যাওয়ায়িদ ১/১৩৯。
১৩৯. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৬৪৮৬; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৩৪৬১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২৬৬৯; সুনান দারিমি, হাদীস: ৫৫৯。
১৪০. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৯৪৬; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৫৯; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৬২; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩২৭。

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সম্প্রচারে সাহাবিগণ

📄 হাদীস সংরক্ষণ ও সম্প্রচারে সাহাবিগণ


এ কথা বলা বাহুল্য যে, সাহাবিগণ তাঁদের সর্বসাধ্য দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন, নবীজির অনুসরণ-অনুকরণেই রয়েছে তাঁদের দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি ও সফলতা। তাঁরা এ কথাও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, তাঁদের স্কন্ধে এক গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে-তাঁরা হবেন পরবর্তীদের নিকট ইসলাম পৌঁছানোর মাধ্যম এবং তাদের ইসলাম প্রতিপালনের আদর্শ। তাঁদেরকে মহান আল্লাহ বিশেষভাবে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন মানব সভ্যতার সর্বাধিক দায়িত্বশীল প্রজন্ম।
আমরা ইসলাম পালন করি দুনিয়ার ফাঁকে ফাঁকে। আর তাঁরা শুধুই ইসলাম পালন করতেন। তাঁরা তাঁদের দুনিয়াকেও আখিরাত বানিয়ে নিয়েছিলেন। নবীর সুন্নাহ বা আদর্শ প্রতিপালন ছাড়া তাঁদের জীবনে আর কোনো কাজ ছিল না। তিনি কখন কী বলেন, কখন কী করেন তা শোনা ও দেখার জন্য আবাসে-প্রবাসে সর্বদা তাঁর চারপাশে তাঁরা ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। এমনকি তাঁর অন্দরমহলের কাজও স্ত্রীদের দ্বারা রেকর্ড হতো। তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন, নবীর কোনো কথা-কাজ যেন জানার বাইরে না থাকে। এজন্য যারা সর্বদা তাঁর পাশে থাকতে পারতেন না তাঁরা কেউ কেউ অন্যের সাথে পালা করে নিতেন। এক সময় নিজে থাকতেন আর এক সময় তাকে রাখতেন। অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তির কাছ থেকে এ সময়ের কথাকর্ম জেনে নিতেন। উমার (রা.) যেমনটি তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন :
كُنْتُ أَنَا وَجَارٌ لِي مِنَ الأَنْصَارِ فِي بَنِي أُمَيَّةَ بْنِ زَيْدٍ وَهِيَ مِنْ عَوَالِي الْمَدِينَةِ وَكُنَّا نَتَنَاوَبُ النُّزُوْلَ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْزِلُ يَوْمًا وَأُنْزِلُ يَوْمًا فَإِذَا نَزَلْتُ جِئْتُهُ بِخَبَرِ ذَلِكَ الْيَوْمِ مِنَ الْوَحْيِ وَغَيْرِهِ وَإِذَا نَزَلَ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ.
আমি ও আমার এক আনসারি প্রতিবেশী মদীনার উপকণ্ঠে বনি উমাইয়া ইবন যাইদে বাস করতাম। আমরা দুজন পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হতাম। একদিন তার পালা আর একদিন আমার পালা। যেদিন আমার পালা হতো সেদিনের ওহি ও অন্যান্য বিষয়ের খবর নিয়ে আমি তার কাছে পৌঁছে দিতাম। আর তার পালার দিন তিনিও এমনই করতেন। ১৪১
তাঁরা যখন নবীর কোনো নির্দেশনা শুনতেন, অথবা কোনো কাজ দেখতেন, আর জানতেন যে, এ কর্মটি নবীর জন্য খাস নয়, তা নির্দ্বিধায় পালন করে যেতেন। তার যৌক্তিকতা, উপকারিতা বা প্রয়োজনীয়তার বিবেচনা তাদেরকে দ্বিধান্বিত করত না। যেমন উমার (রা.) বলেছেন :
شَيْءٍ صَنَعَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَا نُحِبُّ أَنْ نَتْرُكَهُ.
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন এমন একটি কর্মও আমরা পরিত্যাগকরতেচাইনা। ১৪২
তাবিয়ি মুজাহিদ (রাহ.) বলেন:
كُنَّا مَعَ ابْنِ عُمَرَ فِي سَفَرٍ فَمَرَّ بِمَكَانٍ فَحَادَ عَنْهُ فَسُئِلَ لِمَ فَعَلْتَ؟ فَقَالَ : رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَ هُذَا فَفَعَلْتُ.
আমরা এক সফরে আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা.)-এর সাথে ছিলাম। এক স্থান অতিক্রমের সময় তিনি একটু ঘুরে গেলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন করতে দেখেছি, তাই আমিও করলাম। ১৪৩
নবীর কথা শোনা ও মান্য করা তাঁদের কাছে নিজের জীবন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নবীজি যখন কথা বলতেন তাঁরা পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে কান পেতে পিনপতন নীরবতার সাথে শুনতেন। যেমন উসামা ইবন শারীক (রা.) বলেছেন :
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابُهُ عِنْدَهُ كَأَنَّمَا عَلَى رُءُوسِهِمْ الطَّيْرُ.
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলাম। তখন তাঁর চারপাশে সাহাবিগণ এমন স্থির হয়ে বসে ছিলেন, যেন তাঁদের মাথার উপর পাখিবসেআছে। ১৪৪
প্রত্যেক সাহাবি তাঁর জানা ইলম মুখস্থ ও বিশুদ্ধ রাখার মেহনত করতেন, তার উপর আমল করতেন এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিতেন। মুআবিয়াহ (রা.) বলেন:
كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فَدَخَلَ الْمَسْجِدَ فَإِذَا هُوَ بِقَوْمٍ فِي الْمَسْجِدِ قُعُوْدٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يُقْعِدُكُمْ؟ قَالُوا : صَلَّيْنَا الصَّلَاةَ الْمَكْتُوبَةَ ثُمَّ قَعَدْنَا نَتَذَاكَرُ كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
একদিন আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন। তখন কিছু মানুষ মসজিদে বসে ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কী কাজে বসে আছো? তাঁরা বললেন, আমরা ফরয সালাত আদায় করে বসেছি-আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাত নিয়ে আলোচনা করছি। ১৪৫
বারা' ইবন আযিব (রা.) বলেন:
لَيْسَ كُلُّنَا سَمِعَ حَدِيثَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ لَنَا ضَيْعَةً وَأَشْغَالُ وَلَكِنَّ النَّاسَ كَانُوا لَا يَكْذِبُوْنَ يَوْمَئِذٍ فَيُحَدِّثُ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ.
আমাদের সকলে সকল হাদীস সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শোনার সুযোগ পেত না। আমাদের খেত-খামারের ব্যস্ততা ছিল। তবে তখন মানুষ মিথ্যা বলত না। উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে হাদীস শুনিয়ে দিত। ১৪৬
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন:
مَا كُلُّ الْحَدِيثِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُحَدِّثُنَا أَصْحَابُنَا عَنْهُ كَانَتْ تَشْغَلُنَا عَنْهُ رَعِيَّةُ الْإِبِلِ.
সকল হাদীস আমরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শোনার সুযোগ পাইনি। আমাদের সাথিগণ আমাদেরকে তাঁর থেকে হাদীস শোনাত। উষ্ট্রপালনের ব্যস্ততায় সর্বদা আমরা তাঁর কাছে থাকতে পারতামনা। ১৪৭
আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন:
مَا كُلُّ مَا تُحَدِّثُكُمْ بِهِ سَمِعْنَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَكِنْ كَانَ يُحَدِّثُ بَعْضُنَا بَعْضًا وَلَا يَتَّهِمُ بَعْضُنَا بَعْضًا.
আমরা যে সকল হাদীস বর্ণনা করি সব হাদীসই আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি শুনিনি। বরং আমরা নবীজির কাছ থেকে শোনা হাদীস একে অপরকে বর্ণনা করতাম। আর আমরা একে অপরকে সন্দেহ করতাম না। ১৪৮
আর তাঁদের কেউ যদি জানতেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি কথা অন্য কেউ জানেন, যা তিনি জানেন না, তবে তা জানার জন্য তিনি তাঁর দরবারে রওনা হতেন। এর জন্য প্রয়োজনে শত শত মাইল সফরও করতেন। যেমন জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি জানতে পারলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবন উনাইস (রা.) নবীজি থেকে একটি হাদীস শুনেছেন, যা তিনি শোনেননি। তখন তিনি একটি উট ক্রয় করে হাদীসটি শোনার জন্য শামে রওনা হলেন। এক মাসের পথ সফর করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন :
حَدِيْثُ بَلَغَنِي عَنْكَ أَنَّكَ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (لَمْ أَسْمَعْهُ) فَخَشِيْتُ أَنْ أَمُوْتَ قَبْلَ أَنْ أَسْمَعَهُ.
আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস শুনেছেন, যা আমি শুনিনি। সেটি শোনার আগে হয়তো মারা যাব সেই আশঙ্কায় আপনার কাছে এসেছি। ১৪৯
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর আমি এক আনসারি ব্যক্তিকে বললাম, নবীজির সাহাবিগণ অনেকেই বেঁচে আছেন। চলো আমরা তাঁদের কাছে জিজ্ঞাসা করে হাদীস জানতে থাকি। সে ব্যক্তি আমাকে বললেন, এত এত সাহাবি বর্তমান থাকতে কে তোমার কাছে শিখতে আসবে? এ কথায় আমি তাকে পরিত্যাগ করে একা একা সাহাবিদের কাছে গিয়ে হাদীস শেখা শুরু করলাম। যখনই কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারতাম যে, তিনি একটি হাদীস জানেন আমি তার বাড়িতে উপস্থিত হতাম। তিনি যদি বিশ্রামে থাকতেন আমি চাদরকে বালিশ বানিয়ে তার দরজায় শুয়ে থাকতাম। বাতাসে আমার শরীর ধূলিময় হয়ে যেত। তিনি বের হয়ে আমাকে দেখে বলতেন, হে আল্লাহর রাসূলের চাচতো ভাই, এ কী অবস্থা! আপনি খবর পাঠাতেন, আমিই আপনার কাছে গিয়ে হাজির হতাম। আমি বলতাম :
لَا ، أَنَا أَحَقُّ أَنْ آتِيَكَ فَأَسْأَلُهُ عَنِ الْحَدِيثِ فَعَاشَ ذُلِكَ الرَّجُلُ الْأَنْصَارِيُّ حَتَّى رَآنِي وَقَدِ اجْتَمَعَ النَّاسُ حَوْلِي يَسْأَلُوْنَنِي فَقَالَ : كَانَ هَذَا الْفَتَى أَعْقَلَ مِنِّي.
তা হবে কেন? আসার প্রয়োজনটা তো আমারই ছিল। তারপর তাকে হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম।
অবশেষে ওই আনসারি লোকটি যখন দেখল, লোকজন আমার চারপাশে একত্র হয়ে জিজ্ঞাসা করছে, সে বলল, এই যুবকটি আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিল। ১৫০
এমনকি সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শোনা হাদীস আলোচনা করার জন্যও তাঁরা দূর-দূরান্ত সফর করতেন। একটি হাদীস হয়তো নবীজি দুজন সাহাবির উপস্থিতিতে বলেছেন। তাঁদের একজন নবীজির ইন্তিকালের পর দূর দেশে কোথাও চলে গেছেন। তখন এই হাদীসটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার জন্যও বহু পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা পরস্পরে মিলিত হতেন।
মাসলামা ইবন মুখাল্লাদ (রা.) তখন মিসরের আমীর। উকবাহ ইবন আমির (রা.) তাঁর সাথে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। এতে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে অভ্যর্থনা জানান। তখন উকবাহ (রা.) বলেন:
إِنِّي لَمْ آتِكَ زَائِرًا وَلَكِنْ جِئْتُكَ بِحَاجَةٍ وَلَكِنْ حَدِيثُ سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُنْتَ مَعِي يَوْمَئِذٍ ) أَتَذْكُرُ يَوْمَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ عَلِمَ مِنْ أَخِيهِ سَيِّئَةً فَسَتَرَهَا سَتَرَ اللهُ عَلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: لِهَذَا جِئْتُ.
আমি নিছক আপনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসিনি। বরং একটি বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। একটি হাদীস আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি। সেদিন আপনিও আমার সাথে উপস্থিত ছিলেন। আপনার কি মনে পড়ে, সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, যে ব্যক্তি অন্য ভাইয়ের কোনো ত্রুটি অবগত হলো, অতঃপর তা গোপন রাখল, কিয়ামতের দিন আল্লাহও তার ত্রুটি গোপন রাখবেন। মাসলামা (রা.) বলেন, হ্যাঁ, আমার স্মরণ আছে। উকবাহ (রা.) বলেন, আমি শুধু এজন্যই এসেছি।১৫১
আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদাহ বলেন, নবীজির একজন সাহাবি দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মিসরে ফাযালাহ ইবন উবাইদ (রা.)-এর নিকট এসে বলেন :
أَمَا إِنِّي لَمْ آتِكَ زَائِرًا وَلَكِنْ سَمِعْتُ أَنَا وَأَنْتَ حَدِيثًا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجَوْتُ أَنْ يَكُوْنَ عِنْدَكَ مِنْهُ عِلْمٌ.
আপনার সাথে শুধু সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমি আসিনি। একটি হাদীস আমি আপনার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছিলাম। সেটি হয়তো আপনার স্মরণে আছে? তখন ফাযালা (রা.) তাঁকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।১৫২
অন্য বর্ণনায় আতা’ ইবন আবী রাবাহ (রাহ.) বলেন, আবু আইউব (রা.) উকবাহ ইবন আমির (রা.)-এর উদ্দেশ্যে মিসরে রওয়ানা হন তাঁর কাছে একটি হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন করার জন্য, যে হাদীসটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শুনেছেন এমন ব্যক্তি তখন শুধু তাঁরা দুজনই জীবিত ছিলেন। মিসরে পৌঁছে তিনি প্রথম সেখানকার আমীর মাসলামা ইবন মুখাল্লাদ আনসারীর বাসায় ওঠেন। তারপর তিনি তাঁর সাহায্য নিয়ে উকবাহ (রা.)-এর নিকট পৌঁছন। উকবাহ (রা.) খবর পেয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে মুআনাকা করেন এবং জানতে চান, কী প্রয়োজনে এসেছেন? তখন আবু আইউব (রা.) বলেন :
মু’মিনের দোষ গোপন রাখা সম্পর্কে একটি হাদীস শুনতে আমি এসেছি। যে হাদীসটি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি। তাঁর কাছ থেকে সরাসরি হাদীসটি শুনেছে এমন ব্যক্তি আমি আর আপনি ছাড়া কেউ বেঁচে নেই।
তখন উকবাহ (রা.) তাঁকে হাদীসটি শোনান। আবু আইউব (রা.) বলেন, আপনি যথার্থ বলেছেন। তারপর তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে বাহনে আরোহণ করে মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে যান।১৫৩
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, সাহাবীগণ গভীর মনোযোগ সহকারে নবীর সকল কর্ম দেখতেন এবং প্রত্যেকটি কথা শুনতেন। তারপর তা অন্যের কাছে পৌঁছে দিতেন। আর কেউ যদি কোনো কথা শোনার বা কোনো কর্ম দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হতেন তবে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যিনি জানেন তার কাছ থেকে জেনে নিতেন। কারণ নবীর প্রত্যেকটি কথা ও কর্ম প্রতিপালন করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। এভাবে নবীর কোনো কথা বা কর্ম কোনো ব্য-ক্তিবিশেষের কাছে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো সমাজে ছড়িয়ে যেত।
আর সমগ্র সমাজের কর্ম ও আলোচনার বিষয়ই ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এইসব নির্দেশনা। সুতরাং কোনো সমাজ থেকে কীভাবে এমন কোনো বিষয় হারিয়ে যেতে পারে যা তাদের কর্ম ও আলোচনার একমাত্র বিষয়, যা তাদের কর্ম ও আলোচনার মাধ্যমে সমাজে সর্বদা মূর্তিমান হয়ে উপস্থিত? এর সাথে অবশ্য সাহাবিদের বিস্ময়কর স্মরণশক্তির কথাও মনে রাখতে হবে। তাদের স্মরণশক্তির এই বিষয়টি এতটাই সর্বজনবিদিত যে, এখানে এ বিষয়ে দালীলিক আলোচনা বাহুল্যজ্ঞানে বর্জিত।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর কেউ ইসলাম গ্রহণ করে যখন এই সমাজে প্রবেশ করবে তখন তার চোখের সামনে সে নবীর সকল সুন্নাহ মূর্তিমান দেখতে পাবে। সে যদি কারো কাছে কিছু নাও শোনে, শুধু সমাজের দিকে দৃষ্টি রাখে তবুও বুঝতে পারবে, কোন বিষয়ে নবীর সুন্নাহ বা নির্দেশনা কী? কোন কাজটি তিনি কীভাবে করতেন? তাবিয়ি প্রজন্ম এভাবেই সাহাবিদের কাছ থেকে ইসলামি জ্ঞানের বড় একটি অংশ শিক্ষা লাভ করেছেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে কখনো কখনো তারা এটা প্রকাশও করেছেন। যেমন তাবিয়ি আতা' (রাহ.) বলেছেন:
أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يُصَلُّوْنَ ثَلَاثًا وَعِشْرِبْنَ رَكْعَةً بِالْوِتْرِ.
আমি লোকদের-অর্থাৎ সাহাবিদেরকে-পেয়েছি, তাঁরা বিতরসহ তেইশ রাকআত পড়তেন। ১৫৪
এ বর্ণনায় আমরা দেখছি, সাহাবিদেরকে যেভাবে কিয়ামু রমাযান করতে দেখেছেন সেটাকেই তিনি শরীআত হিসাবে গ্রহণ করছেন।
তাছাড়া নবীজির নির্দেশ মোতাবেক পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মৌখিকভাবে নবীর হাদীস পৌঁছে দিতেও তাঁরা সচেষ্ট ছিলেন। যেমন সাহাবি ওয়াবিসাহ ইবন মা'বাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে লোকদেরকে সম্বোধন করে বলেন:
أَدْنُوْا نُبَلِّغْكُمْ كَمَا قَالَ لَنَا رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
তোমরা কাছে এসো, তোমাদের কাছে পৌঁছে দিই, যেমন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন। ১৫৫
সুলাইম ইবন আমির (রাহ.) বলেন, আমরা সাহাবি আবু উমামা বাহিলি (রা.)-এর কাছে বসতাম। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদীস বর্ণনা করতেন। তারপর যখন চুপ করতেন, বলতেন:
أَعَقَلْتُمْ؟ بَلِّغُوْا كَمَا بَلَّغْنَاكُمْ.
তোমরা কি বুঝতে পেরেছ? তোমরাও পৌঁছে দেবে, যেভাবে আমরা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিলাম। ১৫৬
অন্য বর্ণনায় আছে তিনি তাদেরকে হাদীস শুনিয়ে বলতেন:
اسْمَعُوْا وَاعْقِلُوْا وَبَلِّغُوْا عَنَّا مَا تَسْمَعُوْنَ.
তোমরা শোনো এবং বুঝে নাও। আর যা শুনলে আমাদের পক্ষ থেকে তা পৌঁছেদাও। ১৫৭
এভাবে তাঁরা পরবর্তীদের কাছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস পৌঁছে দিতে সর্বপ্রযত্নে সচেষ্ট ছিলেন। তারপরও কোনো হাদীস যদি অবর্ণিত থেকে যেত তাঁরা মৃত্যুশয্যায় হলেও তা বর্ণনা করে যেতেন। হাসান বসরি (রাহ.) বলেন, মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে আমি মা'কিল ইবন ইয়াসার (রা.)-কে দেখতে যাই। তখন সেখানে উবাইদুল্লাহ প্রবেশ করলে মা'কিল (রা.) তাকে বলেন:
أُحَدِّثُكَ حَدِيثًا سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
'আমি তোমাকে একটি হাদীস শোনাব, যা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি।' এরপর তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করেন। ১৫৮
আবু আইউব আনসারি (রা.)-এর মৃত্যুর সময় সেনাবাহিনীর আমীর ইয়াযীদ ইবন মুআবিয়াহ তাঁর কাছে গেলে তিনি তাকে বলেন:
إِذَا مِتُّ فَاقْرَءُوْا عَلَى النَّاسِ مِنِّي السَّلَامَ فَأَخْبِرُوْهُمْ أَنِّي سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ: مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا جَعَلَهُ اللَّهُ فِي الْجَنَّةِ.
আমি যখন মারা যাব লোকদেরকে আমার পক্ষ থেকে সালাম দেবে। অতঃপর তাদেরকে জানাবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো শিরক না করে মৃত্যুবরণ করল, আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করবেন।১৫৯
এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা ও তথ্য-উপাত্ত হাদীস ও ইতিহাসের কিতাবাদিতে সংরক্ষিত আছে।

টিকাঃ
১৪১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৮৯。
১৪২. সহীহ বুখারি, হাদীস ১৬০৫; বাইহাকি, আস সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৯২৭৭。
১৪৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৪৮৭০。
১৪৪. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৮৪৫৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৮৫৫。
১৪৫. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩২১。
১৪৬. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৪৩৮; খতীব বাগদাদি, আল কিফায়াহ, পৃ. ৩৮৫。
১৪৭. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৮৪৯৩。
১৪৮. মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৬৪৫৮。
১৪৯. বুখারি, আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস: ৯৭০; সহীহ বুখারি ১/২৬; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৮৭১৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৬০৪২; ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, ১/১৭৪。
১৫০. সুনান দারিমি, হাদীস: ৫৯০; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩৬৩。
১৫১. তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর, ১৭/৩৪৯, হাদীস: ৯৬২ ও ১৯/৪৩৯, হাদীস: ১০৬৭; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৬৯৬০。
১৫২. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৩৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৩৮৮৩。
১৫৩. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৩৫৬৮; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস : ৫৭২৬; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়ায়িদ : ৯/১৮।
১৫৪. মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস: ৭৬৮৮। ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.) বলেন, আসারটির সনদ সহীহ। দেখুন: তারাবীহ সালাতের রাকআত সংখ্যা, পৃ. ৭৫।
১৫৫. কাশফুল আসতার, হাদীস: ১৪৫; মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ১/১৩৯। হাইসামি বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য。
১৫৬. ইবন আবী আসিম, আল আহাদ ওয়াল মাসানি, হাদীস: ১২৩৮; তাবারানি, আল মু'জামুল কাবীর, হাদীস: ৭৬৭৩; মুসনাদুশ শামিয়্যীন, হাদীস: ৯৫৩; খতীব বাগদাদি, শারফু আসহাবিল হাদীস, পৃ. ৯৬। হাইসামি বলেন, হাদীসটির সনদ হাসান。
১৫৭. সুনান দারিমি, হাদীস: ৫৬১। হুসাইন দারানি বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ。
১৫৮. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭১৫১。
১৫৯. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৩৫২৩।

📘 হাদীস মানতেই হবে > 📄 প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ

📄 প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ


প্রবীণ সাহাবিদের কর্ম ও বক্তব্যকে প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করে সংশয় তৈরি করা হয় যে, তাঁরা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতেন না; কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন।
প্রথমত বলা হয়, তাঁরা নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কুরআন ছাড়া আর কোনো কিছু প্রয়োজনীয় মনে করেননি। এ কারণেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাদীস তাঁরা বর্ণনা করেননি এবং লিখিত আকারে হাদীস সংকলনের উদ্যোগও নেননি।
তাঁদের নামে হাদীসের কিতাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হাদীস সংকলিত হয়নি এবং তাঁরা হাদীস সংকলনে পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেননি সত্য। তবে তা থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যে, তাঁরা হাদীসকে প্রয়োজনীয় মনে করতেন না—এ কথা সর্বৈব ভুল ও অবাস্তব। কেন তাঁরা হাদীস লিখিত আকারে সংকলনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেননি, কেন তাঁদের নামে সংকলিত হাদীসের সংখ্যা কম, তাঁদের নামে বর্ণিত না হলেও যে তাঁদের জানা হাদীস পরবর্তী উম্মাতের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে, কীভাবে তা হয়েছে—এসব বিষয় আমরা এ বইয়ে অন্যত্র আলোচনা করেছি। বইটি পুরো পড়া হলে এ সংক্রান্ত সংশয় আর থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত, এছাড়া প্রধান সাহাবিদের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করেও দাবি করা হয় যে, তাঁরা হাদীসকে শরীআতের দলীল হিসাবে মানতেন না; কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন।
(ক) ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেলে তিনি বলেন, 'তোমরা আমার কাছে লেখার কিছু নিয়ে এসো। তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখে দেব যাতে পরবর্তীকালে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না।' তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَلَبَهُ الْوَجَعُ وَعِنْدَنَا كِتَابُ اللَّهِ حَسْبُنَا.
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবল রোগযন্ত্রণার মধ্যে আছেন। আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব আছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট। ১৬০
(খ) আবু জুহাইফা (রা.) বলেন, আমি আলী (রা.)-কে বললাম, আপনাদের কাছে কি কিছু লিখিত আছে? তিনি বললেন:
لَا إِلَّا كِتَابُ اللَّهِ أَوْ فَهُمُ أُعْطِيَهُ رَجُلٌ مُسْلِمُ أَوْ مَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ.
'না, শুধু আল্লাহর কিতাব এবং মুসলিমকে দান করা হয়েছে এমন কিছু উপলব্ধি আর যা আছে এই সহীফাতে।' আবু জুহাইফা (রা.) বলেন, আমি বললাম, এই সহীফাতে কী আছে? তিনি বললেন, 'ক্ষতিপূরণ ও বন্দিমুক্তির বিধান এবং এ বিধানটিও রয়েছে যে, কাফিরের বিনিময়ে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। ১৬১
(গ) ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, উমার (রা.) ছুরিকাঘাতে আহত হলে সুহাইব (রা.) 'হে ভাই, হে বন্ধু' বলে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করে। তখন উমার (রা.) বলেন, হে সুহাইব, তুমি আমার জন্য কাঁদছ? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذِّبُ بِبَعْضِ بُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
মৃত ব্যক্তিকে তার জন্য তার পরিজনদের কোনো কোনো কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।
উমার (রা.)-এর ইন্তিকালের পর ইবন আব্বাস (রা.) এ কথা আয়িশা (রা.)-কে বললে তিনি বলেন, আল্লাহ উমারকে রহম করুন। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেননি যে:
إِنَّ اللَّهَ لَيُعَذِّبُ الْمُؤْمِنَ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
'আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে তার পরিজনদের কান্নার কারণে শাস্তি দেন।' বরং তিনি বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيَزِيدُ الْكَافِرَ عَذَابًا بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ.
'নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরের শাস্তি বৃদ্ধি করেন তার পরিজনদের কান্নার কারণে।' তোমাদের জন্য কুরআনের এই আয়াতই যথেষ্ট :
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى.
“কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”১৬২
এ ধরনের আরো কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয় যে, প্রধান ও প্রবীণ সাহাবিগণ (রা.) কুরআনকেই যথেষ্ট মনে করতেন, শরয়ি বিধানের উৎস হিসাবে হাদীসের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতেন না। এ পুস্তকের ক্ষুদ্র পরিসরে তাদের সকল বক্তব্য উদ্ধৃত করে খণ্ডন ও পর্যালোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে শুধু দেখার চেষ্টা করব যে, ঘটনার অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে তারা যে সিদ্ধান্তে এসেছে তা যথার্থ নয়। এমনকি তাদের চিন্তন দক্ষতা এ কাজের যোগ্য ও উপযুক্তও নয়।
কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত কোনো বক্তব্যকে সব সময় সাধারণ ও সর্বজনীনভাবে ব্যবহার করা যায় না। বরং বক্তার কর্ম ও অন্যান্য বক্তব্যকে সামনে রেখে বিবেচনা করতে হয়। নইলে মারাত্মক অর্থ বিভ্রাট ঘটতে পারে। সূরা তাওবাহর ৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন :
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْ تُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
“অতঃপর সম্মানিত মাসসমূহ অতিবাহিত হয়ে গেলে মুশরিকদেরকে যেখানেই পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে পাকড়াও করবে, অবরোধ করবে এবং তাদেরকে ধরার জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওত পেতে বসে থাকবে। তবে তারা যদি তাওবা করে, সালাত কায়িম করে এবং যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।”
মহান আল্লাহর বিধান এ নয় যে, সম্মানিত মাস ছাড়া অন্যান্য মাসে যেকোনো ধরনের মুশরিককে ধরার জন্য ওত পেতে থাকতে হবে এবং যেখানেই তাদের কাউকে পাওয়া যাবে হত্যা করতে হবে। কিন্তু প্রসঙ্গ ছাড়া আয়াতটি উল্লেখ করলে এমনটিই বোঝা যায়।
উল্লিখিত বর্ণনাগুলোতে বিশেষ প্রেক্ষাপটে সাহাবির বক্তব্য প্রদত্ত হয়েছে। যা সাধারণ ও সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নয়। আমরা তাঁদের সারা জীবনের কর্মপদ্ধতি ও অন্যান্য বক্তব্য সামনে রেখে বিবেচনা করলেই বুঝতে পারব।
উমার (রা.) কেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তিম উপদেশ লিখতে বাধা দিয়েছেন, তা ওই বর্ণনার মাঝেই উল্লেখ আছে। একে তো নবীজি রোগযন্ত্রণায় ক্লিষ্ট। উমার (রা.) চাননি, এই মুহূর্তে নবীজিকে কষ্ট দেওয়া হোক। তাছাড়া নবীজি তখন শরীআত সম্পর্কে নতুন কোনো বিধান বর্ণনা করতে চাননি। বরং কিছু হিতোপদেশ দিতে চেয়েছেন, যা তাঁর উম্মাতকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করবে। উমার (রা.) বুঝেছেন, আমাদেরকে ভ্রান্তি থেকে বাঁচিয়ে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য কুরআন তো রয়েছেই। সুতরাং এই ক্লিষ্ট মুহূর্তে নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার কী দরকার!
তিনি যে বলেছেন, দিশা দেওয়ার জন্য, ভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর জন্য কুরআনই যথেষ্ট, সেই কুরআনই তো আমাদেরকে নির্দেশনা দিচ্ছে, কুরআনকে নবীজির হাদীসের আলোকে বুঝে মান্য করতে হবে। কুরআনের এই নির্দেশনা অমান্য করে কুরআন বুঝতে গেলে আমরা বিভ্রান্ত হব। সুতরাং উমার (রা.)-এর এ কথার উদ্দেশ্য কিছুতেই এ নয় যে, হাদীস মানতে হবে না। বরং তাঁর সারা জীবনের কর্মপন্থা প্রমাণ করে, তিনি কুরআন বুঝতেন হাদীসের আলোকে আর হাদীসকে মানতেন শরয়ি বিধানের অন্যতম উৎস হিসাবে। প্রমাণ হিসাবে আমরা দুটি বর্ণনা উল্লেখ করছি।
উমার (রা.) তাঁর নিযুক্ত কুফার বিচারক কাযি শুরাইহকে নির্দেশ দিয়ে লেখেন:
اقْضِ بِمَا فِي كِتَابِ اللهِ فَإِنْ لَّمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَبِسُنَّةِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
তুমি আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফায়সালা করবে। যদি আল্লাহর কিতাবে না থাকে তবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসারে ফায়সালা করবে। ১৬৩
তাবিয়ি উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রাহ.) বলেন:
أَنَّ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ نَشَدَ النَّاسَ : مَنْ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي السِّقْطِ ؟ فَقَالَ الْمُغِيرَةُ: أَنَا سَمِعْتُهُ قَضَى فِيْهِ بِغُرَّةٍ عَبْدٍ أَوْ أَمَةٍ قَالَ: ائْتِ مَنْ يَشْهَدُ مَعَكَ عَلَى هُذَا. فَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ : أَنَا أَشْهَدُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمِثْلِ هَذَا.
উমার (রা.) মানুষদের কাছে জানতে চান, আঘাতের ফলে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হলে তার বিচারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে রায় দিয়েছেন তা কেউ শুনেছেন কি না। তখন মুগীরাহ বলেন, আমি তাঁকে এ বিষয়ে একজন দাস বা দাসী প্রদানের বিধান দিতে শুনেছি। উমার (রা.) বলেন, আপনার সাথে এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কাউকে আনয়ন করুন। তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ বিধান দিয়েছেন। ১৬৪
অন্য বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন:
أَنَّ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ نَشَدَ النَّاسَ قَضَاءَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْجَنِيْنِ فَقَامَ حَمَلُ بْنُ مَالِكِ بْنِ النَّابِغَةِ فَقَالَ: كُنْتُ بَيْنَ امْرَأَتَيْنِ فَضَرَبَتْ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى بِمِسْطَحٍ فَقَضَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جَنِينِهَا بِغُرَّةٍ وَأَنْ تُقْتَلَ بِهَا.
গর্ভস্থ সন্তানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফায়সালা জানতে চান উমার (রা.) লোকদের কাছে। তখন হামাল ইবন মালিক ইবন নাবিগাহ দাঁড়িয়ে বলেন, আমি দুজন নারীর মাঝে ছিলাম। তাদের একজন অপরজনকে দণ্ড দ্বারা আঘাত করে। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের বিষয়ে ক্রীতদাস প্রদানের এবং ওই নারীর বদলে তাকে হত্যার ফায়সালা প্রদান করেন। ১৬৫
এ বর্ণনা থেকে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। ১. উমার (রা.) হাদীসকে শরয়ি বিধানের দলীল হিসাবে মানতেন। এজন্য ফায়সালা দেবার ক্ষেত্রে যে বিষয়ে তিনি নবীজির হাদীস জানেন না অন্যদের কাছে শুনে জেনে নিচ্ছেন। ২. তাঁর কাছে হাদীস এত গুরুত্বপূর্ণ যে, অন্যের কাছে শুনে গ্রহণ করার আগে সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই করে নিচ্ছেন। গুরুত্বহীন জিনিস কেউ গ্রহণ করার জন্য যাচাই-বাছাই করে না। এবং ৩. সাহাবিগণ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একে অপরের কাছ থেকে হাদীস শিখতেন।
আলী (রা.)-এর বক্তব্য এক বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদত্ত হয়েছিল। যে কারণে এ কথাটি তাঁকে বারবার বলতে হয়েছে। হাদীস অস্বীকারের জন্য তিনি এ কথা বলেননি। শীআ সম্প্রদায় তাদের মতলব হাসিলের মানসে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আহলে বাইত, বিশেষ করে আলী (রা.)-এর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কিছু ইলম রেখে গেছেন, যা অন্যদের জানা নেই। আলী (রা.) এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হচ্ছিলেন। কখনো তিনি জিজ্ঞাসাকারীকে, আবার কখনো পুরো জাতিকে জানানোর জন্য মিম্বারে এ বিষয়ক বক্তব্য প্রদান করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে: আমার কাছে লিখিত বস্তু, যা পাঠ করা যায়, এমন বিষয় শুধু আল্লাহর কিতাব এবং এই পুস্তিকায় সংকলিত বিধিবিধান বিষয়ক কিছু বাণী আর আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ উপলব্ধিই রয়েছে। এছাড়া অন্য সাহাবিদের থেকে অতিরিক্ত আমার কিছুই জানা নেই।
এখন বলুন, এর সাথে হাদীস অস্বীকারের কী সম্পর্ক? তিনি তো শীআদের এই দাবি খণ্ডন করছেন যে, তাঁর কাছে নবীজি ওহির কিছু বিশেষ জ্ঞান অতিরিক্ত রেখে গেছেন। তিনি যে বলছেন, আমার কাছে আল্লাহর কিতাব এবং এই সহীফায় লিখিত কিছু বাণী ছাড়া কিছুই নেই, এর অর্থ কি এই যে, তাঁর কাছে হাদীস অপরিহার্য বিষয় ছিল না, তাই তিনি হাদীস সংরক্ষণ করেননি? না, বরং তিনি বলছেন, শীআদের দাবি মতো তাঁর কাছে কিছু নেই বা কুরআন ও এই বাণীগুলো ছাড়া তার কাছে লিখিত, যা পাঠ করা যায় (مِنْ كِتَابٍ يُقْرَأُ وَفِي رِوَايَةٍ كِتَابٌ نَقْرَأَهُ), এমন কিছু নেই। এ বিষয়ক সকল বর্ণনা সামনে রাখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ১৬৬
মনে রাখতে হবে, লিখে রাখা সাহাবিদের কাছে হাদীস সংরক্ষণের মূল মাধ্যম ছিল না। বরং মূল মাধ্যম ছিল ব্যক্তি ও সমাজের আমল, স্মৃতিতে সংরক্ষণ এবং আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে নিত্যনৈমিত্তিক চর্চা। সুতরাং এ কথা মনে করা যে, যেহেতু অনেক কিছু লিখিত ছিল না সেহেতু সংরক্ষিত ছিল না এবং তিনি এর গুরুত্বও দিতেন না—এ কথা হাদীস সংরক্ষণ বিষয়ে সাহাবিদের কর্মপন্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।
আলী (রা.) উমার (রা.)-এর মতোই হাদীসকে শরীআতের উৎস মনে করতেন এবং বড় সতর্কতার সাথে বর্ণনা ও গ্রহণ করতেন।
আসমা ইবন হাকাম ফাযারি (রাহ.) বলেন, আমি আলী (রা.)-কে বলতে শুনেছি :
إِنِّي كُنْتُ رَجُلًا إِذَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثًا نَفَعَنِي اللهُ مِنْهُ بِمَا شَاءَ أَنْ يَنْفَعَنِي وَإِذَا حَدَّثَنِي رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِهِ اسْتَحْلَفْتُهُ (أَنَّهُ سَمِعَهُ مِنْهُ) فَإِذَا حَلَفَ لِي صَدَّقْتُهُ.
আমি এমন প্রকৃতির লোক ছিলাম যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি কোনো হাদীস শুনলে আল্লাহর ইচ্ছায় তা দ্বারা প্রভূত উপকৃত হতাম। আর তাঁর অন্য কোনো সাহাবি আমাকে হাদীস বললে তাঁকে এই মর্মে শপথ করতে বলতাম যে, সত্যই তিনি তাঁর থেকে শুনেছেন। শপথ করলে তাঁর বর্ণনা সত্য বলে গ্রহণ করে নিতাম।... এরপর তিনি আবু বাকর (রা.)-এর সূত্রে ইস্তিগফার বিষয়ক একটি হাদীস বর্ণনা করেন। ১৬৭
সুওয়াইদ ইবন গাফালাহ (রাহ.) বলেন, আলী (রা.) বলেছেন:
إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَأَنْ أَخِرَّ مِنَ السَّمَاءِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَكْذِبَ عَلَيْهِ وَإِذَا حَدَّثْتُكُمْ فِيْمَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ فَإِنَّ الْحَرْبَ خَدْعَةٌ.
আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করি তখন তাঁর নামে মিথ্যা বলার চেয়ে আকাশ থেকে ভূপাতিত হওয়া আমার কাছে প্রিয়। আর আমাদের পারস্পরিক আলোচনার বিষয় তো এই যে, যুদ্ধমাত্রই কৌশল। ১৬৮
হাদীস সংরক্ষণের জন্যও তিনি বিশেষ তাকিদ দিতেন। নিয়মিত হাদীস চর্চার নির্দেশ দিয়ে ছাত্রদের বলতেন :
تَزَاوَرُوا وَتَذَاكَرُوا الْحَدِيثَ فَإِنَّكُمْ إِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا يَدْرُسُ.
তোমরা পরস্পর সাক্ষাৎ করে হাদীসের চর্চা ও আলোচনা করতে থাকো। তোমরা এটা না করলে হাদীস বিলীন হয়ে যাবে। ১৬৯
'জীবিতদের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তির শাস্তি হয়' উমার (রা.)-এর এ বিষয়ক বর্ণনার বিপরীতে আয়িশা (রা.) যে বলেছেন, 'তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট' এ কথা কি তিনি হাদীসের বিরুদ্ধে বলেছেন? কখনোই নয়। তিনি বরং হাদীসের পাঠ বিশুদ্ধ করতে চেয়েছেন। উপরোক্ত বর্ণনাতেই এ কথা সুস্পষ্ট রয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, উমার (রা.)- এর বর্ণনার বিপরীতে তাঁর বর্ণনাই সঠিক। এ কথা বুঝতে তোমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট। এ বিষয়ক ইবন উমার (রা.)-এর বর্ণনার বিপরীতে তিনি বলেন:
وَهَلْ تَعْنِي ابْنَ عُمَرَ إِنَّمَا مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرٍ فَقَالَ : إِنَّ صَاحِبَ هَذَا لَيُعَذِّبُ وَأَهْلُهُ يَبْكُوْنَ عَلَيْهِ.
ইবন উমার ভুল করেছেন। বাস্তবতা এই যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন বলেন, এই কবরের বাসিন্দাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ তার পরিজনরা তার জন্য কাঁদছে।... এ বলে তিনি সূরা আনআমের ১৬৪ নং আয়াতটি পাঠ করেন। ১৭০
উপরের আলোচনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, হাদীসের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের জন্য তিনি এ কথা বলেননি। বরং হাদীসের বিশুদ্ধ পাঠ নিরূপণের জন্য বলেছেন। এবং নিজের বর্ণনার সমর্থক হিসাবে আয়াত উল্লেখ করেছেন। তিনি যদি হাদীসের প্রয়োজনীয়তাই অস্বীকার করবেন, তবে তার পাঠ বিশুদ্ধতার জন্য চেষ্টা কেন করবেন? এ কথাই তো বলে দেবেন যে, তোমরা নবীজি কী বলেছেন তা বাদ দাও, কুরআনের এই আয়াতের দিকে তাকাও। কিন্তু তা তিনি বলেননি।
তাঁর ব্যাপারে এ কথা কীভাবে বলা যায় যে, তিনি হাদীসের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতেন না! অথচ তিনি সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবিদের অন্যতম। হাদীস সংরক্ষণ, হাদীসের পাঠ ও মর্ম বিশুদ্ধকরণ, পরবর্তীদেরকে হাদীস শিক্ষাদান ও হাদীস প্রতিপালনে জীবন উৎসর্গকারী! তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মকে শরয়ি বিধানের দলীল হিসাবে পেশ করতেন, অন্যদেরকে হাদীস শিখতে উৎসাহিত করতেন।
সাহাবিদের মধ্যে গোসল ফরয হওয়ার কারণ বিষয়ে মতভেদ হয়। তখন আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নবীজির কর্মকে দলীল হিসাবে উল্লেখ করে বলেন :
إِذَا جَاوَزَ الْخِتَانُ الْخِتَانَ وَجَبَ الْغُسْلُ فَعَلْتُهُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاغْتَسَلْنَا.
পুরুষের যৌনাঙ্গের খতনার স্থান নারীর খতনার স্থান অতিক্রম করলে গোসল আবশ্যক হয়ে যাবে। আমি এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করেছি। এরপর আমরা গোসল করেছি। ১৭১
উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রাহ.) বলেন, আমার খালা আয়িশা (রা.) আমাকে বলেন:
يَا ابْنَ أُخْتِيْ بَلَغَنِي أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو مَارُّ بِنَا إِلَى الْحَجِّ فَالْقَهُ فَسَائِلْهُ فَإِنَّهُ قَدْ حَمَلَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِلْمًا كَثِيرًا.
'হে ভাগিনা, শুনলাম আব্দুল্লাহ ইবন আমর আমাদের এলাকা দিয়ে হজ্জে যাচ্ছেন। তুমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করে ইলম শিখে নাও। কেননা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রচুর ইলম অর্জন করেছেন।' তখন আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করি। তিনি সেসব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেন। আমি সেসব হাদীস আমার খালা আয়িশা (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করি। তার মধ্যে একটা হাদীসে তাঁর খটকা লাগে। তিনি তাতে আপত্তি করেন। এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাকে আবার জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি তোমাকে বলেছেন যে, এটি তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি শুনেছেন?
পরের বছর খালা আমাকে বলেন, ইবন আমর এসেছেন। তুমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে ওই হাদীসটি সম্পর্কে আবার জিজ্ঞাসা করবে। উরওয়া বলেন, আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। তিনি ওই হাদীসটি প্রথমবার আমাকে যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই বর্ণনা করেন। আমি যখন খালাকে বিষয়টি বলি, তিনি বলেন:
مَا أَحْسَبُهُ إِلَّا قَدْ صَدَقَ أَرَاهُ لَمْ يَزِدْ فِيْهِ شَيْئًا وَلَمْ يَنْقُصْ.
আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি ঠিকই বলেছেন। দেখছি তো, তিনি একটু বাড়িয়েও বলেননি, কমিয়েও বলেননি। ১৭২
এই বর্ণনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, আয়িশা (রা.)-এর খটকা লাগলে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, সত্যই এটা নবীর হাদীস কি না এবং নিশ্চিত হওয়ার পর নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছেন, কোনো অজুহাতেই বাতিল করার চেষ্টা করছেন না। সকল সাহাবির এটাই ছিল রীতি। এমনকি তাঁরা কোনো বর্ণনাকে নবীর হাদীস বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাতে কুরআনের সাথে কাল্পনিক সংঘর্ষ আবিষ্কারেরও চেষ্টা করতেন না। পূর্বের বুঝের সাথে অমিল হলে হাদীস অনুযায়ী নিজের বুঝ মেরামত করে নিতেন।
ইসলামের প্রথম খলীফা প্রধানতম সাহাবি সিদ্দীকে আকবার আবু বাকর (রা.)-ও হাদীসকে শরীআতের অন্যতম উৎস হিসাবে মান্য করতেন। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) ও ইবন আব্বাস (রা.) বলেন:
لَمَّا قُبِضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخْتَلَفُوْا فِي دَفْنِهِ فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ : سَمِعْتُ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا مَا نَسِيْتُهُ قَالَ: مَا قَبَضَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا فِي الْمَوْضِعِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُدْفَنَ فِيْهِ ادْفِنُوهُ فِي مَوْضِعِ فِرَاشِهِ.
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল করেন সাহাবিদের মধ্যে তাঁর দাফন সংক্রান্ত বিষয়ে মতানৈক্য হয়। তখন আবু বাকর (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি, যা আজও ভুলিনি, তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ কোনো নবী (আ.)-এর জান সে স্থানেই কবয করেন যেখানে তাঁর দাফন হওয়া তিনি পছন্দ করেন।' সুতরাং তোমরা নবীজিকে তাঁর মৃত্যুর বিছানার স্থানেই দাফন করো। ১৭৩
এ বর্ণনার আলোকে আমরা দেখছি, আবু বাকর সিদ্দীক (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর প্রথম সিদ্ধান্তই দিয়েছেন হাদীসের আলোকে। এভাবেই তিনি সারা জীবন সকল কাজে নবীজির সুন্নাহকে সামনে রেখেছেন। খিলাফাতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তিনি একটি ভাষণ দেন। সে মূল্যবান ভাষণে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান বর্ণনার পর তিনি বলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ وَلِيْتُ أَمْرَكُمْ وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ وَلَكِنْ نَزَلَ الْقُرْآنُ وَسَنَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم السُّنَنَ فَعَلَّمَنَا فَعَلِمْنَا ... أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَنَا مُتَّبِعُ وَلَسْتُ بِمُبْتَدِعٍ فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِيْنُوْنِيْ وَإِنْ زُعْتُ فَقَوَّمُوْنِي.
হে লোকসকল, আমি তোমাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। আমি তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। তবে কুরআন নাযিল হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ প্রবর্তন করেছেন—তিনি শিক্ষা দিয়েছেন আর আমরা শিখে নিয়েছি।... হে লোকসকল, আমি কেবল অনুসারী; উদ্ভাবক নই। সঠিক পথে থাকলে আমাকে সাহায্য করবে আর বিচ্যুত হলে সোজা করে দেবে। ১৭৪
আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, ফাতিমা (রা.) এবং আব্বাস (রা.) আবু বাকর (রা.)-এর কাছে নবীজির মিরাস দাবি করেন। এ প্রসঙ্গে আবু বাকর (রা.) বলেন:
وَإِنِّي وَاللَّهِ لَا أَدَعُ أَمْرًا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُهُ فِيْهِ إِلَّا صَنَعْتُهُ.
এক্ষেত্রে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যা কিছু করতে দেখেছি তার কিছুই ছাড়ব না, সবকিছুই কার্যে পরিণত করব।১৭৫
কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু বলেছেন আবু বাকর সিদ্দীক (রা.) তাকে মহান আল্লাহপ্রদত্ত আবশ্যক বিধান বলে গণ্য ও মান্য করতেন। আনাস (রা.)-কে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে প্রেরণকালে যাকাতের বিস্তারিত বিধান সংক্রান্ত যে লিখিত দস্তাবেজ তাঁর কাছে দিয়ে দেন তাঁর শুরুতে তিনি লেখেন:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ هَذِهِ فَرِيضَةُ الصَّدَقَةِ الَّتِي فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ وَالَّتِي أَمَرَ اللَّهُ بِهَا رَسُوْلَهُ.
পরম দয়ালু চিরদয়াময় আল্লাহর নামে। এটা যাকাত নির্ধারণ বিষয়ক দস্তাবেজ-যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের উপর আবশ্যক করেছেন এবং আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যার আদেশ করেছেন।১৭৬
সাহাবি কাবীসাহ ইবন যুআইব (রা.) বলেন, এক দাদি এসে আবু বাকর (রা.)-এর কাছে মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার দাবি করে। তখন তিনি বলেন:
مَا لَكِ فِي كِتَابِ اللهِ تَعَالَى شَيْءٍ وَمَا عَلِمْتُ لَكِ فِي سُنَّةِ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا فَارْجِعِي حَتَّى أَسْأَلَ النَّاسَ.
'আল্লাহ তাআলার কিতাবে আপনার জন্য (দাদির উত্তরাধিকার বিষয়ে) কোনো আলোচনা নেই। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা আছে কি না আমার জানা নেই। আপনি ফিরে যান। আমি মানুষদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখি।'
এরপর তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। মুগীরাহ ইবন শু'বাহ (রা.) বলেন, আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাদিকে এক-ষষ্ঠাংশ দান করেন। আবু বাকর (রা.) বলেন, আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছেন? তখন অন্য সাহাবি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা.) দাঁড়ান এবং মুগীরাহ (রা.)-এর অনুরূপ বলেন। তখন আবু বাকর (রা.) সে অনুযায়ী নির্দেশ প্রদান করেন। ১৭৭
মাইমুন ইবন মিহরান (রা.) বলেন:
كَانَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا وَرَدَ عَلَيْهِ الْخَصْمُ نَظَرَ فِي كِتَابِ اللهِ فَإِنْ وَجَدَ فِيْهِ مَا يَقْضِي بَيْنَهُمْ قَضَى بِهِ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي الْكِتَابِ وَعَلِمَ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ذَلِكَ الْأَمْرِ سُنَّةً قَضَى بِهِ فَإِنْ أَعْيَاهُ خَرَجَ فَسَأَلَ الْمُسْلِمِينَ وَقَالَ: أَتَانِي كَذَا وَكَذَا فَهَلْ عَلِمْتُمْ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى فِي ذُلِكَ بِقَضَاءِ؟ فَرُبَّمَا اجْتَمَعَ إِلَيْهِ النَّفَرُ كُلُّهُمْ يَذْكُرُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْهِ قَضَاءً. فَيَقُوْلُ أَبُو بَكْرٍ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي جَعَلَ فِيْنَا مَنْ يَحْفَظُ عَلَى نَبِيِّنَا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আবু বাকর (রা.)-এর কাছে কোনো বিচার এলে তিনি আল্লাহর কিতাব দেখতেন। সেখানে তাদের বিষয়ে কোনো ফায়সালা পেলে সে অনুযায়ী বিচার করে দিতেন। আর আল্লাহর কিতাবে না থাকলে, সে বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সুন্নাহ তাঁর জানা থাকলে সে অনুযায়ী তিনি ফায়সালা করতেন। আর যদি সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো ফায়সালা তাঁর জানা না থাকত, তিনি বের হয়ে মুসলিমদেরকে জিজ্ঞাসা করতেন, আমার কাছে এ-জাতীয় বিচার এসেছে। তোমাদের কি এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ফায়সালা জানা আছে? প্রায়শ তাঁর পাশে কিছু লোক একত্র হয়ে যেত। তাঁরা সে বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ফায়সালা শোনাতেন। তখন আবু বাকর (রা.) বলতেন, প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত। তিনি আমাদের মাঝে এমন লোক রেখেছেন যিনি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিষয় সংরক্ষণ করেছেন। ১৭৮
প্রধান সাহাবি সকলেরই আল কুরআনের পূর্ণাঙ্গ ইলম ছিল। কিন্তু কুরআনের পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাদীস শেখা সত্ত্বেও কোনো কোনো হাদীস অজানা থাকা সংগত কারণেই অসম্ভব নয়। তাই নবীজির ইন্তিকালের পরপর প্রথম দিকে কিছু ঘটনা এমন ঘটেছে যে, কোনো সাহাবি একটি হাদীস বলেছেন, কিন্তু কোনো প্রধান সাহাবি সে হাদীসটি জানেন না। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে, এটি সত্যই নবীর হাদীস কি না। প্রথমত তিনি তাঁর জানা ইলম অনুযায়ী এর উপর সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন। কখনো হয়তো সন্দেহের কারণ হিসাবে কুরআনের কোনো আয়াত পেশ করেছেন এবং হাদীসের পক্ষে পর্যাপ্ত দলীল পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি কুরআন দিয়ে হাদীস বাতিল করে দিচ্ছেন। বরং হাদীসটি তাঁর জানা ইলমের থেকে ভিন্ন হওয়ায় তিনি জানা ইলমের আলোকে এই অজানা ইলমের প্রতি প্রথমত সন্দেহ আরোপ করে এটি সত্যই নবী-বাণী কি না তা নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে সুন্নাহর বিপরীতে সুন্নাহ হলেও একই পন্থা তাঁরা অবলম্বন করতেন। যেমন মহিলা সাহাবি ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) যখন বলেন যে, তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেন, তিনি ইদ্দতকালীন আবাসন ও ভরণপোষণের খরচ পাবেন না। এ কথা শুনে উমার (রা.) বলেন:
إِنْ جِئْتِ بِشَاهِدَيْنِ يَشْهَدَانِ أَنَّهُمَا سَمِعَاهُ مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... لَا نَتْرُكُ كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّنَا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِقَوْلِ امْرَأَةٍ لَا نَدْرِي لَعَلَّهَا حَفِظَتْ أَوْ نَسِيَتْ.
আপনি কি দুজন সাক্ষী আনতে পারবেন যারা সাক্ষ্য দেবে যে, তারা এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন?... এছাড়া তো আমরা একটি নারীর কথায় আল্লাহর কিতাব ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না। আমরা জানি না, তিনি ঠিক ঠিক স্মরণ রাখতে পেরেছেন, নাকি ভুলে গেছেন। ১৭৯
তিনটি বিষয় লক্ষণীয়, ১. উমার (রা.) তাঁর বক্তব্যের পেছনে সূরা তালাকের ১ নং আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। ২. তিনি ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.)-কে তাঁর হাদীসের পক্ষে দুজন সাক্ষী আনয়নের কথা বলেছেন। বোঝা যাচ্ছে, উমার (রা.) সরাসরি এ হাদীসকে বাতিল করে দিচ্ছেন না। সাক্ষী পেয়ে নবীজির হাদীস বলে নিশ্চিত হতে পারলে গ্রহণ করবেন এবং ৩. তিনি বলেছেন, '...আল্লাহর কিতাব ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পরিত্যাগ করতে পারি না'। অর্থাৎ তিনি শুধু কুরআনের বিপরীতে হাদীসের ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। বরং তাঁর জানা হাদীসের বিপরীতে হাদীস হলেও একই কথা প্রযোজ্য।
অনুমতি প্রার্থনা বিষয়ক হাদীস, যা বাহ্যত কুরআনি বিধানকে আংশিক পরিবর্তন করে দেয়, আবু মূসা আশআরি (রা.) যখন হাদীসটি উমার (রা.)-কে বলেন, উমার (রা.) তাঁকে সাক্ষী আনতে বলেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সাক্ষ্য দিলে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, এটা সত্যই নবী- বাণী। তখন তিনি হাদীসটি গ্রহণ করেন এবং স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন:
خَفِيَ عَلَيَّ هَذَا مِنْ أَمْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلْهَانِي عَنْهُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ... إِنِّي لَمْ أَتَّهِمْكَ وَلَكِنَّ الْحَدِيثَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَدِيدٌ... وَلَكِنْ خَشِيْتُ أَنْ يَتَقَوَّلَ النَّاسُ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম বিষয়ক এই নির্দেশনাটি আমার অজানা রয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা আমাকে অনবহিত রেখেছে। আমি আপনাকে সন্দেহ করিনি। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করা তো অনেক বড় ব্যাপার! আমার আশঙ্কা হয়, মানুষ তাঁর নামে বানিয়ে কথা বলে কি না!১৮০
উমার (রা.) আবু মূসা আশআরি (রা.)-কে তাঁর বর্ণিত হাদীসের পক্ষে সাক্ষী আনতে বলেন। এ থেকে যদি আমরা বুঝে থাকি যে, কুরআনের বিপরীত হওয়ায় তিনি এ হাদীস মানছেন না তবে সেটা আমাদের বোঝার ভুল। তিনি পরে সুস্পষ্ট করেই বলেছেন, আবু মূসা আশআরি (রা.)-কে তিনি সন্দেহ করেননি। তবে তিনি চেয়েছেন, নবীজির নামে হাদীস বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেন যে কেউ যাচ্ছেতাই বলতে না পারে। তাই তিনি হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে এ কঠোর পন্থা অবলম্বন করেছেন। অন্যান্য সাহাবি থেকে বর্ণিত এ ধরনের অন্য ঘটনাগুলোও এর আলোকে ব্যাখ্যেয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হাদীসে নববি ইসলামি শরীআতের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ার কারণে সকল যুগেই হাদীসের নামে জালিয়াতি হয়েছে। আর সাহাবিদের মতো প্রত্যেক যুগের মুহাদ্দিসগণও হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে এ ধরনের কঠোর নিরীক্ষণের পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। তাই হাদীস জাল করা কোনো যুগেই এমন ডালভাত ছিল না যে, যে কেউ যাচ্ছেতাই বলছে আর উম্মাত তা গ্রহণ করে নিচ্ছে। বরং কোনো জালিয়াতের কথায় সাধারণ মানুষ সাময়িকভাবে প্রতারিত হলেও মুহাদ্দিসদের নিরীক্ষায় তা ধরা পড়ে যেত। প্রত্যেক যুগের জাল বর্ণনা সমসাময়িক মুহাদ্দিসদের দ্বারাই চিহ্নিত হয়ে গেছে। এমন নয় যে, দীর্ঘকাল ধরে ভুলশুদ্ধ একত্র হয়ে ধোঁয়াশা হয়ে গেছে আর পরবর্তীকালে প্রয়োজন অনুভূত হলে তা থেকে ধুলোর আস্তর সরিয়ে বিশুদ্ধ নবী-বাণী বের করে আনা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

টিকাঃ
১৬০. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১৪。
১৬১. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১১১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১৪১২。
১৬২. সূরা [৬] আনআম, আয়াত: ১৬৪; সহীহ বুখারি, হাদীস : ১২৮৭, ১২৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯২৭, ৯২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ১৮৫৮。
১৬৩. সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৫৩৯৯; সুনান দারিমি, হাদীস: ১৬৯। শায়খ আলবানি বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ।
১৬৪. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৯০৭。
১৬৫. সুনান দারিমি, হাদীস: ২৪২৬。
১৬৬. কাসতাল্লানি, ইরশাদুস সারি, ১০/৩১৪; আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১/২০৪。
১৬৭. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ৩০০৬; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫২১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ১৩৯৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২; মুসনাদ তায়ালিসি, হাদীস: ১ ও ২。
১৬৮. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৩৬১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৬৬。
১৬৯. মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস: ২৬১৩৪; সুনান দারিমি, হাদীস : ৬৫০; মুস্তাদরাক হাকিম: ৩২৪। এই বর্ণনাটিকে হুসাইন দারানি সহীহ বলেছেন।
১৭০. সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩১২৯; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ৫৬৮১。
১৭১. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১০৮; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৭/২৬৮。
১৭২. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৭৩; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল ৮/৩৩。
১৭৩. মুআত্তা মালিক: ১/২৩১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১০১৮; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১৬২৮; মুসনাদ আবু ইয়া'লা, হাদীস: ২২; বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, হাদীস: ৩৮৩২。
১৭৪. আবু উবাইদ, আলখুতাবু ওয়াল মাওয়ায়িয, হাদীস: ১১৯; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৩৬। বর্ণনাটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য।
১৭৫. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৯ ও ৫৮; সহীহ বুখারি, হাদীস : ৬৭২৫-৬৭২৬。
১৭৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ১৪৫৪; সহীহ ইবন খুযাইমা, হাদীস: ২২৬১; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ১৫৬৭; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১৮০০。
১৭৭. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ৩০৩৮; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২৮৯৪; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২১০১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ২৭২৪; মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস: ৩১২৭২; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৭৯৭৮। ইমাম তিরমিযি, হাকিম, যাহাবি, মুহাম্মাদ আওয়ামা, ইসলাম মানসুর প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
১৭৮. সুনান দারিমি, হাদীস: ১৬৩; বাইহাকি, আসসুনানুল কুবরা, হাদীস : ২০৩৪১। নাদরাতুন নাঈম, ২/৩৮। বর্ণনাটির সকল রাবি নির্ভরযোগ্য।
১৭৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪৮০; সুনান নাসায়ি, হাদীস: ৩৫৪৯; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২ ২৯১; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১১৮০。
১৮০. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ২০৩০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১০২৯, ১৯৬১১; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৩৫৩, ৬২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৫৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৫১৮০- ৫১৮৪; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল: ৬/৫৭৯。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00